১৭ তম অধ্যায় : কা’বা গৃহ তাওয়াফে বাধা ও হুদায়বিয়ার সন্ধিচুক্তি সম্পাদন

কা’বা গৃহ তাওয়াফ ও মাতৃভূমি মক্কা পরিদর্শনের তৃষ্ণা

নবী করীম (সাঃ) ও তাঁর সাহবীগণসহ মক্কা থেকে হিজরতের পর ছয়টি বছর কেটে গেলো। মদীনায় নতুন একটি সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনের নিরলস প্রচেষ্টায় এবং অভ্যন্তরীন ষড়যন্ত্র ও বহিঃশত্রুর অব্যাহত আক্রমণ থেকে বেঁচে থাকার দুরূহ সংগ্রামে  অতিবাহিত হয়েছে সারাটা সময়। এখন তাঁদের অন্তরে পবিত্র কা’বা গৃহ তাওয়াফ ও প্রিয় জন্মভূমি দর্শনের তীব্র অনুভূতি সঞ্চারিত হয়। কিন্তু এতেও প্রবল প্রতিবন্ধকতা। পবিত্র কা’বা গৃহ জিয়ারত সকলের জন্য উম্মুক্ত থাকলেও মক্কার কুরাইশরা সেখানে মুসলমানদের প্রবেশাধিকার বাধাগ্রস্ত করে রেখেছে। তারা মনে করে যেহেতু মুসলমানগণ কা’বা গৃহে স্থাপিত প্রতিমাগুলোতে বিশ্বাস করেনা সেহেতু তারা সেখানে প্রবেশ করতে পারবেনা। অথচ হযরত ইব্রাহীম (আঃ) এ গৃহ পুনঃ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এক ও অদ্বিতীয় আল্লাহর উপাসনা করার জন্য।

এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ্ বলেন:

♥ “যখন আমি কা’বা গৃহকে মানুষের জন্যে সম্মিলন স্থল ও শান্তির আলয় করলাম, আর তোমরা ইব্রাহীমের দাঁড়ানোর জায়গাকে নামাযের জায়গা বানাও এবং আমি ইব্রাহীম ও ইসমাঈলকে আদেশ করলাম, তোমরা আমার গৃহকে তওয়াফকারী, অবস্থানকারী ও রুকু–সেজদাকারীদের জন্য পবিত্র রাখ।” (সূরা বাক্বারাহ, ২:১২৫)

♥ “যখন আমি ইব্রাহীমকে বায়তুল্লাহর স্থান ঠিক করে দিয়েছিলাম যে, আমার সাথে কাউকে শরীক করো না এবং আমার গৃহকে পবিত্র রাখ তাওয়াফকারীদের জন্যে, নামাযে দন্ডায়মানদের জন্যে এবং রকু সেজদাকারীদের জন্যে। এবং মানুষের মধ্যে হজ্বের জন্যে ঘোষণা প্রচার কর। তারা তোমার কাছে আসবে পায়ে হেঁটে এবং সর্বপ্রকার কৃশকায় উটের পিঠে সওয়ার হয়ে দূর–দূরান্ত থেকে। যাতে তারা তাদের কল্যাণের স্থান পর্যন্ত পৌছে এবং নির্দিষ্ট দিনগুলোতে আল্লাহর নাম স্মরণ করে তাঁর দেয়া চতুষ্পদ জন্তু যবেহ করার সময়।” (সূরা হাজ্জ্ব, ২২:২৭–২৮)

কিন্তু পরবর্তীতে যখন মহান আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করে কা’বার পবিত্রতা নষ্ট কর হয় এবং সেখানে বাধার প্রাচীর তৈরী করা হয় তখন সতর্কবাণী উচ্চারণ করে আল্লাহ তায়ালা বলেন, 

♥ “যারা কুফর করে ও আল্লাহর পথে বাধা সৃষ্টি করে এবং সেই মসজিদে হারাম থেকে বাধা দেয়, যাকে আমি প্রস্তুত করেছি স্থানীয় ও বহিরাগত সকল মানুষের জন্যে সমভাবে এবং যে মসজিদে হারামে অন্যায়ভাবে কোন ধর্মদ্রোহী কাজ করার ইচছা করে, আমি তাদেরকে যন্ত্রানাদায়ক শাস্তি আস্বাদন করাব। (সূরা হাজ্জ্ব, ২২:২৬)

নবীজী (সাঃ) এর স্বপ্ন ও কা’বা জিয়ারতের আকাঙ্ক্ষা  

নবীজী (সাঃ) স্বপ্নে দেখলেন তিনি পবিত্র কা’বাগৃহ জিয়ারত করছেন। এতে তিনি সাহাবাগণকে সঙ্গে নিয়ে হজ্জ্ব ও ওমরা পালনের জন্য উৎসাহিত হয়ে উঠলেন। তাঁর স্বপ্ন সম্পর্কে আল্লাহ্ বলেন:

♥ “আল্লাহ তাঁর রসূলকে সত্য স্বপ্ন দেখিয়েছেন। আল্লাহ চাহেন তো তোমরা অবশ্যই মসজিদে হারামে প্রবেশ করবে নিরাপদে মস্তকমুন্ডিত অবস্থায় এবং কেশ কর্তিত অবস্থায়। তোমরা কাউকে ভয় করবে না। অতঃপর তিনি জানেন যা তোমরা জান না। এছাড়াও তিনি দিয়েছেন তোমাদেরকে একটি আসন্ন বিজয়।” (সূরা ফাত্হ, ৪৮:২৭)।”

 

ওমরা পালনের উদ্দেশ্যে যাত্রা

হিজরী ষষ্ট সনের জ্বিলকদ মাস – আসন্ন হজ্জ্বের মওসুম। নবী মুহাম্মদ (সা) হজ্জ্ব ও ওমরা পালনের জন্য মদীনার মুসলিম ও অমুসলিম গোত্রগুলোকে প্রস্তুতির আহ্বান জানালেন। এ উদ্দেশ্যে চৌদ্দশতের একটি হজ্জ্ব যাত্রীদল গঠিত হলো। তাদেরকে সঙ্গে নিয়ে তিনি মক্কা অভিমুখে যাত্রা শুরু করেন। তাঁদের সাথে ছিল কুরবাণীর উদ্দেশ্যে আনীত পশুসমূহ। তাঁদের এ তীর্থ যাত্রা ছিল নিরস্ত্র অবস্থায়, আত্মরক্ষার নিমিত্তে শুধুমাত্র কোষবদ্ধ তলোয়ার ব্যতীত অন্য কোন অস্ত্র তাঁদের সাথে ছিল না।

এ হজ্জ্ব ও ওমরাপালনকারী দলটি মক্কার নিকটবর্তী ’উসফান’ নামক স্থানে পৌঁছুলে কুরাইশরা খবর পেয়ে খালীদ বিন ওয়ালীদ ও ইকরামা ইবনে আবু জেহেলের নেতৃত্বে দুইশত  সৈন্যের একটি বাহিনী তাদের গতিরোধ করার জন্য পাঠালো। এ পবিত্র মাসে মুখোমুখী কোন সংঘর্ষ এড়ানোর জন্য হজ্জ্বযাত্রী দলটি ঘুরপথে কষ্টদায়ক গিরিখাত ধরে মক্কার দিকে এগিয়ে গেলো। মক্কার উপকন্ঠে হুদায়বিয়া নামক স্থানে পৌঁছে নবী করীম (সাঃ) সেখানে শিবির স্থাপন করার নির্দেশ দিলেন।

 

কুরাইশদের অন্যায্য বাধা ও উত্তেজনাকর পরিস্থিতি

হুদায়বিয়ায় পৌঁছানোর পর কুরাইশরা হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর নেতৃত্বে আগমনকারী হজ্জ্বযাত্রীদলটিকে মক্কায় প্রবেশের অনুমতি দিতে অনমনীয় মনোভাব প্রদর্শন করে। উভয় পক্ষের মধ্যে আলোচনার জন্য প্রতিনিধি বিনিময় চলে। প্রথমে নবী করীম (সা) তাঁর হজ্জ্বব্রত পালনকারী দলের নিখাদ উদ্দেশ্য ব্যক্ত করার জন্য একজন প্রতিনিধি পাঠান। কুরাইশরা প্রথমে অশালীনভাবে তাঁকে প্রত্যাখ্যান করে।

পরবর্তীতে কুরাইশরাও মুসলিম শিবিরে তাদের প্রতিনিধি প্রেরণ করে। প্রতিনিধিরা নবীজী (সাঃ) এর সাথে সাক্ষাৎ করে তাঁর প্রকৃত উদ্দেশ্য বোঝতে সক্ষম হয় এবং কুরাইশদের নিকট ফিরে গিয়ে বাস্তব অবস্থা সম্পর্কে জানায়। এতেও তারা তাদের জিদ বহাল রেখে দুরভিসন্ধীমূলক চিন্তাভাবনা করতে থাকে। তখন নবী করীম (সা) মক্কায় প্রবেশের অনুমতি চেয়ে তাঁর প্রতিনিধি হিসেবে মক্কাবাসীর নিকট গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিত্ব হযরত ওসমান (রা)–কে কুরাইশদের নিকট প্রেরণ করেন।

কিন্তু কুরাইশ সর্দারগণ বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে এ বছর মুসলমানদেরকে কাবাগৃহে প্রবেশ ও ওমরা পালন করতে দিতে অসম্মত হয়। তবে তারা আলোচনার মাধ্যমে একটা সুরাহায় পৌঁছানোর আগ্রহ প্রকাশ করে। হযরত ওসমান (রা) –এর ফেরত আসতে দেরী হওয়ায়  মুসলমানরা উৎকন্ঠিত হয়ে পড়েন। প্রথমে মনে করা হয়েছিল তাঁকে কুরাইশরা আটক করেছে। পরে গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে, হযরত ওসমান (রা)-কে হত্যা করা হয়েছে। এতে মুসলিম শিবিরে ব্যাপক উত্তেজনার সৃষ্টি হয়।

 বাইয়াতে রিদওয়ান

হযরত ওসমান (রা)–কে হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণের উদ্দেশ্যে নবী করীম (সা) তাঁর সাহাবীগণকে নিয়ে একটি গাছের নীচে শপথ গ্রহণ করেন। তাঁর হাতের ওপর হাত রেখে সাহাবীবৃন্দ আমৃত্যু লড়াই করার শপথ নেন। এ শপথ ‘বাইয়াতে রিদওয়ান’ নামে পরিচিত। হযরত ওসমান (রা)–কে হত্যার খবরটি ছিল একটি গুজব। তিনি মুসলিম শিবিরে ফিরে আসলে এ গুজবের অবসান ঘটে। তবে ‘বাইয়াতে রিদওয়ান’ ছিল মহান আল্লাহর নিকট পছন্দনীয় একটি শপথ। এ সম্পর্কে নাযিলকৃত আয়াতটিতে আল্লাহ্ পাক বলেন,

♥ “আল্লাহ মু’মিনদের প্রতি সন্তুষ্ট হলেন, যখন তারা বৃক্ষের নীচে আপনার কাছে বাইয়াত (শপথ) করল। আল্লাহ অবগত ছিলেন যা তাদের অন্তরে ছিল। অতঃপর তিনি তাদের প্রতি প্রশান্তি নাযিল করলেন এবং তাদেরকে আসন্ন বিজয় পুরস্কার দিলেন।” (সূরা ফাত্হ, ৪৮:১৮)

 

হুদায়বিয়ার সন্ধিচুক্তি সম্পাদন ও এর গুরুত্ব

কুরাইশরা সোহায়েল ইবনে আমরকে তাদের প্রতিনিধি হিসেবে হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর নিকট প্রেরণ করে। উভয়পক্ষের মধ্যে দফায় দফায় আলোচনা চলতে থাকে। সন্ধির শর্ত নির্ধারণে কুরাইশ প্রতিনিধি সোহায়েল রুক্ষ ও কঠোর মনোভাব পোষণ করলেও নবী করীম (সাঃ) অত্যন্ত প্রজ্ঞা,  ধৈর্য ও সংযমের পরিচয় দেন।

চুক্তির শুরুতে ‘মুহাম্মাদুর রসূলুল্লাহ্’ নাম নিয়ে কুরাইশ প্রতিনিধি সোহায়েল আপত্তি তোলে। সে বলে,’আমরা আপনাকে আল্লাহর রসূল হিসেবে স্বীকৃতি দেই না। সুতারাং চুক্তিতে ‘রসূলুল্লাহ্’ শব্দটি থাকতে পারবে না। মহানুভব নবী করীম (সাঃ) শান্তিপূর্ণ সন্ধির স্বার্থে তাতে সম্মতি দেন এবং হযরত আলী (রাঃ)–কে তাঁর নামের সাথে ‘রসূলুল্লাহ্’ শব্দটি কেটে তৎপরিবর্তে ‘ইবনে আব্দুল্লাহ্’ শব্দটি জুড়ে দিতে বললেন। হযরত আলী (রাঃ) তাঁর অপারগতার কথা জানিয়ে বললেন, ‘আমি কোন অবস্থায়ই ‘রসূলুল্লাহ্’ শব্দটি কাটতে পারব না।’ তখন নবীজী (সাঃ) নিজেই তা কেটে দিলেন।

এছাড়া চুক্তির কিছু কিছু ধারা বৈষম্যমূলক ও মুসলিম স্বার্থের পরিপন্থী হলেও তিনি সার্বিক শান্তির লক্ষ্যে তা মেনে নেন। অবশেষে  একটি দশবছর–মেয়াদী একটি শান্তি চুক্তি সম্পাদিত হয় যা ‘হুদায়বিয়ার সন্ধি’ নামে পরিচিত।

এ সন্ধিচুক্তির প্রধান শর্তগুলো ছিল নিম্নরূপ:

  • এ সন্ধিচুক্তির মেয়াদ হবে দশ বছর।

  • এ বছর মুসলমানদেরকে হজ্জ্ব ও ওমরা পালন ব্যতীত ফেরত যেতে হবে। আগামী বছর তারা হজ্জ্ব পালনে আসতে পারবে। তবে তিন দিনের বেশী থাকতে পারবে না। তাদের সঙ্গে শুধু কোষবদ্ধ তরবারী থাকতে পারবে।

  • আরবের অপরাপর গোত্রগুলো উভয় পক্ষের যে কোন পক্ষের সাথে মৈত্রী চুক্তিতে আবদ্ধ হতে পারবে। এতে উভয় পক্ষের কেহ বাধা প্রদান করতে পারবে না।

  • মক্কার কুরাইশদের কোন পুরুষ ব্যক্তি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে নিজ অভিবাবকদের অনুমতি ব্যতীত মদীনা চলে গেলে অভিবাবক চাওয়ামাত্র তাকে কুরাইশদের হাতে ফেরত দিতে হবে।

  • কোন মুসলমান ইসলাম ধর্ম পরিত্যাগ করে মক্কায় চলে গেলে তাকে ফেরত দেওয়া হবে না।

চুক্তির শর্ত অনুযায়ী ওই বছর হজ্জ্ব ও ওমরা পালনে সমর্থ না হওয়ায় মুসলমান হজ্জ্বযাত্রী দলটি খুবই হতাশগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন। তদুপরি উপরোক্ত চুক্তির বৈষম্যমূলক ধারাগুলো মুসলমানদের জন্য অপমানজনক ও পীড়াদায়ক হওয়ায় মুসলিম শিবিরে এক গুমোট পরিস্থিতি বিরাজ করছিল। কিন্তু প্রিয় নবীজী (সাঃ) এর প্রতি শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও আনুগত্যের বন্ধনে আবদ্ধ মুসলমানগণ তাঁর সিদ্ধান্তকেই স্বতঃসিদ্ধভাবে গ্রহণ করলেন। এ

এ সন্ধিচুক্তি ইসলামের অগ্রগতির এক মাইল ফলক

সন্ধি ছিল ইসলাম ধর্মের অগ্রগতির এক মাইল ফলক। এর কতিপয় ধারা আপাতদৃষ্টিতে মুসলমানদের জন্য বৈষম্যমূলক ও আপত্তিকর হলেও ধৈর্য, সংযম ও সহনশীলতার মাধ্যমে সুদূর প্রসারী লক্ষ্য অর্জনের নিমিত্তে তা ছিল অপরিহার্য। শান্তির বৃহত্তর স্বার্থে এবং শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ইসলামের প্রচার ও প্রসারের ক্ষেত্রে এর অবদান ছিল অপরিসীম।

এ ছাড়া এ চুক্তির মাধ্যমে এটা স্বীকৃতি পেলো যে ইসলাম একটি উদীয়মান ও কুরাইশদের সমকক্ষ শক্তি।  সর্বোপরি এ সন্ধিচুক্তি পবিত্র মাসে পবিত্র মক্কা নগরীতে বিবাদমান দু’পক্ষের মধ্যে এক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের শঙ্কা দূর করলো। তাই পবিত্র কুরআনে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা এ সন্ধিকে নিম্নোক্ত আয়াতে এক সুস্পষ্ট বিজয় বলে উল্লেখ করেছেন:

♥ “(হে নবী) নিশ্চয়ই আমি আপনাকে (হুদায়বিয়ার সন্ধির মাধ্যমে) এক সুস্পষ্ট বিজয় দান করেছি। যাতে আল্লাহ আপনার অতীত ও ভবিষ্যত ত্রুটিসমূহ মার্জনা করে দেন এবং আপনার প্রতি তাঁর নেয়ামত পূর্ণ করেন ও আপনাকে সরল পথে পরিচালিত করেন।” (সূরা আল ফাত্হ, ৪৮:১–২)

হুদায়বিয়ার সন্ধি প্রসঙ্গে মুসলমানদেরকে সান্ত্বনা দিয়ে মহান আল্লাহ্ আরও যেসব আয়াত নাযিল করেন তা হলো:

♥ “তিনি মক্কা শহরে তাদের হাত তোমাদের থেকে এবং তোমাদের হাত তাদের থেকে নিবারিত করেছেন তাদের উপর তোমাদেরকে বিজয়ী করার পর। তোমরা যা কিছু কর, আল্লাহ তা দেখেন। তারাই তো কুফরী করেছে এবং বাধা দিয়েছে তোমাদেরকে মসজিদে হারাম থেকে এবং অবস্থানরত কোরবানীর জন্তুদেরকে যথাস্থানে পৌঁছতে। যদি মক্কায় কিছুসংখ্যক ঈমানদার পুরুষ ও ঈমানদার নারী না থাকত, যাদেরকে তোমরা জানতে না। অর্থাৎ তাদের পিষ্ট হয়ে যাওয়ার আশংকা না থাকত, অতঃপর তাদের কারণে তোমরা অজ্ঞাতসারে ক্ষতিগ্রস্ত হতে, তবে সব কিছু চুকিয়ে দেয়া হত; কিন্তু এ কারণে চুকানো হয়নি, যাতে আল্লাহ তা’আলা যাকে ইচ্ছা স্বীয় রহমতে দাখিল করে নেন। যদি তারা সরে যেত, তবে আমি অবশ্যই তাদের মধ্যে যারা কাফের তাদেরকে যন্ত্রনাদায়ক শস্তি দিতাম। কেননা, কাফেররা তাদের অন্তরে মূর্খতা–যুগের জেদ পোষণ করত। অতঃপর আল্লাহ তাঁর রসূল ও মু’মিনদের উপর স্বীয় প্রশান্তি নাযিল করলেন এবং তাদের জন্যে সংযমের দায়িত্ব অপরিহার্য করে দিলেন। বস্তুত তারাই ছিল এর অধিকতর যোগ্য ও উপযুক্ত। আল্লাহ সর্ববিষয়ে সম্যক জ্ঞাত।” (সূরা আল ফাত্হ, ৪৮:২৪–২৬)

 

হুদায়বিয়া সন্ধির আপত্তিকর শর্তটি বাতিল

“মক্কার কুরাইশদের কোন পুরুষ ব্যক্তি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে নিজ অভিবাবকদের অনুমতি ব্যতীত মদীনা চলে গেলে অভিবাবক চাওয়ামাত্র তাকে কুরাইশদের হাতে ফেরত দিতে হবে।” – এটি ছিল মুসলমানদের জন্য বৈষম্যমূলক ও আপত্তিকর একটি শর্ত।

এ সন্ধিচুক্তি সম্পাদনের কিছুদিন পর আবু বাসীর নামক মক্কার এক ব্যক্তি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে অভিকাবকের বিনা অনুমতিতে মদীনায় চলে আসেন। তাঁর অভিবাবক তাঁকে ফিরিয়ে আনার জন্য দু’ব্যক্তিকে মদীনায় পাঠালো। আবু বাসীর (রাঃ) যেতে না চাইলে নবীজী (সাঃ) তাঁকে বুঝিয়ে বললেন যে, সদ্য সম্পাদিত চুক্তির শর্তানুযায়ী তোমাকে ফেরত যেতে হবে। কেননা শর্ত ভঙ্গ করা ইসলাম অনুমোদন করে না।” তিনি তাঁকে ধৈর্য ধারণ এবং আল্লাহর উপর ভরসা করতে বললেন।

আবু বাসীরের মুক্ত হওয়ার ঘটনা

আবু বাসীর ফেরত যাওয়ার পথে প্রহরী দু’ব্যক্তির একজনকে কৌশলে হত্যা করেন। অপরজন পালিয়ে নবীজী (সাঃ) এর নিকট ফিরে এসে ঘটনার বিবরণ দেয়। এ সময় আবু বাসীরও সেখানে উপস্থিত হয়ে নবীজী (সাঃ)–কে  বললেন, “আপনি তাদের হাতে আমাকে হস্তান্তর করে আপনার প্রতিশ্রুতি ও দায়িত্ব পালন করেছেন। পরবর্তী কাজটি আমি আমার দায়িত্বে করেছি এবং মুক্ত হয়েছি। কারণ মক্কায় গিয়ে আমি ইসলাম থেকে বিচ্যুত হতে চাইনা।” এ কথা বলে তিনি সেখান থেকে বের হয়ে পড়েন এবং মদীনা ছেড়ে সিরিয়ার নিকটবর্তী লোহিত সাগরের উপকূলে ঈস নামক এক স্থানে চলে যান।

মক্কা থেকে পলাতক মুসলমানদের ঈসে আশ্রয় গ্রহণ

মক্কায় অবরুদ্ধ মুসলমানগণ আবু বাসীরের ঘটনা ও তাঁর বর্তমান অবস্থানের কথা জানতে পারলেন। তারাও সুযোগ বুঝে পালিয়ে একই স্থানে এসে তাঁর সাথে যুক্ত হন। এভাবে সত্তরজন পলাতক মুসলমানের একটি দল গঠিত হলো যারা হুদায়বিয়ার চুক্তির শর্তের কারণে মদীনায় যেতে পারছিলেন না।

ঈস স্থানটি ছিল সিরিয়ার সাথে কুরাইশদের বাণিজ্য–কাফেলাগামী পথ–সংলগ্ন। হুদায়বিয়ার সন্ধিচুক্তিতে এ বাণিজ্য পথের নিরাপত্তার বিষয়টি উল্লেখিত ছিল না। এ সুযোগে মক্কা থেকে পলাতক মুসলমানগণ প্রায়শই কুরাইশদের বাণিজ্য–কাফেলায় হামলা চালাতে লাগলেন। এতে কুরাইশরা ভীষণ সঙ্কটে পড়লো। তারা বুঝতে পারলো মক্কায় অবরুদ্ধ মুসলমানগ মদীনায় চলে গেলেই ভালো হতো।

অবশেষে তারা নবীজী (সাঃ) এর নিকট একটি প্রতিনিধিদল পাঠিয়ে চুক্তির এ শর্তটি বাতিলের অনুরোধ জানালে তিনি তাতে অনুমোদন দেন। আর এভাবেই এ বৈষম্যমূলক ধারাটি বাতিল হয়ে গেলো এবং ঈস থেকে মুসলমানগণ মদীনায় চলে আসলেন।

উম্মে কুলসুম (রাঃ) এর মদীনায় আগমনের বিষয় নিষ্পত্তি

এ ধরনের আরেকটি ঘটনা হলো মক্কার মহিলা মুসলিম উম্মে কুলসুম (রাঃ) যিনি সবার নজর এড়িয়ে মদীনায় চলে আসেন। তাঁকে ফেরত আনার জন্য তাঁর দুই অমুসলিম ভাই মদীনায় এসে তাঁকে ফেরত দেওয়ার দাবী জানান। কিন্তু নবীজী (সাঃ) তাঁকে ফেরত দিতে অস্বীকার করে বলেন, “ফেরত দেওয়ার ব্যাপারে চুক্তিতে পুরুষদের কথা বলা হয়েছে মহিলাদের ব্যাপারে কিছু বলা হয়নি। সুতরাং মুসলিম মহিলাদের নিরাপত্তা বিধানের দায়িত্ব আমাদের। এছাড়া মুসলিম মহিলার অমুসলিম স্বামী থাকা ইসলামের শরীয়তের পরিপন্থী।”

এ ব্যাপারে পবিত্র কুরআনেও মহান আল্লাহর স্পষ্ট নির্দেশ রয়েছে:

♥ “মুমিনগণ, যখন তোমাদের কাছে ঈমানদার নারীরা হিজরত করে  করে, তখন তাদেরকে পরীক্ষা কর। আল্লাহ তাদের ঈমান সম্পর্কে সম্যক অবগত আছেন। যদি তোমরা জান যে, তারা ঈমানদার, তবে আর তাদেরকে কাফেরদের কাছে ফেরত পাঠিও না। এরা কাফেরদের জন্যে হালাল নয় এবং কাফেররা এদের জন্যে হালাল নয়। কাফেররা যা ব্যয় করেছে, তা তাদের দিয়ে দাও। তোমরা, এই নারীদেরকে প্রাপ্য মোহরানা দিয়ে বিবাহ করলে তোমাদের অপরাধ হবে না। তোমরা কাফের নারীদের সাথে দাম্পত্য সম্পর্ক বজায় রেখো না। তোমরা যা ব্যয় করেছ, তা চেয়ে নাও এবং তারাও চেয়ে নিবে যা তারা ব্যয় করেছে। এটা আল্লাহর বিধান; তিনি তোমাদের মধ্যে ফয়সালা করেন। আল্লাহ সর্বজ্ঞ প্রজ্ঞাময়।” (সূরা আল মুমতাহিনা, ৬০:১০)

 

খয়বরের যুদ্ধ

মক্কার কুরাইশদের সাথে হুদায়বিয়র সন্ধি চুক্তি সম্পাদনের পর মদীনার দক্ষিণাঞ্চল শান্ত ছিল। তবে মদীনার নিকটবর্তী খয়বরের ইহুদী বসতি তখনও ছিল এক বিপদজনক বিষফোঁড়ার মতো। অব্যাহত অসহযোগিতা ও বিশ্বাসঘাতকতার দরুণ তাদের সাথে মুসলমানদের শান্তি প্রচেষ্টা বার বার ব্যাহত হচ্ছিল।

  • খয়বরের ইহুদী গোত্রগুলো নিজেদের সাহসী যোদ্ধা মনে করতো এবং নিজেদের সুরক্ষিত দুর্গ ও প্রচুর যুদ্ধোপকরণের জন্য আত্মম্ভরিতা ও ঔদ্ধত্য প্রকাশ করতো। অবশ্য সমগ্র আরবে তাদের বিপুল শক্তিমত্তার খ্যাতি ছিল।
  • নিজেরা একত্ববাদী ধর্মের অনুসারী বলে দাবী করলেও তারা একত্ববাদী ধর্ম ইসলাম ও মুসলিমদের প্রতি ছিল প্রচন্ড বিদ্বেষপরায়ণ। বিভিন্ন সময়ে মুসলমানদের শত্রুদের সাথে এমনকি একত্ববাদ বিরোধী পৌত্তলিকদের সাথেও তাদের বন্ধুত্ব ছিল লক্ষ্যণীয়।

হুদায়বিয়া থেকে ফিরে আসার পর এহেন পরিস্থিতিতে নবী করীম (সাঃ) খয়বরের ইহুদী গোত্রগুলোর বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত নেন। হুদায়বিয়া থেকে ফেরত সকল মুসলিমকে এ যুদ্ধে শরীক হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

সর্বমোট ষোল শত জনের একটি বাহিনী নিয়ে তিনি খয়বর অবরোধ করেন এবং ইহুদীদেরকে আত্মসমর্পণ করার নির্দেশ দেন। কিন্তু তারা সে নির্দেশ অমান্য করে নিজেদের সুরক্ষিত দুর্গে অবস্থান নেয় এবং সেখান থেকে মুসলিম বাহিনীর উপর আক্রমণ চালাতে শুরু করে। উভয় পক্ষে প্রচন্ড আক্রমণ ও পাল্টা–আক্রমণের সূত্রপাত হয়।

ইহুদীরা আশা করেছিল তাদের মিত্র বনু গাতফান গোত্রের লোকজনেরা তাদের সাহায্যার্থে এগিয়ে আসবে। কিন্তু মুসলিম বাহিনী তাদের আগমণের সকল পথ রুদ্ধ করে রেখেছিল। মুসলিম বাহিনী আক্রমণের পর আক্রমণ চালিয়ে খয়বরের দশটি  দুর্ভেদ্য দুর্গ একের পর এক দখলে নিতে থাকে। অবশেষে ইহুদীদের সবগুলো দুর্গের পতন ঘটে এবং মুসলিম বাহিনীর বিজয় সাধিত হয়।

যুদ্ধের পূর্বে হযরত আলী (রাঃ) চক্ষু–পীড়ায় আক্রান্ত হয়ে পড়েছিলেন। নবীজী (সাঃ) নিজ মুখের পবিত্র লালা তাঁর চোখে লাগিয়ে দিলে তিনি আরোগ্য লাভ করেন এবং এ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। তাঁর অসামান্য বীরত্ব খয়বরের দুর্গসমূহের পতন ঘটাতে সহায়ক হয়েছিল।

মুসলমানদের এ বিজয় সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে পূর্ব থেকেই আভাস দেওয়া হয়েছিল:

♥ “এবং আরও একটি অনুগ্রহ দিবেন, যা তোমরা পছন্দ কর। আল্লাহর পক্ষ থেকে সাহায্য এবং আসন্ন বিজয়। মুমিনদেরকে এর সুসংবাদ দান করুন।” (সূরা আছ ছফ, ৬১:১৩)

খয়বর যুদ্ধে পরাজিত ইহুদীরা সবাই আত্মসমর্পণ করে। তাদের সকল দর্প ও প্রভাব–প্রতিপত্তি চূর্ণ হয়ে যায়। নবী করীম (সাঃ) তাদেরকে খায়বর থেকে বিতাড়িত করেননি বরং তাদেরকে সেখানে বসবাসের অনুমতি দেনঅর্ধেক ফসলের বিনিময়ে তারা তাদের ক্ষেত–খামার ও ফলের বাগানে কাজ করার অনুমতি পায়।

খয়বর বিজয়ের পর মদীনার উত্তর প্রান্তে শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়।

 

শান্তিময় পরিবেশে ইসলামের প্রচার ও প্রসার

হুদায়বিয়ার সন্ধি ও খয়বর যুদ্ধে মুসলমানদের বিজয় মদীনা রাষ্ট্রে এক শান্তিপূর্ণ পরিবেশের সৃষ্টি করে। কুরাইশদের সর্বাত্মক বিরোধিতা ও আগ্রাসন এতদিন যে বাধাবিপত্তির পাহাড় গড়ে তুলেছিল হুদায়বিয়ার সন্ধি তা অপসারণ করে দিলো। অপরদিকে খয়বর যুদ্ধে ইহুদীদের পরাজয় মদীনায় শান্তির পরিবেশ সৃষ্টি করে। এখন নবী করীম (সাঃ) অনায়াসে সর্ব সাধারণ্যে ইসলাম প্রচারের কাজ চালিয়ে যেতে পারছিলেন। ফলে আরব উপদ্বীপে ইসলামের দ্রুত প্রচার ও প্রসারের কাজে নতুন গতি সঞ্চারিত হয়।

ইতোমধ্যেই মদীনার বুকে একটি আদর্শ মুসলিম সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) শুধু আল্লাহর নবী ও রসূলই ছিলেন না, তাঁর পরিচয় শুধু ধর্মপ্রচারক ও আধ্যাত্মিক–গুরুর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং আধ্যাত্মিকতা ও জাগতিক সব বিষয়েই তিনি ছিলেন মানব জাতির জন্য একজন আদর্শ ব্যক্তিত্ব এবং মানুষের ইহকালীন ও পরকালীন জীবনের এক মহা পথ–প্রদর্শক।

তাঁর নেতৃত্বে ও মুসলিম উম্মাহর অপরিসীম ত্যাগ–তীতিক্ষায় প্রচারিত ইসলাম ধর্মের  একত্ববাদের বাণী এবং সাম্য, মৈত্রী ও শান্তির বারতা আরব ও আরবের বাইরেও দ্রুত প্রসার লাভ ঘটতে শুরু করে। এ মহামানবের সংস্পর্শে আসার সৌভাগ্য যাঁদের হয়েছিল তাঁরা প্রত্যেকেই আলোকিত মানুষে পরিণত হয়েছিলেন। ফলে একটি কুসংস্কারবদ্ধ বর্বর সমাজ উন্নত সভ্য সমাজের মর্যাদায় উন্নীত হয়েছিল।

ইসলামের বিশ্বজনীন দাওয়াতী কার্যক্রম

কুরাইশদের সথে হুদায়বিয়ার শান্তি চুক্তি ও খয়বর যুদ্ধ পরবর্তী সময়টিতে বিরাজ করছিল মোটামুটি নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ। এ সময়টি ছিল ইসলাম প্রচার ও প্রসারের এক মোক্ষম সময় ও সুবর্ণ অধ্যায়। এ অনুকূল পরিবেশে নবী করীম (সাঃ) আরবের বিভিন্ন গোত্র এবং এমনকি আরবের বাইরেও, শক্তিশালী রাজা–বাদশাহর নিকট দূত মারফৎ পত্রযোগে  ইসলামের দাওয়াত পৌঁছানোর কাজ শুরু করলেন।

সে সময় ইসলামের দাওয়াত পত্র যেসব রাজা–বাদশাহর নিকট পাঠানো হয়েছিল তারা হলো:

১. রোম সম্রাট হীরাক্লিয়াস,

২. পারস্য সম্রাট দ্বিতীয় খসরু,

৩. আবিসিনিয়ার নেগাস আরামাহ,

৪. মিসরের শাসনকর্তা মারক্যুয়িস,

৫. সিরিয়ার গভর্ণর হারিছ গাসছানি,

৬. বাহরাইনের শাসক মুনজির ইবনে সাওয়া,

৭. ওমানের যুগ্ম শাসক আব্দ ও জায়ফর,

৮. ইয়েমেনের যুবরাজ হিমাইরী হারিছ ইবনে আব্দ কুলাল ও

৯. ইয়েমামার রাজকন্যাদ্বয় দুমামা ও হাওযা ইবনে আলী।

এসব পত্রে ‘মুহাম্মাদুর রসূলুল্লাহ্’ নামাঙ্কিত সীলমোহর ছিল। এসব চিঠির প্রতিক্রিয়া ছিল ভিন্ন ধরনের। কেহ এ আহ্বানে সাড়া দিয়ে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন, যেমন, আবিসিনিয়ার রাজা ও ইয়েমেনের যুবরাজ। দু’য়েকজন ব্যতীত অন্যরা তা বিনয়ের সাথে প্রত্যাখ্যান করেছেন। পারস্য সম্রাট অত্যন্ত বিরূপ আচরণ দ্বারা পত্রদূতকে প্রত্যাখ্যান করে এবং বুসরার গভর্ণর শোরাহবিল মুসলিম দূতকে হত্যা করে।

রোম সম্রাট হীরাক্লিয়াসকে প্রদত্ত দাওয়াতি চিঠির অনুলিপি নিম্নে উদ্ধৃত করা হলো:

♦ “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম (পরম করূণাময় দয়ালু ও দাতা আল্লাহর নামে)  – আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রসূল মুহাম্মদের তরফ থেকে বায়জেন্টাইনের শাসক সম্রাট হীরাক্লিয়াসের প্রতি। যে সঠিক পথে চলে তাঁর উপার আল্লাহর শান্তি বর্ষিত হোক। অধিকন্তু, আমি আপনাকে ইসলামের দিকে দাওয়াত দিচ্ছি এবং আপনি যদি ইসলাম কবুল করেন শান্তি ও নিরাপত্তা লাভ করবেন, এবং আল্লাহ্ আপনাকে দ্বিগুন পুরস্কার দিবেন। আর যদি আপনি ইসলামের দাওয়াত প্রত্যাখ্যান করেন তাহলে আপনার প্রজাদের বিপথগামীতাজনিত পাপের ভাগীদার হবেন। আল্লাহর বাণী আপনার নিকট পাঠ করছি”: (হে নবী) বলুনঃ ‘হে আহলে–কিতাবগণ! একটি বিষয়ের দিকে আস – যা আমাদের মধ্যে ও তোমাদের মধ্যে সমান -যে, আমরা আল্লাহ্ ছাড়া অন্য কারও ইবাদত করব না, তাঁর সাথে কোন শরীক সাব্যস্ত করব না এবং একমাত্র আল্লাহকে ছাড়া কাউকে পালনকর্তা বানাব না। তারপর যদি তারা স্বীকার না করে, তাহলে বলে দিন যে, ‘সাক্ষী থাক আমরা তো মুসলমান (অনুগত)।” (সূরা আলে ইমরান, ৩:৬৪)

সম্রাট হীরাক্লিয়াস ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও তাঁর সেনাবাহিনীর ভয়ে হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর আহ্বান গ্রহণ করেননি। হযরত আনাস ইবনে মালিক বর্ণিত হাদীসে উপরোক্ত চিঠিটি লেখার পর নবীজী (সাঃ) বলেন,

‘কে আছ যে আমার এ পত্রটি সীজারের নিকট পৌঁছাবে এবং এর বিনিময়ে জান্নাত লাভ করবে?’

উপস্থিত লোকজনের একজন বললেন,

‘এমনকি আমাকে যদি হত্যা করা না হয় তবুও?’

নবীজী (সাঃ) বললেন,

‘এমনকি তোমাকে হত্যা করা না–ও হয়।’

ঐ ব্যক্তি পত্রটি সম্রাটের হাতে পৌঁছে দিলেন। চিঠি পড়া শেষ করে সম্রাট পুরোহিত প্রধানকে ডেকে পাঠালেন। তিনি এটা পড়লেন এবং আদেশ করলেন প্রাসাদের দরজাগুলো বন্ধ করে দিতে। এরপর তিনি একজনকে ঘোষণা করতে বললেন, ‘সীজার নিশ্চিতভাবে মুহাম্মদের অনুসারী হয়ে গেছে এবং খৃস্টধর্ম ত্যাগ করেছে।’

এ ঘোষণায় সশস্ত্র সৈন্যরা তাঁকে প্রাসাদের মধ্যে অবরুদ্ধ করে ফেললো। সীজার তখন নবীজী (সাঃ) এর উদ্দেশ্যে বললেন, ‘ আপনি কি দেখতে পাচ্ছেন আমি আমার সাম্রাজ্যের ভয়ে ভীত?’

এরপর তিনি একজনকে ঘোষণা দিতে বললেন, ‘অবশ্যই সীজার তোমাদের প্রতি সন্তুষ্ট যে তিনি দেখতে চেয়েছিলেন তোমরা তোমাদের ধর্ম সম্পর্কে কতটা ঐকান্তিক। সুতরাং তোমরা ফিরে যাও।’

সৈন্যরা ফিরে গেলো। সীজার তখন নবী করীম (সাঃ)–কে লিখলেন, ‘অবশ্যই, আমি একজন মুসলিম,’ এবং তিনি তাঁকে কিছু স্বর্ণমুদ্রা প্রেরণ করলেন।

সীজারের পত্রটি যখন তাঁকে পড়ে শুনানো হলো নবীজী (সাঃ) বললেন,

‘♦ আল্লাহর শত্রু মিথ্যা বলেছে। সে মুসলমান নয়, সে খৃস্ট ধর্মের উপর রয়েছে।’ (সহীহ ইবনে হিসবান ৪৫০৪)

মানবজাতির প্রতি ইসলামের উদাত্ত আহ্বানের মর্মার্থ

বিশ্বের শাসকবৃন্দের নিকট ইসলামের দাওয়াত পৌঁছানোর মাধ্যমে একত্ববাদী ধর্ম ইসলাম এক সার্বজনীন রূপ ধারণ করে। মহান আল্লাহ্ মানবতার কল্যাণে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর মাধ্যমে মানবজাতির প্রতি যে আহ্বান জানিয়েছিলেন তার মর্মার্থ তা পবিত্র কুরআনের ভাষায় নিম্নরূপ:

♥ “(হে নবী) আপনি একনিষ্ঠভাবে নিজেকে ধর্মের উপর প্রতিষ্ঠিত রাখুন। এটাই আল্লাহর প্রকৃতি, যার উপর তিনি মানুষ সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহর সৃষ্টির কোন পরিবর্তন নেই। এটাই সরল ধর্ম। কিন্তু অধিকাংশ মানুষ জানে না।” (সূরা আর রোম, ৩০:৩০)

♥ “হে মানবকুল! তোমাদের পরওয়ারদেগারের পক্ষ থেকে তোমাদের নিকট সনদ পৌঁছে গেছে। আর আমি তোমাদের প্রতি প্রকৃষ্ট আলো (কুরআন) অবতীর্ণ করেছি। অতএব, যারা আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছে এবং তাতে দৃঢ়তা অবলম্বন করেছে, তিনি তাদেরকে স্বীয় রহমত ও অনুগ্রহের আওতায় স্থান দেবেন এবং নিজের দিকে আসার মত সরল পথে তুলে দেবেন।” (সূরা নিসা, ৪:১৭৪–১৭৫)

♥ “হে মানবকুল, তোমাদের পরওয়ারদেগারের পক্ষ থেকে তোমাদের কাছে উপদেশবানী (কুরআন) এসেছে, (যা) তোমাদের অন্তরের রোগের নিরাময়স্বরূপ, (এবং) মোমেনদের জন্য হেদায়েত ও রহমতস্বরূপ। (হে নবী) বলুন, আল্লাহর দয়া ও মেহেরবাণীর কারণে এরই প্রতি তাদের আনন্দতি থাকা উচিৎ। এটিই উত্তম সে সমুদয় (জ্ঞান ও সম্পদ) থেকে যা তারা (এ যাবৎ) সঞ্চয় করছে।” (সূরা ইউনূস, ১০: ৫৭–৫৮)

 

 

অধ্যায়সমূহ