এ অধ্যায়ের বিষয়সমূহ
Toggleমদীনার পার্শ্ববর্তী শত্রু গোত্রগুলোর বিরুদ্ধে অভিযান
ওহুদ যুদ্ধের বিপর্যের পর মদীনার সার্বিক পরিস্থিতি বেশ উত্তাল হয়ে উঠে। পার্শ্ববর্তী শত্রু গোত্রগুলো ওহুদ যুদ্ধে মুসলমানদের শক্তি খর্ব হয়েছেে এ ধারণাবশত মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো। নবী করীম (সাঃ) মদীনার মুসলিম শক্তিকে সুসংহত করতে এবং পার্শ্ববর্তী শত্রু মনোভাবাপন্ন গোত্রগুলোর ষড়যন্ত্র ও লুটপাট ঠেকাতে সতর্ক পরিকল্পনা গ্রহণ করলেন এবং এদের অপতৎপরতা ঠেকাতে তিনি সময়োপযোগি অভিযান পরচালনার সিদ্ধান্ত নিলেন।
বনী আসাদ গোত্রের বিরদ্ধে অভিযান
তিনি খবর পেলেন বনী আসাদ গোত্রের নেতৃবৃন্দ মুসলমানদের গবাদি পশু ও অন্যান্য মালামাল লুট করার পরিকল্পনা আঁটছে। নবীজী (সাঃ) বিশিষ্ট সাহাবী আবু সালামা (রাঃ) এর নেতৃত্বে ১৫০ জনের একটি বাহিনীকে বনী আসাদ গোত্রের বিরুদ্ধে অভিযানে প্রেরণ করলেন। তিনি নির্দেশ দিলেন অতি সন্তর্পণে এবং আকস্মিকভাবে আক্রমণ পরিচালনা করতে যাতে প্রতিপক্ষ প্রতিরোধের কোন সুযোগ না পায়। আক্রমণ টের পেয়ে আসাদ গোত্রের লোকেরা পলাতে শুরু করে। মুসলিম বাহিনী তাদের পশ্চাদ্ধাবন করে কয়েকজনকে আটক করে এবং তাদের মালামাল জব্দ করে নিয়ে আসে।
হুযালী গোত্রের বিরুদ্ধে অভিযান
হুযালী নামীয় অপর এক গোত্রের আক্রমণ পরিকল্পনার খবর পেয়ে নবীজী (সাঃ) গোপনে তথ্য সংগ্রহের জন্য সাহাবী হযরত আব্দুল্লাহ্ ইবনে উনায়সা (রাঃ)-কে প্রেরণ করেন। তিনি ছদ্মবেশ ধারণ করে হুযালী গোত্রের নেতা খালিদ ইবনে সুফিয়ানের নিকট পৌঁছেন এবং অতর্কিত আক্রমণ চালিয়ে তাকে হত্যা করেন। ফলে তাদের মদীনা আক্রমণের পরিকল্পনা ভেস্তে যায়। এসব অভিযানে একদিকে মুসলমানদের মনোবল বৃদ্ধি পায়, অপরদিকে শত্রুদের ধারণাও ভুল প্রমাণিত হয়।
কিছু হৃদয়বিদারক ঘটনা
বনু লিহইয়ান গোত্রের বিশ্বাসঘাতকতার ঘটনা
হুযালী গোত্রের নেতা খালিদ হত্যার প্রতিশোধ নিতে তারা প্রতিবেশী বন্ধু গোত্র বনু লিহইয়ানের নিকট সাহয্য চাইলো। বনু লিহইয়ানের একটি প্রতিনিধি দল মদীনায় এসে প্রতারণাপূর্বক নবীজী (সাঃ)–কে জানালো তাদের গোত্রের লোকজন ইসলাম ধর্ম কবুল করেছে। তাদেরকে পবিত্র কুরআন ও ধর্মীয় হুকুম–আহকাম শিক্ষা দেওয়ার জন্য কয়েকজন মুসলিম শিক্ষক প্রয়োজন। সত্য দ্বীন ইসলাম প্রচারের মাধ্যমে মানুষজনকে হেদায়েতের পথে আনার উদ্দেশ্যে নবীজী (সাঃ) সরল বিশ্বাসে তাদের এ প্রস্তাবে রাজী হলেন। তিনি ছয়জন সাহাবীকে তাদের সঙ্গে পাঠালেন।
মুসলিম শিক্ষক দলটির ওপর আক্রমণ
বনু লিহইয়ানের প্রতিনিধি দলটি মুসলিম শিক্ষকদেরকে নিয়ে হুযালী গোত্রের কাছাকাছি রাজী নামক স্থানে পৌঁছে ঐ গোত্রের লোকজনকে বেরিয়ে আসার আহ্বান জানায়। সে আহ্বানে তৎক্ষণাৎ সাড়া দিয়ে তারা সেখানে এসেই মুসলিম শিক্ষকদের ঘেরাও করে ফেললো। তাঁরা বিপদ আঁচ করতে পেরে নিজেদের অসি খাপমুক্ত করলেন এবং আত্মরক্ষার প্রস্তুতি নিলেন। হুযালী গোত্রের লোকজন তাঁদেরকে বললো, ‘আমরা তোমাদেরকে হত্যার পরিবর্তে মক্কার কুরাইশদের হাতে সমর্পণ করব।’ তাঁরা দৃঢ়তার সাথে এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বললেন, ‘আমরা তোমাদের সাথে লড়াই করেই প্রাণ দেব।’ এ কথা বলেই তাঁরা উম্মুক্ত তরবারী হাতে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। তাঁদের মধ্যে তিনজন শহীদ হয়ে গেলেন আর বাকী তিনজন বন্দী হলেন।
আল্লাহর দ্বীনের স্বার্থে এবং নবীজী (সাঃ) এর প্রতি ভালোবাসায় নিজেদের জীবন উৎসর্গ
বন্দীদের নিয়ে মক্কায় যাওয়ার পথে সাহাবী আব্দুল্লাহ্ ইবনে তারিক (রাঃ) কাফেরদের হাত থেকে মুক্ত হয়ে পালাতে শুরু করেন। শত্রুরা তাঁর পশ্চাদ্ধাবন করলে তিনি তরবারী হাতে ঘুরে দাঁড়ান। তারা তাঁর তরবারীর সম্মুখে যাওয়ার পরিবর্তে প্রস্তর নিক্ষেপ করতে শুরু করলো। অবশেষে তিনি তাদের প্রস্তরাঘাতে শহীদ হয়ে যান। অবশিষ্ট দুই মুসলিম বন্দী হযরত যায়েদ ইবনে দাসনা (রাঃ) ও হযরত খোবায়েব (রাঃ)–কে নিয়ে তারা মক্কায় যায়। সেখানে তারা হযরত যায়েদ (রাঃ)-কে বিক্রী করে সাফওয়ান ইবনে উমাইয়ার নিকট। সাফওয়ান বদর যুদ্ধে তার পিতা কুরাইশ নেতা উমাইয়া ইবনে খালফের হত্যাকারী হযরত যায়েদ (রাঃ)-কে ক্রয় করে পিতৃহত্যার প্রতিশোধ গ্রহণার্থে। তাঁকে হত্যা করার জন্য সে তার ক্রীতদাস নাসতাসকে নির্দেশ দেয়।
বধ্যভূমিতে নিয়ে যাওয়ার পথে যায়েদ (রাঃ) এর সাথে কুরাইশ নেতা আবু সুফিয়ানের দেখা হয়। সে তাঁকে জিজ্ঞেস করে, ‘তোমার পরিবর্তে মুহাম্মদ (সাঃ)-কে হত্যা করা হবে আর তুমি নিরাপদে আমাদের সাথে জীবন কাটাতে করতে পারবে – এ প্রস্তাবে রাজী আছ কি?’ তিনি ঘৃণাভরে তার প্রস্তাব নাকচ করে দিয়ে বলেন, ‘আল্লাহর কসম, নবীজী (সাঃ) এর শরীরের একটি পশমের ক্ষতি হোক এমন প্রস্তাব কক্ষণোই আমার কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।’ তাঁর দৃঢ় প্রত্যয়যুক্ত উত্তরে আবু সুফিয়ান আশ্চর্যান্বিত হয়ে বলে উঠে, ‘মুহাম্মদ (সাঃ) এর সহচরবৃন্দের মত এত নিষ্ঠাবান লোক আমি কখনও দেখিনি।‘ নবীজী (সাঃ) এর প্রতি অপরিসীম শ্রদ্ধা ও ভালবাসার পরাকাষ্ঠা দেখিয়ে তিনি শাহাদাত বরণ করেন।
এরপর রইলেন হযরত খোবায়েব (রাঃ)। মক্কার কুরাইশরা তাঁকেও হযরত যায়েদ (রাঃ) এর মত একই রকমের প্রস্তাব দিয়েছিল। তিনিও ঘৃণাভরে তাদের সে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। তাঁকে ফাঁসীতে ঝুলানোর জন্য তারা বধ্যভুমিতে নিয়ে গেলো। তিনি দু’রাকাত নামায পড়ার জন্য তাদের কাছে অনুমতি চাইলেন। তিনি নামায আদায় করে বললেন, ‘আমি নামায দীর্ঘায়িত করিনি কারণ তোমরা মনে করতে পার যে মৃত্যুভয়ে আমি দেরী করছি।’ ফাঁসীর দড়ি পড়ানোর সময় তিনি মহান আল্লাহর দরবারে কাফেরদের অপমানজনক শাস্তি চেয়ে দোয়া করলেন। কাফেররা ভীত হয়ে দ্রুত তাঁর ফাঁসী কার্যকর করে।
এভাবে সাহাবীগণ আল্লাহর দ্বীনের স্বার্থে এবং নবীজী (সাঃ) এর প্রতি তাঁদের অকুন্ঠ শ্রদ্ধা ও ভালবাসা সমুন্নত রেখে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছেন। মদীনায় এ মর্মান্তিক বিশ্বাসঘাতকতার ঘটনা ও সাহাবীদের করুণ মৃত্যুর খবর পৌঁছুলে নবী করীম (সাঃ) সহ সকল মুসলমান অত্যন্ত বেদনাহত হয়ে পড়েন।
বী’রে মাওনায় অপর এক বিশ্বাসঘাতকতার ঘটনা
বনু লিহইয়ান গোত্রের বিশ্বাসঘাতকতার ঘটনার পর হিজরী চতুর্থ বর্ষে অনুরূপ আরেকটি বিশ্বাসঘাতকতার ঘটনা ঘটে। নজদ এলাকা থেকে আগত কিলাব গোত্রের সর্দার আবুল বারা নবী করীম (সাঃ) এর সাথে সাক্ষাত করলো। তিনি তাকে ইসলাম গ্রহণের দাওয়াত দিলেন। সে ইসলাম কবুল না করেই বললো, ‘আমিতো ইসলামের শত্রু নই।’ অবশ্য এ গোত্রের সাথে মুসলমানদের মৈত্রী চুক্তি ছিল। সে নবীজী (সাঃ)-কে অনুরোধ করে বললো, ‘আপনি অমার সঙ্গে একটি মুসলিম প্রতিনিধিদল পাঠিয়ে দিন যাতে তাঁরা নজদ অঞ্চলে ইসলাম প্রচার করতে পারেন।’ লিহইয়ান গোত্রের বিশ্বাসঘাতকতার কথা স্মরণ করে তিনি এ প্রস্তাবের কোন উত্তর দিলেন না। কিন্তু গোত্রপতি আবুল বারা বারংবার অনুরোধ জানাতে থাকলো এবং মুসলমানদের নিরাপত্তা দানের ওয়াদা করলো। সে প্রভাবশালী বিধায় কাউকে নিরাপত্তা দিলে তা ভঙ্গ করার সাহস তার গোত্রের অন্য কারোর ছিল না। অবশেষে তার অনুরোধে নবী করীম (সাঃ) হযরত মুনযের (রাঃ) এর নেতৃত্বে মতভেদে সত্তর বা চল্লিশ জনের একটি মুসলিম ধর্মপ্রচারক দল তার সাথে প্রেরণ করলেন। যাত্রকালে তিনি কিলাব গোত্রের পার্শ্ববর্তী বনী আমের গোত্রের সর্দার আমের ইবনে তোফায়েলের নিকট একটি পত্র লিখে দিলেন।
তাঁরা যখন বী’রে মাওনায় পৌঁছান তখন তৎসংলগ্ন বনী আমের গোত্রের সর্দার আমেরের নিকট নবীজী (সাঃ) এর পত্রটি হস্তান্তর করতে হযরত হারাম ইবনে মালহান (রাঃ)-কে পাঠানো হয়। সে তাঁর প্রেরিত পত্রটি পাঠ না করেই পত্রবাহক হযরত হারাম (রাঃ)-কে হত্যা করে ফেলে। একই সাথে সে তার গোত্রের লোকজন ও পার্শ্ববর্তী গোত্রসমূহের লোকজনের সমাবেশ ঘটিয়ে মুসলিম প্রতিনিধিদলটিকে ঘেরাও করে। এতে অবশ্য কিলাব গোত্রের লোকজন অংশ নেয়নি কারণ তাদের গোত্রপতি আবুল বারা মুসলমানদের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিয়েছিল।
অবস্থা পরিদৃষ্টে মুসমানগণ আত্মরক্ষার্থে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। কিন্তু কিলাব গোত্রে কেউ এগিয়ে এলো না। ফলে দু’জন ব্যতীত অন্য সবাই শহীদ হয়ে গেলেন। এ দু’জনের মধ্যে হযরত কাআব ইবনে যায়েদ (রাঃ) পালাতে সক্ষম হন এবং মদীনায় ফিরে আসেন। অপরজন হযরত আমর ইবনে উমাইয়া (রাঃ)-কে অন্য কারণে মুক্তি দেওয়া হয়। এ ঘটনায় ক্ষিপ্ত কিলাব গোত্রের নেতা আবুল বারা আমের গোত্রের নেতা আমেরকে হত্যা করে।
হযরত আমর ইবনে উমাইয়া (রাঃ) মদীনা ফেরার পথে কারকারা নামক এক জায়গায় কিলাব গোত্রের দু’জনকে হত্যা করেন। মদীনা ফিরে এসে এ ঘটনা তিনি নবীজী (সাঃ)-কে অবগত করেন। যেহেতু কিলাব গোত্রের সাথে মুসলমানদের মৈত্রী চুক্তি ছিল সেহেতু শর্তানুযায়ী তিনি এ দুই হত্যাকান্ডের রক্তপণ প্রদান করেন।
বী’রে মাউনার ঘটনা নবীজী (সাঃ) ও সহচরবৃন্দকে ভীষণভাবে ব্যথিত করে। তাঁরা মহান আল্লাহর দরবারে পরম ধৈর্যধারণ করেন এবং তাঁর কাছে মদদ ভিক্ষা করেন। আল্লাহর দ্বীন প্রচারের স্বার্থে জীবন উৎসর্গকারী এসব সাহাবীগণকে বেহেশতে উচ্চ মর্যাদা দানের জন্য তাঁরা প্রার্থনা করতে থাকেন।
মদীনা–সনদের চুক্তি ভঙ্গের প্রবণতা
হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর নেতৃত্বে মদীনা সনদের মৈত্রী চুক্তির অন্তর্ভুক্ত সকল সম্প্রদায়ের সমন্বয়ে নব্য প্রতিষ্ঠিত মদীনা রাষ্ট্র ছিল একটি শুভ সূচনা। এর দ্বারা আরবের শতধবিভক্ত অনগ্রসর ও কুসংস্কারপূর্ণ জনগোষ্ঠীর উন্নয়নের এক সুবর্ণ সুযোগের দ্বার উন্মোচিত হয়েছিল। ইসলাম ধর্মের সংস্পর্শে এ সম্ভাবনা ছিল খুবই উজ্জ্বল। ইসলামের সহজ সরল জীবন ব্যবস্থা ও মুহাম্মদ (সাঃ) (সাঃ) এর নবীসুলভ গুণাবলীতে মুগ্ধ মদীনাবাসী সাধারণ মানুষের মধ্যে ইসলাম গ্রহণের প্রবণতা বৃদ্ধি পায়। এর ফলে মুসলমানদের প্রভাব–প্রতিপত্তিও বাড়তে থাকে।
মদীনার ইহুদী ও মুনাফিক সম্প্রদায়ের সম্মিলিত ষড়যন্ত্র
মদীনার বুকে স্বল্প সময়ে মুসলিম সমাজের উত্থান অন্যান্য সম্প্রদায়কে ঈর্ষান্বিত করে তোলে। এরই মধ্যে বদর যুদ্ধে মুসলমানদের বিজয় তাদের বিদ্বেষকে আরও বাড়িয়ে দেয়। মদীনার ইহুদী ও মুনাফিক সম্প্রদায়ের সম্মিলিত ষড়যন্ত্র ও প্রচার–প্ররোচনা তুঙ্গে উঠলো। তাদের মধ্যে কিছু কায়েমী স্বার্থান্বেষী মহল ইসলামের সুনাম বিনষ্ট করার চক্রান্তে মেতে উঠে।
- মক্কার মুশরিক কবিয়ালদের মত ইহুদী কবিয়ালরাও নবী মুহাম্মদ (সাঃ) এর বিরুদ্ধে জঘন্য অপবাদ ও বিদ্বেষপূর্ণ কবিতার আসর জমাতে শুরু করলো।
- ইহুদী সর্দার কাআব ইবনে আশরাফ ছিল এমনি একজন মুসলিম বিদ্বেষী কবি। আসমা বিনতে মারওয়ান নাম্নী অপর এক মহিলা কবিও যুক্ত হয়েছিল তার সাথে।
ইহুদীদের মুসলিম বিদ্বেষী তৎপরতা
ইহুদী সর্দার কাআব ইবনে আশরাফ এতটাই মুসলিম বিদ্বেষী ও উগ্রপন্থী ছিল যে সে বদর যুদ্ধে কুরাইশদের পরাজয়ের ঘটনাটি বিশ্বাস করতে পারছিল না। এর সত্যতা যাচাইয়ে সে নিজে তার দলবল নিয়ে মক্কায় যায়। সেখানে সে কিছুদিন অবস্থান করে প্রকৃত ঘটনা অবগত হয় এবং কুরাইশদেরকে তার রচিত কবিতা দিয়ে উত্তেজিত করে ও প্রতিশোধ গ্রহণের উসকানি দেয়।
মদীনার ইহুদী বনী নজীর গোত্রও একটি প্রতিনিধিদল মক্কায় প্রেরণ করে। সেই দলের প্রতিনিধি হুয়াই ইবনে আখতাব কুরাইশদেরকে বললো, ’মদীনার বিভিন্ন ইহুদী গোত্রের লোকজন কুরাইশদের সাহার্যার্থে উদগ্রীব হয়ে আছে।’ কুরাইশরা জানতো ইহুদীরা কিতাবধারী এবং জ্ঞানী সম্প্রদায়। তাদের মনে এ চিন্তার উদয় হলো – কেন ইহুদীরা একত্ববাদী হয়েও ইসলাম ধর্মের বিরোধীতা করছে? তারা হুয়াই ইবনে আখতাবকে জিজ্ঞেস করলো, ’ইসলাম না পৌত্তলিক – কোন ধর্ম উত্তম?’ উত্তরে সে মিথ্যাচার করে বললো, ‘আপনাদের ধর্মই উত্তম।’
নবীজী (সাঃ)–কে হত্যার ষড়যন্ত্র
বিদ্বেষ পোষণের মধ্যেই তাদের কর্মকান্ড থেমে থাকেনি, তারা এমনকি নবীজী (সাঃ)–কে হত্যার ষড়যন্ত্রেও লিপ্ত হলো।
- প্রথমে পাথর নিক্ষেপ ও পরে খাদ্যে বিষ মিশিয়ে তাঁর জীবন নাশের প্রচেষ্টা চালানো হয়। তাদের এ উভয় প্রচেষ্টাকে আল্লাহ তায়ালা নস্যাৎ করে দিয়ে তাঁর নবীর জীবন রক্ষা করেন।
- আবার এক ইহুদী স্বর্ণকার একজন মুসলিম নারী–ক্রেতার শ্লীলতাহানির চেষ্টা করে। এভাবে শান্তিপূর্ণ সহ–অবস্থানের পরিবেশ বিষিয়ে উঠে। ফলে সহিংস ঘটনার সূত্রপাত হয়।
ইহুদী–মোনাফিক চক্রের ষড়যন্ত্র
ইহুদী নেতা কা’ব ইবনে আশরাফ ও হুয়াই ইবনে আখতাব গোপনে মুনাফিক সর্দার আবদুল্লাহ ইবনে উবাইয়ের সাথে আঁতাত গঠন করে। তারা সম্মিলিতভাবে মদীনা সনদের আওতায় মৈত্রী চুক্তি ভঙ্গ করে মুসলমানদের মধ্য়ে অনৈক্য ও বিভেদ সৃষ্টি প্রচেষ্টা চালায়।
এ সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে মুনাফিকদের দ্বিচারিতার কথা উল্লেখ করে আল্লাহতায়ালা বলেন,
মৈত্রী চুক্তি বিরোধী শক্তির বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভব
মদীনার মুনাফিক ও মুশরিকগণ এবং পার্শ্ববর্তী ইহুদীগণ ওহুদ যুদ্ধে মুসলমানদের বিপর্যয়ে আনন্দিত হয়েছিল। তারা ভেবেছিল এবার মুসলমানদের প্রভাব–প্রতিপত্তি হ্রাস পাবে। তারা নবী করীম (সাঃ)-কে উপহাস করে বলেছিল, ’বদর যুদ্ধে বিজয় যদি হয় তাঁর নবুওতের প্রমাণ তবে ওহুদ যুদ্ধের বেলায় কি?’ এ পরিস্থিতিতে নবী করীম (সাঃ) এসব অপশক্তির মোকাবেলায় মুসলমানদের মধ্যে ঐক্য ও সংহতি গড়ে তোলা অপরিহার্য মনে করলেন। নবীজী (সাঃ) মুখ বোজে এসব অন্যায় আচরণকে প্রশ্রয় দেওয়া সমীচিন মনে করলেন না। তাই মৈত্রী চুক্তি বিরোধী শক্তির বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া তাঁর জন্য জরুরী হয়ে পড়লো।
- এহেন পরিস্থিতিতে নবী করীম (সাঃ) মদীনার সামাজিক শান্তির পরিবেশ রক্ষার স্বার্থে ইসলাম বিদ্বেষী প্রচার প্রচারণা চালানোর অভিযোগে ইহুদী কবিয়াল কা’ব ইবনে আশরাফ ও আসমা বিনতে মারওয়ানকে অভিযুক্ত করেন এবং তাদের মৃত্যুদন্ড কার্যকর করেন।
- ইহুদী স্বর্ণকার কর্তৃক একজন মুসলিম নারী–ক্রেতার শ্লীলতাহানির চেষ্টার অপরাধে তাকেও অনুরূপ শাস্তি প্রদান করা হয়।
- বনু কানুইকা গোত্রকে মৈত্রী চুক্তি মেনে চলার ব্যাপারে সতর্ক করে নবী করীম (সাঃ) মদীনার শান্তিময় পরিবেশ বজায় রাখার আহ্বান জানান। কিন্তু বনু কানুইকা গোত্রের নেতৃবৃন্দের উদ্ধত আচরণ ও বিদ্বেষপূর্ণ মনোভব নবীজী (সাঃ) এর শান্তি প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়। সুতরাং তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরী হয়ে পড়ে।
এ গ্রন্থের ১৮তম অধ্যায়ে মদীনায় ইহুদী–মুনাফিকদের ষড়যন্ত্র ও বিদ্বেষের ইতিবৃত্ত বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হয়েছে।
কুরাইশদের দ্বিতীয় বদর যুদ্ধের ঘোষণা ও বিফলতা
বদর প্রান্তরে পুনরায় মোকাবেলার পূর্ব–ঘোষণা
বনু নজীর গোত্রের ইহুদীদের নির্বাসনের পর মদীনায় অভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্র বন্ধ থাকে। ফলে সেখানে বছর খানেক শান্তির পরিবেশ বিরাজ করছিলো। কিন্তু এরই মধ্যে খবর এলো আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বে মক্কার কুরাইশরা বদর প্রান্তরে দুই হাজার সৈন্য নিয়ে সমবেত হওয়ার পরিকল্পনা করছে। অবশ্য ওহুদের রণাঙ্গণ থেকে ফেরার সময় সে হুঙ্কার দিয়েছিল বদর প্রান্তরে আবার মোকাবেলা হবে। কারণ সে যুদ্ধে মুসলমানদের নির্মূল করার লক্ষ্য অর্জনে তারা ব্যর্থ হয়েছিল।
বদর প্রান্তরে মুসলিম সৈন্য সমাবেশ
এ খবরে মুসলমানগণ কিছুটা শঙ্কিত হলেন এবং বদরের পরিবর্তে মদীনায় থেকেই মোকাবেলা করার চিন্তা করলেন। কিন্তু নবী করীম (সাঃ) বদর প্রান্তরেই কুরাইশদের মোকাবেলা করতে সিদ্ধান্ত নিলেন। তাঁর অটল সিদ্ধান্তে দেড় হাজার মুসলমানগণ অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে তাঁরই নেতৃত্বে বদর অভিমুখে রওয়ানা হলেন। তাঁদের সাথে ছিল দশজন অশ্বারোহী সৈন্য। হিজরী সাল ৪ এর শাবান মাসে বদরে পৌঁছে তাঁরা শিবির স্থাপন করেন ও কুরাইশদের আগমণের অপেক্ষায় থাকেন।
কুরাইশদের যুদ্ধাভিযান পরিত্যাগ
এদিকে মক্কার কুরাইশরা আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বে দুই হাজার সৈন্য নিয়ে বদর প্রান্তর অভিমুখে যাত্রা করে। কিন্তু দিন দু’য়েক চলার পর আবু সুফিয়ানের সাহস স্তিমিত হয়ে আসে এবং মাঝপথে সে অভিযান স্থগিত করে দেয়। সে তার দলবলকে বলে, ‘এ বছরটি আমাদের অনুকূলে নয়। সুতরাং আমাদের জন্য ফিরে যাওয়াই শ্রেয় হবে।’ এ কথা বলে সে তার বাহিনী নিয়ে মক্কায় ফিরে যায়। দ্বিতীয়বার বদর যুদ্ধে মোকাবেলা করার খায়েশ তার এভাবেই মিটে যায়।
কুরাইশদের পলায়নে মুসলিম শিবিরে স্বস্তি ও আনন্দ
অপরদিকে নবীজী (সাঃ) বদর প্রান্তরে আটদিন অপেক্ষা করার পর জানতে পারেন কুরাইশ বাহিনী যুদ্ধাভিযান পরিত্যাগ করে মক্কার দিকে ফিরে গেছে। কুরাইশদের এ অবমাননাকর প্রত্যাবর্তন মুসলমানদেরকে আনন্দিত করে ও তাঁদের মনোবলকে উদ্দীপ্ত করে। এটা ছিল আরবে মুসলিম শক্তিমত্তার উত্থানের এক সুস্পষ্ট বার্তা।
ইসলামের ইতিহাসে এ যুদ্ধাভিযান’বদরে আখের’ নামেও পরিচিত।
যাতুররিকা অভিযান ও দুমাতুল যান্দাল অভিযান
এরপর নবীজী (সাঃ) আরও দু’টি অভিযান পরিচালনা করেন। এর একটি হলো বনু গোফতান গোত্রের বিরুদ্ধে যাতুররিকা অভিযান ও অপরটি হলো দুমাতুল যান্দাল অভিযান। তিনি খবর পেলেন বনু গোফতান গোত্র নজদ এলাকা থেকে মদীনা আক্রমণের পরিকল্পনা করছে। তিনি তৎক্ষণাৎ চারশত সৈন্য নিয়ে তাদেরকে অতর্কিত আক্রমণ করলে তারা সবকিছু ফেলে পালিয়ে যায়।
অপর অভিযানটি হলো মদীনা থেকে বেশ দূরে হিজাজ ও সিরিয়া সীমান্ত সংলগ্ন দুমাতুল যান্দাল। সেখানেও তিনি একই পদ্ধতিতে অতর্কিত আক্রমণ পরিচালনা করেন। শত্রুবাহিনী প্রতিরোধের কোন সুযোগ না পেয়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। পেছনে ফেলে যায় তাদের সহায়–সম্পদ। এসব অভিযানের ফলে অনেক দূরবর্তী এলাকাতেও মুসলমানদের প্রভাব–প্রতিপত্তি বৃদ্ধি পেতে থাকে।