২২ তম অধ্যায় : অর্থনৈতিক বিধি – বিধান সম্পর্কিত আয়াতসমূহ

ইসলামের অর্থনৈতিক নীতিমালা

ইসলাম ধর্ম মতে মানুষ শুধু ভোগসর্বস্ব প্রাণী নয়। সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে মানুষ এ পৃথিবীতে আল্লাহর প্রতিনিধিরূপে প্রেরিত। সৃষ্টির সার্বজনীন কল্যাণের জন্যই মানুষের উদ্ভব। দুনিয়ার বুকে সত্য, ন্যায়, সাম্য ও শান্তি প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব দিয়ে আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন মানুষকে প্রেরণ করেছেন। মানুষ এ দুনিয়ায় আল্লাহ্ প্রদত্ত নিয়ামতের সঠিক আমানতদারী করবে, মিতব্যয়ীতার সাথে এ নিয়ামত ভোগ করবে এবং সার্বজনীন উপকারে এর ন্যায্য বন্টন নিশ্চিত করবে – এটাই আল্লাহর নির্দেশ। আল্লাহ্ সব প্রয়োজন ও অভাবের ঊর্দ্ধে, পৃথিবীর যাবতীয় সম্পদে তাঁর নিজের কোন প্রয়োজন নেই। তিনি চান, মানুষ তাঁর প্রতিনিধি হিসেবে তাদেরকে প্রদত্ত যিম্মাদারী তাঁর নির্দেশ মোতাবেক সঠিকভাবে পালন করুক। তিনি তাঁর প্রতিনিধি হিসেবে মানুষকে যে জিম্মাদারীর দায়িত্ব দিয়েছেন তার সাথে তিনি যুক্ত করে দিয়েছেন কর্মের স্বাধীনতা ও জবাবদিহিতা।

মানুষের জীবন–জীবিকার সাথে উৎপাদন ও বন্টন ব্যবস্থা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। মানুষ সমাজবদ্ধ জীব, তাই তারা পারস্পরিক প্রয়োজনে একে অপরের উপর নির্ভরশীল। এ কারণেই উৎপাদন ও বন্টন ব্যবস্থার সুষ্ঠু ও ন্যায্য ব্যবস্থাপনা অতীব জরুরী। মানুষ তার ইচ্ছামাফিক জীবিকা অর্জন ও ভোগ করতে পারবে, তবে এর জন্য পরকালে তাকে পুরোপুরি হিসেব–নিকেশ ও জবাবদিহির সম্মুখীন হতে হবে। বিচার দিবসে প্রত্যেকেই তার জীবন–জীবিকার সাথে সংশ্লিষ্ট বিষয়সমূহ এবং আল্লাহ্ প্রদত্ত নিয়ামতের ব্যবহার ও ভোগ সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। ন্যায়ভিত্তক সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য গরীবের প্রাপ্য হক তাকে দিয়ে দিতে হবে এবং আল্লাহ্ প্রদত্ত সম্পদের কোনরূপ অপচয় ও অপব্যবহার করা যাবে না।

আল্লাহ্ জীবিকার ক্ষেত্রে তারতম্য এজন্য করেছেন যেন মানুষের মধ্যে পারস্পরিক নির্ভরশীলতা ও সহযোগিতা বৃদ্ধি পায়, জীবন চক্র সহজ ও সাবলীল হয়ে ওঠে। সম্পদ, জ্ঞান, বুদ্ধি, মেধা, শক্তি, কর্ম – দক্ষতা ও জীবিকার তারতম্যের মধ্যে মানুষের জন্য নিহিত রয়েছে আল্লাহর প্রতিনিধি হিসেবে তার দায়িত্ব পালনের পরীক্ষা ও জবাবদিহিতার বিষয়টি। একজন ব্যক্তিবিশেষ তার একার পক্ষে বিবিধ মানবিক সীমাবদ্ধতার দরুন নিজের সব রকম চাহিদা পূরণে সক্ষম নয়। অন্যের সেবা ও সাহায্য–সহযোগিতা তার প্রয়োজন। আর মানুষের এ প্রয়োজনকে ঘিরেই সৃষ্টি হয়েছে যাবতীয় অর্থনৈতিক কর্মকান্ড। এ অর্থনৈতিক কর্মকান্ডকে ন্যায্য পন্থায় ও সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালিত করাই ইসলাম ধর্মের লক্ষ্য। এ লক্ষ্য অর্জনে আল্লাহ মানুষের উপর দুঃসাধ্য কষ্ট আরোপ করতে চান না, বরং তাদের জীবনকে সহজ করতে চান। তিনি বলেন:

“….আল্লাহ্ কারো উপর তার সাধ্যাতীত কোন বোঝা চাপিয়ে দেন না……।” (২:২৮৬) । তিনি আরও বলেন,  “…. আল্লাহ্ তোমাদের জন্য সহজ করতে চান; তোমাদের জন্য জটিলতা কামনা করেন না ……।” (২:১৮৫)।

“….আল্লাহ তোমাদেরকে অসুবিধায় ফেলতে চান না; কিন্তু তোমাদেরকে পবিত্র রাখতে চান এবং তোমাদের প্রতি স্বীয় নেয়ামত পূর্ণ করতে চান–যাতে তোমরা কৃতজ্ঞাতা প্রকাশ কর।” (৫:৬)

যেহেতু আল্লাহতায়ালা ইসলামকে একটি মধ্যপন্থী ধর্ম হিসেবে মনোনীত করেছেন, সেহেতু মানুষের জীবন–যাপনও হবে মধ্যম মানের। জীবনকে লাগামহীন বানানো ইসলামের নীতি–বিরুদ্ধ। এ কারণেই একদিকে যেমন উগ্র বিলাসিতা, অপব্যয় ও অপচয় ইসলামে নিষেধ করা হয়েছে, অপরদিকে কৃচ্ছতার নামে কৃপণতা বা স্বাভাবিক জৈবিক প্রয়োজনগুলোকে অস্বীকার করে জীবন–বিমুখ হয়ে থাকা এর কোনটাই ইসলাম সমর্থন করে না। ভোগবাদ বা বৈরাগ্যবাদ এর কোনটাই ইসলামে কাম্য নয়। জীবনকে সহজ, সাবলীল ও সুন্দর করে তোলাই ইসলামের লক্ষ্য।

এজন্য জীবন যাপনের ক্ষেত্রে মধ্যপন্থা অবলম্বন করাকেই ইসলাম গুরুত্ব দিয়ে থাকে। চরমপন্থা মানব জাতির জন্য কি দুর্দশা বয়ে আনে তা আমরা বর্তমান অর্থনৈতিক ব্যবস্থার দিকে তাকালেই দেখতে পাই। এর একদিক যুলুম, শোষণ, বঞ্চনা, ক্ষুধা ও দারিদ্রের কালো চাদরে আবৃত, আর অপরদিক চাকচিক্যময় লাগামহীন বিলাসী জীবনের ফল্গুধারায় উচ্ছ্বসিত। নৈতিকতাবর্জিত সেক্যুলার আর্থ–সামাজিক ব্যবস্থা মানব সমাজে সার্বিক ইনসাফ প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থ হয়েছে। ‘ঋণ নিয়ে ভোগ কর আর জীবনভর সুদসহ তা ফেরত দাও’ – এ ভোগসর্বস্ব শোষণমূলক নীতি মানুষকে ভারবাহী গাধার মত আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেছে। আর এভাবেই মানুষ অর্থনৈতিক শোষণের দাসে পরিণত হয়েছে। তাই ইসলামের মধ্যমপন্থী ন্যায্য ও জবাবদিহিমূলক অর্থনৈতিক নীতিমালা একটি উৎকৃষ্ট বিকল্প জীবন ব্যবস্থার সহায়ক হতে পারে।

ইসলামের অর্থনৈতিক নীতির বৈশিষ্ট্যসমূহ নিম্নে আলোচিত হলো:

  • ইসলাম সহজ–সরল ও মধ্যমপন্থী জীবন ব্যবস্থা অনুমোদন করে।

  • এ লক্ষ্যে ইসলাম ন্যায়ভিত্তিক ও ভারসাম্যপূর্ণ একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থার প্রবক্তা।

  • অপচয়, অপব্যয় ও বিলাসবহুল জড়বাদী জীবন বা পাশব জীবন যাপন ইসলাম সমর্থন করে না।

  • ইসলাম মিতাচার ও মধ্যমমানের জীবন–যাত্রাকে প্রাধান্য দেয়, অন্যদিকে অমিতাচার ও কার্পণ্যকে অপছন্দ করে।

  • আল্লাহর নিয়ামতের অপচয় ও প্রাকৃতিক সম্পদের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার ইসলাম নিরুৎসাহিত করে এবং জনকল্যাণে এসবের সদ্ব্যয় কামনা করে। কারণ প্রাকৃতিক সম্পদের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার পরিবেশ দূষণ করে, প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট করে, বিপর্যয় সৃষ্টি করে ও জনজীবনে দুর্ভোগ বয়ে আনে।

  • ইসলামে প্রতিটি মানুষকে আল্লাহর নিয়ামত ভোগ এবং তার ধন–সম্পদ উপার্জন ও ব্যয়ের ব্যাপারে অল্লাহর নিকট জবাবদিহি করতে হবে।

  • জীবিকা অর্জনের ক্ষেত্রে সকলের সমান সুযোগ ইসলাম নিশ্চিত করে।

  • ইসলাম ধনীর সম্পদে গরীবের অধিকারকে স্বীকৃতি দেয় এবং ধনীর জন্যা যাকাত প্রদান বাধ্যতামূলক করা হয়েছে যাতে গরীব, অভাবগ্রস্ত ও দুঃস্থ মানুষ অর্থনৈতিক নিরাপত্তা লাভ করে।

  • ইসলামে গরীবের মৌলিক চাহিদা পূরণের জন্য  ‘বাইতুল মাল’ বা সরকারী কোষাগার থেকে ভাতা প্রদানের ব্যবস্থা করে থাকে।

  • হালাল উপার্জনকে ইসলাম ইবাদত হিসেবে গণ্য করে।

  • ইসলাম  লাভ–লোকসানের ভিত্তিতে সৎ ও হালাল ব্যবসা অনুমোদন করে। ব্যবসায়ে প্রতারণা, শপথভঙ্গ, পণ্যে ভেজাল, ওজন ও মাপে হেরফের, মুনাফাখুরী, ইত্যাদি দুর্নীতিমূলক অপকর্ম ইসলামে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

  • শোষণের হাতিয়ার সুদকে ইসলাম নিষিদ্ধ ও পাপ বলে গণ্য করে এবং সুদমুক্ত ঋণ প্রদানকে প্রাধান্য দেয়।

  •  ইসলাম সুনির্দিষ্ট হারে উত্তরাধিকার সম্পদের ভাগ–বাটোয়ারার মাধ্যমে সম্পদের ন্যায্য বন্টন নিশ্চিত করে।

  • সম্পদ কিছু লোকের হাতে পুঞ্জীভূত হওয়া ইসলামের নীতি নয়, বরং অতিরিক্ত সম্পদ যাকাত, দান–খয়রাত, ওসীয়ত ও ওয়াকফের মাধ্যমে বিলিবন্টনের তাগিদ দেয়।

 

অর্থনৈতিক নীতি ও জীবিকা সম্পর্কিত আয়াতগুলো নিম্নে উদ্ধৃত করা হলো:

وَ لَوْ بَسَطَ اللّٰهُ الرِّزْقَ لِعِبَادِہٖ لَبَغَوْا فِی الْاَرْضِ وَ لٰكِنْ یُّنَزِّلُ بِقَدَرٍ مَّا یَشَآءُ ؕ اِنَّہٗ بِعِبَادِہٖ خَبِیْرٌۢ بَصِیْرٌ ۝

“যদি আল্লাহ তাঁর সকল বান্দাকে প্রচুর রিযিক দিতেন, তবে তারা পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করত। কিন্তু তিনি যে পরিমাণ ইচ্ছা সে পরিমাণ (জীবিকা) নাযিল করেন। নিশ্চয় তিনি তাঁর বান্দাদের সম্যক খবর রাখেন ও সবকিছু দেখেন।” (৪২:২৭)

وَ مَا مِنْ دَآبَّۃٍ فِی الْاَرْضِ اِلَّا عَلَی اللّٰهِ رِزْقُهَا وَ یَعْلَمُ مُسْتَقَرَّهَا وَ مُسْتَوْدَعَهَا ؕ کُلٌّ فِیْ كِتٰبٍ مُّبِیْنٍ۝

“আর পৃথিবীতে এমন কোন বিচরণশীল জীব নেই, যার জীবিকার দায়িত্ব আল্লাহর ওপর নেই। তিনি জানেন তারা কোথায় থাকে এবং কোথায় সমাপিত হয়। সবকিছুই এক সুবিন্যস্ত কিতাবে রয়েছে।” (১১:৬)

اَهُمْ یَقْسِمُوْنَ رَحْمَتَ رَبِّكَ ؕ نَحْنُ قَسَمْنَا بَیْنَهُمْ مَّعِیْشَتَهُمْ فِی الْحَیٰوۃِ الدُّنْیَا وَ رَفَعْنَا بَعْضَهُمْ فَوْقَ بَعْضٍ دَرَجٰتٍ لِّیَتَّخِذَ بَعْضُهُمْ بَعْضًا سُخْرِیًّا ؕ وَ رَحْمَتُ رَبِّكَ خَیْرٌ مِّمَّا یَجْمَعُوْنَ۝

“তারা কি আপনার পালনকর্তার রহমত বণ্টন করে? আমি তাদের মধ্যে তাদের জীবিকা বণ্টন করেছি পার্থিব জীবনে এবং একের মর্যাদাকে অপরের উপর উন্নীত করেছি, যাতে একে অপরকে সেবকরূপে গ্রহণ করে। তারা যা সঞ্চয় করে, আপনার পালনকর্তার রহমত তদপেক্ষা উত্তম।” (৪৩:৩২)

یٰۤاَیُّهَا الَّذِیْنَ اٰمَنُوْا لَا تَاْکُلُوْۤا اَمْوَالَکُمْ بَیْنَکُمْ بِالْبَاطِلِ اِلَّاۤ اَنْ تَکُوْنَ تِجَارَۃً عَنْ تَرَاضٍ مِّنْکُمْ ۟ وَ لَا تَقْتُلُوْۤا اَنْفُسَکُمْ ؕ اِنَّ اللّٰهَ كَانَ بِکُمْ رَحِیْمًا ۝ وَ مَنْ یَّفْعَلْ ذٰلِكَ عُدْوَانًا وَّ ظُلْمًا فَسَوْفَ نُصْلِیْهِ نَارًا ؕ وَ كَانَ ذٰلِكَ عَلَی اللّٰهِ یَسِیْرًا ۝

“হে ঈমানদারগণ! তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না। কেবলমাত্র তোমাদের পরস্পরের সম্মতিক্রমে যে ব্যবসা করা হয় তা বৈধ। আর তোমরা নিজেদের কাউকে হত্যা করো না। নিঃসন্দেহে আল্লাহ্ তোমাদের প্রতি দয়ালু। আর যে কেউ সীমালঙ্ঘন কিংবা যুলুমের বশবর্তী হয়ে এরূপ করবে, তাকে খুব শীঘ্রই আগুনে নিক্ষেপ করা হবে। এটা আল্লাহর পক্ষে খুবই সহজসাধ্য।” (৪:২৯ – ৩০)

وَ هُوَ الَّذِیْۤ اَنْشَاَ جَنّٰتٍ مَّعْرُوْشٰتٍ وَّ غَیْرَ مَعْرُوْشٰتٍ وَّ النَّخْلَ وَ الزَّرْعَ مُخْتَلِفًا اُکُلُہٗ وَ الزَّیْتُوْنَ وَ الرُّمَّانَ مُتَشَابِہًا وَّ غَیْرَ مُتَشَابِہٍ ؕ کُلُوْا مِنْ ثَمَرِہٖۤ اِذَاۤ اَثْمَرَ وَ اٰتُوْا حَقَّہٗ یَوْمَ حَصَادِہٖ ۫ۖ وَ لَا تُسْرِفُوْا ؕ اِنَّہٗ لَا یُحِبُّ الْمُسْرِفِیْنَ ۝

“তিনিই উদ্যানসমূহ সৃষ্টি করেছেন – এমনকিছু যা মাচার উপর তুলে দেয়া হয়, এবং যা মাচার উপর তোলা হয় না এবং খর্জুর বৃক্ষ ও চাষের মাধ্যমে ফলানো সকল প্রকার ফসল এবং যয়তুন ও আনার এবং এগুলোর মত স্বাদে ও প্রকারে যা কিছু সৃষ্টি করেছেন -একে অন্যের সাদৃশ্যশীল এবং সাদৃশ্যহীনভাবে। এসব যখন ফলবান হয় তখন এগুলোর ফল-ফসল খাও ও প্রাপ্য হক দান করো ফসল তোলার সময়ে এবং অপব্যয় করো না। নিশ্চয় তিনি অপব্যয়ীদেরকে পছন্দ করেন না।” (৬:১৪১)

هُوَ الَّذِیْ جَعَلَ لَکُمُ الْاَرْضَ ذَلُوْلًا فَامْشُوْا فِیْ مَنَاكِبِهَا وَ کُلُوْا مِنْ رِّزْقِہٖ ؕ وَ اِلَیْهِ النُّشُوْرُ۝

“তিনি জমিনকে তোমাদের জন্য বাধ্যগত ও বশীভূত করে দিয়েছেন। অতএব, তোমরা এর প্রশস্ততার উপর চলাচল কর এবং আহার কর তাঁর প্রদত্ত জীবিকা থেকে, আর জেনে রাখ তোমাদের আবার জীবিত হয়ে তাঁরই কাছে ফিরে যেতে হবে।” (৬৭:১৫)

اِنَّ رَبَّكَ یَبْسُطُ الرِّزْقَ لِمَنْ یَّشَآءُ وَ یَقْدِرُ ؕ اِنَّہٗ كَانَ بِعِبَادِہٖ خَبِیْرًۢا بَصِیْرًا ۝

“নিশ্চয় তোমার পালকর্তা যাকে ইচ্ছা অধিক জীবনোপকরণ দান করেন এবং তিনিই তা সংকুচিতও করে দেন। তিনিই তাঁর বান্দাদের সম্পর্কে ভালোভাবে অবহিত, তাদের সবকিছুই তাঁর দৃষ্টির আওতায়।” (১৭:৩০)

وَ لَا تَجْعَلْ یَدَكَ مَغْلُوْلَۃً اِلٰی عُنُقِكَ وَ لَا تَبْسُطْهَا کُلَّ الْبَسْطِ فَتَقْعُدَ مَلُوْمًا مَّحْسُوْرًا۝

“তুমি একেবারে ব্যয়–কুণ্ঠ হয়োনা এবং একেবারে মুক্ত হস্তও হয়ো না। তাহলে তুমি তিরস্কৃত, নিঃস্ব হয়ে বসে থাকবে।” (১৭:২৯)

وَ اِذَاۤ اَذَقْنَا النَّاسَ رَحْمَۃً فَرِحُوْا بِهَا ؕ وَ اِنْ تُصِبْهُمْ سَیِّئَۃٌۢ بِمَا قَدَّمَتْ اَیْدِیْهِمْ اِذَا هُمْ یَقْنَطُوْنَ ۝ اَوَ لَمْ یَرَوْا اَنَّ اللّٰهَ یَبْسُطُ الرِّزْقَ لِمَنْ یَّشَآءُ وَ یَقْدِرُ ؕ اِنَّ فِیْ ذٰلِكَ لَاٰیٰتٍ لِّقَوْمٍ یُّؤْمِنُوْنَ ۝

“আর যখন আমি মানুষকে রহমতের স্বাদ আস্বাদন করাই, তারা তাতে আনন্দিত হয় এবং তাদের কৃতকর্মের ফলে যদি তাদেরকে কোন দুদর্শা পায়, তবে তারা হতাশ হয়ে পড়ে। তারা কি দেখে না যে, আল্লাহ যার জন্যে ইচ্ছা রিযিক বর্ধিত করেন এবং হ্রাস করেন। নিশ্চয় এতে বিশ্বাসী সম্প্রদায়ের জন্যে নিদর্শনাবলী রয়েছে।” (৩০:৩৬ – ৩৭)

 

ভারসাম্যপূর্ণ ও ন্যায্য বণ্টন নীতিমালা

ইসলামের সম্পদের বণ্টন নীতিমালাও ভারসাম্যপূর্ণ ও ন্যায্য এবং সম্পদ বন্টনের বিধানসমূহ সম্পূর্ণ ইনসাফের ওপর প্রতিষ্ঠিত। মানুষের চাহিদা লাগামহীন – তাই ইসলাম একে এক যৌক্তিক কাঠামোর ওপর দাঁড় করিয়েছে। যাদেরকে মহান আল্লাহ প্রচুর জীবনোপকরণ দিয়েছেন সেটা তাদের জন্য এক পরীক্ষা। তিনি চান, তারা যেন নিজেরা তা ভোগ করে, তাঁর শুকরিয়া আদায় করে এবং উদ্বৃত্তাংশ থেকে গরীব, দুঃখী ও অবাবগ্রস্তদেরকে দান করে। যথেচ্ছভাবে নয়, ন্যায্যতার ভিত্তিতে সবাই জীবিকা আহরণ ও ভোগ করলে সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়। তাই আল্লাহ্ বৈধ আয় ও ন্যায্য বন্টনের একটি সুস্পষ্ট বিধি–বিধান জারী করেছেন যাতে মানুষ ন্যায্যতার ভিত্তিতে তাঁর প্রদত্ত নিয়ামত ভোগ করতে পারে। সম্পদ শুধু নিজের বেহিসেবী ভোগ ও বিলাসব্যসনের জন্য আল্লাহ্ কাউকে দেননি, এ সম্পদে রয়েছে আত্মীয়–স্বজন ও অবাবগ্রস্তদের জন্যেও সুনির্দিষ্ট অধিকার। হালাল উপার্জনের উর্দ্ধ-সীমা নির্ধারিত না থাকলেও বন্টনের যৌক্তিক নীতিমালার কারণে সম্পদ পুঞ্জীভূত হওয়ার সুযোগ থাকে না। এর দ্বারা সম্পদ যাতে শুধুমাত্র বিত্তশালীদের হাতে কুক্ষিগত হয়ে না পড়ে সেদিকে লক্ষ্য রেখে গরীব–নিঃস্ব, অসহায়, অভাবগ্রস্তদের সবাইকে ধনীর সম্পদে অধিকার দান করা হয়েছে। গরীবকে তার হক থেকে বঞ্ছিত রেখে সম্পদের অপচয় ও অপব্যবহার একটি অতি গর্হিত কাজ। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ বলেন:

“আত্মীয়–স্বজনকে তার হক দান কর এবং অভাবগ্রস্ত ও মুসাফিরকেও। এবং কিছুতেই অপব্যয় করোনা। নিশ্চয় অপব্যয়কারীরা শয়তানের ভাই। শয়তান স্বীয় পালনকর্তার প্রতি অতিশয় অকৃতজ্ঞ।” (১৭:২৬ – ২৭)

যাকাত ইসলামের একটি বাধ্যতামূলক আর্থিক ইবাদত: যাকাত ব্যবস্থার মাধ্যমে ধনীর নীট  সম্পদের (ন্যায্য খরচ বাদে অবশিষ্ট সম্পদের) ২.৫ শতাংশ প্রতি বছর গরীব জনগোষ্ঠীর মধ্যে বণ্টন হয়ে যায়। এভাবে দুঃস্থ ও নিঃস্বদের আর্থ-সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে ইসলাম। ইসলামের বিধান মোতাবেক এটা সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত। রাষ্ট্রীয়ভাবে যাকাত চালু করলে তৃণমূল দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে সম্পদ বণ্টন সুনিশ্চিত হয়। ইসলামের প্রাথমিক যুগে খোলাফায়ে রাশেদীনের আমলে যাকাতের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার কারণে দারিদ্র্য বিমোচন এতটাই সম্ভব হয়েছিল যে পরবর্তীতে যাকাত গ্রহণের মত অভাবী মানুষ পাওয়া ভার হয়ে পড়েছিল। দারিদ্র বিমোচনে যাকাতের এটাই বিরাট সাফল্য।

এতদসম্পর্কে কুরআনে আল্লাহ্ পাক বলেন:

اِنَّمَا الصَّدَقٰتُ لِلْفُقَرَآءِ وَ الْمَسٰكِیْنِ وَ الْعٰمِلِیْنَ عَلَیْهَا وَ الْمُؤَلَّفَۃِ قُلُوْبُهُمْ وَ فِی الرِّقَابِ وَ الْغٰرِمِیْنَ وَ فِیْ سَبِیْلِ اللّٰهِ وَ ابْنِ السَّبِیْلِ ؕ فَرِیْضَۃً مِّنَ اللّٰهِ ؕ وَ اللّٰهُ عَلِیْمٌ حَكِیْمٌ۝

“যাকাত হল কেবল ফকির, মিসকীন, যাকাত আদায়কারী ও যাদের চিত্ত আকর্ষণ প্রয়োজন তাদের হক এবং তা দাস-মুক্তির জন্যে, ঋণগ্রস্তদের জন্য, আল্লাহর পথে জেহাদকারীদের জন্যে এবং মুসাফিরদের জন্যে, এই হল আল্লাহর নির্ধারিত বিধান। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।” (৯:৬০)

اَلَّذِیْنَ اِنْ مَّكَنّٰهُمْ فِی الْاَرْضِ اَقَامُوا الصَّلٰوۃَ وَ اٰتَوُا الزَّکٰوۃَ وَ اَمَرُوْا بِالْمَعْرُوْفِ وَ نَهَوْا عَنِ الْمُنْكَرِ ؕ وَ لِلّٰهِ عَاقِبَۃُ الْاُمُوْرِ ۝

“তারা (মু’মিন বান্দা) এমন লোক যাদেরকে আমি পৃথিবীতে শক্তি–সামর্থ্য (রাজনৈতিক প্রতিপত্তি) দান করলে তারা নামায কায়েম করবে, যাকাত দেবে এবং সৎকাজে আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধ করবে। প্রত্যেক কর্মের পরিণাম আল্লাহর এখতিয়ারভুক্ত।” (২২:৪১)

مَاۤ اَفَآءَ اللّٰهُ عَلٰی رَسُوْلِہٖ مِنْ اَهْلِ الْقُرٰی فَلِلّٰهِ وَ لِلرَّسُوْلِ وَ لِذِی الْقُرْبٰی وَ الْیَتٰمٰی وَ الْمَسٰكِیْنِ وَ ابْنِ السَّبِیْلِ ۙ كَیْ لَا یَکُوْنَ دُوْلَۃًۢ بَیْنَ الْاَغْنِیَآءِ مِنْکُمْ ؕ وَ مَاۤ اٰتٰىکُمُ الرَّسُوْلُ فَخُذُوْهُ ٭ وَ مَا نَهٰىکُمْ عَنْهُ فَانْتَهُوْا ۚ وَ اتَّقُوا اللّٰهَ ؕ اِنَّ اللّٰهَ شَدِیْدُ الْعِقَابِ۝

“আল্লাহ জনপদবাসীদের কাছ থেকে তাঁর রাসূলকে যা দিয়েছেন, তা আল্লাহর, রাসূলের, তাঁর আত্মীয়–স্বজনের, ইয়াতীমদের, অভাবগ্রস্তদের এবং মুসাফিরদের জন্যে, যাতে ধনৈশ্বর্য্য কেবল তোমাদের বিত্তশালীদের মধ্যেই পুঞ্জীভূত না হয়। রাসূল তোমাদেরকে যা দেন, তা গ্রহণ কর এবং যা নিষেধ করেন, তা থেকে বিরত থাক এবং আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয় আল্লাহ কঠোর শাস্তিদাতা।” (৫৯:৭)

وَ اٰتِ ذَاالْقُرْبٰی حَقَّہٗ وَ الْمِسْكِیْنَ وَ ابْنَ السَّبِیْلِ وَ لَا تُبَذِّرْ تَبْذِیْرًا ۝ اِنَّ الْمُبَذِّرِیْنَ كَانُوْۤا اِخْوَانَ الشَّیٰطِیْنِ ؕ وَ كَانَ الشَّیْطٰنُ لِرَبِّہٖ كَفُوْرًا ۝

“আত্মীয়–স্বজনকে তার হক দান কর এবং অভাবগ্রস্ত ও মুসাফিরকেও। এবং কিছুতেই অপব্যয় করোনা। নিশ্চয় অপব্যয়কারীরা শয়তানের ভাই। শয়তান স্বীয় পালনকর্তার প্রতি অতিশয় অকৃতজ্ঞ।” (১৭:২৬ – ২৭)

یَسْـَٔلُوْنَكَ مَا ذَا یُنْفِقُوْنَ ۬ؕ قُلْ مَاۤ اَنْفَقْتُمْ مِّنْ خَیْرٍ فَلِلْوَالِدَیْنِ وَ الْاَقْرَبِیْنَ وَ الْیَتٰمٰی وَ الْمَسٰكِیْنِ وَ ابْنِالسَّبِیْلِ ؕ وَ مَا تَفْعَلُوْا مِنْ خَیْرٍ فَاِنَّ اللّٰهَ بِہٖ عَلِیْمٌ ۝

“তোমার কাছে জিজ্ঞেস করে, কি তারা ব্যয় করবে? বলে দাও – যে বস্তুই তোমরা ব্যয় কর, তা হবে পিতা-মাতার জন্যে, আত্মীয়-আপনজনের জন্যে, এতীম-অনাথদের জন্যে, অসহায়দের জন্যে এবং মুসাফিরদের জন্যে। আর তোমরা যে কোন সৎকাজ করবে, নিঃসন্দেহে তা অত্যন্ত ভালভাবেই আল্লাহর জানা রয়েছে।” (২:২১৫)

وَ اِذَا قِیْلَ لَهُمْ اَنْفِقُوْا مِمَّا رَزَقَکُمُ اللّٰهُ ۙ قَالَ الَّذِیْنَ كَفَرُوْا لِلَّذِیْنَ اٰمَنُوْۤا اَنُطْعِمُ مَنْ لَّوْ یَشَآءُ اللّٰهُ اَطْعَمَہٗۤ ٭ۖ اِنْ اَنْتُمْ اِلَّا فِیْ ضَلٰلٍ مُّبِیْنٍ ۝

“যখন তাদেরকে বলা হয়, আল্লাহ তোমাদেরকে যা দিয়েছেন, তা থেকে ব্যয় কর। তখন কাফেররা মু’মিনগণকে বলে, ইচ্ছা করলেই আল্লাহ যাকে খাওয়াতে পারতেন, আমরা তাকে কেন খাওয়াব? তোমরা তো স্পষ্ট বিভ্রান্তিতে পতিত রয়েছ।” (৩৬:৪৭)

لِلرِّجَالِ نَصِیْبٌ مِّمَّا تَرَكَ الْوَالِدٰنِ وَ الْاَقْرَبُوْنَ ۪ وَ لِلنِّسَآءِ نَصِیْبٌ مِّمَّا تَرَكَ الْوَالِدٰنِ وَ الْاَقْرَبُوْنَ مِمَّا قَلَّ مِنْهُ اَوْ كَثُرَ ؕ نَصِیْبًا مَّفْرُوْضًا ۝ وَ اِذَا حَضَرَ الْقِسْمَۃَ اُولُوا الْقُرْبٰی وَ الْیَتٰمٰی وَ الْمَسٰكِیْنُ فَارْزُقُوْهُمْ مِّنْهُ وَ قُوْلُوْا لَهُمْ قَوْلًا مَّعْرُوْفًا ۝

“পিতা-মাতা ও আত্মীয়–স্বজনদের পরিত্যক্ত সম্পত্তিতে পুরুষদেরও অংশ আছে এবং পিতা–মাতা ও আত্মীয়-স্বজনদের পরিত্যক্ত সম্পত্তিতে নারীদেরও অংশ আছে; অল্প হোক কিংবা বেশী। এ অংশ নির্ধারিত। সম্পত্তি বন্টনের সময় যখন আত্মীয়–স্বজন, এতীম ও মিসকীন উপস্থিত হয়, তখন তা থেকে তাদের কিছু খাইয়ে দাও এবং তাদের সাথে কিছু সদালাপ করো।” (৪:৭ – ৮)

وَ لَا تُؤْتُوا السُّفَهَآءَ اَمْوَالَکُمُ الَّتِیْ جَعَلَ اللّٰهُ لَکُمْ قِیٰمًا وَّ ارْزُقُوْهُمْ فِیْهَا وَ اکْسُوْهُمْ وَ قُوْلُوْا لَهُمْ قَوْلًا مَّعْرُوْفًا ۝

“আর যে সম্পদকে আল্লাহ তোমাদের জীবন–যাত্রার অবলম্বন করেছেন, তা অর্বাচীনদের (অবুঝ নাবালেগ) হাতে তুলে দিও না। বরং তা থেকে তাদেরকে খাওয়াও, পরাও এবং তাদেরকে সান্ত্বনার বাণী শোনাও।” (৪:৫)

وَ اللّٰهُ فَضَّلَ بَعْضَکُمْ عَلٰی بَعْضٍ فِی الرِّزْقِ ۚ فَمَا الَّذِیْنَ فُضِّلُوْا بِرَآدِّیْ رِزْقِهِمْ عَلٰی مَا مَلَكَتْ اَیْمَانُهُمْ فَهُمْ فِیْهِ سَوَآءٌ ؕ اَفَبِنِعْمَۃِ اللّٰهِ یَجْحَدُوْنَ ۝

“আল্লাহ তা‘আলা জীবনোপকরণে তোমাদের একজনকে অন্যজনের চাইতে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন। অতএব যাদেরকে শ্রেষ্ঠত্ব দেয়া হয়েছে, তারা তাদের অধীনস্থ দাস–দাসীদেরকে স্বীয় জীবিকা থেকে এমন কিছু দেয় না, যাতে তারা এ বিষয়ে তাদের সমান হয়ে যাবে। তবে কি তারা আল্লাহর নেয়ামত অস্বীকার করে?” (১৬:৭১)

 

উপার্জন ও ব্যয় সংক্রান্ত আয়াতসমূহ

ইসলাম মানুষকে তার প্রয়োজন মোতাবেক বৈধ পন্থায় জীবিকা উপার্জন করা এবং তা নিজ ও নিজ–পরিবারের জন্য ব্যয় করার নির্দেশ দেয়। প্রয়োজনাতিরিক্ত উদ্বৃত্ত সম্পদ থেকে দরিদ্র আত্মীয়–স্বজন ও প্রতিবেশীকে এবং নিঃস্ব ও অভাবগ্রস্ত মানুষকে যাকাত, সাদাকা, ফিতরা দেবে ও দান-খয়রাত করবে এটাই আল্লাহর নির্দেশ। কিন্তু ধনিক শ্রেণী গরীবের প্রাপ্য হক প্রদানে অস্বীকৃতি জানিয়ে হঠকারিতা প্রদর্শন করে থাকে। ইসলাম প্রাকৃতিক নিয়ম নির্ভর এক স্বাভাবিক ধর্ম যা উগ্র বিলাসিতা ও সন্যসাব্রত থেকে মুক্ত। তাই ইসলামের পথ সহজ, সরল ও প্রাকৃতিক নিয়মের মতই স্বাভাবিক। মধ্যমপন্থা ও পরিমিতিবোধ হলো এ ধর্মের প্রধান বৈশিষ্ট্য। যেনতেন প্রকারে সম্পদ কুক্ষিগত ও পুঞ্জীভূত করা, কার্পণ্য করা ও অপচয় ও অমিতাচার এ ধর্মে নিষিদ্ধ। অর্থাৎ আয়–ব্যয়ের ক্ষেত্রে একটি মধবর্তী পথ বেছে নিতে আল্লাহ্ অনুমোদন করেছেন। সম্পদ শুধু নিজের বেহিসেবী ভোগের জন্যই আল্লাহ্ কাউকে দেননি, এ সম্পদে রয়েছে আত্মীয়–স্বজন ও অভাবগ্রস্তদের জন্যেও সুনির্দিষ্ট অধিকার।

সবার প্রাপ্য হক আদায় করার তাগিদ দিয়ে আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন বলেন:

وَ اٰتِ ذَاالْقُرْبٰی حَقَّہٗ وَ الْمِسْكِیْنَ وَ ابْنَ السَّبِیْلِ وَ لَا تُبَذِّرْ تَبْذِیْرًا ۝ اِنَّ الْمُبَذِّرِیْنَ كَانُوْۤا اِخْوَانَ الشَّیٰطِیْنِ ؕ وَ كَانَ الشَّیْطٰنُ لِرَبِّہٖ كَفُوْرًا ۝ وَ اِمَّا تُعْرِضَنَّ عَنْهُمُ ابْتِغَآءَ رَحْمَۃٍ مِّنْ رَّبِّكَ تَرْجُوْهَا فَقُلْ لَّهُمْ قَوْلًا مَّیْسُوْرًا ۝ وَ لَا تَجْعَلْ یَدَكَ مَغْلُوْلَۃً اِلٰی عُنُقِكَ وَ لَا تَبْسُطْهَا کُلَّ الْبَسْطِ فَتَقْعُدَ مَلُوْمًا مَّحْسُوْرًا ۝ اِنَّ رَبَّكَ یَبْسُطُ الرِّزْقَ لِمَنْ یَّشَآءُ وَ یَقْدِرُ ؕ اِنَّہٗ كَانَ بِعِبَادِہٖ خَبِیْرًۢا بَصِیْرًا ۝ وَ لَا تَقْتُلُوْۤا اَوْلَادَکُمْ خَشْیَۃَ اِمْلَاقٍ ؕ نَحْنُ نَرْزُقُهُمْ وَ اِیَّاکُمْ ؕ اِنَّ قَتْلَهُمْ كَانَ خِطْاً كَبِیْرًا۝

“আত্মীয়–স্বজনকে তার হক দান কর এবং অভাবগ্রস্ত ও মুসাফিরকেও। এবং কিছুতেই অপব্যয় করো না। নিশ্চয় অপব্যয়কারীরা শয়তানের ভাই। শয়তান স্বীয় পালনকর্তার প্রতি অতিশয় অকৃতজ্ঞ। এবং তোমার পালনকর্তার করুণার প্রত্যাশায় অপেক্ষামান থাকাকালে যদি কোন সময় তাদেরকে বিমুখ করতে হয়, তখন তাদের সাথে নম্রভাবে কথা বল। তুমি একেবারে ব্যয়–কুষ্ঠ হয়োনা এবং একেবারে মুক্ত হস্তও হয়ো না। তাহলে তুমি তিরস্কৃত, নিঃস্ব হয়ে বসে থাকবে। নিশ্চয় তোমার পালকর্তা যাকে ইচ্ছা অধিক জীবনোপকরণ দান করেন এবং তিনিই তা সংকুচিতও করে দেন। তিনিই তাঁর বান্দাদের সম্পর্কে ভালোভাবে অবহিত – সব কিছু দেখছেন। দারিদ্রের ভয়ে তোমাদের সন্তানদেরকে হত্যা করো না। তাদেরকে এবং তোমাদেরকে আমিই জীবনোপকরণ দিয়ে থাকি। নিশ্চয় তাদেরকে হত্যা করা মারাত্মক অপরাধ।” (১৭:২৬ – ৩১)

وَ اِذَا قِیْلَ لَهُمْ اَنْفِقُوْا مِمَّا رَزَقَکُمُ اللّٰهُ ۙ قَالَ الَّذِیْنَ كَفَرُوْا لِلَّذِیْنَ اٰمَنُوْۤا اَنُطْعِمُ مَنْ لَّوْ یَشَآءُ اللّٰهُ اَطْعَمَہٗۤ ٭ۖ اِنْ اَنْتُمْ اِلَّا فِیْ ضَلٰلٍ مُّبِیْنٍ ۝

“যখন তাদেরকে বলা হয়, আল্লাহ তোমাদেরকে যা দিয়েছেন, তা থেকে ব্যয় কর। তখন কাফেররা মু’মিনগণকে বলে, ইচ্ছা করলেই আল্লাহ যাকে খাওয়াতে পারতেন, আমরা তাকে কেন খাওয়াব? তোমরা তো স্পষ্ট বিভ্রান্তিতে পতিত রয়েছ।” (৩৬:৪৭)

یٰۤاَیُّهَا الَّذِیْنَ اٰمَنُوْا لَا تُلْهِکُمْ اَمْوَالُکُمْ وَ لَاۤ اَوْلَادُکُمْ عَنْ ذِکْرِ اللّٰهِ ۚ وَ مَنْ یَّفْعَلْ ذٰلِكَ فَاُولٰٓئِكَ هُمُ الْخٰسِرُوْنَ ۝ وَ اَنْفِقُوْا مِنْ مَّا رَزَقْنٰکُمْ مِّنْ قَبْلِ اَنْ یَّاْتِیَ اَحَدَکُمُ الْمَوْتُ فَیَقُوْلَ رَبِّ لَوْ لَاۤ اَخَّرْتَنِیْۤ اِلٰۤی اَجَلٍ قَرِیْبٍ ۙ فَاَصَّدَّقَ وَ اَکُنْ مِّنَ الصّٰلِحِیْنَ ۝ وَ لَنْ یُّؤَخِّرَ اللّٰهُ نَفْسًا اِذَا جَآءَ اَجَلُهَا ؕ وَ اللّٰهُ خَبِیْرٌۢ بِمَا تَعْمَلُوْنَ ۝

“হে মু’মিনগণ! তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান–সন্ততি যেন তোমাদেরকে আল্লাহর স্মরণ থেকে গাফেল না করে। যারা এ কারণে গাফেল হয়, তারাই তো ক্ষতিগ্রস্ত। আমি তোমাদেরকে যা দিয়েছি, তা থেকে মৃত্যু আসার আগেই ব্যয় কর। অন্যথায় সে বলবে: হে আমার পালনকর্তা, আমাকে আরও কিছুকাল অবকাশ দিলে না কেন? তাহলে আমি সদকা করতাম এবং সৎকর্মীদের অন্তর্ভুক্ত হতাম। প্রত্যেক ব্যক্তির নির্ধারিত (মৃত্যুর) সময় যখন উপস্থিত হবে, তখন আল্লাহ কাউকে অবকাশ দেবেন না। তোমরা যা কর, আল্লাহ সে বিষয়ে খবর রাখেন।” (৬৩:৯ – ১১)

وَ لَا تَاْکُلُوْۤا اَمْوَالَکُمْ بَیْنَکُمْ بِالْبَاطِلِ وَ تُدْلُوْا بِهَاۤ اِلَی الْحُكَامِ لِتَاْکُلُوْا فَرِیْقًا مِّنْ اَمْوَالِ النَّاسِ بِالْاِثْمِ وَ اَنْتُمْ تَعْلَمُوْنَ ۝

“তোমরা অন্যায়ভাবে একে অপরের সম্পদ ভোগ করো না। এবং জনগণের সম্পদের কিয়দংশ জেনে-শুনে পাপ পন্থায় আত্মসাৎ করার উদ্দেশে শাসন কর্তৃপক্ষের হাতেও তুলে দিও না।” (২:১৮৮)

یٰۤاَیُّهَا الَّذِیْنَ اٰمَنُوْا لَا تَاْکُلُوْۤا اَمْوَالَکُمْ بَیْنَکُمْ بِالْبَاطِلِ اِلَّاۤ اَنْ تَکُوْنَ تِجَارَۃً عَنْ تَرَاضٍ مِّنْکُمْ …..

“হে ঈমানদারগণ! তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না। কেবলমাত্র তোমাদের পরস্পরের সম্মতিক্রমে যে ব্যবসা করা হয় তা বৈধ। ……..।” (৪:২৯)

وَ لَا تَتَمَنَّوْا مَا فَضَّلَ اللّٰهُ بِہٖ بَعْضَکُمْ عَلٰی بَعْضٍ ؕ لِلرِّجَالِ نَصِیْبٌ مِّمَّا اکْتَسَبُوْا ؕ وَ ِلنِّسَآءِ نَصِیْبٌ مِّمَّا اکْتَسَبْنَ ؕ وَ سْئَلُوا اللّٰهَ مِنْ فَضْلِہٖ ؕ اِنَّ اللّٰهَ كَانَ بِکُلِّ شَیْءٍ عَلِیْمًا ۝

“আর তোমরা আকাঙ্খা করো না এমন সব বিষয়ে যাতে আল্লাহ্ তোমাদের একের উপর অপরের শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন। পুরুষ যা অর্জন করে সেটা তার অংশ এবং নারী যা অর্জন করে সেটা তার অংশ। আর আল্লাহর কাছে তাঁর অনুগ্রহ প্রার্থনা কর। নিঃসন্দেহে আল্লাহ্ সর্ব বিষয়ে জ্ঞাত।” (৪:৩২)

لَتُبْلَوُنَّ فِیْۤ اَمْوَالِکُمْ وَ اَنْفُسِکُمْ……

“অবশ্য ধন-সম্পদে এবং জনসম্পদে তোমাদের পরীক্ষা হবে……।” (৩:১৮৬)

ا لَّذِیْ جَمَعَ مَالًا وَّ عَدَّدَہٗ ۝ یَحْسَبُ اَنَّ مَالَہٗۤ اَخْلَدَہٗ ۝ كَلَّا لَیُنْۢبَذَنَّ فِی الْحُطَمَۃِ ۝ وَ مَاۤ اَدْرٰىكَ مَا الْحُطَمَۃُ ۝ نَارُ اللّٰهِ الْمُوْقَدَۃُ ۝ الَّتِیْ تَطَّلِعُ عَلَی الْاَفْـِٕدَۃِ ۝ اِنَّهَا عَلَیْهِمْ مُّؤْصَدَۃٌ ۝ فِیْ عَمَدٍ مُّمَدَّدَۃٍ ۝

“যে অর্থ সঞ্চিত করে ও গণনা করে – সে মনে করে যে, তার অর্থ চিরকাল তার সাথে থাকবে! কখনও না, সে অবশ্যই নিক্ষিপ্ত হবে পিষ্টকারীর মধ্যে। আপনি কি জানেন, পিষ্টকারী কি? এটা আল্লাহর প্রজ্জ্বলিত অগ্নি, যা হৃদয় পর্যন্ত পৌঁছবে। এতে তাদেরকে বেঁধে রাখা হবে, লম্বা লম্বা খুঁটিতে।” (১০৪:২-৯)

وَتُحِبُّوْنَ الْمَالَ حُبًّا جَمًّا۝ كَلَّا

“এবং তোমরা ধন-সম্পদকে প্রাণভরে ভালবাস – এটা অনুচিত।” (৮৯:২০ – ২১)

الَّذِیْنَ یَبْخَلُوْنَ وَ یَاْمُرُوْنَ النَّاسَ بِالْبُخْلِ ؕ وَ مَنْ یَّتَوَلَّ فَاِنَّ اللّٰهَ هُوَ الْغَنِیُّ الْحَمِیْدُ ۝

“যারা কৃপণতা করে এবং মানুষকে কৃপণতার প্রতি উৎসাহ দেয়, যে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তার জানা উচিত যে, আল্লাহ অভাবমুক্ত, প্রশংসিত।” (৫৭:২৪)

وَ الَّذِیْنَ اِذَاۤ اَنْفَقُوْا لَمْ یُسْرِفُوْا وَ لَمْ یَقْتُرُوْا وَ كَانَ بَیْنَ ذٰلِكَ قَوَامًا ۝

“এবং তারা যখন ব্যয় করে, তখন অযথা ব্যয় করে না – কৃপণতাও করে না এবং তাদের পন্থা হয় এতদুভয়ের মধ্যবর্তী।” (২৫:৬৭)

وَ لَا یَحْسَبَنَّ الَّذِیْنَ یَبْخَلُوْنَ بِمَاۤ اٰتٰهُمُ اللّٰهُ مِنْ فَضْلِہٖ هُوَ خَیْرًا لَّهُمْ ؕ بَلْ هُوَ شَرٌّ لَّهُمْ ؕ سَیُطَوَّقُوْنَ مَا بَخِلُوْا بِہٖ یَوْمَ الْقِیٰمَۃِ ؕ وَ لِلّٰهِ مِیْرَاثُ السَّمٰوٰتِ وَ الْاَرْضِ ؕ وَ اللّٰهُ بِمَا تَعْمَلُوْنَ خَبِیْرٌ۝

“আল্লাহ তাদেরকে নিজের অনুগ্রহে যা দান করেছেন তাতে যারা কৃপণতা করে এই কার্পণ্য তাদের জন্য মঙ্গলকর হবে বলে তারা যেন ধারণা না করে। বরং এটা তাদের পক্ষে একান্তই ক্ষতিকর প্রতিপন্ন হবে। যাতে তারা কার্পণ্য করে সে সমস্ত ধন-সম্পদকে কিয়ামতের দিন তাদের গলায় বেড়ী বানিয়ে পরানো হবে। আর আল্লাহ হচ্ছেন আসমান ও যমীনের পরম সত্ত্বাধিকারী। আর যা কিছু তোমরা কর; আল্লাহ সে সম্পর্কে জানেন।” (৩:১৮০)

فَاِذَا قُضِیَتِ الصَّلٰوۃُ فَانْتَشِرُوْا فِی الْاَرْضِ وَ ابْتَغُوْا مِنْ فَضْلِ اللّٰهِ وَ اذْکُرُوا اللّٰهَ كَثِیْرًا لَّعَلَّکُمْ تُفْلِحُوْنَ ۝

“অতঃপর নামায সমাপ্ত হলে তোমরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড় এবং আল্লাহর অনুগ্রহ তালাশ কর ও আল্লাহকে অধিক স্মরণ কর, যাতে তোমরা সফলকাম হও।” (৬২:১০)

فَاَمَّا الْاِنْسَانُ اِذَا مَا ابْتَلٰىهُ رَبُّہٗ فَاَکْرَمَہٗ وَ نَعَّمَہٗ ۬ۙ فَیَقُوْلُ رَبِّیْۤ اَکْرَمَنِ ۝ وَ اَمَّاۤ اِذَا مَا ابْتَلٰىهُ فَقَدَرَ عَلَیْهِ رِزْقَہٗ ۬ۙ فَیَقُوْلُ رَبِّیْۤ اَهَانَنِ ۝ كَلَّا بَلْ لَّا تُکْرِمُوْنَ الْیَتِیْمَ ۝ وَ لَا تَحٰٓضُّوْنَ عَلٰی طَعَامِ الْمِسْكِیْنِ ۝ وَ تَاْکُلُوْنَ التُّرَاثَ اَکْلًا لَّمًّا ۝ وَّ تُحِبُّوْنَ الْمَالَ حُبًّا جَمًّا ۝

“মানুষ এরূপ যে, যখন তার পালনকর্তা তাকে পরীক্ষা করেন, অতঃপর সম্মান ও অনুগ্রহ দান করেন, তখন বলে, আমার পালনকর্তা আমাকে সম্মান দান করেছেন। এবং যখন তাকে পরীক্ষা করেন, অতঃপর রিযিক সংকুচিত করে দেন, তখন বলে: আমার পালনকর্তা আমাকে হেয় করেছেন। এটা অমূলক, বরং তোমরা এতীমকে সম্মান কর না। এবং মিসকীনকে অন্নদানে পরস্পরকে উৎসাহিত কর না। এবং তোমরা মৃতের ত্যাজ্য সম্পত্তি সম্পূর্ণরূপে কুক্ষিগত করে ফেল এবং তোমরা ধন-সম্পদকে প্রাণভরে ভালবাস।” (৮৯:১৫ – ২০)

ظَهَرَ الْفَسَادُ فِی الْبَرِّ وَ الْبَحْرِ بِمَا كَسَبَتْ اَیْدِی النَّاسِ لِیُذِیْقَهُمْ بَعْضَ الَّذِیْ عَمِلُوْا لَعَلَّهُمْ یَرْجِعُوْنَ ۝

“মানুষের (অনৈতিক ও অন্যায্য) কৃতকর্মের দরুন স্থলে ও জলে বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়েছে। আল্লাহ তাদেরকে তাদের কর্মের শাস্তি আস্বাদন করাতে চান, যাতে তারা ফিরে আসে।” (৩০:৪১)

اَلْهٰکُمُ التَّكَاثُرُ ۝ حَتّٰی زُرْتُمُ الْمَقَابِرَ ۝ كَلَّا سَوْفَ تَعْلَمُوْنَ ۝ ثُمَّ كَلَّا سَوْفَ تَعْلَمُوْنَ ۝ كَلَّا لَوْ تَعْلَمُوْنَ عِلْمَ الْیَقِیْنِ ۝

“ধন–সম্পদ ও প্রাচুর্যের লালসা তোমাদেরকে বেখবর রাখে, যতক্ষণ না, তোমরা কবরগুহায় পৌঁছে যাও। এটা কখনও উচিত নয়। তোমরা সত্ত্বরই জেনে নেবে। অতঃপর এটা কখনও উচিত নয়। তোমরা সত্ত্বরই জেনে নেবে। কখনই নয়; যদি তোমরা নিশ্চিত জানতে।” (১০২:১ – ৫)

وَ اِذَا تَوَلّٰی سَعٰی فِی الْاَرْضِ لِیُفْسِدَ فِیْهَا وَ یُہْلِكَ الْحَرْثَ وَ النَّسْلَ ؕ وَ اللّٰهُ لَا یُحِبُّ الْفَسَادَ ۝ وَ اِذَا قِیْلَ لَهُ اتَّقِ اللّٰهَ اَخَذَتْهُ الْعِزَّۃُ بِالْاِثْمِ فَحَسْبُہٗ جَهَنَّمُ ؕ وَ لَبِئْسَ الْمِهَادُ ۝

“যখন ফিরে যায় তখন চেষ্টা করে যাতে সেখানে অকল্যাণ সৃষ্টি করতে পারে এবং শস্যক্ষেত্র ও জীবজন্তুর বিনাশ ঘটাতে পারে। আল্লাহ ফাসাদ ও দাঙ্গা-হাঙ্গামা পছন্দ করেন না। আর যখন তাকে বলা হয় যে, আল্লাহকে ভয় কর, তখন তার পাপ তাকে অহঙ্কারে উদ্বুদ্ধ করে। সুতরাং তার জন্যে দোযখই যথেষ্ট। আর নিঃসন্দেহে তা হলো নিকৃষ্টতর ঠিকানা।” (২:২০৫ – ২০৬)

وَلَا تَقْتُلُوْٓا اَوْلٰدَكُمْ خَشْيَةَ اِمْلٰقٍ نَّحْنُ نَرْزُقُهُمْ وَاِيْاكُمْ اِنَّ قَتْلَهُمْ كَانَ خِطْـًٔا كَبِيْرًا۝

“দারিদ্র্যের ভয়ে তোমাদের সন্তানদেরকে হত্যা করো না। তাদেরকে এবং তোমাদেরকে আমিই জীবনোপকরণ দিয়ে থাকি। নিশ্চয় তাদেরকে হত্যা করা মারাত্মক অপরাধ।” (১৭:৩১)

تَدْعُوْا مَنْ اَدْبَرَ وَ تَوَلّٰی ۝ وَ جَمَعَ فَاَوْعٰی ۝ اِنَّ الْاِنْسَانَ خُلِقَ هَلُوْعًا ۝ اِذَا مَسَّهُ الشَّرُّ جَزُوْعًا ۝ وَّ اِذَا مَسَّهُ الْخَیْرُ مَنُوْعًا ۝

“সে (দোযখের আগুন) সেই ব্যক্তিকে ডাকবে যে সত্যের প্রতি পৃষ্ঠপ্রদর্শন করেছিল ও বিমুখ হয়েছিল। সম্পদ পুঞ্জীভূত করেছিল, অতঃপর আগলিয়ে রেখেছিল। মানুষ তো সৃজিত হয়েছে ভীরুরূপে। যখন তাকে অনিষ্ট স্পর্শ করে, তখন সে হা – হুতাশ করে। আর যখন কল্যাণপ্রাপ্ত হয়, তখন কৃপণ হয়ে যায়।” (৭০:১৭ – ২১)

وَ اعْلَمُوْۤا اَنَّمَاۤ اَمْوَالُکُمْ وَ اَوْلَادُکُمْ فِتْنَۃٌ ۙ وَّ اَنَّ اللّٰهَ عِنْدَہٗۤ اَجْرٌ عَظِیْمٌ ۝

“আর জেনে রাখ, তোমাদের ধন–সম্পদ ও সন্তান–সন্ততি অকল্যাণের সম্মুখীনকারী। বস্তুত আল্লাহর নিকট রয়েছে মহা সওয়াব।” (৮:২৮)

اِنَّمَاۤ اَمْوَالُکُمْ وَ اَوْلَادُکُمْ فِتْنَۃٌ ؕ وَ اللّٰهُ عِنْدَہٗۤ اَجْرٌ عَظِیْمٌ ۝ فَاتَّقُوا اللّٰهَ مَا اسْتَطَعْتُمْ وَاسْمَعُوْا وَاَطِیْعُوْا وَاَنْفِقُوْا خَیْرًا لِّاَنْفُسِکُمْ ؕ وَمَنْ یُّوْقَ شُحَّ نَفْسِہٖ فَاُولٰٓئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُوْنَ۝

“তোমাদের ধন–সম্পদ ও সন্তান–সন্ততি তো কেবল পরীক্ষাস্বরূপ। আর আল্লাহর কাছে রয়েছে মহাপুরস্কার। অতএব তোমরা যথাসাধ্য আল্লাহকে ভয় কর, শোন, আনুগত্য কর এবং ব্যয় কর। এটা তোমাদের জন্যে কল্যাণকর। যারা মনের কার্পণ্য থেকে মুক্ত, তারাই সফলকাম। (৬৪:১৫ – ১৬)

وَ هَدَیْنٰهُ النَّجْدَیْنِ ۝ فَلَا اقْتَحَمَ الْعَقَبَۃَ ۝ وَ مَاۤ اَدْرٰىكَ مَا الْعَقَبَۃُ ۝ فَکُّ رَقَبَۃٍ ۝ اَوْ اِطْعٰمٌ فِیْ یَوْمٍ ذِیْ مَسْغَبَۃٍ ۝ یَّتِیْمًا ذَا مَقْرَبَۃٍ ۝ اَوْ مِسْكِیْنًا ذَا مَتْرَبَۃٍ ۝ ثُمَّ كَانَ مِنَ الَّذِیْنَ اٰمَنُوْا وَ تَوَاصَوْا بِالصَّبْرِ وَ تَوَاصَوْا بِالْمَرْحَمَۃِ ۝ اُولٰٓئِكَ اَصْحٰبُ الْمَیْمَنَۃِ۝

“বস্তুত আমি তাকে দু’টি পথ প্রদর্শন করেছি। অতঃপর সে ধর্মের ঘাঁটিতে প্রবেশ করেনি। আপনি জানেন, সে ঘাঁটি কি? তা হচ্ছে দাসমুক্তি অথবা দুর্ভিক্ষের দিনে অন্নদান – এতীম আত্মীয়কে অথবা ধূলি – ধূসরিত মিসকীনকে। অতঃপর তাদের অন্তর্ভুক্ত হওয়া – যারা ঈমান আনে এবং পরস্পরকে উপদেশ দেয় সবরের ও উপদেশ দেয় দয়ার। তারাই সৌভাগ্যশালী।” (৯০:১০ – ১৮)

 

লেনদেনে ন্যায্যতা

লেনদেনে ন্যায্যতা এবং আমানতদারীর ওপর আল্লাহ্ তায়ালা সবিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। যেনতেন প্রকারে আয় ও ব্যয় ইসলাম কোনভাবেই সমর্থন করে না। অবৈধ পন্থায় উপার্জনের প্রবণতা সমাজ ও রাষ্ট্রে অশান্তি ও দুর্নীতির সৃষ্টি করে। হালাল পন্থায় পরিশ্রমলব্ধ উপার্জনই ইসলাম অনুমোদন করে। হারাম উপার্জনের অর্থে যারা জীবন-জীবিকা নির্বাহ করে তাদের ইবাদত–বন্দেগীও আল্লাহতায়ালার নিকট গ্রহণযোগ্য নয়। ওজন ও মাপে কম দেওয়া, প্রতারণা, জালিয়াতি, যুলুম, কার্পণ্য, লুন্ঠন, মজুতদারী, মুনাফাখোরী, ফটকাবাজি, মদ, জুয়া, সুদ, ঘুষ, ভেজাল, আমানতের খেয়ানত, ইত্যাদি অবৈধ পন্থায় উপার্জনকে ইসলাম সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। অধিক লাভের আশায় নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য চল্লিশ দিনের বেশী মজুত রাখাও পবিত্র হাদীসে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কেননা এগুলো সামগ্রিকভাবে মানুষের জন্য ক্ষতিকর এবং অকল্যাণ বয়ে আনে।

এতদসংক্রান্ত আয়াতগুলো নীচে বর্ণিত হলো:

یٰۤاَیُّهَا الَّذِیْنَ اٰمَنُوْا لَا تَخُوْنُوا اللّٰهَ وَ الرَّسُوْلَ وَ تَخُوْنُوْۤا اَمٰنٰتِکُمْ وَ اَنْتُمْ تَعْلَمُوْنَ ۝

“হে ঈমানদারগণ, খেয়ানত করোনা আল্লাহর সাথে ও রাসূলের সাথে এবং খেয়ানত করো না নিজেদের পারস্পরিক আমানতে জেনে-শুনে।” (৮:২৭)

 اَوْفُوا الْمِکْیَالَ وَ الْمِیْزَانَ بِالْقِسْطِ وَ لَا تَبْخَسُوا النَّاسَ اَشْیَآءَهُمْ وَ لَا تَعْثَوْا فِی الْاَرْضِ مُفْسِدِیْنَ ۝ بَقِیَّتُ اللّٰهِ خَیْرٌ لَّکُمْ اِنْ کُنْتُمْ مُّؤْمِنِیْنَ ۬ۚ وَ مَاۤ اَنَا عَلَیْکُمْ بِحَفِیْظٍ ۝

“……. ন্যায়নিষ্ঠার সাথে ঠিকভাবে পরিমাপ কর ও ওজন দাও এবং লোকদের জিনিসপত্রে কোনরূপ ক্ষতি করো না, আর পৃথিবীতে ফাসাদ করে বেড়াবে না। আল্লাহ প্রদত্ত উদ্বৃত্ত তোমাদের জন্য উত্তম, যদি তোমরা ঈমানদার হও, আর আমি তো তোমাদের উপর সদা পর্যবেক্ষণকারী নই।” (১১:৮৫ – ৮৬)

وَاَقِيْمُوْا الْوَزْنَ بِالْقِسْطِ وَلَا تُخْسِرُوْا الْمِيْزَانَ۝

“তোমরা ন্যায্য ওজন কায়েম কর এবং ওজনে কম দিয়ো না।” (৫৫:৯)

وَ اَوْفُوا الْكَیْلَ اِذَا كِلْتُمْ وَ زِنُوْا بِالْقِسْطَاسِ الْمُسْتَقِیْمِ ؕ ذٰلِكَ خَیْرٌ وَّ اَحْسَنُ تَاْوِیْلًا۝

“মেপে দেয়ার সময় পূর্ণ মাপে দেবে এবং সঠিক দাঁড়িপাল্লায় ওজন করবে। এটা উত্তম; এর পরিণাম শুভ।” (১৭:৩৫)

وَیْلٌ لِّلْمُطَفِّفِیْنَ ۝ الَّذِیْنَ اِذَا اکْتَالُوْا عَلَی النَّاسِ یَسْتَوْفُوْنَ ۝ وَ اِذَا كَالُوْهُمْ اَوْ وَّزَنُوْهُمْ یُخْسِرُوْنَ ۝ اَلَا یَظُنُّ اُولٰٓئِكَ اَنَّهُمْ مَّبْعُوْثُوْنَ ۝ لِیَوْمٍ عَظِیْمٍ ۝

“যারা মাপে কম করে, তাদের জন্যে দুর্ভোগ, যারা লোকের কাছ থেকে যখন মেপে নেয়, তখন পূর্ণ মাত্রায় নেয় এবং যখন লোকদেরকে মেপে দেয় কিংবা ওজন করে দেয়, তখন কম করে দেয়। তারা কি চিন্তা করে না যে, তারা পুনরুত্থিত হবে – সেই মহাদিবসে।” (৮৩:১ – ৫)

 

 

ঋণের লেনদেন সংক্রান্ত আয়াত

ইসলাম ঋণের পারস্পরিক লেন–দেনের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতায় বিশ্বাসী। তাই আল্লাহ্ তায়ালা ঋণের লেন–দেনের ক্ষেত্রে নির্ধারিত সময়, সুস্পষ্ট শর্তাবলী ও স্বাক্ষীসহ লিখিত চুক্তিপত্রের নির্দেশনা দিয়েছেন যাতে ঋণ নিষ্পত্তির সময় কোন জটিলতার সৃষ্টি না হয়। নিম্নোক্ত আয়াতটিতে তা বর্ণিত হয়েছে:

یٰۤاَیُّهَا الَّذِیْنَ اٰمَنُوْۤا اِذَا تَدَایَنْتُمْ بِدَیْنٍ اِلٰۤی اَجَلٍ مُّسَمًّی فَاکْتُبُوْهُ ؕ وَ لْیَکْتُبْ بَّیْنَکُمْ كَاتِبٌۢ بِالْعَدْلِ ۪ وَ لَا یَاْبَ كَاتِبٌ اَنْ یَّکْتُبَ كَمَا عَلَّمَهُ اللّٰهُ فَلْیَکْتُبْ ۚ وَ لْیُمْلِلِ الَّذِیْ عَلَیْهِ الْحَقُّ وَ لْیَتَّقِ اللّٰهَ رَبَّہٗ وَ لَا یَبْخَسْ مِنْهُ شَیْئًا ؕ فَاِنْ كَانَ الَّذِیْ عَلَیْهِ الْحَقُّ سَفِیْہًا اَوْ ضَعِیْفًا اَوْ لَا یَسْتَطِیْعُ اَنْ یُّمِلَّ هُوَ فَلْیُمْلِلْ وَلِیُّہٗ بِالْعَدْلِ ؕ وَ اسْتَشْهِدُوْا شَهِیْدَیْنِ مِنْ رِّجَالِکُمْ ۚ فَاِنْ لَّمْ یَکُوْنَا رَجُلَیْنِ فَرَجُلٌ وَّ امْرَاَتٰنِ مِمَّنْ تَرْضَوْنَ مِنَ الشُّهَدَآءِ اَنْ تَضِلَّ اِحْدٰىهُمَا فَتُذَكِرَ اِحْدٰىهُمَا الْاُخْرٰی ؕ وَ لَا یَاْبَ الشُّهَدَآءُ اِذَا مَا دُعُوْا ؕ وَ لَا تَسْـَٔمُوْۤا اَنْ تَکْتُبُوْهُ صَغِیْرًا اَوْ كَبِیْرًا اِلٰۤی اَجَلِہٖ ؕ ذٰلِکُمْ اَقْسَطُ عِنْدَ اللّٰهِ وَ اَقْوَمُ لِلشَّهَادَۃِ وَ اَدْنٰۤی اَلَّا تَرْتَابُوْۤا اِلَّاۤ اَنْ تَکُوْنَ تِجَارَۃً حَاضِرَۃً تُدِیْرُوْنَهَا بَیْنَکُمْ فَلَیْسَ عَلَیْکُمْ جُنَاحٌ اَلَّا تَکْتُبُوْهَا ؕ وَ اَشْهِدُوْۤا اِذَا تَبَایَعْتُمْ ۪ وَ لَا یُضَآرَّ كَاتِبٌ وَّ لَا شَهِیْدٌ ۬ؕ وَ اِنْ تَفْعَلُوْا فَاِنَّہٗ فُسُوْقٌۢ بِکُمْ ؕ وَ اتَّقُوا اللّٰهَ ؕ وَ یُعَلِّمُکُمُ اللّٰهُ ؕ وَ اللّٰهُ بِکُلِّ شَیْءٍ عَلِیْمٌ ۝

“হে মু’মিনগণ! যখন তোমরা কোন নির্দিষ্ট সময়ের জন্যে ঋণের আদান–প্রদান কর, তখন তা লিপিবদ্ধ করে নাও এবং তোমাদের মধ্যে কোন লেখক ন্যায়সঙ্গতভাবে তা লিখে দেবে; লেখক লিখতে অস্বীকার করবে না। আল্লাহ তাকে যেমন শিক্ষা দিয়েছেন, তার উচিত তা লিখে দেয়া। এবং ঋণগ্রহীতা যেন লেখার বিষয় বলে দেয় এবং সে যেন স্বীয় পালনকর্তা আল্লাহকে ভয় করে এবং লেখার মধ্যে বিন্দুমাত্রও বেশ কম না করে। অতঃপর ঋণগ্রহীতা যদি নির্বোধ হয় কিংবা দুর্বল হয় অথবা নিজে লেখার বিষয়বস্তু বলে দিতে অক্ষম হয়, তবে তার অভিভাবক ন্যায়সঙ্গতভাবে লিখাবে। দুজন সাক্ষী কর, তোমাদের পুরুষদের মধ্যে থেকে। যদি দুজন পুরুষ না হয়, তবে একজন পুরুষ ও দুজন মহিলা। ঐ সাক্ষীদের মধ্য থেকে যাদেরকে তোমরা পছন্দ কর যাতে একজন যদি ভুলে যায়, তবে একজন অন্যজনকে স্মরণ করিয়ে দেয়। যখন ডাকা হয়, তখন সাক্ষীদের অস্বীকার করা উচিত নয়। তোমরা এটা লিখতে অলসতা করোনা, তা ছোট হোক কিংবা বড়, নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত। এ লিপিবদ্ধ করণ আল্লাহর কাছে সুবিচারকে অধিক কায়েম রাখে, সাক্ষ্যকে অধিক সুসংহত রাখে এবং তোমাদের সন্দেহে পতিত না হওয়ার পক্ষে অধিক উপযুক্ত। কিন্তু যদি কারবার নগদ হয়, পরস্পর হাতে হাতে আদান–প্রদান কর, তবে তা না লিখলে তোমাদের প্রতি কোন অভিযোগ নেই। তোমরা ক্রয়–বিক্রয়ের সময় সাক্ষী রাখ। কোন লেখক ও সাক্ষীকে ক্ষতিগ্রস্ত করো না। যদি তোমরা এরূপ কর, তবে তা তোমাদের পক্ষে পাপের বিষয়। আল্লাহকে ভয় কর তিনি তোমাদেরকে শিক্ষা দেন। আল্লাহ সব কিছু জানেন।” (২:২৮২)

وَ اِنْ کُنْتُمْ عَلٰی سَفَرٍ وَّ لَمْ تَجِدُوْا كَاتِبًا فَرِهٰنٌ مَّقْبُوْضَۃٌ ؕ فَاِنْ اَمِنَ بَعْضُکُمْ بَعْضًا فَلْیُؤَدِّ الَّذِی اؤْتُمِنَ اَمَانَتَہٗ وَ لْیَتَّقِ اللّٰهَ رَبَّہٗ ؕ وَ لَا تَکْتُمُوا الشَّهَادَۃَ ؕ وَ مَنْ یَّکْتُمْهَا فَاِنَّہٗۤ اٰثِمٌ قَلْبُہٗ ؕ وَ اللّٰهُ بِمَا تَعْمَلُوْنَ عَلِیْمٌ ۝

“আর তোমরা যদি প্রবাসে থাক এবং কোন লেখক না পাও তবে বন্ধকী বস্তু হস্তগত রাখা উচিত। যদি একে অন্যকে বিশ্বাস করে, তবে যাকে বিশ্বাস করা হয়, তার উচিত অন্যের প্রাপ্য পরিশোধ করা এবং স্বীয় পালনকর্তা আল্লাহকে ভয় কর! তোমরা সাক্ষ্য গোপন করো না। যে কেউ তা গোপন করবে, তার অন্তর পাপপূর্ণ হবে। তোমরা যা কর, আল্লাহ সে সম্পর্কে খুব জ্ঞাত।” (২:২৮৩)

 

 

সুদ ও ব্যবসা সংক্রান্ত আয়াতসমূহ

ইসলাম ব্যবসাকে হালাল করেছে, কারণ ব্যবসা লাভ–ক্ষতি সমভাবে ভাগ করে নেয়। সুদ শোষণ ও নির্যাতনের এক বড় হাতিয়ার। এটা কোন পরিশ্রমলব্ধ উপার্জন নয়, সুদে টাকা খাটিয়ে শুধু লাভই আসে, এতে কেউ ক্ষতির ভাগীদার হয় না। তাই ইসলাম সুদকে হারাম বা নিষিদ্ধ করেছে। মহানবী (সা) তাঁর উম্মতকে হুঁশিয়ার করে দিয়ে বলেছেন, যে কয়টি বিষয়ের জবাবদিহি ব্যতীত কিয়ামতের দিবসে পার পাওয়া যাবে না তার মধ্যে অন্যতম হলো মানুষের সম্পদের হিসাব, অর্থাৎ সম্পদ কিভাবে উপার্জিত হয়েছে ও ব্যয়িত হয়েছে। ইসলামের এ উপার্জন নীতিমালা ও জবাবদিহির ভয় যেনতেন প্রকারে সম্পদ কুক্ষিগত করার প্রবণতাকে রোধ করে দেশ ও সমাজে শান্তির পরিবেশ সৃষ্টি করে। বিশ্বে প্রচলিত বর্তমান পুঁজিবাদী ও সুদযুক্ত অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় ধনী ও গরীবের অবস্থা এমন যে তারা বিপরীত দুই মেরুর দুই জনগোষ্ঠী। তাই আল্লাহ্ তায়ালা সুদকে হারাম করেছেন এবং ব্যবসা ও ‘কর্জে হাসানাকে’ (সুদমুক্ত ঋণ) উৎসাহিত করেছেন। ঋণী যদি যথা সময়ে ঋণ পরিশোধে অক্ষম হয় তবে সচ্ছলতা না আসা পর্যন্ত তাকে অবকাশ দানের কথা বলা হয়েছে। একান্ত অপরাগতায় তাকে মাফ করে দিলে তা আল্লাহর নিকট অতি উত্তম বলে বিবেচিত হবে (২:২৮০)।

এ সংক্রান্ত আয়াতসমূহ নিম্নে দেওয়া হলো:

یٰۤاَیُّهَا الَّذِیْنَ اٰمَنُوْا لَا تَاْکُلُوا الرِّبٰۤوا اَضْعَافًا مُّضٰعَفَۃً ۪ وَ اتَّقُوا اللّٰهَ لَعَلَّکُمْ تُفْلِحُوْنَ ۝ وَ اتَّقُوا النَّارَ الَّتِیْۤ اُعِدَّتْ لِلْکٰفِرِیْنَ ۝

“হে ঈমানদারগণ! তোমরা চক্রবৃদ্ধি হারে সুদ খেয়ো না। আর আল্লাহকে ভয় করতে থাক, যাতে তোমরা কল্যাণ অর্জন করতে পারো। এবং তোমরা সে আগুন থেকে বেঁচে থাক, যা কাফেরদের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে।” (৩:১৩০ – ১৩১)

اَلَّذِیْنَ یَاْکُلُوْنَ الرِّبٰوا لَا یَقُوْمُوْنَ اِلَّا كَمَا یَقُوْمُ الَّذِیْ یَتَخَبَّطُهُ الشَّیْطٰنُ مِنَ الْمَسِّ ؕ ذٰلِكَ بِاَنَّهُمْ قَالُوْۤا اِنَّمَا الْبَیْعُ مِثْلُ الرِّبٰوا ۘ وَ اَحَلَّ اللّٰهُ الْبَیْعَ وَ حَرَّمَ الرِّبٰوا ؕ فَمَنْ جَآءَہٗ مَوْعِظَۃٌ مِّنْ رَّبِّہٖ فَانْتَهٰی فَلَہٗ مَا سَلَفَ ؕ وَ اَمْرُہٗۤ اِلَی اللّٰهِ ؕ وَ مَنْ عَادَ فَاُولٰٓئِكَ اَصْحٰبُ النَّارِ ۚ هُمْ فِیْهَا خٰلِدُوْنَ ۝ یَمْحَقُ اللّٰهُ الرِّبٰوا وَ یُرْبِی الصَّدَقٰتِ ؕ وَ اللّٰهُ لَا یُحِبُّ کُلَّ كَفَّارٍ اَثِیْمٍ ۝

“যারা সুদ খায়, তারা কিয়ামতে দন্ডায়মান হবে, যেভাবে দন্ডায়মান হয় ঐ ব্যক্তি, যাকে শয়তান আছর দ্বারা মোহাবিষ্ট করে দেয়। তাদের এ অবস্থার কারণ এই যে, তারা বলেছে: ক্রয়-বিক্রয় ও তো সুদ নেয়ারই মত! অথচ আল্লাহ্ তা‘আলা ক্রয় – বিক্রয় বৈধ করেছেন এবং সুদ হারাম করেছেন। অতঃপর যার কাছে তার পালনকর্তার পক্ষ থেকে উপদেশ এসেছে এবং সে বিরত হয়েছে, পূর্বে যা হয়ে গেছে, তা তার। তার ব্যাপার আল্লাহর উপর নির্ভরশীল। আর যারা পুনরায় সুদ নেয়, তারাই দোযখে যাবে। তারা সেখানে চিরকাল অবস্থান করবে। আল্লাহ তা‘আলা সুদকে নিশ্চিহ্ন করেন এবং দান খয়রাতকে বর্ধিত করেন। আল্লাহ পছন্দ করেন না কোন অবিশ্বাসী পাপীকে।” (২:২৭৫ – ২৭৬)

یٰۤاَیُّهَا الَّذِیْنَ اٰمَنُوا اتَّقُوا اللّٰهَ وَ ذَرُوْا مَا بَقِیَ مِنَ الرِّبٰۤوا اِنْ کُنْتُمْ مُّؤْمِنِیْنَ ۝ فَاِنْ لَّمْ تَفْعَلُوْا فَاْذَنُوْا بِحَرْبٍ مِّنَ اللّٰهِ وَ رَسُوْلِہٖ ۚ وَ اِنْ تُبْتُمْ فَلَکُمْ رُءُوْسُ اَمْوَالِکُمْ ۚ لَا تَظْلِمُوْنَ وَ لَا تُظْلَمُوْنَ ۝

“হে ঈমানদারগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সুদের যে সমস্ত বকেয়া আছে, তা পরিত্যাগ কর, যদি তোমরা ঈমানদার হয়ে থাক। অতঃপর যদি তোমরা পরিত্যাগ না কর, তবে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সাথে যুদ্ধ করতে প্রস্তুত হয়ে যাও। কিন্তু যদি তোমরা তওবা কর, তবে তোমরা নিজের মূলধন পেয়ে যাবে। তোমরা কারও প্রতি অত্যাচার করো না এবং কেউ তোমাদের প্রতি অত্যাচার করবে না।” (২:২৭৮ – ২৭৯)

وَ مَاۤ اٰتَیْتُمْ مِّنْ رِّبًا لِّیَرْبُوَا۠ فِیْۤ اَمْوَالِ النَّاسِ فَلَا یَرْبُوْا عِنْدَ اللّٰهِ ۚ وَ مَاۤ اٰتَیْتُمْ مِّنْ زَکٰوۃٍ تُرِیْدُوْنَ وَجْهَ اللّٰهِ فَاُولٰٓئِكَ هُمُ الْمُضْعِفُوْنَ ۝

“মানুষের ধন-সম্পদে তোমাদের ধন–সম্পদ বৃদ্ধি পাবে, এই আশায় তোমরা সুদে যা কিছু দাও, আল্লাহর কাছে তা বৃদ্ধি পায় না। পক্ষান্তরে, আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায় পবিত্র অন্তরে যারা দিয়ে থাকে, অতএব, তারাই দ্বিগুণ লাভ করে।” (৩০:৩৯)

وَّ اَخْذِهِمُ الرِّبٰوا وَ قَدْ نُهُوْا عَنْهُ وَ اَکْلِهِمْ اَمْوَالَ النَّاسِ بِالْبَاطِلِ ؕ وَ اَعْتَدْنَا لِلْکٰفِرِیْنَ مِنْهُمْ عَذَابًا اَلِیْمًا ۝

“আর যেহেতু, তারা (আহলে কিতাবের এক দল) সুদ গ্রহণ করত, অথচ এ ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছিল এবং এ কারণে যে, তারা অপরের সম্পদ ভোগ করতো অন্যায়ভাবে। বস্তুত, আমি কাফেরদের জন্য তৈরী করে রেখেছি বেদনাদায়ক আযাব।” (৪:১৬১)

وَ اِنْ كَانَ ذُوْ عُسْرَۃٍ فَنَظِرَۃٌ اِلٰی مَیْسَرَۃٍ ؕ وَ اَنْ تَصَدَّقُوْا خَیْرٌ لَّکُمْ اِنْ کُنْتُمْ تَعْلَمُوْنَ ۝

“যদি খাতক (ঋণী) অভাবগ্রস্ত হয়, তবে তাকে সচ্ছলতা আসা পর্যন্ত সময় দেয়া উচিত। আর যদি ক্ষমা করে দাও, তবে তা খুবই উত্তম যদি তোমরা উপলব্ধি কর।” (২:২৮০)

 

 

কর্জে-হাসানা (সুদমুক্ত উত্তম ঋণ)

সুদযুক্ত ঋণের বিপরীতে ইসলাম কর্জে–হাসানা বা সুদমুক্ত উত্তম ঋণকে সমর্থন ও উৎসাহিত করে। কর্জে–হাসানার মূল উদ্দেশ্য হলো – অভাবগ্রস্ত মানুষ যাতে সুদমুক্ত সাময়িক ঋণ নিয়ে তার অর্থকষ্ট দূরীভূত করতে পারে। এ ধরণের ঋণ সহমর্মীতা ও সৌভ্রাতৃত্বমূলক এবং মহান আল্লাহর নিকট খুবই পছন্দনীয় এবং সাওয়াবের দিক থেকে তা দানের চেয়েওে উত্তম। কর্জে–হাসানা আল্লাহকে ধার দেওয়ারই নামান্তর। এতদসংক্রান্ত আয়াতগুলো নিম্নে উদ্ধৃত করা হলো:

مَنْ ذَا الَّذِیْ یُقْرِضُ اللّٰهَ قَرْضًا حَسَنًا فَیُضٰعِفَہٗ لَہٗ وَ لَہٗۤ اَجْرٌ كَرِیْمٌ۝

“কে সেই ব্যক্তি, যে আল্লাহকে উত্তম ধার দিবে, এরপর তিনি তার জন্যে তা বহুগুণে বৃদ্ধি করবেন এবং তার জন্যে রয়েছে সম্মানিত পুরস্কার।” (৫৭:১১)

اِنَّ الْمُصَّدِّقِیْنَ وَالْمُصَّدِّقٰتِ وَاَقْرَضُوا اللّٰهَ قَرْضًا حَسَنًا یُّضٰعَفُ لَهُمْ وَلَهُمْ اَجْرٌ كَرِیْمٌ۝

“নিশ্চয় দানশীল ব্যক্তি ও দানশীলা নারী, যারা আল্লাহকে উত্তমরূপে ধার দেয়, তাদেরকে দেয়া হবে বহুগুণ এবং তাদের জন্যে রয়েছে সম্মানজনক পুরস্কার।” (৫৭:১৮)

اِنْ تُقْرِضُوا اللّٰهَ قَرْضًا حَسَنًا یُّضٰعِفْهُ لَکُمْ وَ یَغْفِرْ لَکُمْ ؕ وَ اللّٰهُ شَکُوْرٌ حَلِیْمٌ۝

“যদি তোমরা আল্লাহকে উত্তম ঋণ দান কর, তিনি তোমাদের জন্যে তা দ্বিগুণ করে দেবেন এবং তোমাদেরকে ক্ষমা করবেন। আল্লাহ গুণগ্রাহী, সহনশীল।” (৬৪:১৭)

…… وَ اَقِیْمُوا الصَّلٰوۃَ وَ اٰتُوا الزَّکٰوۃَ وَ اَقْرِضُوا اللّٰهَ قَرْضًا حَسَنًا ؕ وَ مَا تُقَدِّمُوْا لِاَنْفُسِکُمْ مِّنْ خَیْرٍ تَجِدُوْهُ عِنْدَ اللّٰهِ هُوَ خَیْرًا وَّ اَعْظَمَ اَجْرًا ؕ…….

“…………. তোমরা নামায কায়েম কর, যাকাত দাও এবং আল্লাহকে উত্তম ঋণ দাও। তোমরা নিজেদের জন্যে যা কিছু অগ্রে পাঠাবে, তা আল্লাহর কাছে উত্তম আকারে এবং পুরস্কার হিসেবে বর্ধিতরূপে পাবে…………..।” (৭৩:২০)

 

অধ্যায়সমূহ