এ অধ্যায়ের বিষয়সমূহ
Toggleকুরাইশদের প্রতিশোধ স্পৃহা
বদর যুদ্ধে শোচনীয়ভাবে পরাজিত কুরাইশগণ শোকে কাতর হয়ে পড়লেও নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর সাথে সমঝোতার পরিবর্তে প্রতিশোধ গ্রহণে তৎপর হয়ে উঠে। কুরাইশ নেতা আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হিন্দা তার বাপ, চাচা ও ভাই এ তিন ঘনিষ্টজনকে হারিয়ে এতটাই হিংস্র হয়ে পড়েছিল যে সব শোক ভুলে সে প্রতিহিংসার অনলে জ্বলতে থাকে। সে প্রতিজ্ঞা করে যে, এর প্রতিশোধ না নিয়ে সে কোন সাজগোজ করবে না, এমনকি স্বামীর সাথে সহবাসও করবে না।
এদিকে মুসলমানদের অবরোধের ফলে কুরাইশদের সিরিয়া ও আবিসিনিয়াগামী বাণিজ্য কাফেলার প্রধান যাতায়াত পথ অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। ফলে বাণিজ্য নির্ভর মক্কাবাসী কুরাইশদের মধ্যে বিরাট এক অর্থনৈতিক মন্দা ও সঙ্কটের আশঙ্কা প্রবল হয়ে উঠে। তারা এটা নিশ্চিত হয় যে, মদীনা থেকে মুসলমানদেরকে উৎখাত না করা পর্যন্ত তাদের এ আশঙ্কার অবসান হবে না। তাই তাদের দুশ্চিন্তার সাথে যুক্ত হয় তাদের প্রতিশোধ স্পৃহা।
কুরাইশ নেতা আবু সুফিয়ানের মদীনা অভিযান
বদর যুদ্ধে পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে কুরাইশ নেতা আবু সুফিয়ান উদ্গ্রীব হয়ে উঠে। সে ও তার স্ত্রী হিন্দা শপথ করেছিল যে, তারা পরস্পরকে স্পর্শ করবে না যতক্ষণ না এ পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে পারে। কুরাইশদের শক্তি–সামর্থ্য প্রদর্শনের উদগ্র বাসনায় সে চার শত সৈন্য নিয়ে মদীনা অভিমুখে যাত্রা করে। পথিমধ্যে মুসলিম বাহিনীর অবস্থানের আশঙ্কায় সে খুবই সতর্কতা অবলম্বন করে।
অবশেষে সে মদীনার পার্শ্ববর্তী উরায়য নামক স্থানে পৌঁছে শিবির স্থাপন করলো। সেখানে তারা গবাদি পশু-চারণরত দু’জন রাখালকে দেখতে পায়। এদের একজন ছিল মুসলিম আনসার। আবু সুফিয়ান বাহিনী এদের দু’জনকেই হত্যা করে এবং পাশের একটি খেজুর বাগানে অগ্নি সংযোগ করে। ঘটনাটি মদীনার মুসলমানদের নজরে আসলে নবী করীম (সাঃ) মুসলিম বাহিনী নিয়ে দ্রুত সেদিকে ধাবিত হলেন। প্রতিআক্রমণ আঁচ করতে পেরে আবু সুফিয়ান বাহিনী সে স্থান ছেড়ে মক্কার দিকে পালাতে শুরু করলো। তারা এতই ভীত–সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছিল যে, তাদের রসদপত্রের সাথে খাবার হিসেবে আনীত প্রচুর ছাতুর বস্তা ফেলেই পশ্চাদাপসরণ করেছিল।
মুসলিম বাহিনী তাদের পশ্চাদ্ধাবন করে কারকারাতুল কুদর নামক স্থানে পৌঁছান। কিন্তু শত্রুবাহিনী ততক্ষণে নাগালের বাইরে চলে যায়। পথিমধ্যে শত্রুর ফেলে যাওয় ছাতুর বস্তাগুলো তারা গনীমতের মাল হিসেবে মদীনায় নিয়ে আসেন। আর এজন্যই একে বলা হয় সাবীক বা ছাতুর যুদ্ধ। এভাবেই আবু সুফিয়ানের মদীনা অভিযানটি ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়।
কুরাইশদের বিকল্প বাণিজ্য–পথ সন্ধান
আবহমান কাল থেকেই লোহিত সাগরের উপকূল ধরে মক্কার সাথে আবিসিনিয়া ও সিরিয়ার বাণিজ্য পথ চালু ছিল। অনুর্বর পার্বত্য মরুময় মক্কাবাসীর জীবিকা নির্বাহের প্রধান উপায় ছিল ব্যবসা–বাণিজ্য। এ পথেই খাদ্য সামগ্রীসহ তাদের প্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ আসতো ও বাণিজ্য চলতো। সুবিধাজনক ভৌগলিক অবস্থানের কারণে মদীনাবাসী মুসলমানগণ কুরাইশদের বাণিজ্য কাফেলায় বারবার আক্রমণ চালিয়ে তাদেরকে বিপর্যস্ত করে তোলে। ফলে তারা বিকল্প বাণিজ্য পথের সন্ধান করে।
তারা নিজেদের মধ্যে আলাপ–আলোচনা করে ইরাক অভিমুখে একটি অপরিচিত দুর্গম বাণিজ্য পথ নির্ধারণ করে। একজন অভিজ্ঞ পথপ্রদর্শকের সহায়তায় প্রায় এক লাখ দীনার মূল্যের পণ্য সম্ভার নিয়ে তাদের বাণিজ্য কাফেলা সে বিকল্প পথে যাত্রা করে। মক্কায় অবস্থানরত একজন মদীনাবাসী এ খবরটি জানতে পেরে মদীনায় ফিরে এসে তা জানিয়ে দেয়।
নবী করীম (সাঃ) তৎক্ষণাৎ হযরত যায়েদ (রাঃ) এর অধীনে একশত সৈন্যের একটি বাহিনী নজদের দিকে কাফেলাটির সন্ধানে প্রেরণ করেন। তিনি সেখানে পৌঁছে ইরাকগামী পথের পাশে একটি ঝর্ণার নিকটে অবস্থান নেন। বাণিজ্য কাফেলাটি উক্ত ঝর্ণার কাছাকাছি পৌঁছে যখন মুসলিম বাহিনীকে দেখতে পায় তৎক্ষণাৎ তারা প্রাণভয়ে বাণিজ্য সম্ভার ফেলে পালিয়ে যায়। হযরত যায়েদ (রাঃ) কাফেলার সব পণ্যসামগ্রী জব্দ করেন এবং গনীমতের মাল হিসেবে মদীনায় নিয়ে আসেন। এ ঘটনায় কুরাইশরা তাদের বিপুল পুঁজি হারিয়ে ব্যবসা–বাণিজ্যের বাপারে চরম হতাশায় পড়ে যায়।
কুরাইশদের প্রতিশোধ যুদ্ধ পরিকল্পনা
বদর যুদ্ধে পরাজয়ের গ্লানি ও মর্মপীড়া প্রতিনিয়ত কুরাইশদেরকে কুরে কুরে খাচ্ছিল। বিপুল জানমালের ক্ষয়–ক্ষতি প্রায় প্রতিটি পরিবারকে দারুণভাবে স্পর্শ করে। এদিকে বাণিজ্য পথ অবরোধের কারণে তাদের অর্থনৈতিক দুর্দশা ক্রমশ প্রকট হচ্ছিল। অবার আবু সুফিয়ান পরিচালিত ছাতুর যুদ্ধের ব্যর্থতাও তাদেরকে আরও ক্ষিপ্ত করে তোলে। তারা এসবের প্রতিশোধ নিতে মরিয়া হয়ে উঠলো। তিন হাজার সৈন্যের এক সুসজ্জিত বাহিনী গঠন করলো তারা। তাদের এ বাহিনীর সাথে যুক্ত হয় মিত্র গোত্রসমূহের লোকজন। তম্মধ্যে ছিল তায়েফের বনু সাকীফ গোত্রের দুইশত যোদ্ধা। এছাড়াও ছিল কিছু সংখ্যক হাবশী ক্রীতদাস। এ বাহিনীতে ছিল দুই শত ঘোড়–সওয়ার, তিন হাজার উট ও সাত শত বর্ম পরিহিত সৈন্য।
আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হিন্দা যুদ্ধে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিলো। সে তার ঘনিষ্ট স্বজন হারিয়ে প্রবল প্রতিহিংসাপরায়ণ ও উম্মত্ত হয়ে পড়েছিল এবং প্রতিশোধ নিতে সে তার হাবশী ক্রীতদাস ওয়াহশীকে সঙ্গে নিয়ে যায়। হিন্দার সাথে যুক্ত হলো আরও অনেক মহিলা যারা কুরাইশ বাহিনীকে অনুপ্রেরণা ও বিনিদোন দেওয়ার নিমিত্তে গিয়েছিল।
হযরত আব্বাস (রাঃ) কর্তৃক মদীনায় কুরাইশ অভিযানের সংবাদ প্রেরণ
নবীজী (সাঃ) এর আপন চাচা আব্বাস (রাঃ) বদর যুদ্ধে অমুসলিম থাকা অবস্থায় মুসলমানদের হাতে বন্দী হন এবং গোপনে ইসলাম গ্রহণ করেন। তিনি তখন মক্কায় অবস্থান করছিলেন এবং কুরাইশদের এ যুদ্ধ প্রস্তুতি সম্পর্কে ওয়াকিফহাল ছিলেন। কুরাইশ বাহিনী মদীনা অভিমুখে যাত্রার পূর্বেই তিনি একজন দূত মারফৎ বিস্তারিত ঘটনা সম্বলিত একটি চিঠি তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্র হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) সমীপে প্রেরণ করেন। দূত কালবিলম্ব না করে দ্রুত এ চিঠি তাঁর নিকট পৌঁছে দেন।
ওহুদ প্রান্তরে কুরাইশদের সৈন্য সমাবেশ
মদীনা আক্রমণের উদ্দেশ্যে কুরাইশ বাহিনী মদীনা শহরের অদূরে ওহুদ পাহাড়ের পাদদেশে শিবির স্থাপন করে। হযরত আব্বাস (রাঃ) কর্তৃক প্রেরিত চিঠির বিষয়বস্তু নিয়ে নবী করীম (সাঃ) সাহাবীগণের সাথে পরামর্শ সভায় মিলিত হন। এদিকে তিনি শত্রুর অবস্থানের খবরাখবর নেওয়ার জন্য কয়েকজন সাহাবীকে প্রেরণ করেন। তারা শত্রুপক্ষের অবস্থান নির্ণয় করে দেখতে পান মদীনার ফসলের ক্ষেতে শত্রুর ঘোড়া ও উট চারণ করছে। তারা কুরাইশ সৈন্য সংখ্যা ও রণসম্ভারের যে বিবরণ দেন তা হযরত আব্বাস (রাঃ) এর চিঠির বর্ণনার সাথে মিলে যায়।
পরামর্শ সভায় নবীজী (সাঃ) তাঁর নিজ অভিমত ব্যক্ত করে বলেন, মুসলিম বাহিনীর মধ্যে মুহাজিরগণ শহরের বাইরে শত্রুর সম্মুখভাগে অবস্থান নেবে এবং অন্যরা শহরের অভ্যন্তর থেকে যুদ্ধ করবে। মদীনার নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি ও মুনাফিক সর্দার আব্দুল্লাহ্ ইবনে উবাই তার অভিজ্ঞতার আলোকে নবীজী (সাঃ) এর পরিকল্পনা সমর্থন করলো এবং শহরের অভ্যন্তর থেকেই কুরাইশদের মোকাবিলার পরামর্শ দিলো।
কিন্তু মদীনার তেজস্বী যুবসমাজ ভিন্নমত পোষণ করলো। তারা রণাঙ্গণে সরাসরি সম্মুখ যুদ্ধের পক্ষপাতি ছিল। তাদের ওজস্বী বক্তব্য ও শাহাদাত বরণের উদ্দীপনা অনেককেই অভিভূত করলো এবং অধিকাংশই তাদের পক্ষে অভিমত ব্যক্ত করলো। অবশেষে নবীজী (সাঃ) সিদ্ধান্ত নিলেন ওহুদ প্রান্তরেই শত্রুর সাথে মোকাবিলা হবে। সে অনুযায়ী এক হাজার মুসলিম সৈন্যের একটি বাহিনী প্রস্তুত করা হলো।
ওহুদ যুদ্ধের সূচনা
হিজরী তৃতীয় বর্ষে ওহুদ প্রান্তরে মুসলমান ও কুরাইশদের মধ্যে যুদ্ধ সংঘটিত হয়। নবী করীম (সাঃ) যুদ্ধবেশ ধারণ করেন ও বর্ম পরিধান করে বেরিয়ে আসেন। যুব সমাজের কিছু লোক বুঝতে পারলো নবীজী (সাঃ) এর মতের বিরূদ্ধে যাওয়া তাদের ঠিক হয়নি। তারা এসে তাদের ভুল স্বীকার করলো এবং তাঁর পূর্বতন অভিমত অনুযায়ী শহরের অভ্যন্তরে থেকেই যুদ্ধ পরিচালনার জন্য তাঁকে অনুরোধ জানালো। তিনি তাদেরকে বললেন,
’এটা নবীসুলভ আচরণ নয় যে, যুদ্ধবেশ ধারণ করার পর তা খুলে ফেলা। বরং যে সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে তা বাস্তবায়ন করো। তোমরা যদি আল্লাহর উপর ভরসা করো, ধৈর্যধারণ করো ও অবিচল থাকো, তবে তোমরাই জয়ী হবে।’
এ কথা বলে তিনি ওহুদ অভিমুখে যাত্রা করেন। মুনাফিক আবদুল্লাহ্ ইবনে উবাই তার প্রদত্ত পরামর্শ অগ্রাহ্য করায় মুসলিম বাহিনী থেকে তার তিন শত সৈন্য প্রত্যাহার করে নিলো। কুরাইশদের তিন হাজার সৈন্যের বিশাল বাহিনীর বিপরীতে মাত্র সাত শত মুসলিম সৈন্য নিয়ে নবীজী (সাঃ) ওহুদ পাহাড়ের পাদদেশে উপস্থিত হলেন।
ওহুদ রণাঙ্গণে পৌঁছে তিনি প্রথমে সেনাদের কাতারবন্দী করেন। একটি গিরিপথ তাঁর নজরে আসে। সেখান দিয়ে পেছন থেকে শত্রুর আক্রমণের আশঙ্কা করলেন তিনি। গিরিপথটি সুরক্ষিত করার জন্য তিনি সেখানে পঞ্চাশ জন দক্ষ তীরন্দাজ নিযুক্ত করে নির্দেশ দিলেন তারা যেন কোন অবস্থায়ই এ স্থান ত্যাগ না করে এবং সে স্থানে থেকেই কুরাইশদের অশ্ববাহিনীর উপর তীর নিক্ষেপ করে। এটি ছিল নবী করীম (সাঃ) এর এক সুচিন্তিত ও দূরদর্শী সিদ্ধান্ত।
যুদ্ধ শুরুর পূর্বে তিনি তাঁর নিজ তরবারীটি খাপমুক্ত করে বললেন, ‘তোমাদের মধ্যে কে আছ যে এ অসির চাহিদা পূরণে সক্ষম?’ তাঁর এ আহ্বানে ত্বরিত গতিতে কয়েকজন সাহাবী বীর যোদ্ধা এগিয়ে এলেন। তাঁদের মধ্যে মাথায় লাল পট্টি বাঁধাআব্বাস (রাঃ) নবীজী (সাঃ) কে জিজ্ঞেস করলেন, ’এ তরবারীর চাহিদা কি এবং তা কিভাবে মেটানো যাবে?’ উত্তরে তিনি বললেন, ‘এটির চাহিদা হলো উপর্যুপরি আঘাতে আঘাতে এর দ্বারা শত্রু নিধন চলতে থাকবে যতক্ষণ না এটি দুমড়ে–মুচড়ে যায়।’ আবু দুজানা (রাঃ) শহীদ হওয়ার আকাঙ্খায় মাথায় লাল পট্টি বেঁধে এসেছিলেন। তিনি বললেন, ‘আমি শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে এর চাহিদা মেটাবো।’ নবীজী (সাঃ) তাঁর হাতেই এ তরবারীটি দিলেন। তিনিই যুদ্ধ শুরু করলেন এবং তাঁর প্রতিশ্রুতি রক্ষা করলেন। অমিত শক্তিতে শত্রুব্যুহ ভেদ করে তিনি তাদেরকে কচু–কাটা করেন।
মুসলমানদের প্রাথমিক বিজয়
ওহুদ রণাঙ্গণে প্রাথমিক পর্যায়ে মুসলিম বাহিনী ঈমানী শক্তিতে বলীয়ান হয়ে বিপুল সংখ্যক শত্রুবাহিনীর বিরুদ্ধে বীর বিক্রমে যুদ্ধ চালিয়ে যায়। হযরত হামযা (রাঃ) ও হযরত আলী (রাঃ) আক্রমণের মুখে তারা পিছু হঠতে বাধ্য হয়। হযরত আলী (রাঃ) এর হাতে কুরাইশদের পতাকাবাহী তালহা নিহত হয়। এভাবে হযরত হামযা (রাঃ) এর হাতে একের পর এক কুরাইশ পতাকাবাহীরা নিহত হতে লাগলো। সর্বশেষে কুরাইশদের নবম পতাকাবাহী নিহত হয় হাবশী ক্রীতদাস হযরত সোয়াব হযরত কুযমান (রাঃ) অথবা হযরত সাআদ ইবনে আবী ওয়াক্কাস (রাঃ) এর হাতে। এরপর আর কোন পতাকাবাহিী না আসায় তারা পলায়নপর হয়ে পড়ে।
হযরত হামযা (রাঃ) এর শাহাদাত বরণ
এদিকে আবু সুফিয়ানের স্ত্রী প্রতিশোধপরায়ণা হিন্দা তার হাবশী ক্রীতদাস ওয়াহশীকে প্রচুর পুরস্কারের লোভ দেখিয়ে হযরত হামযা (রাঃ)-কে হত্যার জন্য পাঠালো। কারণ তিনি বদর যুদ্ধে তার পিতা ও ভাইকে হত্যা করেছিলেন। সে রণাঙ্গনে তাঁকে খুঁজে বের করলো এবং দূর থেকে তাঁর দিকে বর্শা নিক্ষেপ করলো। বর্শাটি তাঁর দেহ ভেদ করে যায় এবং এতে তিনি শাহাদাত বরণ করেন। তখন হিন্দা এসে তাঁর বক্ষ চিরে দেহ থেকে হৃদপিন্ড বের করে আনে এবং তা চিবিয়ে খায়।
মুসলিম বাহিনীর বিপর্যয়ের ঘটনা
যুদ্ধের প্রাথমিক পর্যায়ের বিজয় মুসলমানদেরকে উৎফুল্ল করে তোলে। তাঁরা গনীমতের মাল সংগ্রহে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। এদিকে গিরিপথ রক্ষার দায়িত্বপালনকারী পঞ্চাশজনের মুসলিম তীরন্দাজ বাহিনী শত্রুর পরাজয়ে বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন। তাঁদের অধিকাংশই গিরিপথ অরক্ষিত রেখে গনীমতের মাল সংগ্রহে স্থান ত্যাগ করেন। কিন্তু এ তীরন্দাজ বাহিনীর অধিনায়ক হযরত আব্দুল্লাহ্ ইবনে যোবায়ের (রাঃ) গিরিপথ না ছাড়ার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করলেন। এতে শুধু দশজন ছাড়া আর কেউ তাঁর কথায় কর্ণপাত করলো না।
এদিকে বিচক্ষণ কুরাইশ সেনাপতি খালীদ ইবনে ওয়ালীদ গিরিপথের এ দুর্বল অবস্থা দেখে তার অশ্বারোহী বাহিনীকে সে পথে ধাবিত করেন। স্বল্প–সংখ্যক মুসলিম তীরন্দাজগণ সর্বশক্তি নিয়োগ করে শত্রুবাহিনীকে প্রতিহত করার চেষ্টা করেন। কিন্তু শত্রুবাহিনী তাঁদেরকে পরাভূত করে এগিয়ে গেলো। তীরন্দাজ বাহিনীর দশজনের সবাই শাহাদাত বরণ করলেন।
বীর খালীদ বিন ওয়ালীদের নেতৃত্বে কুরাইশ বাহিনী পশ্চাদদিক থেকে আক্রমণ করে অপ্রস্তুত মুসলিম বাহিনীর ভিতরে ঢুকে পড়েন এবং গনীমত সংগ্রহে লিপ্ত মুসলিমবাহিনীর উপর অতর্কিত আক্রমণ চালিয়ে বিপর্যয় ঘটাতে সক্ষম হন। এভাবে মুসলমানদের প্রাথমিক বিজয়ের সুখ–স্বপ্ন গিরিপথ রক্ষাকারী তীরন্দাজদের ভুলের কারণে দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়।
কুরাইশ সেনাপতি খালীদ ইবনে ওয়ালীদের এ অতর্কিত আক্রমণের ফলে মুসলিম বাহিনী বিশৃঙ্খল ও ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে। মুসলিম বাহিনী এতই বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে যে তাদের শত্রু–মিত্র চিনতে ভুল হচ্ছিল এবং নিজেরাই নিজ পক্ষের লোকজনের উপর আঘাত হানছিল।
নবীজী (সাঃ) এর ওপর আক্রমণ
এদিকে শত্রুবাহিনী নবী করীম (সাঃ) এর নিকটবর্তী হয়ে পড়ে। তাঁর বীর দেহরক্ষীগণ সর্বশক্তি প্রয়োগ করে শত্রুর আক্রমণ ঠেকাতে থাকেন। এক পর্যায়ে শত্রুর নিক্ষিপ্ত একটি পাথর নবীজী (সাঃ) এর ঠোঁটে আঘাত করলে তাঁর দু’টি দন্তমোবারক শহীদ হয় এবং তাঁর শিরস্ত্রাণের দু’টি কড়া তাঁর পবিত্র গালে বসে যায়। ফলে তাঁর গন্ডদেশ বেয়ে রক্ত ঝরতে থাকে। তাঁর এ করুণ অবস্থায় তিনি স্বজাতির প্রতি অভিশাপ বর্ষণ না করে বরং তাদের হেদায়েতের জন্য দোয়া করেন। হযরত আবু হাতীম (রাঃ) বর্ণিত হাদীসে এ দোয়াটি হলো: ”ইয়া আল্লাহ্! আমার কওমকে ক্ষমা করুন – তারা অজ্ঞ।” (সহীহ ইবনে হিব্বান ৯৭৩)
নবীজী (সাঃ) এর শাহাদাত বরণের গুজব
এরই মধ্যে গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) শাহাদাত বরণ করেছেন। এ মিথ্যা গুজবে মুসলমানদের মধ্যে হাতাশা আরও বৃদ্ধি পায়। কিন্তু আল্লাহর খাঁটি বান্দাদের মধ্যে ঈমানী শক্তি বহুগুণে বেড়ে যায়। তাঁরা মরণপণ সংগ্রামে লিপ্ত হন। ইতোমধ্যে নবীজী (সাঃ) এর প্রিয় সাহাবীগণ তাঁকে নিয়ে ওহুদ পর্বতের চূড়ায় এক নিরাপদ স্থানে অবস্থান গ্রহণ করেন। নবীজী (সাঃ) জীবিত আছেন জেনে কুরাইশগণ বারবার আক্রমণ চালিয়েও সেখানে পৌঁছুতে সক্ষম হলো না।
কুরাইশ বাহিনীর রণক্ষেত্র পরিত্যাগ
অবশেষে ব্যর্থ কুরাইশ বাহিনী মদীনা শহর আক্রমণ ও মুসলমাদেরকে নির্মূল করার পরিকল্পনা পরিত্যাগ করে মক্কার পথে ফিরে চললো। এ যুদ্ধে কুরাইশরা কোন সুস্পষ্ট বিজয় অর্জন করতে না পারলেও প্রায় সত্তর জন মুসলমান শাহাদাত বরণ করেছিলেন। তবে কুরাইশদেরও জান–মালের ক্ষতিও কম ছিল না।
মুসলিম শহীদদের লাশ দাফন
যুদ্ধ শেষে কুরাইশগণ রণক্ষেত্র পরিত্যাগ করলে নবী করীম (সাঃ) মুসলিম শহীদদের লাশ দাফন করার জন্য রণাঙ্গণে যান এবং হযরত হামযা (রাঃ)সহ সকল শহীদের লাশ দাফন করেন। সেখানে আপন চাচা হযরত হামযা (রাঃ) এর বিকৃত লাশ দেখে তিনি খুবই ব্যথিত হন। এর প্রতিশোধ গ্রহণে তিনি শপথ করেন যে ভবিষ্যতে তিনিও ওদের লাশকে এমনইভাবে বিকৃত করবেন। কিন্তু মহান আল্লাহ্ তাঁর এ ধরনের শপথ পছন্দ করলেন না। তিনি নিম্নোক্ত আয়াত দু’টি আয়াত নাযিল করলে তিনি তাঁর এ শপথ বাতিল করে দেন:
“আর যদি তোমরা প্রতিশোধ গ্রহণ কর, তবে ঐ পরিমাণ প্রতিশোধ গ্রহণ করবে, যে পরিমাণ তোমাদেরকে কষ্ট দেয়া হয়। যদি সবর কর, তবে তা সবরকারীদের জন্যে উত্তম। আপনি সবর করবেন। আপনার সবর আল্লাহর জন্য ব্যতীত নয়, তাদের জন্যে দুঃখ করবেন না এবং তাদের চক্রান্তের কারণে মন ছোট করবেন না।” (সূরা নহল, ১৬:১২৬–১২৭)
মুসলিমদের পুনরায় যুদ্ধযাত্রা
মদীনায় ফিরে এসে নবী করীম (সাঃ) জানতে পারলেন কুরাইশ সেনাপতি আবু সুফিয়ান রাওহা নামক স্থানে শিবির স্থাপন করেছে এবং বিশাল রণসম্ভার নিয়ে পুনরায় মদীনা আক্রমণের পরিকল্পনা আঁটছে। এতে মুসলিম শক্তি ভীত হওয়ার পরিবর্তে তাদের ঈমানী শক্তি আরও বৃদ্ধি পায়। তাঁরা বলেন, ‘আল্লাহ্ই আমাদের জন্য যথেষ্ট।’ নবীজী (সাঃ) তৎক্ষণাৎ ওহুদ যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সকল সাহাবীকে সঙ্গে নিয়ে কুরাইশদের পশ্চাদ্ধাবনের জন্য রওয়ানা দেন। যাঁরা আহত হয়েছিলেন তাঁরাও তাঁর সঙ্গী হলেন।
নবীজী (সাঃ) তাঁদেরকে নিয়ে মদীনার অদূরে হামরাউল আসাদ নামক স্থানে অবস্থান নেন। সেখানে তিনি যুদ্ধের কৌশল হিসেবে অনেকগুলো অগ্নিকুন্ড প্রজ্জ্বলিত করেন যাতে শত্রুরা মুসলমানদের সংখ্যা নিরুপণে বিভ্রান্ত ও ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে।
এদিকে আবু সুফিয়ান জানতে পারলো মদীনা থেকে বিপুল বাহিনী নিয়ে মুসলমানগণ নব উদ্যমে এগিয়ে এসেছে। রাতের বেলায় বিপুল সংখ্যক অগ্নিশিখা দর্শনে সে প্রমাদ গুনলো এবং পরাজয়ের আশঙ্কায় মক্কায় ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলো। কুরাইশরা চলে গেলে নবীজী (সাঃ) মদীনায় ফিরে আসলেন।
এ ঘটনায় মুসলমানদের প্রতি সন্তুষ্টি জানিয়ে পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ্ বলেন:
“যারা আহত হয়ে পড়ার পরেও আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের নির্দেশ মান্য করেছে, তাদের মধ্যে যারা সৎ ও পরহেযগার, তাদের জন্য রয়েছে মহান সওয়াব। যাদেরকে লোকেরা বলেছে যে, তোমাদের সাথে মোকাবেলা করার জন্য লোকেরা সমাবেশ করেছে বহু -সাজ-সরঞ্জাম; তাদের ভয় কর। তখন তাদের বিশ্বাস আরও দৃঢ় হয়ে যায় এবং তারা বলে, আমাদের জন্য আল্লাহই যথেষ্ট; কতই না চমৎকার কামিয়াবীদানকারী। অতঃপর ফিরে এল মুসলমানরা আল্লাহর অনুগ্রহ নিয়ে, তদের কিছুই অনিষ্ট হলো না। তারপর তারা আল্লাহর ইচ্ছার অনুগত হল। বস্তুত আল্লাহর অনুগ্রহ অতি বিরাট।” (সূরা আলে ইমরান, ৩:১৭২–১৭৪)
ওহুদ যুদ্ধে প্রাথমিক বিজয়ের পর যে বিপর্যয় নেমেে এসেছিল সে সম্পর্কে আল্লাহ্ তায়ালা বলেন:
“আর তোমরা উপরে উঠে যাচ্ছিলে এবং পেছন দিকে ফিরে তাকাচ্ছিলে না কারো প্রতি, অথচ রসূল ডাকছিলেন তোমাদিগকে তোমাদের পেছন দিক থেকে। অতঃপর তোমাদের উপর এলো শোকের ওপরে শোক, যাতে তোমরা হাত থেকে বেরিয়ে যাওয়া বস্তুর জন্য দুঃখ না কর এবং যার সম্মুখীন হচ্ছ সেজন্য বিমর্ষ না হও। আর আল্লাহ তোমাদের কাজের ব্যাপারে অবহিত রয়েছেন।” (সূরা আলে ইমরান, ৩:১৫৩)
মুসলমানদেরকে সান্ত্বনা দিয়ে আল্লাহ্ বলেন:
“আর তোমরা নিরাশ হয়ো না এবং দুঃখ করো না। যদি তোমরা মু’মিন হও তবে, তোমরাই জয়ী হবে। তোমরা যদি আহত হয়ে থাক, তবে তারাও তো তেমনি আহত হয়েছে। আর এ দিনগুলোকে আমি মানুষের মধ্যে পালাক্রমে আবর্তন ঘটিয়ে থাকি। এভাবে আল্লাহ জানতে চান কারা ঈমানদার আর তিনি তোমাদের কিছু লোককে শহীদ হিসাবে গ্রহণ করতে চান। আর আল্লাহ অত্যাচারীদেরকে ভালবাসেন না। আর এ কারণে আল্লাহ ঈমানদারদেরকে পাক-সাফ করতে চান এবং কাফেরদেরকে ধ্বংস করে দিতে চান। তোমাদের কি ধারণা, তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করবে? অথচ আল্লাহ এখনও দেখেননি তোমাদের মধ্যে কারা জেহাদ করেছে এবং কারা ধৈর্য্যশীল।” (সূরা আলে ইমরান, ৩:১৩৯–১৪২)
ওহুদ যুদ্ধের ফলাফল
ওহুদ যুদ্ধে কোন পক্ষই সুস্পষ্ট বিজয় লাভ করতে পারেনি। উভয় পক্ষই কম-বেশী ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। এ যুদ্ধের প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল মুসলমানদের প্রাথমিক পর্যায়ের বিজয় এবং পরবর্তী বিপর্যয়, অপরদিকে কুরাইশদের প্রাথমিক বিপর্যয়ের পর তাদের পরবর্তী বিজয় – যা ছিল অর্ধ সমাপ্ত। কারণ কুরাইশরা তাদের মূল লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়।
- মদীনা শহর দখল করে তারা যেমন মুসলমাদেরকে নির্মূল করতে পারেনি তেমনি তাদের সিরিয়া–আবিসিনিয়াগামী বাণিজ্য পথও সুরক্ষিত করতে পারেনি।
- বরং তাদের পুনরায় মদীনা আক্রমণের চেষ্টাও ভন্ডুল হয়ে যায়। মুসলমানদের পশ্চাদ্ধাবনে তারা পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়।
- তারা যা পেরেছিল তা হলো মুসলমানদের প্রাণহানির মাধ্যমে বদর যুদ্ধের প্রতিশোধ গ্রহণ। কুরাইশ নেতা আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হিন্দা ঠিকই তার প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে পেরেছিল।
মুসলমানদের বিপর্যয়ের মূল কারণ
যুদ্ধে জয়–পরাজয় আছে এবং তা পালাক্রমে ঘটে থাকে। ভুলের কারণে মুসলমানগণ এ যুদ্ধে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল। এতে তাদের জন্য অনেক শিক্ষণীয় বিষয় রয়েছে। লোভের বশবর্তী হয়ে নেতার নির্দেশ অমান্য করা ছিল একটি মারাত্মক ভুল যা ছিল মুসলমানদের বিপর্যয়ের মূল কারণ।
ওহুদ যুদ্ধ ছিল মুসলমানদের জন্য এক বিরাট পরীক্ষা। সে পরীক্ষায় তাদের দুর্বল দিকগুলোর মধ্যে–
- প্রধানতম হলো যুদ্ধের কৌশল অবলম্বনে নেতৃত্বের উপর দৃঢ় বিশ্বাস ও আস্থার ঘাটতি।
- দ্বিতীয় দিকটি হলো শত্রুকে সম্পূর্ণভাবে পরাভূত না করেই গনীমতের মাল সংগ্রহে ব্যস্ত হয়ে পড়া।
- আর তৃতীয়টি হলো নেতৃত্বের নির্দেশ অমান্য করে গিরিপথ অরক্ষিত রেখে গনীমতের মাল সংগ্রহে লিপ্ত হওয়া।
মুসলমানদের এ পরীক্ষা সম্পর্কে মহান আল্লাহ্ বলেন,
“আর আল্লাহ সে ওয়াদাকে সত্যে পরিণত করেছেন, যখন তোমরা তাঁরই নির্দেশে ওদের খতম করছিলে। এমনকি যখন তোমরা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়েছ ও কর্তব্য স্থির করার ব্যাপারে বিবাদে লিপ্ত হয়েছ। আর যা তোমরা চাইতে তা দেখার পর কৃতঘ্নতা প্রদর্শন করেছ, তাতে তোমাদের কারো কাম্য ছিল দুনিয়া আর কারো বা কাম্য ছিল আখেরাত। অতঃপর তোমাদিগকে সরিয়ে দিলেন ওদের উপর থেকে যাতে তোমাদিগকে পরীক্ষা করেন। বস্তুত তিনি তোমাদিগকে ক্ষমা করেছেন। আর আল্লাহর মু’মিনদের প্রতি অনুগ্রহশীল। (সূরা আলে ইমরান, ৩:১৫২)
শহীদী মৃত্যুর মর্যাদা
যারা আল্লাহর দ্বীন ও সত্য–ন্যায় প্রতিষ্ঠার কাজে এবং সমাজকে অন্যায়–অত্যাচার, জোর–জুলুম ও নিপীড়নের হাত থেকে রক্ষার কাজে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করে শাহাদাৎ বরণ করে তারাই শহীদী মর্যাদা লাভ করে। পবিত্র কুরআনে উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন চার ধরনের ব্যক্তিবর্গের কথা উল্লেখিত হয়েছে তাঁদের মধ্যে শহীদগণ অন্যতম। হযরত নুয়া’ইম ইবনে হাম্মার (রাঃ) বর্ণিত হাদীস থেকে জানা যায়, এক ব্যক্তি নবী করীম (সাঃ)-কে জিজ্ঞেস করলো — “শহীদদের মধ্যে কে সর্বোত্তম?” উত্তরে তিনি বললেন:
“যে সব ব্যক্তি জিহাদে শরীক হয় এবং মৃত্যু পর্যন্ত মুখ ফিরিয়ে না নেয় তারাই সর্বোত্তম। তাদের বাসস্থান জান্নাতের সর্বোচ্চ স্থানে এবং তাদের প্রভু তাদের উপর সন্তুষ্ট থাকেন, আর তোমার রব এ দুনিয়ায় যে বান্দার উপর সন্তুষ্ট হয়ে যান পরকালে তাকে কোন হিসাবের সম্মুখীন হতে হবে না।” (আহমদ: ২১৯৭০)।
পবিত্র কুরআনে শহীদদের মর্যাদা সম্পর্কিত আয়াতসমূহ
♠“আর যে কেউ আল্লাহর হুকুম এবং তাঁর রসূলের হুকুম মান্য করবে, তাহলে যাঁদের প্রতি আল্লাহ নেয়ামত দান করেছেন, সে তাঁদের সঙ্গী হবে। তাঁরা হলেন নবী, ছিদ্দীক, শহীদ ও সৎকর্মশীল ব্যক্তিবর্গ। আর তাদের সান্নিধ্যই হল উত্তম। এটা হল আল্লাহ-প্রদত্ত মহত্ত্ব। আর আল্লাহ যথেষ্ট পরিজ্ঞাত।” (সূরা নিসা, ৪:৬৯–৭০)
♠“আল্লাহ ক্রয় করে নিয়েছেন মুসলমানদের থেকে তাদের জান ও মাল এই মূল্যে যে, তাদের জন্য রয়েছে জান্নাত। তারা যুদ্ধ করে আল্লাহর রাহে – অতঃপর মারে ও মরে। তওরাত, ইঞ্জিল ও কুরআনে তিনি এ সত্য প্রতিশ্রুতিতে অবিচল। আর আল্লাহর চেয়ে প্রতিশ্রুতি রক্ষায় কে অধিক? সুতরাং তোমরা আনন্দিত হও সে লেন–দেনের উপর, যা তোমরা করছ তাঁর সাথে। আর এ হল মহান সাফল্য।” (সূরা আত তাওবা, ৯:১১১)
♠“আর যারা আল্লাহর রাস্তায় নিহত হয়, তাদের মৃত বলো না। বরং তারা জীবিত, কিন্তু তোমরা তা বুঝ না।” (সূরা বাক্বারাহ, ২:১৫৪)
♠“আর তোমরা যদি আল্লাহর পথে নিহত হও কিংবা মৃত্যুবরণ কর, তোমরা যা কিছু সংগ্রহ করে থাক আল্লাহ তা’আলার ক্ষমা ও করুণা সে সবকিছুর চেয়ে উত্তম।” (সূরা আলে ইমরান, ৩:১৫৭)
♠“আর যারা আল্লাহর রাহে নিহত হয়, তাদেরকে তুমি কখনো মৃত মনে করো না। বরং তারা নিজেদের পালনকর্তার নিকট জীবিত ও জীবিকাপ্রাপ্ত। আল্লাহ নিজের অনুগ্রহ থেকে যা দান করেছেন তার প্রেক্ষিতে তারা আনন্দ উদযাপন করছে। আর যারা এখনও তাদের কাছে এসে পৌঁছেনি তাদের পেছনে তাদের জন্যে আনন্দ প্রকাশ করে। কারণ, তাদের কোন ভয় ভীতিও নেই এবং কোন চিন্তা ভাবনাও নেই। আল্লাহর নেয়ামত ও অনুগ্রহের জন্যে তারা আনন্দ প্রকাশ করে এবং তা এভাবে যে, আল্লাহ, ঈমানদারদের শ্রমফল বিনষ্ট করেন না “ (সূরা আলে ইমরান, ৩:১৬৯–১৭১)
“♠………. তারপর সে সমস্ত লোক যারা হিজরত করেছে, তাদেরকে নিজেদের দেশ থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে এবং তাদের প্রতি উৎপীড়ন করা হয়েছে আমার পথে এবং যারা লড়াই করেছে ও মৃত্যুবরণ করেছে, অবশ্যই আমি তাদের উপর থেকে অকল্যাণকে অপসারিত করব। এবং তাদেরকে প্রবিষ্ট করব জান্নাতে যার তলদেশে নহর সমূহ প্রবাহিত। এই হলো বিনিময় আল্লাহর পক্ষ থেকে। আর আল্লাহর নিকট রয়েছে উত্তম বিনিময়।” (সূরা আলে ইমরান, ৩:১৯৫)
♠“আর যারা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে তারাই তাদের পালনকর্তার কাছে সিদ্দীক ও শহীদ বলে বিবেচিত। তাদের জন্যে রয়েছে পুরস্কার ও জ্যোতি ……. ।” (৫৭:১৯)
♠“যারা আল্লাহর পথে গৃহ ত্যাগ করেছে, এরপর নিহত হয়েছে অথবা মরে গেছে; আল্লাহ তাদেরকে অবশ্যই উৎকৃষ্ট জীবিকা দান করবেন এবং আল্লাহ সর্বোৎকৃষ্ট রিযিক দাতা। তাদেরকে অবশ্যই এমন এক স্থানে পৌছাবেন, যাকে তারা পছন্দ করবে এবং আল্লাহ জ্ঞানময়, সহনশীল।” (সূরা হাজ্জ্ব, ২২:৫৮–৫৯)
♠“কিন্তু রসূল এবং সেসব লোক যারা ঈমান এনেছে, তাঁর সাথে তারা যুদ্ধ করেছে নিজেদের জান ও মালের দ্বারা। তাদেরই জন্য নির্ধারিত রয়েছে কল্যাণসমূহ এবং তারাই মুক্তির লক্ষ্যে উপনীত হয়েছে। আল্লাহ তাদের জন্য তৈরী করে রেখেছেন কানন–কুঞ্জ, যার তলদেশে প্রবাহিত রয়েছে প্রস্রবণ। তারা তাতে বাস করবে অনন্তকাল। এটাই হল বিরাট কৃতকার্যতা।” (সূরা আত তাওবা, ৯:৮৮–৮৯)
মুসলমানদের বনু কায়নুকা গোত্র অভিযান
মদীনা শহরে বসবাসকারী ইহুদীরা শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের নীতি পদদলিত করে মুসলিম–বিদ্বেষী কর্মকান্ড চালাতে থাকে। তারা ছিল চুক্তি–ভঙ্গকারী গোত্র। বদর যুদ্ধে কুরাইশদের পরিণতি তাদের বোধোদয় ঘটায়নি। পরাজিত কুরািইশদের পক্ষ নিয়ে তারা বিভিন্ন উস্কানিমূলক কর্মকান্ড চালিয়ে যেতে লাগলো। এদের বিশ্বাসঘাতকতা ও ধৃষ্টতাপূর্ণ আচরণে অতিষ্ট হয়ে নবী করীম (সাঃ) ত্বরিত ব্যবস্থা গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিলেন। কালক্ষেপন না করে তিনি বনু কায়নুকা গোত্রের ইহুদীদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করেন।
তাদের কেহই সম্মুখ সমরে না এসে সবাই নিজেদের সুরক্ষিত দুর্গে আশ্রয় নিলো। মুসলিম বাহিনী দুর্গ অবরোধ করে রাখলো এবং দুর্গের অভ্যন্তরে রসদ সরবরাহের সকল পথ বন্ধ করে দিলো। এক নাগারে পনেরো দিন পর্যন্ত অবরোধ চলার পর তারা বিনা যুদ্ধে মুসলিম বাহিনীর কাছে পরাজয় স্বীকার করে নেয় এবং আত্মসমর্পন করে।
এদের সাত শত সৈন্যকে নবী মুহাম্মদ (সাঃ) এর সম্মুখে হাজির করা হয়। তিনি তাদেরকে মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত করেন। এ দন্ড থেকে অব্যাহতি দানের জন্য বনু কায়নুকা গোত্রের পুরোনো মিত্র মদীনার আউস ও খাযরাজ গোত্রের নেতা আব্দুল্লাহ্ ইবনে উবাই এবং একজন সাহাবী হযরত উবাদা ইবনে সামিত নবীজী (সাঃ) এর নিকট বারবার আবেদন–নিবেদন করলে তিনি মৃত্যুদন্ড মওকুফ করে তাদেরকে মদীনা থেকে নির্বাসিত করার নির্দেশ দিলেন।
ফলে তারা নিরস্ত্র অবস্থায় মদীনা ত্যাগ করে, তবে যাবতীয় মালামাল সঙ্গে নিয়ে যায়। ওয়াদিউল কোরা নামক স্থানে কিছুকাল অবস্থান করার পর তারা সিরিয়া অভিমুখে চলে যায়। সেখানে তারা আযরেয়াত অঞ্চলে বসতি স্থাপন করে। আপাতত এভাবে মুসলমানগণ মদীনা শহরে ইহুদীদের অভ্যন্তরীন শত্রুতা থেকে মুক্তি পায়।
মদীনার পার্শ্ববর্তী এলাকায় নিরাপত্তার হুমকি মোকাবিলা
মদীনার আশপাশের বনু ছালাবা, বনু মাহারিব, বনু সুলায়ম প্রভৃতি গোত্রগুলো মুসলমানদেরকে আক্রমণের বিভিন্ন প্রচেষ্টা চালায়। কিন্তু তাদের সেসব প্রচেষ্টা মুসলিম বাহিনীর পাল্টা আক্রমণের ভয়ে নস্যাৎ হয়ে যায়। ইহুদী গোত্র বনু কায়নুকার পরিণতির কথা চিন্তা করে মদীনার আশপাশের ইহুদীরা উদ্বিগ্ন হয়ে উঠে।
তাদের একটি প্রতিনিধিদল নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর সাথে সাক্ষাৎ করে তাদের উদ্বেগের কথা জানায়। তিনি তাদেরকে বুঝিয়ে বলেন কেন তিনি ইহুদী কবি কাআব ও বনু কায়নুকা গোত্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছেন। দীর্ঘ আলোচনার পর নবীজী (সাঃ) তাদের সাথে একটি শান্তি চুক্তি সম্পাদন করেন। যদিও তিনি জানতেন ইহুদীরা পুনঃপুনঃ ওয়াদা–ভঙ্গকারী জাতি তবুও শান্তি প্রতিষ্ঠার স্বার্থে তিনি এ চুক্তি করেছিলেন।