২৮ তম অধ্যায় : বিবিধ বিষয় সম্পর্কিত আয়াতসমূহ

আল্লাহ্ তায়ালার দৃষ্টিতে মুসলমানের বন্ধু ও শত্রু

ইসলামের সূচনা লগ্নেই থেকেই  মুশরেক ও কাফেরদের প্রচন্ড ধর্মীয় বিদ্বেষ ও শত্রুতা আর মুনাফেকদের বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হচ্ছে মুসলিম জনগোষ্ঠী। এ ধারা আজ অবধি বিদ্যমান। বর্তমান বিশ্বে এর প্রকৃষ্ট প্রমাণস্বরূপ উল্লেখ করা যায় ফিলিস্তিন, ভারত, চীন, মায়ানমার, বসনিয়ার মুসলিম নির্যাতন ও গণহত্যার ঘটনাসমূহ। বিভিন্নমুখী আগ্রাসন থেকে বেঁচে থাকার জন্য ইসলামের শত্রু–মিত্র চিহ্নিত করা খুবই জরুরী। তাই পবিত্র কুরআনে আল্লাহ্ তায়ালা এ বিষয়টির ওপর সমধিক গুরুত্ব আরোপ করেছেন। আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন মহাজ্ঞানী – তিনি মানুষর অন্তরের খবর সম্যক জ্ঞাত। তিনি ভালো করেই জানেন কে মুসলমানদের মিত্র আর কে শত্রু। তাই এ ব্যাপারে মুসলমানগণকে বারংবার সাবধান করে বিভিন্ন আয়াত নাযিল করেছেন। মহান আল্লাহ্ পাকের এ সাবধানবাণী যে কত সত্য তা ইতিহাসই বলে দিচ্ছে। এ সত্য শুধু অতীতেই নয়, বর্তমান বিশ্বেও তা প্রতিভাত হচ্ছে। কারণ, মুসলমানগণ এক ও অদ্বিতীয় আল্লাহ্ ছাড়া অন্য কারো আনুগত্য ও উপাসনা করেনা এবং অন্য কারো দাসত্ব মেনে নেয়না। তাই অমুসলিম দেশগুলোতে যেমন চলছে মুসলিম সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর অমানবিক নির্যাতন ও নিধন তেমনি মুসলিম দেশগুলোতেও ইসলামের শত্রুরা চালাচ্ছে বিধ্বংসী আগ্রাসন।

এতদসংক্রান্ত কিছু আয়াত এখানে বর্ণিত হলো:

یٰۤاَیُّهَا الَّذِیْنَ اٰمَنُوْا لَا تَتَّخِذُوْا بِطَانَۃً مِّنْ دُوْنِکُمْ لَا یَاْلُوْنَکُمْ خَبَالًا ؕ وَدُّوْا مَا عَنِتُّمْ ۚ قَدْ بَدَتِ الْبَغْضَآءُ مِنْ اَفْوَاهِهِمْ ۚۖ وَ مَا تُخْفِیْ صُدُوْرُهُمْ اَکْبَرُ ؕ قَدْ بَیَّنَّا لَکُمُ الْاٰیٰتِ اِنْ کُنْتُمْ تَعْقِلُوْنَ ۝ هٰۤاَنْتُمْ اُولَآءِ تُحِبُّوْنَهُمْ وَ لَا یُحِبُّوْنَکُمْ وَ تُؤْمِنُوْنَ بِالْكِتٰبِ کُلِّہٖ ۚ وَ اِذَا لَقُوْکُمْ قَالُوْۤا اٰمَنَّا ۚ٭ۖ وَ اِذَا خَلَوْا عَضُّوْا عَلَیْکُمُ الْاَنَامِلَ مِنَ الْغَیْظِ ؕ قُلْ مُوْتُوْا بِغَیْظِکُمْ ؕ اِنَّ اللّٰهَ عَلِیْمٌۢ بِذَاتِ الصُّدُوْرِ ۝ اِنْ تَمْسَسْکُمْ حَسَنَۃٌ تَسُؤْهُمْ ۫ وَ اِنْ تُصِبْکُمْ سَیِّئَۃٌ یَّفْرَحُوْا بِهَا ؕ وَ اِنْ تَصْبِرُوْا وَ تَتَّقُوْا لَا یَضُرُّکُمْ كَیْدُهُمْ شَیْـًٔا ؕ اِنَّ اللّٰهَ بِمَا یَعْمَلُوْنَ مُحِیْطٌ ۝

“হে ঈমানদারগণ! তোমরা মু’মিন ব্যতীত অন্য কাউকে অন্তরঙ্গরূপে গ্রহণ করো না, তারা তোমাদের অমঙ্গল সাধনে কোন ত্রুটি করে না- তোমরা কষ্টে থাক, তাতেই তাদের আনন্দ। শত্রুতাপ্রসূত বিদ্বেষ তাদের মুখেই ফুটে বেরোয়। আর যা কিছু তাদের মনে লুকিয়ে রয়েছে, তা আরো অনেকগুণ বেশী জঘন্য। তোমাদের জন্যে নিদর্শন বিশদভাবে বর্ণনা করে দেয়া হলো, যদি তোমরা তা অনুধাবন করতে সমর্থ হও। দেখ! তোমরাই তাদের ভালবাস, কিন্তু তারা তোমাদের প্রতি মোটেও সদ্ভাব পোষণ করে না। আর তোমরা সমস্ত কিতাবেই বিশ্বাস কর। অথচ তারা যখন তোমাদের সাথে এসে মিশে, বলে, আমরা ঈমান এনেছি। পক্ষান্তরে তারা যখন পৃথক হয়ে যায়, তখন তোমাদের উপর রোষবশত আঙ্গুল কামড়াতে থাকে। বলুন, তোমরা আক্রোশে মরতে থাক। আর আল্লাহ মনের কথা ভালই জানেন। তোমাদের যদি কোন মঙ্গল হয়; তাহলে তাদের খারাপ লাগে। আর তোমাদের যদি অমঙ্গল হয় তাহলে আনন্দিত হয় আর তাতে যদি তোমরা ধৈর্য্যধারণ কর এবং তাকওয়া অবলম্বন কর, তবে তাদের প্রতারণায় তোমাদের কোনই ক্ষতি হবে না। নিশ্চয়ই তারা যা কিছু করে সে সমস্তই আল্লাহর আয়ত্তে রয়েছে।” (৩:১১৮–১২০)

یٰۤاَیُّهَا الَّذِیْنَ اٰمَنُوْۤا اِنْ تُطِیْعُوا الَّذِیْنَ كَفَرُوْا یَرُدُّوْکُمْ عَلٰۤی اَعْقَابِکُمْ فَتَنْقَلِبُوْا خٰسِرِیْنَ ۝ بَلِ اللّٰهُ مَوْلٰىکُمْ ۚ وَ هُوَ خَیْرُ النّٰصِرِیْنَ ۝

“হে ঈমানদারগণ! তোমরা যদি কাফেরদের কথা শুন, তাহলে ওরা তোমাদেরকে পেছনে ফিরিয়ে দেবে, তাতে তোমরা ক্ষতির সম্মুখীন হয়ে পড়বে। বরং আল্লাহ তোমাদের সাহায্যকারী, আর তাঁর সাহায্যই হচ্ছে উত্তম সাহায্য।” (৩:১৪৯–১৫০)

یٰۤاَیُّهَا الَّذِیْنَ اٰمَنُوْۤا اِنْ تُطِیْعُوْا فَرِیْقًا مِّنَ الَّذِیْنَ اُوْتُوا الْكِتٰبَ یَرُدُّوْکُمْ بَعْدَ اِیْمَانِکُمْ کٰفِرِیْنَ ۝ وَ كَیْفَ تَکْفُرُوْنَ وَ اَنْتُمْ تُتْلٰی عَلَیْکُمْ اٰیٰتُ اللّٰهِ وَ فِیْکُمْ رَسُوْلُہٗ ؕ وَ مَنْ یَّعْتَصِمْ بِاللّٰهِ فَقَدْ هُدِیَ اِلٰی صِرَاطٍ مُّسْتَقِیْمٍ ۝

“হে ঈমানদারগণ! তোমরা যদি আহলে কিতাবদের কোন ফেরকার কথা মান, তাহলে ঈমান আনার পর তারা তোমাদিগকে কাফেরে পরিণত করে দেবে। আর তোমরা কেমন করে কাফের হতে পার, অথচ তোমাদের সামনে পাঠ করা হয় আল্লাহর আয়াতসমূহ এবং তোমাদের মধ্যে রয়েছেন আল্লাহর রাসূল। আর যারা আল্লাহর কথা দৃঢ়ভাবে ধরবে, তারা হেদায়েত প্রাপ্ত হবে সরল পথের।” (৩:১০০–১০১)

یٰۤاَیُّهَا الَّذِیْنَ اٰمَنُوْا لَا تَتَّخِذُوا الْیَهُوْدَ وَ النَّصٰرٰۤی اَوْلِیَآءَ ۘؔ بَعْضُهُمْ اَوْلِیَآءُ بَعْضٍ ؕ وَ مَنْ یَّتَوَلَّهُمْ مِّنْکُمْ فَاِنَّہٗ مِنْهُمْ ؕ اِنَّ اللّٰهَ لَا یَہْدِی الْقَوْمَ الظّٰلِمِیْنَ ۝

“হে মুমিণগণ! তোমরা ইহুদী ও খ্রীষ্টানদেরকে বন্ধু হিসাবে গ্রহণ করো না। তারা একে অপরের বন্ধু। তোমাদের মধ্যে যে তাদের সাথে বন্ধুত্ব করবে, সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ জালেমদেরকে পথ প্রদর্শন করেন না।” (৫:৫১)

اِنَّمَا وَلِیُّکُمُ اللّٰهُ وَ رَسُوْلُہٗ وَ الَّذِیْنَ اٰمَنُوا الَّذِیْنَ یُقِیْمُوْنَ الصَّلٰوۃَ وَ یُؤْتُوْنَ الزَّکٰوۃَ وَ هُمْ رٰكِعُوْنَ ۝ وَ مَنْ یَّتَوَلَّ اللّٰهَ وَ رَسُوْلَہٗ وَ الَّذِیْنَ اٰمَنُوْا فَاِنَّ حِزْبَ اللّٰهِ هُمُ الْغٰلِبُوْنَ ۝ یٰۤاَیُّهَا الَّذِیْنَ اٰمَنُوْا لَا تَتَّخِذُوا الَّذِیْنَ اتَّخَذُوْا دِیْنَکُمْ هُزُوًا وَّ لَعِبًا مِّنَ الَّذِیْنَ اُوْتُوا الْكِتٰبَ مِنْ قَبْلِکُمْ وَ الْکُفَّارَ اَوْلِیَآءَ ۚ وَ اتَّقُوا اللّٰهَ اِنْ کُنْتُمْ مُّؤْمِنِیْنَ ۝ وَ اِذَا نَادَیْتُمْ اِلَی الصَّلٰوۃِ اتَّخَذُوْهَا هُزُوًا وَّ لَعِبًا ؕ ذٰلِكَ بِاَنَّهُمْ قَوْمٌ لَّا یَعْقِلُوْنَ ۝

“তোমাদের বন্ধু তো আল্লাহ তাঁর রাসূল এবং মু’মিনবৃন্দ – যারা নামায কায়েম করে, যাকাত দেয় এবং বিনম্র। আর যারা আল্লাহ তাঁর রাসূল এবং বিশ্বাসীদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করে, তারাই আল্লাহর দল এবং তারাই বিজয়ী। হে মু’মিনগণ, আহলে–কিতাবদের মধ্য থেকে যারা তোমাদের ধর্মকে উপহাস ও খেলা মনে করে, তাদেরকে এবং অন্যান্য কাফেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না। আল্লাহকে ভয় কর, যদি তোমরা ঈমানদার হও। আর যখন তোমরা নামাযের জন্যে আহ্বান কর, তখন তারা একে উপহাস ও খেলা বলে মনে করে। কারণ, তারা নির্বোধ।” (৫:৫৫–৫৮)

لَتَجِدَنَّ اَشَدَّ النَّاسِ عَدَاوَۃً لِّلَّذِیْنَ اٰمَنُوا الْیَهُوْدَ وَ الَّذِیْنَ اَشْرَکُوْا ۚ وَ لَتَجِدَنَّ اَقْرَبَهُمْ مَّوَدَّۃً لِّلَّذِیْنَ اٰمَنُوا الَّذِیْنَ قَالُوْۤا اِنَّا نَصٰرٰی ؕ ذٰلِكَ بِاَنَّ مِنْهُمْ قِسِّیْسِیْنَ وَ رُهْبَانًا وَّ اَنَّهُمْ لَا یَسْتَکْبِرُوْنَ ۝

“আপনি সব মানুষের চাইতে মুসলমানদের অধিক শত্রু ইহুদী ও মুশরেকদেরকে পাবেন এবং আপনি সবার চাইতে মুসলমানদের সাথে বন্ধুত্বে অধিক নিকটবর্তী তাদেরকে পাবেন, যারা নিজেদেরকে খ্রীষ্টান বলে। এর কারণ এই যে, খ্রীষ্টানদের মধ্যে আলেম রয়েছে, দরবেশ রয়েছে এবং তারা অহঙ্কার করে না।” (৫:৮২)

یٰۤاَیُّهَا الَّذِیْنَ اٰمَنُوْا لَا تَتَّخِذُوْا عَدُوِّیْ وَ عَدُوَّکُمْ اَوْلِیَآءَ تُلْقُوْنَ اِلَیْهِمْ بِالْمَوَدَّۃِ وَ قَدْ كَفَرُوْا بِمَا جَآءَکُمْ مِّنَ الْحَقِّ ۚ یُخْرِجُوْنَ الرَّسُوْلَ وَ اِیَّاکُمْ اَنْ تُؤْمِنُوْا بِاللّٰهِ رَبِّکُمْ ؕ اِنْ کُنْتُمْ خَرَجْتُمْ جِهَادًا فِیْ سَبِیْلِیْ وَ ابْتِغَآءَ مَرْضَاتِیْ ٭ۖ تُسِرُّوْنَ اِلَیْهِمْ بِالْمَوَدَّۃِ ٭ۖ وَ اَنَا اَعْلَمُ بِمَاۤ اَخْفَیْتُمْ وَ مَاۤ اَعْلَنْتُمْ ؕ وَ مَنْ یَّفْعَلْهُ مِنْکُمْ فَقَدْ ضَلَّ سَوَآءَ السَّبِیْلِ ۝ اِنْ یَّثْقَفُوْکُمْ یَکُوْنُوْا لَکُمْ اَعْدَآءً وَّ یَبْسُطُوْۤا اِلَیْکُمْ اَیْدِیَهُمْ وَ اَلْسِنَتَهُمْ بِالسُّوْٓءِ وَ وَدُّوْا لَوْ تَکْفُرُوْنَ ۝

“মু’মিনগণ, তোমরা আমার ও তোমাদের শত্রুদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না। তোমরা তো তাদের প্রতি বন্ধুত্বের বার্তা পাঠাও, অথচ তারা যে সত্য তোমাদের কাছে আগমন করেছে, তা অস্বীকার করছে। তারা রাসূলকে ও তোমাদেরকে বহিষ্কার করে এই অপরাধে যে, তোমরা তোমাদের পালনকর্তার প্রতি বিশ্বাস রাখ। যদি তোমরা আমার সন্তুষ্টিলাভের জন্যে এবং আমার পথে জেহাদ করার জন্যে বের হয়ে থাক, তবে কেন তাদের প্রতি গোপনে বন্ধুত্বের পয়গাম প্রেরণ করছ? তোমরা যা গোপন কর এবং যা প্রকাশ কর, তা আমি খুব জানি। তোমাদের মধ্যে যে এটা করে, সে সরলপথ থেকে বিচ্যুত হয়ে যায়। তোমাদেরকে করতলগত করতে পারলে তারা তোমাদের শত্রু হয়ে যাবে এবং মন্দ উদ্দেশ্যে তোমাদের প্রতি বাহু ও রসনা প্রসারিত করবে এবং চাইবে যে, কোনরূপে তোমরা ও কাফের হয়ে যাও।” (৬০:১–২)

لَا یَتَّخِذِ الْمُؤْمِنُوْنَ الْکٰفِرِیْنَ اَوْلِیَآءَ مِنْ دُوْنِ الْمُؤْمِنِیْنَ ۚ وَ مَنْ یَّفْعَلْ ذٰلِكَ فَلَیْسَ مِنَ اللّٰهِ فِیْ شَیْءٍ اِلَّاۤ اَنْ تَتَّقُوْا مِنْهُمْ تُقٰىۃً ؕ وَ یُحَذِّرُکُمُ اللّٰهُ نَفْسَہٗ ؕ وَ اِلَی اللّٰهِ الْمَصِیْرُ ۝

“মু’মিনগন যেন অন্য মু’মিনকে ছেড়ে কোন কাফেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ না করে। যারা এরূপ করবে আল্লাহর সাথে তাদের কোন সম্পর্ক থাকবে না। তবে যদি তোমরা তাদের পক্ষ থেকে কোন অনিষ্টের আশঙ্কা কর, তবে তাদের সাথে সাবধানতার সাথে থাকবে, আল্লাহ তা’আলা তাঁর সম্পর্কে তোমাদের সতর্ক করেছেন। এবং সবাই কে তাঁর কাছে ফিরে যেতে হবে।” (৩:২৮)

اِنَّمَا وَلِیُّکُمُ اللّٰهُ وَ رَسُوْلُہٗ وَ الَّذِیْنَ اٰمَنُوا الَّذِیْنَ یُقِیْمُوْنَ الصَّلٰوۃَ وَ یُؤْتُوْنَ الزَّکٰوۃَ وَ هُمْ رٰكِعُوْنَ ۝ وَ مَنْ یَّتَوَلَّ اللّٰهَ وَ رَسُوْلَہٗ وَ الَّذِیْنَ اٰمَنُوْا فَاِنَّ حِزْبَ اللّٰهِ هُمُ الْغٰلِبُوْنَ

“তোমাদের বন্ধু তো আল্লাহ তাঁর রাসূল এবং মু’মিনবৃন্দ -যারা নামায কায়েম করে, যাকাত দেয় এবং বিনম্র। আর যারা আল্লাহ তাঁর রাসূল এবং বিশ্বাসীদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করে, তারাই আল্লাহর দল এবং তারাই বিজয়ী।” (৫:৫৫–৫৬)

یٰۤاَیُّهَا الَّذِیْنَ اٰمَنُوْا لَا تَتَوَلَّوْا قَوْمًا غَضِبَ اللّٰهُ عَلَیْهِمْ قَدْ یَئِسُوْا مِنَ الْاٰخِرَۃِ كَمَا یَئِسَ الْکُفَّارُ مِنْ اَصْحٰبِ الْقُبُوْرِ ۝

“মু’মিনগণ, আল্লাহ যে জাতির প্রতি রুষ্ট, তোমরা তাদের সাথে বন্ধুত্ব করো না। তারা পরকাল সম্পর্কে নিরাশ হয়ে গেছে যেমন কবরস্থ কাফেররা নিরাশ হয়ে গেছে।” (৬০:১৩)

اَلَمْ تَرَ اِلَی الَّذِیْنَ تَوَلَّوْا قَوْمًا غَضِبَ اللّٰهُ عَلَیْهِمْ ؕ مَا هُمْ مِّنْکُمْ وَ لَا مِنْهُمْ ۙ وَ یَحْلِفُوْنَ عَلَی الْكَذِبِ وَ هُمْ یَعْلَمُوْنَ ۝ اَعَدَّ اللّٰهُ لَهُمْ عَذَابًا شَدِیْدًا ؕ اِنَّهُمْ سَآءَ مَا كَانُوْا یَعْمَلُوْنَ ۝

“আপনি কি তাদের প্রতি লক্ষ্য করেননি, যারা আল্লাহর গযবে নিপতিত সম্প্রদায়ের সাথে বন্ধুত্ব করে? তারা মুসলমানদের দলভুক্ত নয় এবং তাদেরও দলভুক্ত নয়। তারা জেনেশুনে মিথ্যা বিষয়ে শপথ করে। আল্লাহ তাদের জন্যে কঠোর শাস্তি প্রস্তুত রেখেছেন। নিশ্চয় তারা যা করে, খুবই মন্দ।” (৫৮:১৪–১৫)

عَسَی اللّٰهُ اَنْ یَّجْعَلَ بَیْنَکُمْ وَ بَیْنَ الَّذِیْنَ عَادَیْتُمْ مِّنْهُمْ مَّوَدَّۃً ؕ وَ اللّٰهُ قَدِیْرٌ ؕ وَ اللّٰهُ غَفُوْرٌ رَّحِیْمٌ ۝ لَا یَنْهٰىکُمُ اللّٰهُ عَنِ الَّذِیْنَ لَمْ یُقَاتِلُوْکُمْ فِی الدِّیْنِ وَ لَمْ یُخْرِجُوْکُمْ مِّنْ دِیَارِکُمْ اَنْ تَبَرُّوْهُمْ وَ تُقْسِطُوْۤا اِلَیْهِمْ ؕ اِنَّ اللّٰهَ یُحِبُّ الْمُقْسِطِیْنَ ۝

“যারা তোমাদের দুশমন আল্লাহ তাদের মধ্যে ও তোমাদের মধ্যে সম্ভবতঃ বন্ধুত্ব সৃষ্টি করে দেবেন। আল্লাহ সবই করতে পারেন এবং আল্লাহ ক্ষমাশীল, করুণাময়। ধর্মের ব্যাপারে যারা তোমাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেনি এবং তোমাদেরকে দেশ থেকে বহিষ্কৃত করেনি, তাদের প্রতি সদাচরণ ও ইনসাফ করতে আল্লাহ তোমাদেরকে নিষেধ করেন না। নিশ্চয় আল্লাহ ইনসাফকারীদেরকে ভালবাসেন।” (৬০:৭–৮)

اِنَّمَا یَنْهٰىکُمُ اللّٰهُ عَنِ الَّذِیْنَ قٰتَلُوْکُمْ فِی الدِّیْنِ وَ اَخْرَجُوْکُمْ مِّنْ دِیَارِکُمْ وَ ظٰهَرُوْا عَلٰۤی اِخْرَاجِکُمْ اَنْ تَوَلَّوْهُمْ ۚ وَ مَنْ یَّتَوَلَّهُمْ فَاُولٰٓئِكَ هُمُ الظّٰلِمُوْنَ ۝

“আল্লাহ কেবল তাদের সাথে বন্ধুত্ব করতে নিষেধ করেন, যারা ধর্মের ব্যাপারে তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে, তোমাদেরকে দেশ থেকে বহিষ্কৃত করেছে এবং বহিষ্কারকার্যে সহায়তা করেছে। যারা তাদের সাথে বন্ধুত্ব করে তারাই যালেম।” (৬০:৯)

الَّذِیْنَ یَتَّخِذُوْنَ الْکٰفِرِیْنَ اَوْلِیَآءَ مِنْ دُوْنِ الْمُؤْمِنِیْنَ ؕ اَیَبْتَغُوْنَ عِنْدَهُمُ الْعِزَّۃَ فَاِنَّ الْعِزَّۃَ لِلّٰهِ جَمِیْعًا ۝ وَ قَدْ نَزَّلَ عَلَیْکُمْ فِی الْكِتٰبِ اَنْ اِذَا سَمِعْتُمْ اٰیٰتِ اللّٰهِ یُکْفَرُ بِهَا وَ یُسْتَہْزَاُ بِهَا فَلَا تَقْعُدُوْا مَعَهُمْ حَتّٰی یَخُوْضُوْا فِیْ حَدِیْثٍ غَیْرِہٖۤ ۫ۖ اِنَّکُمْ اِذًا مِّثْلُهُمْ ؕ اِنَّ اللّٰهَ جَامِعُ الْمُنٰفِقِیْنَ وَ الْکٰفِرِیْنَ فِیْ جَهَنَّمَ جَمِیْعَۨا ۝ الَّذِیْنَ یَتَرَبَّصُوْنَ بِکُمْ ۚ فَاِنْ كَانَ لَکُمْ فَتْحٌ مِّنَ اللّٰهِ قَالُوْۤا اَلَمْ نَکُنْ مَّعَکُمْ ۫ۖ وَ اِنْ كَانَ لِلْکٰفِرِیْنَ نَصِیْبٌ ۙ قَالُوْۤا اَلَمْ نَسْتَحْوِذْ عَلَیْکُمْ وَ نَمْنَعْکُمْ مِّنَ الْمُؤْمِنِیْنَ ؕ فَاللّٰهُ یَحْکُمُ بَیْنَکُمْ یَوْمَ الْقِیٰمَۃِ ؕ وَ لَنْ یَّجْعَلَ اللّٰهُ لِلْکٰفِرِیْنَ عَلَی الْمُؤْمِنِیْنَ سَبِیْلًا۝

“যারা মুসলমানদের বর্জন করে কাফেরদেরকে নিজেদের বন্ধু বানিয়ে নেয় এবং তাদেরই কাছে সম্মান প্রত্যাশা করে, অথচ যাবতীয় সম্মান শুধুমাত্র আল্লাহরই জন্য। আর কুরআনের মাধ্যমে তোমাদের প্রতি এই হুকুম জারি করে দিয়েছেন যে, যখন আল্লাহ তা’আলার আয়াতসমূহের প্রতি অস্বীকৃতি জ্ঞাপন ও বিদ্রূপ হতে শুনবে, তখন তোমরা তাদের সাথে বসবে না, যতক্ষণ না তারা প্রসঙ্গান্তরে চলে যায়। তা না হলে তোমরাও তাদেরই মত হয়ে যাবে। আল্লাহ দোযখের মাঝে মুনাফেক ও কাফেরদেরকে একই জায়গায় সমবেত করবেন। এরা এমনি মুনাফেক যারা তোমাদের কল্যাণ-অকল্যাণের প্রতীক্ষায় ওত পেতে থাকে। অতঃপর আল্লাহর ইচ্ছায় তোমাদের যদি কোন বিজয় অর্জিত হয়, তবে তারা বলে, আমরাও কি তোমাদের সাথে ছিলাম না? পক্ষান্তরে কাফেরদের যদি আংশিক বিজয় হয়, তবে বলে, আমরা কি তোমাদেরকে ঘিরে রাখিনি এবং মুসলমানদের কবল থেকে রক্ষা করিনি? সুতরাং আল্লাহ তোমাদের মধ্যে কেয়ামতের দিন মীমাংসা করবেন এবং কিছুতেই আল্লাহ কাফেরদেরকে মুসলমানদের উপর বিজয় দান করবেন না।” (৪:১৩৯–১৪১)

اَمْ حَسِبْتُمْ اَنْ تُتْرَکُوْا وَ لَمَّا یَعْلَمِ اللّٰهُ الَّذِیْنَ جٰهَدُوْا مِنْکُمْ وَ لَمْ یَتَّخِذُوْا مِنْ دُوْنِ اللّٰهِ وَ لَا رَسُوْلِہٖ وَ لَا الْمُؤْمِنِیْنَ وَلِیْجَۃً ؕ وَ اللّٰهُ خَبِیْرٌۢ بِمَا تَعْمَلُوْنَ ۝

“তোমরা কি মনে কর যে, তোমাদের ছেড়ে দেয়া হবে এমনি, যতক্ষণ না আল্লাহ জেনে নেবেন তোমাদের কে যুদ্ধ করেছে এবং কে আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও মুসলমানদের ব্যতীত অন্য কাউকে অন্তরঙ্গ বন্ধুরূপে গ্রহণ করা থেকে বিরত রয়েছে। আর তোমরা যা কর সে বিষয়ে আল্লাহ সবিশেষ অবহিত।” (৯:১৬)

اَلَاۤ اِنَّ اَوْلِیَآءَ اللّٰهِ لَا خَوْفٌ عَلَیْهِمْ وَ لَا هُمْ یَحْزَنُوْنَ ۝ الَّذِیْنَ اٰمَنُوْا وَ كَانُوْا یَتَّقُوْنَ ۝ لَهُمُ الْبُشْرٰی فِی الْحَیٰوۃِ الدُّنْیَا وَ فِی الْاٰخِرَۃِ ؕ لَا تَبْدِیْلَ لِكَلِمٰتِ اللّٰهِ ؕ ذٰلِكَ هُوَ الْفَوْزُ الْعَظِیْمُ۝

“মনে রেখো যারা আল্লাহর বন্ধু, তাদের না কোন ভয় ভীতি আছে, না তারা চিন্তান্বিত হবে। যারা ঈমান এনেছে এবং ভয় করতে রয়েছে। তাদের জন্য সুসংবাদ পার্থিব জীবনে ও পরকালীন জীবনে। আল্লাহর কথার কখনো হের-ফের হয় না। এটাই হল মহাসফলতা।” (১০:৬২–৬৪)

لَا تَجِدُ قَوْمًا یُّؤْمِنُوْنَ بِاللّٰهِ وَ الْیَوْمِ الْاٰخِرِ یُوَآدُّوْنَ مَنْ حَآدَّ اللّٰهَ وَ رَسُوْلَہٗ وَ لَوْ كَانُوْۤا اٰبَآءَهُمْ اَوْ اَبْنَآءَهُمْ اَوْ اِخْوَانَهُمْ اَوْ عَشِیْرَتَهُمْ ؕ اُولٰٓئِكَ كَتَبَ فِیْ قُلُوْبِهِمُ الْاِیْمَانَ وَ اَیَّدَهُمْ بِرُوْحٍ مِّنْهُ ؕ وَ یُدْخِلُهُمْ جَنّٰتٍ تَجْرِیْ مِنْ تَحْتِهَا الْاَنْهٰرُ خٰلِدِیْنَ فِیْهَا ؕ رَضِیَ اللّٰهُ عَنْهُمْ وَ رَضُوْا عَنْهُ ؕ اُولٰٓئِكَ حِزْبُ اللّٰهِ ؕ اَلَاۤ اِنَّ حِزْبَ اللّٰهِ هُمُ الْمُفْلِحُوْنَ ۝

“যারা আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস করে, তাদেরকে আপনি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধাচরণকারীদের সাথে বন্ধুত্ব করতে দেখবেন না, যদিও তারা তাদের পিতা, পুত্র, ভ্রাতা অথবা জ্ঞাতি–গোষ্ঠী হয়। তাদের অন্তরে আল্লাহ ঈমান লিখে দিয়েছেন এবং তাদেরকে শক্তিশালী করেছেন তাঁর অদৃশ্য শক্তি দ্বারা। তিনি তাদেরকে জান্নাতে দাখিল করবেন, যার তলদেশে নদী প্রবাহিত। তারা তথায় চিরকাল থাকবে। আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট এবং তারা আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট। তারাই আল্লাহর দল। জেনে রাখ, আল্লাহর দলই সফলকাম হবে।” (৫৮:২২)

اَلَمْ تَرَ اِلَی الَّذِیْنَ اُوْتُوْا نَصِیْبًا مِّنَ الْكِتٰبِ یَشْتَرُوْنَ الضَّلٰلَۃَ وَ یُرِیْدُوْنَ اَنْ تَضِلُّوا السَّبِیْلَ ۝ وَ اللّٰهُ اَعْلَمُ بِاَعْدَآئِکُمْ ؕ وَ كَفٰی بِاللّٰهِ وَلِیًّا ٭۫ وَّ كَفٰی بِاللّٰهِ نَصِیْرًا ۝

“তুমি কি ওদের দেখনি, যারা কিতাবের কিছু অংশ প্রাপ্ত হয়েছে, (অথচ) তারা পথভ্রষ্টতা খরিদ করে এবং কামনা করে, যাতে তোমরাও আল্লাহর পথ থেকে বিভ্রান্ত হয়ে যাও। অথচ আল্লাহ তোমাদের শত্রুদেরকে যথার্থই জানেন। আর অভিভাবক হিসাবে আল্লাহই যথেষ্ট এবং সাহায্যকারী হিসাবেও আল্লাহই যথেষ্ট।” (৪:৪৪–৪৫)

یٰۤاَیُّهَا الَّذِیْنَ اٰمَنُوْا لَا تَتَّخِذُوْۤا اٰبَآءَکُمْ وَ اِخْوَانَکُمْ اَوْلِیَآءَ اِنِ اسْتَحَبُّوا الْکُفْرَ عَلَی الْاِیْمَانِ ؕ وَ مَنْ یَّتَوَلَّهُمْ مِّنْکُمْ فَاُولٰٓئِكَ هُمُ الظّٰلِمُوْنَ ۝

“হে ঈমানদারগণ! তোমরা স্বীয় পিতা ও ভাইদের অভিভাবকরূপে গ্রহণ করো না, যদি তারা ঈমান অপেক্ষা কুফরকে ভালবাসে। আর তোমাদের যারা তাদের অভিভাবকরূপে গ্রহণ করে তারা সীমালংঘনকারী।” (৯:২৩)

وَ لَنْ تَرْضٰی عَنْكَ الْیَهُوْدُ وَ لَا النَّصٰرٰی حَتّٰی تَتَّبِعَ مِلَّتَهُمْ ؕ قُلْ اِنَّ هُدَی اللّٰهِ هُوَ الْهُدٰی ؕ وَ لَئِنِ اتَّبَعْتَ اَهْوَآءَهُمْ بَعْدَ الَّذِیْ جَآءَكَ مِنَ الْعِلْمِ ۙ مَا لَكَ مِنَ اللّٰهِ مِنْ وَّلِیٍّ وَّ لَا نَصِیْرٍ۝

“ইহুদী ও খ্রীষ্টানরা কখনই আপনার প্রতি সন্তুষ্ট হবে না, যে পর্যন্ত না আপনি তাদের ধর্মের অনুসরণ করেন। বলে দিন, যে পথ আল্লাহ প্রদর্শন করেন, তাই হল সরল পথ। যদি আপনি তাদের আকাঙ্খাসমূহের অনুসরণ করেন, ঐ জ্ঞান লাভের পর, যা আপনার কাছে পৌঁছেছে, তবে কেউ আল্লাহর কবল থেকে আপনার উদ্ধারকারী ও সাহায্যকারী নেই।” (২:১২০)

یٰۤاَیُّهَا الَّذِیْنَ اٰمَنُوا اتَّقُوا اللّٰهَ حَقَّ تُقٰتِہٖ وَ لَا تَمُوْتُنَّ اِلَّا وَ اَنْتُمْ مُّسْلِمُوْنَ ۝ وَ اعْتَصِمُوْا بِحَبْلِ اللّٰهِ جَمِیْعًا وَّ لَا تَفَرَّقُوْا ۪ وَ اذْکُرُوْا نِعْمَتَ اللّٰهِ عَلَیْکُمْ اِذْ کُنْتُمْ اَعْدَآءً فَاَلَّفَ بَیْنَ قُلُوْبِکُمْ فَاَصْبَحْتُمْ بِنِعْمَتِہٖۤ اِخْوَانًا ۚ وَ کُنْتُمْ عَلٰی شَفَا حُفْرَۃٍ مِّنَ النَّارِ فَاَنْقَذَکُمْ مِّنْهَا ؕ كَذٰلِكَ یُبَیِّنُ اللّٰهُ لَکُمْ اٰیٰتِہٖ لَعَلَّکُمْ تَہْتَدُوْنَ ۝

“হে ঈমানদারগণ! আল্লাহকে যেমন ভয় করা উচিৎ ঠিক তেমনিভাবে ভয় করতে থাক। এবং অবশ্যই মুসলমান না হয়ে মৃত্যুবরণ করো না। আর তোমরা সকলে আল্লাহর রজ্জুকে সুদৃঢ় হস্তে ধারণ কর; পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না। আর তোমরা সে নেয়ামতের কথা স্মরণ কর, যা আল্লাহ তোমাদিগকে দান করেছেন। তোমরা পরস্পর শত্রু ছিলে। অতঃপর আল্লাহ তোমাদের মনে সম্প্রীতি দান করেছেন। ফলে, এখন তোমরা তাঁর অনুগ্রহের কারণে পরস্পর ভাই ভাই হয়েছ। তোমরা এক অগ্নিকুন্ডের পাড়ে অবস্থান করছিলে। অতঃপর তা থেকে তিনি তোমাদেরকে মুক্তি দিয়েছেন। এভাবেই আল্লাহ নিজের নিদর্শনসমূহ প্রকাশ করেন, যাতে তোমরা হেদায়েত প্রাপ্ত হতে পার।” (৩:১০২–১০৩)

 

পবিত্র কুরআনে উল্লেখিত  মহীয়সী নারীবৃন্দ:

কয়েকজন মহিয়সী নারীর কথা পবিত্র কুরআনে সরাসরি উল্লেখিত হয়েছে। নিম্নে এতদসংক্রান্ত আয়াতগুলো উদ্ধৃত করা হলো:

হযরত মরিয়ম বিনতে ইমরান (আ)

اِذْ قَالَتِ امْرَاَتُ عِمْرٰنَ رَبِّ اِنِّیْ نَذَرْتُ لَكَ مَا فِیْ بَطْنِیْ مُحَرَّرًا فَتَقَبَّلْ مِنِّیْ ۚ اِنَّكَ اَنْتَ السَّمِیْعُ الْعَلِیْمُ ۝ فَلَمَّا وَضَعَتْهَا قَالَتْ رَبِّ اِنِّیْ وَضَعْتُهَاۤ اُنْثٰی ؕ وَ اللّٰهُ اَعْلَمُ بِمَا وَضَعَتْ ؕ وَ لَیْسَ الذَّكَرُ كَالْاُنْثٰی ۚ وَ اِنِّیْ سَمَّیْتُهَا مَرْیَمَ وَ اِنِّیْۤ اُعِیْذُهَا بِكَ وَ ذُرِّیَّتَهَا مِنَ الشَّیْطٰنِ الرَّجِیْمِ۝ فَتَقَبَّلَهَا رَبُّهَا بِقَبُوْلٍ حَسَنٍ وَّ اَنْۢبَتَهَا نَبَاتًا حَسَنًا ۙ وَّ كَفَّلَهَا زَكَرِیَّا ۚؕ کُلَّمَا دَخَلَ عَلَیْهَا زَكَرِیَّا الْمِحْرَابَ ۙ وَجَدَ عِنْدَهَا رِزْقًا ۚ قَالَ یٰمَرْیَمُ اَنّٰی لَكِ هٰذَا ؕ قَالَتْ هُوَ مِنْ عِنْدِ اللّٰهِ ؕ اِنَّ اللّٰهَ یَرْزُقُ مَنْ یَّشَآءُ بِغَیْرِ حِسَابٍ ۝

“এমরানের স্ত্রী যখন বললো, ‘হে আমার পালনকর্তা! আমার গর্ভে যা রয়েছে আমি তাকে তোমার নামে উৎসর্গ করলাম সবার কাছ থেকে মুক্ত রেখে। আমার পক্ষ থেকে তুমি তাকে কবুল করে নাও, নিশ্চয়ই তুমি শ্রবণকারী, সর্বজ্ঞাত।’ অতঃপর যখন তাকে প্রসব করলো বলল, ‘হে আমার পালনকর্তা! আমি কন্যা প্রসব করেছি।’ বস্তুত কি সে প্রসব করেছে আল্লাহ তা ভালই জানেন। সেই কন্যার মত কোন পুত্রই যে নেই। আর আমি তার নাম রাখলাম মারইয়াম। আর আমি তাকে ও তার সন্তানদেরকে তোমার আশ্রয়ে সমর্পণ করছি। অভিশপ্ত শয়তানের কবল থেকে। অতঃপর তাঁর পালনকর্তা তাঁকে উত্তমভাবে গ্রহণ করে নিলেন এবং তাঁকে প্রবৃদ্ধি দান করলেন -অত্যন্ত সুন্দর প্রবৃদ্ধি। আর তাঁকে যাকারিয়ার তত্ত্বাবধানে সমর্পন করলেন। যখনই যাকারিয়া মেহরাবের মধ্যে তার কছে আসতেন তখনই কিছু খাবার দেখতে পেতেন। জিজ্ঞেস করতেন ‘মারইয়াম! কোথা থেকে এসব তোমার কাছে এলো?’ তিনি বলতেন, ‘এসব আল্লাহর নিকট থেকে আসে। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা বেহিসাব রিযিক দান করেন’।” (৩:৩৫–৩৭)

وَ مَرْیَمَ ابْنَتَ عِمْرٰنَ الَّتِیْۤ اَحْصَنَتْ فَرْجَهَا فَنَفَخْنَا فِیْهِ مِنْ رُّوْحِنَا وَ صَدَّقَتْ بِكَلِمٰتِ رَبِّهَا وَ کُتُبِہٖ وَ كَانَتْ مِنَ الْقٰنِتِیْنَ

“আর দৃষ্টান্ত বর্ণনা করেছেন এমরান-তনয়া মরিয়মের, যে তার সতীত্ব বজায় রেখেছিল। অতঃপর আমি তার মধ্যে আমার পক্ষ থেকে জীবন ফুঁকে দিয়েছিলাম এবং সে তার পালনকর্তার বাণী ও কিতাবকে সত্যে পরিণত করেছিল। সে ছিল বিনয় প্রকাশকারীনীদের একজন।” (৬৬:১২)

وَ الَّتِیْۤ اَحْصَنَتْ فَرْجَهَا فَنَفَخْنَا فِیْهَا مِنْ رُّوْحِنَا وَ جَعَلْنٰهَا وَ ابْنَهَاۤ اٰیَۃً لِّلْعٰلَمِیْنَ۝

“এবং সেই নারীর কথা আলোচনা করুন, যে তার কামপ্রবৃত্তিকে বশে রেখেছিল, অতঃপর আমি তার মধ্যে আমার রূহ ফুঁকে দিয়েছিলাম এবং তাকে তার পুত্রকে বিশ্ববাসীর জন্য নিদর্শন করেছিলাম।” (২১:৯১)

وَ اِذْ قَالَتِ الْمَلٰٓئِكَۃُ یٰمَرْیَمُ اِنَّ اللّٰهَ اصْطَفٰكِ وَ طَهَرَكِ وَ اصْطَفٰكِ عَلٰی نِسَآءِ الْعٰلَمِیْنَ ۝ یٰمَرْیَمُ اقْنُتِیْ لِرَبِّكِ وَ اسْجُدِیْ وَ ارْكَعِیْ مَعَ الرّٰكِعِیْنَ ۝ ذٰلِكَ مِنْ اَنْۢبَآءِ الْغَیْبِ نُوْحِیْهِ اِلَیْكَ ؕ وَ مَا کُنْتَ لَدَیْهِمْ اِذْ یُلْقُوْنَ اَقْلَامَهُمْ اَیُّهُمْ یَکْفُلُ مَرْیَمَ ۪ وَ مَا کُنْتَ لَدَیْهِمْ اِذْ یَخْتَصِمُوْنَ ۝ اِذْ قَالَتِ الْمَلٰٓئِكَۃُ یٰمَرْیَمُ اِنَّ اللّٰهَ یُبَشِّرُكِ بِكَلِمَۃٍ مِّنْهُ ٭ۖ اسْمُهُ الْمَسِیْحُ عِیْسَی ابْنُ مَرْیَمَ وَجِیْہًا فِی الدُّنْیَا وَ الْاٰخِرَۃِ وَ مِنَ الْمُقَرَّبِیْنَ ۝ وَ یُكَلِّمُ النَّاسَ فِی الْمَہْدِ وَ كَہْلًا وَّ مِنَ الصّٰلِحِیْنَ ۝ قَالَتْ رَبِّ اَنّٰی یَکُوْنُ لِیْ وَلَدٌ وَّ لَمْ یَمْسَسْنِیْ بَشَرٌ ؕ قَالَ كَذٰلِكِ اللّٰهُ یَخْلُقُ مَا یَشَآءُ ؕ اِذَا قَضٰۤی اَمْرًا فَاِنَّمَا یَقُوْلُ لَہٗ کُنْ فَیَکُوْنُ ۝

“আর যখন ফেরেশতা বলল হে মারইয়াম!, আল্লাহ তোমাকে পছন্দ করেছেন এবং তোমাকে পবিত্র পরিচ্ছন্ন করে দিয়েছেন। আর তোমাকে বিশ্ব নারী সমাজের উর্ধ্বে মনোনীত করেছেন। হে মারইয়াম! তোমার পালনকর্তার উপাসনা কর এবং রুকুকারীদের সাথে সেজদা ও রুকু কর। এ হলো গায়েবী সংবাদ, যা আমি আপনাকে পাঠিয়ে থাকি। আর আপনি তো তাদের কাছে ছিলেন না, যখন প্রতিযোগিতা করছিল যে, কে প্রতিপালন করবে মারইয়ামকে এবং আপনি তাদের কাছে ছিলেন না, যখন তারা ঝগড়া করছিলো। যখন ফেরেশতাগণ বললো, হে মারইয়াম আল্লাহ তোমাকে তাঁর এক বাণীর সুসংবাদ দিচ্ছেন, যার নাম হলো মসীহ-মারইয়াম-তনয় ঈসা, দুনিয়া ও আখেরাতে তিনি মহাসম্মানের অধিকারী এবং আল্লাহর ঘনিষ্ঠদের অন্তর্ভুক্ত। যখন তিনি মায়ের কোলে থাকবেন এবং পূর্ণ বয়স্ক হবেন তখন তিনি মানুষের সাথে কথা বলবেন। আর তিনি সৎকর্মশীলদের অন্তর্ভুক্ত হবেন। তিনি বললেন, পরওয়ারদেগার! কেমন করে আমার সন্তান হবে; আমাকে তো কোন মানুষ স্পর্শ করেনি। বললেন এ ভাবেই আল্লাহ যা ইচ্ছা সৃষ্টি করেন। যখন কোন কাজ করার জন্য ইচ্ছা করেন তখন বলেন যে, ‘হয়ে যাও’ অমনি তা হয়ে যায়।” (৩:৪২–৪৭)

وَ اذْکُرْ فِی الْكِتٰبِ مَرْیَمَ ۘ اِذِ انْتَبَذَتْ مِنْ اَهْلِهَا مَكَانًا شَرْقِیًّا ۝ فَاتَّخَذَتْ مِنْ دُوْنِهِمْ حِجَابًا ۪۟ فَاَرْسَلْنَاۤ اِلَیْهَا رُوْحَنَا فَتَمَثَّلَ لَهَا بَشَرًا سَوِیًّا ۝قَالَتْ اِنِّیْۤ اَعُوْذُ بِالرَّحْمٰنِ مِنْكَ اِنْ کُنْتَ تَقِیًّا ۝ قَالَ اِنَّمَاۤ اَنَا رَسُوْلُ رَبِّكِ ٭ۖ لِاَهَبَ لَكِ غُلٰمًا زَكِیًّا ۝ قَالَتْ اَنّٰی یَکُوْنُ لِیْ غُلٰمٌ وَّ لَمْ یَمْسَسْنِیْ بَشَرٌ وَّ لَمْ اَکُ بَغِیًّا ۝ قَالَ كَذٰلِكِ ۚ قَالَ رَبُّكِ هُوَ عَلَیَّ هَیِّنٌ ۚ وَ لِنَجْعَلَہٗۤ اٰیَۃً لِّلنَّاسِ وَ رَحْمَۃً مِّنَّا ۚ وَ كَانَ اَمْرًا مَّقْضِیًّا ۝ فَحَمَلَتْهُ فَانْتَبَذَتْ بِہٖ مَكَانًا قَصِیًّا ۝ فَاَجَآءَهَا الْمَخَاضُ اِلٰی جِذْعِ النَّخْلَۃِ ۚ قَالَتْ یٰلَیْتَنِیْ مِتُّ قَبْلَ هٰذَا وَ کُنْتُ نَسْیًا مَّنْسِیًّا ۝ فَنَادٰىهَا مِنْ تَحْتِهَاۤ اَلَّا تَحْزَنِیْ قَدْ جَعَلَ رَبُّكِ تَحْتَكِ سَرِیًّا ۝ وَ هُزِّیْۤ اِلَیْكِ بِجِذْعِ النَّخْلَۃِ تُسٰقِطْ عَلَیْكِ رُطَبًا جَنِیًّا ۝ فَکُلِیْ وَ اشْرَبِیْ وَ قَرِّیْ عَیْنًا ۚ فَاِمَّا تَرَیِنَّ مِنَ الْبَشَرِ اَحَدًا ۙ فَقُوْلِیْۤ اِنِّیْ نَذَرْتُ لِلرَّحْمٰنِ صَوْمًا فَلَنْ اُكَلِّمَ الْیَوْمَ اِنْسِیًّا۝

“এই কিতাবে মারইয়ামের কথা বর্ণনা করুন, যখন সে তার পরিবারের লোকজন থেকে পৃথক হয়ে পূর্বদিকে এক স্থানে আশ্রয় নিল। অতঃপর তাদের থেকে নিজেকে আড়াল করার জন্যে সে পর্দা করলো। অতঃপর আমি তার কাছে আমার রূহ প্রেরণ করলাম, সে তার নিকট পূর্ণ মানবাকৃতিতে আত্মপ্রকাশ করল। মারইয়াম বলল: আমি তোমা থেকে দয়াময়ের আশ্রয় প্রার্থনা করি যদি তুমি আল্লাহভীরু হও। সে বলল: আমি তো শুধু তোমার পালনকর্তা প্রেরিত, যাতে তোমাকে এক পবিত্র পুত্র দান করে যাব। মরিইয়াম বলল: কিরূপে আমার পুত্র হবে, যখন কোন মানব আমাকে স্পর্শ করেনি এবং আমি কখনও ব্যভিচারিণীও ছিলাম না ? সে বলল: এমনিতেই হবে। তোমার পালনকর্তা বলেছেন, এটা আমার জন্যে সহজ সাধ্য এবং আমি তাকে মানুষের জন্যে একটি নিদর্শন ও আমার পক্ষ থেকে অনুগ্রহ স্বরূপ করতে চাই। এটা তো এক স্থিরীকৃত ব্যাপার। অতঃপর তিনি গর্ভে সন্তান ধারণ করলেন এবং তৎসহ এক দূরবর্তী স্থানে চলে গেলেন। প্রসব বেদনা তাঁকে এক খেজুর বৃক্ষ-মূলে আশ্রয় নিতে বাধ্য করল। তিনি বললেন: হায়, আমি যদি কোনরূপে এর পূর্বে মরে যেতাম এবং মানুষের স্মৃতি থেকে বিলুপ্ত হয়ে যেতাম! অতঃপর ফেরেশতা তাকে নি¤œদিক থেকে আওয়ায দিলেন যে, তুমি দুঃখ করো না। তোমার পালনকর্তা তোমার পায়ের তলায় একটি নহর জারি করেছেন। আর তুমি নিজের দিকে খেজুর গাছের কান্ডে নাড়া দাও, তা থেকে তোমার উপর সুপক্ক খেজুর পতিত হবে। যখন আহার কর, পান কর এবং চক্ষু শীতল কর। যদি মানুষের মধ্যে কাউকে তুমি দেখ, তবে বলে দিও: আমি আল্লাহর উদ্দেশে রোযা মানত করছি। সুতরাং আজ আমি কিছুতেই কোন মানুষের সাথে কথা বলব না।” (১৯:১৬–২৬)

فَاَتَتْ بِہٖ قَوْمَهَا تَحْمِلُہٗ ؕ قَالُوْا یٰمَرْیَمُ لَقَدْ جِئْتِ شَیْئًا فَرِیًّا ۝ یٰۤاُخْتَ هٰرُوْنَ مَا كَانَ اَبُوْكِ امْرَ اَ سَوْءٍ وَّ مَا كَانَتْ اُمُّكِ بَغِیًّا ۝ فَاَشَارَتْ اِلَیْهِ ؕ قَالُوْا كَیْفَ نُكَلِّمُ مَنْ كَانَ فِی الْمَہْدِ صَبِیًّا ۝

“অতঃপর তিনি (মারইয়াম) সন্তানকে নিয়ে তার সম্প্রদায়ের কাছে উপস্থিত হলেন। তারা বলল: হে মারইয়াম, তুমি একটি অঘটন ঘটিয়ে বসেছ। হে হারূন-ভগিনী, তোমার পিতা অসৎ ব্যক্তি ছিলেন না এবং তোমার মাতাও ছিল না ব্যভিচারিনী। অতঃপর তিনি হাতে সন্তানের দিকে ইঙ্গিত করলেন। তারা বলল: যে কোলের শিশু তার সাথে আমরা কেমন করে কথা বলব?” (১৯:২৭–২৯)

وَبِكُفْرِهِمْ وَقَوْلِهِمْ عَلٰى مَرْيَمَ بُهْتٰنًا عَظِيْمًا۝

“আর তারা কুফরী করেছিল এবং মরিয়মের প্রতি মহাঅপবাদ আরোপ করার কারণে। (৪:১৫৬)

 

ফেরাউন-পত্নী আছিয়া (আ)

وَ ضَرَبَ اللّٰهُ مَثَلًا لِّلَّذِیْنَ اٰمَنُوا امْرَاَتَ فِرْعَوْنَ ۘ اِذْ قَالَتْ رَبِّ ابْنِ لِیْ عِنْدَكَ بَیْتًا فِی الْجَنَّۃِ وَ نَجِّنِیْ مِنْ فِرْعَوْنَ وَ عَمَلِہٖ وَ نَجِّنِیْ مِنَ الْقَوْمِ الظّٰلِمِیْنَ ۝

“আল্লাহ তা‘আলা মু’মিনদের জন্যে ফেরাউন-পত্নীর দৃষ্টান্ত বর্ণনা করেছেন। সে বলল: হে আমার পালনকর্তা! আপনার সন্নিকটে জান্নাতে আমার জন্যে একটি গৃহ নির্মাণ করুন, আমাকে ফেরাউন ও তার দুষ্কর্ম থেকে উদ্ধার করুন এবং আমাকে যালেম সম্প্রদায় থেকে মুক্তি দিন।” (৬৬:১১)

 

হযরত মূসা (আ)-এর জননী

وَ اَوْحَیْنَاۤ اِلٰۤی اُمِّ مُوْسٰۤی اَنْ اَرْضِعِیْهِ ۚ فَاِذَا خِفْتِ عَلَیْهِ فَاَلْقِیْهِ فِی الْیَمِّ وَ لَا تَخَافِیْ وَ لَا تَحْزَنِیْ ۚ اِنَّا رَآدُّوْهُ اِلَیْكِ وَ جَاعِلُوْهُ مِنَ الْمُرْسَلِیْنَ ۝

“আমি মূসা-জননীকে আদেশ পাঠালাম যে, তাকে স্তন্য দান করতে থাক। অতঃপর যখন তুমি তার সম্পর্কে বিপদের আশংকা কর, তখন তাকে দরিয়ায় নিক্ষেপ কর এবং ভয় করো না, দুঃখও করো না। আমি অবশ্যই তাকে তোমার কাছে ফিরিয়ে দেব এবং তাকে পয়গম্বরগণের একজন করব।” (২৮:৭)

اِذْ اَوْحَیْنَاۤ اِلٰۤی اُمِّكَ مَا یُوْحٰۤی ۝ اَنِ اقْذِفِیْهِ فِی التَّابُوْتِ فَاقْذِفِیْهِ فِی الْیَمِّ فَلْیُلْقِهِ الْیَمُّ بِالسَّاحِلِ یَاْخُذْهُ عَدُوٌّ لِّیْ وَ عَدُوٌّ لَّہٗ ؕ وَ اَلْقَیْتُ عَلَیْكَ مَحَبَّۃً مِّنِّیْ ۬ۚ وَ لِتُصْنَعَ عَلٰی عَیْنِیْ ۝

“যখন আমি তোমার মাতাকে নির্দেশ দিয়েছিলাম যা অতঃপর বর্ণিত হচ্ছে। যে, তুমি (মূসাকে) সিন্দুকে রাখ, অতঃপর তা দরিয়ায় ভাসিয়ে দাও, অতঃপর দরিয়া তাকে তীরে ঠেলে দেবে। তাকে আমার শত্রু ও তার শত্রু উঠিয়ে নেবে। আমি তোমার প্রতি মহব্বত সঞ্চারিত করেছিলাম আমার নিজের পক্ষ থেকে, যাতে তুমি আমার দৃষ্টির সামনে প্রতিপালিত হও।” (২০:৩৮–৩৯)

وَ اَصْبَحَ فُؤَادُ اُمِّ مُوْسٰی فٰرِغًا ؕ اِنْ كَادَتْ لَتُبْدِیْ بِہٖ لَوْ لَاۤ اَنْ رَّبَطْنَا عَلٰی قَلْبِهَا لِتَکُوْنَ مِنَ الْمُؤْمِنِیْنَ ۝ وَ قَالَتْ لِاُخْتِہٖ قُصِّیْهِ ۫ فَبَصُرَتْ بِہٖ عَنْ جُنُبٍ وَّ هُمْ لَا یَشْعُرُوْنَ ۝ وَ حَرَّمْنَا عَلَیْهِ الْمَرَاضِعَ مِنْ قَبْلُ فَقَالَتْ هَلْ اَدُلُّکُمْ عَلٰۤی اَهْلِ بَیْتٍ یَّکْفُلُوْنَہٗ لَکُمْ وَهُمْ لَہٗ نٰصِحُوْنَ۝ فَرَدَدْنٰهُ اِلٰۤی اُمِّہٖ كَیْ تَقَرَّ عَیْنُهَا وَ لَا تَحْزَنَ وَ لِتَعْلَمَ اَنَّ وَعْدَ اللّٰهِ حَقٌّ وَّ لٰكِنَّ اَکْثَرَهُمْ لَا یَعْلَمُوْنَ ۝

“সকালে মূসা জননীর অন্তর অস্থির হয়ে পড়ল। যদি আমি তাঁর হৃদয়কে দৃঢ় করে না দিতাম, তবে তিনি মূসাজনিত অস্থিরতা প্রকাশ করেই দিতেন। দৃঢ় করলাম, যাতে তিনি থাকেন বিশ্ববাসীগণের মধ্যে। তিনি মূসার ভগিণীকে বললেন, তার পেছন পেছন যাও। সে তাদের অজ্ঞাতসারে অপরিচিতা হয়ে তাকে দেখে যেতে লাগল। পূর্ব থেকেই আমি ধাত্রীদেরকে মূসা থেকে বিরত রেখেছিলাম। মূসার ভগিনী বলল, আমি তোমাদেরকে এমন এক পরিবারের কথা বলব কি, যারা তোমাদের জন্যে একে লালন-পালন করবে এবং তারা হবে তার হিতাকাঙ্খী? অতঃপর আমি তাকে জননীর কাছে ফিরিয়ে দিলাম, যাতে তার চক্ষু জুড়ায় এবং তিনি দুঃখ না করেন এবং যাতে তিনি জানেন যে, আল্লাহর ওয়াদা সত্য, কিন্তু অনেক মানুষ তা জানে না।” (২৮:১০–১৩)

 

উম্মুল মু’মিনিন আয়েশা (রা)

সরাসরি নাম উল্লেখ ছাড়া উম্মুল মু’মিনিন আয়েশা (রা) এর ওপর আনীত মিথ্যা অপবাদের বিষয়টি পবিত্র কুরআনের সূরা নূরে আলোচিত হয়েছে। এ সূরায় মিথ্যা অপবাদের মারাত্মক পরিণাম ও কঠোর শাস্তির বিধানও জারী করা হয় যা শাস্তি বিষয়ক অধ্যায়ে উদ্ধৃত হয়েছে।

মা আয়েশা (রা) সম্পর্কিত আয়াতটি নিম্নে পেশ করা হলো:

لَوْ لَاۤ اِذْ سَمِعْتُمُوْهُ ظَنَّ الْمُؤْمِنُوْنَ وَ الْمُؤْمِنٰتُ بِاَنْفُسِهِمْ خَیْرًا ۙ وَّ قَالُوْا هٰذَاۤ اِفْکٌ مُّبِیْنٌ۝ لَوْ لَا جَآءُوْ عَلَیْهِ بِاَرْبَعَۃِ شُهَدَآءَ ۚ فَاِذْ لَمْ یَاْتُوْا بِالشُّهَدَآءِ فَاُولٰٓئِكَ عِنْدَ اللّٰهِ هُمُ الْکٰذِبُوْنَ ۝ وَ لَوْ لَا فَضْلُ اللّٰهِ عَلَیْکُمْ وَ رَحْمَتُہٗ فِی الدُّنْیَا وَ الْاٰخِرَۃِ لَمَسَّکُمْ فِیْ مَاۤ اَفَضْتُمْ فِیْهِ عَذَابٌ عَظِیْمٌ ۝ اِذْ تَلَقَّوْنَہٗ بِاَلْسِنَتِکُمْ وَ تَقُوْلُوْنَ بِاَفْوَاهِکُمْ مَّا لَیْسَ لَکُمْ بِہٖ عِلْمٌ وَّ تَحْسَبُوْنَہٗ هَیِّنًا ٭ۖ وَّ هُوَ عِنْدَ اللّٰهِ عَظِیْمٌ ۝ وَ لَوْ لَاۤ اِذْ سَمِعْتُمُوْهُ قُلْتُمْ مَّا یَکُوْنُ لَنَاۤ اَنْ نَّتَكَلَّمَ بِهٰذَا ٭ۖ سُبْحٰنَكَ هٰذَا بُہْتَانٌ عَظِیْمٌ ۝ یَعِظُکُمُ اللّٰهُ اَنْ تَعُوْدُوْا لِمِثْلِہٖۤ اَبَدًا اِنْ کُنْتُمْ مُّؤْمِنِیْنَ۝

“তোমরা যখন একথা শুনলে, তখন ঈমানদার পুরুষ ও নারীগণ কেন নিজেদের লোক সম্পর্কে উত্তম ধারণা করনি এবং বলনি যে, এটা তো নির্জলা অপবাদ? তারা কেন এ ব্যাপারে চার জন সাক্ষী উপস্থিত করেনি; অতঃপর যখন তারা সাক্ষী উপস্থিত করেনি, তখন তারাই আল্লাহর কাছে মিথ্যাবাদী। যদি ইহকালে ও পরকালে তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ ও দয়া না থাকত, তবে তোমরা যা চর্চা করছিলে, তজ্জন্যে তোমাদেরকে গুরুতর আযাব স্পর্শ করত। যখন তোমরা একে মুখে মুখে ছড়াচ্ছিলে এবং মুখে এমন বিষয় উচ্চারণ করছিলে, যার কোন জ্ঞান তোমাদের ছিল না। তোমরা একে তুচ্ছ মনে করছিলে, অথচ এটা আল্লাহর কাছে গুরুতর ব্যাপার ছিল। তোমরা যখন এ কথা শুনলে তখন কেন বললে না যে, এ বিষয়ে কথা বলা আমাদের উচিত নয়। আল্লাহ তো পবিত্র, মহান। এটা তো এক গুরুতর অপবাদ। আল্লাহ তোমাদেরকে উপদেশ দিচ্ছেন, তোমরা যদি ঈমানদার হও, তবে কখনও পুনরায় এ ধরণের আচরণের পুনরাবৃত্তি করো না।” (২৪:১২–১৭)

 

উম্মুল মু’মিনিন জয়নব (রা)

সূরা আহযাবে উম্মুল মু’মিনিন জয়নব (রা)-এর নাম উল্লেখ ব্যতীত নবী করীম (সা)-এর সাথে তার বিয়ের ব্যাপরটি বর্ণিত হয়েছে।

এ সম্পর্কিত আয়াতটি নিম্নে উদ্ধৃত করা হলো:

وَ اِذْ تَقُوْلُ لِلَّذِیْۤ اَنْعَمَ اللّٰهُ عَلَیْهِ وَ اَنْعَمْتَ عَلَیْهِ اَمْسِکْ عَلَیْكَ زَوْجَكَ وَ اتَّقِ اللّٰهَ وَ تُخْفِیْ فِیْ نَفْسِكَ مَا اللّٰهُ مُبْدِیْهِ وَ تَخْشَی النَّاسَ ۚ وَ اللّٰهُ اَحَقُّ اَنْ تَخْشٰهُ ؕ فَلَمَّا قَضٰی زَیْدٌ مِّنْهَا وَطَرًا زَوَّجْنٰكَهَا لِكَیْ لَا یَکُوْنَ عَلَی الْمُؤْمِنِیْنَ حَرَجٌ فِیْۤ اَزْوَاجِ اَدْعِیَآئِهِمْ اِذَا قَضَوْا مِنْهُنَّ وَطَرًا ؕ وَ كَانَ اَمْرُ اللّٰهِ مَفْعُوْلًا۝

“আল্লাহ যাকে অনুগ্রহ করেছেন; আপনিও যাকে অনুগ্রহ করেছেন; তাকে যখন আপনি বলেছিলেন, তোমার স্ত্রীকে তোমার কাছেই থাকতে দাও এবং আল্লাহকে ভয় কর। আপনি অন্তরে এমন বিষয় গোপন করছিলেন, যা আল্লাহপাক প্রকাশ করে দেবেন আপনি লোকনিন্দার ভয় করেছিলেন অথচ আল্লাহকেই অধিক ভয় করা উচিত। অতঃপর যায়েদ যখন তার স্ত্রীর (জয়নব রা) সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করল, তখন আমি তাকে আপনার সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ করলাম যাতে মু’মিনদের পোষ্যপুত্ররা তাদের স্ত্রীর সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করলে সেসব স্ত্রীকে বিবাহ করার ব্যাপারে মু’মিনদের কোন অসুবিধা না থাকে। আল্লাহর নির্দেশ কার্যে পরিণত হয়েই থাকে।” (৩৩:৩৭)।

 

উম্মুল মু’মিনিন হাফসা (রা)

وَإِذْ أَسَرَّ النَّبِيُّ إِلَىٰ بَعْضِ أَزْوَاجِهِ حَدِيثًا فَلَمَّا نَبَّأَتْ بِهِ وَأَظْهَرَهُ اللَّهُ عَلَيْهِ عَرَّفَ بَعْضَهُ وَأَعْرَضَ عَن بَعْضٍ ۖ فَلَمَّا نَبَّأَهَا بِهِ قَالَتْ مَنْ أَنبَأَكَ هَـٰذَا ۖ قَالَ نَبَّأَنِيَ الْعَلِيمُ الْخَبِيرُ۝ إِن تَتُوبَا إِلَى اللَّهِ فَقَدْ صَغَتْ قُلُوبُكُمَا ۖ وَإِن تَظَاهَرَا عَلَيْهِ فَإِنَّ اللَّهَ هُوَ مَوْلَاهُ وَجِبْرِيلُ وَصَالِحُ الْمُؤْمِنِينَ ۖ وَالْمَلَائِكَةُ بَعْدَ ذَٰلِكَ ظَهِيرٌ۝ عَسَىٰ رَبُّهُ إِن طَلَّقَكُنَّ أَن يُبْدِلَهُ أَزْوَاجًا خَيْرًا مِّنكُنَّ مُسْلِمَاتٍ مُّؤْمِنَاتٍ قَانِتَاتٍ تَائِبَاتٍ عَابِدَاتٍ سَائِحَاتٍ ثَيِّبَاتٍ وَأَبْكَارًا
“যখন নবী তাঁর একজন স্ত্রীর (হাফসা রা) কাছে একটি কথা গোপনে বললেন, অতঃপর স্ত্রী যখন তা (আয়েশা রা –  কে) বলে দিল এবং আল্লাহ নবীকে তা জানিয়ে দিলেন, তখন নবী সে বিষয়ে স্ত্রীকে কিছু বললেন এবং কিছু বললেন না। নবী যখন তা স্ত্রীকে বললেন, তখন স্ত্রী বললেনঃ কে আপনাকে এ সম্পর্কে অবহিত করল? নবী বললেন, যিনি সর্বজ্ঞ, ওয়াকিফহাল, তিনি আমাকে অবহিত করেছেন। তোমাদের অন্তর অন্যায়ের দিকে ঝুঁকে পড়েছে বলে যদি তোমরা উভয়ে তওবা কর, তবে ভাল কথা। আর যদি নবীর বিরুদ্ধে একে অপরকে সাহায্য কর, তবে জেনে রেখ আল্লাহ জিবরাঈল এবং সৎকর্মপরায়ণ মুমিনগণ তাঁর সহায়। উপরন্তুত ফেরেশতাগণও তাঁর সাহায্যকারী। যদি নবী তোমাদের সকলকে পরিত্যাগ করেন, তবে সম্ভবতঃ তাঁর পালনকর্তা তাঁকে পরিবর্তে দিবেন তোমাদের চাইতে উত্তম স্ত্রী, যারা হবে আজ্ঞাবহ, ঈমানদার, নামাযী তওবাকারিণী, এবাদতকারিণী, রোযাদার, অকুমারী ও কুমারী।” (৬৬:৩–৫)

 

 

ইসলামে নারী জাতির সম্মান ও মর্যাদা

নরী ও পুরুষ আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীনের মহান সৃষ্টি। আদিপিতা আদম (আ) এর পৃষ্টদেশ থেকে আদিমাতা হাওয়া (আ) কে তিনি সৃষ্টি করেছেন। সুতরাং তাঁরা উভয়েই এক দেহ ও এক আত্মাসম।  এ ব্যাপারে আল্লাহ্ বলেন,

یٰۤاَیُّهَا النَّاسُ اتَّقُوْا رَبَّکُمُ الَّذِیْ خَلَقَکُمْ مِّنْ نَّفْسٍ وَّاحِدَۃٍ وَخَلَقَ مِنْهَا زَوْجَهَا وَبَثَّ مِنْهُمَا رِجَالًا كَثِیْرًا وَنِسَآءً ۚ وَّاتَّقُوا اللّٰهَ الَّذِیْ تَسَآءَلُوْنَ بِہٖ وَالْاَرْحَامَ ؕ اِنَّ اللّٰهَ كَانَ عَلَیْکُمْ رَقِیْبًا۝

“হে মানব সমাজ! তোমরা তোমাদের পালনকর্তাকে ভয় কর, যিনি তোমাদেরকে এক ব্যক্তিসত্তা থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং যিনি তার থেকে তার সঙ্গীনীকে সৃষ্টি করেছেন; আর বিস্তার করেছেন তাদের দু’জন থেকে অগণিত পুরুষ ও নারী। আর আল্লাহকে ভয় কর, যাঁর নামে তোমরা একে অপরের নিকট যাচঞ্ঝা করে থাক এবং আত্নীয় জ্ঞাতিদের ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন কর। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের ব্যাপারে সচেতন রয়েছেন।” (৪:১)

উপরোক্ত আয়াতে মহান আল্লাহ্ নারী ও পুরুষের পারস্পরিক সম্পর্ককে সমুন্নত রাখার ব্যাপারে গুরুত্ব দিয়ে বলেছেন এ সম্পর্ক রক্ষার ক্ষেত্রে আমরা যেন তাঁকে ভয় করি ও সতর্ক থাকি। ইসলামে নারীর অধিকার, সম্মান ও মর্যাদা রক্ষার ব্যাপারে যে দিক্–নির্দেশনা দিয়েছে তা নিম্নে উল্লেখ করা হলো:

  • প্রাক ইসলামী যুগ যা ‘আইয়্যামে জাহেলিয়াত’ (অন্ধকার যুগ) নামে অভিহিত — সে যুগে নারীদের অবমাননা ছিল চরম পর্যায়ে। তখনকার কুসংস্কারাচ্ছন্ন সমাজ কন্যাশিশুর জন্মকে অপমান ও দুর্ভাগ্যজনক মনে করত এবং তাদেরকে জীবন্ত কবর দিয়ে হত্যা করত। বেশ্যাবৃত্তি, বলপূর্বক বিবাহ ও নির্যাতন নারীর জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছিল। সেই যুগে ইসলাম এসব কুপ্রথা থেকে নারী সমাজকে মুক্ত করে এবং তাদেরকে উচ্চ মর্যাদায় অসীন করে।

  • ইসলামে প্রতিটি মানুষ পবিত্র অবস্থায় জন্মগ্রহণ করে, তাই তাকে জীবনভর সচেষ্ট থাকতে হবে যাতে সে পবিত্রতা বজায় থাকে। নারী ও পুরুষের পবিত্র জীবন যাপনকে ইসলাম সবিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে এবং অবাধ মেলামিশা, নগ্নতা, বেহায়াপনা, অশ্লীল জীবন যাপন  বা বেপর্দা চলাফেরা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে। ইসলামে নারীকে যৌন পণ্য আর তার নগ্নতাকে পণ্যের বিজ্ঞাপন হিসেবে ব্যবহার করা গুরুতর পাপকর্ম। কারণ এসব অপকর্ম নারীর মর্যাদার পরিপন্থী, অবমাননাকর এবং ইসলামের মূল্যবোধ ও নীতি–নৈতিকতা বিরোধী।
  • ইসলাম বিবাহ-বহির্ভূত যৌন কর্ম নিষিদ্ধ করেছে এং বিবাহ বন্ধনকে পবিত্র করেছে, বিবাহে নারীর সম্মতি, মোহরানা ও সম্মানজনক ভরণপোষণকে আবশ্যকীয় করেছে। দাম্পত্য বিরোধ নিরসনে ন্যায়সঙ্গত আপোষ – মীমাংসার তাগিদ দিয়েছে। নেহায়েৎ অপারগতায় বিবাহ – বিচ্ছেদ অনুমোদন করেছে এবং একে একটি বিধি –বিধানের অন্তর্ভুক্ত করেছে যাতে কারো উপর জুলুম না হয়।
  • ইসলামে  স্ত্রী, মাতা, কন্যা ও ভগ্নি হিসেবে নারীর ভূমিকা পারিবারিক পরিবেশে যেমন অপরিসীম তেমনি পরিবারের বাইরেও নারী শালীন পরিবেশে বিভিন্নমুখী কর্মকান্ডে অংশগ্রহণ ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। যদিও সন্তান লালনপালন, তাদের পারিবারিক শিক্ষা ও গৃহস্থালীই নারীর প্রধান কর্মক্ষেত্র, তবে জীবিকার প্রয়োজনে নারী পর্দার সাথে বাইরের আর্থিক কর্মকান্ডে যুক্ত হতে পারে।
  • ইসলাম উত্তরাধিকার সম্পত্তিতে নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠিত করেছে এবং তার অংশ সুনির্দিষ্ট করে দিয়েছে। সে সাথে ইসলাম নারীকে তার অর্জিত সম্পদ নিজ ইচ্ছামাফিক ভোগ করার অধিকার দিয়েছে।
  • ইসলাম নারীকে শিক্ষার অধিকার দিয়েছে। নবী (সা) বলেছেন, ‘পুরুষ ও নারীর জন্য শিক্ষার্জন ফরজ।’
  • মায়ের সম্মান সমুন্নত রাখার ক্ষেত্রে ইসলামের নবী (সা) বলেছেন, ‘মায়ের পদতলে সন্তানের বেহেশত।’ তিনি সন্তানের নিকট পিতার তুলনায় মায়ের মর্যাদাকে তিন গুণ উচ্চে নির্ধারণ করেছেন।
  • ইসলামে নারী ও পুরুষ  একে অপরের পরিচ্ছদ স্বরূপ (২:১৮৭)।

 

এতদ্সম্পর্কিত আয়াতসমূহ নিম্নে পেশ করা হলো:

وَالْمُؤْمِنُوْنَ وَالْمُؤْمِنٰتُ بَعْضُهُمْ اَوْلِیَآءُ بَعْضٍ ۘ یَاْمُرُوْنَ بِالْمَعْرُوْفِ وَیَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَیُقِیْمُوْنَ الصَّلٰوۃَ وَیُؤْتُوْنَ الزَّکٰوۃَ وَیُطِیْعُوْنَ اللّٰهَ وَرَسُوْلَہٗ ؕ اُولٰٓئِكَ سَیَرْحَمُهُمُ اللّٰهُ ؕ اِنَّ اللّٰهَ عَزِیْزٌ حَكِیْمٌ۝

“আর ঈমানদার পুরুষ ও ঈমানদার নারী একে অপরের সহায়ক। তারা ভাল কথার শিক্ষা দেয় এবং মন্দ থেকে বিরত রাখে। নামায প্রতিষ্ঠা করে, যাকাত দেয় এবং আল্লাহ ও তাঁর রসূলের নির্দেশ অনুযায়ী জীবন যাপন করে। এদেরই উপর আল্লাহ তা’আলা দয়া করবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ পরাক্রমশীল, সুকৌশলী।” (৯:৭১)

وَ لَهُنَّ مِثْلُ الَّذِیْ عَلَیْهِنَّ بِالْمَعْرُوْفِ  وَلِلرِّجَالِ عَلَیْهِنَّ دَرَجَۃٌ ؕ وَاللّٰهُ عَزِیْزٌ حَكِیْمٌ۝

“……….. আর পুরুষদের যেমন স্ত্রীদের উপর অধিকার রয়েছে, তেমনি ভাবে স্ত্রীদেরও অধিকার রয়েছে পুরুষদের উপর নিয়ম অনুযায়ী। আর নারীরদের ওপর পুরুষদের শ্রেষ্ঠত্ব রয়েছে। আর আল্লাহ হচ্ছে পরাক্রমশালী, বিজ্ঞ।” (২:২২৮)

مَنْ عَمِلَ صَالِحًا مِّنْ ذَكَرٍ اَوْ اُنْثٰی وَهُوَ مُؤْمِنٌ فَلَنُحْیِیَنَّہٗ حَیٰوۃً طَیِّبَۃً ۚ وَلَنَجْزِیَنَّهُمْ اَجْرَهُمْ بِاَحْسَنِ مَا كَانُوْا یَعْمَلُوْنَ۝

“যে সৎকর্ম সম্পাদন করে এবং সে ঈমাণদার, পুরুষ হোক কিংবা নারী আমি তাকে পবিত্র জীবন দান করব এবং প্রতিদানে তাদেরকে তাদের উত্তম কাজের কারণে প্রাপ্য পুরষ্কার দেব যা তারা করত।” (১৬:৯৭)

یَوْمَ تَرَی الْمُؤْمِنِیْنَ وَالْمُؤْمِنٰتِ یَسْعٰی نُوْرُهُمْ بَیْنَ اَیْدِیْهِمْ وَبِاَیْمَانِهِمْ بُشْرٰىکُمُ الْیَوْمَ جَنّٰتٌ تَجْرِیْ مِنْ تَحْتِهَا الْاَنْهٰرُ خٰلِدِیْنَ فِیْهَا ؕ ذٰلِكَ هُوَ الْفَوْزُ الْعَظِیْمُ ۝

“যেদিন আপনি দেখবেন ঈমানদার পুরুষ ও ঈমানদার নারীদেরকে, তাদের সম্মুখ ভাগে ও ডানপার্শ্বে তাদের জ্যোতি ছুটোছুটি করবে বলা হবেঃ আজ তোমাদের জন্যে সুসংবাদ জান্নাতের, যার তলদেশে নদী প্রবাহিত, তাতে তারা চিরকাল থাকবে। এটাই মহাসাফল্য।” (৫৭:১২)

وَمِنْ اٰیٰتِہٖۤ اَنْ خَلَقَ لَکُمْ مِّنْ اَنْفُسِکُمْ اَزْوَاجًا لِّتَسْکُنُوْۤا اِلَیْهَا وَجَعَلَ بَیْنَکُمْ مَّوَدَّۃً وَرَحْمَۃً ؕ اِنَّ فِیْ ذٰلِكَ لَاٰیٰتٍ لِّقَوْمٍ یَّتَفَكَرُوْنَ ۝

“আর এক নিদর্শন এই যে, তিনি তোমাদের জন্যে তোমাদের মধ্য থেকে তোমাদের সংগিনীদের সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে শান্তিতে থাক এবং তিনি তোমাদের মধ্যে পারস্পরিক সম্প্রীতি ও দয়া সৃষ্টি করেছেন। নিশ্চয় এতে চিন্তাশীল লোকদের জন্যে নিদর্শনাবলী রয়েছে।.” (৩০:২১)

لِلرِّجَالِ نَصِیْبٌ مِّمَّا تَرَكَ الْوَالِدٰنِ وَالْاَقْرَبُوْنَ ۪ وَلِلنِّسَآءِ نَصِیْبٌ مِّمَّا تَرَكَ الْوَالِدٰنِ وَالْاَقْرَبُوْنَ مِمَّا قَلَّ مِنْهُ اَوْ كَثُرَ ؕ نَصِیْبًا مَّفْرُوْضًا ۝

“পিতা-মাতা ও আত্নীয়–স্বজনদের পরিত্যক্ত সম্পত্তিতে পুরুষদেরও অংশ আছে এবং পিতা–মাতা ও আত্নীয়-স্বজনদের পরিত্যক্ত সম্পত্তিতে নারীদেরও অংশ আছে; অল্প হোক কিংবা বেশী। এ অংশ নির্ধারিত।” (৪:৭)

یٰۤاَیُّهَا الَّذِیْنَ اٰمَنُوْا لَا یَحِلُّ لَکُمْ اَنْ تَرِثُوا النِّسَآءَ كَرْہًا ؕ وَّلَا تَعْضُلُوْهُنَّ لِتَذْهَبُوْا بِبَعْضِ مَاۤ اٰتَیْتُمُوْهُنَّ اِلَّاۤ اَنْ یَّاْتِیْنَ بِفَاحِشَۃٍ مُّبَیِّنَۃٍ ۚ وَعَاشِرُوْهُنَّ بِالْمَعْرُوْفِ ۚ فَاِنْ كَرِهْتُمُوْهُنَّ فَعَسٰۤی اَنْ تَکْرَهُوْا شَیْئًا وَیَجْعَلَ اللّٰهُ فِیْهِ خَیْرًا كَثِیْرًا ۝ وَّاِنْ اَرَدْتُّمُ اسْتِبْدَالَ زَوْجٍ مَّكَانَ زَوْجٍ ۙ وَّاٰتَیْتُمْ اِحْدٰهُنَّ قِنْطَارًا فَلَا تَاْخُذُوْا مِنْهُ شَیْئًا ؕ اَتَاْخُذُوْنَہٗ بُہْتَانًا وَّ اِثْمًا مُّبِیْنًا ۝ وَكَیْفَ تَاْخُذُوْنَہٗ وَقَدْ اَفْضٰی بَعْضُکُمْ اِلٰی بَعْضٍ وَّاَخَذْنَ مِنْکُمْ مِّیْثَاقًا غَلِیْظًا ۝

“হে ঈমাণদারগণ! বলপূর্বক নারীদেরকে উত্তরাধিকারে গ্রহন করা তোমাদের জন্যে হালাল নয় এবং তাদেরকে আটক রেখো না যাতে তোমরা তাদেরকে যা প্রদান করেছ তার কিয়দংশ নিয়ে নাও; কিন্তু তারা যদি কোন প্রকাশ্য অশ্লীলতা করে! নারীদের সাথে সদ্ভাবে জীবন-যাপন কর। অতঃপর যদি তাদেরকে অপছন্দ কর, তবে হয়ত তোমরা এমন এক জিনিসকে অপছন্দ করছ, যাতে আল্লাহ, অনেক কল্যাণ রেখেছেন। যদি তোমরা এক স্ত্রীর স্থলে অন্য স্ত্রী পরিবর্তন করতে ইচ্ছা কর এবং তাদের একজনকে প্রচুর ধন–সম্পদ প্রদান করে থাক, তবে তা থেকে কিছুই ফেরত গ্রহণ করো না। তোমরা কি তা অন্যায়ভাবে ও প্রকাশ্য গোনাহর মাধ্যমে গ্রহণ করবে? তোমরা কিরূপে তা গ্রহণ করতে পার, অথচ তোমাদের একজন অন্য জনের কাছে গমন এবং নারীরা তোমাদের কাছে থেকে সুদৃঢ় অঙ্গীকার গ্রহণ করেছে?” (৪:১৯–২১)

وَلَا تَتَمَنَّوْا مَا فَضَّلَ اللّٰهُ بِہٖ بَعْضَکُمْ عَلٰی بَعْضٍ ؕ لِّلرِّجَالِ نَصِیْبٌ مِّمَّا اکْتَسَبُوْا ؕ وَلِلنِّسَآءِ نَصِیْبٌ مِّمَّا اکْتَسَبْنَ ؕ وَسْئَلُوا اللّٰهَ مِنْ فَضْلِہٖ ؕ اِنَّ اللّٰهَ كَانَ بِکُلِّ شَیْءٍ عَلِیْمًا ۝

“আর তোমরা আকাঙ্ক্ষা করো না এমন সব বিষয়ে যাতে আল্লাহ তা’আলা তোমাদের একের উপর অপরের শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন। পুরুষ যা অর্জন করে সেটা তার অংশ এবং নারী যা অর্জন করে সেটা তার অংশ। আর আল্লাহর কাছে তাঁর অনুগ্রহ প্রার্থনা কর। নিঃসন্দেহে আল্লাহ তা’আলা সর্ব বিষয়ে জ্ঞাত।” (৪:৩২)

وَمَن يَعْمَلْ مِنَ الصَّالِحَاتِ مِن ذَكَرٍ أَوْ أُنثَىٰ وَهُوَ مُؤْمِنٌ فَأُولَـٰئِكَ يَدْخُلُونَ الْجَنَّةَ وَلَا يُظْلَمُونَ نَقِيرًا
“যে লোক পুরুষ হোক কিংবা নারী, কোন সৎকর্ম করে এবং বিশ্বাসী হয়, তবে তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং তাদের প্রাপ্য তিল পরিমাণ ও নষ্ট হবে না।” (৪:১২৪)

[নারী অধিকার সম্পর্কিত আরও আয়াত – অধ্যায় নং: ২৬ এ উল্লেখিত হয়েছে]

ইসলামের বিরুদ্ধে অপপ্রচার

ইসলাম ধর্মের সূচনা লগ্ন থেকেই বিরুদ্ধবাদীরা ইসলামের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালিয়ে আসছে। ইদানীংকালে এ অপপ্রচার নতুন এক রূপ ধারন করেছে। শীতল যুদ্ধের পরবর্তী রণউন্মাদনার এ এক নতুন সংস্করণ। বিগত শতকে দুটি গরম বিশ্বযুদ্ধ সংঘটিত হওয়ার পর ‘কম্যুনিজম-ভীতিকে’ কেন্দ্র করে পশ্চিমা বিশ্বে যে শীতল যুদ্ধের সূচনা হয়েছিল, সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর নব্বইয়ের দশকে তার অবসান ঘটে। আর তখনই পাশ্চাত্যে জন্ম নেয় ‘ইসলামোফোবিয়া’ বা  ‘ইসলাম-ভীতি’ নামক এক নব্য জুজুর। ইসলামোফোবিয়া নামক এ ধারণাটি প্রথম প্রকাশ পায় ১৯৯১ খৃষ্টাব্দে বৃটেনের ‘রানিমেড ট্রাস্ট প্রতিবেদনে’। এ প্রতিবেদনে একে “মুসলিম জনগোষ্ঠরি প্রতি ভিত্তিহীন বৈরিতা, এবং এ কারণে ভীতি অথবা সকল বা অধিকাংশ মুসলমানের প্রতি বিরূপ মনোভাব” বলে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। এর পরিণতিতে পাশ্চাত্য সমাজে মুসলিম সম্প্রদায়কে বর্জন (exclusion)  ও বৈষম্যের (discrimination) সম্মুখীন হতে হচ্ছে। প্রতিবেদনটির বর্ণনা অনুযায়ী বৃটেন এবং ইউরোপের দেশগুলোতে মুসলিম জনগণের প্রতি সাধারণভাবে যেসব বিরূপ মানসিকতা পোষণ করা হয় তা হলো: ইসলাম একটি অনড় একত্ববাদী ধর্ম যা নতুন কোন বাস্তবতার সাথে মিশে না; সর্বজনীন মূল্যবোধগুলোকে অন্য ধর্মবিশ্বাসের সাথে ভাগাভাগি (share) করে না; ইসলাম ধর্ম হিসেবে পাশ্চাত্যের নিকট নিম্ন মানের, সেকেলে, বর্বর এবং অমূলদ; ইসলাম সহিংস ধর্ম ও জঙ্গীবাদের সমর্থক, এবং এটি একটি উগ্রবাদী আদর্শ।

‘ইসলামোফোবিয়ার’ একটি কার্যকর সংজ্ঞা দিতে গিয়ে ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণা পত্রে বলা হয়েছে যে:

(Islamophobia is a contrived fear or prejudice fomented by the existing Eurocentric and Orientalist global power structure.  It is directed at a perceived or real Muslim threat through the maintenance and extension of existing disparities in economic, political, social and cultural relations, while rationalizing the necessity to deploy violence as a tool to achieve “civilizational rehab” of the target communities (Muslim or otherwise).  Islamophobia reintroduces and reaffirms a global racial structure through which resource distribution disparities are maintained and extended. – Islamophobia Research & Documentation Project: DEFINING “ISLAMOPHOBIA”, Published by University of California, or else Berkely: Center for Race & Gender) | অর্থাৎ “এটি একটি বানোয়াট ভীতি বা কুসংস্কার যা অধুনা ইউরোপীয় সভ্যতা ও সংস্কৃতির আত্মম্ভরিতা-প্রসূত ধারণা এবং প্রাচ্যদেশীয় বৈশ্বিক ক্ষমতা কাঠামো দ্বারা উদ্দীপিত। বর্তমান অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বৈষম্যের ধারা বজায় থাকা ও এর বিস্তার ঘটা এটাকে একটি ধারণাপ্রসূত অথবা বাস্তব মুসলিম হুমকির দিকে পরিচালিত করছে। পক্ষান্তরে, তা মুসলমান অথবা অন্য কারোর জন্য “সভ্যতায় পুনর্বাসন” লাভের হাতিয়ার হিসেবে শক্তি প্রয়োগের প্রয়োজনীয়তাকে যৌক্তিক করে তোলেছে। ইসলামোফোবিয়া একটি বৈশ্বিক জাতিগত কাঠামোকে পুনস্থাপিত ও পুনর্ব্যক্ত করেছে যার মাধ্যমে সম্পদের বৈষম্যমূলক বন্টন বজায় থাকছে ও বিস্তৃত হচ্ছে।”

আমেরিকায় সেপ্টেম্বর ১১, ২০০১ এর সন্ত্রাসী হামলাকে কেন্দ্র করে পাশ্চাত্যে মুসলিম বিরোধী তৎপরতা বেশ বেড়ে যায়। ‘আলকায়দা’ নামে একটি জঙ্গীগোষ্ঠীকে এসব হামলার হোতা বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। আর এ জঙ্গীগোষ্ঠীর যারা নায়ক তারা স্বয়ং আমেরিকারই তৈরী। আফগানিস্তানে সোভিয়েত আগ্রাসনের বিরুদ্ধে জিহাদ পরিচালনার স্বার্থে আমেরিকার মদদে বিভিন্ন দেশের মুসলমানদেরকে নিয়ে গঠিত হয়েছিল একটি মুজাহিদ বাহিনী। আফগানিস্তান থেকে সোভিয়েত বাহিনী পশ্চাদপসরণ করলে এ মুজাহিদ বাহিনীটি নিজেদেরকে ইসলামের ‘চ্যাম্পয়িান’ এবং নিপীড়িত মুসলিম সম্প্রদায়ের ‘ত্রাতা’ হিসেবে ভাবতে শুরু করে। তারা তখন আফগানিস্তানেই তাদের আস্তানা গেড়ে বসে। পাশ্চাত্যের মদদে সৃষ্ট ইহুদী রাষ্ট্র ‘ইসরাইল’ প্যালষ্টোইনী মুসলমানদের ওপর অব্যাহিতভাবে যে অমানুষিক অত্যাচার, উৎপীড়ন ও নিপীড়ন চালিয়ে যাচ্ছে তারই প্রতবিাদে এ জঙ্গীগোষ্ঠীটি সন্ত্রাসী হামলায় লিপ্ত হয়। এসব হামলার সাথে ইসলাম ধর্ম বা মুসলিম রাষ্ট্রের কোন সম্পর্ক নেই। এমনকি এ জঙ্গীগোষ্ঠীর নেতা ওসামা বিন লাদেন কোন ধর্মীয় পন্ডিতও ছিল না। পশ্চিমাদের মদদপুষ্ট ভূঁইফোঁড় ইসরায়েল রাষ্ট্রটিকে মধ্যপ্রাচ্যে তাদের ‘লাঠিয়ালের’ ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। এটিকে গোপনে সভ্যতা বিধ্বংসী পারমানবিক বোমার অধিকারী বানিয়ে দেওয়া হয়েছে। অথচ মুসলিম রাষ্ট্র ইরানের শান্তিপূর্ণ পারমানবিক কর্মসূচী নিয়ে তারা সারা বিশ্বে হৈচৈ ফেলে দিয়েছে। ইরানের ওপর অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করেছে এবং তাকে হুমকি-ধামকি দিচ্ছে। তাদের এ দ্বিমুখী নীতি যেমন মুসলিম সমাজকে উৎকন্ঠিত করছে, তেমনই কিছু সংখ্যক বিভ্রান্ত জঙ্গীগোষ্ঠীর উত্থান ঘটিয়েছে। বিশ্ব শান্তির স্বার্থে পরাশক্তিসহ সকল দেশেরই উচিত মানবসভ্যতা বিধ্বংসী সকল পারমানবিক কর্মসূচী বন্ধ করা এবং সকল সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের মূলোৎপাটন করা।

বিশ্ব জুড়ে কে বা কারা সহিংসতার হোতা তা সবাই জানে। শান্তির ভেক্ধারী পাশ্চাত্যের পরাশক্তি এশিয়া, অফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকার দেশে দেশে বিভিন্ন অজুহাতে সহিংস আক্রমণ চালাচ্ছে। পশ্চিমা বিশ্বের একটি ইহুদীখৃষ্টান স্বার্থান্বেষী মহল ইসলামকে একটি জঙ্গীবাদী ধর্ম হিসেবে চিহ্নিত করে তার ভাবমূর্তি বিনষ্ট করার অপপ্রয়াস চালাচ্ছে। অথচ ইসলাম সম্পর্কে জঙ্গীবাদী ধারণা পোষণ করার পূর্বে পাশ্চাত্য সমাজের নিজের চেহারার দিকে একটু নজর দেওয়া প্রয়োজন ছিল। তাদের মারণাস্ত্রের আঘাতে প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে কত কোটি মানুষ নিহত হয়েছে ইতিহাসের পাতায় তা লিপিবদ্ধ আছে। জার্মানীতে তো প্রায় পুরো ইহুদী জাতিগোষ্ঠীকে গ্যাস চেম্বারে পুড়ে মারা হয়েছে, যার সংখ্যা প্রায় ষাট লাখ। জাপানে আমেরিকান আণবিক বোমার আঘাতে লক্ষ লক্ষ মানুষকে ভীবৎসভাবে হত্যা করা হয়েছে। ভিয়েৎনামেও তাদের নাপাম বোমার আঘাতে হাজারো মানুষের মৃত্যু ঘটেছে। ইরাক, আফগানিস্তান ও ইয়েমেনে পাশ্চাত্যের বিধ্বংসী মারণাস্ত্রের শিকার হয়েছে লক্ষ লক্ষ মানুষ। সম্প্রতি ঠুনকো ও বানোয়াট সব অভিযোগে ইরাক, আফগানিস্তান, সিরিয়া, লিবিয়া ও ইয়েমেনে পাশ্চাত্যের বিধ্বংসী আগ্রাসন এসবের প্রকৃষ্ট প্রমাণ।

জার্মানীতে ইহুদী হত্যাযজ্ঞের (holocaust) পর ইউরোপ ও অন্যান্য দেশের ইহুদীদেরকে পুনর্বাসনের জন্য পাশ্চাত্য শক্তি জাতিসংঘের মাধ্যমে ১৯৪৮ খৃষ্টাব্দে প্যালেষ্টাইনে ‘ইসরাইল’ নামে একটি জায়োনিস্ট রাষ্ট্রের উদ্ভব ঘটায়। ইসরাইলে ইহুদীরা পুনর্বাসিত হলেও সেখানকার মুসলিম জনগোষ্টীকে অন্যায়ভাবে তাদের পিতৃপুরুষের ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ করে উদ্বাস্তু বানিয়ে ফেলা হয়, তারা নিজ জন্মভূমিতে পরবাসীতে পরিণত হয়। পাশ্চাত্যের শতভাগ মদদে এ ইহুদী ইসরাইল রাষ্ট্রটি ফিলিস্তানী মুসলিম জনগোষ্ঠীকে সম্পূর্ণভাবে নির্মূল করার জন্য সব ধরনের নির্যাতন ও হত্যাযজ্ঞের পথ বেছে নেয়। হীনবল প্যালেষ্টাইনী মুসলিম জনগণ কোন ধরনের প্রতিকার না পেয়ে নিজেদের অধিকার পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টায় ‘ইনতেফাদা’ তীব্র আন্দোলনের সূচনা করে। সেই থেকে মধ্যপ্রাচ্যে অশান্তির আগুন জ্বলে ওঠে। এ স্বাধিকার আন্দোলনকে বিকৃত করার জন্য পাশ্চাত্য শক্তি একে ‘সন্ত্রাসী’ আন্দোলন আখ্যা দিয়ে এর বিরুদ্ধে মিথ্যা অপপ্রচার শুরু করে। মধ্যপ্রাচ্যের অধিকারহারা জনগোষ্ঠীর মধ্যে ক্ষোভ ও বঞ্ছনার দানা ক্রমে জমাট বাঁধতে থাকে। এরই বহিঃপ্রকাশ হিসেবে পশ্চাত্যের বিভিন্ন দেশে সহিংস তৎপরতা শুরু হয়। অন্য সম্প্রদায়কে অশান্তি ও নির্যাতনের মধ্যে ফেললে নিজেদের গায়ে তো এর সামান্য হলেও আঁচ লাগতে পারে। এটাই স্বাভাবিক এবং সত্য। কারণ “প্রতিটি ক্রিয়ারই একটি সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া আছে” – বিজ্ঞানী নিউটনের এ তত্ত্ব তো সবারই জানা। এ ছাড়াও মধ্যপ্রাচ্যের তেল সম্পদের ওপর আধিপত্য বজায় রাখার জন্য পশ্চিমা শক্তি যে ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তার করেছে, সে কারণেও সেখানকার জনগণের মধ্যে পাশ্চাত্যবিরোধী মনোভাব তীব্রতর হচ্ছে।

সাম্রাজ্যবাদী ও উপনিবেশবাদী শাসন ও শোষণের পর পশ্চিমা শক্তি এবার বিশ্ব ব্যাপী তাদের নব্যউপনিবেশবাদী অর্থনৈতিক আধিপত্য বজায় রাখার নীলনকশা বাস্তবায়ন করছে। তাদের পুঁজিবাদী অর্থনীতিকে শোষণের হাতিয়ার বানিয়ে আর্থসামাজিক বৈষম্যের সৃষ্টি করে চলেছে। আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা অক্সফাম সম্পদের অসম বন্টন নিয়ে তাদের গবেষণা পত্রে বলেছে, ‘বিশ্বে যত সম্পদ আছে তার প্রায় অর্ধেক সম্পদ এখন ধনকুবের ১ শতাংশ মানুষের হাতে। বাকি অর্ধেক ৯৯ শতাংশ লোকের হাতে।’ আর পশ্চিমা বিশ্বের ধনকুবেরদের হাতেই এ সম্পদের পাহাড় গড়ে ওঠেছে। বিধ্বংসী মারণস্ত্রের ব্যবসায়ীরাই এসব ধনকুবেরদের অন্তর্ভূক্ত। এরাই তাদের কায়েমী স্বার্থে বিভিন্ন জুজুর ভয় দেখিয়ে, বিশ্ব শান্তিকে অস্থিতিশীল রেখে ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করছে। পশ্চিমা পুঁজিবাদী অর্থনীতি ও ভোগবাদী জীবন ব্যবস্থা মানুষের মানবিক ও নৈতিক মূল্যবোধে ধস নামিয়ে দিয়েছে। যেনতেন প্রকারে সম্পদ কুক্ষিগত করার প্রতিযোগিতায় গুটি কয়েক লোক বিপুল বিত্ত-বৈভবের মালিক হচ্ছে, অপরদিকে বেশীর ভাগ মানুষই পিছিয়ে পড়ছে। যারা পিছিয়ে পড়ছে তারা হতাশায় নিমজ্জিত হচ্ছে। অর্থ-বিত্তের নেশায় মানুষ তার মানবিক গুণাবলী হারিয়ে পশুসুলভ মনোবৃত্তিকে জাগিয়ে তোলছে। ফলে বিশ্ব জুড়ে সামাজিক টানাপোড়েন ও অশান্তির বিস্তার ঘটছে।

নাইনএলিভেনের ঘটনার পর ‘বুশ-ব্লেয়ারের’ মিথ্যাচারে সমগ্র ইরাক, আফগানিস্তান ও পাকিস্তানসহ মধ্যপ্রাচ্যের লাখো মানুষ জ্বলে-পুুড়ে মরছে। বুশের মুখ ফসকে তো ‘Crusade’ এর রণহুংকার বেরিয়ে পড়েছিল, যে Crusade বা ধর্মযুদ্ধের ডাকে হাজার বছর পূর্বে ইউরোপীয় খৃষ্টান দেশগুলো সম্মিলিতভাবে ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধাভিযান পরিচালনা করেছিল। Crusade  এর নামে মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম অধ্যুসিত অঞ্চলে বার বার সশস্ত্র হামলা চালিয়ে ইসলাম ও মুসলমানদেরকে পৃথিবীর বুক থেকে নিশ্চিহ্ন করার ব্যর্থ প্রচেষ্টা চালানো হয়েছিল। পশ্চিমাবিশ্ব, বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একচোখা নীতির কারণে মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার মুসলিম দেশগুলোতে ক্রমবর্ধমান অস্থিতিশীলতা ও জঙ্গিবাদের উত্থান প্রকট হয়ে উঠেছে। সিরিয়া, লিবিয়া, পাকিস্তান, আফগানিস্তান ও নাইজেরিয়ায় আল-কায়েদা, আইএস, তালেবান, বোকো হারাম প্রভৃতি উগ্রপন্থী জঙ্গীগোষ্ঠীর উত্থানের পেছনে সরাসরি মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা ও পেন্টাগনের আনুকূল্য এবং মোসাদের ভূমিকাই মুখ্য বলে গণ্য করা হয়। নিজেদের এসব অপকর্ম ঢাকার জন্য মুসলমানদের গায়ে জঙ্গীবাদের লেবেল এঁটে দিয়ে তাদেরকে বলির পাঁঠা বানানো হচ্ছে। তথাকথিত ইসলামী জঙ্গী দমনের নামে পরাশক্তিধরদের নেতৃত্বে বহুজাতিক বাহিনী তৈরী করা হয়েছে। তাদের বর্বরোচিত হামলায় মধ্যপ্রাচ্যের দেশে দেশে বহু সমৃদ্ধ নগর ও জনপদ বিরানভূমিতে পরিণত হচ্ছে। সম্প্রতি প্যালেস্টাইনের গাযাভূমিতে আমেরিকা সমর্থিত ইসরাইলের গণহত্যা  চালিয়ে যাওয়া এর এক প্রকৃষ্ট উদাহরণ।

অধ্যায়সমূহ