২৫ তম অধ্যায় : সমগ্র আরব জুড়ে ইসলাম ধর্মের উত্থান

এ অধ্যায়ের বিষয়সমূহ

সমগ্র আরবে ইসলামী শক্তির বিকাশ

তৎকালীন পার্শ্ববর্তী দুই পরাশক্তি খৃস্টান রোমান সাম্রাজ্য ও অগ্নিপূজক পারস্য সাম্রাজ্য ইসলামের উত্থানে প্রমাদ গুনলো। মুসলমানদের তাবুক অভিযানের সময় সীমান্ত থেকে রোমান বাহিনীর পশ্চাদপসরণ ইসলামকে একটি সমীহ শক্তিতে পরিণত করে। তাবুক অভিযানের পর সমগ্র আরব জুড়ে ইসলাম ধর্মের প্রভাব ও বিকাশ অপ্রতিহত হয়ে উঠে এবং সেই সাথে মুসলিম শক্তির উত্থান ঘটে।

 

তায়েফবাসীর ইসলাম গ্রহণ

যুদ্ধ–নিষিদ্ধ মাস ও হজ্জ্ব মওসুম সমাগত হওয়ায় নবী করীম (সাঃ) তায়েফ অবরোধ স্থগিত করেছিলেন। হজ্জ্ব ও ওমরা পালন করতে তিনি মুসলিম বাহিনী নিয়ে মক্কায় চলে এসেছিলেন। তাই তায়েফবাসী তখনও ইসলামের ছায়াতলে আসেনি। তায়েফের সাকীফ গোত্রের এক অন্যতম নেতা ওরওয়া ইবনে মাসুদ ইয়েমেন থেকে ফিরে এসে প্রথমে নবী করীম (সাঃ) সাক্ষাৎ করেন এবং ইসলাম গ্রহণ করে তায়েফে ফিরে যান। সেখানে পৌঁছে তিনি স্বগোত্রের লোকজনকে ইসলামের প্রতি দাওয়াত দেন। কিন্তু ইসলাম গ্রহণের পরিবর্তে তারা তাঁকে হত্যা করে।

এরপর সাকীফ গোত্রের নেতৃবৃন্দের পাঁচ–সদস্যের এক প্রতিনিধিদল মদীনায় নবী করীম (সাঃ) এর সাথে সাক্ষাৎ করে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করার ব্যাপারে কয়েকটি দাবী ও শর্ত পেশ করেন। এগুলোর মধ্যে তাদের লাত প্রতিমা ধ্বংস না করা, নামায থেকে অব্যাহতি পাওয়া, মদ্যপান ও ব্যভিচার কর্ম চালিয়ে যাওয়ার মতো বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত ছিল।

কিন্তু নবীজী (সাঃ) এসব দাবীর কোনটিই গ্রহণ করেননি। তিনি তাঁদেরকে ইসলাম ধর্মের মৌলিক বিষয়গুলো বুঝিয়ে বললে তাঁরা এসব মেনে নেন। তবে তাঁরা লাত প্রতিমা ধ্বংসের কাজ থেকে তাদেরকে অব্যাহতি দিয়ে অন্য কাউকে এ দায়িত্ব দেওয়ার শর্ত দেন। নবীজী (সাঃ) তাঁদের শর্তটি মেনে নিয়ে এ কাজের দায়িত্ব দেন হযরত আবু সুফিয়ান (রাঃ) ও হযরত মুগীরা (রাঃ)-কে। তায়েফে ইসলামের বিস্তার ও সেখানকার লাত প্রতিমার ধ্বংস সাধনের মধ্য দিয়ে ক্রমশ আরব থেকে পৌত্তলিকতার অবসান ইসলামের অগ্রগতিকে অপ্রতিরোধ্য করে তুলে।

তায়েফের প্রতিনিধিদলের সদস্য ওসমান ইবনে আবুল আস ইসলামী দ্বীনের শিক্ষা গ্রহণ করেন। তাঁকে সেখানে দ্বীন শিক্ষা প্রদান ও ইসলাম প্রচারের কাজে নিযুক্ত করা হয়। এভাবেই তায়েফে ইসলামের প্রসার ঘটতে থাকে।

 

বিভিন্ন আরব গোত্রের প্রতিনিধি দলের মদীনায় আগমন

প্রতিনিধি আগমণের বর্ষ

নবম হিজরী সাল। বছরব্যাপী আরব উপদ্বীপের চতুষ্পার্শ থেকে বিভিন্ন গোত্রের প্রতিনিধি দলের আগমনে মদীনা মুখরিত হয়ে উঠে। একের পর এক প্রতিনিধিদল মদীনায় এসে নবীজী (সাঃ) এর সাথে সাক্ষাৎপূর্বক ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতে থাকেন। তায়েফের সাকীফ গোত্রের পর আরবের বিভিন্ন গোত্রের মধ্যে ইসলাম গ্রহণের সাড়া পড়ে যায়।

তাই এটি ছিল পৌত্তলিক ও কিতাবধারী নির্বিশেষে সকল গোত্রের প্রতিনিধি আগমণের বর্ষ। এ যেন স্বেচ্ছায় ইসলাম গ্রহণের এক গণ–জোয়ার। আরবের বিভিন্ন স্থান থেকে আগত এসব প্রতিনিধি দলের তালিকা বেশ দীর্ঘ। ইবনে সাআদ রচিত ‘তাবাকাতে কুবরা’ নামক গ্রন্থে এর বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে।

  • নবী করীম (সাঃ) আগত প্রতিনিধিদলকে উপযুক্ত মর্যাদা দান করতেন,
  • তাদেরকে যথেষ্ট যত্ন ও আপ্যায়ন করতেন,
  • ইসলামের মৌলিক বিষয় অর্থাৎ ঈমান ও আমলের ব্যাপারে নসীহত করতেন এবং তাদের  নেতৃবৃন্দকে স্বপদে বহাল রেখে সসম্মানে বিদায় জানাতেন।
  • তাদের বিদায়ের সময় দ্বীনী শিক্ষা দানের জন্য একজন করে সাহাবীকে দ্বীনি–শিক্ষক হিসেবে তাদের সঙ্গে দিতেন।

 

নাজরানবাসীর প্রতি ইসলামের দাওয়াত

নবী করীম (সাঃ) খৃস্টান অধ্যুষিত নাজরানবাসীর প্রতি ইসলামের দাওয়াত পাঠালেন। তারা ইসলাম গ্রহণে অস্বীকৃত হলে তাদেরকে জিযিয়া কর প্রদানের শর্তে বশ্যতা স্বীকার করতে বলা হয়। নাজরানের বিশপ ষাট–সদস্যের একটি খৃস্টান প্রতিনিধিদল মদীনায় প্রেরণ করেন। তারা মসজিদে নব্বীতে নবীজী (সাঃ) এর সাথে সাক্ষাৎ ও আলোচনা করেন।

  • উভয় পক্ষের মধ্যে একটি সন্ধিচুক্তি সম্পাদিত হয়।
  • সন্ধিপত্রে নাজরানবাসীকে তাদের নিজ ধর্ম পালনের পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া হয় এবং তাদের ধন–সম্পদসহ অন্যান্য অধিকার  রক্ষা নিশ্চিত করা হয়।
  • বিশপের ভ্রাতাসহ তাদের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণ করেন।

এভাবে খৃস্টান অধ্যুষিত নাজরানেও ক্রমশ ইসলামের প্রসার ঘটতে থাকে।

ইয়েমেনের বুকে ইসলামের প্রসার

ইয়েমেনের একটি প্রসিদ্ধ গোত্র বনু কিন্দার যার সাথে নবী করীম (সাঃ) এর মাতুলালয়ের সম্পর্ক ছিল। তাদের একটি প্রতিনিধিদল আশআছ ইবনে কায়েসের নেতৃত্বে নবীজী (সাঃ) এর সাথে সাক্ষাৎ করে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে। এ প্রতিনিধিদলের সাথে আগত হাদ্রামাউতের সামন্ত সর্দার ওয়ায়েল ইবনে হুজর কিন্দীও ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে এবং উশর (ফসলের খাজনা) প্রদানে সম্মত হয়। সর্বশেষ ইয়েমেনের নাখআ গোত্র ইসলামের পতাকাতলে আসলে সমগ্র ইয়েমেনের বুকে ইসলাম সুপ্রতিষ্ঠিত হয়।

হযরত মুয়াবিয়া (রাঃ) ও হযরত মুয়ায ইবনে জাবাল (রাঃ)–কে দ্বীনি শিক্ষা প্রদানের জন্য প্রেরণ

নবীজী (সাঃ) দ্বীনী শিক্ষা প্রদানের জন্য হযরত মুয়াবিয়া (রাঃ)–কে ওয়ায়েলের সাথে হাদ্রামাউতে প্রেরণ করেন। একই উদ্দেশ্যে হযরত মুয়ায ইবনে জাবাল (রাঃ) এর নেতৃত্বে সাহাবাগণের একটি দলকে ইয়েমেনে পাঠানো হয়। তাঁদের প্রতি নবীজী (সাঃ) উপদেশ ছিল তাঁরা যেন কোনো কঠোরতা নয় বরং সদ্ভাব, বিনয় ও নম্রতাসহকারে দ্বীনের কথা মানুষকে পৌঁছে দেন।

 

কট্টরবাদী কাফের ও মুনাফিকদের অসম্মতি ও পরিণতি

ইসলামের এ গণ–জোয়ারের মধ্যেও কিছু সংখ্যক কাফের ও মুনাফিক তাদের কট্টরবাদী মনোভাব প্রকাশ থেকে বিরত থাকেনি। তাদের মধ্যে একজন ছিল বনী আমের গোত্রের নেতা আমের ইবনে তোফায়েল। সে একটি প্রতিনিধিদল নিয়ে মদীনায় নবীজী (সাঃ) এর সাথে সাক্ষাৎ করতে আসলেও ইসলাম গ্রহণ না করে তাঁকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে ফেরত যায়। নবীজী (সাঃ) তাকে বুঝানোর চেষ্টা করলেও সে কর্ণপাত করেনি। পরিণতিতে আল্লাহর তরফ থেকে তার উপর গজব নাযিল হয় এবং সে প্লেগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু বরণ করে।

এ প্রতিনিধি দলের অপর এক ব্যক্তি আরবাদ ইবনে কায়েসও ইসলাম গ্রহণ না করে ফেরত যায়। যাওয়ার পথে তার বজ্রাঘাতে মৃত্যু হয়। অবশ্য এ গোত্রের অন্য সবাই ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে।

এছাড়া ইয়ামামার অধিবাসী মুসায়লামা ইবনে হাবীব তার গোত্রের প্রতিনিধি দলের সাথে নবীজী (সাঃ) এর সাক্ষাতে আসে। সে নবুওতের অংশীদার দাবী করে নিজেকে রসূল ঘোষণা করে। নামায বাতিল এবং মদ্যপান ও ব্যভিচার বৈধ ঘোষণা করে নিজ সম্প্রদায়ের কিছু ব্যক্তিকে বিপথগামী করে ফেলে।

তবে অধিকাংশ লোকজনই তার দাবী প্রত্যাখ্যান করে ও তাকে বর্জন করে।

 

জাহেলিয়াত যুগের প্রচলিত হজ্জ্বের আচার–অনুষ্ঠান

নবম হিজরী সালে নবী করীম (সাঃ) হজ্জ্ব পালনে দু’টি কারণে যেতে পারেননি। প্রথমটি হলো সে বছর আরবের বিভিন্ন জায়গা থেকে একের পর এক যেসব প্রতিনিধিদল এসেছিলো তাদের সাথে তাঁর সাক্ষাৎ ও তাদেরকে দ্বীনের দাওয়াত দানের ব্যাপারে ব্যস্ততা। দ্বিতীয় যে কারণটি ছিলো তা হলো, মুশরেকদের সাথে হজ্জ্ব পালনে অনীহার বিষয়টি। কারণ:

  • মুশরেকরা সবাই তখনও ইসলাম গ্রহণ করেনি। তাদের মধ্যে প্রচলিত জাহেলিয়াত যুগের হজ্জ্ব সম্পর্কিত আচার–অনুষ্ঠানগুলোও ছিল কুসংস্কারপূর্ণ ও অপবিত্র।
  • এসবই ছিল ইসলামের একত্ববাদী ধ্যান–ধারণার সম্পূর্ণ পরিপন্থী। যেমন,
  • নগ্ন অবস্থায় তাওয়াফ, কা’বা গৃহের দেওয়াল পশুর রক্ত দ্বারা রঞ্জিত করা, প্রতিমা পূজা, ইত্যাদি।

মক্কা বিজয়ের পর এসব ভ্রান্ত রীতি–নীতি থেকে হজ্জ্ব অনুষ্ঠানের পরিবেশে শুচিতা ফিরিয়ে আনা নেহায়েৎ জরুরী হয়ে পড়েছিল। কিন্তু তখন পর্যন্ত মুশরেকদের হজ্জ্ব পালনে কোনরূপ বাধা–নিষেধ আরোপ করা হয়নি। এ অবস্থায় তিনি মুশরেকদের সাথে হজ্জ্ব পালনে বিরত থাকলেন।

এ বিষয়ে তিনি মহান আল্লাহর নির্দেশনার প্রতীক্ষা করছিলেন। তাই ওই বছর তিনি হযরত আবু বকর (রাঃ)–কে তিনশত সদস্যের হজ্জ্ব প্রতিনিধিদলের নেতা মনোনীত করে মক্কায় পাঠিয়ে দিলেন।

মুশরেকমুক্ত হাজ্জ্ব পালনের ঐশী ঘোষণাবলী

এদিকে মুসলিম ও মুশরেকদের উপস্থিতিতে মক্কায় হজ্জ্ব কার্যক্রম শুরু হয়ে যায়। এসময় মুশরেকদের হাজ্জ্ব পালনের বিষয়ে আল্লাহ্ তায়ালা সূরা তওবা নাযিল করেন। এ সূরার ভাষ্য অনুযায়ী:

  • আল্লাহ্ তায়ালা মুশরিকদের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ ও মক্কায় তাদের প্রবেশ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন।
  • নিষিদ্ধ চার মাস সময় অতিবাহিত হওয়ার পর এ ঘোষণা বলবৎ হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়।
  • তবে তাদের সাথে যেসব চুক্তিতে সময়সীমা উল্লেখ আছে তা নির্ধারিত সময় পর্যন্ত বলবৎ থাকবে।

নবী করীম (সাঃ) সদ্য নাযিলকৃত সূরা তওবার ঘোষণাটি হযরত আলী (রাঃ)-কে দিয়ে মক্কায় পাঠিয়ে দিলেন যাতে হজ্জ্ব সমাবেশে উপস্থিত সকলের সম্মুখে তিনি তা পাঠ করে শুনিয়ে দেন। পবিত্র কুরআনের ঘোষণাটির কিছু অংশ নিম্নে পেশ করা হলো:

♦ “সম্পর্কচ্ছেদ করা হল আল্লাহ ও তাঁর রসূলের পক্ষ থেকে সেই মুশরিকদের সাথে, যাদের সাথে তোমরা চুক্তিবদ্ধ হয়েছিলে।”

♦ “অতঃপর তোমরা পরিভ্রমণ কর এ দেশে চার মাসকাল। আর জেনে রেখো, তোমরা আল্লাহকে পরাভূত করতে পারবে না, আর নিশ্চয়ই আল্লাহ কাফেরদিগকে লাঞ্ছিত করে থাকেন।”

♦ “আর মহান হজ্বের দিনে আল্লাহ ও তাঁর রসূলের পক্ষ থেকে লোকদের প্রতি ঘোষণা করে দেয়া হচ্ছে যে, আল্লাহ মুশরেকদের থেকে দায়িত্ব মুক্ত এবং তাঁর রসূলও। অবশ্য যদি তোমরা তওবা কর, তবে তা, তোমাদের জন্যেও কল্যাণকর, আর যদি মুখ ফেরাও, তবে জেনে রেখো, আল্লাহকে তোমরা পরাভূত করতে পারবে না। আর কাফেরদেরকে মর্মান্তিক শাস্তির সুসংবাদ দাও।”

♦ “তবে যে মুশরিকদের সাথে তোমরা চুক্তি বদ্ধ, অতপরঃ যারা তোমাদের ব্যাপারে কোন ত্রুটি করেনি এবং তোমাদের বিরুদ্ধে কাউকে সাহায্যও করেনি, তাদের সাথে কৃত চুক্তিকে তাদের দেয়া মেয়াদ পর্যন্ত পূরণ কর। অবশ্যই আল্লাহ সাবধানীদের পছন্দ করেন।”

(সূরা আত তাওবা, ৯:১–৪)

 

ইসলামের অগ্রযাত্রায় সাহাবায়ে কেরামের অবদান

মুসলিম উম্মাহর অভ্যুদ্বয়

প্রাথমিক যুগের মক্কার মুহাজির ও মদীনার আনসারদের সমন্বয়ে অভ্যুদ্বয় ঘটে এক মুসলিম উম্মাহর। মদীনার বুকে প্রতিষ্ঠিত হয় কুরআন ও সুন্নাহ্ ভিত্তিক একটি সমাজ ও রাষ্ট্র। এ নব গঠিত সমাজ ও রাষ্ট্রের সুরক্ষার কাজে সাহাবাগণ তাঁদের জান–মাল ও সর্বস্ব উৎসর্গ করে দেন।

দ্বীন–ইসলামের ইতিহাসে সাহাবায়ে কেরাম (রাযিয়াল্লাহু আনহুম) এক অনন্য ও অবিস্মরণীয় অধ্যায়ের নাম। তাঁরা ছিলেন মানবজাতির কল্যাণে নিবেদিত এক আদর্শ সম্প্রদায়। নবীজী (সাঃ) এর নেতৃত্বে এবং সাহাবায়ে কেরামের ত্যাগ ও তীতিক্ষার অবদানে মদীনায় প্রতিষ্ঠিত হয় কুরআন ও সুন্নাহভিত্তিক একটি ন্যায়পরায়ণ সমাজ ও রাষ্ট্র। এই নবগঠিত সমাজব্যবস্থার ভিত্তি ছিল তাঁদের সুদৃঢ় ঈমান, ভ্রাতৃত্ব, ও আত্মত্যাগ। সাহাবায়ে কেরাম নিজেদের স্বার্থের উপর দ্বীনের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়েছিলেন।

ইসলামের প্রচার কালে নবী করীম (সাঃ) এর সঙ্গ–-লাভ করেন একদল হেদায়েতপ্রাপ্ত ব্যক্তিবর্গ, যারা “সাহাবায়ে কেরাম’ নামে খ্যাত। তাঁর সাহচর্যে থেকে তাঁরা অর্জন করেন ঈমানী দৃঢ়তা, নেক আমলের অনুপ্রেরণা এবং প্রবল আত্মিক শক্তি।

  • নবীজী (সা)-এর সাথে তাঁরা আল্লাহর দ্বীন প্রচার ও প্রসারের কাজে সর্বাত্মকভাবে আত্মনিয়োগ করেন। তাঁর নেতৃত্বে প্রথমে মক্কায় এবং হিজরতের পরে মদীনায় ইসলামের দাওয়াতের কাজ পরিচালিত হয়।
  • দ্বীন প্রচারে তারা ছিলেন অত্যন্ত কষ্ট–সহিষ্ণু ও ধৈর্যশীল। এ কাজে সাহাবাগণ তাঁদের জান–মাল ও সর্বস্ব উৎসর্গ করে দেন।
  • আল্লাহ্ ও তাঁর নবীর প্রেমে তাঁরা ছিলেন উৎসর্গীকৃত প্রাণ।
  • মক্কার মোহাজের ও মদীনার আনসারদের সর্বোচ্চ আত্মত্যাগ মহান আল্লাহর দরবারে গৃহীত হয় এবং অবশেষে ইসলাম আল্লাহর দ্বীন হিসেবে দুনিয়ার বুকে প্রতিষ্ঠিত হয়।
  • তাঁরা এ মহান কাজের জন্য আল্লাহ্ তায়ালার সন্তুষ্টি অর্জন করেন।

ইসলামী দ্বীনের প্রচার ও প্রসারে তাঁদের অবদান

ইসলামের প্রসারেও তাঁদের অবদান ছিল অসাধারণ। রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর ইন্তিকালের পর সাহাবায়ে কেরাম আরব উপদ্বীপের সীমানা অতিক্রম করে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে ইসলামের বাণী পৌঁছে দেন। তাঁদের দাওয়াত, জ্ঞান, ন্যায়পরায়ণতা, চরিত্র ও আত্মত্যাগের ফলে অগণিত মানুষ ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করে।

সর্বশেষ নবী মুহম্মদ (সাঃ) এর ইন্তেকালের পর রিসালত ও নবুওতের পরিসমাপ্তি ঘটে। তাঁর তিরোধানের পর সাহাবায়ে কেরামের উপর দ্বীনি দাওয়াতের দায়িত্ব পুরোপুরিভাবে বর্তায়। নবী করীম (সা) জীবিত থাকাকালীন সময়েই তাঁদের দ্বারা এ দাওয়াতি কার্যক্রম শুরু করেন। তাঁরাই ছিলেন রাসূল (সা) ও পরবর্তী উম্মতের মধ্যে প্রথম যোগসূত্র।

  • অনুপস্থিত ও অনাগত উম্মতবৃন্দ সাহাবায়ে কেরামের কাছ থেকে পবিত্র কুরআনের বিশুদ্ধ সংকলন লাভ করেছেন এবং এর তফসীর বা ব্যাখ্যা পেয়েছেন।
  • একমাত্র তাঁদেরই বর্ণিত হাদীসের মাধ্যমে নবী করীম (সা) এর শিক্ষা, তাঁর উপদেশ ও দৈনন্দিন জীবনাদর্শ তথা দ্বীনের যাবতীয় বিষয়বস্তু সম্পর্কে জানতে পেরেছেন।
  • একমাত্র তাঁদেরই বর্ণিত হাদীসের মাধ্যমে অনুপস্থিত ও অনাগত উম্মত পবিত্র কুরআন, এর তফসীর বা ব্যাখ্যা, নবী করীম (সা) এর পরিচয়, তাঁর শিক্ষা, উপদেশ, আদর্শ তথা দ্বীনের যাবতীয় বিষয়বস্তু সম্পর্কে জানতে পেরেছেন।
  • এমনকি রাসূলুল্লাহ্ (সা) -এর ব্যক্তিগত জীবনাচরণ এবং তৎসংশ্লিষ্ট দ্বীনের খুঁটিনাটি বিষয়ও তাঁদের বর্ণনা থেকে বাদ পড়েনি।
  • পরবর্তী প্রজন্মগণ অর্থাৎ তাবেঈন, তাবে তাবেঈন ও আলেমবৃন্দ  তাঁদের এ দাওয়াতি কার্যক্রমকে যুগ যুগ ধরে এগিয়ে নিয়ে গেছেন।

বিদায় হজ্জ্বের ভাষণেও নবী করীম (সা) দ্বীন প্রচারের ধারাবাহিকতার ওপর গুরুত্ব দিয়ে বলেন,

‘আজ যারা এখানে হাজির হয়েছো আমার বাণী পৌঁছে দাও তাদের কাছে যারা এখানে উপস্থিত নেই, হতে পারে উপস্থিত শ্রোতৃমন্ডলীর চেয়ে অনুপস্থিত ব্যক্তিবর্গের নিকট আমার কথাগুলো বেশী গুরুত্ব বহন করবে।’

দাওয়াতের ক্ষেত্রে সাহাবীগণের প্রতি রাসুলুল্লাহ্ (সা) -এর নির্দেশ ছিল,

‘একটি আয়াতও যদি হয় তা আমার পক্ষ থেকে পৌঁছে দাও।’

তিনি আরও বলেন,

‘তোমরা তাদেরকে সহজ পথ বলে দেবে, কোন কঠিন অবস্থায় ফেলবে না, তাদেরকে সুসংবাদ দেবে এবং নিরুৎসাহিত করবে না (সহী বুখারী শরীফ)।’

এ হাদীসে দ্বীন প্রচারের শুরুতেই কোনরূপ কঠোরতা অবলম্বন না করার উপদেশ দেওয়া হয়েছে।

পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহ’র সংরক্ষণ ও প্রচারের দায়িত্বপালন

সাহাবায়ে কেরামের সবচেয়ে বড় অবদান হলো কুরআন ও সুন্নাহ সংরক্ষণ এবং পরবর্তী প্রজন্মের কাছে তা নির্ভুলভাবে পৌঁছে দেওয়া। রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর নিকট থেকে তাঁরা কুরআন শিক্ষা গ্রহণ করেন, তা মুখস্থ করেন, লিখে রাখেন এবং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে বাস্তবায়ন করেন। তাঁদের মাধ্যমেই কুরআনের আয়াত, রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর হাদীস, তাঁর জীবনাচার এবং ইসলামের বিধানাবলি পরবর্তী যুগের মুসলমানদের কাছে পৌঁছেছে। ইসলামী জ্ঞান, সভ্যতা ও সংস্কৃতির যে সুবিশাল ভাণ্ডার আজ আমাদের কাছে বিদ্যমান, তার ভিত্তি স্থাপিত হয়েছে সাহাবায়ে কেরামের অক্লান্ত প্রচেষ্টা ও ত্যাগের উপর।

মহান আল্লাহ্ তায়ালার সন্তুষ্টি অর্জন

সাহাবায়ে কেরামের সর্বোচ্চ আত্মত্যাগ মহান আল্লাহর দরবারে গৃহীত হয় এবং অবশেষে ইসলাম আল্লাহর দ্বীন হিসেবে দুনিয়ার বুকে প্রতিষ্ঠিত হয়। তাঁরা এ মহান কাজের জন্য আল্লাহ্ তায়ালার সন্তুষ্টি অর্জন করেন। আলল্লাহ রাব্বুল আলামীন সাহাবায়ে কেরামের সুদৃঢ় ঈমান, একনিষ্ঠ  আমল এবং দ্বীনের প্রতি তাঁদের অফুরন্ত ভালোবাসার কারণে তাঁদের প্রতি যে অতীব সন্তুষ্ট ছিলেন তা নিম্নের আয়াতসমূহে তা স্পষ্ট প্রতীয়মান:

♥ “আর যারা সর্বপ্রথম হিজরতকারী ও আনছারদের মাঝে পুরাতন, এবং যারা তাদের অনুসরণ করেছে, আল্লাহ সে সমস্ত লোকদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং তারাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছে। আর তাদের জন্য প্রস্তুত রেখেছেন কানন–কুঞ্জ, যার তলদেশ দিয়ে প্রবাহিত প্রস্রবণসমূহ। সেখানে তারা থাকবে চিরকাল। এটাই হল মহান কৃতকার্যতা।” (সূরা আত তাওবা, ৯:১০০)

♥ “আল্লাহ দয়াশীল নবীর প্রতি এবং মুহাজির ও আনসারদের প্রতি, যারা কঠিন মুহূর্তে নবীর সঙ্গে ছিল, যখন তাদের এক দলের অন্তর ফিরে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। অতঃপর তিনি দয়াপরবশ হন তাদের প্রতি। নিঃসন্দেহে তিনি তাদের প্রতি দয়াশীল ও করুণাময়।” (সূরা আত তাওবা,  ৯:১১৭)

♥ “আল্লাহ মু’মিনদের প্রতি সন্তুষ্ট হলেন, যখন তারা বৃক্ষের নীচে আপনার কাছে বাইয়াত (শপথ) করল। আল্লাহ অবগত ছিলেন যা তাদের অন্তরে ছিল। অতঃপর তিনি তাদের প্রতি প্রশান্তি নাযিল করলেন এবং তাদেরকে আসন্ন বিজয় পুরস্কার দিলেন।” (সূরা ফাত–হা ৪৮:১৮)

♥ “যারা আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস করে, তাদেরকে আপনি আল্লাহ ও তাঁর রসূলের বিরুদ্ধাচরণকারীদের সাথে বন্ধুত্ব করতে দেখবেন না, যদিও তারা তাদের পিতা, পুত্র, ভ্রাতা অথবা জ্ঞাতি–-গোষ্ঠী হয়। তাদের অন্তরে আল্লাহ ঈমান লিখে দিয়েছেন এবং তাদেরকে শক্তিশালী করেছেন তাঁর অদৃশ্য শক্তি দ্বারা। তিনি তাদেরকে জান্নাতে দাখিল করবেন, যার তলদেশে নদী প্রবাহিত। তারা তথায় চিরকাল থাকবে। আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট এবং তারা আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট। তারাই আল্লাহর দল। জেনে রাখ, আল্লাহর দলই সফলকাম হবে।” (সূরাহ আল মুজাদালাহ, ৫৮:২২)

সাহাবায়ে কেরামের চরিত্র, ঈমান, ইবাদত ও আত্মত্যাগের প্রশংসা করে মহান আল্লাহ আরও বলেন:

“মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল; আর তাঁর সঙ্গে যারা আছে তারা কাফিরদের বিরুদ্ধে কঠোর এবং নিজেদের মধ্যে পরস্পরের প্রতি দয়ালু। তুমি তাদেরকে রুকূ ও সিজদারত অবস্থায় দেখবে; তারা আল্লাহর অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টি কামনা করে।” (সূরা আল–ফাতহ, ৪৮:২৯)

সাহাবায়ে কেরাম ছিলেন এক আদর্শ উম্মাহ

মক্কার মুহাজির এবং মদীনার আনসারদের সমন্বয়ে ইসলামের ইতিহাসে গড়ে ওঠে এক আদর্শ উম্মাহ। তাঁরা ছিলেন মানবজাতির কল্যাণে নিবেদিত এক আদর্শ সম্প্রদায়। মদীনায় প্রতিষ্ঠিত হয় কুরআন ও সুন্নাহভিত্তিক একটি ন্যায়পরায়ণ সমাজ ও রাষ্ট্র। এই নবগঠিত সমাজব্যবস্থার ভিত্তি ছিল ঈমান, ভ্রাতৃত্ব, ন্যায়বিচার ও আত্মত্যাগ। সাহাবায়ে কেরাম নিজেদের স্বার্থের উপর দ্বীনের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়েছিলেন। তাঁদের পারস্পরিক ভালোবাসা ও ত্যাগের বর্ণনা দিয়ে আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

“তারা নিজেদের অভাব থাকা সত্ত্বেও অন্যদেরকে নিজেদের উপর প্রাধান্য দেয়। আর যারা নিজেদের অন্তরের কার্পণ্য থেকে রক্ষা পায়, তারাই সফলকাম।” (সূরা আল–হাশর, ৫৯:৯)

এই আয়াতে সাহাবায়ে কেরামের ঈমান, ও  ভ্রাতৃত্ববোধের যে চিত্র অঙ্কিত হয়েছে, তা মানব ইতিহাসে এক অনন্য দৃষ্টান্ত।

“যে আল্লাহর দিকে দাওয়াত দেয়, সৎকর্ম করে এবং বলে, আমি একজন আজ্ঞাবহ, তার কথা অপেক্ষা উত্তম কথা আর কার।” (সূরাহ হা মীম সেজদাহ, ৪১:৩৩)

সর্বোত্তম উম্মতের মর্যাদা লাভ

মহান আল্লাহ্ রব্বুল আলামীনের ভাষ্য অনুযায়ী নবী করীম (সাঃ)-এর সাহাবাগণ ছিলেন দ্বীন–ইসলামের খেদমতকারী সর্বোত্তম উম্মত।

  • তাঁদেরকে মানবজাতির কল্যাণের জন্য মনোনীত করা হয়েছিল।
  • তাঁরা নবীজীর (সাঃ) কাছ থেকে সরাসরি দ্বীনের শিক্ষা পেয়েছিলেন। তাই মহান আল্লাহ্ তাঁদেরকে তাঁর দ্বীনের প্রচার ও প্রসারে তাঁর প্রিয় নবীর (সাঃ) সাহায্যকারী ও দায়িত্ববহনকারী হিসেবে পছন্দ করেছেন।
  • সাহাবায়ে কেরাম ছিলেন মানবজাতির কল্যাণে নিবেদিত এক আদর্শ সম্প্রদায়।
  • তাঁরা সৎকাজের আদেশ দিতেন, অসৎকাজ থেকে বিরত রাখতেন এবং আল্লাহর দ্বীনের প্রচার ও প্রতিষ্ঠায় সর্বদা সচেষ্ট থাকতেন।

মহান আল্লাহ তাঁদেরকে সর্বোত্তম উম্মতের মর্যাদা দান করে বলেন:

“তোমরাই সর্বোত্তম উম্মত, মানবজাতির কল্যাণের জন্য তোমাদের আবির্ভাব ঘটানো হয়েছে; তোমরা সৎকাজের আদেশ দাও, অসৎকাজ থেকে নিষেধ কর এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান রাখ।” (সূরা আলে ইমরান, ৩:১১০)

যদিও আয়াতটি সমগ্র মুসলিম উম্মতের জন্য প্রযোজ্য, তবুও এর সর্বপ্রথম ও সর্বোত্তম বাস্তব রূপ ছিলেন রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর সাহাবায়ে কেরাম।

রাসূলুল্লাহ (সাঃ) নিজেও সাহাবায়ে কেরামের মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে উম্মতকে সতর্ক ও সচেতন করেছেন। তিনি বলেন—

“আমার সাহাবীদের গালি দিও না। সেই সত্তার শপথ, যার হাতে আমার প্রাণ! তোমাদের কেউ যদি উহুদ পাহাড় সমপরিমাণ স্বর্ণও আল্লাহর পথে ব্যয় করে, তবুও সে তাদের এক ‘মুদ’ কিংবা অর্ধ ‘মুদ’ দানের মর্যাদায় পৌঁছতে পারবে না।”
(সহীহ আল-বুখারী, হাদীস নং ৩৬৭৩; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৫৪০)

অন্য এক হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন:

“সর্বোত্তম মানুষ হলো আমার যুগের মানুষ (সাহাবীগণ), তারপর তাদের পরবর্তী যুগ, তারপর তাদের পরবর্তী যুগ।” (সহীহ আল-বুখারী, হাদীস নং ২৬৫২; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৫৩৩)

 

আল্লাহ্ ও রাসূলের প্রতি আনুগত্য ও ভালোবাসার এক উজ্জ্বল প্রতীক

সাহাবায়ে কেরামের জীবন ছিল আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি পরিপূর্ণ ভালোবাসা, আনুগত্য এবং আত্মসমর্পণের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। নবীজী (সাঃ) এর সংস্পর্শে তাঁদের অন্তর হয়ে উঠেছিল পবিত্র, পরিশুদ্ধ ও খাঁটি ঈমানে পরিপূর্ণ। আল্লাহ্ ও রাসূলের আনুগত্যে তাঁরা ছিলেন পুরোপুরি আত্মসমর্পিত। তাঁদের ঈমান, ইখলাস, তাকওয়া, ত্যাগ, ধৈর্য ও আল্লাহভীতি যুগে যুগে মুসলিম উম্মাহর জন্য প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।

নবীজী (সাঃ)–কে তাঁরা নিজের জান-–মাল ও সন্তান–সন্ততির চেয়েও বেশী ভালবাসতেন।  দ্বীনের প্রতি তাঁদের ভালবাসা ও আত্মোৎসর্গ ছিল সমগ্র উম্মতের জন্য এক অনুকরণীয় আদর্শস্বরূপ।

  • তাঁরা সবাই নেক কাজে একে অপরের সাথে প্রতিযোগিতা করতেন,
  • অন্যের প্রয়োজনকে নিজের প্রয়োজনের চেয়ে বেশী মূল্য দিতেন, এবং
  • সৎ কাজে আদেশ ও অসৎ কাজে নিষেধ করতেন।
  • রসূলুল্লাহ্ (সাঃ) তাঁর সাহাবাগণকে উজ্জ্বল নক্ষত্রের সাথে তুলনা করেছেন। বিভিন্ন হাদীসে তাঁদের উচ্চ মর্যাদার কথা বর্ণিত হয়েছে।

নবী করীম (সাঃ) এর সৌভাগ্যবান ও পরীক্ষিত সহচর

সাহাবায়ে কেরাম ছিলেন সেই সৌভাগ্যবান ব্যক্তিবর্গ, যারা রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর প্রতি ঈমান এনেছেন, তাঁর সান্নিধ্য লাভ করেছেন এবং ঈমানের উপর অবিচল থেকে মৃত্যুবরণ করেছেন। তাঁরা ইসলামের দাওয়াত, প্রতিষ্ঠা ও সংরক্ষণের জন্য নিজেদের জীবন, সম্পদ, সময় ও শক্তি সর্বস্ব দিয়ে উৎসর্গ করেছিলেন। মক্কার নির্যাতন, সামাজিক বয়কট, দেশত্যাগ, যুদ্ধের ময়দান এবং জীবনের নানাবিধ পরীক্ষায় তাঁরা অসাধারণ ধৈর্য, ত্যাগ ও আনুগত্যের পরিচয় দিয়েছেন।

মহান আল্লাহর দরবারে তাঁদের আকুতি ছিল নিম্নরূপ:

“হে আমাদের পালনকর্তা! আমরা নিশ্চিতরূপে শুনেছি একজন আহ্বানকারীকে ঈমানের প্রতি আহ্বান করতে যে, তোমাদের পালনকর্তার প্রতি ঈমান আন; তাই আমরা ঈমান এনেছি। হে আমাদের পালনকর্তা! অতঃপর আমাদের সকল গোনাহ মাফ করো এবং আমাদের সকল দোষত্রুটি দূর করে দাও, আর আমাদের মৃত্যু দাও নেক লোকদের সাথে।” (সূরা আলে ইমরান, ৩:১৯৩)

মহান আল্লাহ সাহাবায়ে কেরামের এই দোয়া উত্তরে বলেন,

“অতঃপর তাদের পালনকর্তা তাদের দোয়া (এই বলে) কবুল করে নিলেন যে, আমি তোমাদের কোন পরিশ্রমকারীর পরিশ্রমই বিনষ্ট করি না, তা সে পুরুষ হোক কিংবা স্ত্রীলোক। তোমরা পরস্পর এক। তারপর সে সমস্ত লোক যারা হিজরত করেছে, তাদেরকে নিজেদের দেশ থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে এবং তাদের প্রতি উৎপীড়ন করা হয়েছে আমার পথে এবং যারা লড়াই করেছে ও মৃত্যুবরণ করেছে, অবশ্যই আমি তাদের উপর থেকে অকল্যাণকে অপসারিত করব। এবং তাদেরকে প্রবিষ্ট করব জান্নাতে যার তলদেশে নহর সমূহ প্রবাহিত। এই হলো বিনিময় আল্লাহর পক্ষ থেকে। আর আল্লাহর নিকট রয়েছে উত্তম বিনিময়।” (সূরা আলে ইমরান, ৩:১৯৫)

কুরআন ও সুন্নাহর জীবন্ত রূপ

মহান আল্লাহ তা‘আলা তাঁর সর্বশেষ রাসূল হযরত মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)–এর মাধ্যমে মানবজাতির জন্য যে হিদায়াত ও মুক্তির পথ প্রেরণ করেছেন, তা পৃথিবীর সর্বত্র পৌঁছে দেওয়ার মহান দায়িত্ব পালনে সাহাবায়ে কেরাম ছিলেন তাঁর প্রধান সহযোগী ও বিশ্বস্ত সহচর। নবী করীম (সাঃ)-এর সাহচর্যে থেকে তাঁরা ঈমানের দৃঢ়তা, তাকওয়া, আত্মশুদ্ধি, আল্লাহভীতি এবং নেক আমলের উৎকৃষ্ট শিক্ষা লাভ করেছিলেন। নবীজী (সাঃ) যেমন ছিলেন কুরআনের বাস্তব প্রতিচ্ছবি তেমনি তাঁর সাহাবাগণের জীবন ছিল সুন্নাহর জীবন্ত রূপ

তাঁদের মহৎ অবদানের স্বীকৃতি

পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ্ তাঁদের মহৎ অবদানের স্বীকৃতি দিয়ে বলেন:

♣ “যারা ঈমান এনেছে, দেশ ত্যাগ করেছে এবং আল্লাহর রাহে নিজেদের জান ও মাল দিয়ে জিহাদ করেছে, তাদের বড় মর্যাদা রয়েছে আল্লাহর কাছে আর তারাই সফলকাম। তাদের সুসংবাদ দিচ্ছেন তাদের পরওয়ারদেগার স্বীয় দয়া ও সন্তোষের এবং জান্নাতের, সেখানে আছে তাদের জন্য স্থায়ী শান্তি। তথায় তারা থাকবে চিরদিন। নিঃসন্দেহে আল্লাহর কাছে আছে মহাপুরস্কার।” (সূরা আত তাওবা, ৯:২০-–২২)

♣ “(হে নবী) আর যখন তারা আপনার কাছে আসবে যারা আমার নিদর্শনসমূহে বিশ্বাস করে, তখন আপনি বলে দিন: তোমাদের উপর শান্তি বর্ষিত হোক। তোমাদের পালনকর্তা রহমত করা নিজ দায়িত্বে লিখে নিয়েছেন যে, তোমাদের মধ্যে যে কেউ অজ্ঞতাবশতঃ কোন মন্দ কাজ করে, অনন্তর এরপরে তওবা করে নেয় এবং সৎ হয়ে যায়, তবে তিনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল, করুণাময়।” (সূরা আন’আম, ৬:৫৪)

এ সংক্রান্ত আরও আয়াত:

♣ “……সুতরাং যেসব লোক তাঁর উপর ঈমান এনেছে, তাঁর সাহচর্য অবলম্বন করেছে, তাঁকে সাহায্য করেছে এবং সে নূরের (কুরআনের) অনুসরণ করেছে যা তার সাথে অবতীর্ণ করা হয়েছে, শুধুমাত্র তারাই নিজেদের উদ্দেশ্য সাধনে সফলতা অর্জন করতে পেরেছে।” (সূরা আরাফ, ৭:১৫৭)

♣ “মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে যারা প্রথম অগ্রগামী এবং যারা নিষ্ঠার সাথে তাদের অনুসরণ করেছে, আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং তারাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছে। তিনি তাদের জন্য এমন জান্নাত প্রস্তুত করে রেখেছেন, যার তলদেশে নদী প্রবাহিত; সেখানে তারা চিরকাল অবস্থান করবে। এটাই মহাসাফল্য।” (সূরা আত–তাওবা, ৯:১০০)

উপসংহার

সাহাবায়ে কেরাম (রাঃ) ছিলেন ইসলামের প্রথম প্রজন্ম, কুরআনের শিক্ষার সর্বোত্তম বাস্তব রূপ এবং মানবজাতির জন্য আলোকবর্তিকা। তাঁদের আত্মত্যাগ, নিষ্ঠা ও ঈমানের কারণেই ইসলামের বাণী পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে পৌঁছেছে। মহান আল্লাহ তাঁদের প্রতি সন্তুষ্টি ঘোষণা করেছেন এবং জান্নাতের সুসংবাদ দিয়েছেন। অতএব, মুসলিম উম্মাহর কর্তব্য হলো সাহাবায়ে কেরামের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা পোষণ করা, তাঁদের জীবনাদর্শ অনুসরণ করা এবং তাঁদের দেখানো পথে কুরআন ও সুন্নাহকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরা। আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে সাহাবায়ে কেরামের আদর্শ অনুসরণ করে তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের তাওফীক দান করুন। আমীন।

অধ্যায়সমূহ