এ অধ্যায়ের বিষয়সমূহ
Toggleপবিত্র কুরআন কি? কোথা থেকে – কেন এসেছে এবং কেন এটা সার্বজনীন?
পবিত্র কুরআন আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীনের নাযিলকৃত ঐশী গ্রন্থ যা মানবজাতিকে সুপথ প্রদর্শনের জন্য নাযিল হয়েছিল সর্বশেষ নবী ও রাসূল হযরত মুহাম্মদ (সা) এর উপর। বাণী বাহক ফেরেশতা হযরত জিব্রাইল (আ) মহান আল্লাহর তরফ থেকে এ গ্রন্থের আয়াতসমূহ বিভিন্ন সময়ে অবতীর্ণ করেন নবী করীম (সা) এর নিকট। তাঁর তেইশ বছরের নবুওতি জীবনে পরিপূর্ণ কুরআন নাযিল হয়েছিল।
পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন আয়াতে কুরআনের পরিচয় সুস্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে। পবিত্র কুরআন মানবজাতির জন্য এক উপদেশ বাণী, সতর্ক বার্তা, হেদায়েত ও রহমত। এ গ্রন্থটি স্বয়ং আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন কর্তৃক সুরক্ষিত। এটি সত্য, ন্যায় ও পূত–পবিত্র বাক্যাবলীর সমষ্টি এবং এতে নেই কোন সন্দেহ, গরমিল ও অশ্লীলতা।
এ কুরআন কি, কোথা থেকে এসেছে, কেন এসেছে – এসব প্রশ্নের উত্তর পবিত্র কুরআনে বিশদভাবে বর্ণিত হয়েছে:
১️. পবিত্র কুরআন কী?
পবিত্র কুরআন হলো আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলার চূড়ান্ত ঐশী বাণী, যা মানবজাতির হেদায়েতের জন্য নাযিল হয়েছে সর্বশেষ নবী ও রাসূল হযরত মুহাম্মদ (সা) এর ওপর। এটি কেবল একটি ধর্মগ্রন্থ নয়; বরং একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা—যেখানে বিশ্বাস, নৈতিকতা, আইন, সমাজব্যবস্থা ও আধ্যাত্মিকতার দিকনির্দেশনা একত্রে উপস্থাপিত হয়েছে।
যুক্তিগতভাবে, মানবজীবনের জটিলতা ও বহুমাত্রিক সমস্যার জন্য একটি নির্ভুল ঐশী নির্দেশনার প্রয়োজন ছিলো — পবিত্র কুরআন সেই পূর্ণাঙ্গ দিকনির্দেশনাই প্রদান করে।
“এটি এমন এক কিতাব, যাতে কোনো সন্দেহ নেই; মুত্তাকীদের জন্য হেদায়েত (পথ–প্রদর্শক)।” (সূরাহ বাক্বারাহ, ২:২)
২️. পবিত্র কুরআন কেন নাযিল হয়েছে?
(ক) মানবজাতিকে সঠিক পথ প্রদর্শনের জন্য: মানুষ স্বভাবতই সীমিত জ্ঞানের অধিকারী; তাই সঠিক/ভুল নির্ধারণে ঐশী নির্দেশনা অপরিহার্য।
“এ কুরআন মানুষের জন্য সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা…” (সূরাহ বাক্বারাহ, ২:১৮৫)
(খ) সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য নির্ধারণের জন্য: যুক্তিগতভাবে, নৈতিক আপেক্ষিকতার যুগে একটি নির্ভরযোগ্য মানদণ্ড প্রয়োজন—পবিত্র কুরআন সেই চূড়ান্ত মানদণ্ড।
“এটি ফুরকান (সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারী)।” (সূরাহ ফুরকান, ২৫:১)
(গ) আত্মশুদ্ধি ও নৈতিক উন্নতির জন্য: মানুষ শুধু জ্ঞান দিয়ে নয়, চরিত্র গঠনের মাধ্যমেই উন্নত হয়—পবিত্র কুরআন উভয় দিকই নিশ্চিত করে।
“তিনি তাদেরকে পরিশুদ্ধ করেন এবং কিতাব শিক্ষা দেন…” (সূরাহ জুমুআহ, ৬২:২)
(ঘ) পূর্ববর্তী কিতাবসমূহের বিকৃতিকে সংশোধন করার জন্য: ইতিহাসে ধর্মীয় শিক্ষার বিকৃতি ঘটেছে; পবিত্র কুরআন সেই সত্যকে পুনরুদ্ধার করেছে।
“আমি আপনার প্রতি অবতীর্ণ করেছি সত্যগ্রন্থ, যা পূর্ববতী গ্রন্থ সমূহের সত্যায়নকারী এবং সেগুলোর বিষয়বস্তুর রক্ষণাবেক্ষণকারী।” (সূরাহ মায়েদাহ, ৫:৪৮)
৩️. পবিত্র কুরআন কেন সার্বজনীন?
(ক) সমগ্র মানবজাতির জন্য নাযিল: পবিত্র কুরআন কোনো নির্দিষ্ট জাতি বা যুগের জন্য নয়—বরং সকল মানুষের জন্য নাযিল হয়েছ সর্বশেষ নবী ও রাসূল হযরত মুহাম্মদ (সা) এর ওপর।
“আমি আপনাকে সমগ্র মানবজাতির জন্য প্রেরণ করেছি…” (সূরাহ সাবা, ৩৪:২৮)
(খ) সময় ও স্থানের ঊর্ধ্বে নীতিমালা: পবিত্র কুরআনের নীতিগুলো (ন্যায়, সত্য, দয়া, জবাবদিহিতা) চিরন্তন—যে কোনো সমাজে প্রযোজ্য।
(গ) ভাষা ও বার্তার সহজবোধ্যতা: পবিত্র কুরআনের বার্তা সরল, গভীর এবং সর্বস্তরের মানুষের জন্য বোধগম্য ও গ্রহণযোগ্য।
“আমি কুরআনকে সহজ করে দিয়েছি বোঝার জন্য…” (সূরাহ ক্বামার, ৫৪:১৭)
(ঘ) সংরক্ষিত ও অপরিবর্তিত: যুক্তিগতভাবে, একটি সার্বজনীন নির্দেশনা তখনই কার্যকর হয়, যখন তা বিকৃতিহীন থাকে—কুরআন সেই বৈশিষ্ট্য ধারণ করে।
“নিশ্চয়ই আমি কুরআন নাযিল করেছি এবং আমিই তা সংরক্ষণ করব।” (সূরাহ হিজর, ১৫:৯)
উপরোক্ত যৌক্তিক বিষয়বস্তুর আলোকে পবিত্র কুরআন হলো:
- ঐশী নির্দেশনা (Divine Guidance)
- নৈতিকতার মানদণ্ড (Moral Standard)
- পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা (Complete Way of Life)
এটি নাযিল হয়েছে:
- মানবজাতিকে সরল ও সঠিক পথ–প্রদর্শন করার জন্য,
- সত্যকে মিথ্যা ও বিকৃতির মিশ্রণ থেকে পৃথক করতে,
- মানুষের নৈতিক চরিত্র গঠন করতে, এবং
এ পবিত্র কুরআনের আহ্বান সার্বজনীন কারণ:
- তা সব মানুষের জন্য নাযিল হয়েছে,
- এটি সব যুগের জন্য নাযিল হয়েছে, এবং
- তা অপরিবর্তিত ও সংরক্ষিত অবস্থায় রোজ ক্বিয়ামত পর্যন্ত থাকবে।
উপসংহারে বলা যায়, পবিত্র কুরআন মানবজাতির জন্য একটি আলোকবর্তিকা, যা অজ্ঞতা, বিভ্রান্তি ও নৈতিক অবক্ষয় থেকে মুক্তির পথ নির্দেশ করে। এটি কেবল একটি ধর্মীয় গ্রন্থ নয়; বরং একটি চিরন্তন গাইডলাইন, যা ব্যক্তি, সমাজ ও সভ্যতাকে সঠিক পথে পরিচালিত করে।
অতএব, কুরআনের প্রকৃত উদ্দেশ্য অনুধাবন করে তার আলোকে জীবন পরিচালনাই মানুষের প্রকৃত সফলতার পথ।
এতদসংক্রান্ত আয়াতগুলো নিম্নে পেশ করা হলো:
كِتٰبٌ اَنْزَلْنٰهُ اِلَيْكَ مُبٰرَكٌ لِّيَدَّبَّرُوْۤا اٰيٰتِه وَلِيْتَذَكَّرَ اُوْلُوْا الْاَلْبَابِ
“এটি একটি বরকতময় কিতাব, যা আমি আপনার প্রতি বরকত হিসেবে অবতীর্ণ করেছি, যাতে মানুষ এর আয়াতসমূহ লক্ষ্য করে এবং বুদ্ধিমানগণ যেন তা অনুধাবন করে।” (সূরাহ ছোয়াদ , ৩৮:২৯ )
تَنْزِيْلُ الْكِتٰبِ لَا رَيْبَ فِيْهِ مِنْ رَّبِّ الْعٰلَمِيْنَ
“এ কিতাবের অবতরণ বিশ্ব–পালনকর্তার নিকট থেকে, এতে কোন সন্দেহ নেই।” (সূরাহ সেজদাহ, ৩২:২)
يَا أَهْلَ الْكِتَابِ قَدْ جَاءَكُمْ رَسُولُنَا يُبَيِّنُ لَكُمْ كَثِيرًا مِّمَّا كُنتُمْ تُخْفُونَ مِنَ الْكِتَابِ وَيَعْفُو عَن كَثِيرٍ ۚ قَدْ جَاءَكُم مِّنَ اللَّهِ نُورٌ وَكِتَابٌ مُّبِينٌيَهْدِي بِهِ اللَّهُ مَنِ اتَّبَعَ رِضْوَانَهُ سُبُلَ السَّلَامِ وَيُخْرِجُهُم مِّنَ الظُّلُمَاتِ إِلَى النُّورِ بِإِذْنِهِ وَيَهْدِيهِمْ إِلَىٰ صِرَاطٍ مُّسْتَقِيمٍ
“হে আহলে-কিতাবগণ! তোমাদের কাছে আমার রাসূল আগমন করেছেন! কিতাবের যেসব বিষয় তোমরা গোপন করতে, তিনি তার মধ্য থেকে অনেক বিষয় প্রকাশ করেন এবং অনেক বিষয় মার্জনা করেন। তোমাদের কাছে একটি উজ্জল জ্যোতি এসেছে এবং একটি সমুজ্জল গ্রন্থ। এর দ্বারা আল্লাহ যারা তাঁর সন্তুষ্টি কামনা করে, তাদেরকে নিরাপত্তার পথ প্রদর্শন করেন এবং তাদেরকে স্বীয় নির্দেশ দ্বারা অন্ধকার থেকে বের করে আলোর দিকে আনয়ন করেন এবং সরল পথে পরিচালনা করেন।” (সূরাহ আল মায়েদাহ, ১৫–১৬)
هٰذَا بَصَآئِرُ لِلنَّاسِ وَهُدًى وَّرَحْمَةٌ لِّقَوْمٍ يُّوْقِنُوْنَ “……এটা (কুরআন) মানুষের জন্যে জ্ঞানের কথা এবং দৃঢ় বিশ্বাসী সম্প্রদায়ের জন্য হেদায়েত (পথের দিশারী) ও রহমত।” (সূরাহ আল জাসিয়া, ৪৫:২০)
تَبَارَكَ الَّذِىْ نَزَّلَ الْفُرْقَانَ عَلٰى عَبْدِه لِيَكُوْنَ لِلْعٰلَمِيْنَ نَذِيْرًا
“পরম কল্যাণময় তিনি যিনি তাঁর বান্দার (নবী করীম সা:) প্রতি (সত্য–মিথ্যার) ফয়সালাকারী গ্রন্থ অবর্তীণ করেছেন, যাতে সে বিশ্বজগতের জন্যে সতর্ককারী হয়।” (সূরাহ ফুরকান, ২৫:১)
وَاِنَّه لَهُدًى وَّرَحْمَةٌ لِّلْمُؤْمِنِيْنَ
“এবং নিশ্চিতই এটা মু’মিনদের জন্যে হেদায়েত ও রহমত।” (সূরাহ নমল , ২৭:৭৭)
وَبِالْحَقِّ اَنْزَلْنٰهُ وَبِالْحَقِّ نَزَلَ
“আমি সত্যসহ এ কুরআন নাযিল করেছি এবং সত্যসহ এটা নাযিল হয়েছে…।” (সূরাহ বনী ইসরাঈল, ১৭:১০৫)
وَالَّذِىۤ اَوْحَيْنَآ اِلَيْكَ مِنَ الْكِتٰبِ هُوَ الْحَقُّ مُصَدِّقًا لِّمَا بَيْنَ يَدَيْهِ
“আমি আপনার প্রতি যে কিতাব প্রত্যাদেশ করেছি, তা সত্য – পূর্ববর্তী কিতাবের সত্যায়নকারী।” (সূরাহ ফাতির , ৩৫:৩১)
بَلْ هُوَ قُرْاٰنٌ مَّجِيْدٌ فِىْ لَوْحٍ مَّحْفُوْظٍ
“বস্তুত এটা মর্যাদাবান কুরআন, লওহে মাহফুযে (সংরক্ষিত ফলকে) লিপিবদ্ধ আছে।” (সূরাহ আল বুরূজ, ৮৫:২১ – ২২)
هٰذَا بَلٰغٌ لِّلنَّاسِ وَلِيُنْذَرُوْا بِه وَلِيَعْلَمُوْٓا اَنَّمَا هُوَ اِلٰهٌ وَّاحِدٌ وَّلِيَذَّكَّرَ اُوْلُوا الْاَلْبَابِ
“এটা মানুষের প্রতি একটি বার্তা এবং যাতে এর দ্বারা ওরা সতর্ক হয় এবং জানতে পারে যে, তিনিই একমাত্র উপাস্য এবং যাতে বোধশক্তিসম্পন্ন ব্যক্তিরা উপদেশ গ্রহণ করে।” (সূরাহ ইব্রাহীম ,১৪:৫২)
تَنْزِيْلٌ مِّنَ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيْمِ كِتٰبٌ فُصِّلَتْ اٰيٰتُهقُرْاٰنًا عَرَبِيًّا لِّقَوْمٍ يَّعْلَمُوْنَ بَشِيْرًا وَّنَذِيْرًا فَاَعْرَضَ اَكْثَرُهُمْ فَهُمْ لَا يَسْمَعُوْنَ
“এটা অবতীর্ণ হয়েছে পরম করুণাময়, দয়ালুর পক্ষ থেকে। এই কিতাবের আয়াতসমূহ বিশদভাবে বিবৃত হয়েছে আরবীতে কুরআনরূপে বোধসম্পন্ন সম্প্রদায়ের জন্য; সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে, অতঃপর তাদের অধিকাংশই মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে, তারা শুনে না।” (সূরাহ হা–মীম সেজদাহ, ৪১:২ – ৪)
حمٓ وَالْكِتٰبِ الْمُبِيْنِ اِنَّا جَعَلْنٰهُ قُرْءٰنًا عَرَبِيًّا لَّعَلَّكُمْ تَعْقِلُوْنَ وَاِنَّه فِىْۤ اُمِّ الْكِتٰبِ لَدَيْنَا لَعَلِىٌّ حَكِيْمٌ
“হা-মীম। শপথ সুস্পষ্ট কিতাবের, আমি একে অবতীর্ণ করেছি, কুরআন আরবী ভাষায়, যাতে তোমরা বোঝ। নিশ্চয় এ (কুরআন) রয়েছে আমার কাছে উম্মুল কিতাবে (লওহে মাহফুযে), ইহা সমুন্নত, প্রজ্ঞাপূর্ণ।” (সূরাহ যুখরুফ, ৪৩:১ – ৪)
وَاِنَّه لَتَنْزِيْلُ رَبِّ الْعٰلَمِيْنَ نَزَلَ بِهِ الرُّوْحُ الْاَمِيْنُ عَلٰى قَلْبِكَ لِتَكُوْنَ مِنَ الْمُنْذِرِيْنَ بِلِسَانٍ عَرَبِىٍّ مُّبِيْنٍ
“এই কুরআন তো বিশ্ব–জাহানের পালনকর্তার নিকট থেকে অবতীর্ণ। বিশ্বস্ত ফেরেশতা (জিব্রাইল আ) একে নিয়ে অবতরণ করেছেন আপনার অন্তরে, যাতে আপনি ভীতি প্রদর্শণকারীদের অন্তর্ভুক্ত হন, সুস্পষ্ট আরবী ভাষায়।” (সূরাহ আশ–শো’আরা, ২৬:১৯২–১৯৫)
تَنْزِيْلُ الْكِتٰبِ مِنَ اللَّهِ الْعَزِيْزِ الْحَكِيْمِ إِنَّا أَنزَلْنَا إِلَيْكَ الْكِتَابَ بِالْحَقِّ فَاعْبُدِ اللَّهَ مُخْلِصًا لَّهُ الدِّينَإِ
“কিতাব (কুরআন) অবতীর্ণ হয়েছে পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময় আল্লাহর পক্ষ থেকে। আমি আপনার প্রতি এ কিতাব যথার্থরূপে নাযিল করেছি। অতএব, আপনি নিষ্ঠার সাথে আল্লাহর এবাদত করুন।” (সূরাহ আল–যুমার, ৩৯:১–২)
اِنَّه لَقُرْاٰنٌ كَرِيْمٌ فِى كِتٰبٍ مَّكْنُوْنٍ لَّا يَمَسُّه اِلَّا الْمُطَهَّرُوْنَ تَنْزِيْلٌ مِّنْ رَّبِّ الْعٰلَمِيْنَ
“নিশ্চয় এটা সম্মানিত কুরআন, যা আছে এক সুরক্ষিত কিতাবে, যারা পাক–পবিত্র, তারা ব্যতীত অন্য কেউ একে স্পর্শ করবে না। এটা বিশ্ব-পালনকর্তার পক্ষ থেকে অবতীর্ণ।” (সূরাহ আল ওয়াক্বিয়া, ৫৬:৭৭–৮০)
وَاَنْزَلْنَآ اِلَيْكَ الْكِتٰبَ بِالْحَقِّ مُصَدِّقًا لِّمَا بَيْنَ يَدَيْهِ مِنَ الكِتٰبِ وَمُهَيْمِنًا عَلَيْهِ
“আমি আপনার প্রতি অবতীর্ণ করেছি, যা পূর্ববতী গ্রন্থসমূহের সত্যায়নকারী এবং সেগুলোর বিষয়বস্তুর রক্ষণাবেক্ষণকারী।” (সূরাহ মায়েদা, ৫:৪৮)
ذٰلِكَ الْكِتٰبُ لَا رَيْبَ فِيْهِ هُدًى لِّلْمُتَّقِيْنَ
“এ সেই গ্রন্থ যাতে কোনই সন্দেহ নেই। (এটি) পথ প্রদর্শনকারী পরহেযগারদের জন্য…. ।” (সূরাহ বাক্বারাহ, ২:২)
وَيَهْدِىٓ اِلٰى صِرٰطِ الْعَزِيْزِ الْحَمِيْدِ
“…….এটা মানুষকে পরাক্রমশালী, প্রশংসার্হ আল্লাহর পথ প্রদর্শন করে।” (সূরাহ সাবা, ৩৪:৬)
اِنَّ هٰذَا الْقُرْاٰنَ يَهْدِىْ لِلَّتِىْ هِىَ اَقْوَمُ وَيُبَشِّرُ الْمُؤْمِنِيْنَ الَّذِيْنَ يَعْمَلُوْنَ الصّٰلِحٰتِ اَنَّ لَهُمْ اَجْرًا كَبِيْرًا
“এই কুরআন এমন পথ প্রদর্শন করে, যা সর্বাধিক সরল এবং সৎকর্মপরায়ণ মু’মিনদেরকে সুসংবাদ দেয় যে, তাদের জন্যে মহা পুরস্কার রয়েছে।” (সূরাহ বনী ইসরাঈল, ১৭:৯)
قُلْ نَزَّلَه رُوْحُ الْقُدُسِ مِنْ رَّبِّكَ بِالْحَقِّ لِيُثَبِّتَ الَّذِيْنَ اٰمَنُوْا وَهُدًى وَّبُشْرٰى لِلْمُسْلِمِيْنَ
“বলুন, একে পবিত্র ফেরেশতা পালনকর্তার পক্ষ থেকে নিশ্চিত সত্যসহ নাযিল করেছেন, যাতে মুমিনদেরকে প্রতিষ্ঠিত করেন এবং এটা মুসলমানদের জন্যে পথ নির্দেশ ও সুসংবাদ স্বরূপ।” (সূরাহ নাহল, ১৬:১০২)
وَنُنَزِّلُ مِنَ الْقُرْاٰنِ مَا هُوَ شِفَآءٌ وَّرَحْمَةٌ لِّلْمُؤْمِنِيْنَۙ وَلَا يَزِيْدُ الظّٰلِمِيْنَ اِلَّا خَسَارًا
“আমি কুরআনে এমন বিষয় নাযিল করি যা রোগের সুচিকিৎসা এবং মু’মিনের জন্য রহমত। গুনাহগারদের তো এতে শুধু ক্ষতিই বৃদ্ধি পায়।” (সূরাহ বনী ইসরাঈল, ১৭:৮২)
وَلَقَدْ ضَرَبْنَا لِلنَّاسِ فِىْ هٰذَا الْقُرْاٰنِ مِنْ كُلِّ مَثَلٍ لَّعَلَّهُمْ يَتَذَكَّرُوْنَ قُرْاٰنًا عَرَبِيًّا غَيْرَ ذِىْ عِوَجٍ لَّعَلَّهُمْ يَتَّقُوْنَ
“আমি এ কুরআনে মানুষের জন্যে সব দৃষ্টান্তই বর্ণনা করেছি, যাতে তারা অনুধাবন করে; আরবী ভাষায় এ কুরআন জটিলতামুক্ত, যাতে তারা সাবধান হয়ে চলে।” (সূরাহ আল-যুমার, ৩৯:২৭ – ২৮)
وَكَذٰلِكَ اَنْزَلْنٰهُ قُرْاٰنًا عَرَبِيْا وَصَرَّفْنَا فِيْهِ مِنَ الوَعِيْدِ لَعَلَّهُمْ يَتَّقُوْنَ اَوْ يُحْدِثُ لَهُمْ ذِكْرًا
“এমনিভাবে আমি আরবী ভাষায় কুরআন নাযিল করেছি এবং এতে নানাভাবে সতর্কবাণী ব্যক্ত করেছি, যাতে তারা আল্লাহভীরু হয় অথবা তাদের অন্তরে চিন্তার খোরাক যোগায়।” (সূরাহ ত্বোয়া–হা, ২০:১১৩)
تِلْكَ اٰيٰتُ الْكِتٰبِ الْحَكِيْمِ هُدًى وَّرَحْمَةً لِّلْمُحْسِنِيْنَ الَّذِيْنَ يُقِيْمُوْنَ الصَّلَوٰةَ وَيُؤْتُوْنَ الزَّكَوٰةَ وَهُمْ بِالْاٰخِرَةِ هُمْ يُوْقِنُوْنَ اُوْلٰٓئِكَ عَلٰى هُدًى مِّنْ رَّبِّهِمْ وَاُوْلٰٓئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُوْنَ
“এগুলো জ্ঞানময় কিতাবের আয়াত। হেদায়েত ও রহমতস্বরূপ সৎকর্মপরায়ণদের জন্য – যারা সালাত কায়েম করে, যাকাত দেয় এবং আখেরাত সম্পর্কে দৃঢ় বিশ্বাস রাখে। এসব লোকই তাদের পরওয়ারদেগারের তরফ থেকে আগত হেদায়েতের উপর প্রতিষ্ঠিত এবং এরাই সফলকাম।” (সূরাহ লোকমান, ৩১:২ – ৫)
পবিত্র কুরআন নাযিলের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য
মহান আল্লাহ্ তাঁর সমগ্র সৃষ্টিকে কৌতুক বা খেলার উপকরণ হিসেবে তৈরী করেননি। এর পিছনে রয়েছে এক নিগূঢ় রহস্য, জ্ঞান, তত্ত্ব ও যৌক্তিকতা। এক এবং অদ্বিতীয় সত্তা আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীনের একক সার্বভৌমত্বের পরিমন্ডলে সৃষ্টির প্রতিটি বস্তু তাঁরই নির্দেশনায় পরিচালিত ও নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে । মানব জাতিও তাঁর সৃষ্টির মহাপরিকল্পনার অংশ । সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে মানবজাতিকে তিনি এ দুনিয়ায় তাঁর খলীফা বা প্রতিনিধি মনোনীত করেছেন । তাই তিনি মানব জাতিকে এক আলোকিত পথ প্রদর্শনের জন্য হেদায়েতের গ্রন্থ এ কুরআন নাযিল করেছেন যাতে প্রতিটি মানুষ সঠিক পথের দিশা পায় এবং তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে পারে ।
- এ কুরআনের প্রতিটি আয়াত বিশ্বস্রষ্টা আল্লাহর তরফ থেকে বণীবাহক ফেরেশতা হযরত জীব্রাঈল (আ:) এর মাধ্যমে ওহীরূপে আল্লাহর সর্বশেষ নবী ও রাসূল হযরত মুহাম্মদ (সা:) এর ওপর নাযিল হয়েছে । তাই কুরআনের বাণী কোন চমকপ্রদ কথার ফুলঝুরি নয়, বরং তা মানব জাতির ইহকালীন ও পরকালীন জীবনের জন্য এক গুরুত্বর্পূণ উপদেশ বাণীসমগ্র।
- এ পবিত্র গ্রন্থ দিয়ে আল্লাহর রাসূল (সা:) একজন সতর্ককারী ও সুসংবাদদাতা হিসেবে,সর্বোত্তম পন্থায় মানব জাতিকে আল্লাহর হেদায়েতের আলোর পথে আহ্বান জানিয়েছেন।
পবিত্র কুরআন একদিকে যেমন মানুষের বিবেচনাবোধ ও বুদ্ধিবৃত্তিক শক্তিকে জাগ্রত করে, অপর দিকে মানুষকে আল্লাহর বিভিন্ন নিদর্শনের উপর চিন্তা–ভাবনা করার তাগিদ দেয়।
- মনশ্চক্ষু উন্মোচনকারী এ কুরআন একদিকে যাবতীয় মিথ্যা, আন্দাজ–অনুমান, অন্ধ বিশ্বাস, কুসংস্কার, অপকর্ম, অশ্লীলতা, ইত্যাদিকে যেমন নিরুৎসাহিত করে, অপরদিকে তেমনি ঈমান, সৎকর্ম, সৎচিন্তা, সততা, সহনশীলতা ও ধৈর্যাবলম্বনকে উৎসাহিত করে । এর ফলে মানুষ আল্লাহর খাঁটি বান্দারূপে সৃষ্টির সেরা জীবে পরিণত হয়।
- বস্তুতঃ, দুনিয়া ও আখিরাতের শান্তি ও মুক্তি অর্জনই পবিত্র কুরআন নাযিলের প্রকৃত উদ্দেশ্য।
পবিত্র কুরআন নাযিলের নাযিলের মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হলো এ অমোঘ সত্য প্রতিষ্ঠা করা যে,
- মহান আল্লাহর তৌহীদ বা একত্ববাদ প্রতিষ্ঠা করা, অর্থাৎ আল্লাহ্ ব্যতীত অন্যকোন উপাস্য নেই–তিনি এক, অদ্বিতীয়, অনন্য ও অতুলনীয় সত্তা। তাঁর কোন শরীক নেই এবং নেই কোন সমকক্ষ – এটাই হলো তৌহীদ বা একত্ববাদ।
- আল্লাহ্ কারো মুখাপেক্ষী নন, অথচ সবাই তাঁর মুখাপেক্ষী। নভোমন্ডলে যা আছে এবং ভূমন্ডলে যা আছে সব কিছুর একচ্ছত্র মালিক তিনি। তিনিই সার্বভৌম শক্তি ও সকল আনুগত্যের অধিকারী এবং সকল প্রশংসার যোগ্য। মানুষ একমাত্র তাঁরই আনুগত্য ও উপাসনা করবে, একমাত্র তাঁর নিকট সাহায্য প্রার্থনা করবে, তাঁরই ওপর ভরসা করবে এবং তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করবে।
এ পবিত্র গ্রন্থ নাযিলের বিশদ লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কিত আয়াতসমূহ নিম্নে পেশ করা হলো:
الٓرٰ كِتٰبٌ اَنْزَلْنٰهُ اِلَیْكَ لِتُخْرِجَ النَّاسَ مِنَ الظُّلُمٰتِ اِلَی النُّوْرِ ۬ۙ بِاِذْنِ رَبِّهِمْ اِلٰی صِرَاطِ الْعَزِیْزِ الْحَمِیْدِ
“….এটি একটি গ্রন্থ, যা আমি আপনার প্রতি নাযিল করেছি – যাতে আপনি মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের করে আনেন – পরাক্রান্ত, প্রশংসারযোগ্য পালনকর্তার নির্দেশে তাঁরই পথের দিকে।” (সূরাহ ইব্রাহীম, ১৪:১)
یٰۤاَیُّهَا النَّاسُ قَدْ جَآءَتْکُمْ مَّوْعِظَۃٌ مِّنْ رَّبِّکُمْ وَ شِفَآءٌ لِّمَا فِی الصُّدُوْرِ ۬ۙ وَ هُدًی وَّ رَحْمَۃٌ لِّلْمُؤْمِنِیْنَ قُلْ بِفَضْلِ اللّٰهِ وَ بِرَحْمَتِہٖ فَبِذٰلِكَ فَلْیَفْرَحُوْا ؕ هُوَ خَیْرٌ مِّمَّا یَجْمَعُوْنَ
“হে মানবকুল, তোমাদের পরওয়ারদেগারের পক্ষ থেকে এসেছে তোমাদের জন্য উপদেশ বাণী (কুরআন) ও অন্তরস্থ (রোগের) নিরাময়, এবং মু’মিনদের জন্য হেদায়েত ও রহমত। (হে নবী) বলুন, এটা আল্লাহর দয়া ও মেহেরবাণীতে। সুতরাং এরই প্রতি তাদের সন্তুষ্ট থাকা উচিৎ। এটিই উত্তম সে সমুদয় থেকে যা তারা সঞ্চয় করেছে।” (সূরাহ ইউনূস, ১০:৫৭–৫৮)
كِتٰبٌ اُنْزِلَ اِلَيْكَ فَلَا يَكُنْ فِىْ صَدْرِكَ حَرَجٌ مِّنْهُ لِتُنذِرَ بِه وَذِكْرٰى لِلْمُؤْمِنِيْنَ
“এটি একটি গ্রন্থ, যা আপনার প্রতি অবতীর্ণ হয়েছে, যাতে করে আপনি এর মাধ্যমে ভীতি-প্রদর্শন করেন। অতএব, এটি পৌঁছে দিতে আপনার মনে কোনরূপ সংকোচ থাকা উচিত নয়। আর এটিই বিশ্বাসীদের জন্যে উপদেশ।” (সূরাহ আল আ’রাফ, ৭:২)
اِنْ هُوَ اِلَّا ذِكْرٌ لِّلْعٰلَمِيْنَ لِمَنْ شَآءَ مِنْكُمْ اَنْ يَّسْتَقِيْمَ
“এ তো (কুরআন) শুধু বিশ্ব জগতের জন্য উপদেশ, তোমাদের মধ্যে যে সরল পথে চলতে চায় তার জন্যে।” (সূরাহ আত-তাকভীর, ৮১:২৭–২৮)
اِنَّآ اَنْزَلْنَا عَلَيْكَ الْكِتٰبَ لِلنَّاسِ بِالْحَقِّ ۚ فَمَنِ اهْتَدٰى فَلِنَفْسِه ۚ وَمَنْ ضَلَّ فَاِنَّمَا يَضِلُّ عَلَيْهَا ۚ وَمَآ اَنْتَ عَلَيْهِمْ بِوَكِيْلٍ
“আমি আপনার প্রতি সত্য ধর্মসহ কিতাব নাযিল করেছি মানুষের কল্যাণকল্পে। অতঃপর যে সৎপথে আসে, সে নিজের কল্যাণের জন্যেই আসে, আর যে পথভ্রষ্ট হয়, সে নিজেরই অনিষ্টের জন্যে পথভ্রষ্ট হয়। আপনি তাদের জন্যে দায়ী নন।” (সূরাহ আল-যুমার, ৩৯:৪১)
وَاِنَّه لَهُدًى وَّرَحْمَةٌ لِّلْمُؤْمِنِيْنَ اِنَّ رَبَّكَ يَقْضِىْ بَيْنَهُمْ بِحُكْمِه وَهُوَ الْعَزِيْزُ الْعَلِيْمُ
“এবং নিশ্চিতই এটা (কুরআন) মু’মিনদের জন্যে হেদায়েত ও রহমত। আপনার পালনকর্তা নিজ কর্তৃত্ব অনুযায়ী তাদের মধ্যে ফয়সালা করে দেবেন। তিনি পরাক্রমশালী, সুবিজ্ঞ।” (সূরাহ নমল, ২৭:৭৭–৭৮)
وَمَآ اَنْزَلْنَا عَلَيْكَ الْكِتٰبَ اِلَّا لِتُبَيِّنَ لَهُمُ الَّذِىْ اخْتَلَفُوْا فِيْهِ لا وَهُدًى وَّرَحْمَةً لِّقَوْمٍ يُؤْمِنُوْنَ
“আমি আপনার প্রতি এ জন্যেই গ্রন্থ নাযিল করেছি, যাতে আপনি সরল পথ প্রদর্শনের জন্যে তাদেরকে পরিষ্কার বর্ণনা করে দেন, যে বিষয়ে তারা মতবিরোধ করছে এবং মু’মিনদের জন্য পথনির্দেশ ও দয়াস্বরূপ।” (সূরাহ নাহল, ১৬:৬৪)
قُلْ نَزَّلَه رُوْحُ الْقُدُسِ مِنْ رَّبِّكَ بِالْحَقِّ لِيُثَبِّتَ الَّذِيْنَ اٰمَنُوْا وَهُدًى وَّبُشْرٰى لِلْمُسْلِمِيْنَ
“বলুন, একে পবিত্র ফেরেশতা পালনকর্তার পক্ষ থেকে নিশ্চিত সত্যসহ নাযিল করেছেন, যাতে মুমিনদেরকে প্রতিষ্ঠিত করেন এবং এটা মুসলমানদের জন্যে পথ নির্দেশ ও সুসংবাদ স্বরূপ।” (সূরাহ নাহল, ১৬:১০২)
اِنَّ هٰذَا الْقُرْاٰنَ يَهْدِىْ لِلَّتِىْ هِىَ اَقْوَمُ وَيُبَشِّرُ الْمُؤْمِنِيْنَ الَّذِيْنَ يَعْمَلُوْنَ الصّٰلِحٰتِ اَنَّ لَهُمْ اَجْرًا كَبِيْرًا
“এই কুরআন এমন পথ প্রদর্শন করে যা সর্বাধিক সরল, এবং সৎকর্মপরায়ণ মু’মিনদেরকে সুসংবাদ দেয় যে, তাদের জন্যে রয়েছে মহাপুরস্কার।” (সূরাহ বনী ইসরাঈল, ১৭:৯)
رَةِ بِاِذْنِه ج وَيُبَيِّنُ اٰيٰتِه لِلنَّاسِ لَعَلَّهُمْ يَتَذَكَّرُوْنَ
“তারা (মুশরেকগণ) দোযখের দিকে আহ্বান করে, আর আল্লাহ নিজের হুকুমের মাধ্যমে আহ্বান করেন জান্নাত ও ক্ষমার দিকে। আর তিনি মানুষকে নিজের নির্দেশ বাতলে দেন যাতে তারা উপদেশ গ্রহণ করে।” (সূরাহ বাক্বারাহ, ২:২২১)
وَهٰذَاكِتٰبٌ اَنْزَلْنٰهُ مُبَارَكٌ فَاتَّبِعُوْهُ وَاتَّقُوْا لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُوْنَ
“এটি এমন একটি গ্রন্থ, যা আমি অবতীর্ণ করেছি, অতীব মঙ্গলময়, অতএব, এর অনুসরণ কর এবং ভয় কর – যাতে তোমরা করুণাপ্রাপ্ত হও।” (সূরাহ আন’আম, ৬:১৫৫)
وَكَذٰلِكَ نُفَصِّلُ الْاٰيٰتِ وَلَعَلَّهُمْ يَرْجِعُوْنَ
“বস্তুতঃ এভাবে আমি (কুরআনে বর্ণিত) দৃষ্টান্তসমূহ সবিস্তারে বর্ণনা করি, যাতে তারা (সরল পথে) ফিরে আসে।” (সূরাহ আল আ’রাফ, ৭:১৭৪)
পবিত্র কুরআন অবতীর্ণকালীন অবস্থা
সর্বশেষ নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আগমনের সময়টিতে পৃথিবী জুড়ে এক অরাজক অবস্থা বিরাজ করছিল। তাই তাঁর আবির্ভাবের সময়কালটি ইতিহাসের পাতায় ‘আইয়ামে জাহিলিয়াত’ অর্থাৎ অন্ধকার যুগ নামে পরিচিত ছিল।
আবসিনিয়িায় অবস্থানরত মুসলমি অভবিাসীদের নেতা হযরত জাফর ইবনে আবি তালেব (রা:) সেখানকার রাজা নেগাসের সম্মুখে যে বক্তব্য তুলে ধরেছিলেন তাতে সে সময়ের অবস্থার চিত্রটি নিখুঁতভাবে ফুটে ওঠে। তিনি বলেন,
“হে রাজন! আমাদের অবস্থা এমন ছিল যে, লোকজন অজ্ঞানতা, র্ববরতা ও অনতৈকতিা, স্বহস্তে গড়া প্রস্তর নির্মিত মূর্তিকে পূজা, হারাম খাদ্য যেমন, মৃত পশুর মাংস ভক্ষণ, অবাধ যৌনাচার, লুন্ঠন, আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্নকরণ, অতিথি ও প্রতিবেশীর সাথে দুর্ব্যবহার, সবল কর্তৃক দুর্বলের ওপর শোষণ ও নির্যাতনের মতো সব ধরনের পাপাচারে লিপ্ত ছিল …. ।”
এহেন বিরূপ পরিস্থিতিতে এক দীর্ঘ বিরতির পর মহান আল্লাহ্ তায়ালা হযরত মুহাম্মদ (সা)–কে তাঁর সর্বশেষ নবী ও রাসূল হিসেবে পাঠালেন এ দুনিয়ার বুকে এবং মানুষের হেদায়েতের জন্য ওহী মারফত তাঁর ওপর নাযিল করলেন পবিত্র কুরআন। তাঁর ওপর ওহী নাযিল সম্পর্কে আল্লাহ্ তায়ালা বলেন:
وَ اَنْزَلْنَاۤ اِلَیْكَ الْكِتٰبَ بِالْحَقِّ مُصَدِّقًا لِّمَا بَیْنَ یَدَیْهِ مِنَ الْكِتٰبِ وَ مُهَیْمِنًا عَلَیْهِ فَاحْکُمْ بَیْنَهُمْ بِمَاۤ اَنْزَلَ اللّٰهُ وَ لَا تَتَّبِعْ اَهْوَآءَهُمْ عَمَّا جَآءَكَ مِنَ الْحَقِّ ؕ لِکُلٍّ جَعَلْنَا مِنْکُمْ شِرْعَۃً وَّ مِنْهَاجًا ؕ وَ لَوْ شَآءَ اللّٰهُ لَجَعَلَکُمْ اُمَّۃً وَّاحِدَۃً وَّ لٰكِنْ لِّیَبْلُوَکُمْ فِیْ مَاۤ اٰتٰىکُمْ فَاسْتَبِقُوا الْخَیْرٰتِ ؕ اِلَی اللّٰهِ مَرْجِعُکُمْ جَمِیْعًا فَیُنَبِّئُکُمْ بِمَا کُنْتُمْ فِیْهِ تَخْتَلِفُوْنَ وَ اَنِ احْکُمْ بَیْنَهُمْ بِمَاۤ اَنْزَلَ اللّٰهُ وَ لَا تَتَّبِعْ اَهْوَآءَهُمْ وَ احْذَرْهُمْ اَنْ یَّفْتِنُوْكَ عَنْۢ بَعْضِ مَاۤ اَنْزَلَ اللّٰهُ اِلَیْكَ ؕ فَاِنْ تَوَلَّوْا فَاعْلَمْ اَنَّمَا یُرِیْدُ اللّٰهُ اَنْ یُّصِیْبَهُمْ بِبَعْضِ ذُنُوْبِهِمْ ؕ وَ اِنَّ كَثِیْرًا مِّنَ النَّاسِ لَفٰسِقُوْنَ اَفَحُکْمَ الْجَاهِلِیَّۃِ یَبْغُوْنَ ؕ وَ مَنْ اَحْسَنُ مِنَ اللّٰهِ حُکْمًا لِّقَوْمٍ یُّوْقِنُوْنَ
“আমি আপনার প্রতি অবতীর্ণ করেছি সত্যগ্রন্থ, যা পূর্ববতী গ্রন্থসমূহের সত্যায়নকারী এবং সেগুলোর বিষয়বস্তুর রক্ষণাবেক্ষণকারী। অতএব, আপনি তাদের পারস্পারিক ব্যাপারাদিতে আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন, তদনুযায়ী ফয়সালা করুন এবং আপনার কাছে যে সৎপথ এসেছে, তা ছেড়ে তাদের প্রবৃত্তির অনুসরণ করবেন না। আমি তোমাদের প্রত্যেককে একটি আইন ও পথ দিয়েছি। যদি আল্লাহ চাইতেন, তবে তোমাদের সবাইকে এক উম্মত করে দিতেন, কিন্তু এরূপ করেননি – যাতে তোমাদেরকে যে ধর্ম দিয়েছেন, তাতে তোমাদের পরীক্ষা নেন। অতএব, দৌড়ে কল্যাণকর বিষয়াদি অর্জন কর। তোমাদের সবাইকে আল্লাহর কাছে প্রত্যাবর্তন করতে হবে। অতঃপর তিনি অবহিত করবেন সে বিষয়, যাতে তোমরা মতবিরোধ করতে। আর আমি আদেশ করছি যে, আপনি তাদের পারস্পরিক ব্যাপারাদিতে আল্লাহ যা নাযিল করেছেন তদনুযায়ী ফয়সালা করুন; তাদের প্রবৃত্তির অনুসরণ করবেন না এবং তাদের থেকে সতর্ক থাকুন – যেন তারা আপনাকে এমন কোন নির্দেশ থেকে বিচ্যুত না করে, যা আল্লাহ আপনার প্রতি নাযিল করেছেন। অনন্তর যদি তার মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে জেনে নিন, আল্লাহ তাদেরকে তাদের গুনাহের কিছু শাস্তি দিতেই চেয়েছেন। মানুষের মধ্যে অনেকেই নাফরমান। তারা কি জাহেলিয়াত আমলের ফয়সালা কামনা করে? আল্লাহ অপেক্ষা বিশ্বাসীদের জন্যে উত্তম ফয়সালাকারী কে।” (সূরাহ আল মায়েদা,হ ৫:৪৮ – ৫০)
فَاِنَّمَا يَسَّرْنٰهُ بِلِسَانِكَ لِتُبَشِّرَ بِهِ الْمُتَّقِيْنَ وَتُنْذِرَ بِه قَوْمًا لُّدًّا
“আমি কুরআনকে আপনার ভাষায় সহজ করে দিয়েছি, যাতে আপনি এর দ্বারা পরহেযগারদেরকে সুসংবাদ দেন এবং কলহকারী সম্প্রদায়কে সতর্ক করেন।” (সূরাহ মারইয়াম, ১৯:৯৭)
وَالْقُرْاٰنِ الْحَكِيْمِ اِنَّكَ لَمِنَ المُرْسَلِيْنَ عَلٰى صِرٰطٍ مُّسْتَقِيْمٍ تَنْزِيْلَ الْعَزِيْزِ الرَّحِيْمِ لِتُنْذِرَ قَوْمًا مَّآ اُنْذِرَ اٰبَآؤُهُمْ فَهُمْ غٰفِلُوْنَ
“প্রজ্ঞাময় কুরআনরে কসম। নিশ্চয় আপনি প্রেরিত রসূলগণের একজন। সরল পথে প্রতিষ্ঠিত। কুরআন পরাক্রমশালী পরম দয়ালু আল্লাহর তরফ থেকে অবর্তীণ, যাতে আপনি এমন এক জাতিকে সর্তক করেন, যাদের র্পূব পুরুষগণকেও সর্তক করা হয়নি। ফলে তারা গাফেল।” (সূরাহ ইয়াসীন, ৩৬:২ – ৬)
يَا أَهْلَ الْكِتَابِ قَدْ جَاءَكُمْ رَسُولُنَا يُبَيِّنُ لَكُمْ عَلَىٰ فَتْرَةٍ مِّنَ الرُّسُلِ أَن تَقُولُوا مَا جَاءَنَا مِن بَشِيرٍ وَلَا نَذِيرٍ ۖ فَقَدْ جَاءَكُم بَشِيرٌ وَنَذِيرٌ ۗ وَاللَّهُ عَلَىٰ كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ“হে আহলে–কিতাবগণ! তোমাদের কাছে আমার রসূল আগমণ করেছেন, যিনি পয়গম্বরদের বিরতির পর তোমাদের কাছে পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা করেন -যাতে তোমরা একথা বলতে না পার যে, আমাদের কাছে কোন সুসংবাদদাতা ও ভীতিপ্রদর্শক আগমন করে নি। অতএব, তোমাদের কাছে সুসংবাদদাতা ও ভয় প্রদর্শক এসে গেছেন। আল্লাহ সবকিছুর উপর শক্তিমান।” (সূরাহ মায়েদা, ৫:১৯)
পবিত্র কুরআনের বিষয়সমূহ
পবিত্র কুরআন উপদেশমূলক এক মহা শিক্ষাগ্রন্থ। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এ গ্রন্থে মানুষের ইহকালীন ও পরকালীন জীবনের সাথে সংশ্লিষ্ট বহুবিধ বিষয় উল্লেখ করেছেন।
পবিত্র কুরআনে আছে:
- তৌহিদের বাণী সম্বলিত আল্লাহর পরিচয়, এবং তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব, মাহাত্ম, প্রশংসা ও গৌরব,
- তাঁর সৃষ্টির উদ্দেশ্য ও নিদর্শনসমূহের বর্ণনা,
- পার্থিব ও পরকালীন জীবনের অবস্থা,
- মানুষের কল্যাণ ও হেদায়েতের জন্য জীবন–বিধান, উপদেশ, সতর্ক বাণী ও দিক–নির্দেশনা,
- আখিরাতের পরিণাম ফল,
- অতীত জাতিসমূহের কাহিনী এবং নবী ও রাসূলগণের দ্বীনি মিশন, ইত্যাদি।
পবিত্র কুরআনের সাবলীল ও সহজ বর্ণনা মানুষকে সিরাতুল মুস্তাকীমের পথ প্রদর্শন করে। এর নিয়মিত চর্চা ও অনুশীলন দ্বারা মানুষের অন্তরের রোগসমূহ নিরাময় লাভ করে, তাদের জীবনাচরণ বদলে যায়, তাদের জন্য পার্থিব ও পরকালীন রহমত, কল্যাণ ও সাফল্যের দ্বার উন্মোচিত হয়।
পবিত্র কুরআনের মূল বিষয়গুলো হলো:
-
আল্লাহ্ ও অদৃশ্য বিষয়সমূহের উপর ঈমান;
-
ইহকালীন জীবনের অনিশ্চিতি ও পরকালীন চিরস্থায়ী জীবনের গুরুত্ব;
-
ক্বিয়ামত, পুনরুত্থান ও বিচার দিবস;
-
রিসালত, হেদায়েত ও শরীয়তভিত্তিক আমল;
-
নীতি, নৈতিকতা ও ন্যায্যতা; ইত্যাদি।
এছাড়া অধিকার বিষয়ক দু’টি প্রধান ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো: হক্কুল্লাহ্ (আল্লাহর অধিকার) ও হক্কুল ইবাদ (সৃষ্টির অধিকার)।
-
হক্কুল্লাহর অন্তর্ভুক্ত বিষয়গুলো হলো: আল্লাহর অস্তিত্ব, তাঁর একত্ববাদ অর্থাৎ তিনি এক, অদ্বিতীয়, তুলনাহীন ও শরীকবিহীন; তাঁর সর্বময় কর্তৃত্ব ও সর্বভৌমত্ব, তিনি সবকিছুর স্রষ্টা ও ভাগ্যনিয়ন্তা, সৃষ্ট জগতসমূহের একক মালিকানা তাঁর এবং তিনিই বিচার দিবসের মালিক; সমস্ত প্রশংসা, পবিত্রতা, ইবাদত ও উপাসনার একমাত্র অধিকারী তিনি। এছাড়া পবিত্র কুরআনে রয়েছে আল্লাহর অফুরন্ত দয়া, ক্ষমা, অনুগ্রহ ও নিয়ামতরাশির বর্ণনা। আরো রয়েছে তাঁর ধ্বংসকারী ও কঠোর শাস্তি প্রদানের সতর্কবাণী।
-
অপরদিকে হক্কুল ইবাদের অন্তর্ভুক্ত বিষয়গুলো হলো: মানবাধিকার ও অন্যান্য সৃষ্ট জীব ও বস্তুসমূহের অধিকার।
নিম্নে উদ্ধৃত আয়াতগুলো থেকে পবিত্র কুরআনের বিষয়সমূহ সম্পর্কে সম্যক ধারণা করা যায়:
شَهِدَ اللّٰهُ اَنَّہٗ لَاۤ اِلٰهَ اِلَّا هُوَ ۙ وَ الْمَلٰٓئِكَۃُ وَ اُولُوا الْعِلْمِ قَآئِمًۢا بِالْقِسْطِ ؕ لَاۤ اِلٰهَ اِلَّا هُوَ الْعَزِیْزُ الْحَكِیْمُ
“আল্লাহ সাক্ষ্য দিয়েছেন যে, তিনি ছাড়া আর কোন উপাস্য নেই। ফেরেশতাগণ এবং ন্যায়নিষ্ঠ জ্ঞানীগণও সাক্ষ্য দিয়েছেন যে, তিনি ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই। তিনি পরাক্রমশালী প্রজ্ঞাময়।” (সূরাহ আলে ইমরান, ৩:১৮)
قُلْ تَعَالَوْا اَتْلُ مَا حَرَّمَ رَبُّکُمْ عَلَیْکُمْ اَلَّا تُشْرِکُوْا بِہٖ شَیْئًا وَّ بِالْوَالِدَیْنِ اِحْسَانًا ۚ وَ لَا تَقْتُلُوْۤا اَوْلَادَکُمْ مِّنْ اِمْلَاقٍ ؕ نَحْنُ نَرْزُقُکُمْ وَ اِیَّاهُمْ ۚ وَ لَا تَقْرَبُوا الْفَوَاحِشَ مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَ مَا بَطَنَ ۚ وَ لَا تَقْتُلُوا النَّفْسَ الَّتِیْ حَرَّمَ اللّٰهُ اِلَّا بِالْحَقِّ ؕ ذٰلِکُمْ وَصّٰکُمْ بِہٖ لَعَلَّکُمْ تَعْقِلُوْنَ وَ لَا تَقْرَبُوْا مَالَ الْیَتِیْمِ اِلَّا بِالَّتِیْ هِیَ اَحْسَنُ حَتّٰی یَبْلُغَ اَشُدَّہٗ ۚ وَ اَوْفُوا الْكَیْلَ وَ الْمِیْزَانَ بِالْقِسْطِ ۚ لَا نُكَلِّفُ نَفْسًا اِلَّا وُسْعَهَا ۚ وَ اِذَا قُلْتُمْ فَاعْدِلُوْا وَ لَوْ كَانَ ذَا قُرْبٰی ۚ وَ بِعَہْدِ اللّٰهِ اَوْفُوْا ؕ ذٰلِکُمْ وَصّٰکُمْ بِہٖ لَعَلَّکُمْ تَذَكَرُوْنَ وَ اَنَّ هٰذَا صِرَاطِیْ مُسْتَقِیْمًا فَاتَّبِعُوْهُ ۚ وَ لَا تَتَّبِعُوا السُّبُلَ فَتَفَرَّقَ بِکُمْ عَنْ سَبِیْلِہٖ ؕ ذٰلِکُمْ وَصّٰکُمْ بِہٖ لَعَلَّکُمْ تَتَّقُوْنَ
“আপনি বলুন: এসো, আমি তোমাদেরকে ঐসব বিষয় পাঠ করে শোনাই, যেগুলো তোমাদের প্রতিপালক তোমাদের জন্যে হারাম করেছেন। তা এই যে, আল্লাহর সাথে কোন কিছুকে শরীক করো না, পিতা-মাতার সাথে সদয় ব্যবহার করো, স্বীয় সন্তানদেরকে দারিদ্রের কারণে হত্যা করো না – আমি তোমাদেরকে ও তাদেরকে আহার দেই, নির্লজ্জতার কাছেও যেয়ো না – তা প্রকাশ্য হোক কিংবা অপ্রকাশ্য, যাকে হত্যা করা আল্লাহ হারাম করেছেন – তাকে হত্যা করো না, কিন্তু ন্যায়ভাবে। তোমাদেরকে এ নির্দেশ দিয়েছেন, যেন তোমরা বুঝো। এতীমদের ধন–সম্পদের কাছেও যেয়ো না – কিন্তু উত্তম পন্থায় যে পর্যন্ত সে বয়ঃপ্রাপ্ত না হয়। ওজন ও মাপ পূর্ণ কর ন্যায় সহকারে। আমি কাউকে তার সাধ্যাতীত কষ্ট দেই না। যখন তোমরা কথা বল তখন সুবিচার করো, যদিও সে আত্মীয়ও হয়। আল্লাহর অঙ্গীকার পূর্ণ করো। তোমাদেরকে এ নির্দেশ দিয়েছেন যেন তোমরা উপদেশ গ্রহণ করো। নিশ্চিত এটি আমার সরল পথ। অতএব, এ পথে চলো এবং অন্যান্য পথে চলো না। তা হলে সেসব পথ তোমাদেরকে তাঁর পথ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিবে। তোমাদেরকে এ নির্দেশ দিয়েছেন, যাতে তোমরা সংযত হও।” (সূরাহ আনআ’ম, ৬:১৫১ – ১৫৩)
الٓرٰ ۟ كِتٰبٌ اُحْكِمَتْ اٰیٰتُہٗ ثُمَّ فُصِّلَتْ مِنْ لَّدُنْ حَكِیْمٍ خَبِیْرٍ ۙ اَلَّا تَعْبُدُوْۤا اِلَّا اللّٰهَ ؕ اِنَّنِیْ لَکُمْ مِّنْهُ نَذِیْرٌ وَّ بَشِیْرٌ ۙ وَّ اَنِ اسْتَغْفِرُوْا رَبَّکُمْ ثُمَّ تُوْبُوْۤا اِلَیْهِ یُمَتِّعْکُمْ مَّتَاعًا حَسَنًا اِلٰۤی اَجَلٍ مُّسَمًّی وَّ یُؤْتِ کُلَّ ذِیْ فَضْلٍ فَضْلَہٗ ؕ وَ اِنْ تَوَلَّوْا فَاِنِّیْۤ اَخَافُ عَلَیْکُمْ عَذَابَ یَوْمٍ كَبِیْرٍ اِلَی اللّٰهِ مَرْجِعُکُمْ ۚ وَ هُوَ عَلٰی کُلِّ شَیْءٍ قَدِیْرٌ
“আলিফ, লা-ম, রা; (হে নবী বলুন) এটি এমন এক কিতাব, যার আয়াতসমূহ সুবিন্যস্ত অতঃপর সবিস্তারে বর্ণিত, এক মহাজ্ঞানী, সর্বজ্ঞ সত্তার পক্ষ হতে (অবতীর্ণ)। (এর বক্তব্য বিষয় হচ্ছে) যেন তোমরা আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো বন্দেগী না কর। নিশ্চয় আমি তোমাদের প্রতি তাঁরই পক্ষ হতে (জাহান্নামের) সতর্ককারী ও (জান্নাতের) সুসংবাদদাতা। আর তোমরা নিজেদের পালনকর্তার সমীপে ক্ষমা প্রার্থনা কর। অনন্তর তাঁরই প্রতি মনোনিবেশ কর। তাহলে তিনি তোমাদেরকে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত উৎকৃষ্ট জীবনোপকরণ দান করবেন এবং অধিক আমলকারীকে বেশী করে দেবেন। আর যদি তোমরা বিমুখ হতে থাক, তবে আমি তোমাদের উপর এক মহা দিবসের আযাবের আশঙ্কা করছি। আল্লাহর সান্নিধ্যেই তোমাদেরকে ফিরে যেতে হবে। আর তিনি সব কিছুর উপর ক্ষমতাবান।” (সূরাহ হুদ, ১১:১ – ৪)
اَلَّذِیْنَ یَتَّبِعُوْنَ الرَّسُوْلَ النَّبِیَّ الْاُمِّیَّ الَّذِیْ یَجِدُوْنَہٗ مَکْتُوْبًا عِنْدَهُمْ فِی التَّوْرٰىۃِ وَ الْاِنْجِیْلِ ۫ یَاْمُرُهُمْ بِالْمَعْرُوْفِ وَ یَنْهٰهُمْ عَنِ الْمُنْكَرِ وَ یُحِلُّ لَهُمُ الطَّیِّبٰتِ وَ یُحَرِّمُ عَلَیْهِمُ الْخَبٰٓئِثَ وَ یَضَعُ عَنْهُمْ اِصْرَهُمْ وَ الْاَغْلٰلَ الَّتِیْ كَانَتْ عَلَیْهِمْ ؕ فَالَّذِیْنَ اٰمَنُوْا بِہٖ وَ عَزَّرُوْهُ وَ نَصَرُوْهُ وَ اتَّبَعُوا النُّوْرَ الَّذِیْۤ اُنْزِلَ مَعَہٗۤ ۙ اُولٰٓئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُوْنَ
“সেসমস্ত লোক, যারা আনুগত্য অবলম্বন করে এ রাসূলের, যিনি উম্মী নবী, যাঁর সম্পর্কে তারা নিজেদের কাছে রক্ষিত তওরাত ও ইঞ্জিলে লেখা দেখতে পায়, তিনি তাদেরকে নির্দেশ দেন সৎকর্মের, বারণ করেন অসৎকর্ম থেকে; তাদের জন্য যাবতীয় পবিত্র বস্তু হালাল ঘোষণা করেন ও নিষিদ্ধ করেন হারাম বস্তুসমূহ এবং তাদের উপর থেকে সে বোঝা নামিয়ে দেন এবং বন্দীত্ব অপসারণ করেন যা তাদের উপর বিদ্যমান ছিল। সুতরাং যেসব লোক তাঁর উপর ঈমান এনেছে, তাঁর সাহচর্য অবলম্বন করেছে, তাঁকে সাহায্য করেছে এবং সে নূরের অনুসরণ করেছে যা তার সাথে অবতীর্ণ করা হয়েছে, শুধুমাত্র তারাই নিজেদের উদ্দেশ্য সাধনে সফলতা অর্জন করতে পেরেছে।” (সূরাহ আরাফ, ৭:১৫৭)
اَفَحَسِبْتُمْ اَنَّمَا خَلَقْنٰکُمْ عَبَثًا وَّ اَنَّکُمْ اِلَیْنَا لَا تُرْجَعُوْنَ
“তোমরা কি ধারণা করে নিয়েছ যে, আমি তোমাদেরকে অনর্থক সৃষ্টি করেছি এবং তোমরা আমার কাছে ফিরে আসবে না?” (সূরাহ আল মু’মিনূন, ২৩:১১৫)
الَّذِیْنَ یَصُدُّوْنَ عَنْ سَبِیْلِ اللّٰهِ وَ یَبْغُوْنَهَا عِوَجًا ؕ وَ هُمْ بِالْاٰخِرَۃِ هُمْ کٰفِرُوْنَ اُولٰٓئِكَ لَمْ یَکُوْنُوْا مُعْجِزِیْنَ فِی الْاَرْضِ وَ مَا كَانَ لَهُمْ مِّنْ دُوْنِ اللّٰهِ مِنْ اَوْلِیَآءَ ۘ یُضٰعَفُ لَهُمُ الْعَذَابُ ؕ مَا كَانُوْا یَسْتَطِیْعُوْنَ السَّمْعَ وَ مَا كَانُوْا یُبْصِرُوْنَ اُولٰٓئِكَ الَّذِیْنَ خَسِرُوْۤا اَنْفُسَهُمْ وَ ضَلَّ عَنْهُمْ مَّا كَانُوْا یَفْتَرُوْنَ لَا جَرَمَ اَنَّهُمْ فِی الْاٰخِرَۃِ هُمُ الْاَخْسَرُوْنَ اِنَّ الَّذِیْنَ اٰمَنُوْا وَ عَمِلُوا الصّٰلِحٰتِ وَ اَخْبَتُوْۤا اِلٰی رَبِّهِمْ ۙ اُولٰٓئِكَ اَصْحٰبُ الْجَنَّۃِ ۚ هُمْ فِیْهَا خٰلِدُوْنَ مَثَلُ الْفَرِیْقَیْنِ كَالْاَعْمٰی وَ الْاَصَمِّ وَ الْبَصِیْرِ وَ السَّمِیْعِ ؕ هَلْ یَسْتَوِیٰنِ مَثَلًا ؕ اَفَلَا تَذَكَرُوْنَ
“যারা আল্লাহর পথে বাধা দেয়, আর তাতে বক্রতা খুঁজে বেড়ায়, এরাই আখিরাতকে অস্বীকার করে। তারা পৃথিবীতেও আল্লাহকে অপারগ করতে পারবে না এবং আল্লাহ ব্যতীত তাদের কোন সাহায্যকারীও নেই, তাদের জন্য দ্বিগুণ শাস্তি রয়েছে; তারা (সত্য পথের কথা) শুনতে পারত না এবং (সুপথ) দেখতেও পেত না। এরা সে লোক, যারা নিজেরাই নিজেদেরকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে, আর এরা যা কিছু মিথ্যা মা’বুদ সাব্যস্ত করেছিল, (আখিরাতে) তা সবই তাদের থেকে হারিয়ে যাবে। আখিরাতে এরাই হবে সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্ত কোন সন্দেহ নেই। নিশ্চয়ই যারা ঈমান এনেছে ও সৎকাজ করেছে এবং স্বীয় পালনকর্তার সমীপে বিনতি প্রকাশ করেছে তারাই বেহেশতবাসী, সেখানেই তারা চিরকাল থাকবে। (জান্নাতী ও জাহান্নামী) উভয় পক্ষের দৃষ্টান্ত হচ্ছে যেমন (জাহান্নামীরা) অন্ধ ও বধির এবং (জান্নাতীরা) চক্ষুষ্মান ও শ্রবণশক্তিসম্পন্ন; উভয়ের অবস্থা কি এক সমান? তবুও তোমরা কি ভেবে দেখ না।” (সূরাহ হুদ, ১১:১৯ – ২৪)
পবিত্র কুরআনের পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ আক্বীদাহ বিষয়ক আ’মল
রাসূলুল্লাহর (সা) হাদীসে পবিত্র কুরআনের পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ আক্বীদাহ বিষয়ক আ’মল উল্লেখিত হয়েছে যা অবশ্যই মানতে ও করতে হবে। সেগুলো হলো:
-
হালালকে হালাল হিসেবে মান্য করা,
-
হারামকে হারাম হিসেবে গণ্য করে এ থেকে বিরত থাকা,
-
মুহকামাত অর্থাৎ আকীদা, ইবাদত, আমল-আখলাক ও হুকুম–আহকামের ওপর আমল করা,
-
মুতাশাবিহাত অর্থাৎ জান্নাত, জাহান্নাম, আরশ, ফেরেশতা, ইত্যাদি অদৃশ্য বিষয়সমূহের ওপর পরিপূর্ণ বিশ্বাস রাখা,
-
এবং উদাহরণ অর্থাৎ অতীতের নাফরমান জাতিসমূহের পরিণতি থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা। (মেশকাত শরীফ)।
হযরত যাবের (রা) বর্ণিত আরেক হাদীসে আল্লাহর নবী (সা) বলেন,
‘আল্লাহ তায়ালা কিছু কাজ ফরজ করেছেন, সেগুলোকে তোমরা নষ্ট করোনা, কিছু সীমা নির্ধারণ করেছেন, সেগুলো অতিক্রম করোনা, কিছু বিষয় সম্পর্কে তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে নীরবতা অবলম্বন করেছেন, তোমরা সেগুলো সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করোনা ।’ (মেশকাত শরীফ)
মুহকামাতের আয়াতসমূহ সুস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন এবং অবশ্য পালনীয়। অপরদিকে মুতাশাবিহাত আয়াতগুলো রূপক অর্থে ব্যবহৃত যার প্রকৃত অর্থ একমাত্র আল্লাহই অবগত আছেন। এসব আয়াতের ভুল ব্যাখ্যা করা বা এ নিয়ে বিতর্ক করা আল্লাহ্ তায়ালা নিষিদ্ধ করেছেন। এ সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন,
هُوَ الَّذِیْۤ اَنْزَلَ عَلَیْكَ الْكِتٰبَ مِنْهُ اٰیٰتٌ مُّحْكَمٰتٌ هُنَّ اُمُّ الْكِتٰبِ وَ اُخَرُ مُتَشٰبِهٰتٌ ؕ فَاَمَّا الَّذِیْنَ فِیْ قُلُوْبِهِمْ زَیْغٌ فَیَتَّبِعُوْنَ مَا تَشَابَهَ مِنْهُ ابْتِغَآءَ الْفِتْنَۃِ وَ ابْتِغَآءَ تَاْوِیْلِہٖ ۚ وَ مَا یَعْلَمُ تَاْوِیْلَہٗۤ اِلَّا اللّٰهُ ۘؔ وَ الرّٰسِخُوْنَ فِی الْعِلْمِ یَقُوْلُوْنَ اٰمَنَّا بِہٖ ۙ کُلٌّ مِّنْ عِنْدِ رَبِّنَا ۚ وَ مَا یَذَّكَرُ اِلَّاۤ اُولُوا الْاَلْبَابِ رَبَّنَا لَا تُزِغْ قُلُوْبَنَا بَعْدَ اِذْ هَدَیْتَنَا وَ هَبْ لَنَا مِنْ لَّدُنْكَ رَحْمَۃً ۚ اِنَّكَ اَنْتَ الْوَهَابُ
“তিনিই আপনার প্রতি কিতাব নাযিল করেছেন। তাতে কিছু আয়াত রয়েছে সুস্পষ্ট, সেগুলোই কিতাবের আসল অংশ। আর অন্যগুলো রূপক। সুতরাং যাদের অন্তরে কুটিলতা রয়েছে, তারা অনুসরণ করে ফিৎনা বিস্তার এবং অপব্যাখ্যার উদ্দেশ্যে তন্মধ্যেকার রূপকগুলোর। আর সেগুলোর ব্যাখ্যা আল্লাহ ব্যতীত কেউ জানে না। আর যারা জ্ঞানে সুগভীর, তারা বলেন: আমরা এর প্রতি ঈমান এনেছি। এই সবই আমাদের পালনকর্তার পক্ষ থেকে অবতীর্ণ হয়েছে। আর বোধশক্তি সম্পন্নেরা ছাড়া অপর কেউ শিক্ষা গ্রহণ করে না। হে আমাদের পালনকর্তা! সরল পথ প্রদর্শনের পর তুমি আমাদের অন্তরকে সত্যলংঘনে প্রবৃত্ত করোনা এবং তোমার নিকট থেকে আমাদিগকে অনুগ্রহ দান কর। তুমিই সব কিছুর দাতা।” (সূরাহ আলে ইমরান, ৩:৭ – ৮)
ইসলামী শরীয়তের পাঁচটি বিষয়
ইসলামী শরীয়াহ্ হলো আল্লাহর পবিত্র কুরআন এবং নবী ও রসূল হযরত মুহাম্মদ (সা) এর হাদীস ও সুন্নাহ্ ভিত্তিক ইসলামী আইন ও বিধানসমূহ। ধর্মীয় উপাসনা ছাড়াও শরীয়ত মুসলমানদের জীবনের বিভিন্ন দিক অর্থাৎ তাদের ব্যক্তিগত আচরণ ও নৈতিকতা, পারিবারিক বিষয়াদি, ব্যবসায়িক লেনদেন, সামাজিক সম্পর্ক, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, ইত্যাদি ব্যাপক বিষয় নিয়ন্ত্রণ করে।
ইসলামী শরীয়তে পাঁচটি বিষয় রয়েছে যা পবিত্র কুরআনের বিষয়াবলীর অন্তর্ভুক্ত। যেমন: ঈমান ও আকাইদ, ইবাদত: নামায, রোজা, যাকাত, হজ্জ্ব, ইত্যাদি ফরজ ও নফল ইবাদত।
এছাড়া গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো হলো:
-
মু‘আমালাত: লেন–দেন, দেনা–পাওনা, ব্যবসা–বাণিজ্য, পেশা–চাকুরী, চুক্তি, উত্তরাধিকার, ওসীয়ত, ইত্যাদি সম্পর্কিত নীতিমালা ও নির্দেশনা,
-
মু’আশারাত: পারিবারিক বিধি–বিধান (যেমন বিয়ে–শাদী–তালাক), পারস্পরিক হক, দান–খয়রাত, ব্যক্তিগত ও ও সামাজিক আচার–আচরণ, শিষ্টাচার ও আদব–কায়দা, পরিচ্ছন্নতা ও পাক–পবিত্রতা (গোছল, অজু, তয়ম্মুম), হালাল খাদ্য ও পানীয়, শালীনতা (পোষাক–পরিচ্ছদ), ইত্যাদি।
-
সিয়াসাত: রাষ্ট্রীয় নীতিমালা, আইন ও সুশাসন, ন্যায়বিচার ব্যবস্থা, জান–মাল-ইজ্জতের নিরাপত্তা, যুদ্ধ ও সন্ধিচুক্তি, ইত্যাদি,
-
ইকতিসাদিয়্যাত : অর্থনৈতিক নীতিমালা, উপার্জন ও ব্যয়, ব্যবসা–বাণিজ্য, সম্পদের বণ্টননীতি, ইত্যাদি),
-
দ্বীনি দাওয়াত: ইসলামের পথে আহ্বান ও জিহাদ ফী–সাবিলিল্লাহ্ (আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ), এবং
-
আখলাকিয়াত :চারিত্রিক ও আধ্যাত্মিক পরিশুদ্ধি, পরহেজগারি, আল্লাহর জিকির, কুরআন তেলাওয়াত, দোয়া ও দরুদ, ইত্যাদি।
পবিত্র কুরআন গ্রন্থাকারে সংকলনের ইতিবৃত্ত
ইসলামের ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কুরআনের সংরক্ষণ ও সংকলনের ইতিহাস। এটা জানা থাকলে কুরআনের ঐশী সংরক্ষণ সম্পর্কে গভীর উপলব্ধি সৃষ্টি হয়। নবী করীম (ﷺ)–এর যুগ থেকে হযরত উসমান (রা.)–এর যুগ পর্যন্ত কুরআন সংকলনের ইতিহাস ধারাবাহিকভাবে তুলে ধরা হলো:
১. নবী মুহাম্মদ (ﷺ)-এর জীবদ্দশায় কুরআনের সংরক্ষণ
পবিত্র কুরআন একবারে অবতীর্ণ হয়নি। বরং প্রায় তেইশ বছর ধরে বিভিন্ন ঘটনা, পরিস্থিতি ও প্রয়োজন অনুসারে ধাপে ধাপে অবতীর্ণ হয়েছে।
“আমি কুরআনকে ধীরে ধীরে নাযিল করেছি, যাতে আপনি তা মানুষের নিকট অবকাশে পাঠ করতে পারেন।”
(সূরাহ বনি–ইসরাঈল, ১৭:১০৬)
ক) মুখস্থ করার মাধ্যমে সংরক্ষণ
আরবদের স্মৃতিশক্তি ছিল অত্যন্ত প্রখর। ওহী নাযিল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নবী (ﷺ) তা মুখস্থ করতেন এবং সাহাবীগণও মুখস্থ করতেন।
আল্লাহ বলেন,
“এটি সুস্পষ্ট আয়াত, যা জ্ঞানপ্রাপ্তদের অন্তরে সংরক্ষিত রয়েছে।”
(সূরা আল-আনকাবূত, ২৯:৪৯)
হাজার হাজার সাহাবী কুরআন মুখস্থ করেছিলেন। তাঁদের বলা হতো হাফিযুল কুরআন বা কুররা (قراء)।
খ) লিখিতভাবে সংরক্ষণ
নবী (ﷺ) ওহী লেখার জন্য বিশেষ সাহাবীদের নিয়োগ করেছিলেন।
প্রসিদ্ধ ওহী-লেখকদের মধ্যে ছিলেন:
- হযরত যায়েদ ইবন সাবিত (রা.)
- হযরত উবাই ইবন কা’ব (রা.)
- হযরত আলী (রা.)
- হযরত মুয়াবিয়া (রা.)
- হযরত খালিদ ইবন ওয়ালিদ (রা.)
- হযরত আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা.)
ওহী নাযিল হলে নবী (ﷺ) লেখকদের ডেকে বলতেন কোন সূরার কোন স্থানে আয়াতটি লিখতে হবে।
কুরআন লেখার উপকরণ
সেই সময় কাগজ সহজলভ্য ছিল না। তাই আয়াতগুলো লেখা হতো—
- খেজুর পাতায়
- পশুর চামড়ায়
- সাদা পাথরে
- হাড়ে
- কাঠের ফলকে
গ) নবী (ﷺ) নিজে কুরআনের বিন্যাস নির্ধারণ করেন
প্রতিবছর রমযানে জিবরীল (আ.) নবী (ﷺ)-এর সঙ্গে সম্পূর্ণ কুরআন পর্যালোচনা করতেন।
ইবন আব্বাস (রা.) বর্ণনা করেন:
“জিবরীল (আ.) প্রতি রমযানে নবী (ﷺ)-এর সঙ্গে কুরআন পুনরালোচনা করতেন।”
(সহীহ বুখারী)
নবী (ﷺ)–এর ইন্তিকালের পূর্ববর্তী রমযানে এই পর্যালোচনা দুইবার সম্পন্ন হয়।
২. হযরত আবু বকর (রা.)-এর যুগে প্রথম সরকারি সংকলন
ইয়ামামার যুদ্ধ ও নতুন পরিস্থিতি
হিজরি ১২ সালে ইয়ামামার যুদ্ধে বহু হাফিজ সাহাবী শাহাদাতবরণ করেন।
সহীহ বুখারীতে বর্ণিত আছে যে প্রায় সত্তরজন বিশিষ্ট কারী ও হাফিজ শহীদ হন।
এতে হযরত উমর (রা.) উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন।
তিনি হযরত আবু বকর (রা.)-কে বলেন:
“আমি আশঙ্কা করছি, ভবিষ্যতে আরও হাফিজ শাহাদাতবরণ করলে কুরআনের কিছু অংশ হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিতে পারে।” (সহীহ বুখারী)
প্রথম সংকলন কমিটি
হযরত উমর (রাঃ) এর যুক্তিপূর্ণ কথায় অবশেষে হযরত আবু বকর (রা.) সম্মত হন এবং একটি কুরআন সংকলন কমিটি গঠন করেন ।
তিনি হযরত যায়েদ ইবন সাবিত (রা.)–কে এ কমিটির প্রধান হিসেবে নিয়োগ দান করেন।
হযরত জায়েদ (রা.) বলেন:
“আল্লাহর কসম! যদি আমাকে একটি পাহাড় স্থানান্তরের দায়িত্ব দেওয়া হতো, তবে তা কুরআন সংকলনের দায়িত্বের চেয়ে সহজ মনে হতো।” (সহীহ বুখারী)
সংকলনের পদ্ধতি
প্রত্যেক আয়াত গ্রহণের জন্য দুটি শর্ত ছিল:
১. লিখিত দলিল থাকতে হবে
২. কমপক্ষে দুইজন নির্ভরযোগ্য সাহাবীর সাক্ষ্য থাকতে হবে
অর্থাৎ শুধু মুখস্থ বা শুধু লিখিত কপি যথেষ্ট ছিল না।
এভাবে সর্বোচ্চ সতর্কতার সঙ্গে সম্পূর্ণ কুরআন একত্রিত করা হয়।
সংরক্ষণ:
সংকলিত কপি প্রথমে সংরক্ষিত ছিল:
- হযরত আবু বকর (রা.)–এর কাছে
- পরে হযরত উমর (রা.)–এর কাছে
- পরে হযরত হাফসা (রা.)–এর কাছে
৩. হযরত উসমান (রা.)-এর যুগে মানসম্মত অনুলিপি প্রস্তুত
ভিন্ন ভিন্ন কিরাআতে কুরআন পাঠে সমস্যার সৃষ্টি
ইসলামী সাম্রাজ্য দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছিল। ফলত, বিভিন্ন অঞ্চলের নতুন মুসলমানরা ভিন্ন ভিন্ন কিরাআতে কুরআন পাঠ করছিলেন। এ নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়।
আজারবাইজান ও আর্মেনিয়া অভিযান কালে হযরত হুযাইফা ইবন ইয়ামান (রা.) এই পরিস্থিতি দেখে উদ্বিগ্ন হন।
উসমানী উদ্যোগ:
স্থানীয় অধিবাসীদের মধ্যে কুরআন তিলাওয়াতের পদ্ধতি নিয়ে মতভেদ দেখা দিলে তিনি মদিনায় ফিরে এসে বিষয়টি হযরত উসমান (রা.)-এর নিকট উপস্থাপন করে বলেন:
“এই উম্মাহকে রক্ষা করুন, তারা যেন ইহুদি ও খ্রিস্টানদের মতো তাদের কিতাব নিয়ে বিভক্ত না হয়ে যায়।” (সহীহ বুখারী)
এই নতুন পরিস্থিতি নিয়ে হযরত উসমান (রা.) গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। উভয়েই আশঙ্কা করলেন যে, এভাবে চলতে থাকলে মুসলিম উম্মাহর মধ্যে মতবিরোধ ও সংঘাত সৃষ্টি হতে পারে, যেমনটি পূর্বে তাওরাত ও ইনজীলের অনুসারীদের মধ্যে তাদের ধর্মগ্রন্থের বিশুদ্ধতা নিয়ে ঘটেছিল।
পরিস্থিতির গুরুত্ব উপলব্ধি করে হযরত উসমান (রা.) দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। তিনি হযরত হাফসা (রা.)–এর নিকট সংরক্ষিত কুরআনের মূল সংকলনটি সাময়িকভাবে চেয়ে পাঠান এবং প্রতিশ্রুতি দেন যে, অনুলিপি প্রস্তুত হওয়ার পর তা তাঁকে ফেরত দেওয়া হবে। হযরত হাফসা (রা.) তা অবিলম্বে তাঁর নিকট প্রেরণ করেন।
হযরত যায়েদ ইবন সাবিত (রা.), যিনি পূর্বে কুরআনের প্রথম সংকলনের দায়িত্ব পালন করেছিলেন, তাঁকে একটি বিশেষ কমিটির প্রধান নিযুক্ত করা হয়। মূল কপির হুবহু ও নির্ভুল অনুলিপি প্রস্তুতের দায়িত্ব এই কমিটির ওপর অর্পিত হয়। কমিটির অন্যান্য সদস্য ছিলেন হযরত আবদুল্লাহ ইবন যুবাইর (রা.), হযরত সাঈদ ইবন আল–আস (রা.) এবং হযরত আবদুর রহমান ইবন হারিস (রা.)।
হযরত উসমান (রা.) তাঁদের নির্দেশ দেন যে, কোনো আয়াতের লিখনরীতি বা ভাষাগত বিষয়ে যদি হযরত যায়েদ (রা.) এবং অপর তিন সদস্যের মধ্যে মতপার্থক্য দেখা দেয়, তবে তা কুরাইশদের ভাষা ও উপভাষা অনুযায়ী লিখতে হবে। কারণ পবিত্র কুরআন সেই ভাষাতেই অবতীর্ণ হয়েছিল। অনুলিপি প্রস্তুত সম্পন্ন হওয়ার পর মূল সংকলনটি পুনরায় হযরত হাফসা (রা.)–এর নিকট ফিরিয়ে দেওয়া হয়।
- এরপর প্রস্তুতকৃত মানসম্মত কপিগুলো ইসলামী রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রদেশে প্রেরণ করা হয়।
- একই সঙ্গে নির্দেশ জারি করা হয় যে, কুরআনের অন্য যেসব ব্যক্তিগত বা আংশিক অনুলিপি প্রচলিত ছিল, সেগুলো প্রত্যাহার করে এই নির্ভরযোগ্য ও অনুমোদিত অনুলিপি দ্বারা প্রতিস্থাপন করতে হবে।
- এর ফলে সমগ্র মুসলিম বিশ্বে কুরআনের পাঠ ও লিখনরীতির ক্ষেত্রে পূর্ণ ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয়।
সেই সময় থেকে আজ পর্যন্ত পবিত্র কুরআন তার মূল ও অবিকৃত রূপে সংরক্ষিত রয়েছে এবং আল্লাহ তাআলার অনুগ্রহ ও প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কিয়ামত পর্যন্ত এভাবেই সংরক্ষিত থাকবে, ইনশাআল্লাহ।
“নিশ্চয় আমিই এ উপদেশ (কুরআন) অবতীর্ণ করেছি এবং আমিই এর সংরক্ষক।” (সূরা আল-হিজর, ১৫:৯)
সংক্ষিপ্ত মন্তব্য
হযরত আবু বকর (রা.)-এর যুগে কুরআনের প্রথম সরকারি সংকলন এবং হযরত উসমান (রা.)-এর যুগে তার মানসম্মত অনুলিপি প্রস্তুত ও প্রচারের এই ঐতিহাসিক উদ্যোগ কুরআনের সংরক্ষণ ইতিহাসের এক অনন্য অধ্যায়। এর ফলে পবিত্র কুরআনের পাঠ, ভাষা ও বিষয়বস্তুর বিশুদ্ধতা অক্ষুণ্ণ থাকে এবং মুসলিম উম্মাহ একটি অভিন্ন ও নির্ভরযোগ্য কুরআনিক পাঠের ওপর ঐক্যবদ্ধ হতে সক্ষম হয়। আজ পৃথিবীর যে কোনো প্রান্তে পঠিত কুরআনের মূল পাঠের অভিন্নতা এই ঐতিহাসিক প্রচেষ্টারই জীবন্ত সাক্ষ্য বহন করে।
মানসম্মত মুসহাফ
হযরত উসমান (রা.) এর উদ্যোগে হাফসা (রা.)–এর নিকট থেকে সংরক্ষিত মূল কপি সংগ্রহ করা হয় এবং হযরত জায়েদ ইবন সাবিত (রা.)–এর নেতৃত্বে নতুন কমিটি গঠন করে নির্ভুল অনুলিপি প্রস্তুত করা হয়। অতঃপর এই কপিগুলো: মক্কা, কুফা, বসরা, শাম, ইয়ামান, বাহরাইন, প্রভৃতি অঞ্চলে পাঠানো হয়।
৪. কেন অন্যান্য ব্যক্তিগত কপি প্রত্যাহার করা হয়েছিল?
অনেকে ভুলভাবে মনে করেন যে হযরত উসমান (রা.) কুরআন পরিবর্তন করেছিলেন।
এ ধারণা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। বাস্তবে তিনি:
- কুরআনের কোনো শব্দ পরিবর্তন করেননি।
- কোনো আয়াত যোগ বা বিয়োগ করেননি।
- কেবল একটি অভিন্ন সরকারি পাঠ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
এর ফলে মুসলিম উম্মাহ একটি একক মুসহাফের ওপর ঐক্যবদ্ধ হয়।
কুরআন সংরক্ষণের বিশেষ বৈশিষ্ট্য
বিশ্বের অন্য কোনো ধর্মগ্রন্থ সম্পর্কে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো একসঙ্গে প্রমাণিত নয়:
- মুখস্থ সংরক্ষণ
- লিখিত সংরক্ষণ
- হাজারো প্রত্যক্ষ সাক্ষী
- প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ধারাবাহিক বর্ণনা (তাওয়াতুর)
- সরকারি ও সামাজিক উভয় পর্যায়ে সংরক্ষণ
উপসংহার
পবিত্র কুরআনের সংরক্ষণ মানব ইতিহাসে এক অনন্য ঘটনা। নবী মুহাম্মদ (ﷺ)-এর জীবদ্দশায় ওহী লিপিবদ্ধকরণ, সাহাবীদের ব্যাপক মুখস্থকরণ, হযরত আবু বকর (রা.)-এর যুগে প্রথম সরকারি সংকলন এবং হযরত উসমান (রা.)-এর যুগে মানসম্মত অনুলিপি প্রস্তুতের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা তাঁর কিতাবকে এমনভাবে সংরক্ষণ করেছেন, যার তুলনা ইতিহাসে বিরল।
এ কারণেই আজ পৃথিবীর কোটি কোটি মুসলমান যে কুরআন তিলাওয়াত করছেন, তা চৌদ্দশত বছরেরও বেশি সময় আগে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর ওপর অবতীর্ণ সেই একই কুরআন।
“নিশ্চয়ই আমিই এ উপদেশ (কুরআন) নাযিল করেছি এবং আমিই এর সংরক্ষক।”
(সূরা আল-হিজর, ১৫:৯)
এই আয়াতের বাস্তব প্রতিফলনই হলো কুরআনের সংরক্ষণ ও সংকলনের এই বিস্ময়কর ইতিহাস।
পবিত্র কুরআনের সূরাহসমূহের সংক্ষিপ্ত তথ্য
হযরত মুহাম্মদ (সা)-এর নবুওতি জীবনের ১৩ বছর মক্কায় অবস্থানকালীন সময়ে ৮৬টি সূরাহ নাযিল হয়। এ সূরাহগুলো মক্কী সূরা নামে অভিহিত। আর মদীনায় হিজরতের পর তথায় তাঁর ১০ বছরের জীবৎকালীন সময়ে যে ২৮টি সূরাহ নাযিল হয় সেগুলো মাদানী সূরাহ নামে পরিচিত। ওহীবাহক ফেরেশতা হযরত জিব্রাইল (আ) মহান আল্লাহর তরফ থেকে প্রাপ্ত পবিত্র কালাম ওহীর মাধ্যমে তাঁর নিকট নিয়ে আসতেন। নবীজী (সা) এর ২৩ বছরের নবুওতি জীবনে সমগ্র কুরআনের নাযিল সমাপ্ত হয়।
- সমগ্র কুরআন শরীফ ৩০টি পারায় বিভক্ত।
- পবিত্র কুরআনের সূরাহর সংখ্যা মোট ১১৪টি।
- ক্রমিক সংখ্যা অনুযায়ী প্রথমটি হলো ‘সূরাহ ফাতিহা’ এবং সর্বশেষটি হলো ‘সূরাহ নাছ’।
- সূরাহগুলোর মধ্যে ২৮৬-আয়াত বিশিষ্ট ‘সূরাহ বাক্বারা’ হলো সর্ববৃহৎ যা কুরঅনের প্রথম ৩টি পারা নিয়ে বিস্তৃত। অপরদিকে ৩–আয়াত বিশিষ্ট সবচেয়ে ছোট সূরাহটি হলো ‘সূরাহ কাওসার’।
- পবিত্র কুরআনে ওয়াজিব সেজদার আয়াতসহ ছয় সহস্রাধিক আয়াত রয়েছে।
- মাদানী সূরাগুলো বৃহদাকার আর মক্কী সূরাহগুলো মাঝারি ও ক্ষুদ্রাকার।
- সর্বশেষ পূর্ণাঙ্গ যে সূরাটি নাযিল হয়েছিল তা হলো ‘সূরা আন–নছর’। এ সূরার মাধ্যমে আল্লাহ্ তায়ালা ইসলামের বিজয় ও হযরত মুহাম্মদ (সা)-এর নবুওতি মিশনের পরিসমাপ্তি ও তাঁর তিরোধানের ইঙ্গিত প্রদান করেন।
- মক্কী সূরাগুলোতে আল্লাহর একত্ববাদ, পৌত্তলিকতার অসারতা, পরকালীন জীবন, ক্বিয়ামত, বিচার দিবস, পুনরুজ্জীবন, বেহেশত–দোযখ, ইবাদত–বন্দগী, নৈতিকতা, ইত্যাদি বিষয়াদি বিশদভাবে আলোচিত হয়েছে।
- অপরদিকে মাদানী সূরাগুলোতে ইসলাম ধর্ম ও শরীয়তের বিধি–বিধান, পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় সম্পর্ক, হিজরত, জিহাদ, হজ্জ্ব ও যাকাতের বিধানসমূহ, ইত্যাদি বিষয় আলোচিত হয়েছে।
- শুধুমাত্র সূরা তাওবা ব্যতীত অপর সকল সূরার সূচনা বাক্য (তাসমিহ্) হলো : بِسْمِ اللّهِ الرَّحْمـَنِ الرَّحِيمِ (বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম) অর্থাৎ ‘শুরু করছি পরম করুণাময় আল্লাহর নামে’। তবে সূরা ‘নমলে’ এ বাক্যটি দুইবার থাকায় সমগ্র কুরআনে তাসমিহের সংখ্যা মোট ১১৪টি।
পবিত্র কুরআন বিভিন্ন নামে অভিহিত হয়েছে, যেমন:
قُرْآنٌ مَّجِيدٌ – “কুরআন মজীদ” (৮৫:২১), الْفُرْقَانَ – “আল ফুরকান” (২৫:১), هُدًى وَرَحْمَةٌ – “হুদা ওয়া রাহমত” (১০:৫৭), لَقُرْآنٌ كَرِيمٌ – “কুরআনুল করীম” (৫৬:৭৭), الْكِتَابِ الْمُبِينِ – “কিতাবুল মুবীন” (৪৩:২), نُورًا مُّبِينًا “নূরাম মুবীনা” (৪:১৭৪), الْكِتَابِ الْحَكِيمِ – “কিতাবুল হাকীম” (১০:১), ذِكْرٌ – “যিকর” (২১:৪৫), ইত্যাদি।
পবিত্র কুরআনের সূরাহ সমূহের নামের তালিকা
১. ফাতিহা ২. বাক্বারাহ্ ৩. আল – ইমরান ৪. আন – নিসা ৫. মা’য়েদাহ ৬. আন’আম ৭. আ’রাফ ৮. আনফাল ৯. তাওবাহ্ ১০. ইউনুস ১১. হুদ ১২. ইউছুফ ১৩. রা’দ ১৪. ইব্রাহীম ১৫. হিজর ১৬. নাহল ১৭. বনী ইসরাইল/ইসরা ১৮. কাহাফ ১৯. মরইয়াম ২০. ত্বোয়া–হা ২১. আম্বিয়া ২২. হাজ্জ্ব ২৩. মু’মিনূন ২৪. আন-নূর ২৫. ফুরকান ২৬. শো’য়ারা ২৭. নামল ২৮. আল-কাসাস ২৯. আনকাবুত ৩০. আর রোম ৩১. লোকমান ৩২. সাজাদাহ ৩৩. আহযাব ৩৪. সাবা ৩৫. ফাতির ৩৬. ইয়াসীন ৩৭. সাফফাত ৩৮. ছোয়াদ ৩৯. যুমার ৪০. মু’মিন ৪১. হা-মীম সাজাদাহ ৪২. শূরা ৪৩. যুখরুফ ৪৪. দোখান ৪৫. জাছিয়া ৪৬. আহক্বাফ ৪৭. মুহাম্মদ ৪৮. ফাতহ্ ৪৯. হুজুরাত ৫০. ক্বাফ ৫১. যারিয়াত ৫২. আত-তূর ৫৩. নাজম ৫৪. ক্বামার ৫৫. রাহমান ৫৬. ওয়াক্বিয়া ৫৭. হাদীদ ৫৮. মুজাদালাহ্ ৫৯. হাশর ৬০. মুমতাহিনা ৬১. আস-সাফ ৬২. জুমআহ্ ৬৩. মুনাফিকুন ৬৪. তাগাবুন ৬৫. ত্বালাক্ব ৬৬. তাহরীম ৬৭. মুলক ৬৮. কালাম ৬৯. হাক্বক্বাহ ৭০. মা’আরিজ ৭১. নূহ ৭২. জিন ৭৩. মুযযাম্মিল ৭৪. মুদ্দাসসির ৭৫. ক্বিয়ামাহ ৭৬. দাহর/ইনসান ৭৭. মুরসালাত ৭৮. নাবা ৭৯. নাযি’য়াত ৮০. আবাসা ৮১. তাকভীর ৮২. ইনফিতার ৮৩. মুতাফফিফীন ৮৪. ইনশিক্বাক্ব ৮৫. বুরুজ ৮৬. তারিক্ব ৮৭. আ’লা ৮৮. গাশিয়াহ্ ৮৯. ফজর ৯০. বালাদ ৯১. শামস ৯২. লায়ল ৯৩. দ্বোহা ৯৪. ইনশিরাহ ৯৫. ত্বীন ৯৬. আলাক্ব ৯৭. ক্বদর ৯৮. বাইয়্যিনাহ্ ৯৯. যিলযাল ১০০. আদিয়াত ১০১. ক্বারিয়া ১০২. তাকাছুর ১০৩. আছর ১০৪. হুমাযাহ্ ১০৫. ফীল ১০৬. কুরাইশ ১০৭. মাউন ১০৮. কাওছার ১০৯. কাফিরূন ১১০. নাসর ১১১. লাহাব/মাসাদ ১১২. ইখলাছ ১১৩. ফালাক্ব ১১৪, নাস [এ সংকলনে উদ্ধৃত আয়াতের শেষে ব্র্যাকেটে সূরাহ নং ও আয়াত নং উল্লিখিত হয়েছে]
তেলাওয়াতে-সেজদার আয়াতসমূহ
পবিত্র কুরআনে ১৪টি তেলাওয়াতে সেজদার আয়াত রয়েছে, তবে মতভেদে ১৫টি। এসব আয়াত পাঠের পর প্রতিটির জন্য একটি সেজদা করা ওয়াজিব, নতুবা গুনাহ হবে। সেজদা স্বাভাবিক নিয়মেই করতে হবে। সেজদার আয়াতগুলো নিম্নে প্রদত্ত হলো :
اِنَّ الَّذِيْنَ عِندَ رَبِّكَ لَا يَسْتَكْبِرُوْنَ عَنْ عِبَادَتِه وَيُسَبِّحُوْنَه وَلَه يَسْجُدُوْنَ ۩
“নিশ্চয়ই যারা তোমার পরওয়ারদেগারের সান্নিধ্যে রয়েছেন, তারা তাঁর বন্দেগীর ব্যাপারে অহঙ্কার করেন না এবং স্মরণ করেন তাঁর পবিত্র সত্তাকে; আর তাঁকেই সেজদা করেন।” (সূরা আরাফ, ৭:২০৬)
وَلِلّٰهِ يَسْجُدُ مَنْ فِى السَّمٰوٰتِ وَالْاَرْضِ طَوْعًا وَّكَرْهًا وَّظِلٰلُهُمْ بِالْغُدُوِّ وَالْاٰصَالِ ۩
“আল্লাহকে সেজদা করে যা কিছু নভোমন্ডলে ও ভূমন্ডলে আছে ইচ্ছায় অথবা অনিচ্ছায় এবং তাদের প্রতিচ্ছায়াও সকাল-সন্ধ্যায়।” ( সূরাহ আর রা’দ, ১৩:১৫)
وَلِلّٰهِ يَسْجُدُ مَا فِى السَّمٰوٰتِ وَمَا فِى الْاَرْضِ مِنْ دَآبَّةٍ وَالْمَلٰٓئِكَةُ وَهُمْ لَا يَسْتَكْبِرُوْنَ يَخَافُوْنَ رَبَّهُمْ مِّنْ فَوْقِهِمْ وَيَفْعَلُوْنَ مَا يُؤْمَرُوْنَ ۩
“আল্লাহকে সেজদা করে যা কিছু নভোমন্ডলে আছে এবং যা কিছু ভূমন্ডলে আছে এবং ফেরেশতাগণ; তারা অহংকার করে না। তারা তাদের উপর পরাক্রমশালী তাদের পালনকর্তাকে ভয় করে এবং তারা যা আদেশ পায়, তা করে।” (সূরাহ নাহল, ১৬:৪৯ – ৫০)
۩وَيَخِرُّوْنَ لِلْاَذْقَانِ يَبْكُوْنَ وَيَزِيْدُهُمْ خُشُوْعًا
“তারা ক্রন্দন করতে করতে নতমস্তকে ভূমিতে লুটিয়ে পড়ে এবং তাদের বিনয়ভাব আরো বৃদ্ধি পায়।” (সূরাহ বনী ইসরাঈল, ১৭:১০৯)
۩اُوْلٰٓئِكَ الَّذِيْنَ اَنْعَمَ اللهُ عَلَيْهِمْ مِّنَ النَّبِيِّنَ مِنْ ذُرِّيْةِ اٰدَمَ وَمِمَّنْ حَمَلْنَا مَعَ نُوْحٍ وَمِنْ ذُرِّيَّةِ اِبْرٰهِيْمَ وَاِسْرٰٓءِيْلَ وَمِمَّنْ هَدَيْنَا وَاجْتَبَيْنَآ ج اِذَا تُتْلٰى عَلَيْهِمْ اٰيٰتُ الرَّحْمٰنِ خَرُّوْا سُجَّدًا وَبُكِيًا
“এরাই তারা-নবীগণের মধ্য থেকে যাদেরকে আল্লাহ তা’আলা নেয়ামত দান করেছেন। এরা আদমের বংশধর এবং যাদেরকে আমি নূহের সাথে নৌকায় আরোহন করিয়েছিলাম, তাদের বংশধর, এবং ইব্রাহীম ও ইসরাঈলের বংশধর এবং যাদেরকে আমি পথ প্রদর্শন করেছি ও মনোনীত করেছি, তাদের বংশোদ্ভূত। তাদের কাছে যখন দয়াময় আল্লাহর আয়াতসমূহ পাঠ করা হত, তখন তারা সেজদায় লুটিয়ে পড়ত এবং ক্রন্দন করত।” (সূরাহ মারইয়াম ,১৯:৫৮)
اَلَمْ تَرَ اَنَّ اللهَ يَسْجُدُ لَه مَنْ فِى السَّمٰوٰتِ وَمَنْ فِى الْاَرْضِ وَالشَّمْسُ وَالْقَمَرُ وَالنُّجُوْمُ وَالْجِبَالُ وَالشَّجَرُ وَالدَّوَآبُّ وَكَثِيْرٌ مِّنَ النَّاسِ وَكَثِيْرٌ حَقَّ عَلَيْهِ الْعَذَابُ ۗ وَمَنْ يُّهِنِ اللهُ فَمَا لَه مِنْ مُّكْرِمٍ ۚ اِنَّ اللهَ يَفْعَلُ مَا يَشَآءُ ۩
“তুমি কি দেখনি যে, আল্লাহকে সেজদা করে যা কিছু আছে নভোমন্ডলে, যা কিছু আছে ভূমন্ডলে, সূর্য, চন্দ্র, তারকারাজি পর্বতরাজি বৃক্ষলতা, জীবজন্তু এবং অনেক মানুষ। আবার অনেকের উপর অবধারিত হয়েছে শাস্তি। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা লাঞ্ছিত করেন, তাকে কেউ সম্মান দিতে পারে না। আল্লাহ যা ইচ্ছা তাই করেন।” (সূরাহ হাজ্জ্ব, ২২:১৮)
۩يٰۤاَيُّهَا الَّذِيْنَ اٰمَنُوْا ارْكَعُوْا وَاسْجُدُوْا وَاعْبُدُوْا رَبَّكُمْ وَافْعَلُوْا الْخَيْرَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُوْنَ
“হে মুমিনগণ! তোমরা রুকু কর, সেজদা কর, তোমাদের পালনকর্তার এবাদত কর এবং সৎকাজ সম্পাদন কর, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার।” (সূরাহ হাজ্জ্ব, ২২:৭৭) [ইমাম শাফেয়ী (রঃ)–এর মতানুসারে]
۩وَاِذَا قِيْلَ لَهُمُ اسْجُدُوْا لِلرَّحْمٰنِ قَالُوْا وَمَا الرَّحْمٰنُ اَنَسْجُدُ لِمَا تَاْمُرُنَا وَزَادَهُمْ نُفُوْرًا
“তাদেরকে যখন বলা হয়, দয়াময়কে সেজদা কর, তখন তারা বলে, দয়াময় আবার কে? তুমি কাউকে সেজদা করার আদেশ করলেই কি আমরা সেজদা করব? এতে তাদের পলায়নপরতাই বৃদ্ধি পায়।” (সূরাহ আল-ফুরকান, ২৫:৬০)
۩اَلَّا يَسْجُدُوْا لِلّٰهِ الَّذِىْ يُخْرِجُ الْخَبْءَ فِى السَّمٰوٰتِ وَالْاَرْضِ وَيَعْلَمُ مَا تُخْفُوْنَ وَمَا تُعْلِنُوْنَ اللهُ لَا اِلٰهَ اِلَّا هُوَ رَبُّ الْعَرْشِ الْعَظِيْمِ
“তারা আল্লাহকে সেজদা করে না কেন, যিনি নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলের গোপন বস্তু প্রকাশ করেন এবং জানেন যা তোমরা গোপন কর ও যা প্রকাশ কর। আল্লাহ ব্যতীত কোন উপাস্য নেই; তিনি মহা আরশের মালিক।” (সূরাহ নমল, ২৭:২৫ – ২৬)
۩اِنَّمَا يُؤْمِنْ بِـَٔايٰتِنَا الَّذِيْنَ اِذَا ذُكِّرُوْا بِهَا خَرُّوْا سُجَّدًا وَسَبَّحُوْا بِحَمْدِ رَبِّهِمْ وَهُمْ لَا يَسْتَكْبِرُوْنَ
“কেবল তারাই আমার আয়াতসমূহের প্রতি ঈমান আনে, যারা আয়াতসমূহ দ্বারা উপদেশপ্রাপ্ত হয়ে সেজদায় লুটিয়ে পড়ে এবং অহংকারমুক্ত হয়ে তাদের পালনকর্তার সপ্রশংস পবিত্রতা বর্ণনা করে।” (সূরাহ সেজদাহ, ৩২:১৫)
۩قَالَ لَقَدْ ظَلَمَكَ بِسُؤَالِ نَعْجَتِكَ اِلٰى نِعَاجِه وَاِنَّ كَثِيْرًا مِّنَ الخُلَطَآءِ لَيَبْغِىْ بَعْضُهُمْ عَلٰى بَعْضٍ اِلَّا الَّذِيْنَ اٰمَنُوْا وَعَمِلُوْا الصّٰلِحٰتِ وَقَلِيْلٌ مَّا هُمْ ۗ وَظَنَّ دَاودُاَنَّمَا فَتَنّٰهُ فَاسْتَغْفَرَ رَبَّه وَخَرَّ رَاكِعًا وَّاَنَابَ
“দাউদ বলল: সে তোমার দুম্বাটিকে নিজের দুম্বাগুলোর সাথে সংযুক্ত করার দাবী করে তোমার প্রতি অবিচার করেছে। শরীকদের অনেকেই একে অপরের প্রতি যুলুম করে থাকে। তবে তারা করে না, যারা আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসী ও সৎকর্ম সম্পাদনকারী। অবশ্য এমন লোকের সংখ্যা অল্প। দাউদের খেয়াল হল যে, আমি তাকে পরীক্ষা করছি। অতঃপর সে তার পালনকর্তার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করল, সেজদায় লুটিয়ে পড়ল এবং তাঁর দিকে প্রত্যাবর্তন করল।” (সূরাহ ছোয়াদ, ৩৮:২৪)
۩وَمِنْ اٰيٰتِهِ الَّيْلُ وَالنَّهَارُ وَالشَّمْسُ وَالْقَمَرُ ط لَا تَسْجُدُوْا لِلشَّمْسِ وَلَا لِلْقَمَرِ وَاسْجُدُوْا لِلّٰهِ الَّذِىْ خَلَقَهُنَّ اِنْ كُنْتُمْ اِيَّاهُ تَعْبُدُوْنَ فَاِنِ اسْتَكْبَرُوْا فَالَّذِيْنَ عِنْدَ رَبِّكَ يُسَبِّحُوْنَ لَه بِالَّيْلِ وَالنَّهَارِ وَهُمْ لَا يَسْـَٔمُوْنَ
“তাঁর নিদর্শনসমূহের মধ্যে রয়েছে দিবস, রজনী, সূর্য ও চন্দ্র। তোমরা সূর্যকে সেজদা করো না, চন্দ্রকেও না; আল্লাহকে সেজদা কর, যিনি এগুলো সৃষ্টি করেছেন, যদি তোমরা নিষ্ঠার সাথে শুধুমাত্র তাঁরই এবাদত কর। অতঃপর তারা যদি অহংকার করে, তবে যারা আপনার পালনকর্তার কাছে আছে, তারা দিবারাত্রি তাঁর পবিত্রতা ঘোষণা করে এবং তারা ক্লান্ত হয় না।” (সূরাহ হা-মীম সেজদাহ , ৪১:৩৭ – ৩৮)
۩فَاسْجُدُوا لِلّٰهِ وَاعْبُدُوْا
“অতএব আল্লাহকে সেজদা কর এবং তাঁর এবাদত কর।” (সূরাহ আন-নাজম, ৫৩:৬২)
۩وَإِذَا قُرِئَ عَلَيْهِمُ الْقُرْاٰنُ لَا يَسْجُدُوْنَ
“যখন তাদের কাছে কুরআন পাঠ করা হয়, তখন সেজদা করে না।” (সূরাহ আল ইনশিক্বাক্ব, ৮৪:২১)
۩كَلَّا لَا تُطِعْهُ وَاسْجُدْ وَاقْتَرِبْ
“কখনই নয়, আপনি তার আনুগত্য করবেন না। আপনি সেজদা করুন ও আমার নৈকট্য অর্জন করুন।” (সূরাহ আলাক, ৯৬:১৯)
আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার নাযিলকৃত অন্যান্য কিতাবসমূহ
لِكُلِّ اَجَلٍ كِتَابٌ يَمْحُوْا اللهُ مَا يَشَآءُ وَيُثْبِتُ وَعِنْدَه اُمُّ الْكِتٰبِ
“……প্রত্যেক নির্ধারিত কালের জন্য একটি কিতাব থাকে। আল্লাহ যা ইচ্ছা বাতিল করে দেন এবং যা ইচ্ছা বহাল রাখেন এবং মূলগ্রন্থ তাঁর কাছেই রয়েছে।” (সূরাহআর–রা’দ , ১৩:৩৮–৩৯)
প্রতি যুগের জন্যই আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন নির্ধারিত করেছিলেন এক একটি আসমানী গ্রন্থ। নবী ও রসূলগণ ওহীর মাধ্যমে প্রাপ্ত হন এসব কিতাব। যুগের প্রেক্ষাপট বিবেচনায় এসব কিতাবের নির্দেশ অনুযায়ী নিজ নিজ সম্প্রদায়ের জন্যে তাঁরা জারী করতেন আল্লাহ্ প্রদত্ত বিধান। তাঁদের তিরোধানের পর অনেক বিধান বিকৃত হয়ে পড়ায় সেগুলো বাতিল করে নতুন যুগের প্রয়োজনে আল্লাহর তরফ থেকে নতুন বিধান নিয়ে পরবর্তী নবী–রাসূলগণ এসেছেন। অনেক সময় পূর্ববর্তী নবী ও রাসূলগণের কিতাব সমসাময়িক বা পরবর্তী নবীগণের জন্যও প্রযোজ্য ছিল অথবা সেগুলোতে কিছু পুরোনো বিধান বদলে দিয়ে আল্লাহ তায়ালা নতুন বিধান সংযুক্ত করেছিলেন। এরই ধারাবাহিকতায় সর্বশেষ নবী ও রাসূল মুহাম্মদ (সা) এর ওপর নাযিল হয় সর্বশেষ আসমানী কিতাব “কুরআন” – যা পূর্ববর্তী সকল আসমানী কিতাবের সত্যায়ন করে এবং যার বিধিবিধানসমূহ সমগ্র মানব জাতির জন্য ক্বিয়ামত পর্যন্ত বলবৎ থাকবে। অন্যান্য আসমানী গ্রন্থের উপর বিশ্বাস স্থাপন সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন:
ذَٰلِكَ الْكِتَابُ لَا رَيْبَ ۛ فِيهِ ۛ هُدًى لِّلْمُتَّقِينَالَّذِينَ يُؤْمِنُونَ بِالْغَيْبِ وَيُقِيمُونَ الصَّلَاةَ وَمِمَّا رَزَقْنَاهُمْ يُنفِقُونَوَالَّذِينَ يُؤْمِنُونَ بِمَا أُنزِلَ إِلَيْكَ وَمَا أُنزِلَ مِن قَبْلِكَ وَبِالْآخِرَةِ هُمْ يُوقِنُونَأُولَـٰئِكَ عَلَىٰ هُدًى مِّن رَّبِّهِمْ ۖ وَأُولَـٰئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ“এ সেই কিতাব (কুরআন) যাতে কোনই সন্দেহ নেই। পথ প্রদর্শনকারী পরহেযগারদের জন্য, যারা অদেখা বিষয়ের উপর বিশ্বাস স্থাপন করে এবং নামায প্রতিষ্ঠা করে। আর আমি তাদেরকে যে রুযী দান করেছি তা থেকে ব্যয় করে এবং যারা বিশ্বাস স্থাপন করেছে সেসব বিষয়ের উপর যা কিছু তোমার প্রতি অবতীর্ণ হয়েছে এবং সেসব বিষয়ের উপর যা তোমার পূর্ববর্তীদের প্রতি অবতীর্ণ হয়েছে। আর আখেরাতকে যারা নিশ্চিত বলে বিশ্বাস করে। তারাই নিজেদের পালনকর্তার পক্ষ থেকে সুপথ প্রাপ্ত, আর তারাই যথার্থ সফলকাম।” (সূরাহ বাক্বারাহ, ২:২–৫)آمَنَ الرَّسُولُ بِمَا أُنزِلَ إِلَيْهِ مِن رَّبِّهِ وَالْمُؤْمِنُونَ ۚ كُلٌّ آمَنَ بِاللَّهِ وَمَلَائِكَتِهِ وَكُتُبِهِ وَرُسُلِهِ لَا نُفَرِّقُ بَيْنَ أَحَدٍ مِّن رُّسُلِهِ ۚ وَقَالُوا سَمِعْنَا وَأَطَعْنَا ۖ غُفْرَانَكَ رَبَّنَا وَإِلَيْكَ الْمَصِيرُ“রসূল (হযরত মুহাম্মদঃ) বিশ্বাস রাখেন ঐ সমস্ত বিষয় সম্পর্কে যা তাঁর পালনকর্তার পক্ষ থেকে তাঁর কাছে অবতীর্ণ হয়েছে এবং মুসলমানরাও সবাই বিশ্বাস রাখে আল্লাহর প্রতি, তাঁর ফেরেশতাদের প্রতি, তাঁর গ্রন্থসমুহের প্রতি এবং তাঁর পয়গম্বরগণের প্রতি। তারা বলে আমরা তাঁর পয়গম্বরদের মধ্যে কোন তারতম্য করিনা। তারা বলে, আমরা শুনেছি এবং কবুল করেছি। আমরা তোমার ক্ষমা চাই, হে আমাদের পালনকর্তা। তোমারই দিকে প্রত্যাবর্তন করতে হবে। (সূরাহ বাক্বারাহ, ২:২৮৫)মহান আল্লাহর কালাম অনুযায়ী প্রতিটি যুগের প্রেক্ষাপটে এক একটি আসমানী কিতাব নাযিল হলেও পবিত্র কুরআনে চারটি আসমানী কিতাবের নাম উল্লেখ আছে – এগুলো হলো:
হযরত মূসার (আ) ওপর নাযিলকৃত কিতাব ‘তাওরাত’,
হযরত দাউদের (আ) কিতাব ‘জবুর’,
হযরত ঈসার (আ) কিতাব ‘ইঞ্জিল’ এবং
হযরত মুহাম্মদের (সা) ওপর নাযিলকৃত কিতাব ‘কুরআন’।
হযরত ইব্রাহীম (আ) ও অন্যান্য নবী ও রাসূলগণের ওপর নাযিল হয়েছিল ‘সহীফা’ (পথ–নির্দেশক পুস্তিকা)। প্রতিটি আসমানী কিতাবসমূহের ওপর বিশ্বাস স্থাপন করা ঈমানের অঙ্গ এবং সকল মু’মিন নর–নারীর জন্য আবশ্যিক।
কিতাব সংক্রান্ত কিছুসংখ্যক আয়াত নীচে উদ্ধৃত করা হলো:
كَانَ النَّاسُ اُمَّۃً وَّاحِدَۃً ۟ فَبَعَثَ اللّٰهُ النَّبِیّٖنَ مُبَشِّرِیْنَ وَ مُنْذِرِیْنَ ۪ وَ اَنْزَلَ مَعَهُمُ الْكِتٰبَ بِالْحَقِّ لِیَحْکُمَ بَیْنَ النَّاسِ فِیْمَا اخْتَلَفُوْا فِیْهِ ؕ وَ مَا اخْتَلَفَ فِیْهِ اِلَّا الَّذِیْنَ اُوْتُوْهُ مِنْۢ بَعْدِ مَا جَآءَتْهُمُ الْبَیِّنٰتُ بَغْیًۢا بَیْنَهُمْ ۚ فَهَدَی اللّٰهُ الَّذِیْنَ اٰمَنُوْا لِمَا اخْتَلَفُوْا فِیْهِ مِنَ الْحَقِّ بِاِذْنِہٖ ؕ وَ اللّٰهُ یَہْدِیْ مَنْ یَّشَآءُ اِلٰی صِرَاطٍ مُّسْتَقِیْمٍ
“সকল মানুষ একই জাতি সত্তার অন্তর্ভুক্ত ছিল। অতঃপর আল্লাহ তা’আলা পয়গম্বর পাঠালেন সুসংবাদদাতা ও ভীতি প্রদর্শনকরী হিসাবে। আর তাঁদের সাথে অবতীর্ণ করলেন সত্য কিতাব, যাতে মানুষের মাঝে বিতর্কমূলক বিষয়ে মীমাংসা করতে পারেন। বস্তুতঃ কিতাবের ব্যাপারে অন্য কেউ মতভেদ করেনি; কিন্তু পরিষ্কার নির্দেশ এসে যাবার পর নিজেদের পারস্পরিক জেদবশত তারাই করেছে, যারা কিতাব প্রাপ্ত হয়েছিল। অতঃপর আল্লাহ ঈমানদারদেরকে হেদায়েত করেছেন সেই সত্য বিষয়ে, যে ব্যাপারে তারা মতভেদ লিপ্ত হয়েছিল। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা, সরল পথ বাতলে দেন।” (সূরাহ বাক্বারাহ, ২:২১৩)
اَلَّذِيْنَ اٰتَيْنٰهُمُ الْكِتٰبَ يَتْلُوْنَه حَقَّ تِلَاوَتِه اُوْلٰٓئِكَ يُؤْمِنُوْنَ بِه ۗ وَمَنْ يَكْفُرْ بِه فَاُوْلٰٓئِكَ هُمُ الْخٰسِرُوْنَ
“আমি যাদেরকে গ্রন্থ দান করেছি, তারা তা যথাযথভাবে পাঠ করে। তারাই তৎপ্রতি বিশ্বাস করে। আর যারা তা অবিশ্বাস করে, তারাই হবে ক্ষতিগ্রস্ত।” (সূরাহ বাক্বারাহ, ২:১২১)।
ذٰلِكَ الْكِتٰبُ لَا رَيْبَ ۛ فِيْهِ ۛ هُدًى لِّلْمُتَّقِيْنَ
“এ সেই কিতাব (কুরআন) যাতে কোনই সন্দেহ নেই। পথ প্রদর্শনকারী পরহেযগারদের জন্য।” (সূরাহ বাক্বারাহ, ২:২)
نَزَّلَ عَلَيْكَ الْكِتٰبَ بِالْحَقِّ مُصَدِّقًا لِّمَا بَيْنَ يَدَيْهِ وَاَنزَلَ التَّوْرٰىةَ وَالْاِنجِيْلَ مِنْ قَبْلُ هُدًى لِّلنَّاسِ وَاَنزَلَ الْفُرْقَانَ ۗ اِنَّ الَّذِيْنَ كَفَرُوْا بِـَٔايٰتِ اللهِ لَهُمْ عَذَابٌ شَدِيْدٌ ۗ وَاللهُ عَزِيْزٌ ذُوْانتِقَامٍ
“তিনি আপনার প্রতি কিতাব (কুরআন) নাযিল করেছেন সত্যতার সাথে; যা সত্যায়ন করে পূর্ববর্তী কিতাবসমূহের। নাযিল করেছেন তাওরাত ও ইঞ্জিল, এ কিতাবের পূর্বে, মানুষের হেদায়েতের জন্যে এবং অবতীর্ণ করেছেন ফুরকান (সত্য ও মিথ্যার মীমাংসাকারী মানদন্ড)। নিঃসন্দেহে যারা আল্লাহর আয়াতসমূহ অস্বীকার করে, তাদের জন্যে রয়েছে কঠিন আযাব। আর আল্লাহ হচ্ছেন পরাক্রমশীল, প্রতিশোধ গ্রহণকারী।” (সূরাহ আলে ইমরান, ৩:৩–৪)
كَمَاۤ اَرْسَلْنَا فِیْکُمْ رَسُوْلًا مِّنْکُمْ یَتْلُوْا عَلَیْکُمْ اٰیٰتِنَا وَ یُزَكِیْکُمْ وَ یُعَلِّمُکُمُ الْكِتٰبَ وَ الْحِکْمَۃَ وَ یُعَلِّمُکُمْ مَّا لَمْ تَکُوْنُوْا تَعْلَمُوْنَ
“যেমন, আমি পাঠিয়েছি তোমাদেরই মধ্য থেকে তোমাদের জন্যে একজন রসূল, যিনি তোমাদের নিকট আমার বাণীসমূহ পাঠ করবেন এবং তোমাদের পবিত্র করবেন; আর তোমাদের শিক্ষা দেবেন কিতাব (কুরআন) ও তাঁর তত্ত্ব–জ্ঞান এবং শিক্ষা দেবেন এমন বিষয় যা কখনো তোমরা জানতে না।” (সূরাহ বাক্বারাহ, ২:১৫১)
وَاِذَا قِیْلَ لَهُمْ اٰمِنُوْا بِمَاۤ اَنْزَلَ اللّٰهُ قَالُوْا نُؤْمِنُ بِمَاۤ اُنْزِلَ عَلَیْنَا وَ یَکْفُرُوْنَ بِمَا وَرَآءَہٗ ٭ وَ هُوَ الْحَقُّ مُصَدِّقًا لِّمَا مَعَهُمْ ط قُلْ فَلِمَ تَقْتُلُوْنَ اَنْۢبِیَآءَ اللّٰهِ مِنْ قَبْلُ اِنْ کُنْتُمْ مُّؤْمِنِیْنَ
“যখন তাদেরকে বলা হয়, আল্লাহ যা পাঠিয়েছেন তা মেনে নাও, তখন তারা বলে, আমরা মানি যা আমাদের প্রতি অবতীর্ণ হয়েছে। সেটি ছাড়া সবগুলোকে তারা অস্বীকার করে। অথচ এ গ্রন্থটি (কুরআন) সত্য এবং সত্যায়ন করে ঐ গ্রন্থের যা তাদের কাছে রয়েছে। বলে দিন, তবে তোমরা ইতিপূর্বে পয়গম্বরদের হত্যা করতে কেন যদি তোমরা বিশ্বাসী ছিলে।” (সূরাহ বাক্বারাহ, ২:৯১)
لٰكِنِ الرّٰسِخُوْنَ فِی الْعِلْمِ مِنْهُمْ وَ الْمُؤْمِنُوْنَ یُؤْمِنُوْنَ بِمَاۤ اُنْزِلَ اِلَیْكَ وَ مَاۤ اُنْزِلَ مِنْ قَبْلِكَ وَ الْمُقِیْمِیْنَ الصَّلٰوۃَ وَ الْمُؤْتُوْنَ الزَّکٰوۃَ وَ الْمُؤْمِنُوْنَ بِاللّٰهِ وَ الْیَوْمِ الْاٰخِرِ ؕ اُولٰٓئِكَ سَنُؤْتِیْهِمْ اَجْرًا عَظِیْمًا اِنَّاۤ اَوْحَیْنَاۤ اِلَیْكَ كَمَاۤ اَوْحَیْنَاۤ اِلٰی نُوْحٍ وَّ النَّبِیّٖنَ مِنْۢ بَعْدِہٖ ۚ وَ اَوْحَیْنَاۤ اِلٰۤی اِبْرٰهِیْمَ وَ اِسْمٰعِیْلَ وَ اِسْحٰقَ وَ یَعْقُوْبَ وَ الْاَسْبَاطِ وَ عِیْسٰی وَ اَیُّوْبَ وَ یُوْنُسَ وَ هٰرُوْنَ وَسُلَیْمٰنَ ۚ وَ اٰتَیْنَا دَاوٗدَ زَبُوْرًا
“কিন্তু যারা তাদের মধ্যে জ্ঞানপক্ক ও ঈমানদার, তারা তাও মান্য করে যা আপনার উপর অবতীর্ণ হয়েছে এবং যা অবতীর্ণ হয়েছে আপনার পূর্বে। আর যারা নামাযে অনুবর্তিতা পালনকারী, যারা যাকাত দানকারী এবং যারা আল্লাহ ও কেয়ামতে আস্থাশীল। বস্তুত এমন লোকদেরকে আমি দান করবো মহাপূণ্য। আমি আপনার প্রতি ওহী পাঠিয়েছি, যেমন করে ওহী পাঠিয়েছিলাম নূহের প্রতি এবং সে সমস্ত নবী-রাসূলের প্রতি যাঁরা তাঁর পরে প্রেরিত হয়েছেন। আর ওহী পাঠিয়েছি, ইসমাঈল, ইব্রাহীম, ইসহাক, ইয়াকুব ও তাঁর সন্তানবর্গের প্রতি এবং ঈসা, আইয়ুব, ইউনূস, হারুন ও সুলায়মানের প্রতি। আর আমি দাউদকে দান করেছি যবুর গ্রন্থ।” (সূরাহ আন–নিসা, ৪:১৬২–১৬৩)
مَثَلُ الَّذِيْنَ حُمِّلُوْا التَّوْرٰىةَ ثُمَّ لَمْ يَحْمِلُوْهَا كَمَثَلِ الْحِمَارِ يَحْمِلُ اَسْفَارًۢا بِئْسَ مَثَلُ الْقَوْمِ الَّذِيْنَ كَذَّبُوْا بِـَٔايٰتِ اللهِ ج وَاللهُ لَا يَهْدِى الْقَوْمَ الظّٰلِمِيْنَ
“যাদেরকে তওরাত দেয়া হয়েছিল, অতঃপর তারা তার অনুসরণ করেনি, তাদের দৃষ্টান্ত সেই গাধা, যে পুস্তক বহন করে, যারা আল্লাহর আয়াতসমূহকে মিথ্যা বলে, তাদের দৃষ্টান্ত কত নিকৃষ্ট। আল্লাহ জালেম সম্প্রদায়কে পথ প্রদর্শন করেন না।” (সূরাহ আল জুমুআহ, ৬২:৫)
قُوْلُوْۤا اٰمَنَّا بِاللّٰهِ وَ مَاۤ اُنْزِلَ اِلَیْنَا وَ مَاۤ اُنْزِلَ اِلٰۤی اِبْرٰہٖمَ وَ اِسْمٰعِیْلَ وَ اِسْحٰقَ وَ یَعْقُوْبَ وَ الْاَسْبَاطِ وَ مَاۤ اُوْتِیَ مُوْسٰی وَ عِیْسٰی وَ مَاۤ اُوْتِیَ النَّبِیُّوْنَ مِنْ رَّبِّهِمْ ۚ لَا نُفَرِّقُ بَیْنَ اَحَدٍ مِّنْهُمْ ۫ۖ وَنَحْنُ لَہٗ مُسْلِمُوْنَ
“তোমরা বল, আমরা ঈমান এনেছি আল্লাহর উপর এবং যা অবতীর্ণ হয়েছে আমাদের প্রতি এবং যা অবতীর্ণ হয়েছে ইব্রাহীম, ইসমাঈল, ইসহাক, ইয়াকুব এবং তদীয় বংশধরের প্রতি এবং মূসা, ঈসা, অন্যান্য নবীকে পালনকর্তার পক্ষ থেকে যা দান করা হয়েছে, তৎসমুদয়ের উপর। আমরা তাদের মধ্যে পার্থক্য করি না। আমরা তাঁরই আনুগত্যকারী।” (সূরাহ বাক্বারাহ, ২:১৩৬)
ذٰلِكَ بِاَنَّ اللهَ نَزَّلَ الْكِتٰبَ بِالْحَقِّ ۗ وَاِنَّ الَّذِيْنَ اخْتَلَفُوْا فِى الْكِتٰبِ لَفِىْ شِقَاقٍۭ بَعِيْدٍ
“আর এটা এজন্যে যে, আল্লাহ নাযিল করেছেন সত্যপূর্ণ কিতাব। আর যারা কেতাবের মাঝে মতবিরোধ সৃষ্টি করেছে নিশ্চয়ই তারা জেদের বশবর্তী হয়ে অনেক দূরে চলে গেছে।” (সূরাহ বাক্বারাহ, ২:১৭৬)
اِنَّ الَّذِیْنَ یَکْتُمُوْنَ مَاۤ اَنْزَلَ اللّٰهُ مِنَ الْكِتٰبِ وَ یَشْتَرُوْنَ بِہٖ ثَمَنًا قَلِیْلًا لا اُولٰٓئِكَ مَا یَاْکُلُوْنَ فِیْ بُطُوْنِهِمْ اِلَّا النَّارَ وَلَا یُكَلِّمُهُمُ اللّٰهُ یَوْمَ الْقِیٰمَۃِ وَلَا یُزَكِیْهِمْ ج وَ لَهُمْ عَذَابٌ اَلِیْمٌ
“নিশ্চয় যারা সেসব বিষয় গোপন করে, যা আল্লাহ কিতাবে নাযিল করেছেন এবং সেজন্য অল্প মূল্য গ্রহণ করে, তারা আগুন ছাড়া নিজের পেটে আর কিছু ঢুকায় না। আর আল্লাহ কেয়ামতের দিন তাদের সাথে না কথা বলবেন, না তাদের পবিত্র করা হবে, বস্তুত তাদের জন্যে রয়েছে বেদনাদায়ক আযাব।” (সূরাহ বাক্বারাহ, ২:১৭৪)
هُوَ الَّذِیْۤ اَنْزَلَ عَلَیْكَ الْكِتٰبَ مِنْهُ اٰیٰتٌ مُّحْكَمٰتٌ هُنَّ اُمُّ الْكِتٰبِ وَ اُخَرُ مُتَشٰبِهٰتٌ ؕ فَاَمَّا الَّذِیْنَ فِیْ قُلُوْبِهِمْ زَیْغٌ فَیَتَّبِعُوْنَ مَا تَشَابَهَ مِنْهُ ابْتِغَآءَ الْفِتْنَۃِ وَ ابْتِغَآءَ تَاْوِیْلِہٖ ۚ وَ مَا یَعْلَمُ تَاْوِیْلَہٗۤ اِلَّا اللّٰهُ ۘؔ وَ الرّٰسِخُوْنَ فِی الْعِلْمِ یَقُوْلُوْنَ اٰمَنَّا بِہٖ ۙ کُلٌّ مِّنْ عِنْدِ رَبِّنَا ۚ وَ مَا یَذَّكَرُ اِلَّاۤ اُولُوا الْاَلْبَابِ
“তিনিই আপনার প্রতি কিতাব নাযিল করেছেন। তাতে কিছু আয়াত রয়েছে সুস্পষ্ট, সেগুলোই কিতাবের আসল অংশ। আর অন্যগুলো রূপক। সুতরাং যাদের অন্তরে কুটিলতা রয়েছে, তারা অনুসরণ করে ফিৎনা বিস্তার এবং অপব্যাখ্যার উদ্দেশে তন্মধ্যেকার রূপকগুলোর। আর সেগুলোর ব্যাখ্যা আল্লাহ ব্যতীত কেউ জানে না। আর যারা জ্ঞানে সুগভীর, তারা বলেন: আমরা এর প্রতি ঈমান এনেছি। এই সবই আমাদের পালনকর্তার পক্ষ থেকে অবতীর্ণ হয়েছে। আর বোধশক্তি সম্পন্নেরা ছাড়া অপর কেউ শিক্ষা গ্রহণ করে না।” (সূরাহ আলে ইমরান, ৩:৭)
بَلْ تُؤْثِرُوْنَ الْحَیٰوۃَ الدُّنْیَا وَ الْاٰخِرَۃُ خَیْرٌ وَّ اَبْقٰی اِنَّ هٰذَا لَفِی الصُّحُفِ الْاُوْلٰی صُحُفِ اِبْرٰهِیْمَ وَ مُوْسٰی
“বস্তুত তোমরা পার্থিব জীবনকে অগ্রাধিকার দাও, অথচ পরকালের জীবন উৎকৃষ্ট ও স্থায়ী। এটা লিখিত রয়েছে পূর্ববতী কিতাবসমূহে; ইব্রাহীম ও মূসার কিতাবসমূহে।” (সূরাহ আল আ’লা, ৮৭:১৬–১৯)
اَلَمْ تَرَ اِلَی الَّذِیْنَ اُوْتُوْا نَصِیْبًا مِّنَ الْكِتٰبِ یُدْعَوْنَ اِلٰی كِتٰبِ اللّٰهِ لِیَحْکُمَ بَیْنَهُمْ ثُمَّ یَتَوَلّٰی فَرِیْقٌ مِّنْهُمْ وَ هُمْ مُّعْرِضُوْنَ
“আপনি কি তাদের দেখেননি, যারা কিতাবের কিছু অংশ পেয়েছে – আল্লাহর কিতাবের প্রতি তাদের আহ্বান করা হয়েছিল যাতে তাদের মধ্যে মীমাংসা করা যায়। অতঃপর তাদের মধ্যে একদল তা অমান্য করে মুখ ফিরিয়ে নেয় ।” (সূরাহ আলে ইমরান,৩:২৩)
وَ اِنَّ مِنْهُمْ لَفَرِیْقًا یَّلْوٗنَ اَلْسِنَتَهُمْ بِالْكِتٰبِ لِتَحْسَبُوْهُ مِنَ الْكِتٰبِ وَ مَا هُوَ مِنَ الْكِتٰبِ ۚ وَ یَقُوْلُوْنَ هُوَ مِنْ عِنْدِ اللّٰهِ وَ مَا هُوَ مِنْ عِنْدِ اللّٰهِ ۚ وَ یَقُوْلُوْنَ عَلَی اللّٰهِ الْكَذِبَ وَ هُمْ یَعْلَمُوْنَ
“আর তাদের মধ্যে একদল রয়েছে, যারা বিকৃত উচ্চারণে মুখ বাঁকিয়ে কিতাব পাঠ করে, যাতে তোমরা মনে কর যে, তার কিতাব থেকেই পাঠ করছে। অথচ তারা যা আবৃত্তি করছে তা আদৌ কিতাব নয়। এবং তারা বলে যে, এসব কথা আল্লাহর তরফ থেকে আগত। অথচ এসব আল্লাহর তরফ থেকে প্রেরিত নয়। আর তারা জেনে শুনে আল্লাহরই প্রতি মিথ্যারোপ করে ।” (সূরাহ আলে ইমরান, ৩:৭৮)
وَمِنْهُمْ مَّنْ يُّؤْمِنُ بِه وَمِنْهُمْ مَّنْ لَّا يُؤْمِنْ بِه ط وَرَبُّكَ اَعْلَمُ بِالْمُفْسِدِيْنَ وَاِنْ كَذَّبُوْكَ فَقُلْ لِّى عَمَلِىْ وَلَكُمْ عَمَلُكُمْ اَنْتُمْ بَرِيْٓـُٔوْنَ مِمَّاۤ اَعْمَلُ وَاَنَابَرِىٓءٌ مِّمَّا تَعْمَلُوْنَ وَمِنْهُمْ مَّنْ يَسْتَمِعُوْنَ اِلَيْكَ ط اَفَاَنْتَ تُسْمِعُ الصُّمَّ وَلَوْ كَانُوْا لَا يَعْقِلُوْنَ وَمِنْهُمْ مَّنْ يَّنْظُرُ اِلَيْكَ ط اَفَاَنْتَ تَهْدِى الْعُمْىَ وَلَوْ كَانُوْا لَا يُبْصِرُوْنَ اِنَّ اللهَ لَا يَظْلِمُ النَّاسَ شَيْـًٔا وَّلٰكِنَّ النَّاسَ اَنْفُسَهُمْ يَظْلِمُوْنَ
“আর তাদের মধ্যে কেউ কেউ কুরআনকে বিশ্বাস করবে এবং কেউ কেউ বিশ্বাস করবে না। বস্তুত আপনার পরওয়ারদেগার যথার্থই জানেন দুরাচারদিগকে। আর যদি আপনাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে, তবে বলুন, আমার জন্য আমার কর্ম, আর তোমাদের জন্য তোমাদের কর্ম। তোমাদের দায়–দায়িত্ব নেই আমার কর্মের উপর এবং আমারও দায়–দায়িত্ব নেই তোমরা যা কর সেজন্য। তাদের কেউ কেউ কান রাখে আপনাদের প্রতি; আপনি বধিরদেরকে কি শোনাবেন যদি তাদের বিবেক–বুদ্ধি না থাকে! আবার তাদের মধ্যে কেউ কেউ আপনাদের প্রতি দৃষ্টিনিবদ্ধ রাখে; আপনি অন্ধদেরকে কি পথ দেখাবেন যদি তারা মোটেও দেখতে না পারে। আল্লাহ যুলুম করেন না মানুষের উপর, বরং মানুষ নিজেই নিজের উপর যুলুম করে।” (সূরাহ ইউনুস, ১০:৪০–৪৪)
فَاِنْ كَذَّبُوْكَ فَقَدْ کُذِّبَ رُسُلٌ مِّنْ قَبْلِكَ جَآءُوْ بِالْبَیِّنٰتِ وَ الزُّبُرِ وَ الْكِتٰبِ الْمُنِیْرِ
“তাছাড়া এরা যদি তোমাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে, তবে তোমার পূর্বেও এরা এমন বহু নবীকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে, যারা নিদর্শনসমূহ নিয়ে এসেছিলেন। এবং এনেছিলেন সহীফা ও প্রদীপ্ত গ্রন্থ।” (সূরাহ আলে ইমরান, ৩:১৮৪)
وَ اِنَّ مِنْ اَهْلِ الْكِتٰبِ لَمَنْ یُّؤْمِنُ بِاللّٰهِ وَ مَاۤ اُنْزِلَ اِلَیْکُمْ وَ مَاۤ اُنْزِلَ اِلَیْهِمْ خٰشِعِیْنَ لِلّٰهِ ۙ لَا یَشْتَرُوْنَ بِاٰیٰتِ اللّٰهِ ثَمَنًا قَلِیْلًا ؕ اُولٰٓئِكَ لَهُمْ اَجْرُهُمْ عِنْدَ رَبِّهِمْ ؕ اِنَّ اللّٰهَ سَرِیْعُ الْحِسَابِ
“আর আহলে কিতাবদের মধ্যে কেউ কেউ এমনও রয়েছে, যারা আল্লাহর উপর ঈমান আনে এবং যা কিছু তোমার উপর অবতীর্ণ হয় আর যা কিছু তাদের উপর অবতীর্ণ হয়েছে সেগুলোর উপর, আল্লাহর সামনে বিনয়াবনত থাকে এবং আল্লার আয়াতসমূহকে স্বল্পমুল্যের বিনিময়ে সওদা করে না, তারাই হলো সে লোক যাদের জন্য পারিশ্রমিক রয়েছে তাদের পালনকর্তার নিকট। নিশ্চয়ই আল্লাহ যথাশীঘ্র হিসাব চুকিয়ে দেন।” (সূরাহ আলে ইমরান, ৩:১৯৯)
وَ مِنْ قَبْلِہٖ كِتٰبُ مُوْسٰۤی اِمَامًا وَّ رَحْمَۃً ؕ وَ هٰذَا كِتٰبٌ مُّصَدِّقٌ لِّسَانًا عَرَبِیًّا لِّیُنْذِرَ الَّذِیْنَ ظَلَمُوْا ٭ۖ وَ بُشْرٰی لِلْمُحْسِنِیْنَ
”এর আগে মূসার কিতাব ছিল পথপ্রদর্শক ও রহমতস্বরূপ। আর এই কিতাব (কুরআন) তার সমর্থক আরবী ভাষায়, যাতে যালেমদেরকে সতর্ক করে এবং সৎকর্মপরায়ণদেরকে সুসংবাদ দেয়।” (সূরাহ আল আহক্বাফ, ৪৬:১২)
يٰۤاَيُّهَا الَّذِيْنَ اُوْتُوْا الْكِتٰبَ اٰمِنُوْا بِمَا نَزَّلْنَا مُصَدِّقًا لِّمَا مَعَكُمْ مِّنْ قَبْلِ
“হে আসমানী গ্রন্থের অধিকারীবৃন্দ! যা কিছু আমি অবতীর্ণ করেছি তার উপর বিশ্বাস স্থাপন কর, যা সে গ্রন্থের সত্যায়ন করে এবং যা তোমাদের নিকট রয়েছে পূর্ব থেকে…।” (সূরাহ আন–নিসা, ৪:৪৭)
یَسْـَٔلُكَ اَهْلُ الْكِتٰبِ اَنْ تُنَزِّلَ عَلَیْهِمْ كِتٰبًا مِّنَ السَّمَآءِ فَقَدْ سَاَلُوْا مُوْسٰۤی اَکْبَرَ مِنْ ذٰلِكَ فَقَالُوْۤا اَرِنَا اللّٰهَ جَہْرَۃً فَاَخَذَتْهُمُ الصّٰعِقَۃُ بِظُلْمِهِمْ ۚ ثُمَّ اتَّخَذُوا الْعِجْلَ مِنْۢ بَعْدِ مَا جَآءَتْهُمُ الْبَیِّنٰتُ فَعَفَوْنَا عَنْ ذٰلِكَ ۚ وَاٰتَیْنَا مُوْسٰی سُلْطٰنًا مُّبِیْنًا
“আপনার নিকট আহলে–কিতাবরা আবেদন জানায় যে, আপনি তাদের উপর আসমান থেকে লিখিত কিতাব অবতীর্ণ করিয়ে নিয়ে আসুন। বস্তুত এরা মূসার কাছে এর চেয়েও বড় জিনিস চেয়েছে। বলেছে, একেবারে সামনাসামনিভাবে আমাদের আল্লাহকে দেখিয়ে দাও। অতএব, তাদের উপর বজ্রপাত হয়েছে তাদের পাপের দরুন; অতঃপর তাদের নিকট সুস্পষ্ট প্রমাণ–নিদর্শন প্রকাশিত হবার পরেও তারা গো–বৎসকে উপাস্যরূপে গ্রহণ করেছিল; তাও আমি ক্ষমা করে দিয়েছিলাম এবং আমি মূসাকে প্রকৃষ্ট প্রভাব দান করেছিলাম।” (সূরাহ আন–নিসা, ৪:১৫৩)
اِنَّاۤ اَنْزَلْنَا التَّوْرٰىۃَ فِیْهَا هُدًی وَّ نُوْرٌ ۚ یَحْکُمُ بِهَا النَّبِیُّوْنَ الَّذِیْنَ اَسْلَمُوْا لِلَّذِیْنَ هَادُوْا وَ الرَّبّٰنِیُّوْنَ وَ الْاَحْبَارُ بِمَا اسْتُحْفِظُوْا مِنْ كِتٰبِ اللّٰهِ وَ كَانُوْا عَلَیْهِ شُهَدَآءَ ۚ فَلَا تَخْشَوُا النَّاسَ وَ اخْشَوْنِ وَ لَا تَشْتَرُوْا بِاٰیٰتِیْ ثَمَنًا قَلِیْلًا ؕ وَ مَنْ لَّمْ یَحْکُمْ بِمَاۤ اَنْزَلَ اللّٰهُ فَاُولٰٓئِكَ هُمُ الْکٰفِرُوْنَ
“আমি তওরাত অবতীর্ণ করেছি। এতে হেদায়াত ও আলো রয়েছে। আল্লাহর আজ্ঞাবহ পয়গম্বর, দরবেশ ও আলেমরা এর মাধ্যমে ইহুদীদেরকে ফয়সালা দিতেন। কেননা, তাদেরকে এ খোদায়ী গ্রন্থের দেখাশোনা করার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল এবং তাঁরা এর রক্ষণাবেক্ষণে নিযুক্ত ছিলেন। …” (সূরাহ মায়েদা, ৫:৪৪)
وَ قَفَّیْنَا عَلٰۤی اٰثَارِهِمْ بِعِیْسَی ابْنِ مَرْیَمَ مُصَدِّقًا لِّمَا بَیْنَ یَدَیْهِ مِنَ التَّوْرٰىۃِ ۪ وَ اٰتَیْنٰهُ الْاِنْجِیْلَ فِیْهِ هُدًی وَّنُوْرٌ ۙ وَّ مُصَدِّقًا لِّمَا بَیْنَ یَدَیْهِ مِنَ التَّوْرٰىۃِ وَ هُدًی وَّ مَوْعِظَۃً لِّلْمُتَّقِیْنَ
“আমি তাদের পেছনে মরিয়ম তনয় ঈসাকে প্রেরণ করেছি। তিনি পূর্ববর্তী গ্রন্থ তওরাতের সত্যায়নকারী ছিলেন। আমি তাঁকে ইঞ্জিল প্রদান করেছি। এতে হেদায়াত ও আলো রয়েছে। এটি পূর্ববর্তী গ্রন্থ তওরাতের সত্যায়ন করে পথ প্রদর্শন করে এবং এটি খোদাভীরুদের জন্যে হেদায়েত উপদেশ বাণী।” (সূরাহ মায়েদা, ৫:৪৬)