২য় অধ্যায় : পবিত্র কুরআনের মাহাত্ম্য

সর্বশেষ কিতাব পবিত্র কুরআনের মাহাত্ম্য

وَبِالْحَقِّ اَنْزَلْنٰهُ وَبِالْحَقِّ نَزَلَ…. ۝

“আমি সত্যসহ এ কুরআন নাযিল করেছি এবং সত্যসহ এটা নাযিল হয়েছে। …. ।” (১৭:১০৫)

পবিত্র কুরআনের গুরুত্ব ও মাহাত্ম্য শাশ্বত ও চিরন্তন। এর বাণী বিশ্বজগতের স্রষ্টা ও প্রতিপালক সম্পর্কে মানুষের সকল বিভ্রান্তি দূরীভূত করে প্রকৃত সত্য জানতে ও চিনতে শিখিয়েছে। তাদের স্রষ্টা যে আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন – যিনি এক ও অদ্বিতীয় সত্তা, যিনি সর্বশক্তিমান ও সর্বভৌম ক্ষমতার মালিক এবং একমাত্র উপাস্য –  এ প্রকৃত সত্যকে ভুলে গিয়ে মানুষ শতসহস্র উপাস্যের দাসত্বের শৃঙ্খলে বাঁধা পড়েছিল। কুরআনের সর্বজনীন শিক্ষার মধ্যেই নিহিত রয়েছে মানব জাতরি কল্যাণ ও সাফল্য । এ শিক্ষা তাদেরকে ফিরিয়ে এনেছে তাদের আপন মহিমায় এবং তাদেরকে উন্নীত করেছে সৃষ্টির সেরা জীবের মর্যাদায়। পবিত্র কুরআনের বাণী সহজ, সরল ও সত্য পথের দিশারী যা মানুষের কুসংস্কারাবৃত ও ব্যাধিগ্রস্ত অন্তরকে পরিশুদ্ধ ও নিরাময় করে তোলে। পরকালীন জবাবদিহির ভয় বিশ্বাসীদের মনকে করে তোলে পাপ–পঙ্কিলতামুক্ত। চারিত্রিক পরিশুদ্ধির দ্বারা তাদের অন্তর হয়ে ওঠে আলোকিত ও প্রাণবন্ত। নীচের আয়াতগুলোতে মহান আল্লাহ্ একথাই ব্যক্ত করেছেন:

بَلْ هُوَ قُرْاٰنٌ مَّجِيْدٌ ۝ فِىْ لَوْحٍ مَّحْفُوْظٍ ۝

“বস্তুত এটা মর্যাদাবান কুরআন, লওহে মাহফুযে (সংরক্ষিত ফলকে) লিপিবদ্ধ আছে।” (৮৫:২১–২২)

اِنَّه لَقُرْاٰنٌ كَرِيْمٌ ۝ فِى كِتٰبٍ مَّكْنُوْنٍ ۝ لَّا يَمَسُّه اِلَّا الْمُطَهَّرُوْنَ ۝ تَنْزِيْلٌ مِّنْ رَّبِّ الْعٰلَمِيْنَ ۝

“নিশ্চয় এটা সম্মানিত কুরআন, যা আছে এক সুরক্ষিত কিতাবে, যারা পাক–পবিত্র, তারা ব্যতীত অন্য কেউ একে স্পর্শ করবে না। এটা বিশ্ব–পালনকর্তার পক্ষ থেকে অবতীর্ণ।” (৫৬:৭৭–৮০)

تَبَارَكَ الَّذِىْ نَزَّلَ الْفُرْقَانَ عَلٰى عَبْدِه لِيَكُوْنَ لِلْعٰلَمِيْنَ نَذِيْرًا۝

“পরম কল্যাণময় তিনি যিনি তাঁর বান্দার (নবী করীম সা) প্রতি (সত্য–মিথ্যার) ফয়সালাকারী গ্রন্থ অবর্তীণ করেছেন, যাতে সে বিশ্বজগতের জন্যে সতর্ককারী হয়।” (২৫:১)

كِتٰبٌ اَنْزَلْنٰهُ اِلَيْكَ مُبٰرَكٌ لِّيَدَّبَّرُوْٓا اٰيٰتِه وَلِيَتَذَكَّرَ اُوْلُوْا الْاَلْبٰبِ۝

“এটি একটি বরকতময় কিতাব, যা আমি আপনার প্রতি বরকত হিসেবে অবতীর্ণ করেছি, যাতে মানুষ এর আয়াতসূহ লক্ষ্য করে এবং বুদ্ধিমানগণ যেন তা অনুধাবন করে।” (৩৮:২৯)

وَتَمَّتْ كَلِمَتُ رَبِّكَ صِدْقًا وَّعَدْلًا لَّا مُبَدِّلِ لِكَلِمَاتِهِ وَهُوَ السَّمِيْعُ الْعَلِيْمُ۝

“আপনার প্রতিপালকের কথা সত্য ও ইনসাফে পরিপূর্ণ। তাঁর কথার কোন পরিবর্তনকারী নেই। তিনিই শ্রবণকারী, মহাজ্ঞানী।” (৬:১১৫)

اِنَّآ اَنْزَلْنَا عَلَيْكَ الْكِتٰبَ لِلنَّاسِ بِالْحَقِّ ج فَمَنِ اهْتَدٰى فَلِنَفْسِه ج وَمَنْ ضَلَّ فَاِنَّمَا يَضِلُّ عَلَيْهَا ج وَمَآ اَنْتَ عَلَيْهِمْ بِوَكِيْلٍ۝

“আমি আপনার প্রতি সত্য ধর্মসহ কিতাব নাযিল করেছি মানুষের কল্যাণকল্পে। অতঃপর যে সৎপথে আসে, সে নিজের কল্যাণের জন্যেই আসে, আর যে পথভ্রষ্ট হয়, সে নিজেরই অনিষ্টের জন্যে পথভ্রষ্ট হয়। আপনি তাদের জন্যে দায়ী নন।” (৩৯:৪১)

اِنَّ هٰذَا الْقُرْاٰنَ يَهْدِىْ لِلَّتِىْ هِىَ اَقْوَمُ وَيُبَشِّرُ الْمُؤْمِنِيْنَ الَّذِيْنَ يَعْمَلُوْنَ الصّٰلِحٰتِ اَنَّ لَهُمْ اَجْرًا كَبِيْرًا۝

“এই কুরআন এমন পথ প্রদর্শন করে যা সর্বাধিক সরল, এবং সৎকর্মপরায়ণ মু’মিনদেরকে সুসংবাদ দেয় যে, তাদের জন্যে রয়েছে মহাপুরস্কার।” (১৭:৯)

لَاۤ اِكْرَاهَ فِى الدِّيْنِ ج قَدْ تَّبَيَّنَ الرُّشْدُ مِنَ الْغَىِّ ج فَمَنْ يَّكْفُرْ بِالطّٰغُوْتِ وَيُؤْمِنۢ بِاللهِ فَقَدِ اسْتَمْسَكَ بِالْعُرْوَةِ الْوُثْقٰى ج لَا انْفِصَامَ لَهَا ط وَاللهُ سَمِيْعٌ عَلِيْمٌ ۝ اَللهُ وَلِىُّ الَّذِيْنَ اٰمَنُوْا يُخْرِجُهُمْ مِّنَ الظُّلُمٰتِ اِلَى النُّوْرِ ط وَالَّذِيْنَ كَفَرُوْٓا اَوْلِيَآؤُهُمُ الطّٰغُوْتُ يُخْرِجُوْنَهُمْ مِّنَ النُّوْرِ اِلَى الظُّلُمٰتِ ط اُوْلٰٓئِكَ اَصْحٰبُ النَّارِ ج هُمْ فِيْهَا خٰلِدُوْنَ ۝

“দ্বীনের ব্যাপারে কোন জবরদস্তি বা বাধ্যবাধকতা নেই। নিঃসন্দেহে হেদায়াত গোমরাহী থেকে পৃথক হয়ে গেছে। এখন যারা গোমরাহকারী ‘তাগুত’দেরকে মানবে না এবং আল্লাহতে বিশ্বাস স্থাপন করবে, সে ধারণ করে নিয়েছে সুদৃঢ় হাতল যা ভাঙবার নয়। আর আল্লাহ সবই শুনেন এবং জানেন। যারা ঈমান এনেছে, আল্লাহ তাদের অভিভাবক। তাদেরকে তিনি বের করে আনেন অন্ধকার থেকে আলোর দিকে। আর যারা কুফরী করে তাদের অভিভাবক হচ্ছে তাগুত। তারা তাদেরকে আলো থেকে বের করে অন্ধকারের দিকে নিয়ে যায়। এরাই হলো দোযখের অধিবাসী, চিরকাল তারা সেখানেই থাকবে।” (২:২৫৬–২৫৭)

 وَجَآءَكَ فِىْ هٰذِهِ الْحَقُّ وَمَوْعِظَةٌ وَّذِكْرٰى لِلْمُؤْمِنِيْنَ ۝ وَقُلْ لِّلَّذِيْنَ لَا يُؤْمِنُوْنَ اعْمَلُوْا عَلٰى مَكَانَتِكُمْ اِنَّا عٰمِلُوْنَ ۝ وَانْتَظِرُوْٓا اِنَّا مُنْتَظِرُوْنَ ۝

“…… (হে নবী,) আর এভাবে আপনার নিকট মহাসত্য এবং ঈমানদারদের জন্য নসীহত (উপদেশ) ও স্মরণীয় বিষয়বস্তু এসেছে। আর যারা ঈমান আনে না, তাদেরকে বলে দিন যে, তোমরা নিজ নিজ অবস্থায় কাজ করে যাও আমরাও কাজ করে যাই। এবং তোমরাও অপেক্ষা করে থাক, আমরাও অপেক্ষায় রইলাম।” (১১:১২০–১২২)

وَمَا كَانَ هٰذَا الْقُرْاٰنُ اَنْ یُّفْتَرٰی مِنْ دُوْنِ اللّٰهِ وَلٰكِنْ تَصْدِیْقَ الَّذِیْ بَیْنَ یَدَیْهِ وَتَفْصِیْلَ الْكِتٰبِ لَا رَیْبَ فِیْهِ مِنْ رَّبِّ الْعٰلَمِیْنَ ۝

“আর কুরআন সে জিনিস নয় যে, আল্লাহ ব্যতীত কেউ তা বানিয়ে নেবে। অবশ্য এটি পূর্ববর্তী কালামের সত্যায়ন করে এবং সে সমস্ত বিষয়ের বিশ্লেষণ  দান করে যা তােমার প্রতি দেয়া হয়েছে যাতে কোন সন্দেহ নেই– তোমার  বিশ্ব পালনর্কতার পক্ষ থেকে ।” (১০:৩৭)

اِنَّہٗ لَقَوْلٌ فَصْلٌ ۝ وَّمَا هُوَ بِالْهَزْلِ۝

“নিশ্চয় কুরআন সত্য–মিথ্যার ফয়সালা। এবং এটা কোন বিনোদন নয় ।” (৮৬:১৩–১৪)

وَاِنَّہٗ لَتَنْزِیْلُ رَبِّ الْعٰلَمِیْنَ ۝ نَزَلَ بِهِ الرُّوْحُ الْاَمِیْنُ ۝ عَلٰی قَلْبِكَ لِتَکُوْنَ مِنَ الْمُنْذِرِیْنَ ۝ بِلِسَانٍ عَرَبِیٍّ مُّبِیْنٍ ۝ وَ اِنَّہٗ لَفِیْ زُبُرِ الْاَوَّلِیْنَ ۝

“এই কুরআনতো বিশ্ব–জাহানের পালনর্কতার নিকট থেকে অবতীর্ণ বিশ্বস্ত ফেরেশতা একে নিয়ে অবতরণ করছে– আপনার অন্তরে, যাতে আপনি ভীতি প্রদর্শকারীদের অর্ন্তভুক্ত হন, সুস্পষ্ট আরবী ভাষায়। নিশ্চয় এর উল্লখে আছে পূর্ববর্তী কিতাবসমূহে” (২৬:১৯২–১৯৬)

كِتٰبٌ اُحْكِمَتْ اٰیٰتُہٗ ثُمَّ فُصِّلَتْ مِنْ لَّدُنْ حَكِیْمٍ خَبِیْرٍ ۙ۝ اَلَّا تَعْبُدُوْۤا اِلَّا اللّٰهَ ؕ

“….এটি এমন এক কিতাব, যার আয়াতসমূহ সুপ্রতিষ্ঠিত অতঃপর সবিস্তারে বর্ণিত এক মহাজ্ঞানী, সর্বজ্ঞ সত্তার পক্ষ হতে। যেন তোমরা আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো বন্দেগী না কর ……।” (১১:১ –২)

اِنَّه لَقَوْلُ رَسُوْلٍ كَرِيْمٍ۝ ذِىْ قُوْةٍ عِنْدَ ذِى الْعَرْشِ مَكِيْنٍ۝ مُّطَاعٍ ثَمَّ اَمِيْنٍ۝

“নিশ্চয় কুরআন সম্মানিত বাণীবাহকের (জিব্রাইল আ) আনীত বাণী, যিনি শক্তিশালী, আরশের মালিকের নিকট মর্যাদাশালী, সবার মান্যবর, সেখানকার বিশ্বাসভাজন।” (৮১:১৯–২১)

فِیْ صُحُفٍ مُّكَرَّمَۃٍ ۝ مَّرْفُوْعَۃٍ مُّطَهَرَۃٍۭ ۝ بِاَیْدِیْ سَفَرَۃٍ ۝ كِرَامٍۭ بَرَرَۃٍ ۝

“এটা লিখিত আছে সম্মানতি, উচ্চ পবত্রি পত্রসমূহে, লিপিকিারের হস্তে – যারা মহৎ, পূত চরিত্র।” (৮০:১৩–১৬)

لَوْ اَنْزَلْنَا هٰذَا الْقُرْاٰنَ عَلٰى جَبَلٍ لَّرَاَيْتَه خٰشِعًا مُّتَصَدِّعًا مِّنْ خَشْيَةِ اللهِ وَتِلْكَ الْاَمْثٰلُ نَضْرِبُهَا لِلنَّاسِ لَعَلَّهُمْ يَتَفَكَّرُوْنَ۝

“যদি আমি এই কুরআন পাহাড়ের উপর অবতীর্ণ করতাম, তবে তুমি দেখতে যে, পাহাড় বিনীত হয়ে আল্লাহ তায়ালার ভয়ে বিদীর্ণ হয়ে গেছে। আমি এসব দৃষ্টান্ত মানুষের জন্যে বর্ণনা করি, যাতে তারা চিন্তা–ভাবনা করে।” (৫৯:২১)

بَلْ هُوَ قُرْآنٌ مَّجِيدٌ۝فِي لَوْحٍ مَّحْفُوظٍ۝
“বরং এটা মহান কুরআন, লওহে মাহফুযে লিপিবদ্ধ।” (৮৫:২১–২২)

 

পবিত্র কুরআন মানবতার মুক্তির সনদ

یٰۤاَیُّهَا النَّاسُ قَدْ جَآءَتْکُمْ مَّوْعِظَۃٌ مِّنْ رَّبِّکُمْ وَ شِفَآءٌ لِّمَا فِی الصُّدُوْرِ ۬ۙ وَ هُدًی وَّ رَحْمَۃٌ لِّلْمُؤْمِنِیْنَ ۝ قُلْ بِفَضْلِ اللّٰهِ وَ بِرَحْمَتِہٖ فَبِذٰلِكَ فَلْیَفْرَحُوْا ؕ هُوَ خَیْرٌ مِّمَّا یَجْمَعُوْنَ۝

“হে মানবকুল, তোমাদের পরওয়ারদেগারের পক্ষ থেকে তোমাদের কাছে উপদেশবানী (কুরআন) এসেছে, (যা) তোমাদের অন্তরের রোগের নিরাময়স্বরূপ, (এবং) মোমেনদের জন্য হেদায়েত ও রহমতস্বরূপ। (হে নবী) বলুন, আল্লাহর দয়া ও মেহেরবাণীর কারণে এরই প্রতি তাদের আনন্দতি থাকা উচিৎ। এটিই উত্তম সে সমুদয় (জ্ঞান ও সম্পদ) থেকে যা তারা সঞ্চয় করছে।” (১০: ৫৭–৫৮)

প্রায় চৌদ্দশত বছর পূর্বে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা মানব জাতির মুক্তির সনদ, পথ–নির্দেশক ও রহমত হিসেবে নাযিল করেন সর্বশেষ ঐশী গ্রন্থ পবিত্র কুরআন। হযরত মুহাম্মদ সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রেরিত হয়েছিলেন মানব জাতির পথ–প্রদর্শক এবং সর্বশেষ নবী ও রসূল হিসেবে। তাঁরই ওপর নাযিলকৃত পবিত্র কুরআন হলো মানবজাতির চূড়ান্ত জীবন–বিধান সম্বলিত আসমানী গ্রন্থ। মানব জাতি আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীনের এক বিশেষ সৃষ্টি এবং মর্যাদাপূর্ণ বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। তবে স্বভাবগতভাবে মানুষ ভুলপ্রবণ। বেহেশতে অবস্থানকালে ভুলবশত আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করার কারণেই আদি পিতা আদম (আ) ও আদি মাতা হাওয়ার স্বর্গচ্যুতি ও দুনিয়ায় আগমণ। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,

وَ لَقَدْ عَهِدْنَاۤ اِلٰۤی اٰدَمَ مِنْ قَبْلُ فَنَسِیَ وَ لَمْ نَجِدْ لَہٗ عَزْمًا ۝

“আমি ইতিপূর্বে আদমকে নির্দেশ দিয়েছিলাম। অতঃপর সে ভুলে গিয়েছিল এবং আমি তার মধ্যে দৃঢ়তা পাইনি।” (২০:১১৫)

এ থেকে প্রতীয়মান হয় যে, ভুলের কারণেই মানুষ এ দুনিয়ায় পথভ্রষ্ট হচ্ছে। এতে সহায়তা করছে মানব জাতির দুই প্রধান শত্রু – প্রথমটি হলো মানুষের প্রকাশ্য শত্রু শয়তান আর দ্বিতীয়টি হলো তার নফস বা রিপু। ভুল পথে চলার পরিণতি হচ্ছে দুনিয়া ও আখিরাতে ভীষণ অশান্তি এবং পক্ষান্তরে সঠিক পথে চলার ফল হলো দুনিয়া ও আখিরাতে পরম শান্তি। তাই অতীব দয়াময় ও ক্ষমাশীল আল্লাহ্ তায়ালা মানব সৃষ্টির শুরু থেকেই এ দুই প্রধান শত্রুর হাত থেকে মানবজাতিকে বাঁচানোর জন্য সরল সঠিক পথের দিক–নির্দেশনা দিয়েছেন। সঠিক পথ প্রদর্শনের জন্য তিনি যেমন প্রেরণ করেছেন নবী ও রাসূল, তেমনই জীবন পরিচালনার বিধি–বিধান হিসেবে নাযিল করেছেন কিতাবসমূহ।

পূর্ববর্তী সকল নবী ও রসূলই ছিলেন মহান আল্লাহর মনোনীত দ্বীনের বাহক ও প্রচারক। তাঁদের প্রচারিত দ্বীনের মৌলিক বিষয়সমূহ ছিল একই। কিন্তু তাঁদের ওপর নাযিলকৃত শরীয়াহ বা জীবন–বিধান ছিল ভিন্ন ভিন্ন ও তাঁদের নিজ নিজ যুগের চাহিদার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। অর্থাৎ তাঁদের প্রবর্তিত শরীয়াহ তাঁদের যুগ ও সম্প্রদায়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। কাল প্রবাহে ও বিভিন্ন সময়কালে মানুষ ধর্ম নিয়ে বিভ্রান্ত ও বিভক্ত হয়ে পড়েছিল। আল্লাহর দ্বীন নিয়ে মতানৈক্য ও বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছিল আহলে–কিতাবদের মধ্যে। তাদের ধর্মযাজকরা হীন স্বার্থে আল্লাহর প্রেরিত কিতাবগুলোকে বিকৃত করে নিজেদের খেয়াল–খুশীমত বিধানসমূহ জারী করলো। তারা সত্য দ্বীন থেকে বিচ্যুত হয়ে এক ও অদ্বিতীয় আল্লাহর উপাসনার বদলে মন–গড়া শরীকদের উপাসনায় লিপ্ত হলো। পৌত্তলিকতা, ভ্রান্ত বিশ্বাস, কুসংস্কার, অশ্লীলতা ও অপকমের্র অতল গহ্বরে হারিয়ে গেল মানব সমাজ। শত সহস্র অলীক ঈশ্বরের উপাসনা ও দাসত্বের দ্বারা মানুষ তাদের আত্মাকে শৃঙ্খলিত ও বিবেকবোধকে কলুষিত করে ফেললো। পার্থিব জগতের সাময়িক সুখ ও বিলাসী জীবনের আশায় আল্লাহর প্রতিশ্রুত পরকালের চিরস্থায়ী জীবনের অনন্ত সুখ ও শান্তির ব্যাপারটি ভুলে বসলো। নীতি–নৈতিকতা বিবর্জিত হয়ে তারা ধারণ করলো পশুসুলভ মনোবৃত্তি এবং সৃষ্টির সেরা জীবের মর্যাদাকে করলো ভূলুন্ঠিত। মানবজাতির এ দুরাবস্থায় মহান আল্লাহ্ নাযিল করলেন মহাপবিত্র গ্রন্থ কুরআন তাদের হেদায়েতের জন্য।

পবিত্র কুরআনে জ্ঞানার্জনের আহ্বান সম্বলতি সর্ব প্রথম যে আয়াতগুচ্ছ নাযিল হয়েছিল তার মধ্যইে নিহিত ছিল মানবতার মুক্তির দিক–নির্দেশনা:

اِقْرَاْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِیْ خَلَقَ ۚ۝ خَلَقَ الْاِنْسَانَ مِنْ عَلَقٍ ۚ۝ اِقْرَاْ وَ رَبُّكَ الْاَکْرَمُ ۙ۝ الَّذِیْ عَلَّمَ بِالْقَلَمِ ۙ۝ عَلَّمَ الْاِنْسَانَ مَا لَمْ یَعْلَمْ۝

“পাঠ করুন আপনার পালনকর্তার নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন, সৃষ্টি করেছেন মানুষকে জমাট রক্ত থেকে। পাঠ করুন, আপনার পালনকর্তা মহাদয়ালু, যিনি কলমের সাহায্যে শিক্ষা দিয়েছেন, শিক্ষা দিয়েছেন মানুষকে যা সে জানত না।” (৯৬:১–৫)

یٰۤاَیُّهَا النَّاسُ اِنَّا خَلَقْنٰکُمْ مِّنْ ذَكَرٍ وَّ اُنْثٰی وَ جَعَلْنٰکُمْ شُعُوْبًا وَّ قَبَآئِلَ لِتَعَارَفُوْا ؕ اِنَّ اَکْرَمَکُمْ عِنْدَ اللّٰهِ اَتْقٰکُمْ ؕ اِنَّ اللّٰهَ عَلِیْمٌ خَبِیْرٌ ۝

“হে মানব সমাজ, আমি তোমাদেরকে একজন পুরুষ ও একজন নারী থেকে সৃষ্টি করেছি এবং তোমাদেরকে বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি, যাতে তোমরা পরস্পরের সাথে পরিচিত হতে পার। নিশ্চয় আল্লাহর কাছে সে-ই সর্বাধিক সম্ভ্রান্ত যে সর্বাধিক সৎকর্মশীল। নিশ্চয় আল্লাহ্ সর্বজ্ঞ, সবকিছুর খবর রাখেন।” (৪৯:১৩)

পবিত্র কুরআনের উপরোক্ত আয়াতগুলো অজ্ঞানতার অন্ধকারে নিমজ্জিত মানব সমাজকে ঐশী জ্ঞান অর্জনের আহ্বান জানালো। মহান আল্লাহর মনোনীত ধর্ম ইসলাম এবং তাঁর নাযিলকৃত গ্রন্থ পবিত্র কুরআনের নির্দেশনা অনুযায়ী আল্লাহর নবী ও রসূল হযরত মুহাম্মদ (সা) দুনিয়ার বুকে আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠার জন্য আদিষ্ট হলেন। কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে তাঁর উদাত্ত আহ্বান এক ও অদ্বিতীয় আল্লাহর নিকট আত্মসমর্পণে উদ্বুদ্ধ করলো মানব জাতিকে। জাতি–গোত্র–ধর্ম–বর্ণ–ধনী–গরীব নির্বিশেষে সকল মানুষকে আনলো একই কাতারে। তাদের মধ্যে জন্ম দিলো ন্যায় নীতি, সাম্য, মুক্তি, ভ্রাতৃত্ব ও মৈত্রীর বন্ধন। অবসান ঘটালো সকল প্রকার সামাজিক বৈষম্য, শোষণ–নিপীড়ণ এবং মানবতার দাসত্বের শৃঙ্খল।

ঈমান, খোদাভীতি, সততা ও নৈতিকতার মানই আল্লাহর নিকট মর্যাদা প্রাপ্তির মাপকাঠি হওয়ায় প্রতিষ্ঠিত হলো সামাজিক সাম্য। মহান আল্লাহ্ তায়ালা সকল ভেদাভেদ ও কৃত্রিম বেড়াজাল ছিন্ন করে মানুষের মর্যাদার মানদন্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠা করলেন ঈমান, নিষ্ঠা এবং সৎকর্মকে। ক্ষমতা–কর্তৃত্ব, ধন–সম্পদ, বংশ–আভিজাত্য, মেধা–পান্ডিত্য, গাত্রবর্ণ ও রূপ–লাবণ্য সবই হারিয়ে গেলো শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি থেকে। পবিত্র কুরআনের সাম্যের বাণী শুধু মুখের বুলিই নয় – বরং তা প্রতিদিন প্রত্যক্ষ্যভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে ধর্মীয় ও সামাজিক আচার অনুষ্ঠানে। ধনী–গরীব, সাদা–কালো, প্রভু–ভৃত্য, শাসক–প্রজা সবাই একই কাতারে দাঁড়িয়ে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে নামায আদায় করছে, একই আল্লাহর কাছে পরম আনুগত্যে মাথা নত করছে ও সেজদায় লুটিয়ে পড়ছে। এভাবেই কুরআন মানব জাতিকে সকল কৃত্রিম ভেদাভেদ ও হাজারো দাসত্বের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করে সৃষ্টি সেরা জীবে পরিণত করেছে। একমাত্র আল্লাহ্ তায়ালার আনুগত্যে নিজেকে বিলীন করে দিয়ে মানুষ অর্জন করেছে মানবতার মুক্তির সনদ। অপরদিকে পবিত্র কুরআনের মধ্যমপন্থী জীবনব্যবস্থা আল্লার হক (অধিকার) ও বান্দার হকের এক অপূর্ব সমন্বয় ঘটিয়েছে মানব জীবনে এবং একই সাথে মানবতার মুক্তির সনদকে করেছে সুসংহত। এ সম্পর্কে মানুষকে উদ্দেশ্য করে আল্লাহ বলেন:

یٰۤاَیُّهَا النَّاسُ قَدْ جَآءَکُمْ بُرْهَانٌ مِّنْ رَّبِّکُمْ وَ اَنْزَلْنَاۤ اِلَیْکُمْ نُوْرًا مُّبِیْنًا ۝ فَاَمَّا الَّذِیْنَ اٰمَنُوْا بِاللّٰهِ وَ اعْتَصَمُوْا بِہٖ فَسَیُدْخِلُهُمْ فِیْ رَحْمَۃٍ مِّنْهُ وَ فَضْلٍ ۙ وَّ یَہْدِیْهِمْ اِلَیْهِ صِرَاطًا مُّسْتَقِیْمًا۝

“হে মানবকুল! তোমাদের পরওয়ারদেগারের পক্ষ থেকে তোমাদের নিকট সনদ পৌঁছে গেছে। আর আমি তোমাদের প্রতি প্রকৃষ্ট আলো (কুরআন) অবতীর্ণ করেছি। অতএব, যারা আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছে এবং তাতে দৃঢ়তা অবলম্বন করেছে, তিনি তাদেরকে স্বীয় রহমত ও অনুগ্রহের আওতায় স্থান দেবেন এবং নিজের দিকে আসার মত সরল পথে তুলে দেবেন।” (৪:১৭৪–১৭৫)

وَهٰذَا كِتٰبٌ اَنْزَلْنٰهُ مُبٰرَکٌ فَاتَّبِعُوْهُ وَ اتَّقُوْا لَعَلَّکُمْ تُرْحَمُوْنَ ۝ اَنْ تَقُوْلُوْۤا اِنَّمَاۤ اُنْزِلَ الْكِتٰبُ عَلٰی طَآئِفَتَیْنِ مِنْ قَبْلِنَا ۪ وَ اِنْ کُنَّا عَنْ دِرَاسَتِهِمْ لَغٰفِلِیْنَ ۝ اَوْ تَقُوْلُوْا لَوْ اَنَّاۤ اُنْزِلَ عَلَیْنَا الْكِتٰبُ لَکُنَّاۤ اَهْدٰی مِنْهُمْ ۚ فَقَدْ جَآءَکُمْ بَیِّنَۃٌ مِّنْ رَّبِّکُمْ وَ هُدًی وَّ رَحْمَۃٌ ۚ فَمَنْ اَظْلَمُ مِمَّنْ كَذَّبَ بِاٰیٰتِ اللّٰهِ وَ صَدَفَ عَنْهَا ؕ سَنَجْزِی الَّذِیْنَ یَصْدِفُوْنَ عَنْ اٰیٰتِنَا سُوْٓءَ الْعَذَابِ بِمَا كَانُوْا یَصْدِفُوْنَ۝

“এটি এমন একটি গ্রন্থ, যা আমি অবতীর্ণ করেছি, খুব মঙ্গলময়, অতএব, এর অনুসরণ কর এবং ভয় কর – যাতে তোমরা করুণাপ্রাপ্ত হও। এ জন্যে যে, কখনও তোমরা বলতে শুরু কর: গ্রন্থ তো কেবল আমাদের পূর্ববর্তী দুই সম্প্রদায়ের প্রতিই অবতীর্ণ হয়েছে এবং আমরা সেগুলোর পাঠ ও পঠন সম্পর্কে কিছুই জানতাম না। কিংবা বলতে শুরু কর: যদি আমাদের প্রতি কোন গ্রন্থ অবতীর্ণ হত, আমরা এদের চাইতে অধিক পথপ্রাপ্ত হতাম। অতএব, তোমাদের পালনকর্তার পক্ষ থেকে তোমাদের কাছে সুষ্পষ্ট প্রমাণ, হেদায়েত ও রহমত এসে গেছে। অতঃপর সে ব্যক্তির চাইতে অধিক অনাচারী কে হবে, যে আল্লাহর আয়াতসমূহকে মিথ্যা বলে এবং গা বাঁচিয়ে চলে। অতি সত্ত¡র আমি তাদেরকে শাস্তি দেব। যারা আমার আয়াতসমূহ থেকে গা বাঁচিয়ে চলে – জঘন্য শাস্তি তাদের গা বাঁচানোর কারণে।” (৬:১৫৫–১৫৭)

ذٰلِکُمْ وَصّٰکُمْ بِہٖ لَعَلَّکُمْ تَذَكَرُوْنَ ۝ وَ اَنَّ هٰذَا صِرَاطِیْ مُسْتَقِیْمًا فَاتَّبِعُوْهُ ۚ وَ لَا تَتَّبِعُوا السُّبُلَ فَتَفَرَّقَ بِکُمْ عَنْ سَبِیْلِہٖ ؕ ذٰلِکُمْ وَصّٰکُمْ بِہٖ لَعَلَّکُمْ تَتَّقُوْنَ ۝

“……তোমাদেরকে এ নির্দেশ দিয়েছেন, যেন তোমরা উপদেশ গ্রহণ কর। নিশ্চিত এটি আমার সরল পথ। অতএব, এ পথে চল এবং অন্যান্য পথে চলো না। তা হলে সেসব পথ তোমাদেরকে তাঁর পথ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিবে। তোমাদেরকে এ নির্দেশ দিয়েছেন, যাতে তোমরা সংযত হও।” (৬:১৫৩)

وَالسَّمَآءِ ذَاتِ الرَّجْعِ ۝ وَالْاَرْضِ ذَاتِ الصَّدْعِ ۝ اِنَّہٗ لَقَوْلٌ فَصْلٌ ۝ وَّ مَا هُوَ بِالْهَزْلِ۝

“শপথ চক্রশীল আকাশের এবং বিদারণশীল পৃথিবীর, নিশ্চয় কুরআন সত্য–মিথ্যার ফয়সালাকারী। এবং এটা বিনোদন নয়।” (৮৬:১১–১৪)

وَ هُوَ اللّٰهُ لَاۤ اِلٰهَ اِلَّا هُوَ ؕ لَهُ الْحَمْدُ فِی الْاُوْلٰی وَ الْاٰخِرَۃِ ۫ وَ لَهُ الْحُکْمُ وَ اِلَیْهِ تُرْجَعُوْنَ ۝

“তিনিই আল্লাহ, তিনি ব্যতীত কোন উপাস্য নেই। ইহকাল ও পরকালে তাঁরই প্রশংসা। বিধান তাঁরই ক্ষমতাধীন এবং তোমরা তাঁরই কাছে প্রত্যাবর্তিত হবে।” (২৮:৭০)

اِتَّبِعُوْا مَاۤ اُنْزِلَ اِلَیْکُمْ مِّنْ رَّبِّکُمْ وَلَا تَتَّبِعُوْا مِنْ دُوْنِہٖۤ اَوْلِیَآءَ ؕ قَلِیْلًا مَّا تَذَكَرُوْنَ۝ وَ كَمْ مِّنْ قَرْیَۃٍ اَهْلَکْنٰهَا فَجَآءَهَا بَاْسُنَا بَیَاتًا اَوْ هُمْ قَآئِلُوْنَ۝

“তোমরা অনুসরণ কর, যা তোমাদের প্রতি পালকের পক্ষ থেকে অবতীর্ণ হয়েছে এবং আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্য সাথীদের অনুসরণ করো না। আর তোমরা অল্পই উপদেশ গ্রহণ কর। অনেক জনপদকে আমি ধ্বংস করে দিয়েছি। তাদের কাছে আমার আযাব রাত্রি বেলায় পৌঁছেছে অথবা দ্বিপ্রহরে বিশ্রামরত অবস্থায়।” (৭:৩–৪)

ثُمَّ جَعَلْنٰكَ عَلٰی شَرِیْعَۃٍ مِّنَ الْاَمْرِ فَاتَّبِعْهَا وَ لَا تَتَّبِعْ اَهْوَآءَ الَّذِیْنَ لَا یَعْلَمُوْنَ ۝ اِنَّهُمْ لَنْ یُّغْنُوْا عَنْكَ مِنَ اللّٰهِ شَیْئًا ؕ وَاِنَّ الظّٰلِمِیْنَ بَعْضُهُمْ اَوْلِیَآءُ بَعْضٍ ۚ وَاللّٰهُ وَلِیُّ الْمُتَّقِیْنَ۝

“এরপর আমি আপনাকে রেখেছি ধর্মের এক বিশেষ শরীয়তের উপর। অতএব, আপনি এর অনুসরণ করুন এবং অজ্ঞানদের খেয়াল–খুশীর অনুসরণ করবেন না। আল্লাহর সামনে তারা আপনার কোন উপকারে আসবে না। যালেমরা একে অপরের বন্ধু। আর আল্লাহ পরহেযগারদের বন্ধু।” (৪৫:১৮–১৯)

وَ یَرَی الَّذِیْنَ اُوْتُوا الْعِلْمَ الَّذِیْۤ اُنْزِلَ اِلَیْكَ مِنْ رَّبِّكَ هُوَ الْحَقَّ ۙ وَ یَہْدِیْۤ اِلٰی صِرَاطِ الْعَزِیْزِ الْحَمِیْدِ۝

“যারা জ্ঞানপ্রাপ্ত, তারা আপনার পালনকর্তার নিকট থেকে অবর্তীর্ণ কুরআনকে সত্য জ্ঞান করে এবং এটা মানুষকে পরাক্রমশালী, প্রশংসার্হ আল্লাহর পথ প্রদর্শন করে।” (৩৪:৬)

کُنْتُمْ خَیْرَ اُمَّۃٍ اُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ تَاْمُرُوْنَ بِالْمَعْرُوْفِ وَ تَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَ تُؤْمِنُوْنَ بِاللّٰهِ ؕ وَ لَوْ اٰمَنَ اَهْلُ الْكِتٰبِ لَكَانَ خَیْرًا لَّهُمْ ؕ مِنْهُمُ الْمُؤْمِنُوْنَ وَ اَکْثَرُهُمُ الْفٰسِقُوْنَ ۝

“তোমরাই হলে সর্বোত্তম উম্মত, মানবজাতির কল্যাণের জন্যেই তোমাদের উদ্ভব ঘটানো হয়েছে। তোমরা সৎকাজের নির্দেশ দান করবে ও অন্যায় কাজে বাধা দেবে এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান আনবে। আর আহলে–কিতাবরা যদি ঈমান আনতো, তাহলে তা তাদের জন্য মঙ্গলকর হতো। তাদের মধ্যে কিছু তো রয়েছে ঈমানদার আর অধিকাংশই হলো পাপাচারী।” (৩:১১০)

قَدْ خَلَتْ مِنْ قَبْلِکُمْ سُنَنٌ ۙ فَسِیْرُوْا فِی الْاَرْضِ فَانْظُرُوْا كَیْفَ كَانَ عَاقِبَۃُ الْمُكَذِّبِیْنَ۝

“তোমাদের আগে অতীত হয়েছে অনেক ধরনের জীবনাচরণ। তোমরা পৃথিবীতে ভ্রমণ কর এবং দেখ যারা মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে তাদের পরিণতি কি হয়েছে।” (৩:১৩৭)

فَاتَّقُوا اللّٰهَ وَ اَطِیْعُوْنِ ۝ وَ لَا تُطِیْعُوْۤا اَمْرَ الْمُسْرِفِیْنَ ۝ الَّذِیْنَ یُفْسِدُوْنَ فِی الْاَرْضِ وَ لَا یُصْلِحُوْنَ ۝

“সুতরাং তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং আমার অনুগত্য কর। এবং সীমালংঘনকারীদের আদেশ মান্য কর না; যারা পৃথিবীতে অনর্থ সৃষ্টি করে এবং শান্তি স্থাপন করে না।” (২৬:১৫০–১৫২)

وَ هُوَ الَّذِیْ جَعَلَکُمْ خَلٰٓئِفَ الْاَرْضِ وَ رَفَعَ بَعْضَکُمْ فَوْقَ بَعْضٍ دَرَجٰتٍ لِّیَبْلُوَکُمْ فِیْ مَاۤ اٰتٰکُمْ ؕ اِنَّ رَبَّكَ سَرِیْعُ الْعِقَابِ ۫ۖ وَ اِنَّہٗ لَغَفُوْرٌ رَّحِیْمٌ ۝

“তিনিই তোমাদেরকে পৃথিবীতে প্রতিনিধি করেছেন এবং একে অন্যের উপর মর্যাদা সমুন্নত করেছেন, যাতে তোমাদেরকে এ বিষয়ে পরীক্ষা করেন, যা তোমাদেরকে দিয়েছেন। আপনার প্রতিপালক দ্রুত শাস্তিদাতা এবং তিনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল, দয়ালু।” (৬:১৬৫)

نَزَّلَ عَلَیْكَ الْكِتٰبَ بِالْحَقِّ مُصَدِّقًا لِّمَا بَیْنَ یَدَیْهِ وَ اَنْزَلَ التَّوْرٰىۃَ وَ الْاِنْجِیْلَ ۙ۝ مِنْ قَبْلُ هُدًی لِّلنَّاسِ وَ اَنْزَلَ الْفُرْقَانَ ۬ؕ اِنَّ الَّذِیْنَ كَفَرُوْا بِاٰیٰتِ اللّٰهِ لَهُمْ عَذَابٌ شَدِیْدٌ ؕ وَ اللّٰهُ عَزِیْزٌ ذُو انْتِقَامٍ ۝

“তিনি আপনার প্রতি কিতাব নাযিল করেছেন সত্যতার সাথে; যা সত্যায়ন করে পূর্ববর্তী কিতাবসমূহের। নাযিল করেছেন তাওরত ও ইঞ্জিল, এ কিতাবের পূর্বে, মানুষের হেদায়েতের জন্যে এবং অবতীর্ণ করেছেন ফুরকান (সত্য–মিথ্যার পার্থক্য নির্ণয়কারী)। নিঃসন্দেহে যারা আল্লাহর আয়াতসমূহ অস্বীকার করে, তাদের জন্যে রয়েছে কঠিন আযাব। আর আল্লাহ হচ্ছেন পরাক্রমশীল, প্রতিশোধ গ্রহণকারী।” (৩:৩ –৪)

 

পবিত্র কুরআনের সত্যতা ও বিশুদ্ধতার চ্যালেঞ্জ

اِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا الذِّكْرَ وَاِنَّا لَه لَحٰفِظُوْنَ۝

“আমি স্বয়ং এ উপদেশ গ্রন্থ অবতারণ করেছি এবং আমি নিজেই এর সংরক্ষক।” (১৫:৯)

কালের পরিক্রমায় পূর্ববর্তী কিতাবসমূহ মানুষের হাতে বিকৃত হয়ে পড়লেও পবিত্র কুরআন সম্পূর্ণ নির্ভুল ও অপরিবর্তিত অবস্থায় এখনও বলবৎ আছে এবং রোজ ক্বিয়ামত পর্যন্ত বলবৎ থাকবে। কারণ এর সংরক্ষণের দ্বায়িত্ব আল্লাহ্ নিজে গ্রহণ করেছেন। এ ঐশী গ্রন্থ প্রতিটি মানুষের জন্য এক সঠিক দিক–নির্দেশনা যা তাকে সহজ–সরল পথ প্রদর্শন করে, যুগোপযোগি সকল সমস্যার সমাধান দেয় এবং পরকালীন অনন্ত জীবনের শান্তি ও মুক্তি নিশ্চিত করে। পবিত্র কুরআন এক অনন্য সাধারণ আসমানী গ্রন্থ যা মানব–দানব রচিত গ্রন্থসমূহের বহু ঊর্ধ্বে। নবী মুহাম্মদ (সা) এ কুরআন রচনা করেননি এবং নিজেকে এর রচয়িতা বলেও কখনো দাবী করেননি। জিন–ইনসান–ফেরেশতা কারো পক্ষে এ কুরআন রচনা করা কখনোই সম্ভব নয়। তাই আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন পবিত্র কুরআনের ব্যাপারে মানব ও জিন জাতির ওপর কয়েকটি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন।

  • প্রথম চ্যালেঞ্জটি হলো:পবিত্র কুরআন স্বয়ং আল্লাহর কালাম যা তিনি নাযিল করেছেন তাঁর নবী ও রাসূল হযরত মুহাম্মদ (সা)-এর ওপর ওহীবাহক ফেরেশতা হযরত জিব্রাইল (আ) এর মাধ্যমে। সুতরাং এটা নিশ্চিতভাবে সত্য যে, এটা আল্লাহ্ ব্যতীত অন্য কারো রচিত গ্রন্থ নয়। জিন ও মানব জাতি একত্র হয়েও এর একটি সূরার মত কোন সূরা রচনা করতে কখনোই সক্ষম হবেনা। কাফেররা বলতো, এটা কোন আসমানী গ্রন্থ নয় – হযরত মুহাম্মদ (সা) এর রচয়িতা। অথচ তাঁর কোন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল না এবং আসমানী গ্রন্থ সম্পর্কিত পূর্ব জ্ঞানও তাঁর ছিল না।

  • দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জটি হলো: এটা একটি সম্পূর্ণ নির্ভুল ও বিশুদ্ধ গ্রন্থ – এতে কোন গরমিল নেই।

  • তৃতীয় চ্যালেঞ্জটি হলো: এ গ্রন্থটি রোজ কিয়ামত পর্যন্ত সম্পূর্ণ অবিকৃত ও অপরিবর্তনীয় থাকবে, কারণ স্বয়ং আল্লাহ্ তায়ালা এর সংরক্ষণের দায়ত্বি নিয়েছেন।

মহান আল্লাহর নাযিলকৃত গ্রন্থ কুরআন সত্য ও ইনসাফের ধারক এবং সকল প্রকার সন্দেহ, বিকৃতি, অসংলগ্নতা ও বিভ্রান্তি থেকে মুক্ত। বিগত চৌদ্দশত বছর ধরে এ পবিত্র গ্রন্থ সম্পূর্ণ অবিকৃত অবস্থায়ই বিরাজ করছে এবং রোজ কিয়ামত পর্যন্ত তা এরূপ অবিকৃত থেকেই মানব জাতিকে সুপথ প্রদর্শন করে যাবে। কাফেরদের ভ্রান্ত দাবীকে চ্যালেঞ্জ করে মহান আল্লাহ্ বলেন:

تَنْزِیْلُ الْكِتٰبِ لَا رَیْبَ فِیْهِ مِنْ رَّبِّ الْعٰلَمِیْنَ ۝ اَمْ یَقُوْلُوْنَ افْتَرٰىهُ ۚ بَلْ هُوَ الْحَقُّ مِنْ رَّبِّكَ لِتُنْذِرَ قَوْمًا مَّاۤ اَتٰهُمْ مِّنْ نَّذِیْرٍ مِّنْ قَبْلِكَ لَعَلَّهُمْ یَہْتَدُوْنَ۝

“এ কিতাবের অবতরণ বিশ্বপালনকর্তার নিকট থেকে, এতে কোন সন্দেহ নেই। তারা কি বলে, এটা সে মিথ্যা রচনা করেছে? বরং এটা আপনার পালনকর্তার তরফ থেকে সত্য, যাতে আপনি এমন এক সম্প্রদায়কে সতর্ক করেন, যাদের কাছে আপনার পূর্বে কোন সতর্ককারী আসেনি। সম্ভবতঃ এরা সুপথ প্রাপ্ত হবে।” (৩২:২–৩)

قُلْ لَّئِنِ اجْتَمَعَتِ الْاِنْسُ وَ الْجِنُّ عَلٰۤی اَنْ یَّاْتُوْا بِمِثْلِ هٰذَا الْقُرْاٰنِ لَا یَاْتُوْنَ بِمِثْلِہٖ وَ لَوْ كَانَ بَعْضُهُمْ لِبَعْضٍ ظَهِیْرًا۝

“(হে নবী) বলুন, যদি সমগ্র মানব ও জ্বীন জাতি এ কুরআনের অনুরূপ কিছু রচনা করার জন্য একত্রিত হয়, এবং (তা রচনার ব্যাপারে) তারা পরস্পরের সাহায্যকারী হয়; তবুও তারা কখনও এর অনুরূপ রচনা করে আনতে পারবে না।” (১৭:৮৮)

وَ لَقَدْ صَرَّفْنَا لِلنَّاسِ فِیْ هٰذَا الْقُرْاٰنِ مِنْ کُلِّ مَثَلٍ ۫ فَاَبٰۤی اَکْثَرُ النَّاسِ اِلَّا کُفُوْرًا ۝ وَ قَالُوْا لَنْ نُّؤْمِنَ لَكَ حَتّٰی تَفْجُرَ لَنَا مِنَ الْاَرْضِ یَنْۢبُوْعًا ۝ اَوْ تَکُوْنَ لَكَ جَنَّۃٌ مِّنْ نَّخِیْلٍ وَّ عِنَبٍ فَتُفَجِّرَ الْاَنْهٰرَ خِلٰلَهَا تَفْجِیْرًا ۝ اَوْ تُسْقِطَ السَّمَآءَ كَمَا زَعَمْتَ عَلَیْنَا كِسَفًا اَوْ تَاْتِیَ بِاللّٰهِ وَ الْمَلٰٓئِكَۃِ قَبِیْلًا ۝ اَوْ یَکُوْنَ لَكَ بَیْتٌ مِّنْ زُخْرُفٍ اَوْ تَرْقٰی فِی السَّمَآءِ ؕ وَ لَنْ نُّؤْمِنَ لِرُقِیِّكَ حَتّٰی تُنَزِّلَ عَلَیْنَا كِتٰبًا نَّقْرَؤُہٗ ؕ قُلْ سُبْحَانَ رَبِّیْ هَلْ کُنْتُ اِلَّا بَشَرًا رَّسُوْلًا۝

“আমি এই কুরআনে মানুষকে সব রকম উপমা দিয়ে বুঝিয়েছি। কিন্তু অধিকাংশ লোক অস্বীকার না করে থাকেনি। এবং তারা বলে: আমরা কখনও আপনাকে বিশ্বাস করব না, যে পর্যন্ত না আপনি ভূপৃষ্ঠ থেকে আমাদের জন্যে একটি ঝরণা প্রবাহিত করে দিন। অথবা আপনার জন্যে খেজুরের ও আঙুরের একটি বাগান হবে, অতঃপর আপনি তার মধ্যে নির্ঝরিনীসমূহ প্রবাহিত করে দেবেন। অথবা আপনি যেমন বলে থাকেন, তেমনিভাবে আমাদের উপর আসমানকে খন্ড–বিখন্ড করে ফেলে দেবেন অথবা আল্লাহ ও ফেরেশতাদেরকে আমাদের সামনে নিয়ে আসবেন। অথবা আপনার কোন সোনার তৈরী গৃহ হবে অথবা আপনি আকাশে আরোহণ করবেন এবং আমরা আপনার আকাশে আরোহণকে কখনও বিশ্বাস করবনা, যে পর্যন্ত না আপনি অবতীর্ণ করেন আমাদের প্রতি এক গ্রন্থ, যা আমরা পাঠ করব। বলুন: পবিত্র মহান আমার পালনকর্তা, একজন মানব, একজন রসূল বৈ আমি কে।” (১৭:৮৯–৯৩)

وَ مَا كَانَ هٰذَا الْقُرْاٰنُ اَنْ یُّفْتَرٰی مِنْ دُوْنِ اللّٰهِ وَ لٰكِنْ تَصْدِیْقَ الَّذِیْ بَیْنَ یَدَیْهِ وَ تَفْصِیْلَ الْكِتٰبِ لَا رَیْبَ فِیْهِ مِنْ رَّبِّ الْعٰلَمِیْنَ ۝ اَمْ یَقُوْلُوْنَ افْتَرٰىهُ ؕ قُلْ فَاْتُوْا بِسُوْرَۃٍ مِّثْلِہٖ وَ ادْعُوْا مَنِ اسْتَطَعْتُمْ مِّنْ دُوْنِ اللّٰهِ اِنْ کُنْتُمْ صٰدِقِیْنَ۝

“আর কুরআন সে জিনিস নয় যে, আল্লাহ ব্যতীত কেউ তা বানিয়ে নেবে। অবশ্য এটি পূর্ববর্তী কালামের সত্যায়ন করে এবং সে সমস্ত বিষয়ের বিশ্লেষণ দান করে যা তোমার প্রতি দেয়া হয়েছে, যাতে কোন সন্দেহ নেই – তোমার বিশ্বপালনকর্তার পক্ষ থেকে (তা অবতীর্ণ)। মানুষ কি বলে যে, এটি বানিয়ে এনেছ? বলে দাও, তোমরা নিয়ে এসো একটিই সূরা, আর ডেকে নাও, যাদেরকে নিতে সক্ষম হও আল্লাহ ব্যতীত, যদি তোমরা সত্যবাদী হয়ে থাক।” (১০:৩৭–৩৮)

وَ مَا کُنْتَ تَتْلُوْا مِنْ قَبْلِہٖ مِنْ كِتٰبٍ وَّ لَا تَخُطُّہٗ بِیَمِیْنِكَ اِذًا لَّارْتَابَ الْمُبْطِلُوْنَ ۝ بَلْ هُوَ اٰیٰتٌۢ بَیِّنٰتٌ فِیْ صُدُوْرِ الَّذِیْنَ اُوْتُوا الْعِلْمَ ؕ وَ مَا یَجْحَدُ بِاٰیٰتِنَاۤ اِلَّا الظّٰلِمُوْنَ ۝ وَ قَالُوْا لَوْ لَاۤ اُنْزِلَ عَلَیْهِ اٰیٰتٌ مِّنْ رَّبِّہٖ ؕ قُلْ اِنَّمَا الْاٰیٰتُ عِنْدَ اللّٰهِ ؕ وَ اِنَّمَاۤ اَنَا نَذِیْرٌ مُّبِیْنٌ ۝ اَوَ لَمْ یَکْفِهِمْ اَنَّاۤ اَنْزَلْنَا عَلَیْكَ الْكِتٰبَ یُتْلٰی عَلَیْهِمْ ؕ اِنَّ فِیْ ذٰلِكَ لَرَحْمَۃً وَّ ذِکْرٰی لِقَوْمٍ یُّؤْمِنُوْنَ ۝ قُلْ كَفٰی بِاللّٰهِ بَیْنِیْ وَ بَیْنَکُمْ شَهِیْدًا ۚ یَعْلَمُ مَا فِی السَّمٰوٰتِ وَ الْاَرْضِ ؕ وَ الَّذِیْنَ اٰمَنُوْا بِالْبَاطِلِ وَ كَفَرُوْا بِاللّٰهِ ۙ اُولٰٓئِكَ هُمُ الْخٰسِرُوْنَ۝

“আপনি তো এর পূর্বে কোন কিতাব পাঠ করেননি এবং স্বীয় দক্ষিণ হস্ত দ্বারা কোন কিতাব লিখেননি। এরূপ হলে মিথ্যাবাদীরা অবশ্যই সন্দেহ পোষণ করত। বরং যাদেরকে জ্ঞান দেয়া হয়েছে, তাদের অন্তরে ইহা (কুরআন) তো স্পষ্ট আয়াত। কেবল বেইনসাফরাই আমার আয়াতসমূহ অস্বীকার করে। তারা বলে, তার পালনকর্তার পক্ষ থেকে তার প্রতি কিছু নিদর্শন অবতীর্ণ হল না কেন? বলুন, নিদর্শন তো আল্লাহর ইচ্ছাধীন। আমি তো একজন সুস্পষ্ট সতর্ককারী মাত্র। এটাকি তাদের জন্যে যথেষ্ট নয় যে, আমি আপনার প্রতি কিতাব নাযিল করেছি, যা তাদের কাছে পাঠ করা হয়। এতে অবশ্যই বিশ্বাসী লোকদের জন্যে রহমত ও উপদেশ আছে। বলুন, আমার মধ্যে ও তোমাদের মধ্যে আল্লাহই সাক্ষীরূপে যথেষ্ট। তিনি জানেন যা কিছু নভো মন্ডলে ও ভূমন্ডলে আছে। আর যারা মিথ্যায় বিশ্বাস করে ও আল্লাহকে অস্বীকার করে, তারাই ক্ষতিগ্রস্ত।” (২৯:৪৮–৫২)

تَنْزِیْلٌ مِّنَ الرَّحْمٰنِ الرَّحِیْمِ ۝ كِتٰبٌ فُصِّلَتْ اٰیٰتُہٗ قُرْاٰنًا عَرَبِیًّا لِّقَوْمٍ یَّعْلَمُوْنَ ۝ بَشِیْرًا وَّ نَذِیْرًا ۚ فَاَعْرَضَ اَکْثَرُهُمْ فَهُمْ لَا یَسْمَعُوْنَ۝

“এটা অবতীর্ণ হয়েছে পরম করুণাময়, দয়ালুর পক্ষ থেকে। এই কিতাবের আয়াতসমূহ বিশদভাবে বিবৃত হয়েছে আরবীতে কুরআনরূপে বোধসম্পন্ন সম্প্রদায়ের জন্য; সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে, অতঃপর তাদের অধিকাংশই মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে, তারা শুনে না।” (৪১:২–৪)

وَاِذَا تُتْلٰى عَلَيْهِمْ اٰيَاتُنَا بَيِّنٰتٍ ۙ قَالَ الَّذِيْنَ لَا يَرْجُوْنَ لِقَآءَنَاائْتِ بِقُرْاٰنٍ غَيْرِ هٰذَاۤ اَوْ بَدِّلْهُ ۚ قُلْ مَا يَكُوْنُ لِىۤ اَنْ اُبَدِّلَه مِنْ تِلْقَآئِ نَفْسِىْ ج اِنْ اَتَّبِعُ اِلَّا مَا يُوْحٰىۤ اِلَىَّ اِنِّىۤ اَخَافُ اِنْ عَصَيْتُ رَبِّى عَذَابَ يَوْمٍ عَظِيْمٍ ۝ قُلْ لَّوْ شَآءَ اللهُ مَا تَلَوْتُه عَلَيْكُمْ وَلَاۤ اَدْرٰىكُمْ بِه فَقَدْ لَبِثْتُ فِيْكُمْ عُمُرًا مِّنْ قَبْلِه ط اَفَلَا تَعْقِلُوْنَ ۝

“আর যখন তাদের কাছে আমার প্রকৃষ্ট আয়াত সমূহ পাঠ করা হয়, তখন সে সমস্ত লোক বলে, যাদের আশা নেই আমার সাক্ষাতের, নিয়ে এসো কোন কুরআন এটি ছাড়া, অথবা একে পরিবর্তিত করে দাও। তাহলে বলে দাও, একে নিজের পক্ষ থেকে পরিবর্তিত করা আমার কাজ নয় – আমি সে নির্দেশেরই আনুগত্য করি, যা আমার কাছে আসে। আমি যদি স্বীয় পরওয়ারদেগারের নাফরমানী করি, তবে কঠিন দিবসের আযাবের ভয় করি। বলে দাও, যদি আল্লাহ চাইতেন, তবে আমি এটি তোমাদের সামনে পড়তাম না, আর নাইবা তিনি তোমাদেরেকে অবহিত করতেন এ সম্পর্কে। কারণ আমি তোমাদের মাঝে ইতিপূর্বেও একটা বয়স অতিবাহিত করেছি। তারপরেও কি তোমরা চিন্তা করবে না।” (১০:১৫–১৬)

اِنَّ الَّذِيْنَ كَفَرُوْا بِالذِّكْرِ لَمَّا جَآءَهُمْ ج وَاِنَّه لَكِتٰبٌ عَزِيْزٌ ۝ لَّا يَاْتِيْهِ الْبٰطِلُ مِنْۢ بَيْنِ يَدَيْهِ وَلَا مِنْ خَلْفِه ط تَنْزِيْلٌ مِّنْ حَكِيْمٍ حَمِيْدٍ ۝

“নিশ্চয় যারা কুরআন আসার পর তা অস্বীকার করে, তাদের মধ্যে চিন্তা–ভাবনার অভাব রয়েছে। এটা অবশ্যই এক সম্মানিত গ্রন্থ। এতে মিথ্যার প্রভাব নেই, সামনের দিক থেকেও নেই এবং পেছন দিক থেকেও নেই। এটা প্রজ্ঞাময়, প্রশংসিত আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ।” (৪১:৪১–৪২)

وَرَتَّلْنٰهُ تَرْتِيْلًا ۝ وَلَا يَاْتُوْنَكَ بِمَثَلٍ اِلَّا جِئْنٰكَ بِالْحَقِّ وَاَحْسَنَ تَفْسِيْرًا ۝

“সত্য প্রত্যাখানকারীরা বলে, তাঁর প্রতি সমগ্র কুরআন একদফায় অবতীর্ণ হল না কেন? আমি এমনিভাবে অবতীর্ণ করেছি এবং ক্রমে ক্রমে আবৃত্তি করেছি আপনার অন্তকরণকে মজবুত করার জন্যে। তারা আপনার কাছে কোন সমস্যা উপস্থাপিত করলেই আমি আপনাকে তার সঠিক জওয়াব ও সুন্দর ব্যাখ্যা দান করি।” (২৫:৩২–৩৩)

وَتَمَّتْ كَلِمَتُ رَبِّكَ صِدْقًا وَّعَدْلًالَّامُبَدِّلَ لِكَلِمٰتِه وَهُوَ السَّمِيْعُ الْعَلِيْمُ۝

“আপনার প্রতিপালকের বাণী পূর্ণ সত্য ও সুষম। তাঁর বাণীর কোন পরিবর্তনকারী নেই। তিনিই শ্রবণকারী, মহাজ্ঞানী।” (৬:১১৫)

وَمَا تَنَزَّلَتْ بِهِ الشَّيٰطِيْنُ ۝ وَمَا يَنْۢبَغِىْ لَهُمْ وَمَا يَسْتَطِيْعُوْنَ ۝ اِنَّهُمْ عَنِ السَّمْعِ لَمَعْزُوْلُوْنَ ۝

“এই কুরআন শয়তানরা অবতীর্ণ করেনি। তারা এ কাজের উপযুক্ত নয় এবং তারা এর সামর্থ্য ও রাখে না। তাদেরকে তো শ্রবণের জায়গা থেকে দূরে রাখা রয়েছে।” (২৬:২১০–২১২)

وَكَذٰلِكَ اَنْزَلْنٰهُ حُكْمًا عَرَبِيًّا ۚ وَلَئِنِ اتَّبَعْتَ اَهْوَآءَهُمْ بَعْدَمَا جَآءَكَ مِنَ الْعِلْمِ مَا لَكَ مِنَ اللهِ مِنْ وَّلِىٍّ وَّلَا وَاقٍ ۝ وَلَقَدْ اَرْسَلْنَا رُسُلًا مِّنْ قَبْلِكَ وَجَعَلْنَا لَهُمْ اَزْوٰجًا وَّذُرِّيْةً ۚ وَمَا كَانَ لِرَسُوْلٍ اَنْ يَّاْتِىَ بِـَٔايَةٍ اِلَّا بِاِذْنِ اللهِ ۗ لِكُلِّ اَجَلٍ كِتَابٌ ۝ يَمْحُوْا اللهُ مَا يَشَآءُ وَيُثْبِتُ وَعِندَهۤ اُمُّ الْكِتٰبِ ۝

“এমনিভাবেই আমি এ কুরআনকে আরবী ভাষায় নির্দেশরূপে অবতীর্ণ করেছি। যদি আপনি তাদের প্রবৃত্তির অনুসরণ করেন আপনার কাছে জ্ঞান পৌঁছার পর, তবে আল্লাহর কবল থেকে আপনার না কোন সাহায্যকারী আছে এবং না কোন রক্ষাকারী। আপনার পূর্বে আমি অনেক রসূল প্রেরণ করেছি এবং তাঁদেরকে পত্নী ও সন্তান–সন্ততি দিয়েছি। কোন রসূলের এমন সাধ্য ছিল না যে আল্লাহর নির্দেশ ছাড়া কোন আয়াত উপস্থিত করে। প্রত্যেকটি (কালের জন্য) কিতাব আছে। আল্লাহ (তা থেকে) যা ইচ্ছা মিটিয়ে দেন এবং বহাল রাখেন (পরবর্তী কালের জন্য) এবং মূলগ্রন্থ তাঁর কাছেই রয়েছে।” (১৩:৩৭–৩৯)

طٰسٓ ۟ تِلْكَ اٰیٰتُ الْقُرْاٰنِ وَ كِتَابٍ مُّبِیْنٍ ۝ هُدًی وَّ بُشْرٰی لِلْمُؤْمِنِیْنَ ۝ الَّذِیْنَ یُقِیْمُوْنَ الصَّلٰوۃَ وَ یُؤْتُوْنَ الزَّکٰوۃَ وَ هُمْ بِالْاٰخِرَۃِ هُمْ یُوْقِنُوْنَ ۝ اِنَّ الَّذِیْنَ لَا یُؤْمِنُوْنَ بِالْاٰخِرَۃِ زَیَّنَّا لَهُمْ اَعْمَالَهُمْ فَهُمْ یَعْمَهُوْنَ ۝ اُولٰٓئِكَ الَّذِیْنَ لَهُمْ سُوْٓءُ الْعَذَابِ وَ هُمْ فِی الْاٰخِرَۃِ هُمُ الْاَخْسَرُوْنَ ۝ وَ اِنَّكَ لَتُلَقَّی الْقُرْاٰنَ مِنْ لَّدُنْ حَكِیْمٍ عَلِیْمٍ۝

“ত্বা-সীন; এগুলো আল–কুরআনের আয়াত এবং আয়াত সুস্পষ্ট কিতাবের। মুমিনদের জন্যে পথ–নির্দেশ ও সুসংবাদ। যারা নামায কায়েম করে, যাকাত প্রদান করে এবং পরকালে নিশ্চিত বিশ্বাস করে। যারা পরকালে বিশ্বাস করে না, আমি তাদের দৃষ্টিতে তাদের কর্মকান্ডকে শোভন করে দিয়েছি। অতএব, তারা উদভ্রান্ত হয়ে ঘুরে বেড়ায়। তাদের জন্যেই রয়েছে মন্দ শাস্তি এবং তারাই পরকালে অধিক ক্ষতিগ্রস্ত। নিশ্চয় আপনাকে কুরআন প্রদত্ত হচ্ছে প্রজ্ঞাময়, জ্ঞানময় আল্লাহর কাছ থেকে। (২৭:১–৬)

اَمْ یَقُوْلُوْنَ تَقَوَّلَہٗ ۚ بَلْ لَّا یُؤْمِنُوْنَ ۝ فَلْیَاْتُوْا بِحَدِیْثٍ مِّثْلِہٖۤ اِنْ كَانُوْا صٰدِقِیْنَ۝

“না তারা বলে: এই কুরআন সে নিজে রচনা করেছে? বরং তারা অবিশ্বাসী। যদি তারা সত্যবাদী হয়ে থাকে, তবেএর অনুরূপ কোন রচনা উপস্থিত করুক।” (৫২:৩৩–৩৪)

وَ لَوْ جَعَلْنٰهُ قُرْاٰنًا اَعْجَمِیًّا لَّقَالُوْا لَوْ لَا فُصِّلَتْ اٰیٰتُہٗ ؕ ءَؔاَعْجَمِیٌّ وَّ عَرَبِیٌّ ؕ قُلْ هُوَ لِلَّذِیْنَ اٰمَنُوْا هُدًی وَّ شِفَآءٌ ؕ وَ الَّذِیْنَ لَا یُؤْمِنُوْنَ فِیْۤ اٰذَانِهِمْ وَقْرٌ وَّ هُوَ عَلَیْهِمْ عَمًی ؕ اُولٰٓئِكَ یُنَادَوْنَ مِنْ مَّكَانٍۭ بَعِیْدٍ۝

“আমি যদি একে অনারব ভাষার কুরআন প্রেরণ করতাম, তবে অবশ্যই তারা বলত, এর আয়াতসমূহ পরিস্কার ভাষায় বিবৃত হয়নি কেন? কি আশ্চর্য যে, কিতাব অনারব ভাষায় আর রাসূল আরবী ভাষী! (হে নবী) বলুন, এটা বিশ্বাসীদের জন্য হেদায়েত ও রোগের প্রতিকার। যারা মু’মিন নয়, তাদের কানে আছে ছিপি, আর কুরআন তাদের জন্যে অন্ধত্ব। তাদেরকে যেন দূরবর্তী স্থান থেকে আহ্বান করা হয়।” (৪১:৪৪)

وَ لَقَدْ نَعْلَمُ اَنَّهُمْ یَقُوْلُوْنَ اِنَّمَا یُعَلِّمُہٗ بَشَرٌ ؕ لِسَانُ الَّذِیْ یُلْحِدُوْنَ اِلَیْهِ اَعْجَمِیٌّ وَّ هٰذَا لِسَانٌ عَرَبِیٌّ مُّبِیْنٌ ۝ اِنَّ الَّذِیْنَ لَا یُؤْمِنُوْنَ بِاٰیٰتِ اللّٰهِ ۙ لَا یَہْدِیْهِمُ اللّٰهُ وَ لَهُمْ عَذَابٌ اَلِیْمٌ۝

“আমি তো ভালভাবেই জানি যে, তারা বলে: তাকে জনৈক ব্যক্তি শিক্ষা দেয়। যার দিকে তারা ইঙ্গিত করে, তার ভাষা তো আরবী নয় এবং এ কুরআন পরিষ্কার আরবী ভাষায়। যারা আল্লাহর কথায় বিশ্বাস করে না, তাদেরকে আল্লাহ পথ প্রদর্শন করেন না এবং তাদের জন্যে রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।” (১৬:১০৩–১০৪)

اَفَغَیْرَ اللّٰهِ اَبْتَغِیْ حَكَمًا وَّ هُوَ الَّذِیْۤ اَنْزَلَ اِلَیْکُمُ الْكِتٰبَ مُفَصَّلًاؕ وَ الَّذِیْنَ اٰتَیْنٰهُمُ الْكِتٰبَ یَعْلَمُوْنَ اَنَّہٗ مُنَزَّلٌ مِّنْ رَّبِّكَ بِالْحَقِّ فَلَا تَکُوْنَنَّ مِنَ الْمُمْتَرِیْنَ ۝ وَ تَمَّتْ كَلِمَتُ رَبِّكَ صِدْقًا وَّ عَدْلًا ؕ لَا مُبَدِّلَ لِكَلِمٰتِہٖ ۚ وَ هُوَ السَّمِیْعُ الْعَلِیْمُ۝

“(হে নবী বলুন) তবে কি আমি আল্লাহ ব্যতীত অন্য কোন বিচারক অনুসন্ধান করব, অথচ তিনিই তোমাদের প্রতি বিস্তারিত গ্রন্থ অবতীর্ণ করেছেন? আমি যাদেরকে গ্রন্থ প্রদান করেছি, তারা নিশ্চিত জানে যে, এটি আপনার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে সত্যসহ অবর্তীর্ণ হয়েছে। অতএব, আপনি সংশয়কারীদের অন্তর্ভুক্ত হবেন না। আপনার প্রতিপালকের বাক্য পূর্ণ সত্য ও সুষম। তাঁর বাক্যের কোন পরিবর্তনকারী নেই। তিনিই শ্রবণকারী, মহাজ্ঞানী।” (৬:১১৪–১১৫)

قُلْ اَرَءَیْتُمْ اِنْ كَانَ مِنْ عِنْدِ اللّٰهِ ثُمَّ كَفَرْتُمْ بِہٖ مَنْ اَضَلُّ مِمَّنْ هُوَ فِیْ شِقَاقٍۭ بَعِیْدٍ۝

“বলুন, তোমরা ভেবে দেখেছ কি, যদি এটা (কুরআন) আল্লাহর পক্ষ থেকে (অবতীর্ণ) হয়, অতঃপর তোমরা একে অমান্য কর, তবে যে ব্যক্তি ঘোর বিরোধিতায় লিপ্ত, তার চাইতে অধিক পথভ্রষ্ট আর কে?” (৪১:৫২)

اَفَنَضْرِبُ عَنْکُمُ الذِّکْرَ صَفْحًا اَنْ کُنْتُمْ قَوْمًا مُّسْرِفِیْنَ۝

“তোমরা সীমাতিক্রমকারী সম্প্রদায় – এ কারণে কি আমি তোমাদের কাছ থেকে কুরআন প্রত্যাহার করে নেব?” (৪৩:৫)

اَوَ لَمْ یَکُنْ لَّهُمْ اٰیَۃً اَنْ یَّعْلَمَہٗ عُلَمٰٓؤُا بَنِیْۤ اِسْرَآءِیْلَ ۝ وَ لَوْ نَزَّلْنٰهُ عَلٰی بَعْضِ الْاَعْجَمِیْنَ ۝ فَقَرَاَہٗ عَلَیْهِمْ مَّا كَانُوْا بِہٖ مُؤْمِنِیْنَ۝

“তাদের জন্যে এটা (কুরআন) কি নিদর্শন নয় যে, বনী–ইসরাঈলের আলেমগণ এটা অবগত আছে? যদি আমি একে কোন ভিন্নভাষীর প্রতি অবতীর্ণ করতাম, অতঃপর তিনি তা তাদের কাছে পাঠ করতেন, তবে তারা তাতে বিশ্বাস স্থাপন করত না।” (২৬:১৯৭–১৯৯)

পবিত্র কুরআনের অলৌকিকত্ব

لَوْ أَنزَلْنَا هَـٰذَا الْقُرْآنَ عَلَىٰ جَبَلٍ لَّرَأَيْتَهُ خَاشِعًا مُّتَصَدِّعًا مِّنْ خَشْيَةِ اللَّهِ ۚ وَتِلْكَ الْأَمْثَالُ نَضْرِبُهَا لِلنَّاسِ لَعَلَّهُمْ يَتَفَكَّرُونَ
“যদি আমি এই কোরআন পাহাড়ের উপর অবতীর্ণ করতাম, তবে তুমি দেখতে যে, পাহাড় বিনীত হয়ে আল্লাহ তা’আলার ভয়ে বিদীর্ণ হয়ে গেছে। আমি এসব দৃষ্টান্ত মানুষের জন্যে বর্ণনা করি, যাতে তারা চিন্তা–ভাবনা করে।” (৫৯:২১)

পবিত্র কুরআনের অলৌকিকত্ব সম্পর্কে রসূল (সা) বলেন,

“আল্লাহ্ প্রত্যেক নবীকেই মু‘জেজা (অলৌকিক শক্তি) দান করেছিলেন যার কারণে তাদের উম্মতগণ বিশ্বাসী হতে পারে। কিন্তু আল্লাহ্ আমাকে অলৌকিক নিদর্শন হিসেবে দিয়েছন ঐশী বাণী (কুরআন) যা তিনি আমার ওপর নাযিল করেছেন। সুতরাং আমি আশা করি যে, পুনরুত্থান দিবসে আমার উম্মতের সংখ্যা অন্য নবীদের উম্মতের চেয়ে অধিক হবে।”

পবিত্র কুরআনের অলৌকিকত্বের কয়েকটি দিক নিম্নে বর্ণিত হলো:

পবিত্র কুরআনের অলৌকিক সংরক্ষণ পদ্ধতি:  এই কুরআনের এক বিশেষ অলৌকিকত্ব এই যে, এটা স্বয়ং আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীনের বাণী – যা তাঁর সুরক্ষিত ফলক ‘লাওহে মাহফুযʼ থেকে ওহীবাহক ফেরেশতা জিব্রাইল (আ) মারফৎ মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহর (সা) ওপর বিভিন্ন সময়ে নাযিল হয়েছে। এর সংরক্ষণ পদ্ধতি এতই বিস্ময়কর ও নিখুঁত যে ওহী নাযিলের পর থেকে আজ পর্যন্ত এর একটি অক্ষরও পরিবর্তন হয়নি। সারা দুনিয়া জুড়ে কুরআন তার মৌলিকত্ব বজায় রেখেই বিদ্যমান রয়েছে। ছয় সহস্রাধিক আয়াত বিশিষ্ট এ বিরাট গ্রন্থটির সকল আয়াত খুব সহজেই সম্পূর্ণ মুখস্ত করেছেন এমন লক্ষ লক্ষ কুরআনে হাফেজ মুসলিম দুনিয়ায় পূর্বেও ছিলেন, এখনও আছেন, এবং ভবিষ্যতেও থাকবেন। এমন অসংখ্য শিশু কুরআনে–হাফেজ রয়েছে যারা অতি অল্প বয়সে পবিত্র কুরআনের মত একটি বৃহৎ গ্রন্থ স্বল্প সময়ে মুখস্ত করে ফেলেছে। বিশ্ব জুড়ে কুরআনে–হাফেজগণ এ পবিত্র গ্রন্থটিকে অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে তাদের হৃদয়ে এমনভাবে গ্রথিত করে রেখেছেন যে, পৃথিবী থেকে সব মুদ্রিত বা লিপিবদ্ধ কুরআন যদি কখনও হারিয়ে যায় তখন এসব হাফেজের মুখস্থ করা কুরআনের একটি হরফও কখনও হারাবে না। তাদের মন–মগজে সংরক্ষিত অবিকল কুরআন মুদ্রিত হয়ে পুনরায় প্রকাশ পেতে থাকবে – যা অন্য কোন গ্রন্থের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। এটাই কুরআনের সবচেয়ে বড় অলৌকিকত্ব।

পবিত্র কুরআন চির-সত্য ও ভুল-ভ্রান্তিমুক্ত: এই কুরআনের আরেক অলৌকিকত্ব হলো, যেহেতু এটি সর্বজ্ঞানী প্রজ্ঞাময় আল্লাহর সত্য কিতাব তাই এতে কোনরূপ তথ্যগত ভুল–ভ্রান্তি বা গরমিল নেই। বর্তমান যুগের মানুষের জ্ঞানের পরিধি ও বিজ্ঞানের উন্নতির সাথে সাথে চৌদ্দশত বছর পূর্বে পবিত্র কুরআনে বর্ণিত সৃষ্টি রহস্য সম্পর্কিত বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক তথ্য ও ঐতিহাসিক ঘটনা সংক্রান্ত বিবরণগুলো ক্রমশই সত্যের আলোকে উদ্ভাসিত হচ্ছে। কুরআনের কোন তথ্যই আজ পর্যন্ত ভুল প্রমাণিত হয়নি। এর কোথাও কোন অমিল বা অসঙ্গতি খুঁজে পাওয়া যায়নি। তাইতো মহান আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন বলেন, “আপনার প্রতিপালকের বাণী পূর্ণ সত্য ও সুষম। তাঁর বাণীর কোন পরিবর্তনকারী নেই। তিনিই শ্রবণকারী, মহাজ্ঞানী।” (৬:১১৫)

পবিত্র কুরআনের ব্যঞ্জনাময় ভাষাশৈলী: পবিত্র কুরআন আরবী ভাষায় নাযলি হওয়ায় তা আরবী ভাষাকে মহিমান্বিত ও সমৃদ্ধ করেছে। তৎকালীন আরবী সাহিত্যের চরম উৎকর্ষের যুগে কুরআনের ভাষাশৈলী ছিল অনন্য ও ব্যঞ্জনাময়। তখনকার খ্যাতিমান কবি-সাহিত্যিকরা চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেও কুরআনের বাণীর মত দু’য়েকটি পঙক্তি রচনা করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। পবিত্র কুরআনের মধুর বচনভঙ্গী, ভাবের দ্যোতনা, সামঞ্জস্যপূর্ণ শাব্দিক বিন্যাস, সুস্পষ্ট বর্ণনা ও বাস্তবধর্মী উপমায় মানব মনে দিক-নির্দেশনামূলক ও ভাবগম্ভীর চিন্তার উদ্রেক করে। কুরআনের তেলাওয়াত বিশ্বাসীদের মনে ভয় ও আশার সৃষ্টি করে, অন্তরের ব্যাধিসমূহ নিরাময় করে এবং প্রশান্তি আনে। শুধু তাই নয়, পবিত্র কুরআন মুসলিম জাহানে এক ভাষাগত ঐক্যের সৃষ্টি করেছে।

ওহীর মাধ্যমে এর অবতরণ, এর নির্ভুল সংরক্ষণ, এর বচনশৈলী ও সাহিত্যিক উৎকর্ষতা, এর বিষয়বস্তু, এর ভবিষ্যৎবাণী, বিজ্ঞানভিত্তিক ও ঐতিহাসিক তথ্যাবলী সার্বিকভাবে কুরআনকে এক মহান অলৌকিক মর্যাদায় ভূষিত করেছে। যেহেতু কুরআনের এ অলৌকিকত্ব ক্বিয়ামত দিবস পর্যন্ত বহাল থাকবে তাই এর দ্বারা হেদায়েতপ্রাপ্ত উম্মতে মুহাম্মদীর সংখ্যা অন্য নবীদের উম্মতের তুলনায় অনেক বেশী হবে। এমনকি জিন সম্প্রদায়ের একটি দলও কুরআনের পবিত্র বাণী শ্রবণ করে হেদায়েতপ্রাপ্ত হয়ে বলেছিল:

قُلْ أُوحِيَ إِلَيَّ أَنَّهُ اسْتَمَعَ نَفَرٌ مِّنَ الْجِنِّ فَقَالُوا إِنَّا سَمِعْنَا قُرْآنًا عَجَبًا ۝يَهْدِي إِلَى الرُّشْدِ فَآمَنَّا بِهِ ۖ وَلَن نُّشْرِكَ بِرَبِّنَا أَحَدًا ۝وَأَنَّهُ تَعَالَىٰ جَدُّ رَبِّنَا مَا اتَّخَذَ صَاحِبَةً وَلَا وَلَدًا ۝
“(হে নবী) বলুন: আমার প্রতি ওহী নাযিল করা হয়েছে যে, জিনদের একটি দল কুরআন শ্রবণ করেছে, অতঃপর তারা বলেছেঃ আমরা বিস্ময়কর কুরআন শ্রবণ করেছি; যা সৎপথ প্রদর্শন করে। ফলে আমরা তাতে বিশ্বাস স্থাপন করেছি। আমরা কখনও আমাদের পালনকর্তার সাথে কাউকে শরীক করব না।  এবং আরও বিশ্বাস করি যে, আমাদের পালনকর্তার মহান মর্যাদা সবার উর্ধ্বে। তিনি কোন পত্নী গ্রহণ করেননি এবং তাঁর কোন সন্তান নেই।” (৭২:১–৩)

আল্লাহ্ রাব্বুল আালামীন তাঁর নাযিলকৃত এই বিস্ময়কর গ্রন্থ কুরআন সম্পর্কে বলেন:

اِنَّه لَقُرْاٰنٌ كَرِيْمٌ ۝ فِى كِتٰبٍ مَّكْنُوْنٍ ۝ لَّا يَمَسُّه اِلَّا الْمُطَهَّرُوْنَ ۝ تَنْزِيْلٌ مِّنْ رَّبِّ الْعٰلَمِيْنَ ۝

“নিশ্চয় এটা সম্মানিত কুরআন, যা আছে এক সুরক্ষিত কিতাবে, যারা পাক–পবিত্র, তারা ব্যতীত অন্য কেউ একে স্পর্শ করবে না। এটা বিশ্ব-পালনকর্তার পক্ষ থেকে অবতীর্ণ।” (৫৬:৭৭–৮০)

وَمَا مِنْ غَآئِبَةٍ فِى السَّمَآءِ وَالْاَرْضِ اِلَّا فِىْ كِتٰبٍ مُّبِيْنٍ۝

“আকাশে ও পৃথিবীতে এমন কোন গোপন ভেদ নেই, যা সুস্পষ্ট কিতাবে নেই।” (২৭:৭৫)

بَلْ هُوَ قُرْاٰنٌ مَّجِيْدٌ ۝ فِىْ لَوْحٍ مَّحْفُوْظٍ ۝

“বস্তুত এটা মর্যাদাবান কুরআন, লওহে মাহফুযে (সংরক্ষিত ফলকে) লিপিবদ্ধ আছে।” (৮৫:২১–২২)।

اَفَلَا يَتَدَبَّرُوْنَ الْقُرْاٰنَ ط وَلَوْ كَانَ مِنْ عِنْدِ غَيْرِ اللهِ لَوَجَدُوْا فِيْهِ اخْتِلٰفًا كَثِيْرًا ۝

“তারা কি লক্ষ্য করে না কুরআনের প্রতি? পক্ষান্তরে এটা যদি আল্লাহ্ ব্যতীত অপর কারও পক্ষ থেকে (রচিত) হত, তবে এতে অবশ্যই বহু গরমিল দেখতে পেত।” (৪:৮২)

فَلَاۤ اُقْسِمُ بِمَا تُبْصِرُوْنَ ۝ وَمَا لَا تُبْصِرُوْنَ ۝ اِنَّه لَقَوْلُ رَسُوْلٍ كَرِيْمٍ ۝ وَمَا هُوَ بِقَوْلِ شَاعِرٍ ۚ قَلِيْلًا مَّا تُؤْمِنُوْنَ ۝ وَلَا بِقَوْلِ كَاهِنٍط ۚ قَلِيْلًا مَّا تَذَكَّرُوْنَ ۝ تَنْزِيْلٌ مِّنْ رَّبِّ الْعٰلَمِيْنَ ۝ وَلَوْ تَقَوَّلَ عَلَيْنَا بَعْضَ الْاَقَاوِيْلِ ۝ لَاَخَذْنَا مِنْهُ بِالْيَمِيْنِ ۝ ثُمَّ لَقَطَعْنَا مِنْهُ الْوَتِيْنَ ۝ فَمَا مِنْكُمْ مِّنْ اَحَدٍ عَنْهُ حٰجِزِيْنَ ۝ وَاِنَّه لَتَذْكِرَةٌ لِّلْمُتَّقِيْنَ ۝ وَاِنَّا لَنَعْلَمُ اَنَّ مِنْكُمْ مُّكَذِّبِيْنَ ۝ وَاِنَّه لَحَسْرَةٌ عَلَى الْكٰفِرِيْنَ ۝ وَاِنَّه لَحَقُّ الْيَقِيْنِ ۝ فَسَبِّحْ بِاسْمِ رَبِّكَ الْعَظِيْمِ ۝

“তোমরা যা দেখ, আমি তার শপথ করছি, এবং যা তোমরা দেখ না, তার – নিশ্চয়ই এই কুরআন একজন সম্মানিত রাসূলের আনীত। এবং এটা কোন কবির কাব্য নয়; তোমরা কমই বিশ্বাস কর। এবং এটা কোন অতীন্দ্রিয়বাদীর পাঁচালী নয়; তোমরা কমই অনুধাবন কর। এটা বিশ্বপালনকর্তার কাছ থেকে অবতীর্ণ। সে যদি আমার নামে কোন কথা রচনা করত তবে আমি তার দক্ষিণ হস্ত ধরে ফেলতাম, অতঃপর কেটে দিতাম তার গ্রীবা। তোমাদের কেউ তাকে রক্ষা করতে পারতে না। এটা খোদাভীরুদের জন্যে অবশ্যই একটি উপদেশ। আমি জানি যে, তোমাদের মধ্যে কেউ কেউ মিথ্যারোপ করবে। নিশ্চয় এটা কাফেরদের জন্যে অনুতাপের কারণ। নিশ্চয় এটা (কুরআন) নিশ্চিত সত্য। অতএব, আপনি আপনার মহান পালনকর্তার নামের পবিত্রতা বর্ণনা করুন।” (৬৯:৩৮–৫২)

الٓرٰ ۟ كِتٰبٌ اُحْكِمَتْ اٰیٰتُہٗ ثُمَّ فُصِّلَتْ مِنْ لَّدُنْ حَكِیْمٍ خَبِیْرٍ۝

“আলিফ, লা-ম, রা; এটি এমন এক কিতাব, যার আয়াতসমূহ সুবিন্যস্ত অতঃপর সবিস্তারে বর্ণিত, এক মহাজ্ঞানী, সর্বজ্ঞ সত্তার পক্ষ হতে (অবতীর্ণ)।” (১১:১)

اَمْ یَقُوْلُوْنَ افْتَرٰىهُ ؕ قُلْ فَاْتُوْا بِعَشْرِ سُوَرٍ مِّثْلِہٖ مُفْتَرَیٰتٍ وَّ ادْعُوْا مَنِ اسْتَطَعْتُمْ مِّنْ دُوْنِ اللّٰهِ اِنْ کُنْتُمْ صٰدِقِیْنَ ۝ فَاِلَّمْ یَسْتَجِیْبُوْا لَکُمْ فَاعْلَمُوْۤا اَنَّمَاۤ اُنْزِلَ بِعِلْمِ اللّٰهِ وَ اَنْ لَّاۤ اِلٰهَ اِلَّا هُوَ ۚ فَهَلْ اَنْتُمْ مُّسْلِمُوْنَ۝

“তারা কি বলে? কুরআন তুমি তৈরী করেছ? তুমি বল, তবে তোমরাও অনুরূপ দশটি সূরা তৈরী করে নিয়ে আস এবং আল্লাহ ছাড়া যাকে পার ডেকে নাও, যদি তোমাদের কথা সত্য হয়ে থাকে। অতঃপর তারা যদি তোমাদের কথা পূরণ করতে অপারগ হয়; তবে জেনে রাখ, এটি আল্লাহর ইলম দ্বারা অবতীর্ণ হয়েছে; আরো একীন করে নাও যে, আল্লাহ ব্যতীত অন্য কোন মাবুদ নেই। অতএব, এখন কি তোমরা আত্মসমর্পন করবে।” (১১:১৩–১৪)

عٰلِمُ الْغَيْبِ فَلَا يُظْهِرُ عَلٰى غَيْبِه اَحَدًا ۝ اِلَّا مَنِ ارْتَضٰى مِنْ رَّسُوْلٍ فَاِنَّه يَسْلُكُ مِنْۢ بَيْنِ يَدَيْهِ وَمِنْ خَلْفِه رَصَدًا ۝ لِّيَعْلَمَ اَنْ قَدْ اَبْلَغُوْا رِسٰلٰتِ رَبِّهِمْ وَاَحَاطَ بِمَا لَدَيْهِمْ وَاَحْصٰى كُلَّ شَىْءٍ عَدَدًا ۝

“তিনি অদৃশ্যের জ্ঞানী। পরন্ত তিনি অদৃশ্য বিষয় কারও কাছে প্রকাশ করেন না তাঁর মনোনীত রসূল ব্যতীত। তখন (ওহী নাযিলের ক্ষেত্রে) তিনি তার অগ্রে ও পশ্চাতে প্রহরী নিযুক্ত করেন যাতে আল্লাহ তা’আলা জেনে নেন যে, রসূলগণ তাঁদের পালনকর্তার পয়গাম পৌঁছিয়েছেন কি না। রসূলগণের কাছে যা আছে, তা তাঁর জ্ঞান-গোচর। তিনি সবকিছুর সম্যক হিসাব রাখেন।” (৭২:২৬–২৮)

وَقَالُوْا لَوْلَاۤ اُنْزِلَ عَلَيْهِ اٰيٰتٌ مِّنْ رَّبِّه قُلْ اِنَّمَا الْاٰيٰتُ عِنْدَ اللهِ وَاِنَّمَآ اَنَانَذِيْرٌ مُّبِيْنٌ ۝ اَوَلَمْ يَكْفِهِمْ اَنَّاۤ اَنْزَلْنَا عَلَيْكَ الْكِتٰبَ يُتْلٰى عَلَيْهِمْ اِنَّ فِىْ ذٰلِكَ لَرَحْمَةً وَّذِكْرٰى لِقَوْمٍ يُؤْمِنُوْنَ۝

“তারা বলে, তার পালনকর্তার পক্ষ থেকে তার প্রতি কিছু (অলৌকিক) নিদর্শন অবতীর্ণ হল না কেন? বলুন, নিদর্শন তো আল্লাহর ইচ্ছাধীন। আমি তো একজন সুস্পষ্ট সতর্ককারী মাত্র। এটা কি তাদের জন্যে যথেষ্ট নয় যে, আমি আপনার প্রতি কিতাব নাযিল করেছি, যা তাদের কাছে পাঠ করা হয়। এতে অবশ্যই বিশ্বাসী লোকদের জন্যে রহমত ও উপদেশ আছে।” (২৯:৫০–৫১)

আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার নাযিলকৃত কিতাবসমূহ

 لِكُلِّ اَجَلٍ كِتَابٌ۝ يَمْحُوْا اللهُ مَا يَشَآءُ وَيُثْبِتُ وَعِنْدَه اُمُّ الْكِتٰبِ۝

“……প্রত্যেক নির্ধারিত কালের জন্য একটি কিতাব থাকে। আল্লাহ যা ইচ্ছা বাতিল করে দেন এবং যা ইচ্ছা বহাল রাখেন এবং মূলগ্রন্থ তাঁর কাছেই রয়েছে।” (১৩:৩৮–৩৯)

প্রতি যুগের জন্যই আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন নির্ধারিত করেছিলেন এক একটি আসমানী গ্রন্থ। নবী ও রসূলগণ ওহীর মাধ্যমে প্রাপ্ত হন এসব কিতাব। যুগের প্রেক্ষাপট বিবেচনায় এসব কিতাবের নির্দেশ অনুযায়ী নিজ নিজ সম্প্রদায়ের জন্যে তাঁরা জারী করতেন আল্লাহ্ প্রদত্ত বিধান। তাঁদের তিরোধানের পর অনেক বিধান বিকৃত হয়ে পড়ায় সেগুলো বাতিল করে নতুন যুগের প্রয়োজনে আল্লাহর তরফ থেকে নতুন বিধান নিয়ে পরবর্তী নবী–রাসূলগণ এসেছেন। অনেক সময় পূর্ববর্তী নবী ও রাসূলগণের কিতাব সমসাময়িক বা পরবর্তী নবীগণের জন্যও প্রযোজ্য ছিল অথবা সেগুলোতে কিছু পুরোনো বিধান বদলে দিয়ে আল্লাহ তায়ালা নতুন বিধান সংযুক্ত করেছিলেন। এরই ধারাবাহিকতায় সর্বশেষ নবী ও রাসূল মুহাম্মদ (সা) এর ওপর নাযিল হয় সর্বশেষ আসমানী কিতাব “কুরআন” – যা পূর্ববর্তী সকল আসমানী কিতাবের সত্যায়ন করে এবং যার বিধিবিধানসমূহ সমগ্র মানব জাতির জন্য ক্বিয়ামত পর্যন্ত বলবৎ থাকবে।

পবিত্র কুরআনে চারটি আসমানী কিতাবের নাম উল্লেখ আছে – এগুলো হলো:

  • হযরত মূসার (আ) ওপর নাযিলকৃত কিতাব ‘তাওরাত’,

  • হযরত দাউদের (আ) কিতাব ‘জবুর’,

  • হযরত ঈসার (আ) কিতাব ‘ইঞ্জিল’ এবং

  • হযরত মুহাম্মদের (সা) ওপর নাযিলকৃত কিতাব ‘কুরআন’।

হযরত ইব্রাহীম (আ) ও অন্যান্য নবী ও রাসূলগণের ওপর নাযিল হয়েছিল ‘সহীফা’ (পথ–নির্দেশক পুস্তিকা)। প্রতিটি আসমানী কিতাবসমূহের ওপর বিশ্বাস স্থাপন করা ঈমানের অঙ্গ এবং সকল মু’মিন নর–নারীর জন্য আবশ্যিক।

কিতাব সংক্রান্ত কিছুসংখ্যক আয়াত নীচে উদ্ধৃত করা হলো:

كَانَ النَّاسُ اُمَّۃً وَّاحِدَۃً ۟ فَبَعَثَ اللّٰهُ النَّبِیّٖنَ مُبَشِّرِیْنَ وَ مُنْذِرِیْنَ ۪ وَ اَنْزَلَ مَعَهُمُ الْكِتٰبَ بِالْحَقِّ لِیَحْکُمَ بَیْنَ النَّاسِ فِیْمَا اخْتَلَفُوْا فِیْهِ ؕ وَ مَا اخْتَلَفَ فِیْهِ اِلَّا الَّذِیْنَ اُوْتُوْهُ مِنْۢ بَعْدِ مَا جَآءَتْهُمُ الْبَیِّنٰتُ بَغْیًۢا بَیْنَهُمْ ۚ فَهَدَی اللّٰهُ الَّذِیْنَ اٰمَنُوْا لِمَا اخْتَلَفُوْا فِیْهِ مِنَ الْحَقِّ بِاِذْنِہٖ ؕ وَ اللّٰهُ یَہْدِیْ مَنْ یَّشَآءُ اِلٰی صِرَاطٍ مُّسْتَقِیْمٍ ۝

“সকল মানুষ একই জাতি সত্তার অন্তর্ভুক্ত ছিল। অতঃপর আল্লাহ তা’আলা পয়গম্বর পাঠালেন সুসংবাদদাতা ও ভীতি প্রদর্শনকরী হিসাবে। আর তাঁদের সাথে অবতীর্ণ করলেন সত্য কিতাব, যাতে মানুষের মাঝে বিতর্কমূলক বিষয়ে মীমাংসা করতে পারেন। বস্তুত কিতাবের ব্যাপারে অন্য কেউ মতভেদ করেনি; কিন্তু পরিষ্কার নির্দেশ এসে যাবার পর নিজেদের পারস্পরিক জেদবশত তারাই করেছে, যারা কিতাব প্রাপ্ত হয়েছিল। অতঃপর আল্লাহ ঈমানদারদেরকে হেদায়েত করেছেন সেই সত্য বিষয়ে, যে ব্যাপারে তারা মতভেদ লিপ্ত হয়েছিল। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা, সরল পথ বাতলে দেন।” (২:২১৩)

اَلَّذِيْنَ اٰتَيْنٰهُمُ الْكِتٰبَ يَتْلُوْنَه حَقَّ تِلَاوَتِه اُوْلٰٓئِكَ يُؤْمِنُوْنَ بِه ۗ وَمَنْ يَكْفُرْ بِه فَاُوْلٰٓئِكَ هُمُ الْخٰسِرُوْنَ

“আমি যাদেরকে গ্রন্থ দান করেছি, তারা তা যথাযথভাবে পাঠ করে। তারাই তৎপ্রতি বিশ্বাস করে। আর যারা তা অবিশ্বাস করে, তারাই হবে ক্ষতিগ্রস্ত।” (২:১২১)।

ذٰلِكَ الْكِتٰبُ لَا رَيْبَ ۛ فِيْهِ ۛ هُدًى لِّلْمُتَّقِيْنَ۝

“এ সেই কিতাব (কুরআন) যাতে কোনই সন্দেহ নেই। পথ প্রদর্শনকারী পরহেযগারদের জন্য।” (২:২)

نَزَّلَ عَلَيْكَ الْكِتٰبَ بِالْحَقِّ مُصَدِّقًا لِّمَا بَيْنَ يَدَيْهِ وَاَنزَلَ التَّوْرٰىةَ وَالْاِنجِيْلَ۝ مِنْ قَبْلُ هُدًى لِّلنَّاسِ وَاَنزَلَ الْفُرْقَانَ ۗ اِنَّ الَّذِيْنَ كَفَرُوْا بِـَٔايٰتِ اللهِ لَهُمْ عَذَابٌ شَدِيْدٌ ۗ وَاللهُ عَزِيْزٌ ذُوْانتِقَامٍ۝

“তিনি আপনার প্রতি কিতাব (কুরআন) নাযিল করেছেন সত্যতার সাথে; যা সত্যায়ন করে পূর্ববর্তী কিতাবসমূহের। নাযিল করেছেন তাওরাত ও ইঞ্জিল, এ কিতাবের পূর্বে, মানুষের হেদায়েতের জন্যে এবং অবতীর্ণ করেছেন ফুরকান (সত্য ও মিথ্যার মীমাংসাকারী মানদন্ড)। নিঃসন্দেহে যারা আল্লাহর আয়াতসমূহ অস্বীকার করে, তাদের জন্যে রয়েছে কঠিন আযাব। আর আল্লাহ হচ্ছেন পরাক্রমশীল, প্রতিশোধ গ্রহণকারী।” (৩:৩–৪)

كَمَاۤ اَرْسَلْنَا فِیْکُمْ رَسُوْلًا مِّنْکُمْ یَتْلُوْا عَلَیْکُمْ اٰیٰتِنَا وَ یُزَكِیْکُمْ وَ یُعَلِّمُکُمُ الْكِتٰبَ وَ الْحِکْمَۃَ وَ یُعَلِّمُکُمْ مَّا لَمْ تَکُوْنُوْا تَعْلَمُوْنَ ۝

“যেমন, আমি পাঠিয়েছি তোমাদেরই মধ্য থেকে তোমাদের জন্যে একজন রসূল, যিনি তোমাদের নিকট আমার বাণীসমূহ পাঠ করবেন এবং তোমাদের পবিত্র করবেন; আর তোমাদের শিক্ষা দেবেন কিতাব (কুরআন) ও তাঁর তত্ত্ব–জ্ঞান এবং শিক্ষা দেবেন এমন বিষয় যা কখনো তোমরা জানতে না।” (২:১৫১)

وَاِذَا قِیْلَ لَهُمْ اٰمِنُوْا بِمَاۤ اَنْزَلَ اللّٰهُ قَالُوْا نُؤْمِنُ بِمَاۤ اُنْزِلَ عَلَیْنَا وَ یَکْفُرُوْنَ بِمَا وَرَآءَہٗ ٭ وَ هُوَ الْحَقُّ مُصَدِّقًا لِّمَا مَعَهُمْ ط قُلْ فَلِمَ تَقْتُلُوْنَ اَنْۢبِیَآءَ اللّٰهِ مِنْ قَبْلُ اِنْ کُنْتُمْ مُّؤْمِنِیْنَ۝

“যখন তাদেরকে বলা হয়, আল্লাহ যা পাঠিয়েছেন তা মেনে নাও, তখন তারা বলে, আমরা মানি যা আমাদের প্রতি অবতীর্ণ হয়েছে। সেটি ছাড়া সবগুলোকে তারা অস্বীকার করে। অথচ এ গ্রন্থটি (কুরআন) সত্য এবং সত্যায়ন করে ঐ গ্রন্থের যা তাদের কাছে রয়েছে। বলে দিন, তবে তোমরা ইতিপূর্বে পয়গম্বরদের হত্যা করতে কেন যদি তোমরা বিশ্বাসী ছিলে।” (২:৯১)

لٰكِنِ الرّٰسِخُوْنَ فِی الْعِلْمِ مِنْهُمْ وَ الْمُؤْمِنُوْنَ یُؤْمِنُوْنَ بِمَاۤ اُنْزِلَ اِلَیْكَ وَ مَاۤ اُنْزِلَ مِنْ قَبْلِكَ وَ الْمُقِیْمِیْنَ الصَّلٰوۃَ وَ الْمُؤْتُوْنَ الزَّکٰوۃَ وَ الْمُؤْمِنُوْنَ بِاللّٰهِ وَ الْیَوْمِ الْاٰخِرِ ؕ اُولٰٓئِكَ سَنُؤْتِیْهِمْ اَجْرًا عَظِیْمًا ۝ اِنَّاۤ اَوْحَیْنَاۤ اِلَیْكَ كَمَاۤ اَوْحَیْنَاۤ اِلٰی نُوْحٍ وَّ النَّبِیّٖنَ مِنْۢ بَعْدِہٖ ۚ وَ اَوْحَیْنَاۤ اِلٰۤی اِبْرٰهِیْمَ وَ اِسْمٰعِیْلَ وَ اِسْحٰقَ وَ یَعْقُوْبَ وَ الْاَسْبَاطِ وَ عِیْسٰی وَ اَیُّوْبَ وَ یُوْنُسَ وَ هٰرُوْنَ وَسُلَیْمٰنَ ۚ وَ اٰتَیْنَا دَاوٗدَ زَبُوْرًا ۝

“কিন্তু যারা তাদের মধ্যে জ্ঞানপক্ক ও ঈমানদার, তারা তাও মান্য করে যা আপনার উপর অবতীর্ণ হয়েছে এবং যা অবতীর্ণ হয়েছে আপনার পূর্বে। আর যারা নামাযে অনুবর্তিতা পালনকারী, যারা যাকাত দানকারী এবং যারা আল্লাহ ও কেয়ামতে আস্থাশীল। বস্তুত এমন লোকদেরকে আমি দান করবো মহাপূণ্য। আমি আপনার প্রতি ওহী পাঠিয়েছি, যেমন করে ওহী পাঠিয়েছিলাম নূহের প্রতি এবং সে সমস্ত নবী-রাসূলের প্রতি যাঁরা তাঁর পরে প্রেরিত হয়েছেন। আর ওহী পাঠিয়েছি, ইসমাঈল, ইব্রাহীম, ইসহাক, ইয়াকুব ও তাঁর সন্তানবর্গের প্রতি এবং ঈসা, আইয়ুব, ইউনূস, হারুন ও সুলায়মানের প্রতি। আর আমি দাউদকে দান করেছি যবুর গ্রন্থ।” (৪:১৬২–১৬৩)

مَثَلُ الَّذِيْنَ حُمِّلُوْا التَّوْرٰىةَ ثُمَّ لَمْ يَحْمِلُوْهَا كَمَثَلِ الْحِمَارِ يَحْمِلُ اَسْفَارًۢا بِئْسَ مَثَلُ الْقَوْمِ الَّذِيْنَ كَذَّبُوْا بِـَٔايٰتِ اللهِ ج وَاللهُ لَا يَهْدِى الْقَوْمَ الظّٰلِمِيْنَ۝

“যাদেরকে তওরাত দেয়া হয়েছিল, অতঃপর তারা তার অনুসরণ করেনি, তাদের দৃষ্টান্ত সেই গাধা, যে পুস্তক বহন করে, যারা আল্লাহর আয়াতসমূহকে মিথ্যা বলে, তাদের দৃষ্টান্ত কত নিকৃষ্ট। আল্লাহ জালেম সম্প্রদায়কে পথ প্রদর্শন করেন না।” (৬২:৫)

قُوْلُوْۤا اٰمَنَّا بِاللّٰهِ وَ مَاۤ اُنْزِلَ اِلَیْنَا وَ مَاۤ اُنْزِلَ اِلٰۤی اِبْرٰہٖمَ وَ اِسْمٰعِیْلَ وَ اِسْحٰقَ وَ یَعْقُوْبَ وَ الْاَسْبَاطِ وَ مَاۤ اُوْتِیَ مُوْسٰی وَ عِیْسٰی وَ مَاۤ اُوْتِیَ النَّبِیُّوْنَ مِنْ رَّبِّهِمْ ۚ لَا نُفَرِّقُ بَیْنَ اَحَدٍ مِّنْهُمْ ۫ۖ وَنَحْنُ لَہٗ مُسْلِمُوْنَ۝

“তোমরা বল, আমরা ঈমান এনেছি আল্লাহর উপর এবং যা অবতীর্ণ হয়েছে আমাদের প্রতি এবং যা অবতীর্ণ হয়েছে ইব্রাহীম, ইসমাঈল, ইসহাক, ইয়াকুব এবং তদীয় বংশধরের প্রতি এবং মূসা, ঈসা, অন্যান্য নবীকে পালনকর্তার পক্ষ থেকে যা দান করা হয়েছে, তৎসমুদয়ের উপর। আমরা তাদের মধ্যে পার্থক্য করি না। আমরা তাঁরই আনুগত্যকারী।” (২:১৩৬)

ذٰلِكَ بِاَنَّ اللهَ نَزَّلَ الْكِتٰبَ بِالْحَقِّ ۗ وَاِنَّ الَّذِيْنَ اخْتَلَفُوْا فِى الْكِتٰبِ لَفِىْ شِقَاقٍۭ بَعِيْدٍ۝

“আর এটা এজন্যে যে, আল্লাহ নাযিল করেছেন সত্যপূর্ণ কিতাব। আর যারা কেতাবের মাঝে মতবিরোধ সৃষ্টি করেছে নিশ্চয়ই তারা জেদের বশবর্তী হয়ে অনেক দূরে চলে গেছে।” (২:১৭৬)

اِنَّ الَّذِیْنَ یَکْتُمُوْنَ مَاۤ اَنْزَلَ اللّٰهُ مِنَ الْكِتٰبِ وَ یَشْتَرُوْنَ بِہٖ ثَمَنًا قَلِیْلًا لا اُولٰٓئِكَ مَا یَاْکُلُوْنَ فِیْ بُطُوْنِهِمْ اِلَّا النَّارَ وَلَا یُكَلِّمُهُمُ اللّٰهُ یَوْمَ الْقِیٰمَۃِ وَلَا یُزَكِیْهِمْ ج وَ لَهُمْ عَذَابٌ اَلِیْمٌ۝

“নিশ্চয় যারা সেসব বিষয় গোপন করে, যা আল্লাহ কিতাবে নাযিল করেছেন এবং সেজন্য অল্প মূল্য গ্রহণ করে, তারা আগুন ছাড়া নিজের পেটে আর কিছু ঢুকায় না। আর আল্লাহ কেয়ামতের দিন তাদের সাথে না কথা বলবেন, না তাদের পবিত্র করা হবে, বস্তুত তাদের জন্যে রয়েছে বেদনাদায়ক আযাব।” (২:১৭৪)

هُوَ الَّذِیْۤ اَنْزَلَ عَلَیْكَ الْكِتٰبَ مِنْهُ اٰیٰتٌ مُّحْكَمٰتٌ هُنَّ اُمُّ الْكِتٰبِ وَ اُخَرُ مُتَشٰبِهٰتٌ ؕ فَاَمَّا الَّذِیْنَ فِیْ قُلُوْبِهِمْ زَیْغٌ فَیَتَّبِعُوْنَ مَا تَشَابَهَ مِنْهُ ابْتِغَآءَ الْفِتْنَۃِ وَ ابْتِغَآءَ تَاْوِیْلِہٖ ۚ وَ مَا یَعْلَمُ تَاْوِیْلَہٗۤ اِلَّا اللّٰهُ ۘؔ وَ الرّٰسِخُوْنَ فِی الْعِلْمِ یَقُوْلُوْنَ اٰمَنَّا بِہٖ ۙ کُلٌّ مِّنْ عِنْدِ رَبِّنَا ۚ وَ مَا یَذَّكَرُ اِلَّاۤ اُولُوا الْاَلْبَابِ۝

“তিনিই আপনার প্রতি কিতাব নাযিল করেছেন। তাতে কিছু আয়াত রয়েছে সুস্পষ্ট, সেগুলোই কিতাবের আসল অংশ। আর অন্যগুলো রূপক। সুতরাং যাদের অন্তরে কুটিলতা রয়েছে, তারা অনুসরণ করে ফিৎনা বিস্তার এবং অপব্যাখ্যার উদ্দেশে তন্মধ্যেকার রূপকগুলোর। আর সেগুলোর ব্যাখ্যা আল্লাহ ব্যতীত কেউ জানে না। আর যারা জ্ঞানে সুগভীর, তারা বলেন: আমরা এর প্রতি ঈমান এনেছি। এই সবই আমাদের পালনকর্তার পক্ষ থেকে অবতীর্ণ হয়েছে। আর বোধশক্তি সম্পন্নেরা ছাড়া অপর কেউ শিক্ষা গ্রহণ করে না।” (৩:৭)

بَلْ تُؤْثِرُوْنَ الْحَیٰوۃَ الدُّنْیَا ۝ وَ الْاٰخِرَۃُ خَیْرٌ وَّ اَبْقٰی ۝ اِنَّ هٰذَا لَفِی الصُّحُفِ الْاُوْلٰی ۝ صُحُفِ اِبْرٰهِیْمَ وَ مُوْسٰی۝

“বস্তুত তোমরা পার্থিব জীবনকে অগ্রাধিকার দাও, অথচ পরকালের জীবন উৎকৃষ্ট ও স্থায়ী। এটা লিখিত রয়েছে পূর্ববতী কিতাবসমূহে; ইব্রাহীম ও মূসার কিতাবসমূহে।” (৮৭:১৬–১৯)

اَلَمْ تَرَ اِلَی الَّذِیْنَ اُوْتُوْا نَصِیْبًا مِّنَ الْكِتٰبِ یُدْعَوْنَ اِلٰی كِتٰبِ اللّٰهِ لِیَحْکُمَ بَیْنَهُمْ ثُمَّ یَتَوَلّٰی فَرِیْقٌ مِّنْهُمْ وَ هُمْ مُّعْرِضُوْنَ۝

“আপনি কি তাদের দেখেননি, যারা কিতাবের কিছু অংশ পেয়েছে – আল্লাহর কিতাবের প্রতি তাদের আহ্বান করা হয়েছিল যাতে তাদের মধ্যে মীমাংসা করা যায়। অতঃপর তাদের মধ্যে একদল তা অমান্য করে মুখ ফিরিয়ে নেয় ।” (৩:২৩)

وَ اِنَّ مِنْهُمْ لَفَرِیْقًا یَّلْوٗنَ اَلْسِنَتَهُمْ بِالْكِتٰبِ لِتَحْسَبُوْهُ مِنَ الْكِتٰبِ وَ مَا هُوَ مِنَ الْكِتٰبِ ۚ وَ یَقُوْلُوْنَ هُوَ مِنْ عِنْدِ اللّٰهِ وَ مَا هُوَ مِنْ عِنْدِ اللّٰهِ ۚ وَ یَقُوْلُوْنَ عَلَی اللّٰهِ الْكَذِبَ وَ هُمْ یَعْلَمُوْنَ۝

“আর তাদের মধ্যে একদল রয়েছে, যারা বিকৃত উচ্চারণে মুখ বাঁকিয়ে কিতাব পাঠ করে, যাতে তোমরা মনে কর যে, তার কিতাব থেকেই পাঠ করছে। অথচ তারা যা আবৃত্তি করছে তা আদৌ কিতাব নয়। এবং তারা বলে যে, এসব কথা আল্লাহর তরফ থেকে আগত। অথচ এসব আল্লাহর তরফ থেকে প্রেরিত নয়। আর তারা জেনে শুনে আল্লাহরই প্রতি মিথ্যারোপ করে ।” (৩:৭৮)

وَمِنْهُمْ مَّنْ يُّؤْمِنُ بِه وَمِنْهُمْ مَّنْ لَّا يُؤْمِنْ بِه ط وَرَبُّكَ اَعْلَمُ بِالْمُفْسِدِيْنَ ۝ وَاِنْ كَذَّبُوْكَ فَقُلْ لِّى عَمَلِىْ وَلَكُمْ عَمَلُكُمْ اَنْتُمْ بَرِيْٓـُٔوْنَ مِمَّاۤ اَعْمَلُ وَاَنَابَرِىٓءٌ مِّمَّا تَعْمَلُوْنَ ۝ وَمِنْهُمْ مَّنْ يَسْتَمِعُوْنَ اِلَيْكَ ط اَفَاَنْتَ تُسْمِعُ الصُّمَّ وَلَوْ كَانُوْا لَا يَعْقِلُوْنَ ۝ وَمِنْهُمْ مَّنْ يَّنْظُرُ اِلَيْكَ ط اَفَاَنْتَ تَهْدِى الْعُمْىَ وَلَوْ كَانُوْا لَا يُبْصِرُوْنَ ۝ اِنَّ اللهَ لَا يَظْلِمُ النَّاسَ شَيْـًٔا وَّلٰكِنَّ النَّاسَ اَنْفُسَهُمْ يَظْلِمُوْنَ ۝

“আর তাদের মধ্যে কেউ কেউ কুরআনকে বিশ্বাস করবে এবং কেউ কেউ বিশ্বাস করবে না। বস্তুত আপনার পরওয়ারদেগার যথার্থই জানেন দুরাচারদিগকে। আর যদি আপনাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে, তবে বলুন, আমার জন্য আমার কর্ম, আর তোমাদের জন্য তোমাদের কর্ম। তোমাদের দায়–দায়িত্ব নেই আমার কর্মের উপর এবং আমারও দায়–দায়িত্ব নেই তোমরা যা কর সেজন্য। তাদের কেউ কেউ কান রাখে আপনাদের প্রতি; আপনি বধিরদেরকে কি শোনাবেন যদি তাদের বিবেক–বুদ্ধি না থাকে! আবার তাদের মধ্যে কেউ কেউ আপনাদের প্রতি দৃষ্টিনিবদ্ধ রাখে; আপনি অন্ধদেরকে কি পথ দেখাবেন যদি তারা মোটেও দেখতে না পারে। আল্লাহ যুলুম করেন না মানুষের উপর, বরং মানুষ নিজেই নিজের উপর যুলুম করে।” (১০:৪০–৪৪)

فَاِنْ كَذَّبُوْكَ فَقَدْ کُذِّبَ رُسُلٌ مِّنْ قَبْلِكَ جَآءُوْ بِالْبَیِّنٰتِ وَ الزُّبُرِ وَ الْكِتٰبِ الْمُنِیْرِ ۝

“তাছাড়া এরা যদি তোমাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে, তবে তোমার পূর্বেও এরা এমন বহু নবীকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে, যারা নিদর্শনসমূহ নিয়ে এসেছিলেন। এবং এনেছিলেন সহীফা ও প্রদীপ্ত গ্রন্থ।” (৩:১৮৪)

وَ اِنَّ مِنْ اَهْلِ الْكِتٰبِ لَمَنْ یُّؤْمِنُ بِاللّٰهِ وَ مَاۤ اُنْزِلَ اِلَیْکُمْ وَ مَاۤ اُنْزِلَ اِلَیْهِمْ خٰشِعِیْنَ لِلّٰهِ ۙ لَا یَشْتَرُوْنَ بِاٰیٰتِ اللّٰهِ ثَمَنًا قَلِیْلًا ؕ اُولٰٓئِكَ لَهُمْ اَجْرُهُمْ عِنْدَ رَبِّهِمْ ؕ اِنَّ اللّٰهَ سَرِیْعُ الْحِسَابِ۝

“আর আহলে কিতাবদের মধ্যে কেউ কেউ এমনও রয়েছে, যারা আল্লাহর উপর ঈমান আনে এবং যা কিছু তোমার উপর অবতীর্ণ হয় আর যা কিছু তাদের উপর অবতীর্ণ হয়েছে সেগুলোর উপর, আল্লাহর সামনে বিনয়াবনত থাকে এবং আল্লার আয়াতসমূহকে স্বল্পমুল্যের বিনিময়ে সওদা করে না, তারাই হলো সে লোক যাদের জন্য পারিশ্রমিক রয়েছে তাদের পালনকর্তার নিকট। নিশ্চয়ই আল্লাহ যথাশীঘ্র হিসাব চুকিয়ে দেন।” (৩:১৯৯)

وَ مِنْ قَبْلِہٖ كِتٰبُ مُوْسٰۤی اِمَامًا وَّ رَحْمَۃً ؕ وَ هٰذَا كِتٰبٌ مُّصَدِّقٌ لِّسَانًا عَرَبِیًّا لِّیُنْذِرَ الَّذِیْنَ ظَلَمُوْا ٭ۖ وَ بُشْرٰی لِلْمُحْسِنِیْنَ ۝

”এর আগে মূসার কিতাব ছিল পথপ্রদর্শক ও রহমতস্বরূপ। আর এই কিতাব (কুরআন) তার সমর্থক আরবী ভাষায়, যাতে যালেমদেরকে সতর্ক করে এবং সৎকর্মপরায়ণদেরকে সুসংবাদ দেয়।” (৪৬:১২)

يٰۤاَيُّهَا الَّذِيْنَ اُوْتُوْا الْكِتٰبَ اٰمِنُوْا بِمَا نَزَّلْنَا مُصَدِّقًا لِّمَا مَعَكُمْ مِّنْ قَبْلِ

“হে আসমানী গ্রন্থের অধিকারীবৃন্দ! যা কিছু আমি অবতীর্ণ করেছি তার উপর বিশ্বাস স্থাপন কর, যা সে গ্রন্থের সত্যায়ন করে এবং যা তোমাদের নিকট রয়েছে পূর্ব থেকে…।” (৪:৪৭)

یَسْـَٔلُكَ اَهْلُ الْكِتٰبِ اَنْ تُنَزِّلَ عَلَیْهِمْ كِتٰبًا مِّنَ السَّمَآءِ فَقَدْ سَاَلُوْا مُوْسٰۤی اَکْبَرَ مِنْ ذٰلِكَ فَقَالُوْۤا اَرِنَا اللّٰهَ جَہْرَۃً فَاَخَذَتْهُمُ الصّٰعِقَۃُ بِظُلْمِهِمْ ۚ ثُمَّ اتَّخَذُوا الْعِجْلَ مِنْۢ بَعْدِ مَا جَآءَتْهُمُ الْبَیِّنٰتُ فَعَفَوْنَا عَنْ ذٰلِكَ ۚ وَاٰتَیْنَا مُوْسٰی سُلْطٰنًا مُّبِیْنًا ۝

“আপনার নিকট আহলে–কিতাবরা আবেদন জানায় যে, আপনি তাদের উপর আসমান থেকে লিখিত কিতাব অবতীর্ণ করিয়ে নিয়ে আসুন। বস্তুত এরা মূসার কাছে এর চেয়েও বড় জিনিস চেয়েছে। বলেছে, একেবারে সামনাসামনিভাবে আমাদের আল্লাহকে দেখিয়ে দাও। অতএব, তাদের উপর বজ্রপাত হয়েছে তাদের পাপের দরুন; অতঃপর তাদের নিকট সুস্পষ্ট প্রমাণ–নিদর্শন প্রকাশিত হবার পরেও তারা গো–বৎসকে উপাস্যরূপে গ্রহণ করেছিল; তাও আমি ক্ষমা করে দিয়েছিলাম এবং আমি মূসাকে প্রকৃষ্ট প্রভাব দান করেছিলাম।” (৪:১৫৩)

اِنَّاۤ اَنْزَلْنَا التَّوْرٰىۃَ فِیْهَا هُدًی وَّ نُوْرٌ ۚ یَحْکُمُ بِهَا النَّبِیُّوْنَ الَّذِیْنَ اَسْلَمُوْا لِلَّذِیْنَ هَادُوْا وَ الرَّبّٰنِیُّوْنَ وَ الْاَحْبَارُ بِمَا اسْتُحْفِظُوْا مِنْ كِتٰبِ اللّٰهِ وَ كَانُوْا عَلَیْهِ شُهَدَآءَ ۚ فَلَا تَخْشَوُا النَّاسَ وَ اخْشَوْنِ وَ لَا تَشْتَرُوْا بِاٰیٰتِیْ ثَمَنًا قَلِیْلًا ؕ وَ مَنْ لَّمْ یَحْکُمْ بِمَاۤ اَنْزَلَ اللّٰهُ فَاُولٰٓئِكَ هُمُ الْکٰفِرُوْنَ

“আমি তওরাত অবতীর্ণ করেছি। এতে হেদায়াত ও আলো রয়েছে। আল্লাহর আজ্ঞাবহ পয়গম্বর, দরবেশ ও আলেমরা এর মাধ্যমে ইহুদীদেরকে ফয়সালা দিতেন। কেননা, তাদেরকে এ খোদায়ী গ্রন্থের দেখাশোনা করার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল এবং তাঁরা এর রক্ষণাবেক্ষণে নিযুক্ত ছিলেন। …” (৫:৪৪)

وَ قَفَّیْنَا عَلٰۤی اٰثَارِهِمْ بِعِیْسَی ابْنِ مَرْیَمَ مُصَدِّقًا لِّمَا بَیْنَ یَدَیْهِ مِنَ التَّوْرٰىۃِ ۪ وَ اٰتَیْنٰهُ الْاِنْجِیْلَ فِیْهِ هُدًی وَّنُوْرٌ ۙ وَّ مُصَدِّقًا لِّمَا بَیْنَ یَدَیْهِ مِنَ التَّوْرٰىۃِ وَ هُدًی وَّ مَوْعِظَۃً لِّلْمُتَّقِیْنَ۝

“আমি তাদের পেছনে মরিয়ম তনয় ঈসাকে প্রেরণ করেছি। তিনি পূর্ববর্তী গ্রন্থ তওরাতের সত্যায়নকারী ছিলেন। আমি তাঁকে ইঞ্জিল প্রদান করেছি। এতে হেদায়াত ও আলো রয়েছে। এটি পূর্ববর্তী গ্রন্থ তওরাতের সত্যায়ন করে পথ প্রদর্শন করে এবং এটি খোদাভীরুদের জন্যে হেদায়েত উপদেশ বাণী।” (৫:৪৬)

অধ্যায়সমূহ