এ অধ্যায়ের বিষয়সমূহ
Toggleহযরত ইব্রাহীম (আঃ) কর্তৃক মক্কা নগরীর প্রতিষ্ঠা ও আবাদ
ঐতিহাসিকভাবে পবিত্র মক্কা নগরীর প্রতিষ্ঠাতা ও আবাদকারী ছিলেন মুসলিম উম্মাহর পিতা হযরত ইব্রাহীম (আঃ) এবং তাঁর পুত্র হযরত ইসমাঈল (আঃ)। কথিত আছে যে, পৃথিবীর আদিতম উপাসনাগৃহের অবস্থান ছিল পবিত্র মক্কা নগরীতে। নবী হযরত নূহ (আঃ) এর সময়কালীন মহাপ্লাবনে এ নগরী ও কা’বাগৃহটি সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়ে যায় এবং এ অঞ্চলটি একটি জনমানবহীন বিরান ভূমিতে পরিণত হয়। তাই আল্লাহ্ রব্বুল আলামীন ইচ্ছা করলেন তিনি এ মক্কা নগরীকে পুনর্বাসিত এবং কা’বাগৃহটিকে পুনর্নির্মাণ করাবেন। এতদুদ্দেশ্যে মহান আল্লাহর নির্দেশে হযরত ইব্রাহীম (আঃ) তাঁর স্ত্রী হাজেরা (আঃ) ও শিশু পুত্র হযরত ইসমাঈলকে (আঃ) তৎকালীন জনমানবহীন ঊষর ও পর্বতসঙ্কুল মক্কায় নির্বাসিত করেন। প্রিয় স্ত্রী ও প্রিয়তম শিশু সন্তানকে নির্বাসনে পাঠানোর এ ঈমানী পরীক্ষায় তিনি ছিলেন অত্যন্ত ধৈর্যশীল। মহান আল্লাহর সুদূর প্রসারী পরিকল্পনা ও নির্দেশে হযরত ইব্রাহীম (আঃ) ঊষর মরুভূমি মক্কার জনমানবশূণ্য ও বৃক্ষলতাহীন পাহাড়ি উপত্যকায় যখন তাঁর প্রাণপ্রিয় স্ত্রী হাজেরা ও পুত্র ইসমাঈলকে নির্বাসন দিলেন তখন তিনি কাতর কণ্ঠে প্রার্থন করলেন:
رَبَّنَاۤ اِنِّیْۤ اَسْكَنْتُ مِنْ ذُرِّیَّتِیْ بِوَادٍ غَیْرِ ذِیْ زَرْعٍ عِنْدَ بَیْتِكَ الْمُحَرَّمِ ۙ رَبَّنَا لِیُـقِیْمُوا الصَّلٰوۃَ فَاجْعَلْ اَفْئِدَۃً مِّنَ النَّاسِ تَہْوِیْۤ اِلَیْهِمْ وَارْ زُقْهُمْ مِّنَ الثَّمَرٰتِ لَعَلَّهُمْ یَشْکُرُوْنَ
“হে আমাদের পালনকর্তা, আমি নিজের এক সন্তানকে তোমার পবিত্র গৃহের সন্নিকটে চাষাবাদহীন উপত্যকায় আবাদ করেছি; হে আমাদের পালনকর্তা, যাতে তারা নামায কায়েম রাখে। অতঃপর আপনি কিছু লোকের অন্তরকে তাদের প্রতি আকৃষ্ট করুন এবং তাদেরকে ফলাদি দ্বারা রুযী দান করুন, সম্ভবতঃ তারা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে।” (১৪:৩৭)
মহান আল্লাহ্ তাঁর উপরোক্ত প্রার্থনা কবুল করলেন এবং এই জায়গায় পবিত্র ’জমজম’ কূপ সৃষ্টির মাধ্যমে পবিত্র পানির ফল্গুধারা উৎসারিত করে দিলেন। এরপর থেকেই সেখানে গড়ে ওঠে এক বিশাল জনপদ।
প্রায় চার হাজার বছর পূর্বের কথা। হযরত ইব্রাহীম (আঃ) ও হযরত ইসমাঈল (আঃ) কর্তৃক মক্কা আবাদ হওয়ার পর হযরত ইসমাঈল (আঃ) সেখানেই স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। এরপর ‘জোরহাম’ নামে আরবের এক গোত্র এখানে এসে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে। হযরত ইসমাঈল (আঃ) এ গোত্রে দু’টি বিবাহ করেন। পিতৃ-আদেশে তিনি প্রথম স্ত্রীকে তালাক দেন এবং পরবর্তীতে দ্বিতীয় বিয়ে করেন। তাঁর এ স্ত্রীর পিতার নাম ছিল মুয়ায ইবনে আমর। দ্বিতীয় স্ত্রীর গর্ভে তাঁর বারোটি সন্তান জন্মগ্রহণ করে। মক্কা নগরী তখন থেকে একটি সমৃদ্ধ জনপদ হিসেবে গড়ে উঠতে থাকে। হযরত ইসমাঈল (আঃ) এর মৃত্যুর পর এ নগরীর কর্তৃত্ব জোরহাম গোত্রের হাতে ন্যস্ত হয়।
হযরত ইব্রাহীম (আঃ) মক্কায় গড়ে উঠা জনপদটিকে একটি শান্তির আবাসভূমি হিসেবে পরিণত করার জন্য আল্লাহ্ রব্বুল আলামীনের নিকট দোয়া করলেন:
وَإِذْ قَالَ إِبْرَاهِيمُ رَبِّ اجْعَلْ هَـٰذَا بَلَدًا آمِنًا وَارْزُقْ أَهْلَهُ مِنَ الثَّمَرَاتِ مَنْ آمَنَ مِنْهُم بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ ۖ قَالَ وَمَن كَفَرَ فَأُمَتِّعُهُ قَلِيلًا ثُمَّ أَضْطَرُّهُ إِلَىٰ عَذَابِ النَّارِ ۖ وَبِئْسَ الْمَصِيرُ“যখন ইব্রাহীম বললেন, পরওয়ারদেগার! এ স্থানকে তুমি শান্তিধান কর এবং এর অধিবাসীদের মধ্যে যারা অল্লাহ ও কিয়ামতে বিশ্বাস করে, তাদেরকে ফলের দ্বারা রিযিক দান কর। (আল্লাহ্) বললেন: যারা অবিশ্বাস করে, আমি তাদেরও কিছুদিন ফায়দা ভোগ করার সুযোগ দেব, অতঃপর তাদেরকে বলপ্রয়োগে দোযখের আযাবে ঠেলে দেবো; সেটা নিকৃষ্ট বাসস্থান।” (২:১২৬)
তিনি মহান আল্লাহর দরবারে আরও দোয়া করে বললেন:
وَإِذْ قَالَ إِبْرَاهِيمُ رَبِّ اجْعَلْ هَـٰذَا الْبَلَدَ آمِنًا وَاجْنُبْنِي وَبَنِيَّ أَن نَّعْبُدَ الْأَصْنَامَ
“হে পালনকর্তা, এ শহরকে শান্তিময় করে দিন এবং আমাকে ও আমার সন্তান—সন্ততিকে মূর্তিপূজা থেকে দূরে রাখুন (১৪:৩৫)।”
“জমজম” কূপের উৎপত্তি
হযরত ইব্রাহীম (আঃ) স্ত্রী–পুত্রকে নির্বাসনকালে স্ত্রীর কাছে খাদ্য ও পানীয়ের যে মজুদ রেখে এসেছিলেন তা নিঃশেষ হয়ে গেলে তাঁরা ভীষণ কষ্টে পড়েন। ঠিক তখনই মহান আল্লাহর অশেষ রহমতে মক্কার ঊষর ভূমিতে একটি অলৌকিক পানীয় কূপের উদ্ভব ঘটে। কথিত আছে যে, পানির অভাবে নির্বাসিত পুত্র ইসমাঈল (আঃ) পিপাসায় কাতর হয়ে পড়লে মাতা হাজেরা (আঃ) পানির সন্ধানে এদিক–ওদিক ছুটাছুটি করছিলেন। কিন্তু কোথাও পানি দেখতে পেলেন না। অবশেষে সাফা ও মারওয়া পাহাড়ের উপত্যকায় দৌড়াদৌড়ির এক পর্যায়ে যখন নিরাশ হয়ে পড়েছিলেন ঠিক তখনই মহান আল্লাহর অশেষ রহমতে মক্কার ঊষর ভূমিতে কান্নারত শিশু ইসমাঈল (আঃ)-এর পায়ের নীচে অলৌকিকভাবে “জমজম” নামীয় একটি পানির কূপের উদ্ভব ঘটে। বিবি হাজেরা (আঃ) পানির সন্ধানে সাফা–মারওয়া উপত্যকা সাতবার প্রদক্ষিণ করেছিলেন। তাঁর স্মৃতি বিজড়িত এ ঘটনাটিকে স্মরণীয় করে রাখতে এবং এর সম্মানার্থে এখনও হজ্জ্ব ও ওমরাহ্ পালনকারীগণ সাতবার সাফা–মারওয়া উপত্যকা প্রদক্ষিণ করে থাকেন। এ কূপের পানি পৃথিবীর বিশুদ্ধতম পানীয়। এরপর থেকে এ বরকতময় কূপকে কেন্দ্র করে এতদ্অঞ্চলে মানব বসতি গড়ে উঠতে থাকে। মক্কা একটি অনুর্বর মরুভূমি হলেও হযরত ইব্রাহীম (আঃ) এর দোয়ার বরকতে এ জনবসতির মানুষের খাদ্য ও পানীয়ের চাহিদা পূরণ হয়। বিভিন্ন অঞ্চল থেকে এখানে প্রচুর ফল–ফলাদির সরবরাহ শুরু হয় ও ব্যবসা–বাণিজ্যের প্রসার ঘটে।
মক্কার নামকরণ
বিশ্ব মুসলিমের ঐক্যের কেন্দ্রবিন্দু ও ইবাদতের কেন্দ্রস্থল মক্কা নগরী পবিত্র কুরআনে বিভিন্ন নামে অভিহিত হয়েছে। যেমন: মক্কা – যার অর্থ উৎপাটন করা/নিবারণ করা। এ নগরীকে মক্কা নামে অভিহিত করার কারণ হলো এ স্থান থেকে সব ধরনের পাপ নিবারণ করা। এর অন্য একটি কারণ হলো, যারা এখানে জুলুমে লিপ্ত হয় তাদেরকে উৎপাটন বা নির্মূল করা। মহান আল্লাহ্ বলেন,
وَهُوَ الَّذِي كَفَّ أَيْدِيَهُمْ عَنكُمْ وَأَيْدِيَكُمْ عَنْهُم بِبَطْنِ مَكَّةَ مِن بَعْدِ أَنْ أَظْفَرَكُمْ عَلَيْهِمْ ۚ وَكَانَ اللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ بَصِيرًا
”তিনি মক্কা শহরে তাদের হাত তোমাদের থেকে এবং তোমাদের হাত তাদের থেকে নিবারিত করেছেন তাদের উপর তোমাদেরকে বিজয়ী করার পর। তোমরা যা কিছু কর, আল্লাহ তা দেখেন।” (৪৮:২৪)
মক্কার অপর নাম – “বাক্কা” যা প্রায় সমার্থক। এর অর্থ হলো সমূলে উৎপাটন করা অর্থাৎ অহংকারী ও দাম্ভিকদের মূলোচ্ছেদ। অপর একটি নাম হলো – ”উম্মুল কুরা” অর্থাৎ নগরসমূহের মাতা। (৬:৯২)। মক্কা শহরটি “বালাদিল আমীন” নামেও অভিহিত হয়েছে – যার অর্থ হলো শান্তির শহর। (৯৫:৩ ও ১৪:৩৫)। এ ছাড়া এই শহরের আরেকটি নাম হলো: “হারামান আমীন” বা নিরাপদ আশ্রয়স্থল। (২৮:৫৭)। আর মক্কায় অবস্থিত পৃথিবীর এ আদিতম এ উপাসনাগৃহটি “কা’বা”, “বাইতুল আতীক্ক”, “বাইতুল্লাহ” ও “মসজিদুল হারাম” নামে সর্বত্র সুপরিচিত।
হযরত ইব্রাহীম (আঃ) কর্তৃক পবিত্র কা’বা গৃহের পুনর্নির্মাণ
সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর পূর্বপুরুষ নবী হযরত ইব্রাহীম (আঃ) ছিলেন তৌহিদ বা একত্ববাদের প্রবক্তা এবং এক বিশুদ্ধ ধর্মের প্রবর্তক। তিনি মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাসের ভিত্তিকে এক ও অদ্বিতীয় আল্লাহর আনুগত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত করেন। একমাত্র আল্লাহর উপাসনার জন্যই তিনি ও তাঁর পুত্র হযরত ইসমাঈল (আঃ) আরব দেশের মক্কায় তৈরী করেন আল্লাহর ঘর পবিত্র কাবা শরীফ। তবে কথিত আছে, আল্লাহর এ ঘরটি প্রথম নির্মিত হয় হযরত আদম (আঃ) এর সময়ে ফেরেশতাগণের ইবাদত গৃহ বাইতুল মামুরের আদলে। পরবর্তীতে হযরত নূহ (আঃ) এর সময়ের মহাপ্লাবনে তা ক্ষতিগ্রস্ত ও বিলুপ্ত হয়। এরপর আল্লাহর নির্দেশে হযরত ইব্রাহীমের (আঃ) এরই ধ্বংসাবশের স্থানে গড়ে তুলেন এ স্থাপনাটি। এ সুপ্রাচীন উপাসনালয় সম্পর্কে আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন বলেন:
إِنَّ أَوَّلَ بَيْتٍ وُضِعَ لِلنَّاسِ لَلَّذِي بِبَكَّةَ مُبَارَكًا وَهُدًى لِّلْعَالَمِينَ
”নিশ্চয়ই মানুষের জন্য প্রথম স্থাপিত ঘর বাক্কার গৃহ (মক্কার কাবা শরীফ) যাহা আশীর্বাদপ্রাপ্ত এবং জাতিসমূহের পথপ্রদর্শক (৩:৯৬)।”
আল্লাহ্ রব্বুল আলামীন আরও বলেন:
جَعَلَ اللّٰهُ الْكَعْبَۃَ الْبَیْتَ الْحَرَامَ قِیٰمًا لِّلنَّاسِ وَ الشَّہْرَ الْحَرَامَ وَ الْهَدْیَ وَ الْقَلَآئِدَ ؕ ذٰلِكَ لِتَعْلَمُوْۤا اَنَّ اللّٰهَ یَعْلَمُ مَا فِی السَّمٰوٰتِ وَ مَا فِی الْاَرْضِ وَ اَنَّ اللّٰهَ بِکُلِّ شَیْءٍ عَلِیْمٌ
“আল্লাহ সম্মানিত গৃহ কা’বাকে মানুষের জন্য স্থীতিশীলতার কারণ করেছেন এবং সম্মানিত মাসসমূহকে, কুরবানীর জন্তুকে ও যাদের গলায় আবরণ রয়েছে। এর কারণ এই যে, যাতে তোমরা জেনে নাও যে, আল্লাহ নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলের সব কিছু জানেন এবং আল্লাহ সর্ব বিষয়ে মহাজ্ঞানী।” (৫:৯৭)
لِإِيلَافِ قُرَيْشٍ إِيلَافِهِمْ رِحْلَةَ الشِّتَاءِ وَالصَّيْفِ فَلْيَعْبُدُوا رَبَّ هَـٰذَا الْبَيْتِ الَّذِي أَطْعَمَهُم مِّن جُوعٍ وَآمَنَهُم مِّنْ خَوْفٍ
“(কা’বাগৃহের সম্মনার্থে) কোরাইশদের মধ্যে নিরাপত্তাবোধ থাকার কারণে, শীত ও গ্রীষ্মকালে তাদের (নিরাপদ বাণিজ্যিক) সফরের কারণে। অতএব তারা যেন এবাদত করে এই ঘরের পালনকর্তার যিনি তাদেরকে ক্ষুধায় আহার দিয়েছেন এবং যুদ্ধভীতি থেকে তাদেরকে নিরাপদ করেছেন।” (১০৬:১–৪)
প্রখ্যাত ঐতিহাসিক উইলিয়াম ম্যুর তাঁর ’দ্যা লাইফ অব মুহাম্মদ’ গ্রন্থে বলেন: ” …. বস্তুতঃ স্মরণাতীতকাল থেকেই এ ধর্ম–মন্দির আরবজাতির উপাসনাগার হিসেবে গণ্য হয়ে আসছে।” বিশ্ব মুসলিমের মিলনকেন্দ্র হলো মক্কাস্থিত এ পবিত্র কাবা গৃহ। আর এ কাবা শরীফকে কেন্দ্র করেই ঘটেছে ইসলাম ধর্ম ও সভ্যতার বিকাশ। বিশ্বের যে কোন প্রান্তে অবস্থানকারী মুসলিম জনগণের ’ক্বিবলা’ হলো কাবা শরীফ। পবিত্র কাবার দিকে মুখ করেই মুসলমান নর–নারীকে নামায আদায় করতে হয়। আবার এ কাবা শরীফকে স্বশরীরে তাওয়াফের মাধ্যমেই প্রতি বছর হজ্জ্বব্রত উদযাপিত হয়ে থাকে।
মহান আল্লাহর নির্দেশে হযরত ইব্রাহীম (আঃ) মর্যাদাপূর্ণ ও বরকতময় কা’বা গৃহটি পুনর্নির্মাণ করেন ঠিক তার আদি অবস্থানে। হযরত জিব্রাইল (আঃ) কিছু প্রস্তরখন্ড বিছিয়ে জায়গাটি চিহ্নিত করে দেন। পুত্র হযরত ইসমাঈল (আঃ) তাঁর পিতাকে নির্মাণ কাজে সার্বক্ষণিক সহায্য করেন। কা’বা শরীফের ভিত্তি স্থাপন কালে মহান আল্লাহর দরবারে হযরত ইব্রাহীম (আঃ) ও হযরত ইসমাঈল (আঃ) এর এক বিশেষ দোয়ার বরকতে এ দুনিয়ায় আগমন করেন তাঁদেরই বংশধর ও উত্তরপুরুষ সর্বশেষ নবী ও রসূল হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)। পবিত্র কুরআনে তাঁদের দোয়াটি ছিল এরূপ:
وَإِذْ يَرْفَعُ إِبْرَاهِيمُ الْقَوَاعِدَ مِنَ الْبَيْتِ وَإِسْمَاعِيلُ رَبَّنَا تَقَبَّلْ مِنَّا ۖ إِنَّكَ أَنتَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ رَبَّنَا وَاجْعَلْنَا مُسْلِمَيْنِ لَكَ وَمِن ذُرِّيَّتِنَا أُمَّةً مُّسْلِمَةً لَّكَ وَأَرِنَا مَنَاسِكَنَا وَتُبْ عَلَيْنَا ۖ إِنَّكَ أَنتَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ رَبَّنَا وَابْعَثْ فِيهِمْ رَسُولًا مِّنْهُمْ يَتْلُو عَلَيْهِمْ آيَاتِكَ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَيُزَكِّيهِمْ ۚ إِنَّكَ أَنتَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ
“যখন ইব্রাহীম ও ইসমাঈল কা’বাগৃহের ভিত্তি স্থাপন করছিল। তারা দোয়া করেছিল: পরওয়ারদেগার! আমাদের থেকে কবুল কর। নিশ্চয়ই তুমি শ্রবণকারী, সর্বজ্ঞ। পরওয়ারদেগার! আমাদের উভয়কে তোমার আজ্ঞাবহ কর এবং আমাদের বংশধর থেকেও একটি অনুগত দল সৃষ্টি কর, আমাদের হজ্বের রীতিনীতি বলে দাও এবং আমাদের ক্ষমা কর। নিশ্চয় তুমি তওবা কবুলকারী। দয়ালু। হে পরওয়ারদেগার! তাদের মধ্যে থেকেই তাদের নিকট একজন পয়গম্বর প্রেরণ করুন যিনি তাদের কাছে তোমার আয়াতসমূহ তেলাওয়াত করবেন, তাদেরকে কিতাব ও হেকমত শিক্ষা দিবেন। এবং তাদের পবিত্র করবেন। নিশ্চয় তুমিই পরাক্রমশালী হেকমতওয়ালা।” (২:১২৭–১২৯)
হযরত ইব্রাহীম (আঃ) ও তদীয় পুত্র ইসমাঈলের (আঃ) দোয়া কবুল করে আল্লাহ বলেন:
وَإِذْ جَعَلْنَا الْبَيْتَ مَثَابَةً لِّلنَّاسِ وَأَمْنًا وَاتَّخِذُوا مِن مَّقَامِ إِبْرَاهِيمَ مُصَلًّى ۖ وَعَهِدْنَا إِلَىٰ إِبْرَاهِيمَ وَإِسْمَاعِيلَ أَن طَهِّرَا بَيْتِيَ لِلطَّائِفِينَ وَالْعَاكِفِينَ وَالرُّكَّعِ السُّجُودِ
“যখন আমি কা’বা গৃহকে মানুষের জন্যে সম্মিলন স্থল ও শান্তির আলয় করলাম, আর তোমরা মাকামে–ইব্রাহীমকে নামাযের জায়গা বানাও এবং আমি ইব্রাহীম ও ইসমাঈলকে আদেশ করলাম, তোমরা আমার গৃহকে তওয়াফকারী, অবস্থানকারী ও রুকু–সেজদাকারীদের জন্য পবিত্র রাখ (২:১২৫)।”
আল্লাহর নির্দেশে হযরত ইব্রাহীম (আঃ) কা’বা গৃহ তাওয়াফ ও হজ্জ্ব অনুষ্ঠান পালনের জন্য মানবজাতিকে আহ্বান জানালেন। আর তখন থেকেই মক্কার সুপ্রাচীন এ পবিত্র কাবা গৃহটি সমগ্র মুসলিম জাতির উপাসনালয় হিসেবে করে গড়ে উঠেছিল। হযরত ইব্রাহীম (আঃ) ও তাঁর পুত্র হযরত ইসমাঈল (আঃ) উভয়ে মর্যাদাপূর্ণ ও বরকতময় এ গৃহটিতে এক ও অদ্বিতীয় আল্লাহর উপাসনা এবং এতে তাওয়াফ ও হজ্জ্ব অনুষ্ঠাোদি পালনের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করেছিলেন। তাঁদের উভয়ের এ সম্পর্কিত দোয়াসমূহ আল্লাহর দরবারে গৃহীত হয়েছিল।
তাঁদের দোয়ার বরকতে তাঁদেরই বংশধর হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) মক্কা নগরীতে জন্মগ্রহণ করেন এবং সর্বশেষ নবী ও রসূল হিসেবে আবির্ভূত হন। তাঁর আবির্ভাবকাল ছিল ’আইয়্যামে জাহিলিয়াত’ অর্থাৎ অন্ধকার যুগ। সে যুগে খোদাদ্রোহীতা, পৌত্তলিকতা, অন্যায়, জুলুম, লুটতরাজ ও ব্যভিচারে লিপ্ত ছিল পুরো আরব সমাজ তথা বিশ্ববাসী। এ সময় বিভ্রান্ত ও কুসংস্কারপূর্ণ মক্কাবাসী পবিত্র কাবা গৃহকে পরিণত করেছিল পৌত্তলিকতার কেন্দ্র হিসেবে। হযরত ইব্রাহীমের (আঃ) এক ও অদ্বিতীয় আল্লাহর ইবাদতের গৃহটিতে মক্কার বিপথগামী মুশরিকগণ ৩৬০টি মূর্তি স্থাপন করে মূর্তিপূজার আখড়া বানিয়েছিল। অথচ মূর্তিপূজা তথা অংশীবাদ ছিল হযরত ইব্রাহীমের (আঃ) প্রচারিত ধর্মীয় বিশ্বাসের সম্পূর্ণ বিপরীত। পৌত্তলিকতার বিরুদ্ধে ছিল তাঁর আমরণ সংগ্রাম। কারণ তিনি তাঁর সম্প্রদায়ের অংশীবাদি ধারণা ও বিশ্বাস থেকে নিজেকে মুক্ত রেখে তৌহীদের প্রতি আনুগত্য ঘোষণা করেছিলেন:
قَالَ یٰقَوْمِ اِنِّیْ بَرِیْٓءٌ مِّمَّا تُشْرِکُوْنَ اِنِّیْ وَجَّہْتُ وَجْهِیَ لِلَّذِیْ فَطَرَ السَّمٰوٰتِ وَ الْاَرْضَ حَنِیْفًا وَّ مَاۤ اَنَا مِنَ الْمُشْرِكِیْنَ
“……. তখন (ইব্রাহীম আঃ) বললেন, হে আমার সম্প্রদায়, তোমরা যেসব বিষয়কে শরীক কর, আমি ওসব থেকে মুক্ত। আমি একমুখী হয়ে স্বীয় আনন ঐ সত্তার দিকে করেছি, যিনি নভোমন্ডল ও ভূমন্ডল সৃষ্টি করেছেন এবং আমি মুশরেকদের অন্তর্ভুক্ত নই।” (৬:৭৮ – ৭৯)
কিন্তু পরবর্তীতে মক্কার জোরহাম ও কুরাইশ সম্প্রদায় এ পবিত্র গৃহটিকে বহু সংখ্যক দেব–দেবীর পূজালয়ে পরিণত করে ফেলে। ফলে এ গৃহটি তার মৌলিক বৈশিষ্ঠ্য হারিয়ে ফেলে। মুসলিম উম্মাহর পিতা নবী হযরত ইব্রাহীম (আ) ও তদীয় পুত্র হযরত ইসমাঈল (আ) এর উত্তরপুরুষ সর্বশেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) কর্তৃক মক্কা বিজয়ের পর থেকে এ গৃহটি পুনরায় তার স্বরূপে ফিরে আসে এবং তা এক ও অদ্বিতীয় আল্লাহর উপাসনালয়ে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। তখন থেকেই এটি বিশ্ব মুসলিমের ইবাদতের কেন্দ্রস্থল ও ঐক্যের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। মুসলমানগণ কা’বা গৃহকে কেন্দ্র করে ইসলামী শরীয়ত মোতাবেক প্রতি বছর হজ্জ্ব ও ওমরা পালন করে থাকেন।
‘জমজম’ কূপের পুনর্খনন
জোহরাম গোত্রের নেতা আমর ইবনে হারেছ ইবনে মেজমাম শত্রুপক্ষ খুযায়া গোত্রের কাছে মক্কার কর্তৃত্ব হারানোর আশঙ্কায় কা’বা ঘরের কিছু মূল্যবান সামগ্রী ও উপঢৌকন হিসেবে প্রাপ্ত দু’টি সোনার হরিণ জমজম কূপে লুকিয়ে রেখে কূপটি সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেন। তখন থেকে এ কূপটি বিলুপ্ত হয়ে যায়। এর বহু বছর পর মক্কায় সুপেয় পানির চাহিদা মেটাতে কুরাইশদের নেতা আব্দুল মুত্তালিব অবলুপ্ত ‘জমজম’ কূপটি পুনর্খননের সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু এর প্রকৃত অবস্থান কোথায় তা নিশ্চিত না হওয়ায় তিনি চিন্তিত হয়ে পড়েন। তবে তিনি স্বপ্নযোগে এর অবস্থান সম্পর্কে আভাস পান এবং এর খনন কাজ শুরু করেন। এ কাজে তাঁকে সহায়তা করতে কেহ রাজী হলো না। সেই সময়ে তাঁর একজনই পুত্র সন্তান ছিল। অন্য কেহ তাঁর সাহায্যার্থে এগিয়ে না আসায় তিনি একমাত্র পুত্র হারিসকে নিয়ে কূপটির পুনর্খনন শুরু করেন এবং অনেক কষ্ট ও বাধা–বিপত্তি পেরিয়ে সাফল্য অর্জন করেন। জমজম কূপ থেকে তিনি কা’বা ঘরের মূল্যবান সামগ্রী ও সোনার হরিণ দু’টি উদ্ধার করেন এবং আল্লাহর অশেষ রহমতে তা থেকে পানি বের করে আনতে সক্ষম হন। এ সময় তিনি মা’নত করেছিলেন, তাঁর দশটি পুত্র সন্তান জন্ম নিলে এবং বয়ঃপ্রাপ্ত হলে তাঁদের একজনকে আল্লাহর রাহে কুরবানী করবেন। তাঁর এ দৃঢ় সংকল্প ও সাফল্য তাঁকে কুরাইশদের মধ্যে অনন্য এক উচ্চতায় নিয়ে যায়। এ ঘটনাটি পরবর্তী অধ্যায়ে বর্ণিত হয়েছে। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র হযরত আব্বাস (রাঃ) এর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করেন। মক্কা বিজয়ের পর রসূলুল্লাহ্ (সাঃ) তাঁকেই এ দায়িত্বে বহাল রাখেন। এ অলৌকিক বরকতময় কূপটি আজও লক্ষ লক্ষ হজ্জ্ব ও ওমরা পালনকারীদের দৈনন্দিন পানীয় জলের প্রয়োজন মিটিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু কখনও এর পানির স্তর নীচে নামেনি। এ পবিত্র কূপের পানি বিশুদ্ধতম, বরকতময় ও কল্যাণপ্রদ।
আবরাহার হস্তী-বাহিনী কর্তৃক মক্কা আক্রমণের ঘটনা
তীর্থভূমি মক্কায় অবস্থিত কা’বা গৃহের সম্মান ও মর্যাদায় ঈর্ষান্বিত হয়ে ইয়েমেনের খৃস্টান শাসক আবরাহা একটি সুউচ্চ উপসনা মন্দির তৈরী করে ও হীরা–জহরত দ্বারা সুসজ্জিত করে। সে নিজ দেশের লোকজনকে এ মন্দিরে উপাসনা করার আহ্বান জানায়। কিন্তু কা’বা গৃহ ছেড়ে খুব অল্প লোকই এ মন্দিরে গমন করে। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে সে কা’বা গৃহটিকে ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে এক বিরাট হস্তী–বাহিনী নিয়ে মক্কা আগমন করলো। সে মক্কার অদূরে এক উপত্যকার তার বাহিনীকে নিয়ে শিবির স্থাপন করে ত্রাস সৃষ্টির জন্য আশপাশের এলাকায় লুটতরাজ শুরু করে। মক্কার কুরাইশ নেতা আব্দুল মুত্তালিবের একশত উটও একই সাথে লুন্ঠিত হলো। তিনি আবরাহার সাথে সাক্ষাৎ করলেন এবং তাঁর লুণ্ঠিত উটগুলো ফেরত চাইলেন। আবরাহা বিস্মিত হয়ে তাঁকে জিজ্ঞেস করলো, ’আপনি উট ফেরত চাইছেন অথচ কা’বা সম্পর্কে কিছু বলছেন না।’ তিনি উত্তরে বললেন, ’কা’বা আল্লাহর ঘর, এর নিরাপত্তা বিধান ও রক্ষার দায়িত্ব তাঁর। আর উটগুলো আমার, তাই আমি এগুলো ফেরত চাই।’ আবরাহা তাঁর কথায় বিস্মিত হয়ে উটগুলো ফেরত দিয়ে দিলো এবং কা’বা গৃহ আক্রমণের প্রস্তুতি নিলো। এ সময় মহান আল্লাহ্ নাযিল করলেন ঝাঁকে ঝাঁকে আবাবীল পাখী। এদের নিক্ষিপ্ত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পাথরের তীক্ষ্ম আঘাতে আবরাহা ও তার হস্তীবাহিনী সম্পূর্ণভাবে নিষ্পেষিত ও ধ্বংস হয়ে যায়। এ ঘটনাটি হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)- এর জন্মের প্রাক্কালে সংঘটিত হয়েছিল। আবরাহা বাহিনী বিলুপ্ত হওয়ার অভূতপূর্ব ঘটনায় আরব–ভূখন্ডে মক্কা নগরী ও কুরাইশ সম্প্রদায়ের সম্মান ও মর্যাদা বৃদ্ধি পায় এবং একই সাথে এর নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত হয়।
পবিত্র কুরআনে ”সূরা ফীলে” এ সম্পর্কে আল্লাহ্ বলেন:
اَلَمْ تَرَ كَیْفَ فَعَلَ رَبُّكَ بِاَصْحٰبِ الْفِیْلِ اَلَمْ یَجْعَلْ كَیْدَهُمْ فِیْ تَضْلِیْلٍ وَّ اَرْسَلَ عَلَیْهِمْ طَیْرًا اَبَابِیْلَ تَرْمِیْهِمْ بِحِجَارَۃٍ مِّنْ سِجِّیْلٍ فَجَعَلَهُمْ كَعَصْفٍ مَّاْکُوْلٍ
“আপনি কি দেখেননি আপনার পালনকর্তা হস্তীবাহিনীর (কা’বা শরীফ আক্রমণকারী ইয়েমেনের শাসক ও তার সৈন্যদলের) সাথে কিরূপ ব্যবহার করেছেন? তিনি কি তাদের চক্রান্ত নস্যাৎ করে দেননি? তিনি তাদের উপর প্রেরণ করেছেন ঝাঁকে ঝাঁকে আবাবীল পাখী, যারা তাদের উপর পাথরের কংকর নিক্ষেপ করছিল। অতঃপর তিনি তাদেরকে ভক্ষিত তৃণসদৃশ করে দেন।” (১০৫:১ – ৫)