এ অধ্যায়ের বিষয়সমূহ
Toggleআল্লাহ্ তায়ালার দৃষ্টিতে মুসলমানের বন্ধু ও শত্রু
ইসলামের সূচনা লগ্নেই থেকেই মুশরেক ও কাফেরদের প্রচন্ড ধর্মীয় বিদ্বেষ ও শত্রুতা আর মুনাফেকদের বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হচ্ছে মুসলিম জনগোষ্ঠী। এ ধারা আজ অবধি বিদ্যমান। বর্তমান বিশ্বে এর প্রকৃষ্ট প্রমাণস্বরূপ উল্লেখ করা যায় ফিলিস্তিন, ভারত, চীন, মায়ানমার, বসনিয়ার মুসলিম নির্যাতন ও গণহত্যার ঘটনাসমূহ। বিভিন্নমুখী আগ্রাসন থেকে বেঁচে থাকার জন্য ইসলামের শত্রু–মিত্র চিহ্নিত করা খুবই জরুরী। তাই পবিত্র কুরআনে আল্লাহ্ তায়ালা এ বিষয়টির ওপর সমধিক গুরুত্ব আরোপ করেছেন।
আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন মহাজ্ঞানী – তিনি মানুষর অন্তরের খবর সম্যক জ্ঞাত। তিনি ভালো করেই জানেন কে মুসলমানদের মিত্র আর কে শত্রু। তাই এ ব্যাপারে মুসলমানগণকে বারংবার সাবধান করে বিভিন্ন আয়াত নাযিল করেছেন। মহান আল্লাহ্ পাকের এ সাবধানবাণী যে কত সত্য তা ইতিহাসই বলে দিচ্ছে। এ সত্য শুধু অতীতেই নয়, বর্তমান বিশ্বেও তা প্রতিভাত হচ্ছে।
এর মূল কারণ হলো, মুসলমানগণ এক ও অদ্বিতীয় আল্লাহ্ ছাড়া অন্য কারো আনুগত্য ও উপাসনা করেনা এবং অন্য কারো দাসত্বও মেনে নেয়না। তাই অমুসলিম দেশগুলোতে যেমন চলছে মুসলিম সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর অমানবিক নির্যাতন ও নিধন তেমনি মুসলিম দেশগুলোতেও ইসলামের শত্রুরা চালাচ্ছে বিধ্বংসী আগ্রাসন।
এতদসংক্রান্ত কিছু আয়াত এখানে বর্ণিত হলো:
یٰۤاَیُّهَا الَّذِیْنَ اٰمَنُوْا لَا تَتَّخِذُوْا بِطَانَۃً مِّنْ دُوْنِکُمْ لَا یَاْلُوْنَکُمْ خَبَالًا ؕ وَدُّوْا مَا عَنِتُّمْ ۚ قَدْ بَدَتِ الْبَغْضَآءُ مِنْ اَفْوَاهِهِمْ ۚۖ وَ مَا تُخْفِیْ صُدُوْرُهُمْ اَکْبَرُ ؕ قَدْ بَیَّنَّا لَکُمُ الْاٰیٰتِ اِنْ کُنْتُمْ تَعْقِلُوْنَ هٰۤاَنْتُمْ اُولَآءِ تُحِبُّوْنَهُمْ وَ لَا یُحِبُّوْنَکُمْ وَ تُؤْمِنُوْنَ بِالْكِتٰبِ کُلِّہٖ ۚ وَ اِذَا لَقُوْکُمْ قَالُوْۤا اٰمَنَّا ۚ٭ۖ وَ اِذَا خَلَوْا عَضُّوْا عَلَیْکُمُ الْاَنَامِلَ مِنَ الْغَیْظِ ؕ قُلْ مُوْتُوْا بِغَیْظِکُمْ ؕ اِنَّ اللّٰهَ عَلِیْمٌۢ بِذَاتِ الصُّدُوْرِ اِنْ تَمْسَسْکُمْ حَسَنَۃٌ تَسُؤْهُمْ ۫ وَ اِنْ تُصِبْکُمْ سَیِّئَۃٌ یَّفْرَحُوْا بِهَا ؕ وَ اِنْ تَصْبِرُوْا وَ تَتَّقُوْا لَا یَضُرُّکُمْ كَیْدُهُمْ شَیْـًٔا ؕ اِنَّ اللّٰهَ بِمَا یَعْمَلُوْنَ مُحِیْطٌ
“হে ঈমানদারগণ! তোমরা মু’মিন ব্যতীত অন্য কাউকে অন্তরঙ্গরূপে গ্রহণ করো না, তারা তোমাদের অমঙ্গল সাধনে কোন ত্রুটি করে না– তোমরা কষ্টে থাক, তাতেই তাদের আনন্দ। শত্রুতাপ্রসূত বিদ্বেষ তাদের মুখেই ফুটে বেরোয়। আর যা কিছু তাদের মনে লুকিয়ে রয়েছে, তা আরো অনেকগুণ বেশী জঘন্য। তোমাদের জন্যে নিদর্শন বিশদভাবে বর্ণনা করে দেয়া হলো, যদি তোমরা তা অনুধাবন করতে সমর্থ হও। দেখ! তোমরাই তাদের ভালবাস, কিন্তু তারা তোমাদের প্রতি মোটেও সদ্ভাব পোষণ করে না। আর তোমরা সমস্ত কিতাবেই বিশ্বাস কর। অথচ তারা যখন তোমাদের সাথে এসে মিশে, বলে, আমরা ঈমান এনেছি। পক্ষান্তরে তারা যখন পৃথক হয়ে যায়, তখন তোমাদের উপর রোষবশত আঙ্গুল কামড়াতে থাকে। বলুন, তোমরা আক্রোশে মরতে থাক। আর আল্লাহ মনের কথা ভালই জানেন। তোমাদের যদি কোন মঙ্গল হয়; তাহলে তাদের খারাপ লাগে। আর তোমাদের যদি অমঙ্গল হয় তাহলে আনন্দিত হয় আর তাতে যদি তোমরা ধৈর্য্যধারণ কর এবং তাকওয়া অবলম্বন কর, তবে তাদের প্রতারণায় তোমাদের কোনই ক্ষতি হবে না। নিশ্চয়ই তারা যা কিছু করে সে সমস্তই আল্লাহর আয়ত্তে রয়েছে।” (সূরাহ আলে ইমরান, ৩:১১৮–১২০)
یٰۤاَیُّهَا الَّذِیْنَ اٰمَنُوْۤا اِنْ تُطِیْعُوا الَّذِیْنَ كَفَرُوْا یَرُدُّوْکُمْ عَلٰۤی اَعْقَابِکُمْ فَتَنْقَلِبُوْا خٰسِرِیْنَ بَلِ اللّٰهُ مَوْلٰىکُمْ ۚ وَ هُوَ خَیْرُ النّٰصِرِیْنَ
“হে ঈমানদারগণ! তোমরা যদি কাফেরদের কথা শুন, তাহলে ওরা তোমাদেরকে পেছনে ফিরিয়ে দেবে, তাতে তোমরা ক্ষতির সম্মুখীন হয়ে পড়বে। বরং আল্লাহ তোমাদের সাহায্যকারী, আর তাঁর সাহায্যই হচ্ছে উত্তম সাহায্য।” (সূরাহ আলে ইমরান, ৩:১৪৯–১৫০)
یٰۤاَیُّهَا الَّذِیْنَ اٰمَنُوْۤا اِنْ تُطِیْعُوْا فَرِیْقًا مِّنَ الَّذِیْنَ اُوْتُوا الْكِتٰبَ یَرُدُّوْکُمْ بَعْدَ اِیْمَانِکُمْ کٰفِرِیْنَ وَ كَیْفَ تَکْفُرُوْنَ وَ اَنْتُمْ تُتْلٰی عَلَیْکُمْ اٰیٰتُ اللّٰهِ وَ فِیْکُمْ رَسُوْلُہٗ ؕ وَ مَنْ یَّعْتَصِمْ بِاللّٰهِ فَقَدْ هُدِیَ اِلٰی صِرَاطٍ مُّسْتَقِیْمٍ
“হে ঈমানদারগণ! তোমরা যদি আহলে কিতাবদের কোন ফেরকার কথা মান, তাহলে ঈমান আনার পর তারা তোমাদিগকে কাফেরে পরিণত করে দেবে। আর তোমরা কেমন করে কাফের হতে পার, অথচ তোমাদের সামনে পাঠ করা হয় আল্লাহর আয়াতসমূহ এবং তোমাদের মধ্যে রয়েছেন আল্লাহর রাসূল। আর যারা আল্লাহর কথা দৃঢ়ভাবে ধরবে, তারা হেদায়েত প্রাপ্ত হবে সরল পথের।” (সূরাহ আলে ইমরান, ৩:১০০–১০১)
یٰۤاَیُّهَا الَّذِیْنَ اٰمَنُوْا لَا تَتَّخِذُوا الْیَهُوْدَ وَ النَّصٰرٰۤی اَوْلِیَآءَ ۘؔ بَعْضُهُمْ اَوْلِیَآءُ بَعْضٍ ؕ وَ مَنْ یَّتَوَلَّهُمْ مِّنْکُمْ فَاِنَّہٗ مِنْهُمْ ؕ اِنَّ اللّٰهَ لَا یَہْدِی الْقَوْمَ الظّٰلِمِیْنَ
“হে মুমিণগণ! তোমরা ইহুদী ও খ্রীষ্টানদেরকে বন্ধু হিসাবে গ্রহণ করো না। তারা একে অপরের বন্ধু। তোমাদের মধ্যে যে তাদের সাথে বন্ধুত্ব করবে, সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ জালেমদেরকে পথ প্রদর্শন করেন না।” (সূরাহ মায়েদাহ, ৫:৫১)
اِنَّمَا وَلِیُّکُمُ اللّٰهُ وَ رَسُوْلُہٗ وَ الَّذِیْنَ اٰمَنُوا الَّذِیْنَ یُقِیْمُوْنَ الصَّلٰوۃَ وَ یُؤْتُوْنَ الزَّکٰوۃَ وَ هُمْ رٰكِعُوْنَ وَ مَنْ یَّتَوَلَّ اللّٰهَ وَ رَسُوْلَہٗ وَ الَّذِیْنَ اٰمَنُوْا فَاِنَّ حِزْبَ اللّٰهِ هُمُ الْغٰلِبُوْنَ یٰۤاَیُّهَا الَّذِیْنَ اٰمَنُوْا لَا تَتَّخِذُوا الَّذِیْنَ اتَّخَذُوْا دِیْنَکُمْ هُزُوًا وَّ لَعِبًا مِّنَ الَّذِیْنَ اُوْتُوا الْكِتٰبَ مِنْ قَبْلِکُمْ وَ الْکُفَّارَ اَوْلِیَآءَ ۚ وَ اتَّقُوا اللّٰهَ اِنْ کُنْتُمْ مُّؤْمِنِیْنَ وَ اِذَا نَادَیْتُمْ اِلَی الصَّلٰوۃِ اتَّخَذُوْهَا هُزُوًا وَّ لَعِبًا ؕ ذٰلِكَ بِاَنَّهُمْ قَوْمٌ لَّا یَعْقِلُوْنَ
“তোমাদের বন্ধু তো আল্লাহ তাঁর রাসূল এবং মু’মিনবৃন্দ – যারা নামায কায়েম করে, যাকাত দেয় এবং বিনম্র। আর যারা আল্লাহ তাঁর রাসূল এবং বিশ্বাসীদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করে, তারাই আল্লাহর দল এবং তারাই বিজয়ী। হে মু’মিনগণ, আহলে–কিতাবদের মধ্য থেকে যারা তোমাদের ধর্মকে উপহাস ও খেলা মনে করে, তাদেরকে এবং অন্যান্য কাফেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না। আল্লাহকে ভয় কর, যদি তোমরা ঈমানদার হও। আর যখন তোমরা নামাযের জন্যে আহ্বান কর, তখন তারা একে উপহাস ও খেলা বলে মনে করে। কারণ, তারা নির্বোধ।” (সূরাহ মায়েদাহ, ৫:৫৫–৫৮)
لَتَجِدَنَّ اَشَدَّ النَّاسِ عَدَاوَۃً لِّلَّذِیْنَ اٰمَنُوا الْیَهُوْدَ وَ الَّذِیْنَ اَشْرَکُوْا ۚ وَ لَتَجِدَنَّ اَقْرَبَهُمْ مَّوَدَّۃً لِّلَّذِیْنَ اٰمَنُوا الَّذِیْنَ قَالُوْۤا اِنَّا نَصٰرٰی ؕ ذٰلِكَ بِاَنَّ مِنْهُمْ قِسِّیْسِیْنَ وَ رُهْبَانًا وَّ اَنَّهُمْ لَا یَسْتَکْبِرُوْنَ
“আপনি সব মানুষের চাইতে মুসলমানদের অধিক শত্রু ইহুদী ও মুশরেকদেরকে পাবেন এবং আপনি সবার চাইতে মুসলমানদের সাথে বন্ধুত্বে অধিক নিকটবর্তী তাদেরকে পাবেন, যারা নিজেদেরকে খ্রীষ্টান বলে। এর কারণ এই যে, খ্রীষ্টানদের মধ্যে আলেম রয়েছে, দরবেশ রয়েছে এবং তারা অহঙ্কার করে না।” (সূরাহ মায়েদাহ, ৫:৮২)
یٰۤاَیُّهَا الَّذِیْنَ اٰمَنُوْا لَا تَتَّخِذُوْا عَدُوِّیْ وَ عَدُوَّکُمْ اَوْلِیَآءَ تُلْقُوْنَ اِلَیْهِمْ بِالْمَوَدَّۃِ وَ قَدْ كَفَرُوْا بِمَا جَآءَکُمْ مِّنَ الْحَقِّ ۚ یُخْرِجُوْنَ الرَّسُوْلَ وَ اِیَّاکُمْ اَنْ تُؤْمِنُوْا بِاللّٰهِ رَبِّکُمْ ؕ اِنْ کُنْتُمْ خَرَجْتُمْ جِهَادًا فِیْ سَبِیْلِیْ وَ ابْتِغَآءَ مَرْضَاتِیْ ٭ۖ تُسِرُّوْنَ اِلَیْهِمْ بِالْمَوَدَّۃِ ٭ۖ وَ اَنَا اَعْلَمُ بِمَاۤ اَخْفَیْتُمْ وَ مَاۤ اَعْلَنْتُمْ ؕ وَ مَنْ یَّفْعَلْهُ مِنْکُمْ فَقَدْ ضَلَّ سَوَآءَ السَّبِیْلِ اِنْ یَّثْقَفُوْکُمْ یَکُوْنُوْا لَکُمْ اَعْدَآءً وَّ یَبْسُطُوْۤا اِلَیْکُمْ اَیْدِیَهُمْ وَ اَلْسِنَتَهُمْ بِالسُّوْٓءِ وَ وَدُّوْا لَوْ تَکْفُرُوْنَ
“মু’মিনগণ, তোমরা আমার ও তোমাদের শত্রুদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না। তোমরা তো তাদের প্রতি বন্ধুত্বের বার্তা পাঠাও, অথচ তারা যে সত্য তোমাদের কাছে আগমন করেছে, তা অস্বীকার করছে। তারা রাসূলকে ও তোমাদেরকে বহিষ্কার করে এই অপরাধে যে, তোমরা তোমাদের পালনকর্তার প্রতি বিশ্বাস রাখ। যদি তোমরা আমার সন্তুষ্টিলাভের জন্যে এবং আমার পথে জেহাদ করার জন্যে বের হয়ে থাক, তবে কেন তাদের প্রতি গোপনে বন্ধুত্বের পয়গাম প্রেরণ করছ? তোমরা যা গোপন কর এবং যা প্রকাশ কর, তা আমি খুব জানি। তোমাদের মধ্যে যে এটা করে, সে সরলপথ থেকে বিচ্যুত হয়ে যায়। তোমাদেরকে করতলগত করতে পারলে তারা তোমাদের শত্রু হয়ে যাবে এবং মন্দ উদ্দেশ্যে তোমাদের প্রতি বাহু ও রসনা প্রসারিত করবে এবং চাইবে যে, কোনরূপে তোমরা ও কাফের হয়ে যাও।” (সূরাহ মুমতাহিনা, ৬০:১–২)
لَا یَتَّخِذِ الْمُؤْمِنُوْنَ الْکٰفِرِیْنَ اَوْلِیَآءَ مِنْ دُوْنِ الْمُؤْمِنِیْنَ ۚ وَ مَنْ یَّفْعَلْ ذٰلِكَ فَلَیْسَ مِنَ اللّٰهِ فِیْ شَیْءٍ اِلَّاۤ اَنْ تَتَّقُوْا مِنْهُمْ تُقٰىۃً ؕ وَ یُحَذِّرُکُمُ اللّٰهُ نَفْسَہٗ ؕ وَ اِلَی اللّٰهِ الْمَصِیْرُ
“মু’মিনগন যেন অন্য মু’মিনকে ছেড়ে কোন কাফেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ না করে। যারা এরূপ করবে আল্লাহর সাথে তাদের কোন সম্পর্ক থাকবে না। তবে যদি তোমরা তাদের পক্ষ থেকে কোন অনিষ্টের আশঙ্কা কর, তবে তাদের সাথে সাবধানতার সাথে থাকবে, আল্লাহ তা’আলা তাঁর সম্পর্কে তোমাদের সতর্ক করেছেন। এবং সবাই কে তাঁর কাছে ফিরে যেতে হবে।” (সূরাহ আলে ইমরান, ৩:২৮)
اِنَّمَا وَلِیُّکُمُ اللّٰهُ وَ رَسُوْلُہٗ وَ الَّذِیْنَ اٰمَنُوا الَّذِیْنَ یُقِیْمُوْنَ الصَّلٰوۃَ وَ یُؤْتُوْنَ الزَّکٰوۃَ وَ هُمْ رٰكِعُوْنَ وَ مَنْ یَّتَوَلَّ اللّٰهَ وَ رَسُوْلَہٗ وَ الَّذِیْنَ اٰمَنُوْا فَاِنَّ حِزْبَ اللّٰهِ هُمُ الْغٰلِبُوْنَ
“তোমাদের বন্ধু তো আল্লাহ তাঁর রাসূল এবং মু’মিনবৃন্দ –যারা নামায কায়েম করে, যাকাত দেয় এবং বিনম্র। আর যারা আল্লাহ তাঁর রাসূল এবং বিশ্বাসীদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করে, তারাই আল্লাহর দল এবং তারাই বিজয়ী।” (সূরাহ মায়েদাহ, ৫:৫৫–৫৬)
یٰۤاَیُّهَا الَّذِیْنَ اٰمَنُوْا لَا تَتَوَلَّوْا قَوْمًا غَضِبَ اللّٰهُ عَلَیْهِمْ قَدْ یَئِسُوْا مِنَ الْاٰخِرَۃِ كَمَا یَئِسَ الْکُفَّارُ مِنْ اَصْحٰبِ الْقُبُوْرِ
“মু’মিনগণ, আল্লাহ যে জাতির প্রতি রুষ্ট, তোমরা তাদের সাথে বন্ধুত্ব করো না। তারা পরকাল সম্পর্কে নিরাশ হয়ে গেছে যেমন কবরস্থ কাফেররা নিরাশ হয়ে গেছে।” (সূরাহ মুমতাহিনা, ৬০:১৩)
اَلَمْ تَرَ اِلَی الَّذِیْنَ تَوَلَّوْا قَوْمًا غَضِبَ اللّٰهُ عَلَیْهِمْ ؕ مَا هُمْ مِّنْکُمْ وَ لَا مِنْهُمْ ۙ وَ یَحْلِفُوْنَ عَلَی الْكَذِبِ وَ هُمْ یَعْلَمُوْنَ اَعَدَّ اللّٰهُ لَهُمْ عَذَابًا شَدِیْدًا ؕ اِنَّهُمْ سَآءَ مَا كَانُوْا یَعْمَلُوْنَ
“আপনি কি তাদের প্রতি লক্ষ্য করেননি, যারা আল্লাহর গযবে নিপতিত সম্প্রদায়ের সাথে বন্ধুত্ব করে? তারা মুসলমানদের দলভুক্ত নয় এবং তাদেরও দলভুক্ত নয়। তারা জেনেশুনে মিথ্যা বিষয়ে শপথ করে। আল্লাহ তাদের জন্যে কঠোর শাস্তি প্রস্তুত রেখেছেন। নিশ্চয় তারা যা করে, খুবই মন্দ।” (সূরাহ মুজাদালাহ, ৫৮:১৪–১৫)
عَسَی اللّٰهُ اَنْ یَّجْعَلَ بَیْنَکُمْ وَ بَیْنَ الَّذِیْنَ عَادَیْتُمْ مِّنْهُمْ مَّوَدَّۃً ؕ وَ اللّٰهُ قَدِیْرٌ ؕ وَ اللّٰهُ غَفُوْرٌ رَّحِیْمٌ لَا یَنْهٰىکُمُ اللّٰهُ عَنِ الَّذِیْنَ لَمْ یُقَاتِلُوْکُمْ فِی الدِّیْنِ وَ لَمْ یُخْرِجُوْکُمْ مِّنْ دِیَارِکُمْ اَنْ تَبَرُّوْهُمْ وَ تُقْسِطُوْۤا اِلَیْهِمْ ؕ اِنَّ اللّٰهَ یُحِبُّ الْمُقْسِطِیْنَ
“যারা তোমাদের দুশমন আল্লাহ তাদের মধ্যে ও তোমাদের মধ্যে সম্ভবতঃ বন্ধুত্ব সৃষ্টি করে দেবেন। আল্লাহ সবই করতে পারেন এবং আল্লাহ ক্ষমাশীল, করুণাময়। ধর্মের ব্যাপারে যারা তোমাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেনি এবং তোমাদেরকে দেশ থেকে বহিষ্কৃত করেনি, তাদের প্রতি সদাচরণ ও ইনসাফ করতে আল্লাহ তোমাদেরকে নিষেধ করেন না। নিশ্চয় আল্লাহ ইনসাফকারীদেরকে ভালবাসেন।” (সূরাহ মুমতাহিনা, ৬০:৭–৮)
اِنَّمَا یَنْهٰىکُمُ اللّٰهُ عَنِ الَّذِیْنَ قٰتَلُوْکُمْ فِی الدِّیْنِ وَ اَخْرَجُوْکُمْ مِّنْ دِیَارِکُمْ وَ ظٰهَرُوْا عَلٰۤی اِخْرَاجِکُمْ اَنْ تَوَلَّوْهُمْ ۚ وَ مَنْ یَّتَوَلَّهُمْ فَاُولٰٓئِكَ هُمُ الظّٰلِمُوْنَ
“আল্লাহ কেবল তাদের সাথে বন্ধুত্ব করতে নিষেধ করেন, যারা ধর্মের ব্যাপারে তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে, তোমাদেরকে দেশ থেকে বহিষ্কৃত করেছে এবং বহিষ্কারকার্যে সহায়তা করেছে। যারা তাদের সাথে বন্ধুত্ব করে তারাই যালেম।” (সূরাহ মুমতাহিনা, ৬০:৯)
الَّذِیْنَ یَتَّخِذُوْنَ الْکٰفِرِیْنَ اَوْلِیَآءَ مِنْ دُوْنِ الْمُؤْمِنِیْنَ ؕ اَیَبْتَغُوْنَ عِنْدَهُمُ الْعِزَّۃَ فَاِنَّ الْعِزَّۃَ لِلّٰهِ جَمِیْعًا وَ قَدْ نَزَّلَ عَلَیْکُمْ فِی الْكِتٰبِ اَنْ اِذَا سَمِعْتُمْ اٰیٰتِ اللّٰهِ یُکْفَرُ بِهَا وَ یُسْتَہْزَاُ بِهَا فَلَا تَقْعُدُوْا مَعَهُمْ حَتّٰی یَخُوْضُوْا فِیْ حَدِیْثٍ غَیْرِہٖۤ ۫ۖ اِنَّکُمْ اِذًا مِّثْلُهُمْ ؕ اِنَّ اللّٰهَ جَامِعُ الْمُنٰفِقِیْنَ وَ الْکٰفِرِیْنَ فِیْ جَهَنَّمَ جَمِیْعَۨا الَّذِیْنَ یَتَرَبَّصُوْنَ بِکُمْ ۚ فَاِنْ كَانَ لَکُمْ فَتْحٌ مِّنَ اللّٰهِ قَالُوْۤا اَلَمْ نَکُنْ مَّعَکُمْ ۫ۖ وَ اِنْ كَانَ لِلْکٰفِرِیْنَ نَصِیْبٌ ۙ قَالُوْۤا اَلَمْ نَسْتَحْوِذْ عَلَیْکُمْ وَ نَمْنَعْکُمْ مِّنَ الْمُؤْمِنِیْنَ ؕ فَاللّٰهُ یَحْکُمُ بَیْنَکُمْ یَوْمَ الْقِیٰمَۃِ ؕ وَ لَنْ یَّجْعَلَ اللّٰهُ لِلْکٰفِرِیْنَ عَلَی الْمُؤْمِنِیْنَ سَبِیْلًا
“যারা মুসলমানদের বর্জন করে কাফেরদেরকে নিজেদের বন্ধু বানিয়ে নেয় এবং তাদেরই কাছে সম্মান প্রত্যাশা করে, অথচ যাবতীয় সম্মান শুধুমাত্র আল্লাহরই জন্য। আর কুরআনের মাধ্যমে তোমাদের প্রতি এই হুকুম জারি করে দিয়েছেন যে, যখন আল্লাহ তা’আলার আয়াতসমূহের প্রতি অস্বীকৃতি জ্ঞাপন ও বিদ্রূপ হতে শুনবে, তখন তোমরা তাদের সাথে বসবে না, যতক্ষণ না তারা প্রসঙ্গান্তরে চলে যায়। তা না হলে তোমরাও তাদেরই মত হয়ে যাবে। আল্লাহ দোযখের মাঝে মুনাফেক ও কাফেরদেরকে একই জায়গায় সমবেত করবেন। এরা এমনি মুনাফেক যারা তোমাদের কল্যাণ-অকল্যাণের প্রতীক্ষায় ওত পেতে থাকে। অতঃপর আল্লাহর ইচ্ছায় তোমাদের যদি কোন বিজয় অর্জিত হয়, তবে তারা বলে, আমরাও কি তোমাদের সাথে ছিলাম না? পক্ষান্তরে কাফেরদের যদি আংশিক বিজয় হয়, তবে বলে, আমরা কি তোমাদেরকে ঘিরে রাখিনি এবং মুসলমানদের কবল থেকে রক্ষা করিনি? সুতরাং আল্লাহ তোমাদের মধ্যে কেয়ামতের দিন মীমাংসা করবেন এবং কিছুতেই আল্লাহ কাফেরদেরকে মুসলমানদের উপর বিজয় দান করবেন না।” (সূরাহ নিসা, ৪:১৩৯–১৪১)
اَمْ حَسِبْتُمْ اَنْ تُتْرَکُوْا وَ لَمَّا یَعْلَمِ اللّٰهُ الَّذِیْنَ جٰهَدُوْا مِنْکُمْ وَ لَمْ یَتَّخِذُوْا مِنْ دُوْنِ اللّٰهِ وَ لَا رَسُوْلِہٖ وَ لَا الْمُؤْمِنِیْنَ وَلِیْجَۃً ؕ وَ اللّٰهُ خَبِیْرٌۢ بِمَا تَعْمَلُوْنَ
“তোমরা কি মনে কর যে, তোমাদের ছেড়ে দেয়া হবে এমনি, যতক্ষণ না আল্লাহ জেনে নেবেন তোমাদের কে যুদ্ধ করেছে এবং কে আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও মুসলমানদের ব্যতীত অন্য কাউকে অন্তরঙ্গ বন্ধুরূপে গ্রহণ করা থেকে বিরত রয়েছে। আর তোমরা যা কর সে বিষয়ে আল্লাহ সবিশেষ অবহিত।” (সূরাহ তাওবা, ৯:১৬)
اَلَاۤ اِنَّ اَوْلِیَآءَ اللّٰهِ لَا خَوْفٌ عَلَیْهِمْ وَ لَا هُمْ یَحْزَنُوْنَ الَّذِیْنَ اٰمَنُوْا وَ كَانُوْا یَتَّقُوْنَ لَهُمُ الْبُشْرٰی فِی الْحَیٰوۃِ الدُّنْیَا وَ فِی الْاٰخِرَۃِ ؕ لَا تَبْدِیْلَ لِكَلِمٰتِ اللّٰهِ ؕ ذٰلِكَ هُوَ الْفَوْزُ الْعَظِیْمُ
“মনে রেখো যারা আল্লাহর বন্ধু, তাদের না কোন ভয় ভীতি আছে, না তারা চিন্তান্বিত হবে। যারা ঈমান এনেছে এবং ভয় করতে রয়েছে। তাদের জন্য সুসংবাদ পার্থিব জীবনে ও পরকালীন জীবনে। আল্লাহর কথার কখনো হের-ফের হয় না। এটাই হল মহাসফলতা।” (সূরাহ ইউনূস, ১০:৬২–৬৪)
لَا تَجِدُ قَوْمًا یُّؤْمِنُوْنَ بِاللّٰهِ وَ الْیَوْمِ الْاٰخِرِ یُوَآدُّوْنَ مَنْ حَآدَّ اللّٰهَ وَ رَسُوْلَہٗ وَ لَوْ كَانُوْۤا اٰبَآءَهُمْ اَوْ اَبْنَآءَهُمْ اَوْ اِخْوَانَهُمْ اَوْ عَشِیْرَتَهُمْ ؕ اُولٰٓئِكَ كَتَبَ فِیْ قُلُوْبِهِمُ الْاِیْمَانَ وَ اَیَّدَهُمْ بِرُوْحٍ مِّنْهُ ؕ وَ یُدْخِلُهُمْ جَنّٰتٍ تَجْرِیْ مِنْ تَحْتِهَا الْاَنْهٰرُ خٰلِدِیْنَ فِیْهَا ؕ رَضِیَ اللّٰهُ عَنْهُمْ وَ رَضُوْا عَنْهُ ؕ اُولٰٓئِكَ حِزْبُ اللّٰهِ ؕ اَلَاۤ اِنَّ حِزْبَ اللّٰهِ هُمُ الْمُفْلِحُوْنَ
“যারা আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস করে, তাদেরকে আপনি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধাচরণকারীদের সাথে বন্ধুত্ব করতে দেখবেন না, যদিও তারা তাদের পিতা, পুত্র, ভ্রাতা অথবা জ্ঞাতি–গোষ্ঠী হয়। তাদের অন্তরে আল্লাহ ঈমান লিখে দিয়েছেন এবং তাদেরকে শক্তিশালী করেছেন তাঁর অদৃশ্য শক্তি দ্বারা। তিনি তাদেরকে জান্নাতে দাখিল করবেন, যার তলদেশে নদী প্রবাহিত। তারা তথায় চিরকাল থাকবে। আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট এবং তারা আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট। তারাই আল্লাহর দল। জেনে রাখ, আল্লাহর দলই সফলকাম হবে।” (সূরাহ মুজাদালাহ, ৫৮:২২)
اَلَمْ تَرَ اِلَی الَّذِیْنَ اُوْتُوْا نَصِیْبًا مِّنَ الْكِتٰبِ یَشْتَرُوْنَ الضَّلٰلَۃَ وَ یُرِیْدُوْنَ اَنْ تَضِلُّوا السَّبِیْلَ وَ اللّٰهُ اَعْلَمُ بِاَعْدَآئِکُمْ ؕ وَ كَفٰی بِاللّٰهِ وَلِیًّا ٭۫ وَّ كَفٰی بِاللّٰهِ نَصِیْرًا
“তুমি কি ওদের দেখনি, যারা কিতাবের কিছু অংশ প্রাপ্ত হয়েছে, (অথচ) তারা পথভ্রষ্টতা খরিদ করে এবং কামনা করে, যাতে তোমরাও আল্লাহর পথ থেকে বিভ্রান্ত হয়ে যাও। অথচ আল্লাহ তোমাদের শত্রুদেরকে যথার্থই জানেন। আর অভিভাবক হিসাবে আল্লাহই যথেষ্ট এবং সাহায্যকারী হিসাবেও আল্লাহই যথেষ্ট।” (সূরাহ নিসা, ৪:৪৪–৪৫)
یٰۤاَیُّهَا الَّذِیْنَ اٰمَنُوْا لَا تَتَّخِذُوْۤا اٰبَآءَکُمْ وَ اِخْوَانَکُمْ اَوْلِیَآءَ اِنِ اسْتَحَبُّوا الْکُفْرَ عَلَی الْاِیْمَانِ ؕ وَ مَنْ یَّتَوَلَّهُمْ مِّنْکُمْ فَاُولٰٓئِكَ هُمُ الظّٰلِمُوْنَ
“হে ঈমানদারগণ! তোমরা স্বীয় পিতা ও ভাইদের অভিভাবকরূপে গ্রহণ করো না, যদি তারা ঈমান অপেক্ষা কুফরকে ভালবাসে। আর তোমাদের যারা তাদের অভিভাবকরূপে গ্রহণ করে তারা সীমালংঘনকারী।” (সূরাহ তাওবা, ৯:২৩)
وَ لَنْ تَرْضٰی عَنْكَ الْیَهُوْدُ وَ لَا النَّصٰرٰی حَتّٰی تَتَّبِعَ مِلَّتَهُمْ ؕ قُلْ اِنَّ هُدَی اللّٰهِ هُوَ الْهُدٰی ؕ وَ لَئِنِ اتَّبَعْتَ اَهْوَآءَهُمْ بَعْدَ الَّذِیْ جَآءَكَ مِنَ الْعِلْمِ ۙ مَا لَكَ مِنَ اللّٰهِ مِنْ وَّلِیٍّ وَّ لَا نَصِیْرٍ
“ইহুদী ও খ্রীষ্টানরা কখনই আপনার প্রতি সন্তুষ্ট হবে না, যে পর্যন্ত না আপনি তাদের ধর্মের অনুসরণ করেন। বলে দিন, যে পথ আল্লাহ প্রদর্শন করেন, তাই হল সরল পথ। যদি আপনি তাদের আকাঙ্খাসমূহের অনুসরণ করেন, ঐ জ্ঞান লাভের পর, যা আপনার কাছে পৌঁছেছে, তবে কেউ আল্লাহর কবল থেকে আপনার উদ্ধারকারী ও সাহায্যকারী নেই।” (সূরাহ বাক্বারাহ, ২:১২০)
یٰۤاَیُّهَا الَّذِیْنَ اٰمَنُوا اتَّقُوا اللّٰهَ حَقَّ تُقٰتِہٖ وَ لَا تَمُوْتُنَّ اِلَّا وَ اَنْتُمْ مُّسْلِمُوْنَ وَ اعْتَصِمُوْا بِحَبْلِ اللّٰهِ جَمِیْعًا وَّ لَا تَفَرَّقُوْا ۪ وَ اذْکُرُوْا نِعْمَتَ اللّٰهِ عَلَیْکُمْ اِذْ کُنْتُمْ اَعْدَآءً فَاَلَّفَ بَیْنَ قُلُوْبِکُمْ فَاَصْبَحْتُمْ بِنِعْمَتِہٖۤ اِخْوَانًا ۚ وَ کُنْتُمْ عَلٰی شَفَا حُفْرَۃٍ مِّنَ النَّارِ فَاَنْقَذَکُمْ مِّنْهَا ؕ كَذٰلِكَ یُبَیِّنُ اللّٰهُ لَکُمْ اٰیٰتِہٖ لَعَلَّکُمْ تَہْتَدُوْنَ
“হে ঈমানদারগণ! আল্লাহকে যেমন ভয় করা উচিৎ ঠিক তেমনিভাবে ভয় করতে থাক। এবং অবশ্যই মুসলমান না হয়ে মৃত্যুবরণ করো না। আর তোমরা সকলে আল্লাহর রজ্জুকে সুদৃঢ় হস্তে ধারণ কর; পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না। আর তোমরা সে নেয়ামতের কথা স্মরণ কর, যা আল্লাহ তোমাদিগকে দান করেছেন। তোমরা পরস্পর শত্রু ছিলে। অতঃপর আল্লাহ তোমাদের মনে সম্প্রীতি দান করেছেন। ফলে, এখন তোমরা তাঁর অনুগ্রহের কারণে পরস্পর ভাই ভাই হয়েছ। তোমরা এক অগ্নিকুন্ডের পাড়ে অবস্থান করছিলে। অতঃপর তা থেকে তিনি তোমাদেরকে মুক্তি দিয়েছেন। এভাবেই আল্লাহ নিজের নিদর্শনসমূহ প্রকাশ করেন, যাতে তোমরা হেদায়েত প্রাপ্ত হতে পার।” (সূরাহ আলে ইমরান, ৩:১০২–১০৩)
পবিত্র কুরআনে উল্লেখিত মহীয়সী নারীবৃন্দ:
কয়েকজন মহিয়সী নারীর কথা পবিত্র কুরআনে সরাসরি উল্লেখিত হয়েছে। নিম্নে এতদসংক্রান্ত আয়াতগুলো উদ্ধৃত করা হলো:
হযরত মরিয়ম বিনতে ইমরান (আ)
اِذْ قَالَتِ امْرَاَتُ عِمْرٰنَ رَبِّ اِنِّیْ نَذَرْتُ لَكَ مَا فِیْ بَطْنِیْ مُحَرَّرًا فَتَقَبَّلْ مِنِّیْ ۚ اِنَّكَ اَنْتَ السَّمِیْعُ الْعَلِیْمُ فَلَمَّا وَضَعَتْهَا قَالَتْ رَبِّ اِنِّیْ وَضَعْتُهَاۤ اُنْثٰی ؕ وَ اللّٰهُ اَعْلَمُ بِمَا وَضَعَتْ ؕ وَ لَیْسَ الذَّكَرُ كَالْاُنْثٰی ۚ وَ اِنِّیْ سَمَّیْتُهَا مَرْیَمَ وَ اِنِّیْۤ اُعِیْذُهَا بِكَ وَ ذُرِّیَّتَهَا مِنَ الشَّیْطٰنِ الرَّجِیْمِ فَتَقَبَّلَهَا رَبُّهَا بِقَبُوْلٍ حَسَنٍ وَّ اَنْۢبَتَهَا نَبَاتًا حَسَنًا ۙ وَّ كَفَّلَهَا زَكَرِیَّا ۚؕ کُلَّمَا دَخَلَ عَلَیْهَا زَكَرِیَّا الْمِحْرَابَ ۙ وَجَدَ عِنْدَهَا رِزْقًا ۚ قَالَ یٰمَرْیَمُ اَنّٰی لَكِ هٰذَا ؕ قَالَتْ هُوَ مِنْ عِنْدِ اللّٰهِ ؕ اِنَّ اللّٰهَ یَرْزُقُ مَنْ یَّشَآءُ بِغَیْرِ حِسَابٍ
“এমরানের স্ত্রী যখন বললো, ‘হে আমার পালনকর্তা! আমার গর্ভে যা রয়েছে আমি তাকে তোমার নামে উৎসর্গ করলাম সবার কাছ থেকে মুক্ত রেখে। আমার পক্ষ থেকে তুমি তাকে কবুল করে নাও, নিশ্চয়ই তুমি শ্রবণকারী, সর্বজ্ঞাত।’ অতঃপর যখন তাকে প্রসব করলো বলল, ‘হে আমার পালনকর্তা! আমি কন্যা প্রসব করেছি।’ বস্তুত কি সে প্রসব করেছে আল্লাহ তা ভালই জানেন। সেই কন্যার মত কোন পুত্রই যে নেই। আর আমি তার নাম রাখলাম মারইয়াম। আর আমি তাকে ও তার সন্তানদেরকে তোমার আশ্রয়ে সমর্পণ করছি। অভিশপ্ত শয়তানের কবল থেকে। অতঃপর তাঁর পালনকর্তা তাঁকে উত্তমভাবে গ্রহণ করে নিলেন এবং তাঁকে প্রবৃদ্ধি দান করলেন -অত্যন্ত সুন্দর প্রবৃদ্ধি। আর তাঁকে যাকারিয়ার তত্ত্বাবধানে সমর্পন করলেন। যখনই যাকারিয়া মেহরাবের মধ্যে তার কছে আসতেন তখনই কিছু খাবার দেখতে পেতেন। জিজ্ঞেস করতেন ‘মারইয়াম! কোথা থেকে এসব তোমার কাছে এলো?’ তিনি বলতেন, ‘এসব আল্লাহর নিকট থেকে আসে। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা বেহিসাব রিযিক দান করেন’।” (সূরাহ আলে ইমরান, ৩:৩৫–৩৭)
وَ مَرْیَمَ ابْنَتَ عِمْرٰنَ الَّتِیْۤ اَحْصَنَتْ فَرْجَهَا فَنَفَخْنَا فِیْهِ مِنْ رُّوْحِنَا وَ صَدَّقَتْ بِكَلِمٰتِ رَبِّهَا وَ کُتُبِہٖ وَ كَانَتْ مِنَ الْقٰنِتِیْنَ
“আর দৃষ্টান্ত বর্ণনা করেছেন এমরান-তনয়া মরিয়মের, যে তার সতীত্ব বজায় রেখেছিল। অতঃপর আমি তার মধ্যে আমার পক্ষ থেকে জীবন ফুঁকে দিয়েছিলাম এবং সে তার পালনকর্তার বাণী ও কিতাবকে সত্যে পরিণত করেছিল। সে ছিল বিনয় প্রকাশকারীনীদের একজন।” (সূরাহ তাহরীম, ৬৬:১২)
وَ الَّتِیْۤ اَحْصَنَتْ فَرْجَهَا فَنَفَخْنَا فِیْهَا مِنْ رُّوْحِنَا وَ جَعَلْنٰهَا وَ ابْنَهَاۤ اٰیَۃً لِّلْعٰلَمِیْنَ
“এবং সেই নারীর কথা আলোচনা করুন, যে তার কামপ্রবৃত্তিকে বশে রেখেছিল, অতঃপর আমি তার মধ্যে আমার রূহ ফুঁকে দিয়েছিলাম এবং তাকে তার পুত্রকে বিশ্ববাসীর জন্য নিদর্শন করেছিলাম।” (সূরাহ আম্বিয়া, ২১:৯১)
وَ اِذْ قَالَتِ الْمَلٰٓئِكَۃُ یٰمَرْیَمُ اِنَّ اللّٰهَ اصْطَفٰكِ وَ طَهَرَكِ وَ اصْطَفٰكِ عَلٰی نِسَآءِ الْعٰلَمِیْنَ یٰمَرْیَمُ اقْنُتِیْ لِرَبِّكِ وَ اسْجُدِیْ وَ ارْكَعِیْ مَعَ الرّٰكِعِیْنَ ذٰلِكَ مِنْ اَنْۢبَآءِ الْغَیْبِ نُوْحِیْهِ اِلَیْكَ ؕ وَ مَا کُنْتَ لَدَیْهِمْ اِذْ یُلْقُوْنَ اَقْلَامَهُمْ اَیُّهُمْ یَکْفُلُ مَرْیَمَ ۪ وَ مَا کُنْتَ لَدَیْهِمْ اِذْ یَخْتَصِمُوْنَ اِذْ قَالَتِ الْمَلٰٓئِكَۃُ یٰمَرْیَمُ اِنَّ اللّٰهَ یُبَشِّرُكِ بِكَلِمَۃٍ مِّنْهُ ٭ۖ اسْمُهُ الْمَسِیْحُ عِیْسَی ابْنُ مَرْیَمَ وَجِیْہًا فِی الدُّنْیَا وَ الْاٰخِرَۃِ وَ مِنَ الْمُقَرَّبِیْنَ وَ یُكَلِّمُ النَّاسَ فِی الْمَہْدِ وَ كَہْلًا وَّ مِنَ الصّٰلِحِیْنَ قَالَتْ رَبِّ اَنّٰی یَکُوْنُ لِیْ وَلَدٌ وَّ لَمْ یَمْسَسْنِیْ بَشَرٌ ؕ قَالَ كَذٰلِكِ اللّٰهُ یَخْلُقُ مَا یَشَآءُ ؕ اِذَا قَضٰۤی اَمْرًا فَاِنَّمَا یَقُوْلُ لَہٗ کُنْ فَیَکُوْنُ
“আর যখন ফেরেশতা বলল হে মারইয়াম!, আল্লাহ তোমাকে পছন্দ করেছেন এবং তোমাকে পবিত্র পরিচ্ছন্ন করে দিয়েছেন। আর তোমাকে বিশ্ব নারী সমাজের উর্ধ্বে মনোনীত করেছেন। হে মারইয়াম! তোমার পালনকর্তার উপাসনা কর এবং রুকুকারীদের সাথে সেজদা ও রুকু কর। এ হলো গায়েবী সংবাদ, যা আমি আপনাকে পাঠিয়ে থাকি। আর আপনি তো তাদের কাছে ছিলেন না, যখন প্রতিযোগিতা করছিল যে, কে প্রতিপালন করবে মারইয়ামকে এবং আপনি তাদের কাছে ছিলেন না, যখন তারা ঝগড়া করছিলো। যখন ফেরেশতাগণ বললো, হে মারইয়াম আল্লাহ তোমাকে তাঁর এক বাণীর সুসংবাদ দিচ্ছেন, যার নাম হলো মসীহ-মারইয়াম-তনয় ঈসা, দুনিয়া ও আখেরাতে তিনি মহাসম্মানের অধিকারী এবং আল্লাহর ঘনিষ্ঠদের অন্তর্ভুক্ত। যখন তিনি মায়ের কোলে থাকবেন এবং পূর্ণ বয়স্ক হবেন তখন তিনি মানুষের সাথে কথা বলবেন। আর তিনি সৎকর্মশীলদের অন্তর্ভুক্ত হবেন। তিনি বললেন, পরওয়ারদেগার! কেমন করে আমার সন্তান হবে; আমাকে তো কোন মানুষ স্পর্শ করেনি। বললেন এ ভাবেই আল্লাহ যা ইচ্ছা সৃষ্টি করেন। যখন কোন কাজ করার জন্য ইচ্ছা করেন তখন বলেন যে, ‘হয়ে যাও’ অমনি তা হয়ে যায়।” (সূরাহ আলে ইমরান, ৩:৪২–৪৭)
وَ اذْکُرْ فِی الْكِتٰبِ مَرْیَمَ ۘ اِذِ انْتَبَذَتْ مِنْ اَهْلِهَا مَكَانًا شَرْقِیًّا فَاتَّخَذَتْ مِنْ دُوْنِهِمْ حِجَابًا ۪۟ فَاَرْسَلْنَاۤ اِلَیْهَا رُوْحَنَا فَتَمَثَّلَ لَهَا بَشَرًا سَوِیًّا قَالَتْ اِنِّیْۤ اَعُوْذُ بِالرَّحْمٰنِ مِنْكَ اِنْ کُنْتَ تَقِیًّا قَالَ اِنَّمَاۤ اَنَا رَسُوْلُ رَبِّكِ ٭ۖ لِاَهَبَ لَكِ غُلٰمًا زَكِیًّا قَالَتْ اَنّٰی یَکُوْنُ لِیْ غُلٰمٌ وَّ لَمْ یَمْسَسْنِیْ بَشَرٌ وَّ لَمْ اَکُ بَغِیًّا قَالَ كَذٰلِكِ ۚ قَالَ رَبُّكِ هُوَ عَلَیَّ هَیِّنٌ ۚ وَ لِنَجْعَلَہٗۤ اٰیَۃً لِّلنَّاسِ وَ رَحْمَۃً مِّنَّا ۚ وَ كَانَ اَمْرًا مَّقْضِیًّا فَحَمَلَتْهُ فَانْتَبَذَتْ بِہٖ مَكَانًا قَصِیًّا فَاَجَآءَهَا الْمَخَاضُ اِلٰی جِذْعِ النَّخْلَۃِ ۚ قَالَتْ یٰلَیْتَنِیْ مِتُّ قَبْلَ هٰذَا وَ کُنْتُ نَسْیًا مَّنْسِیًّا فَنَادٰىهَا مِنْ تَحْتِهَاۤ اَلَّا تَحْزَنِیْ قَدْ جَعَلَ رَبُّكِ تَحْتَكِ سَرِیًّا وَ هُزِّیْۤ اِلَیْكِ بِجِذْعِ النَّخْلَۃِ تُسٰقِطْ عَلَیْكِ رُطَبًا جَنِیًّا فَکُلِیْ وَ اشْرَبِیْ وَ قَرِّیْ عَیْنًا ۚ فَاِمَّا تَرَیِنَّ مِنَ الْبَشَرِ اَحَدًا ۙ فَقُوْلِیْۤ اِنِّیْ نَذَرْتُ لِلرَّحْمٰنِ صَوْمًا فَلَنْ اُكَلِّمَ الْیَوْمَ اِنْسِیًّا
“এই কিতাবে মারইয়ামের কথা বর্ণনা করুন, যখন সে তার পরিবারের লোকজন থেকে পৃথক হয়ে পূর্বদিকে এক স্থানে আশ্রয় নিল। অতঃপর তাদের থেকে নিজেকে আড়াল করার জন্যে সে পর্দা করলো। অতঃপর আমি তার কাছে আমার রূহ প্রেরণ করলাম, সে তার নিকট পূর্ণ মানবাকৃতিতে আত্মপ্রকাশ করল। মারইয়াম বলল: আমি তোমা থেকে দয়াময়ের আশ্রয় প্রার্থনা করি যদি তুমি আল্লাহভীরু হও। সে বলল: আমি তো শুধু তোমার পালনকর্তা প্রেরিত, যাতে তোমাকে এক পবিত্র পুত্র দান করে যাব। মরিইয়াম বলল: কিরূপে আমার পুত্র হবে, যখন কোন মানব আমাকে স্পর্শ করেনি এবং আমি কখনও ব্যভিচারিণীও ছিলাম না ? সে বলল: এমনিতেই হবে। তোমার পালনকর্তা বলেছেন, এটা আমার জন্যে সহজ সাধ্য এবং আমি তাকে মানুষের জন্যে একটি নিদর্শন ও আমার পক্ষ থেকে অনুগ্রহ স্বরূপ করতে চাই। এটা তো এক স্থিরীকৃত ব্যাপার। অতঃপর তিনি গর্ভে সন্তান ধারণ করলেন এবং তৎসহ এক দূরবর্তী স্থানে চলে গেলেন। প্রসব বেদনা তাঁকে এক খেজুর বৃক্ষ-মূলে আশ্রয় নিতে বাধ্য করল। তিনি বললেন: হায়, আমি যদি কোনরূপে এর পূর্বে মরে যেতাম এবং মানুষের স্মৃতি থেকে বিলুপ্ত হয়ে যেতাম! অতঃপর ফেরেশতা তাকে নি¤œদিক থেকে আওয়ায দিলেন যে, তুমি দুঃখ করো না। তোমার পালনকর্তা তোমার পায়ের তলায় একটি নহর জারি করেছেন। আর তুমি নিজের দিকে খেজুর গাছের কান্ডে নাড়া দাও, তা থেকে তোমার উপর সুপক্ক খেজুর পতিত হবে। যখন আহার কর, পান কর এবং চক্ষু শীতল কর। যদি মানুষের মধ্যে কাউকে তুমি দেখ, তবে বলে দিও: আমি আল্লাহর উদ্দেশে রোযা মানত করছি। সুতরাং আজ আমি কিছুতেই কোন মানুষের সাথে কথা বলব না।” (সূরাহ মারইয়াম, ১৯:১৬–২৬)
فَاَتَتْ بِہٖ قَوْمَهَا تَحْمِلُہٗ ؕ قَالُوْا یٰمَرْیَمُ لَقَدْ جِئْتِ شَیْئًا فَرِیًّا یٰۤاُخْتَ هٰرُوْنَ مَا كَانَ اَبُوْكِ امْرَ اَ سَوْءٍ وَّ مَا كَانَتْ اُمُّكِ بَغِیًّا فَاَشَارَتْ اِلَیْهِ ؕ قَالُوْا كَیْفَ نُكَلِّمُ مَنْ كَانَ فِی الْمَہْدِ صَبِیًّا
“অতঃপর তিনি (মারইয়াম) সন্তানকে নিয়ে তার সম্প্রদায়ের কাছে উপস্থিত হলেন। তারা বলল: হে মারইয়াম, তুমি একটি অঘটন ঘটিয়ে বসেছ। হে হারূন-ভগিনী, তোমার পিতা অসৎ ব্যক্তি ছিলেন না এবং তোমার মাতাও ছিল না ব্যভিচারিনী। অতঃপর তিনি হাতে সন্তানের দিকে ইঙ্গিত করলেন। তারা বলল: যে কোলের শিশু তার সাথে আমরা কেমন করে কথা বলব?” (সূরাহ মারইয়াম, ১৯:২৭–২৯)
وَبِكُفْرِهِمْ وَقَوْلِهِمْ عَلٰى مَرْيَمَ بُهْتٰنًا عَظِيْمًا
“আর তারা কুফরী করেছিল এবং মরিয়মের প্রতি মহাঅপবাদ আরোপ করার কারণে। (সূরাহ নিসা, ৪:১৫৬)
ফেরাউন-পত্নী আছিয়া (আ)
وَ ضَرَبَ اللّٰهُ مَثَلًا لِّلَّذِیْنَ اٰمَنُوا امْرَاَتَ فِرْعَوْنَ ۘ اِذْ قَالَتْ رَبِّ ابْنِ لِیْ عِنْدَكَ بَیْتًا فِی الْجَنَّۃِ وَ نَجِّنِیْ مِنْ فِرْعَوْنَ وَ عَمَلِہٖ وَ نَجِّنِیْ مِنَ الْقَوْمِ الظّٰلِمِیْنَ
“আল্লাহ তা‘আলা মু’মিনদের জন্যে ফেরাউন-পত্নীর দৃষ্টান্ত বর্ণনা করেছেন। সে বলল: হে আমার পালনকর্তা! আপনার সন্নিকটে জান্নাতে আমার জন্যে একটি গৃহ নির্মাণ করুন, আমাকে ফেরাউন ও তার দুষ্কর্ম থেকে উদ্ধার করুন এবং আমাকে যালেম সম্প্রদায় থেকে মুক্তি দিন।” (সূরাহ তাহরীম, ৬৬:১১)
হযরত মূসা (আ)-এর জননী
وَ اَوْحَیْنَاۤ اِلٰۤی اُمِّ مُوْسٰۤی اَنْ اَرْضِعِیْهِ ۚ فَاِذَا خِفْتِ عَلَیْهِ فَاَلْقِیْهِ فِی الْیَمِّ وَ لَا تَخَافِیْ وَ لَا تَحْزَنِیْ ۚ اِنَّا رَآدُّوْهُ اِلَیْكِ وَ جَاعِلُوْهُ مِنَ الْمُرْسَلِیْنَ
“আমি মূসা-জননীকে আদেশ পাঠালাম যে, তাকে স্তন্য দান করতে থাক। অতঃপর যখন তুমি তার সম্পর্কে বিপদের আশংকা কর, তখন তাকে দরিয়ায় নিক্ষেপ কর এবং ভয় করো না, দুঃখও করো না। আমি অবশ্যই তাকে তোমার কাছে ফিরিয়ে দেব এবং তাকে পয়গম্বরগণের একজন করব।” (সূরাহ কাসাস, ২৮:৭)
اِذْ اَوْحَیْنَاۤ اِلٰۤی اُمِّكَ مَا یُوْحٰۤی اَنِ اقْذِفِیْهِ فِی التَّابُوْتِ فَاقْذِفِیْهِ فِی الْیَمِّ فَلْیُلْقِهِ الْیَمُّ بِالسَّاحِلِ یَاْخُذْهُ عَدُوٌّ لِّیْ وَ عَدُوٌّ لَّہٗ ؕ وَ اَلْقَیْتُ عَلَیْكَ مَحَبَّۃً مِّنِّیْ ۬ۚ وَ لِتُصْنَعَ عَلٰی عَیْنِیْ
“যখন আমি তোমার মাতাকে নির্দেশ দিয়েছিলাম যা অতঃপর বর্ণিত হচ্ছে। যে, তুমি (মূসাকে) সিন্দুকে রাখ, অতঃপর তা দরিয়ায় ভাসিয়ে দাও, অতঃপর দরিয়া তাকে তীরে ঠেলে দেবে। তাকে আমার শত্রু ও তার শত্রু উঠিয়ে নেবে। আমি তোমার প্রতি মহব্বত সঞ্চারিত করেছিলাম আমার নিজের পক্ষ থেকে, যাতে তুমি আমার দৃষ্টির সামনে প্রতিপালিত হও।” (সূরাহ তআওয়া–হা, ২০:৩৮–৩৯)
وَ اَصْبَحَ فُؤَادُ اُمِّ مُوْسٰی فٰرِغًا ؕ اِنْ كَادَتْ لَتُبْدِیْ بِہٖ لَوْ لَاۤ اَنْ رَّبَطْنَا عَلٰی قَلْبِهَا لِتَکُوْنَ مِنَ الْمُؤْمِنِیْنَ وَ قَالَتْ لِاُخْتِہٖ قُصِّیْهِ ۫ فَبَصُرَتْ بِہٖ عَنْ جُنُبٍ وَّ هُمْ لَا یَشْعُرُوْنَ وَ حَرَّمْنَا عَلَیْهِ الْمَرَاضِعَ مِنْ قَبْلُ فَقَالَتْ هَلْ اَدُلُّکُمْ عَلٰۤی اَهْلِ بَیْتٍ یَّکْفُلُوْنَہٗ لَکُمْ وَهُمْ لَہٗ نٰصِحُوْنَ فَرَدَدْنٰهُ اِلٰۤی اُمِّہٖ كَیْ تَقَرَّ عَیْنُهَا وَ لَا تَحْزَنَ وَ لِتَعْلَمَ اَنَّ وَعْدَ اللّٰهِ حَقٌّ وَّ لٰكِنَّ اَکْثَرَهُمْ لَا یَعْلَمُوْنَ
“সকালে মূসা জননীর অন্তর অস্থির হয়ে পড়ল। যদি আমি তাঁর হৃদয়কে দৃঢ় করে না দিতাম, তবে তিনি মূসাজনিত অস্থিরতা প্রকাশ করেই দিতেন। দৃঢ় করলাম, যাতে তিনি থাকেন বিশ্ববাসীগণের মধ্যে। তিনি মূসার ভগিণীকে বললেন, তার পেছন পেছন যাও। সে তাদের অজ্ঞাতসারে অপরিচিতা হয়ে তাকে দেখে যেতে লাগল। পূর্ব থেকেই আমি ধাত্রীদেরকে মূসা থেকে বিরত রেখেছিলাম। মূসার ভগিনী বলল, আমি তোমাদেরকে এমন এক পরিবারের কথা বলব কি, যারা তোমাদের জন্যে একে লালন-পালন করবে এবং তারা হবে তার হিতাকাঙ্খী? অতঃপর আমি তাকে জননীর কাছে ফিরিয়ে দিলাম, যাতে তার চক্ষু জুড়ায় এবং তিনি দুঃখ না করেন এবং যাতে তিনি জানেন যে, আল্লাহর ওয়াদা সত্য, কিন্তু অনেক মানুষ তা জানে না।” (সূরাহ কাসাস, ২৮:১০–১৩)
উম্মুল মু’মিনিন আয়েশা (রা)
সরাসরি নাম উল্লেখ ছাড়া উম্মুল মু’মিনিন আয়েশা (রা) এর ওপর আনীত মিথ্যা অপবাদের বিষয়টি পবিত্র কুরআনের সূরা নূরে আলোচিত হয়েছে। এ সূরায় মিথ্যা অপবাদের মারাত্মক পরিণাম ও কঠোর শাস্তির বিধানও জারী করা হয় যা শাস্তি বিষয়ক অধ্যায়ে উদ্ধৃত হয়েছে।
মা আয়েশা (রা) সম্পর্কিত আয়াতটি নিম্নে পেশ করা হলো:
لَوْ لَاۤ اِذْ سَمِعْتُمُوْهُ ظَنَّ الْمُؤْمِنُوْنَ وَ الْمُؤْمِنٰتُ بِاَنْفُسِهِمْ خَیْرًا ۙ وَّ قَالُوْا هٰذَاۤ اِفْکٌ مُّبِیْنٌ لَوْ لَا جَآءُوْ عَلَیْهِ بِاَرْبَعَۃِ شُهَدَآءَ ۚ فَاِذْ لَمْ یَاْتُوْا بِالشُّهَدَآءِ فَاُولٰٓئِكَ عِنْدَ اللّٰهِ هُمُ الْکٰذِبُوْنَ وَ لَوْ لَا فَضْلُ اللّٰهِ عَلَیْکُمْ وَ رَحْمَتُہٗ فِی الدُّنْیَا وَ الْاٰخِرَۃِ لَمَسَّکُمْ فِیْ مَاۤ اَفَضْتُمْ فِیْهِ عَذَابٌ عَظِیْمٌ اِذْ تَلَقَّوْنَہٗ بِاَلْسِنَتِکُمْ وَ تَقُوْلُوْنَ بِاَفْوَاهِکُمْ مَّا لَیْسَ لَکُمْ بِہٖ عِلْمٌ وَّ تَحْسَبُوْنَہٗ هَیِّنًا ٭ۖ وَّ هُوَ عِنْدَ اللّٰهِ عَظِیْمٌ وَ لَوْ لَاۤ اِذْ سَمِعْتُمُوْهُ قُلْتُمْ مَّا یَکُوْنُ لَنَاۤ اَنْ نَّتَكَلَّمَ بِهٰذَا ٭ۖ سُبْحٰنَكَ هٰذَا بُہْتَانٌ عَظِیْمٌ یَعِظُکُمُ اللّٰهُ اَنْ تَعُوْدُوْا لِمِثْلِہٖۤ اَبَدًا اِنْ کُنْتُمْ مُّؤْمِنِیْنَ
“তোমরা যখন একথা শুনলে, তখন ঈমানদার পুরুষ ও নারীগণ কেন নিজেদের লোক সম্পর্কে উত্তম ধারণা করনি এবং বলনি যে, এটা তো নির্জলা অপবাদ? তারা কেন এ ব্যাপারে চার জন সাক্ষী উপস্থিত করেনি; অতঃপর যখন তারা সাক্ষী উপস্থিত করেনি, তখন তারাই আল্লাহর কাছে মিথ্যাবাদী। যদি ইহকালে ও পরকালে তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ ও দয়া না থাকত, তবে তোমরা যা চর্চা করছিলে, তজ্জন্যে তোমাদেরকে গুরুতর আযাব স্পর্শ করত। যখন তোমরা একে মুখে মুখে ছড়াচ্ছিলে এবং মুখে এমন বিষয় উচ্চারণ করছিলে, যার কোন জ্ঞান তোমাদের ছিল না। তোমরা একে তুচ্ছ মনে করছিলে, অথচ এটা আল্লাহর কাছে গুরুতর ব্যাপার ছিল। তোমরা যখন এ কথা শুনলে তখন কেন বললে না যে, এ বিষয়ে কথা বলা আমাদের উচিত নয়। আল্লাহ তো পবিত্র, মহান। এটা তো এক গুরুতর অপবাদ। আল্লাহ তোমাদেরকে উপদেশ দিচ্ছেন, তোমরা যদি ঈমানদার হও, তবে কখনও পুনরায় এ ধরণের আচরণের পুনরাবৃত্তি করো না।” (সূরাহ আন নূর, ২৪:১২–১৭)
উম্মুল মু’মিনিন জয়নব (রা)
সূরা আহযাবে উম্মুল মু’মিনিন জয়নব (রা)-এর নাম উল্লেখ ব্যতীত নবী করীম (সা)-এর সাথে তার বিয়ের ব্যাপারটি বর্ণিত হয়েছে।
এ সম্পর্কিত আয়াতটি নিম্নে উদ্ধৃত করা হলো:
وَ اِذْ تَقُوْلُ لِلَّذِیْۤ اَنْعَمَ اللّٰهُ عَلَیْهِ وَ اَنْعَمْتَ عَلَیْهِ اَمْسِکْ عَلَیْكَ زَوْجَكَ وَ اتَّقِ اللّٰهَ وَ تُخْفِیْ فِیْ نَفْسِكَ مَا اللّٰهُ مُبْدِیْهِ وَ تَخْشَی النَّاسَ ۚ وَ اللّٰهُ اَحَقُّ اَنْ تَخْشٰهُ ؕ فَلَمَّا قَضٰی زَیْدٌ مِّنْهَا وَطَرًا زَوَّجْنٰكَهَا لِكَیْ لَا یَکُوْنَ عَلَی الْمُؤْمِنِیْنَ حَرَجٌ فِیْۤ اَزْوَاجِ اَدْعِیَآئِهِمْ اِذَا قَضَوْا مِنْهُنَّ وَطَرًا ؕ وَ كَانَ اَمْرُ اللّٰهِ مَفْعُوْلًا
“আল্লাহ যাকে অনুগ্রহ করেছেন; আপনিও যাকে অনুগ্রহ করেছেন; তাকে যখন আপনি বলেছিলেন, তোমার স্ত্রীকে তোমার কাছেই থাকতে দাও এবং আল্লাহকে ভয় কর। আপনি অন্তরে এমন বিষয় গোপন করছিলেন, যা আল্লাহপাক প্রকাশ করে দেবেন আপনি লোকনিন্দার ভয় করেছিলেন অথচ আল্লাহকেই অধিক ভয় করা উচিত। অতঃপর যায়েদ যখন তার স্ত্রীর (জয়নব রা) সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করল, তখন আমি তাকে আপনার সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ করলাম যাতে মু’মিনদের পোষ্যপুত্ররা তাদের স্ত্রীর সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করলে সেসব স্ত্রীকে বিবাহ করার ব্যাপারে মু’মিনদের কোন অসুবিধা না থাকে। আল্লাহর নির্দেশ কার্যে পরিণত হয়েই থাকে।” (সূরাহ আহযাব, ৩৩:৩৭)।
উম্মুল মু’মিনিন হাফসা (রা)
وَإِذْ أَسَرَّ النَّبِيُّ إِلَىٰ بَعْضِ أَزْوَاجِهِ حَدِيثًا فَلَمَّا نَبَّأَتْ بِهِ وَأَظْهَرَهُ اللَّهُ عَلَيْهِ عَرَّفَ بَعْضَهُ وَأَعْرَضَ عَن بَعْضٍ ۖ فَلَمَّا نَبَّأَهَا بِهِ قَالَتْ مَنْ أَنبَأَكَ هَـٰذَا ۖ قَالَ نَبَّأَنِيَ الْعَلِيمُ الْخَبِيرُ إِن تَتُوبَا إِلَى اللَّهِ فَقَدْ صَغَتْ قُلُوبُكُمَا ۖ وَإِن تَظَاهَرَا عَلَيْهِ فَإِنَّ اللَّهَ هُوَ مَوْلَاهُ وَجِبْرِيلُ وَصَالِحُ الْمُؤْمِنِينَ ۖ وَالْمَلَائِكَةُ بَعْدَ ذَٰلِكَ ظَهِيرٌ عَسَىٰ رَبُّهُ إِن طَلَّقَكُنَّ أَن يُبْدِلَهُ أَزْوَاجًا خَيْرًا مِّنكُنَّ مُسْلِمَاتٍ مُّؤْمِنَاتٍ قَانِتَاتٍ تَائِبَاتٍ عَابِدَاتٍ سَائِحَاتٍ ثَيِّبَاتٍ وَأَبْكَارًا“যখন নবী তাঁর একজন স্ত্রীর (হাফসা রা) কাছে একটি কথা গোপনে বললেন, অতঃপর স্ত্রী যখন তা (আয়েশা রা – কে) বলে দিল এবং আল্লাহ নবীকে তা জানিয়ে দিলেন, তখন নবী সে বিষয়ে স্ত্রীকে কিছু বললেন এবং কিছু বললেন না। নবী যখন তা স্ত্রীকে বললেন, তখন স্ত্রী বললেনঃ কে আপনাকে এ সম্পর্কে অবহিত করল? নবী বললেন, যিনি সর্বজ্ঞ, ওয়াকিফহাল, তিনি আমাকে অবহিত করেছেন। তোমাদের অন্তর অন্যায়ের দিকে ঝুঁকে পড়েছে বলে যদি তোমরা উভয়ে তওবা কর, তবে ভাল কথা। আর যদি নবীর বিরুদ্ধে একে অপরকে সাহায্য কর, তবে জেনে রেখ আল্লাহ জিবরাঈল এবং সৎকর্মপরায়ণ মুমিনগণ তাঁর সহায়। উপরন্তুত ফেরেশতাগণও তাঁর সাহায্যকারী। যদি নবী তোমাদের সকলকে পরিত্যাগ করেন, তবে সম্ভবতঃ তাঁর পালনকর্তা তাঁকে পরিবর্তে দিবেন তোমাদের চাইতে উত্তম স্ত্রী, যারা হবে আজ্ঞাবহ, ঈমানদার, নামাযী তওবাকারিণী, এবাদতকারিণী, রোযাদার, অকুমারী ও কুমারী।” (সূরাহ তাহরীম, ৬৬:৩–৫)
ইসলামে নারী জাতির সম্মান ও মর্যাদা
নরী ও পুরুষ আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীনের মহান সৃষ্টি। আদিপিতা আদম (আ) এর পৃষ্টদেশ থেকে আদিমাতা হাওয়া (আ) কে তিনি সৃষ্টি করেছেন। সুতরাং তাঁরা উভয়েই এক দেহ ও এক আত্মাসম। এ ব্যাপারে আল্লাহ্ বলেন,
یٰۤاَیُّهَا النَّاسُ اتَّقُوْا رَبَّکُمُ الَّذِیْ خَلَقَکُمْ مِّنْ نَّفْسٍ وَّاحِدَۃٍ وَخَلَقَ مِنْهَا زَوْجَهَا وَبَثَّ مِنْهُمَا رِجَالًا كَثِیْرًا وَنِسَآءً ۚ وَّاتَّقُوا اللّٰهَ الَّذِیْ تَسَآءَلُوْنَ بِہٖ وَالْاَرْحَامَ ؕ اِنَّ اللّٰهَ كَانَ عَلَیْکُمْ رَقِیْبًا
“হে মানব সমাজ! তোমরা তোমাদের পালনকর্তাকে ভয় কর, যিনি তোমাদেরকে এক ব্যক্তিসত্তা থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং যিনি তার থেকে তার সঙ্গীনীকে সৃষ্টি করেছেন; আর বিস্তার করেছেন তাদের দু’জন থেকে অগণিত পুরুষ ও নারী। আর আল্লাহকে ভয় কর, যাঁর নামে তোমরা একে অপরের নিকট যাচঞ্ঝা করে থাক এবং আত্নীয় জ্ঞাতিদের ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন কর। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের ব্যাপারে সচেতন রয়েছেন।” (সূরাহ নিসা, ৪:১)
উপরোক্ত আয়াতে মহান আল্লাহ্ নারী ও পুরুষের পারস্পরিক সম্পর্ককে সমুন্নত রাখার ব্যাপারে গুরুত্ব দিয়ে বলেছেন এ সম্পর্ক রক্ষার ক্ষেত্রে আমরা যেন তাঁকে ভয় করি ও সতর্ক থাকি। ইসলামে নারীর অধিকার, সম্মান ও মর্যাদা রক্ষার ব্যাপারে যে দিক্–নির্দেশনা দিয়েছে তা নিম্নে উল্লেখ করা হলো:
-
প্রাক ইসলামী যুগ যা ‘আইয়্যামে জাহেলিয়াত’ (অন্ধকার যুগ) নামে অভিহিত — সে যুগে নারীদের অবমাননা ছিল চরম পর্যায়ে। তখনকার কুসংস্কারাচ্ছন্ন সমাজ কন্যাশিশুর জন্মকে অপমান ও দুর্ভাগ্যজনক মনে করত এবং তাদেরকে জীবন্ত কবর দিয়ে হত্যা করত। বেশ্যাবৃত্তি, বলপূর্বক বিবাহ ও নির্যাতন নারীর জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছিল। সেই যুগে ইসলাম এসব কুপ্রথা থেকে নারী সমাজকে মুক্ত করে এবং তাদেরকে উচ্চ মর্যাদায় অসীন করে।
- ইসলামে প্রতিটি মানুষ পবিত্র অবস্থায় জন্মগ্রহণ করে, তাই তাকে জীবনভর সচেষ্ট থাকতে হবে যাতে সে পবিত্রতা বজায় থাকে। নারী ও পুরুষের পবিত্র জীবন যাপনকে ইসলাম সবিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে এবং অবাধ মেলামিশা, নগ্নতা, বেহায়াপনা, অশ্লীল জীবন যাপন বা বেপর্দা চলাফেরা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে। ইসলামে নারীকে যৌন পণ্য আর তার নগ্নতাকে পণ্যের বিজ্ঞাপন হিসেবে ব্যবহার করা গুরুতর পাপকর্ম। কারণ এসব অপকর্ম নারীর মর্যাদার পরিপন্থী, অবমাননাকর এবং ইসলামের মূল্যবোধ ও নীতি–নৈতিকতা বিরোধী।
- ইসলাম বিবাহ-বহির্ভূত যৌন কর্ম নিষিদ্ধ করেছে এং বিবাহ বন্ধনকে পবিত্র করেছে, বিবাহে নারীর সম্মতি, মোহরানা ও সম্মানজনক ভরণপোষণকে আবশ্যকীয় করেছে।
- দাম্পত্য বিরোধ নিরসনে ন্যায়সঙ্গত আপোষ –মীমাংসার তাগিদ দিয়েছে। নেহায়েৎ অপারগতায় বিবাহ–বিচ্ছেদ অনুমোদন করেছে এবং একে একটি বিধি –বিধানের অন্তর্ভুক্ত করেছে যাতে কারো উপর জুলুম না হয়।
- ইসলামে স্ত্রী, মাতা, কন্যা ও ভগ্নি হিসেবে নারীর ভূমিকা পারিবারিক পরিবেশে যেমন অপরিসীম তেমনি পরিবারের বাইরেও নারী শালীন পরিবেশে বিভিন্নমুখী কর্মকান্ডে অংশগ্রহণ ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। যদিও সন্তান লালনপালন, তাদের পারিবারিক শিক্ষা ও গৃহস্থালীই নারীর প্রধান কর্মক্ষেত্র, তবে জীবিকার প্রয়োজনে নারী পর্দার সাথে বাইরের আর্থিক কর্মকান্ডে যুক্ত হতে পারে।
- ইসলাম উত্তরাধিকার সম্পত্তিতে নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠিত করেছে এবং তার অংশ সুনির্দিষ্ট করে দিয়েছে। সে সাথে ইসলাম নারীকে তার অর্জিত সম্পদ নিজ ইচ্ছামাফিক ভোগ করার অধিকার দিয়েছে।
- ইসলাম নারীকে শিক্ষার অধিকার দিয়েছে। নবী (সা) বলেছেন, ‘পুরুষ ও নারীর জন্য শিক্ষার্জন ফরজ।’
- মায়ের সম্মান সমুন্নত রাখার ক্ষেত্রে ইসলামের নবী (সা) বলেছেন, ‘মায়ের পদতলে সন্তানের বেহেশত।’ তিনি সন্তানের নিকট পিতার তুলনায় মায়ের মর্যাদাকে তিন গুণ উচ্চে নির্ধারণ করেছেন।
- ইসলামে নারী ও পুরুষ একে অপরের পরিচ্ছদ স্বরূপ। (সূরাহ বাক্বারাহ, ২:১৮৭)
এতদ্সম্পর্কিত আয়াতসমূহ নিম্নে পেশ করা হলো:
وَالْمُؤْمِنُوْنَ وَالْمُؤْمِنٰتُ بَعْضُهُمْ اَوْلِیَآءُ بَعْضٍ ۘ یَاْمُرُوْنَ بِالْمَعْرُوْفِ وَیَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَیُقِیْمُوْنَ الصَّلٰوۃَ وَیُؤْتُوْنَ الزَّکٰوۃَ وَیُطِیْعُوْنَ اللّٰهَ وَرَسُوْلَہٗ ؕ اُولٰٓئِكَ سَیَرْحَمُهُمُ اللّٰهُ ؕ اِنَّ اللّٰهَ عَزِیْزٌ حَكِیْمٌ
“আর ঈমানদার পুরুষ ও ঈমানদার নারী একে অপরের সহায়ক। তারা ভাল কথার শিক্ষা দেয় এবং মন্দ থেকে বিরত রাখে। নামায প্রতিষ্ঠা করে, যাকাত দেয় এবং আল্লাহ ও তাঁর রসূলের নির্দেশ অনুযায়ী জীবন যাপন করে। এদেরই উপর আল্লাহ তা’আলা দয়া করবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ পরাক্রমশীল, সুকৌশলী।” (সূরাহ তাওবা, ৯:৭১)
وَ لَهُنَّ مِثْلُ الَّذِیْ عَلَیْهِنَّ بِالْمَعْرُوْفِ وَلِلرِّجَالِ عَلَیْهِنَّ دَرَجَۃٌ ؕ وَاللّٰهُ عَزِیْزٌ حَكِیْمٌ
“……….. আর পুরুষদের যেমন স্ত্রীদের উপর অধিকার রয়েছে, তেমনি ভাবে স্ত্রীদেরও অধিকার রয়েছে পুরুষদের উপর নিয়ম অনুযায়ী। আর নারীরদের ওপর পুরুষদের শ্রেষ্ঠত্ব রয়েছে। আর আল্লাহ হচ্ছে পরাক্রমশালী, বিজ্ঞ।” (সূরাহ বাক্বারাহ, ২:২২৮)
مَنْ عَمِلَ صَالِحًا مِّنْ ذَكَرٍ اَوْ اُنْثٰی وَهُوَ مُؤْمِنٌ فَلَنُحْیِیَنَّہٗ حَیٰوۃً طَیِّبَۃً ۚ وَلَنَجْزِیَنَّهُمْ اَجْرَهُمْ بِاَحْسَنِ مَا كَانُوْا یَعْمَلُوْنَ
“যে সৎকর্ম সম্পাদন করে এবং সে ঈমাণদার, পুরুষ হোক কিংবা নারী আমি তাকে পবিত্র জীবন দান করব এবং প্রতিদানে তাদেরকে তাদের উত্তম কাজের কারণে প্রাপ্য পুরষ্কার দেব যা তারা করত।” (সূরাহ নহল, ১৬:৯৭)
یَوْمَ تَرَی الْمُؤْمِنِیْنَ وَالْمُؤْمِنٰتِ یَسْعٰی نُوْرُهُمْ بَیْنَ اَیْدِیْهِمْ وَبِاَیْمَانِهِمْ بُشْرٰىکُمُ الْیَوْمَ جَنّٰتٌ تَجْرِیْ مِنْ تَحْتِهَا الْاَنْهٰرُ خٰلِدِیْنَ فِیْهَا ؕ ذٰلِكَ هُوَ الْفَوْزُ الْعَظِیْمُ
“যেদিন আপনি দেখবেন ঈমানদার পুরুষ ও ঈমানদার নারীদেরকে, তাদের সম্মুখ ভাগে ও ডানপার্শ্বে তাদের জ্যোতি ছুটোছুটি করবে বলা হবেঃ আজ তোমাদের জন্যে সুসংবাদ জান্নাতের, যার তলদেশে নদী প্রবাহিত, তাতে তারা চিরকাল থাকবে। এটাই মহাসাফল্য।” (সূরাহ হাদীদ, ৫৭:১২)
وَمِنْ اٰیٰتِہٖۤ اَنْ خَلَقَ لَکُمْ مِّنْ اَنْفُسِکُمْ اَزْوَاجًا لِّتَسْکُنُوْۤا اِلَیْهَا وَجَعَلَ بَیْنَکُمْ مَّوَدَّۃً وَرَحْمَۃً ؕ اِنَّ فِیْ ذٰلِكَ لَاٰیٰتٍ لِّقَوْمٍ یَّتَفَكَرُوْنَ
“আর এক নিদর্শন এই যে, তিনি তোমাদের জন্যে তোমাদের মধ্য থেকে তোমাদের সংগিনীদের সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে শান্তিতে থাক এবং তিনি তোমাদের মধ্যে পারস্পরিক সম্প্রীতি ও দয়া সৃষ্টি করেছেন। নিশ্চয় এতে চিন্তাশীল লোকদের জন্যে নিদর্শনাবলী রয়েছে।.” (সূরাহ আর রোম, ৩০:২১)
لِلرِّجَالِ نَصِیْبٌ مِّ مَّا تَرَكَ الْوَالِدٰنِ وَالْاَقْرَبُوْنَ ۪ وَلِلنِّسَآءِ نَصِیْبٌ مِّمَّا تَرَكَ الْوَالِدٰنِ وَالْاَقْرَبُوْنَ مِمَّا قَلَّ مِنْهُ اَوْ كَثُرَ ؕ نَصِیْبًا مَّفْرُوْضًا
“পিতা–মাতা ও আত্নীয়–স্বজনদের পরিত্যক্ত সম্পত্তিতে পুরুষদেরও অংশ আছে এবং পিতা–মাতা ও আত্নীয়–স্বজনদের পরিত্যক্ত সম্পত্তিতে নারীদেরও অংশ আছে; অল্প হোক কিংবা বেশী। এ অংশ নির্ধারিত।” (সূরাহ নিসা, ৪:৭)
یٰۤاَیُّهَا الَّذِیْنَ اٰمَنُوْا لَا یَحِلُّ لَکُمْ اَنْ تَرِثُوا النِّسَآءَ كَرْہًا ؕ وَّلَا تَعْضُلُوْهُنَّ لِتَذْهَبُوْا بِبَعْضِ مَاۤ اٰتَیْتُمُوْهُنَّ اِلَّاۤ اَنْ یَّاْتِیْنَ بِفَاحِشَۃٍ مُّبَیِّنَۃٍ ۚ وَعَاشِرُوْهُنَّ بِالْمَعْرُوْفِ ۚ فَاِنْ كَرِهْتُمُوْهُنَّ فَعَسٰۤی اَنْ تَکْرَهُوْا شَیْئًا وَیَجْعَلَ اللّٰهُ فِیْهِ خَیْرًا كَثِیْرًا وَّاِنْ اَرَدْتُّمُ اسْتِبْدَالَ زَوْجٍ مَّكَانَ زَوْجٍ ۙ وَّاٰتَیْتُمْ اِحْدٰهُنَّ قِنْطَارًا فَلَا تَاْخُذُوْا مِنْهُ شَیْئًا ؕ اَتَاْخُذُوْنَہٗ بُہْتَانًا وَّ اِثْمًا مُّبِیْنًا وَكَیْفَ تَاْخُذُوْنَہٗ وَقَدْ اَفْضٰی بَعْضُکُمْ اِلٰی بَعْضٍ وَّاَخَذْنَ مِنْکُمْ مِّیْثَاقًا غَلِیْظًا
“হে ঈমাণদারগণ! বলপূর্বক নারীদেরকে উত্তরাধিকারে গ্রহন করা তোমাদের জন্যে হালাল নয় এবং তাদেরকে আটক রেখো না যাতে তোমরা তাদেরকে যা প্রদান করেছ তার কিয়দংশ নিয়ে নাও; কিন্তু তারা যদি কোন প্রকাশ্য অশ্লীলতা করে! নারীদের সাথে সদ্ভাবে জীবন-যাপন কর। অতঃপর যদি তাদেরকে অপছন্দ কর, তবে হয়ত তোমরা এমন এক জিনিসকে অপছন্দ করছ, যাতে আল্লাহ, অনেক কল্যাণ রেখেছেন। যদি তোমরা এক স্ত্রীর স্থলে অন্য স্ত্রী পরিবর্তন করতে ইচ্ছা কর এবং তাদের একজনকে প্রচুর ধন–সম্পদ প্রদান করে থাক, তবে তা থেকে কিছুই ফেরত গ্রহণ করো না। তোমরা কি তা অন্যায়ভাবে ও প্রকাশ্য গোনাহর মাধ্যমে গ্রহণ করবে? তোমরা কিরূপে তা গ্রহণ করতে পার, অথচ তোমাদের একজন অন্য জনের কাছে গমন এবং নারীরা তোমাদের কাছে থেকে সুদৃঢ় অঙ্গীকার গ্রহণ করেছে?” (সূরাহ নিসা, ৪:১৯–২১)
وَلَا تَتَمَنَّوْا مَا فَضَّلَ اللّٰهُ بِہٖ بَعْضَکُمْ عَلٰی بَعْضٍ ؕ لِّلرِّجَالِ نَصِیْبٌ مِّمَّا اکْتَسَبُوْا ؕ وَلِلنِّسَآءِ نَصِیْبٌ مِّمَّا اکْتَسَبْنَ ؕ وَسْئَلُوا اللّٰهَ مِنْ فَضْلِہٖ ؕ اِنَّ اللّٰهَ كَانَ بِکُلِّ شَیْءٍ عَلِیْمًا
“আর তোমরা আকাঙ্ক্ষা করো না এমন সব বিষয়ে যাতে আল্লাহ তা’আলা তোমাদের একের উপর অপরের শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন। পুরুষ যা অর্জন করে সেটা তার অংশ এবং নারী যা অর্জন করে সেটা তার অংশ। আর আল্লাহর কাছে তাঁর অনুগ্রহ প্রার্থনা কর। নিঃসন্দেহে আল্লাহ তা’আলা সর্ব বিষয়ে জ্ঞাত।” (সূরাহ নিসা, ৪:৩২)
وَمَن يَعْمَلْ مِنَ الصَّالِحَاتِ مِن ذَكَرٍ أَوْ أُنثَىٰ وَهُوَ مُؤْمِنٌ فَأُولَـٰئِكَ يَدْخُلُونَ الْجَنَّةَ وَلَا يُظْلَمُونَ نَقِيرًا“যে লোক পুরুষ হোক কিংবা নারী, কোন সৎকর্ম করে এবং বিশ্বাসী হয়, তবে তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং তাদের প্রাপ্য তিল পরিমাণ ও নষ্ট হবে না।” (সূরাহ নিসা, ৪:১২৪)[নারী অধিকার সম্পর্কিত আরও আয়াত – অধ্যায় নং: ২৬ এ উল্লেখিত হয়েছে]
‘ইসলামোফোবিয়া’: ইসলামের বিরুদ্ধে অপপ্রচার
ইসলাম ধর্মের সূচনা লগ্ন থেকেই বিরুদ্ধবাদীরা ইসলামের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালিয়ে আসছে। ইদানীংকালে এ অপপ্রচার নতুন এক রূপ ধারন করেছে। শীতল যুদ্ধের পরবর্তী রণ—উন্মাদনার এ এক নতুন সংস্করণ। বিগত শতকে দুটি গরম বিশ্বযুদ্ধ সংঘটিত হওয়ার পর ‘কম্যুনিজম–ভীতিকে’ কেন্দ্র করে পশ্চিমা বিশ্বে যে শীতল যুদ্ধের সূচনা হয়েছিল, সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর নব্বইয়ের দশকে তার অবসান ঘটে। আর তখনই পাশ্চাত্যে জন্ম নেয় ‘ইসলামোফোবিয়া’ বা ‘ইসলাম-ভীতি’ নামক এক নব্য জুজুর।
ইসলামোফোবিয়া নামক এ ধারণাটি প্রথম প্রকাশ পায় ১৯৯১ খৃষ্টাব্দে বৃটেনের ‘রানিমেড ট্রাস্ট প্রতিবেদনে’। এ প্রতিবেদনে একে “মুসলিম জনগোষ্ঠীর প্রতি ভিত্তিহীন বৈরিতা, এবং এ কারণে ভীতি অথবা সকল বা অধিকাংশ মুসলমানের প্রতি বিরূপ মনোভাব” বলে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। এর পরিণতিতে পাশ্চাত্য সমাজে মুসলিম সম্প্রদায়কে বর্জন (exclusion) ও বৈষম্যের (discrimination) সম্মুখীন হতে হচ্ছে।
প্রতিবেদনটির বর্ণনা অনুযায়ী বৃটেন এবং ইউরোপের দেশগুলোতে মুসলিম জনগণের প্রতি সাধারণভাবে যেসব বিরূপ মানসিকতা পোষণ করা হয় তা হলো:
- ইসলাম একটি অনড় একত্ববাদী ধর্ম যা নতুন কোন বাস্তবতার সাথে মিশে না;
- সর্বজনীন মূল্যবোধগুলোকে অন্য ধর্মবিশ্বাসের সাথে ভাগাভাগি (share) করে না;
- ইসলাম ধর্ম হিসেবে পাশ্চাত্যের নিকট নিম্ন মানের, সেকেলে, বর্বর এবং অমূলদ;
- ইসলাম সহিংস ধর্ম ও জঙ্গীবাদের সমর্থক, এবং এটি একটি উগ্রবাদী আদর্শ।
‘ইসলামোফোবিয়ার’ একটি কার্যকর সংজ্ঞা দিতে গিয়ে ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণা পত্রে বলা হয়েছে যে:
“Islamophobia is a contrived fear or prejudice fomented by the existing Eurocentric and Orientalist global power structure. It is directed at a perceived or real Muslim threat through the maintenance and extension of existing disparities in economic, political, social and cultural relations, while rationalizing the necessity to deploy violence as a tool to achieve “civilizational rehab” of the target communities (Muslim or otherwise). Islamophobia reintroduces and reaffirms a global racial structure through which resource distribution disparities are maintained and extended.” (Islamophobia Research & Documentation Project: DEFINING “ISLAMOPHOBIA”, Published by University of California, or else Berkely: Center for Race & Gender) |
অর্থাৎ “এটি একটি বানোয়াট ভীতি বা কুসংস্কার যা অধুনা ইউরোপীয় সভ্যতা ও সংস্কৃতির আত্মম্ভরিতা–প্রসূত ধারণা এবং প্রাচ্যদেশীয় বৈশ্বিক ক্ষমতা কাঠামো দ্বারা উদ্দীপিত। বর্তমান অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বৈষম্যের ধারা বজায় থাকা ও এর বিস্তার ঘটা এটাকে একটি ধারণা—প্রসূত অথবা বাস্তব মুসলিম হুমকির দিকে পরিচালিত করছে। পক্ষান্তরে, তা মুসলমান অথবা অন্য কারোর জন্য “সভ্যতায় পুনর্বাসন” লাভের হাতিয়ার হিসেবে শক্তি প্রয়োগের প্রয়োজনীয়তাকে যৌক্তিক করে তোলেছে। ইসলামোফোবিয়া একটি বৈশ্বিক জাতিগত কাঠামোকে পুনস্থাপিত ও পুনর্ব্যক্ত করেছে যার মাধ্যমে সম্পদের বৈষম্যমূলক বন্টন বজায় থাকছে ও বিস্তৃত হচ্ছে।”
আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা অক্সফাম সম্পদের অসম বন্টন নিয়ে তাদের গবেষণা পত্রে বলেছে, ‘বিশ্বে যত সম্পদ আছে তার প্রায় অর্ধেক সম্পদ এখন ধনকুবের ১ শতাংশ মানুষের হাতে। বাকি অর্ধেক ৯৯ শতাংশ লোকের হাতে।’ আর পশ্চিমা বিশ্বের ধনকুবেরদের হাতেই এ সম্পদের পাহাড় গড়ে ওঠেছে। বিধ্বংসী মারণস্ত্রের ব্যবসায়ীরাই এসব ধনকুবেরদের অন্তর্ভূক্ত। এরাই তাদের কায়েমী স্বার্থে বিভিন্ন জুজুর ভয় দেখিয়ে, বিশ্ব শান্তিকে অস্থিতিশীল রেখে ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করছে।
ইসলামের বিরুদ্ধবাদীরা ‘ইসলামোফোবিয়ার’ নামে যে অপপ্রচার চালিয়ে আসছে তা সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। এরা হীন স্বার্থে নিজেদেরকে মানবতাবাদি, শান্তিবাদি ও সংস্কারক হিসেবে জাহির করার শঠতাপূর্ণ প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে — অথচ তারাই বিশ্বব্য়াপী যুদ্ধ ও অশান্তি সৃষ্টির মূল হোতা। প্রথম ও দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ এবং বিভিন্ন আঞ্চলিক যুদ্ধ যেমন কোরিয়ান ওয়ার, ভিয়েতনাম ওয়ার ও মধ্য়প্রাচ্য়ের চলমান যুদ্ধসমূহ এসবের প্রকৃষ্ট প্রমাণ। এসব যুদ্ধে ব্যবহৃত হচ্ছে মানব–বিধ্বংসী সব মারণাস্ত্র, এমন কি পরমাণু বোমা ব্যবহৃত হয়েছে জাপানের বিরুদ্ধে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে। এদের মারণাস্ত্র ও বিধ্বংসী বোমার আঘাতে হারিয়ে গেছে লক্ষ–কোটি মানুষের প্রাণ, ধ্বংস হয়েছে অসংখ্য জনপদ এবং বিপর্যস্ত হয়েছে প্রাকৃতিক পরিবেশ। তাদের হাতেই সঞ্চিত আছে পরমাণু অস্ত্রের ভান্ডার যা সমগ্র বিশ্ব সভ্যতাকে দুনিয়ার বুক থেকে মুছে দিতে সক্ষম।
মানবসমাজে “সংস্কার” (ইসলাহ) ও “অশান্তি/দুর্নীতি” (ফাসাদ) — এই দুইটি বিপরীতধর্মী প্রবণতা যুগে যুগে বিদ্যমান। পবিত্র কুরআন স্পষ্টভাবে দেখিয়েছে, অনেক সময় কিছু মানুষ নিজেদেরকে সংস্কারক (মুস্লিহ) হিসেবে উপস্থাপন করে, অথচ বাস্তবে তারা সমাজে ফাসাদ (বিশৃঙ্খলা ও নৈতিক অবক্ষয়) সৃষ্টি করে।
এতদ্সংক্রান্ত কুরআনের আয়াতসমূহ নিম্নে পেশ করা হলো:
وَإِذَا قِيلَ لَهُمْ لَا تُفْسِدُوا فِي الْأَرْضِ قَالُوا إِنَّمَا نَحْنُ مُصْلِحُونَأَلَا إِنَّهُمْ هُمُ الْمُفْسِدُونَ وَلَـٰكِن لَّا يَشْعُرُونَ
“যখন তাদেরকে বলা হয়—পৃথিবীতে ফাসাদ সৃষ্টি করো না, তারা বলে—আমরা তো সংশোধনকারী। সাবধান! তারাই ফাসাদকারী, কিন্তু তারা তা উপলব্ধি করে না।” (সূরাহ বাক্বারাহ, ২:১১–১২)
এই আয়াতটি মানবচরিত্রের যে গভীর মনস্তাত্ত্বিক বাস্তবতা উন্মোচন করে তা হলো ‘আত্মপ্রবঞ্চনা’ (self-deception)।
নৈতিক অবক্ষয় সৃষ্টি করা, সত্যকে বিকৃত করা এবং অন্যায়ের বিস্তার ঘটানোর মাধ্যমে মানব সমাজের শান্তি ও শৃঙ্খলা নষ্ট করা সম্পর্কে পবিত্র কুরআন ঘোষণা করে:
وَلَا تُفْسِدُوا فِي الْأَرْضِ بَعْدَ إِصْلَاحِهَا وَادْعُوهُ خَوْفًا وَطَمَعًا
“পৃথিবীতে সংশোধনের পর তোমরা সেখানে অনর্থ সৃষ্টি করো না…” (সূরাহ আ‘রাফ, ৭:৫৬)
অর্থাৎ, আল্লাহ্ মানবসমাজে সত্য প্রতিষ্ঠা, ন্যায়বিচার কায়েম ও মানুষের মধ্যে শান্তি ও কল্যাণ বিস্তার ঘটানোর লক্ষ্যে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দিয়েছেন; অথচ ফাসাদকারীরা সেই ভারসাম্য ভেঙে দেয়ার প্রচেষ্টায় রত।
এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ্ বলেন,
إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُ بِالْعَدْلِ وَالْإِحْسَانِ وَإِيتَاءِ ذِي الْقُرْبَىٰ وَيَنْهَىٰ عَنِ الْفَحْشَاءِ وَالْمُنكَرِ وَالْبَغْيِ ۚ يَعِظُكُمْ لَعَلَّكُمْ تَذَكَّرُونَ
“আল্লাহ ন্যায়পরায়ণতা, সদাচরণ এবং আত্নীয়-স্বজনকে দান করার আদেশ দেন এবং তিনি অশ্লীলতা, অসঙ্গত কাজ এবং অবাধ্যতা করতে বারণ করেন। তিনি তোমাদের উপদেশ দেন যাতে তোমরা স্মরণ রাখ।” (সূরা নহল, ১৬:৯০)
এদের উদ্দেশ্য হলো ক্ষমতা কুক্ষিগত করার মাধ্যমে দখলদারিত্ব বজায় রাখা এবং অবৈধ সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলা। ক্ষমতা পেলেই এদের আচরণ ধ্বংসাত্মক রূপ ধারণ করে। এরা পার্থিব স্বার্থে ক্ষমতা ও প্রভাব বিস্তারের জন্য সত্যকে বিকৃত করে।
এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ্ বলেন,
وَإِذَا تَوَلَّىٰ سَعَىٰ فِي الْأَرْضِ لِيُفْسِدَ فِيهَا وَيُهْلِكَ الْحَرْثَ وَالنَّسْلَ ۗ وَاللَّهُ لَا يُحِبُّ الْفَسَادَ
“যখন ফিরে যায় তখন চেষ্টা করে যাতে সেখানে অকল্যাণ সৃষ্টি করতে পারে এবং শস্যক্ষেত্র ও প্রাণনাশ করতে পারে। আল্লাহ ফাসাদ ও দাঙ্গা-হাঙ্গামা পছন্দ করেন না। (সূরাহ বাক্বারাহ, ২:২০৫)كُلَّمَا أَوْقَدُوا نَارًا لِّلْحَرْبِ أَطْفَأَهَا اللَّهُ ۚ وَيَسْعَوْنَ فِي الْأَرْضِ فَسَادًا ۚ وَاللَّهُ لَا يُحِبُّ الْمُفْسِدِينَ
“তারা যখনই যুদ্ধের আগুন প্রজ্জ্বলিত করে, আল্লাহ তা নির্বাপিত করে দেন। তারা দেশে অশান্তি উৎপাদন করে বেড়ায়। নিশ্চয়ই আল্লাহ ফাসাদ সৃষ্টিকারীদের পছন্দ করেন না।” (সূরাহ মায়িদাহ, ৫:৬৪)
ফাসাদ বনাম সংস্কার (ইসলাহ): ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে ও পবিত্র কুরআনের আলোকে বিশ্লেষণ
পবিত্র কুরআনের ভাষায় “ফাসাদ” হলো এমন সব কার্যকলাপ, যা মানুষের নৈতিকতা, সামাজিক ভারসাম্য ও আল্লাহ্র নির্ধারিত বিধানকে ধ্বংস করে। অন্যদিকে “ইসলাহ” হলো—সত্য, ন্যায় ও কল্যাণ প্রতিষ্ঠাকল্পে সর্বোতভাবে প্রচেষ্টা চালানো।
“যখন তাদেরকে বলা হয়—পৃথিবীতে ফাসাদ সৃষ্টি করো না, তারা বলে—আমরা তো সংস্কার করছি। মনে রেখো, তারাই হাঙ্গামা সৃষ্টিকারী, কিন্তু তারা তা উপলব্ধি করে না।” (সূরাহ-বাক্বারাহ, ২:১১–১২)
“আর ধর্মের ব্যাপারে ফেতনা–ফ্যাসাদ সৃষ্টি করা নরহত্যা অপেক্ষাও মহাপাপ।” (সূরাহ-বাক্বারাহ, ২:২১৭)”
“যে কেউ প্রাণের বিনিময়ে প্রাণ অথবা পৃথিবীতে অনর্থ সৃষ্টি করা ছাড়া কাউকে হত্যা করে সে যেন সব মানুষকেই হত্যা করে। এবং যে কারও জীবন রক্ষা করে, সে যেন সবার জীবন রক্ষা করে (সূরাহ মায়েদাহ, ৫:৩২)”
“তোমরা কাফেরদেরকে পৃথিবীতে পরাক্রমশালী মনে করো না। তাদের ঠিকানা অগ্নি। কতই না নিকৃষ্ট এই প্রত্যাবর্তনস্থল।” (সূরাহ আন নূর, ২৪:৫৭)
শিক্ষণীয় বিষয়: সব সংস্কারই প্রকৃত সংস্কার নয়—সত্যের মানদণ্ডে নিরূপিত হবে সংস্কার — এটাই আল্লাহ্র নির্দেশনা।
ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে অতীত জাতিসমূহের অবস্থা
(ক) নূহ (আঃ)–এর জাতি: তারা নিজেদের সামাজিক ব্যবস্থাকে সঠিক মনে করত, কিন্তু বাস্তবে শিরক ও অন্যায়ে নিমজ্জিত ছিল।
ফলাফল: এর পরিণতিতে সর্বশক্তিমান আল্রাহ্ মহাপ্লাবন দ্বারা এদেরকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দিলেন।
(খ) ‘আদ ও সামূদ জাতি: এ দুই জাতি উন্নত সভ্যতার অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও তারা অহংকারে মত্ত হয়ে সত্য প্রত্যাখ্যান করেছিল।
শিক্ষণীয় বিষয়: প্রযুক্তি বা শক্তি নয়—নৈতিকতাই টিকে থাকার মূল শর্ত।
(গ) ফেরাউনের শাসনব্যবস্থা: ফেরাউন নিজেকে সংস্কারক দাবি করত:
“…ফেরাউন বলল, আমি যা বুঝি, তোমাদেরকে তাই বোঝাই, আর আমি তোমাদেরকে মঙ্গলের পথই দেখাই।” (সূরাহ মু’মিন, ৪০:২৯)
বাস্তবতা: চরম জুলুম, দাসত্ব ও নির্যাতন চালিয়েছিল বনি ইসরাঈল জাতির প্রতি।
পরিণতি: ফেরাউন তার সৈন্য ও লোকলস্করসহ সাগরে ডুবে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল।
নববী যুগ: প্রকৃত ইসলাহের মডেল
সর্বশেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সা) এর মিশন ছিল প্রকৃত ইসলাহ প্রতিষ্ঠা করা:
- তিনি বহু ঈশ্বরবাদ ও মূর্তিপূজা থেকে মুক্ত করে তাওহীদ বা আল্লাহর একত্ববাদ প্রতিষ্ঠা করেন।
- তিনি গোত্রীয় বিভেদ থেকে মুক্ত করে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করেন।
- অন্যায় ও অবিচার থেকে মুক্ত করে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করেন।
একটি অনন্য উদাহরণ: মক্কা বিজয়ের মাধ্যমে শাসন ক্ষমতা অর্জনের পরও তাঁর ও তাঁর অনুসারীগণের উপর চরম নির্যাতন, হত্যা ও যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার প্রতিশোধ না নিয়ে নবী হযরত মুহাম্মদ (সা) মক্কার কুরাইশদেরকে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেন।
এটি প্রমাণ করে: ইসলাহ ধ্বংস নয়—সংস্কার ও পুনর্গঠন।
সমকালীন কেস স্টাডি
আজকের বিশ্বে “ফাসাদ” নতুন রূপে প্রকাশ পাচ্ছে:
(১) তথ্য বিভ্রান্তি (Misinformation): মিথ্যাকে সত্য হিসেবে প্রচার—সামাজিক বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে।
(২) নৈতিক অবক্ষয়কে স্বাভাবিকীকরণ: অন্যায়কে “স্বাধীনতা” হিসেবে উপস্থাপন করা।
(৩) সহিংসতাকে আদর্শ হিসেবে প্রচার: কিছু গোষ্ঠী “সংস্কার” বা “মুক্তি”র নামে ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপ চালায়।
এগুলো হলো আধুনিক “ফাসাদ”-যার প্রকৃষ্ট উদাহরণ হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের গাযা, ফিলিস্তিন ও অন্যান্য় দেশগুলোর বিরুদ্ধে চলমান আগ্রাসন।
তুলনামূলক বিশ্লেষণ
| বিষয় | ফাসাদ | ইসলাহ |
|---|---|---|
| ভিত্তি | প্রবৃত্তি, স্বার্থ | আল্লাহ্র নির্দেশনা |
| উদ্দেশ্য | ক্ষমতা, বিভ্রান্তি | ন্যায়, শান্তি |
| পদ্ধতি | মিথ্যা, জুলুম | সত্য, নৈতিকতা |
| ফলাফল | ধ্বংস | স্থিতিশীলতা ও কল্যাণ |
গভীর মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ
ফাসাদের একটি বড় কারণ হলো আত্মপ্রবঞ্চনা — মানুষ ভুল করেও মনে করে সে সঠিক।
“তারাই সে লোক, যাদের প্রচেষ্টা পার্থিবজীবনে বিভ্রান্ত হয়, অথচ তারা মনে করে যে, তারা সৎকর্ম করেছে।।” (সূরা আল-কাহফ ১৮:১০৪)
আধুনিক মনোবিজ্ঞানে একে বলা হয়: Cognitive Bias (বোধগত বিভ্রান্তি)
পবিত্র কুরআনের সমাধান: ইসলাহ প্রতিষ্ঠার পথ
- সঠিক জ্ঞান: সঠিক জ্ঞান অর্জনের মাধ্য়েমেই ইসলাহ প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
“যে বিষয়ে তোমার কোন জ্ঞান নেই, তার পিছনে পড়ো না। নিশ্চয় কান, চক্ষু ও অন্তঃকরণ এদের প্রত্যেকটিই জিজ্ঞাসিত হবে।” (সূরাহ বনি ইসরাঈল, ১৭:৩৬)
- আত্মশুদ্ধি: নফসের নিয়ন্ত্রণ ছাড়া সমাজ সংস্কার সম্ভব নয়।
- ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা: সামাজিক সাম্য ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই তা সম্ভব।
“আল্লাহ ন্যায়পরায়ণতা, সদাচরণ এবং আত্নীয়-স্বজনকে দান করার আদেশ দেন এবং তিনি অশ্লীলতা, অসঙ্গত কাজ এবং অবাধ্যতা করতে বারণ করেন। তিনি তোমাদের উপদেশ দেন যাতে তোমরা স্মরণ রাখ।” (সূরাহ নহল, ১৬:৯০)
- সামাজিক দায়িত্ববোধ: যখন একটি সমাজে দায়িত্ববোধ জাগ্রত হবে তখনই সংস্কারের পথ খুলে যাবে।
“তোমরাই হলে সর্বোত্তম উম্মত, মানবজাতির কল্যানের জন্যেই তোমাদের উদ্ভব ঘটানো হয়েছে। তোমরা সৎকাজের নির্দেশ দান করবে ও অন্যায় কাজে বাধা দেবে এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান আনবে।” (সূরাহ আলে ইমরান, ৩:১১০)
- বর্তমান যুগে প্রয়োগ: পবিত্র কুরআনের নির্দেশ অনুযায়ী একজন সচেতন মুসলমানের দায়িত্ব:
-
- সত্যাসত্য যাচাইপূর্বক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা,
-
- মিথ্যার প্রচার ও প্রসার না করা:
“তোমরা মিথ্যার আবরণে সত্যকে আবৃত করোনা এবং জানা সত্ত্বেও সত্যকে তোমরা গোপন করো না।” (সূরাহ বাক্বারাহ, ২:৪২)
“তোমাদের আগে অতীত হয়েছে অনেক ধরনের জীবনাচরণ। তোমরা পৃথিবীতে ভ্রমণ কর এবং দেখ যারা মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে তাদের পরিণতি কি হয়েছে।” (সূরাহ আলে ইমরান, ৩:১৩৭)
-
- সমাজে নৈতিকতার প্রতিষ্ঠা করা এবং এর প্রসার ঘটানো,
- শান্তি ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় দৃঢ় পদক্ষেপ গ্রহণ ও এর প্রচার ও প্রসার ঘটানো।
“হে ঈমানদারগণ, তোমরা ন্যায়ের উপর প্রতিষ্ঠিত থাক; আল্লাহর ওয়াস্তে ন্যায়সঙ্গত সাক্ষ্যদান কর, তাতে তোমাদের নিজের বা পিতা–মাতার অথবা নিকটবর্তী আত্মীয়–স্বজনের যদি ক্ষতি হয় তবুও। কেউ যদি ধনী কিংবা দরিদ্র হয়, তবে আল্লাহ তাদের শুভাকাঙ্খী তোমাদের চাইতে বেশী। অতএব, তোমরা বিচার করতে গিয়ে রিপুর কামনা–বাসনার অনুসরণ করো না। আর যদি তোমরা ঘুরিয়ে–পেঁচিয়ে কথা বল কিংবা পাশ কাটিয়ে যাও, তবে আল্লাহ তোমাদের যাবতীয় কাজ কর্ম সম্পর্কেই অবগত।” (সূরাহ নিসা, ৪:১৩৫)
উপসংহার : ফাসাদ ও ইসলাহ—এই দুই পথ মানবজাতির সামনে সর্বদা উন্মুক্ত। কুরআন আমাদের শিক্ষা দেয়, প্রকৃত সংস্কার সেই যা আল্লাহ্র নির্দেশনার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
যারা নিজেদেরকে সংস্কারক দাবি করেও সত্যকে বিকৃত করে এবং অন্যায়কে প্রসারিত করে—তারা প্রকৃতপক্ষে ফাসাদকারী।
অতএব, ব্যক্তি ও সমাজ উভয় স্তরে প্রকৃত সফলতা অর্জনের জন্য প্রয়োজন—
- সত্যনিষ্ঠা
- আত্মশুদ্ধি
- এবং আল্লাহ্র বিধান অনুযায়ী জীবন পরিচালনা
চূড়ান্ত বার্তা: ইসলাহ শুরু হয় নিজের ভেতর থেকে—তারপরই তা সমাজে ছড়িয়ে পড়ে।
ইসলাম কেন মধ্যমপন্থী ধর্ম
মহান আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন মনোনীত ধর্ম ইসলাম মানজাতির ইহলৌকিক ও পালৌকিক শান্তি ও কল্যাণের জন্য আবির্ভূত হয়েছে। ইসলাম শব্দের অর্থ শান্তি। শব্দটির মধ্যেই এর নামকরণের সার্থকতা নিহিত রয়েছে। প্রতিদিনের সাক্ষাতে মুসলমানদের পারস্পরিক সম্ভাষণ হলো ‘আস্সালামু আলাইকুম‘ অর্থাৎ আপনার ওপর শান্তি বর্ষিত হোক। এর চেয়ে উত্তম অভিবাদন আর কি হতে পারে?
ইসলাম–পূর্ব যুগগুলোতেও অনেক ধর্মের আবির্ভাব ঘটেছিল। কালের বিবর্তনে সেসব ধর্ম বিকৃতির কবলে পড়ে তাদের মৌলিক চরিত্র ও যুগোপযোগিতা হারিয়ে ফেলে। এ পরিস্থিতিতে একটি পূর্ণাঙ্গ, সর্বজনীন ও শাশ্বত ধর্মের প্রয়োজনকে সামনে রেখেই ইসলামের আবির্ভাব।
সর্বশেষ ধর্ম হিসেবে ইসলাম মানবজাতিকে একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান দিয়েছে, যাতে রয়েছে এ পৃথিবীতে জীবন ধারণের সব রকম দিক–নির্দেশনা। ইসলাম মানুষের স্বভাবগত ধর্ম যাতে জাগতিকতার সাথে রয়েছে আধ্যাত্মিকতার এক অপূর্ব সমন্বয়।
জাগতিক প্রয়োজনকে বিবেচনায় রেখে কিভাবে পরজাগতিক মুক্তি আসবে ইসলাম সেই দিকনির্দেশনাই দেয়। তাইতো ইসলামে যেমন বৈরাগ্যবাদ নেই, তেমনি নেই অতি-ভোগবাদীতা। আবার ইসলাম কার্পণ্যকে যেমন নিষেধ করে, তেমনি অমিতব্যয়িতাকে অনুমোদন করে না। ইসলাম দানশীলতা ও মিতব্যয়িতকে উৎসাহিত করে।
এ ধর্মে আল্লাহ্ মানুষের ওপর তার সাধ্যাতীত কোন বিধান বা দায়িত্ব চাপিয়ে দেন নাই। বরং তিনি সবক্ষেত্রে এমন এক মধ্যমপন্থী নীতি অবলম্বনের তাকিদ দিয়েছেন যাতে নেই কোন চরম পন্থা বা বাড়াবাড়ির স্থান। আল্লাহ্ তাঁর উত্তম নিয়ামতসমূহ তাঁর নির্ধারিত হালাল-হারামের সীমারেখার মধ্যে থেকে ভোগ করার অধিকার মানুষকে দিয়েছেন, কিন্তু সীমালঙ্ঘন করতে নিষেধ করেছেন।
“হে মুমিনগণ, তোমরা ঐসব সুস্বাদু বস্তু হারাম করো না, যেগুলো আল্লাহ তোমাদের জন্য হালাল করেছেন এবং সীমা অতিক্রম করো না। নিশ্চয় আল্লাহ সীমা অতিক্রমকারীদেরকে পছন্দ করেন না।” (সূরাহ মায়েদাহ, ৫:৮৭)
ইসলামের এ বাস্তবধর্মীতাই একে এক সরল ও স্বাভাবিক মানবধর্মে পরিণত করেছে। তাই ইসলামের পথ সহজ সরল পথ, এতে নেই কোন বক্রতা ও জটিলতা। আর প্রতিটি মুসলিম তার প্রতিদিনের নামাযে বারংবার সরল পথ প্রদর্শনের প্রার্থনা জানায় আল্লাহর দরবারে।
ইসলামের আবির্ভাবের পর থেকে চৌদ্দ শত বছর যাবৎ আল্লাহর কিতাব আল–কুরআন ও আল্লাহর নবী হযরত মুহাম্মদের (সাঃ) এর সুন্নাহ (জীবন–যবপন পদ্ধতি) ও তাঁর মুখ নিঃসৃত বাণী আল–হাদীস এ ধর্মের সমুজ্জ্বল আলোবর্তিকা হিসেবে মানবজাতিকে শান্তির দিক–নির্দেশনা দিয়ে যাচ্ছে। ইসলাম যে একটি শান্তিপূর্ণ মধ্যমপন্থী ধর্ম তা ইসলামের প্রকৃত ইতিহাসের দিকে নজর দিলেই উপলব্ধী করা যাবে।
আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন পবিত্র কুরআনে মুসলমানদেরকে এক মধ্যমপন্থী উত্তম জাতি হিসেবে অভিহিত করে বলেন,
“তোমরাই (এই দুনিয়ায়) সর্বোত্তম জাতি, সমগ্র মানব জাতির (কল্যাণের) জন্যই তোমাদের সৃষ্টি করা হয়েছে। (তোমাদের দায়িত্ব হচ্ছে) তোমরা দুনিয়ার মানুষদেরকে সৎ কাজের আদেশ দেবে এবং অসৎ কাজ থেকে বিরত রাখবে, নিজেরাও তোমরা আল্লাহর ওপর (পুরোপুরি) ঈমান আনবে (সূরাহ আলে ইমরান, ৩:১১০)।“
ইসলামের প্রচারক মহান আল্লাহর নবী হযরত মুহাম্মদের (সাঃ) সময় থেকেই শান্তিপূর্ণ মৌলনীতির ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়েছে ইসলামী সমাজ ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা। তাই ইসলামকে বিচার করতে হলে এর প্রচারক নবী মুহাম্মদ (সাঃ) ও খোলাফায়ে রাশেদীনের যুগকেই আদর্শ হিসেবে গণ্য করতে হবে।
এরপর থেকে ইসলামী নীতি অনুযায়ী দেশের শাসন কাজ পরিচালনায় শিথিলতা ও ব্যত্যয় ঘটতে শুরু করে। পরবর্তীকালের মুসলিম শাসকগণ ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে নয়, বরং বংশতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে নিজেদের রাষ্ট্র সীমানা ও প্রতিপত্তি বৃদ্ধির জন্যই তাদের শাসন কাজ পরিচালনা করেছিলেন। তাই এ নিবন্ধের আলোচনা মূলত ইসলামের প্রাথমিক আদর্শিক যুগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। পবিত্র কুরআন ও হাদীসের আলোকে যে ধর্মীয় ও রাষ্ট্রীয় নীতিমালা তখন অনুসরণ করা হতো সেগুলোই নীচে আলোচিত হলো।
ইসলামের শান্তিপূর্ণ নীতিমালা
- ইসলামে মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি হলো ঈমান ও সৎকর্ম। বংশ–মর্যাদা, ঐশ্বর্য, শক্তিমত্তা, সুন্দর চেহারা বা গায়ের উজ্জ্বল রঙ, এর কোনটিই আল্লাহর কাছে শ্রেষ্ঠত্বের মানদন্ড হিসেবে গণ্য নয়। ঈমান ও সৎকর্ম ব্যতীত অন্য কোন প্রকার ভেদাভেদ দ্বারা মানুষের মর্যাদা নির্ধারণের বিধান ইসলামে নেই।
- আল্লাহর আইনে সব মানুষই সমান, আর এ আইন ন্যায়নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত। আপন–পর, ধনী–গরীব, সবল–দুর্বল, জাতপাত ও ধর্ম–বর্ণ নির্বিশেষে সর্বত্র ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করার জোর নির্দেশ এসেছে কুরআন ও হাদীস থেকে।এ প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ্ বলেন,
“আমি আমার রসুলগণকে সুস্পষ্ট নিদর্শনসহ প্রেরণ করেছি এবং তাঁদের সাথে অবতীর্ণ করেছি কিতাব ও ন্যায়নীতি, যাতে মানুষ ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করে।” (সূরাহ হাদীদ, ৫৭:২৫)
- বিদায় হজ্বের ভাষণে নবী করিম (সাঃ) বলেন,
“হে মানবমন্ডলী! আল্লাহ্ বলেছেন, ‘হে মানুষ, আমরা তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি একজন মানব ও একজন মানবী থেকে এবং গোত্র ও জাতিতে বিভক্ত করেছি যাতে তোমরা একে অপরকে চিনতে পার। নিশ্চয় আল্লাহর দৃষ্টিতে তোমাদের মধ্যে সে-ই সবচেয়ে মর্যাদবান যে সবচেয়ে বেশী খোদা-ভীরু।’ সকল মানুষ আদমের বংশধর এবং আদম মাটি থেকে তৈরী। অনারবের ওপর আরবের, আরবের ওপর অনারবের, কালোর ওপর সাদার অথবা সাদার ওপর কালোর কোনই শ্রেষ্ঠত্ব নেই শুধুমাত্র পরহেজগারী ছাড়া।”
- ইসলাম কখনই হত্যা, সংঘাত ও হানাহানিকে প্রশ্রয় দেয় না। মহান আল্লাহ্ পবিত্র কুরআনে বলেছেন:
“আর ধর্মের ব্যাপারে ফেতনা-ফ্যাসাদ সৃষ্টি করা নরহত্যা অপেক্ষাও মহাপাপ।” (সূরাহ বাক্বারাহ, ২:২১৭)
“ধর্মের ব্যাপারে কোন জোর-জবরদস্তি নেই (সূরাহ বাক্বারাহ, ২:২৫৬)”,
“যে কেউ প্রাণের বিনিময়ে প্রাণ অথবা পৃথিবীতে অনর্থ সৃষ্টি করা ছাড়া কাউকে হত্যা করে সে যেন সব মানুষকেই হত্যা করে। এবং যে কারও জীবন রক্ষা করে, সে যেন সবার জীবন রক্ষা করে (সূরাহ মায়েদাহ, ৫:৩২)”।
- জোরপূর্বক ধর্মান্তরিত করা ইসলামে নিষিদ্ধ। আল্লাহ্ ইচ্ছে করলেই সব সম্প্রদায়কে একই জাতি সত্তার অন্তর্ভূক্ত করতে পারতেন, কিন্তু তিনি তা চাননি। তিনি যেমন মানুষকে মতভেদ করার স্বাধীনতা দিয়েছেন, তেমনই সঠিক দিক–নির্দেশনাও দিয়েছেন। এরপরও যারা পথভ্রষ্ট হবে তারা তা নিজ দায়িত্বেই হবে। কিয়ামতের পর বিচার দিবসে আল্লাহ্ এ মতভেদের ফয়সালা করবেন।
“আর তোমার পালনকর্তা যদি ইচ্ছা করতেন, তবে অবশ্যই সব মানুষকে একই জাতিসত্তায় পরিনত করতে পারতেন আর তারা বিভিন্ন ভাগে বিভক্ত হতো না।” (সূরাহ হুদ, ১১:১১৮)
“(হে নবী) বলুনঃ সত্য তোমাদের পালনকর্তার পক্ষ থেকে আগত। অতএব, যার ইচ্ছা, বিশ্বাস স্থাপন করুক এবং যার ইচ্ছা অমান্য করুক। ….” (সূরাহ কাহাফ, ১৮:২৯)
আল্লাহর এসব বাণীই হলো ইসলামের শান্তিপূর্ণ নীতির ভিত্তি। তাই ইসলামের ইতিহাসে ধর্মীয় কারণে গণহত্যার কোন নজীর নেই।
- মুসলিম শরীফে বর্ণিত হাদীসে কুদসীতে রসুল (সাঃ) বলেন,
“আল্লাহ্ বলেছেন, জুলুম করা আমি আমার নিজের জন্য অবৈধ করেছি, তেমনই আমার বান্দাদের জন্যও অবৈধ করেছি।”
- জুলুম, পারস্পরিক হানাহানি বা অশান্তি নয়, বরং মানবজাতির কল্যাণ ও শান্তি অর্জনই ইসলামী জীবন ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য। প্রতিবেশীর সুখ-দুঃখ, অভাব ও কষ্টকে ভাগ করে নিতে ইসলাম নির্দেশ দেয়। প্রতিবেশীর অধিকারের ব্যাপারে ইসলাম অত্যধিক গুরুত্ব আরোপ করেছে। ভ্রাতৃত্ব, সম্প্রীতি ও ভালবাসাপূর্ণ সমাজই ইসলামের কাম্য। তাঁরই প্রণীত ‘মদীনা সনদ’ মদীনায় বসবাসরত সকল ধর্মীয় সম্প্রদায়কে নিয়ে এক শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ও সম্প্রীতির পরিবেশ সৃষ্টি করে।
এক হাদীসে রাসুল (সাঃ) বলেছেন,
“প্রতিবেশী যে ধর্মেরই হোক তাকে অভুক্ত রেখে পেটপুরে খেলে ঈমানদার হওয়া যায় না।“
- মন্দকে মন্দ পন্থায় মোকাবিলা করা ইসলামের নীতি নয়। এ প্রসঙ্গে আল্লাহর নির্দেশ হলো:
“(হে নবী) ভালো আর মন্দ কখনোই সমান হতে পারে না, আপনি ভালো’র দ্বারা মন্দকে প্রতিহত করুন, তাহলেই আপনার মধ্যে এবং যার সাথে আপনার শত্রুতা – তার মধ্যে এমন (অবস্থার সৃষ্টি) হয়ে যাবে যেন সে আপনার অন্তরঙ্গ বন্ধু। আর এ (অবস্থা) শুধু তাদেরই (ভাগ্যে লেখা) থাকে যারা ধৈর্য ধারণ করে এবং এসব লোক তারাই হয় যারা সৌভাগ্যের অধিকারী (সূরাহ হা–মীম সেজদাহ, ৪১:৩৪–৩৫)।”
অন্যত্র মহান আল্লাহ্ তায়ালা তাঁর নবীকে (সাঃ) বলেছেন,
“মন্দকে প্রতিহত করুন সর্বোত্তম পন্থায় (সূরাহ মু’মিনূন. ২৩:৯৬)।”
- রাসুল সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর ব্যক্তিগত জীবন ও রাষ্ট্র পরিচালনায় এ সর্বোত্তম পন্থাটিই অনুসরণ করেছেন। পবিত্র কুরআনের এসব নির্দেশনা ও উদার নীতি শান্তি ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠায় বিরাট অবদান রেখেছে। যার ফলে ইসলাম দ্রুত গতিতে সারা বিশ্বে প্রসার লাভ করতে পেরেছে।
ইসলামের অনুসৃত মধ্যমপন্থা সংঘাতয় বিশ্ব ও বিপন্ন মানবতার জন্য এক বিরাট আশীর্বাদস্বরূপ। মহান আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন তাঁর নবী হযরত মুহাম্মদকে (সাঃ) ’রাহমাতুল্লিল আলামীন’ অর্থাৎ সৃষ্টিকুলের রহমতস্বরূপ এ দুনিয়ায় প্রেরণ করেছেন। তিনি ছিলেন শান্তির প্রতীক এবং শান্তির ধর্ম ইসলামের প্রচারে তাঁর ছিল শান্তিপূর্ণ বলিষ্ঠ ভূমিকা।
মক্কাবাসী কোরেশদের অত্যাচার-নিপীড়নে অতিষ্ট হয়ে তিনি তাঁর অনুসারীদেরকে নিয়ে মদীনায় হিজরত করলেন। সেখানকার মুসলিম জনগণ সসম্মানে তাঁকে ও তাঁর অনুসারীগণকে সৌভ্রাতৃত্বের মর্যাদায় অভিষিক্ত করলেন।
মদীনার সকল গোত্র, ধর্ম ও সম্প্রদায়ের লোকজনকে নিয়ে তিনি একটি শান্তিপূর্ণ সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনের উদ্দেশ্যে একটি সাম্প্রদায়িক সহ–অবস্থানের নীতিমালা সম্বলিত সংবিধান রচনা করলেন যা ইতিহাসে ’মদীনা সনদ’ নামে পরিচিত। তৎকালীন সময়ে তাঁর এ সনদটি ছিল সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ইতিহাসে এক বিস্ময়কর অবদান।
বিশ্বাসে, কথায় ও কাজে একই সরল রৈখিক অবস্থানে থেকে তিনি প্রমাণ করেছেন ইসলাম মধ্যমপন্থী ও শান্তিপূর্ণ ধর্ম এবং এতে নেই কোন বক্রতার অবকাশ।
মদীনা সনদ ও সাম্প্রদায়িক সহ—অবস্থানের নীতিমালাঃ
- ইসলাম ধর্মের প্রবর্তক নবী মুহাম্মদ (সাঃ) চৌদ্দ শত বছর পূর্বে মদীনায় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর সকল ধর্মীয় সম্প্রদায়, গোত্র ও জনগোষ্ঠীকে সাথে নিয়ে ‘মদীনা সনদ’ নামে যে জাতীয় ঐক্য চুক্তি সম্পাদন করেন তা বিশ্ব ইতিহাসে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অমূল্য দলিল হিসেবে চির ভাস্বর হয়ে আছে। এ সনদে সকল নাগরিকের ধর্মীয় অধিকার, জীবন ও সম্পদ রক্ষার অধিকার এবং ন্যায় বিচার লাভের অধিকার সুরক্ষিত করা হয়েছিল।
- মুসলিম রাষ্ট্রে বসবাসকারী অমুসলিম যারা জিম্মী নামে পরিচিত, তারা ছিল রাষ্ট্রের পবিত্র আমানত। আল্লাহ্ ও তাঁর নবীর (সাঃ) নামের শপথ দ্বারা তাদের জীবন ও সম্পদ ছিল সুরক্ষিত। ন্যায় বিচার লাভে ছিল তাদের পূর্ণ অধিকার। এ ধরনের ভূরিভূরি দৃষ্টান্ত রয়েছে সে সময়ের ইতিহাসে। পবিত্র হাদীসে নবী করিম (সাঃ) সতর্ক করে বলেছেন,
“কেহ কোন জিম্মিকে অন্যায়ভাবে হত্যা করলে বেহেশতের গন্ধও শুঁকতে পাবে না (নাসায়ী)।” অন্য হাদীসে আল্লাহর নবী (সাঃ) বলেন, “নিষ্ঠুরতা ও অন্যায়কে পরিহর করে চলো, ….. এবং লোভ ও কার্পণ্য থেকে নিজেদেরকে রক্ষা করো, কারণ এগুলোই তোমাদের পূর্ববর্তী জাতিগুলোকে ধ্বংস করে দিয়েছে।” (রিয়াদুস সালেহীন)
- ইসলামের দ্বিতীয় খলীফা হযরত ওমর (রাঃ) যখন নামাযে ইমামতি করছিলেন তখন একজন অমুসলিম বিষ-মাখা ছুরি দিয়ে তাঁকে আহত করে। এ অবস্থায় তাঁর মৃত্যু আসন্ন হয়ে পড়ে। মৃত্যু শয্যায় তিনি অমুসলিমদের ওপর প্রতিশোধের আশংকায় উদ্বিগ্ন হয়ে বললেন, “
ইসলামী রাষ্ট্রের অন্তর্ভূক্ত যে জনগোষ্ঠী (অমুসলিম জিম্মিী) আল্লাহ্ ও তাঁর নবীর (সাঃ) নামে সুরক্ষাপ্রাপ্ত তাদের পক্ষ থেকে আমি তোমাদেরকে নির্দেশ দিচ্ছি যে, তাদের ব্যাপারে আমাদের শপথ পালন করতেই হবে, তাদের রক্ষার ব্যাপারে আমাদেরকে লড়াই করতে হবে, এবং তাদের ওপর সাধ্যাতীত কোন বোঝা চাপানো যাবে না।”
- সপ্তম শতাব্দীতে ইসলাম জাহানের খলীফা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ব্যাপারে উদারতার যে পরাকাষ্ঠা দেখিয়েছিলেন তারই বিপরীত দৃশ্যটি দেখা যায় বিংশ শতাব্দীতে। এক শিখ দেহরক্ষীর হাতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী হত্যাকান্ডের পরবর্তী প্রতিশোধমূলক নৃশংস ঘটনায় সংখ্যালঘু শিখ সম্প্রদায়ের তিন হাজার মানুষ সরকারী ছত্রছায়ায় গণহত্যার শিকার হয়েছিল। মুসলিম সংখ্যালঘুরাও ভারতে প্রতি নিয়ত একই ধরনের হত্যার শিকার হচ্ছে।
- সংখ্যলঘুদের ব্যাপারে ইসলামের উদারতা ইতিহাসের পাতায় চিরদিন এক সমুজ্জ্বল ও অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। খৃষ্টান, ইহুদী ও অন্যান্য জনগোষ্ঠী মুসলমান সাম্রাজ্যে শত শত বছর এক সাথে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করেছে। তারা ধর্মীয় স্বাধীনতার সাথে তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের সুযোগ পেয়েছে।
- ইসলামের নামে ভিন্ন ধর্মাবলম্বী কাউকে হত্যা করার অনুমোদন কখনও ছিল না। ভারত সাম্রাজ্যে আট শত বছর মুসলিম শাসন বিরাজ করলেও মুসলমানরা সব সময় সংখ্যালঘুই ছিল। খৃষ্টান ধর্মীয়-যুদ্ধারা (crusaders) ১০৯৯ সালে যখন জেরুযালেম মুসলিমদের নিকট থেকে দখল করে তখন তারা সেখানে গণহত্যা চালিয়ে সব মুসলিম ও ইহুদী জনগোষ্ঠীকে হত্যা করে। অথচ ১৪৫৩ সালে ওটোমান সুলতান দ্বিতীয় মুহাম্মদ যখন খৃষ্টান শাসিত কন্সটান্টিনোপল (বর্তমান ইস্তাম্বুল) জয় করেন তখন সকল খৃষ্টান নাগরিককে ধর্মীয় স্বাধীনতা প্রদান করেছিলেন।
- ইসরাইলী সাংবাদিক, মানবতাবাদী ও ইসরাইলী সংসদ ‘নেসেটের’ প্রাক্তন সদস্য ইউরি এভনারী দুইটি উদ্ধৃতি প্রমাণ করে ইসলাম অমুসলিমদের ব্যাপারে কতটা উদার ও মানবতাবাদী ছিল। স্পেনে মুসলিম শাসনামলে অন্য ধর্মাবলম্বীদের অবস্থা বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, “মুসলিম স্পেন ছিল ইহুদীদের জন্য এক স্বর্গরাজ্য, এবং মুসলিম বিশ্বে ইহুদী হত্যাযজ্ঞ (Holocaust) কখনও সংঘটিত হয়নি। এমনকি হত্যাকান্ডের ঘটনাও ছিল খুবই নগণ্য। মুহাম্মদের (সাঃ) নির্দেশ ছিল আহলে–কিতাবদের (কিতাবধারী ইহুদী ও খৃষ্টান সম্প্রদায়) সাথে সহিষ্ণু আচরণ করতে হবে এমন সব শর্তাধীনে যা ছিল অতুলনীয় ও আধুনিক ইউরোপীয় আচরণের তুলনায় বেশী উদার। মুসলমানেরা কখনোই ইহুদী ও খৃষ্টানদের ওপর তাদের ধর্ম জোরপূর্বক চাপিয়ে দেয়নি, বরং বাস্তবে দেখা গেছে, ক্যাথলিক স্পেন থেকে যেসব ইহুদীদেরকে বহিষ্কার করা হয়েছিল তারা মুসলিম দেশগুলোতে বসতি স্থাপন করেছে এবং সেখানে সমৃদ্ধি লাভ করেছে।”
- অপর একটি নিবন্ধে তিনি বলেন, “প্রতিটি সৎ ইহুদী যিনি তার জাতির ইতিহাস জানেন, ইসলামের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা অনুভব না করে পারবেন না এ জন্য যে, ইসলাম ইহুদীদেরকে পঞ্চাশ প্রজন্ম পর্যন্ত সুরক্ষা দিয়েছে, যেখানে খৃষ্টান জগৎ বহুবার ‘তরবারীর দ্বারা‘ ইহুদীদের ওপর নির্যাতন-নিপীড়ন চালিয়েছে যাতে তারা তাদের ধর্মীয় বিশ্বাস পরিত্যাগ করে।” (মুহাম্মদʼস সোর্ড : সেপ্টেম্বর ২৭, ২০০৬)
এর বিপরীতে অকৃতজ্ঞ ইহুদী জাতি ফিলিস্তিনের মুসলিম জনগোষ্ঠীর ওপর যে নির্মম ও বর্বর নিপীড়ন ও হত্যাকান্ড চালাচ্ছে তাতে বিশ্ববাসী হতবাক।
নফসের বিরুদ্ধে জিহাদ: প্রবৃত্তি দলনে এক বড় জিহাদ
“শপথ নফসের এবং যিনি তা সুবিন্যস্ত করেছেন তাঁর, অতঃপর তাকে (নফসকে) তার জন্য কোনটি মন্দ ও কোনটি ভাল তা বোঝার জ্ঞান দান করেছেন, প্রকৃতপক্ষে সেই সফলকাম হয় যে নিজেকে পরিশুদ্ধ করে নেয়। এবং যে নিজেকে কলুষিত করে, সে ব্যর্থ হয়” (সূরাহ আশ–শামস, ৯১: ৭–১০)।
জিহাদ একটি ব্যাপক অর্থবোধক শব্দ। সাধারণ অর্থে একে ধর্মীয় লড়াই বা যুদ্ধ বলা হয়। বহিঃশত্রুর আক্রমণ ও আগ্রাসনের বিরুদ্ধে এবং ফেতনা-ফ্যাসাদ দূরীভূত করার জন্য রাষ্ট্র পরিচালিত যুদ্ধই জিহাদ নামে পরিচিত। অন্যায়, অবিচার, জলুম ও অত্যাচার প্রতিহত করে ন্যায় ও শান্তি প্রতিষ্ঠিত করাই জিহাদের লক্ষ্য। প্রকৃত অর্থে আল্লাহর পথে সব চেষ্টা, সাধনা ও সংগ্রামকেও জিহাদ বলা হয়। নফসের বিরুদ্ধে জিহাদও এর অন্তর্ভূক্ত।
নফসকে অর্থাৎ নিজ ব্যক্তিসত্তাকে নিয়ন্ত্রণ, পরিশুদ্ধ ও কলুষমুক্ত রাখার জন্য মু’মিনের অন্তরে যে নিরন্তর সংগ্রাম ও চেষ্টা–সাধনা চলতে থাকে তাই হলো ‘নফসের বিরুদ্ধে জিহাদ’।
- প্রবৃত্তি দলনে নফসের বিরুদ্ধে সংগ্রামকে হাদীস শরীফে ‘বড় জিহাদ’ নামে অভিহিত করা হয়েছে। এক হাদীসে আল্লাহর রাসূল (সা) বলেন,
“মুজাহিদ সেই ব্যক্তি যে সর্বশক্তিমান মহামহিম আল্লাহর আনুগত্য পালনে নিজ নফসের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে।“ (তিরমিজী ও ইবনে মাজা হাদীস গ্রন্থ)
নফস একটি ব্যক্তিসত্তা বা প্রবৃত্তি যা মানুষের প্রাণ সত্তার সাথে অঙ্গীভূত থাকে। সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহ মানুষকে শুধুমাত্র সাধারণ প্রাণী হিসেবেই সৃষ্টি করেননি। তিনি তাকে সৃষ্টির সেরা জীবের মর্যাদা দিয়েছেন, করেছেন বিবেকবুদ্ধি সম্পন্ন। তাকে আরো দিয়েছেন চিন্তার স্বাধীনতা ও বোঝার মত জ্ঞান যাতে সে সত্য-মিথ্যা ও ভাল–মন্দ, সত্য–মিথ্যা যাচাই বাছাই করে সঠিক পথে চলতে পারে। তিনি মানুষের মধ্যে বিরাজমান ব্যক্তিসত্তা বা নফসকে কিছুটা স্বাধীনতা দিয়েছেন, সে ইচ্ছে করলে নিজেকে সঠিক পথেও চালাতে পারে অথবা ভুল পথেও পরিচালিত করতে পারে।
প্রতিটি মানুষের নফসে পরস্পর বিরোধী দু’টি প্রেরণা কাজ করে:
- এর একটি তাকে সৎ কাজ ও চিন্তা–ভাবনার প্রেরণা জোগায়, অপরটি তাকে মন্দ বা অসৎ কর্ম ও চিন্তায় উদ্বুদ্ধ করে। ঐশী বা সৎ প্রেরণার দ্বারা মানবিক সত্তার উন্মেষ ঘটে, বিবেকবোধের সৃষ্টি হয়, – যা তাকে তার জীবনের লক্ষ্য, উদ্দেশ্য, দায়িত্ব, কর্তব্য ও শেষ পরিণতি সম্পর্কে সচেতন করে তোলে। এ ধরনের সচেতন মানুষ তাদের স্বাধীন ব্যক্তিসত্তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে এবং নিজেকে সৎ কাজ ও চিন্তায় নিয়োজিত করে।
- আর কিছু বেপরোয়া মানুষ আছে তারা মন্দ প্রেরণা দ্বারা ষড়রিপুর বশীভূত হয়ে তার পাশবিক সত্তাকে জাগিয়ে তোলে। এরা তখন কুপ্রবৃত্তির তাড়নায় বিবেকবোধ হারিয়ে নিজেকে পাপ-পঙ্কিলতায় জড়িয়ে ফেলে।
যারা কুপ্রবৃত্তিকে দমন করে সৎ চিন্তা ও কর্মের চেষ্টা সাধনায় নিজেদেরকে নিয়োজিত রাখে তাদের সম্পর্কে আল্লাহ্ বলেন,
“তারা আল্লাহর প্রতি ও ক্বিয়ামত দিবসের প্রতি বিশ্বাস রাখে এবং কল্যাণকর বিষয়ের নির্দেশ দেয়; অকল্যাণ থেকে বারণ করে এবং সৎকাজের জন্য সাধ্যমত চেষ্টা করতে থাকে।” (সূরাহ আলে ইমরান, ৩: ১১৪)
””” “অতএব, তোমরা বিচার করতে গিয়ে রিপুর কামনা–বাসনার অনুসরণ করো না। আর যদি তোমরা ঘুরিয়ে–পেঁচিয়ে কথা বল কিংবা পাশ কাটিয়ে যাও, তবে আল্লাহ তোমাদের যাবতীয় কাজ কর্ম সম্পর্কেই অবগত।” (সূরাহ নিসা, ৪:১৩৫)
নিজ ব্যক্তিসত্তাকে অর্থাৎ নফসকে নিয়ন্ত্রণ, পরিশুদ্ধ ও কলুষমুক্ত রাখার জন্য মু’মিনের অন্তঃকরণে নিরন্তর যে সংগ্রাম ও চেষ্টা–সাধনা চলতে থাকে তাকেই ‘নফসের বিরুদ্ধে জিহাদ’ বলা হয়।
তিরমিজী ও ইবনে মাজা হাদীস গ্রন্থে উল্লেখিত এক হাদীসে আল্লাহর রসুল (সাঃ) বলেন,
“মুজাহিদ সেই ব্যক্তি যে সর্ব শক্তিমান মহামহিম আল্লাহর আনুগত্য পালনে নিজ নফসের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে।”
তিরমিজী শরীফে বর্ণিত অপর এক হাদীসে নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নফস প্রসঙ্গে বলেন,
“মানব সত্তার মধ্যে দু’টি অনুপ্রেরণা কাজ করে, একটি আসে একজন ফেরেশতার কাছ থেকে যে কল্যাণের দিকে আহ্বান করে এবং সত্যকে সমর্থন দেয়। যে তা পেয়েছে সে যেন জানে এটা এসেছে আল্লাহর তরফ থেকে এবং তাঁর প্রশংসা করে; অন্য অনুপ্রেরণাটি আসে শত্রুর (শয়তান) কাছ থেকে যা তাকে সন্দেহে পতিত করে এবং যা সত্যকে অস্বীকার করে ও কল্যাণকে বাধা দেয়; যে তা পেয়েছে সে যেন অভিশপ্ত শয়তানের হাত থেকে আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করে।” এরপর তিনি নিম্নের আয়াতটি পাঠ করেন:
“শয়তান তোমাদেরকে অভাব অনটনের ভীতি প্রদর্শন করে এবং অশ্লীলতার আদেশ দেয়।” (সূরাহ বাক্বারাহ, ২: ২৬৮)।
“এমনিভাবে অনেক মুশরেকের দৃষ্টিতে তাদের উপাস্যরা সন্তান হত্যাকে সুশোভিত করে দিয়েছে যেন তারা তাদেরকে বিনষ্ট করে দেয় এবং তাদের ধর্মমতকে তাদের কাছে বিভ্রান্ত করে দেয়। ……।” (সূরাহ আন’আম, ৬:১৩৭)
মানুষের অন্তরের উপরোক্ত দু’টি পরস্পর বিরোধী শক্তির ব্যাখ্যায় অপর এক হাদীসে রসুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
“মু’মিনের অন্তর দয়াময় আল্লাহর দু’টি আঙুলের মাঝখানে বিরাজ করে’ (মুসলিম, আহমদ, তিরমিজী, ইবনে মাজা)।
এখানে আঙুল দু’টিকে অন্তরের সংঘাত ও দ্বিধা–দ্বন্দের দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। রাগ–প্রতিহিংসা, লোভ–লালসা ও অশ্লীলতার মত কুপ্রবৃত্তিগুলোকে অনুসরণ করলে
মানুষের অন্তরে কুমন্ত্রণাদাতা শয়তান আসন গেড়ে বসে। তখন শয়তানী শক্তি নিরর্থক কামনা–বাসনার দ্বারা তাকে বশীভূত করে ফেলে। যদি সে নিজ কুপ্রবৃত্তির বিরূদ্ধে সংগ্রাম করে এবং এগুলোকে তার বিবেকের ওপর আধিপত্য করতে না দেয়, ফেরশেতাদের চরিত্রকে অনুকরণ করে, তা হলে তার অন্তর ফেরেশতাদের বিশ্রাগারে পরিণত হয় এবং তারা একে আলোয় উদ্ভাসিত করে দেয়।
মুসলিম শরীফের এক হাদীসে আল্লাহর রসুল (সাঃ) সাহাবাদেরকে উদ্দেশ্য করে বলেন,
“এমন কেউ নেই যার মধ্যে একজন শয়তান বাস করে না’। সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেন, ‘ও আল্লাহর রসুল, এমনকি আপনার মধ্যেও।’ তিনি বললেন, “এমনকি আমার মধ্যেও, কিন্তু তার থেকে বেঁচে থাকতে আল্লাহ্ আমাকে সাহায্য করেছেন এবং সে আমার নিকট পরাভূত হয়েছে, সুতরাং সে আমার ভাল ছাড়া অন্য কিছু করতে পারে না।”
শয়তান মানুষের প্রকাশ্য শত্রু। সে মানুষের অন্তর এবং প্রতিটি ইন্দ্রিয় ও রিপুকে চতুর্মুখী আক্রমণের দ্বারা প্ররোচিত করে, মন্দ কাজের অনুপ্রেরণা দেয়, অসৎ ও অশ্লীল কাজে তাকে উদ্বুদ্ধ করে। এর কুপ্রভাবে মানুষ ভুল পথে পরিচালিত হয়। মানব জাতির আদি পিতামাতা আদম ও হাওয়া এই শয়তানের প্ররোচনায় ভুল করে আল্লাহর আদেশ অমান্য করে বসেন। তারা অনুতপ্ত হয়ে মহান আল্লাহর দরবারে ক্ষমা প্রার্থনা করেন:
“হে আমাদের পালনকর্তা আমরা নিজেদের নফসের প্রতি জুলম করেছি। যদি আপনি আমাদেরকে ক্ষমা না করেন এবং আমাদের প্রতি অনুগ্রহ না করেন, তবে আমরা অবশ্যই অবশ্যই ধ্বংস হয়ে যাব।” (সূরাহ আরাফ,, ৭:২৩)
পরম করুণাময় আল্লাহ্ তাঁদরেকে ক্ষমা করে দেন, তবে তাঁদেরকে বেহেশত থেকে পৃথিবীর বুকে একটি নির্দিষ্ট কাল পর্যন্ত জীবন–যাপনের জন্য পাঠিয়ে দেন।
সৃষ্টির শুরু থেকেই মানুষ ভুল প্রবণ। সে হাজারো ধরনের ভুল করে থাকে এবং ভুল পথে পরিচালিত হয়। শয়তান সব সময় তার অন্তরে কুপ্ররোচনা দিতে থাকে। সে মানুষকে বিভ্রান্তি ও দ্বিধা–দ্বন্দের মধ্যে ফেলে দেয়। সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ্ অতীব দয়াময় ও ক্ষমাশীল। তাই —
- তিনি তাঁর অনুতপ্ত বান্দাদেরকে দয়া ও ক্ষমা করেন।
- আর ভুলপ্রবণ মানুষের হেদায়েতের জন্য তিনি নাযিল করেছেন ঐশী গ্রন্থসমূহ, যুগে যুগে পাঠিয়েছেন নবী ও রাসুল।
- ঐশী জ্ঞান মানুষকে সৎ পথের সন্ধান দেয় এবং যাবতীয় অসৎ ও অন্যায় কাজ থেকে তাকে বিরত রাখতে সাহায্য করে।
- যখন মানুষ মহান আল্লাহর নিকট পুরোপুরি আত্ম–সমর্পিত হয় তখন নফসের বিরূদ্ধে জিহাদে সে কামিয়াবী লাভ করে। এসব সফল মানুষ সম্পর্কে আল্লাহ্ বলেন,
“হ্যাঁ, যে ব্যক্তি নিজের ব্যক্তি সত্তাকে আল্লাহর উদ্দেশ্যে সমর্পণ করেছে এবং সে সৎকর্মশীলও বটে, তার জন্য তার পালনকর্তার কাছে রয়েছে পুরস্কার। তাদের ভয় নেই এবং তারা চিন্তিতও হবে না (সূরাহ বাক্বারাহ, ২: ১১২)।“
মক্কায় আল্লাহর রসুল (সাঃ) এর তেরো বছরের নবুওতের প্রাথমিক পর্ব ছিল নফসের বিরুদ্ধে জিহাদের যুগ। সসস্ত্র জিহাদের নির্দেশ তখনও আল্লাহ্ নাযিল করেননি।
- সে সময় নবী (সাঃ) ইসলাম প্রচারের সাথে সাথে তাঁর অনুসারীদের চরিত্র সংশোধনের কাজে বেশী গুরুত্ব দিয়েছেন। কেননা মহৎ উদ্দেশ্য সাধনের জন্য আত্ম–শুদ্ধির মাধ্যমে নিজেকে তৈরী করে নিতে হয়।
- রাসূলুল্লাহ (সা)–এর নবুওতি জীবনের মক্কায় অবস্থানকালীন সময়ে তিনি সার্বক্ষণিক নফসের বিরুদ্ধে জিহাদে নিয়োজিত ছিলেন।
- এর মাধ্যমে তিনি ও তাঁর সাহাবীগণ লাভ করেন অপরিসীম ধৈর্য, সংযম ও ঈমানী দৃঢ়তা।
নবী করীম (সাঃ) আবির্ভাব কালীন সময়ে সমগ্র আরব জাহানে ‘আইয়ামে জাহিলিয়াত’ (অন্ধকার যুগ) বিরাজ করছিল।
- সব ধরনের পাপাচার ও অনাচারে লিপ্ত মানবসমাজকে প্রকৃত মু’মিন বান্দা হিসেবে গড়ে তোলাই ছিল নফসের বিরুদ্ধে জিহাদের মূল লক্ষ্য।
- নবী করিম (সাঃ) এর সংস্পর্শে এসব পথভ্রষ্ট মানুষ একনিষ্ঠ ঈমান ও নেক আমলের দ্বারা অন্তরের পরিশুদ্ধি লাভ করে।
- তাদের চরিত্র ও জীবন পুরোপুরি বদলে যায়, তারা এক একজন খাঁটি সোনার মানুষে পরিণত হয়।
পরবর্তীতে তিনি তাঁর এসব অনুসারীদেরকে নিয়ে মদীনায় যে একটি আদর্শ ইসলামী সমাজ ও রাষ্ট্র গঠন করেন তা ছিল সমগ্র বিশ্বের জন্য অনুকরণীয় ও অনুসরণীয়।
- পাশবিক সত্তার ঊর্ধে ওঠে কিভাবে মানবিক সত্তার পূর্ণ বিকাশ ঘটাতে হয় হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর এসব অনুসারীগণ তা বিশ্ববাসীকে দেখিয়ে গেছেন।
- শুধু নফসের বিরূদ্ধে জিহাদেই তারা সাফল্য অর্জন করেননি, সংখ্যায় নগণ্য হয়েও তারা কাফের–মোনাফেকসহ সব ধরনের আগ্রাসী শক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধের ময়দানেও সাফল্য অর্জন করেছিলেন।
নফসের বিরূদ্ধে জিহাদ ইসলামের এক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়:
- আখিরাতে জবাবদিহির ভয় নফসের বিরুদ্ধে জিহাদকে বুলন্দ করে।
- তাক্বওয়া, ধৈর্য, সহিষ্ণুতা, সংযম, মিতাচার, আত্মনিয়ন্ত্রণ, ইত্যাদি গুণাবলী অর্জনের মাধ্যমে নফস পরিশুদ্ধ হয়ে ওঠে।
- নফসের মন্দ থেকে বেঁচে থাকার জন্য সব সময় আল্লাহর নিকট তওবা করতে হয়, ক্ষমা ও সাহায্য প্রার্থনা করতে হয়। নবী করিম (সাঃ) নফসের খারাবী থেকে এবং সব ধরনের মন্দ থেকে আল্লাহর দরবারে বেশী বেশী পানাহ চাইতেন এবং ক্ষমা প্রার্থনা করতেন। তিনি দোয়া করতেন,
“ও আল্লাহ্! আমার অন্তরে সততা দান কর এবং একে পরিশুদ্ধ করে দাও। একমাত্র তুমিই একে পরিশুদ্ধ করতে পার, কারণ তুমিই আমার অভিবাক ও প্রভু’।
তিনি বলতেন, আল্লাহ্ যাকে সুপথ দেখান সে কখনও বিপথগামী হতে পারে না, আর তিনি যাকে সুপথ দেখান না সে কখনও সঠিক পথ প্রাপ্ত হয় না।
- সুপথের সন্ধান পেতে হলে অনুতপ্ত হৃদয়ে ভয় ও আশা নিয়ে আল্লাহর দরবারে দয়া ও ক্ষমা ভিক্ষা করতে হবে,
- আন্তরিক বিশ্বাস ও চেষ্টা সাধনার মাধ্যমে নিজেকে সংশোধন করতে হবে, পার্থিব লোভ–লালসা থেকে নিজেকে সংযত রাখতে হবে এবং নিজ ব্যক্তিসত্তাকে আল্লাহর আনুগত্যে বিলীন করে দিতে হবে। তবেই হেদায়েত প্রাপ্তির আশা করা যেতে পারে।
নফসের বিরুদ্ধে জিহাদ মু’মিনকে সরল সঠিক পথে পরিচালিত করে এবং সৎ পথের ওপর প্রতিষ্ঠিত রাখে। মহান আল্লাহ্ তাঁর মুজাহিদ বান্দার প্রতি প্রতি সন্তুষ্টি ব্যক্ত করে বলেন,
“যারা আমারই পথে জিহাদ করে, আমি অবশ্যই তাদেরকে আমার পথে পরিচালিত করি, নিঃসন্দেহে আল্লাহ্ নেককার বান্দাদের সাথে রয়েছেন” (সূরাহ আনকাবুত, ২৯: ৬৯)।
গুণগতভাবে নফসের তিনটি স্তর রয়েছে:
- সর্বোচ্চ স্তরে অবস্থানকারী নফস হলো ‘নফসে মুতমায়িন্না’ যা উন্নত চারিত্রিক গুণসম্পন্ন এবং পাপ-পঙ্কিলতামুক্ত থেকে মুক্ত। শয়তান তাঁদের ব্যাপারে নিরাশ ছিল যখন সে অন্যদের সম্পর্কে চ্যালেঞ্জ করেছিল,
“সে (শয়তান) বলল, তোমার ইজ্জতের কসম, তাদের সবাইকেই আমি বিপথগামী করে ছাড়ব, শুধু তোমার একনিষ্ঠ বান্দাগণ ব্যতীত।’ (সূরাহ ছোয়াদ, ৩৮: ৮২–৮৩)
এধরনের নফসের অধিকারী ব্যক্তিগণ পূণ্যাত্মা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টিভাজন মু’মিন বান্দা। কুপ্রবৃত্তির তাড়না ও শয়তানের প্ররোচনা তাদের ওপর কার্যকরী হতে পারে না। বিনা দ্বিধায় তারা আত্মসমর্পন করেন :
“…তারা বলে, আমরা শুনেছি এবং মান্য করেছি। আমরা তোমার ক্ষমা চাই, হে আমাদের পালনকর্তা। তোমারই দিকে আমাদের প্রত্যাবর্তন।” (সূরাহ বাক্বারাহ, ২:২৮৫)
মানবজাতির আদি পিতা–মাতা আদম (আঃ) ও হাওয়া (আঃ)–কে যে জান্নাত থেকে বেরিয়ে আসতে হয়েছিল সে জান্নাতেই হবে এ ধরনের আত্মার প্রত্যাবর্তন। তাদেরকে স্বাগতম জানিয়ে মহান আল্লাহ বলেন:
- মধ্যম স্তরে রয়েছে ‘নফসে লাওয়ামা’ যা ভাল মন্দে মিশ্রিত এবং সব সময় নিজেকে ধিক্কার দেয়। তারা ওইসব মু’মিন বান্দার অন্তরে বিদ্যমান যারা মাঝে মধ্যে ভুল করে পাপ কাজ করে ফেলে, কিন্তু যখন ভুল বুঝতে পারে তৎক্ষণাৎ অনুশোচনা ও অনুতাপে দগ্ধ হয়ে নিজেকে ধিক্কার দেয়, আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করে ও তওবা করে। আবার যখন ভাল কাজ করে তা আরো ভালভাবে করতে না পারার আক্ষেপেও নিজেকে ধিক্কার দেয়। শয়তান তাদেরকে নিয়ে বিব্রত বোধ করে।
“আরও শপথ করি সেই নফসের, যে নিজেকে ধিক্কার দেয়।” (সুরাহ ক্বিয়ামাহ, ৭৫:২)
- সব চেয়ে নীচের স্তরের নফস হলো ‘নফসে আম্মারা’ যা ক্রমাগত পাপাচারের দ্বারা নিজেকে কলুষিত করে ফেলেছে। এ রকম নফসের যারা অধিকারী তাদের চোখ, কান ও অন্তরে পর্দা পড়ে গেছে, বোধ শক্তি হারিয়ে গেছে। তাই তাদের কাছে সব অপকর্মই শোভনীয় মনে হয়। এ ধরনের মানুষ পশুর মতই নিকৃষ্ট, এমনকি পশুর চেয়েও অধম। শয়তান এদের ব্যাপারে অতি উৎসাহী।
অধিকাংশ মানুষেরই পরকালের প্রতি বিশ্বাস খুবই কম। তারা এ দুনিয়ায় এমনভাবে অন্যায় অপকর্মে লিপ্ত থাকে যে তারা এটাকেই শোভনীয় মনে করে। পার্থিব জীবনের লোভ–লালসায় তারা অন্ধ হয়ে গেছে। বিবেকহীন পাশবিক সত্তার দ্বারা তাড়িত তারা মনে করে মৃত্যুই সবকিছুর পরিসমাপ্তি ঘটিয়ে দেবে। মরে গেলে এ জীবনের কাজকর্মের কোন হিসাব দিতে হবে না। এদের সম্পর্কে আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন তাঁর নবীকে উদ্দেশ্য করে বলেন,
“আপনি কি তাকে দেখেন না, যে তারা প্রবৃত্তিকে উপাস্যরূপে গ্রহণ করে? তবুও কি আপনি তার যিম্মাদার হবেন?” (সূরাহ ফুরকান, ২৫: ৪৩)।
এটা কোন যৌক্তিক কথা নয় যে, মানুষকে পরকালীন জবাবদিহির সম্মুখীন হতে হবে না। কারণ অনেকেই অন্যায় অপকর্ম ঘটিয়ে এ দুনিয়ার বিচারকে ফাঁকি দিতে পারে, কিন্তু আল্লাহর চোখকে ফাঁকি দেওয়া সম্ভব নয়। আল্লাহ্ সর্বশ্রেষ্ঠ ন্যায় বিচারক হিসেবে নিশ্চিতভাবেই সব মানুষকে ক্বিয়ামত দিবসে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাবেন। যারা পুনরুত্থান দিবস সম্পর্কে অবিশ্বাস পোষণ করে তাদেরেক স্বয়ং আল্লাহ্ প্রশ্ন করেন,
“তোমরা কি ধারণা করে নিয়েছ যে, আমি তোমাদেরকে অনর্থক সৃষ্টি করেছি এবং তোমরা আমার কাছে ফিরে আসবে না?” (সূরাহ মু’মিনূন, ২৩: ১১৫)।
মানুষকে সৃষ্টির সেরা জীব এবং আল্লাহর প্রতিনিধি হিসেবে পৃথিবীতে পাঠানো হয়েছে। দুনিয়ায় নিজ নিজ দায়িত্ব পালন শেষে এক দিন সবাইকে তাঁর কাছে ফিরে যেতে হবে। তাই মানব জাতিকে সতর্ক করে আল্লাহ্ বলেন,
“হে মানুষ, নিশ্চয় আল্লাহর ওয়াদা সত্য। সুতরাং, পার্থিব জীবন যেন তোমাদেরকে প্রতারণা না করে। এবং সেই প্রবঞ্চক (শয়তান) যেন কিছুতেই তোমাদেরকে আল্লাহ্ সম্পর্কে প্রবঞ্চিত না করে” (সূরাহ ফাতির, ৩৫: ৫–৬)।
এ পৃথিবী মানুষের জন্য একটি পরীক্ষা ক্ষেত্র। এখানে চলছে সত্য বনাম মিথ্যা, শুভ বনাম অশুভ, ন্যায় বনাম অন্যায়ের এক চিরন্তন প্রতিদ্বন্দিতা। এগুলোকে ঘিরেই চলছে মানুষের অন্তরে মানবিক সত্তার সাথে পাশবিক সত্তার সংগ্রাম। নফসের বিরুদ্ধে এই জিহাদে আল্লাহ্ চান:
- তিনি মানুষকে যে স্বাধীন ব্যক্তিসত্তা দান করেছেন সে তার পূর্ণ সদ্ব্যবহার করবে, তিনি যে ঐশী জ্ঞান দান করেছেন তার দ্বারা মানুষ তার মানবিক সত্তাকে বলীয়ান করবে, এবং পাশবিক সত্তাকে পরাভূত করে দুনিয়া ও আখিরাতে সাফল্য অর্জন করবে।
- আর এ দুনিয়ায় সে ব্যর্থ হলে একদিন তাকে এর জন্য জবাবদিহি করতেই হবে। কেননা আমরা সবাই মহান স্রষ্টা আল্লাহর নিকট থেকেই এসেছি এবং মৃত্যুর পর তাঁরই নিকট ফিরে যাব।
- বিচার দিবসে আমরা কি আমল নিয়ে তাঁর নিকট উপস্থিত হব মৃত্যুর পূর্বেই এ বিষয়ে সতর্ক হওয়া উচিত। নিজ কামনা-বাসনাকে নিয়ন্ত্রণ করার মধ্যেই রয়েছে বিরাট সাফল্য, এর জন্য সর্ব শক্তিমান আল্লাহর আশ্বাস বাণী হলো:
“যেহেতু সে তার প্রভুর সম্মুখে দাঁড়ানোকে ভয় করেছে এবং তার নফসকে কামনা–বাসনা থেকে বিরত রাখতে পেরেছে, অবশ্যই জান্নাত হবে তার আশ্রয়স্থল।“(সূরাহ নাযিয়াত, ৭৯: ৪০–৪১)