এ অধ্যায়ের বিষয়সমূহ
Toggleহযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর আধ্যাত্মিক সাধনার কাল
আরবের ইসলাম–পূর্ব “আয়্যামে–জাহেলিয়াত” বা অন্ধকার যুগে হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর জন্ম। এ অন্ধকার যুগের সব অনাচার ও কুসংস্কার থেকে তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ নিস্পৃহ। একদিকে জীবনের অনিত্যতা, দুঃখ ও বেদনায় তিনি ছিলেন মর্মাহত, অপরদিকে অসংযত আনন্দ–উল্লাস, অনাচার ও অমিতাচারের পরিণামফল তাঁকে ভাবিয়ে তুলতো। তখনকার সামাজিক ও নৈতিক জীবনের অসঙ্গতিগুলো তাঁর চিন্তা–ভাবনার প্রধান উপজীব্য বিষয় ছিল। এর থেকে পরিত্রাণের লক্ষ্যে তিনি ছিলেন আত্মানুসন্ধানে ব্যাপৃত।
তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ নিরক্ষর, কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়াশুনার সুযোগ পাননি। তবে সহজাত সব গুণাবলীর অধিকারী ছিলেন মুহাম্মদ (সাঃ)।
- কোন জ্ঞানী–গুণীর সংস্পর্শেও তিনি জ্ঞানার্জনের চেষ্টা করেননি। সে সময়ে প্রখ্যাত জ্ঞানী সাধক ওয়ারাকা ইবনে নওফেলের মক্কায় অবস্থান সত্ত্বেও তাঁর সান্নিধ্যে লাভের আগ্রহ মুহাম্মদ (সাঃ) এর অন্তরে জাগেনি।
- ফলে কোন পূর্বতন চিন্তা–চেতনা, জ্ঞান–দর্শন, ভাববাদ, ধর্মীয় অভিজ্ঞা তাঁর অন্তরে পরিপুষ্টি লাভের সুযোগ পায়নি।
- অথচ তিনি ছিলেন অন্তর্নিহিত জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও চিন্তা শক্তির অধিকারী। নিজ দিব্যজ্ঞানে যেভাবে জীবন পরিচালনা করা উত্তম মনে করতেন তিনি সেভাবেই জীবন যাপন করছিলেন।
- তৎকালীন সমাজের পৌত্তলিকতার বিষয়টি ছিল তাঁর মধ্যে সম্পূর্ণ নেতিবাচক, তিনি এ থেকে একেবারে নিঃস্পৃহ ছিলেন।
আধ্যাত্মিক চিন্তা–চেতনার উন্মেষ
হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর জীবনের শুরুর দিকটা ছিল বিভিন্ন বিপর্যয়ের দ্বারা পরিবেষ্টিত।
- জন্মের পূর্বেই তিনি পিতৃহীন হন, মাত্র ছয় বছর বয়সে ঘটে মাতৃবিয়োগ ও আট বছর বয়সে অভিবাবক দাদা আব্দুল মুত্তালিব দুনিয়া থেকে বিদায় নেন। এসব প্রিয়জনের মৃত্যুতে তিনি শোকের সাগরে ভাসেন।
- বিপদ–আপদ ও দুঃখ–কষ্ট ছিল তাঁর আজন্ম সাথী। উপর্যুপরি বিয়োগ ব্য়থায় তাঁর অন্তর্বিপ্লব ঘটে এবং তিনি পরম সহনশীল ও ধৈর্যশীল হয়ে উঠেন।
- পার্থিব জীবনের চাকচিক্য তাঁকে আকৃষ্ট করতে পারেনি। বাল্যকালে রাখালির কাজে নিয়োজিত অবস্থায় নির্জন মরুভূমির বুকে এক নিভৃত পরিবেশে তাঁর মধ্যে আধ্যাত্মিক চিন্তার উন্মেষ ঘটে।
পবিত্র কুরআনের নিম্নোক্ত আয়াতগুলোতে হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর তৎকালীন অবস্থার প্রতিফলন ঘটে:
اَلَمْ يَجِدْكَ يَتِيْمًا فَاٰوٰى وَوَجَدَكَ ضَآلًّا فَهَدٰى وَوَجَدَكَ عَآئِلًا فَاَغْنٰى
“তিনি কি আপনাকে এতীমরূপে পাননি? অতঃপর তিনি আশ্রয় দিয়েছেন। তিনি আপনাকে পেয়েছেন পথহারা, অতঃপর পথ প্রদর্শন করেছেন। তিনি আপনাকে পেয়েছেন নিঃস্ব, অতঃপর অভাবমুক্ত করেছেন।” (সূরা আদ দ্বোহা, ৯৩:৬–৮)
হীরা পর্বতের গুহায় সত্যানুসন্ধানের সাধনা
প্রাক–নবুওতকালে তাঁর আধ্যাত্মিক চিন্তার প্রসার ঘটে। তিনি নির্জনে ধ্যানমগ্ন থাকতে পছন্দ করতেন। এ জন্য তিনি পরিবার থেকে দূরে মক্কার পার্শ্ববর্তী হীরা পর্বতের এক নির্জন গুহা বাছাই করেন। প্রায়ই তিনি যেতেন সে পর্বতের নিভৃত গুহায়, ধ্যান করতেন অনিমেষ এবং পরম সত্যের সন্ধানে ব্যাপৃত রাখতেন নিজেকে। তাঁর মন সর্বদা শ্বাশ্বত সত্যের ধ্যানে আপ্লুত থাকত।
এভাবে প্রতি বছর রমযান মাস তিনি হীরার গুহায় নির্জনবাসে অতিবাহিত করতেন। উপবাসব্রত পালনের মাধ্যমে তিনি আত্মিক উন্নয়নে সচেষ্ট ছিলেন।
- মাস ব্যাপী সেখানে অবস্থানের জন্য সাথে নিয়ে যেতেন খাদ্য ও পানীয়। প্রেমময়ী স্ত্রী খাদীজা (রাঃ) তাঁকে পুরোপুরি সহযোগিতা করতেন। কিছু দিন পরপরই তিনি খাদ্য ও পানীয় নিয়ে প্রিয় স্বামীর সেবায় হীরা গুহায় যেতেন। এ মহিয়সী মহিলা অনুধাবন করতে পেরেছিলেন তাঁর স্বামী ভবিষ্যতের একজন মহাপুরুষ হিসেবে পরিগণিত হবেন।
- হীরা পর্বত গুহায় নিভৃত–নির্জন পরিবেশে বহু দিনের সাধনায় তাঁর অন্তরে এক মহাসত্যের পরশ লাভের প্রস্তুতি গ্রহণ চলছিল। এসময় তিনি স্রষ্টা ও তাঁর সৃষ্টির রহস্যানুসন্ধান এবং মানব জীবনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে ধ্যানমগ্ন থাকতেন।
- তিনি ছিলেন সত্যবাদী, সত্য ও ন্যায়ের অনুসারী। প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন এবং এর আলোকে মানব জীবনের কল্যাণ সাধন তাঁর চিন্তা ও অনুসন্ধিৎসাকে পরিবেষ্টন করে রেখেছিল।
- এসব চিন্তা–ভাবনা তাঁকে আধ্যাত্মিকতার উচ্চমার্গে নিয়ে গিয়েছিল।
পরম সত্যালোকের বারতা লাভের আশায় তিনি অধীর আগ্রহে প্রতীক্ষা করছিলেন। সকল পূর্ব ধারণা বর্জিত তাঁর অন্তঃকরণ ছিল সম্পূর্ণ নিখাদ, পূত–পবিত্র, ঐশী জ্ঞান ধারণের জন্য এক উপযুক্ত ক্ষেত্র।
- এভাবেই পরম করুণাময আল্লাহ্ তায়ালা আল্লাহ্ তাঁর প্রিয় বান্দার অন্তরকে ভবিষ্যত নবীর উপযুক্ত করে গড়ে তুলেছিলেন।
- মানবজাতির পথ প্রদর্শক হিসেবে মনোনীত করার আগে তাঁর মধ্যে ঘটিয়েছিলেন আধ্যাত্মিক ও মানবিক গুণের সমাবেশ।
নবুওত লাভের প্রস্তুতি সম্পন্ন
“আইয়্যামে জাহেলিয়াত” নামে পরিচিত এক অন্ধকার যুগে শেষ নবী হযরত মুহাম্মদের (সা) আবির্ভাব ঘটেছিল সত্য ও ন্যায়ের সমুজ্জ্বল এক বার্তাবাহক ও পথ-প্রদর্শক হিসেবে। শিরকের মত মহাপাপ এবং যুলুম ও কুসংস্কারের আবর্তে পড়ে তখন মানবজাতি ছিল কলুষিত ও দিশাহারা। সমগ্র আরবভূমি ছিল নৈতিকতাহীন এক বর্বরতার প্রতিচ্ছবি। ঠিক তখনই তমসাচ্ছন্ন মানবজাতিকে সুপথ প্রদর্শনের জন্য এক উজ্জ্বল আলোক–বর্তিকা হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন হলো।
মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা) এর আগমনের আগাম–বার্তা এসেছিল তৌরাত ও ইঞ্জিল কিতাবে।
এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ্ বলেন:
ওহী নাযিল ও নবুওতের সূচনা
হীরা পর্বতের গুহায় মুহাম্মদ (সাঃ) এর আধ্যাত্মিক সাধনার এ পর্যায়ে তিনি স্বপ্নযোগে প্রকৃত সত্যের আভাস–ইঙ্গিত পেতে শুরু করেন। ইতোমধ্যে তিনি চল্লিশ বছরে উপনীত হন এবং জীবনের এ মোক্ষম সময়ে আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন তাঁকে সর্বশেষ নবী ও রসূল হিসেবে মনোনীত করেন।
ওহী–বাহক দূত হযরত জিব্রাইল (আঃ) এর আগমন
আল্লাহ্পাক তাঁর বাণীবাহক ফেরেশতা জিব্রাইল (আঃ)–কে পবিত্র কুরআনের বাণীসহ পাঠালেন হীরা পর্বতের গুহায় যেখানে অবস্থান করছিলেন মুহাম্মদ (সাঃ)। রমযান মাসের এক পবিত্র রজনীতে সেই পরম সত্যালোকের ঐশী বাণী নিয়ে হীরা পর্বতের গুহায় হাযির হলেন আল্লাহ্ রব্বুল আলামীনের বানীবাহক দূত হযরত জিব্রাইল (আঃ)।
- জিব্রাইল (আঃ) উর্ধ্ব দিগন্তে নিজ আকৃতিতে প্রকাশিত হলেন এবং মুহাম্মদ (সাঃ) এর সম্মুখে এসে দাঁড়ালেন। তারপর তাঁর নিকটে এলেন, তারপর আরও কাছে এলেন এবং তাঁর দিকে ঝুঁকে গেলেন। এ সময় উভয়ের মধ্যে দুই ধনুকের জ্যা পরিমাণ দূরত্ব ছিল। তিনি বললেন, “পড়ুন”।
- ঘটনার আকস্মিকতায় ভীত মুহাম্মদ (সাঃ) কম্পিত স্বরে বললেন, “আমি পড়তে জানি না।”
- এরপর জিব্রাইল (আঃ) তাঁকে শক্তভাবে বুকে জড়িয়ে ধরে দ্বিতীয়বার বললেন, “পড়ুন”। প্রচন্ড চাপে মুহাম্মদ (সাঃ) ঘর্ম সিক্ত হলেন – তাঁর কষ্ট বোধ হলো। এবারও তিনি উত্তর দিলেন, “আমি পড়তে জানি না।”
- তৃতীয়বারে ফেরেশতা তাঁকে আলিঙ্গনাবদ্ধ করে ছেড়ে দিয়ে সূরা “আলাক্বের” নিম্নোক্ত পাঁচটি আয়াত পড়ে শুনালেন,
اِقْرَاْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِیْ خَلَقَ ۚ خَلَقَ الْاِنْسَانَ مِنْ عَلَقٍ ۚ اِقْرَاْ وَ رَبُّكَ الْاَکْرَمُ ۙ الَّذِیْ عَلَّمَ بِالْقَلَمِ ۙ عَلَّمَ الْاِنْسَانَ مَا لَمْ یَعْلَمْ
“পাঠ করুন আপনার পালনকর্তার নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন, সৃষ্টি করেছেন মানুষকে জমাট রক্ত থেকে। পাঠ করুন, আপনার পালনকর্তা মহা দয়ালু, যিনি কলমের সাহায্যে শিক্ষা দিয়েছেন, শিক্ষা দিয়েছেন মানুষকে যা সে জানত না।” (সূরা “আলাক্ব, ৯৬:১–৫)
সর্বপ্রথম ওহী হিসেবে প্রাপ্ত সূরা “আলাক্বের” উপরোক্ত পাঁচটি আয়াত তাঁর হৃদয়ে গেঁথে গেলো। ওহী–বাহক ফেরেশতা হযরত জিব্রাইল (আঃ) মারফৎ আল্লাহর বাণী প্রাপ্তির মাধ্যমেই সূচিত হলো হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নবুওতি জীবন।
- আল্লাহর নবী ও রসূল হিসেবে তাঁর প্রতি নাযিলকৃত প্রথম বাণী হলো: “পাঠ করুন” – ছোট্ট এ আহ্বানের দ্বারা সমস্ত দিব্যলোকের জ্ঞানভান্ডারের দ্বার উন্মুক্ত করে দেওয়া হল তাঁর সম্মুখে।
- যে আশায় তিনি দিন গুনছিলেন, তাঁর সে স্বপ্ন আজ সত্যে পরিণত হল।
সর্বশক্তিমান আল্লাহর নিকট থেকে ঘোষণা এলো:
“আমি আপনাকে সমগ্র মানবজাতির জন্যে সুসংবাদাতা ও সতর্ককারী রূপে পাঠিয়েছি; কিন্তু অধিকাংশ মানুষ তা জানে না (সূরা সাবা, ৩৪: ২৮)।”
ওহী নাযিল সংক্রান্ত এ ঘটনার বর্ণনায় পবিত্র কুরআনের সূরা নজমে বলা হয়:
وَالنَّجْمِ اِذَا هَوٰى مَا ضَلَّ صَاحِبُكُمْ وَمَا غَوٰى وَمَا يَنْطِقُ عَنِ الْهَوٰىٓ اِنْ هُوَ الَّا وَحْىٌ يُوْحٰى عَلَّمَه شَدِيْدُ الْقُوٰى ذُوْ مِرَّةٍ فَاسْتَوٰى وَهُوَ بِالْاُفُقِ الْاَعْلٰى ثُمَّ دَنَا فَتَدَلّٰى فَكَانَ قَابَ قَوْسَيْنِ اَوْ اَدْنٰى فَاَوْحٰۤى اِلٰى عَبْدِه مَاۤ اَوْحٰى
“নক্ষত্রের কসম, যখন অস্তমিত হয়। তোমাদের সংগী পথভ্রষ্ট হননি এবং বিপথগামীও হননি। এবং প্রবৃত্তির তাড়নায় কথা বলেন না। কুরআন ওহী, যা প্রত্যাদেশ হয়। তাঁকে শিক্ষা দান করে এক শক্তিশালী ফেরেশতা, সহজাত শক্তিসম্পন্ন, সে নিজ আকৃতিতে প্রকাশ পেল – ঊর্ধ্ব দিগন্তে, অতঃপর নিকটবর্তী হল ও ঝুঁকে গেল। তখন দুই ধনুকের ব্যবধান ছিল অথবা আরও কম। তখন আল্লাহ তাঁর দাসের প্রতি যা প্রত্যাদেশ করবার, তা প্রত্যাদেশ করলেন।” (সূরা নজম, ৫৩:১–১০)
প্রায় চৌদ্দশত বছর পূর্বে আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন হযরত মুহাম্মদ (সা) -কে সর্বশেষ নবী ও রাসূল এবং সৃষ্টিকুলের রহমত হিসেবে এ দুনিয়ার বুকে প্রেরণ করেছিলেন। তিনি ছিলেন একাধারে সাইয়েদুল মুরসালিন, আশরাফুল আম্বিয়া, মানবজাতির সর্দার তথা সৃষ্টিকুলের সর্বোচ্চ মর্যাদার অধিকারী ও সর্বযুগের সর্বশ্রেষ্ঠ মানব। সমগ্র মানবজাতিকে হেদায়েতের পথে আহ্বান করাই ছিল তাঁর নবুওতি মিশন।
ওহী নাযিল পরবর্তী ঘটনাসমূহ ও বিবি খাদীজা (রাঃ) এর ভূমিকা
হীরা পর্বতের গুহায় প্রথমবার ওহী নাযিলেরে পর হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) ভীত–সন্ত্রস্ত ও দ্বিধাগ্রস্ত অবস্থায় দ্রুতপদে বাড়ি ফিরলেন এবং কম্পিত দেহে বিবি খাদীজা (রাঃ)–কে অনুরোধ করলেন, ‘আমাকে একটি কম্বল দ্বারা আবৃত করো।’
কিছুক্ষণ পর ভয় ও বিপর্যস্তভাব কেটে গেলে তিনি কিছুটা স্বস্তি বোধ করলেন এবং তিনি খাদীজা (রাঃ)–কে ঐশী ঘটনার আদ্যোপান্ত বর্ণনা দিয়ে বললেন,
‘আমার ভয় হচ্ছে আমি যাদুগ্রস্ত কি না? আমি এ বোঝা সইতে পারব কি না? আমার প্রাণ বেরিয়ে যাবে কি না?’
প্রিয়তমা স্ত্রী খাদীজা (রাঃ) তাঁকে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন,
‘আপনি যে বিষয়ে ধ্যানমগ্ন ছিলেন এ ঘটনা তাঁরই সাফল্যের ইঙ্গিতবাহী। যার হাতে আমার জীবন সে মহাসত্তার শপথ করে বলছি, আপনি নবুওতের শুভ সংবাদ পেতে যাচ্ছেন। আল্লাহর শপথ আপনি কখনও ব্যর্থ হবেন না। কারণ আপনি সদা সত্যবাদী, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষাকারী ও হক আদায়কারী, মেহমান, এতীম ও দুঃস্থদের প্রতি যত্নবান এবং পরোপকারী।’
তাঁর এ সান্ত্বনা বাণী মুহাম্মদ (সাঃ) এর হৃদয়ে পরম শান্তি দান করে এবং প্রশান্ত চিত্তে তিনি ঘুমিয়ে পড়েন।
খাদীজা (রাঃ) কর্তৃক ফেরেশতার আগমন প্রত্যক্ষ্যকরণ
খাদীজা (রাঃ) ওহী নাযিলকালীন সময়ে নবী করীম (সাঃ) এর নিকট ফেরেশতার আগমন প্রত্যক্ষ্য করার আগ্রহ প্রকাশ করলেন। তিনি রাজী হলেন এবং প্রথমে তাঁকে বাম পাশে, এরপর ডানে ও শেষে সামনে বসিয়ে রাখলেন। এ সময় ফেরেশতা সেখানে অবস্থান করছিলেন। কিন্তু খাদীজা (রাঃ) এর মাথা থেকে কাপড় সরে গেলে ফেরশেতা অন্তর্ধান করলেন। এ ঘটনায় খাদীজা (রাঃ) এর অন্তরে এ বিশ্বাস সুদৃঢ় হয় যে, ওহীবাহক অবশ্যই ফেরেশতা, তিনি জ্বিন বা শয়তান নন।
মক্কার ওয়ারাকা ইবনে নওফেলের সাথে খাদীজা (রাঃ) এর সাক্ষাৎ
পৌত্তলিকতা–বিমুখ যে কয়জন ধর্মীয় চিন্তাবিদ মক্কায় অবস্থান করছিলেন তাঁদের মধ্যে খাদীজা (রাঃ) এর চাচাত ভাই এবং তাঁদের বংশের বর্ষীয়ান মুরুব্বী ওয়ারাকা ইবনে নওফেল ছিলেন অন্যতম। তিনি কুরাইশদের ধর্ম পরিত্যাগ করে খৃস্ট ধর্মে দীক্ষিত হয়েছিলেন এবং ইঞ্জিল কিতাবের জ্ঞান অর্জন এবং হিব্রু থেকে এর কিয়দংশ আরবীতে অনুবাদ করেছিলেন।
হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর সাথে হীরা পর্বতের গুহায় সংঘটিত ঘটনার তাৎপর্য অনুসন্ধানে খাদীজা (রাঃ) তাঁর নিকট গেলেন। তিনি ওয়ারাকার নিকট ঘটনার পূর্ণ বিবরণ পেশ করলেন। ঘটনাটি শুনার পর ওয়ারাকা মুহাম্মদ (সাঃ)-কে সত্য নবী হিসেবে চিহ্নিত করে বললেন,
‘এতো সেই ফেরেশেতা জিব্রাইল (আঃ) যিনি নবী মূসা (আঃ) এর নিকটও এসেছিলেন, তিনি তাঁর নিকটও এসেছেন। এ শহরের লোকজন তাঁকে অবিশ্বাস করবে এবং শহর থেকে বের করে দেবে। তাদের সাথে তিনি যুদ্ধ–বিগ্রহে জড়িয়ে পড়বেন। আমি যদি সে সময়ে জীবিত থাকি তবে তাঁর পক্ষালম্বন করব এবং তাঁকে সহায়তা করব।’
খাদীজা পুলকিত চিত্তে গৃহে ফিরে এলেন এবং মুহাম্মদ (সাঃ) এর নিকট ওয়ারাকার মুখ–নিঃসৃত কথাগুলো ব্যক্ত করলেন। তিনি ঘোষণা করলেন, “আমি বিশ্বাস করি, আপনি আল্লাহ্ রব্বুল আলামীন কর্তৃক মনোনীত সত্য নবী।”
এর কয়েকদিন পর মুহাম্মদ (সাঃ) কা’বা ঘর তাওয়াফকালে ওয়ারাকার সাথে তাঁর সাক্ষাৎ হয়। সেখানে তিনি তাঁকে একই কথা ব্যক্ত করেন। তাঁর মুখে দেশান্তরিত হওয়ার কথা শুনে হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) বিস্ময়বোধ করলেন।
ওহী নাযিলের সময়কাল
পবিত্র রমযান মাসের এক সম্মানিত রাতে প্রথম ওহী নাযিলের ঘটনা ঘটে। তবে সঠিক কোন রাতে তা ঘটেছিল তা সুস্পষ্ট নয়। হাদীস সূত্রে জানা যায়, রমযান মাসের শেষ দশকের কোন এক বেজোড় রাতে প্রথম ওহী নাযিল হয়েছিল যা পবিত্র কুরআনে “লাইলাতুল ক্বদর” নামে বিশেষভাবে পরিচিত।
রমযান মাসে কুরআন নাযিলের সূচনা হলেও সমগ্র কুরআনের বিভিন্ন আয়াত বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে নাযিল হয়েছিল। কুরআন নাযিলের সমযকাল সম্পর্কে পবিত্র কুরআনের ভাষ্য হলো:
اِنَّاۤ اَنْزَلْنٰهُ فِیْ لَیْلَۃِ الْقَدْرِ وَ مَاۤ اَدْرٰىكَ مَا لَیْلَۃُ الْقَدْرِ لَیْلَۃُ الْقَدْرِ ۬ۙ خَیْرٌ مِّنْ اَلْفِ شَہْرٍ تَنَزَّلُ الْمَلٰٓئِكَۃُ وَ الرُّوْحُ فِیْهَا بِاِذْنِ رَبِّهِمْ ۚ مِنْ کُلِّ اَمْرٍ سَلٰمٌ ۟ۛ هِیَ حَتّٰی مَطْلَعِ الْفَجْرِ
“আমি একে (কুরআন) নাযিল করেছি লাইলাতুল–ক্বদরে। লাইলাতুল-ক্বদর সম্পর্কে আপনি কি জানেন? লাইলাতুল-ক্বদর হল এক হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম। এতে প্রত্যেক কাজের জন্যে ফেরেশতাগণ ও রূহ (জিব্রাইল আ) অবতীর্ণ হন তাদের পালনকর্তার নির্দেশক্রমে। এটা নিরাপত্তা, যা ফজরের উদয় পর্যন্ত অব্যাহত থাকে (সূরা কদর, ৯৭:১–৫)।”
এছাড়া সূরা দোখানের ১–৬ আয়াতে পবিত্র কুরআন নাযিলের এই অতি বরকতময় রাতের মাহাত্ম্যের বিষয়টি উল্লেখিত হয়েছে:
حٰمٓ وَ الْكِتٰبِ الْمُبِیْنِ اِنَّاۤ اَنْزَلْنٰهُ فِیْ لَیْلَۃٍ مُّبٰرَكَۃٍ اِنَّا کُنَّا مُنْذِرِیْنَ فِیْهَا یُفْرَقُ کُلُّ اَمْرٍ حَكِیْمٍ اَمْرًا مِّنْ عِنْدِنَا ؕ اِنَّا کُنَّا مُرْسِلِیْنَ رَحْمَۃً مِّنْ رَّبِّكَ ؕ اِنَّہٗ هُوَ السَّمِیْعُ الْعَلِیْمُ
“হা–মীম। শপথ সুস্পষ্ট কিতাবের। আমি একে নাযিল করেছি। এক বরকতময় রাতে, নিশ্চয় আমি সতর্ককারী। এ রাতে প্রত্যেক প্রজ্ঞাপূর্ণ বিষয় স্থিরীকৃত হয়। আমার পক্ষ থেকে আদেশক্রমে, আমিই প্রেরণকারী। আপনার পালনকর্তার পক্ষ থেকে রহমতস্বরূপ। তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ (সূরা দোখান, ৪৪:১–৬)।”
সূরা বাক্বারাহর অপর এক আয়াতে কুরআন নাযিলের সময়কাল রমযান মাস বলে উল্লেখিত করা হয়েছে:
شَہْرُ رَمَضَانَ الَّذِیْۤ اُنْزِلَ فِیْهِ الْقُرْاٰنُ هُدًی لِّلنَّاسِ وَ بَیِّنٰتٍ مِّنَ الْهُدٰی وَ الْفُرْقَانِ ۚ
“রমযান মাসই হল সে মাস, যাতে নাযিল করা হয়েছে কুরআন, যা মানুষের জন্য হেদায়েত এবং সত্যপথ যাত্রীদের জন্য সুষ্পষ্ট পথ নির্দেশ আর ন্যায় ও অন্যায়ের মাঝে পার্থক্য বিধানকারী। …” (২:১৮৫)
ওহীবাহক ফেরেশতার দ্বিতীয়বার আগমন
সূরা “আলাক্বের” প্রথম পাঁচটি আয়াত নাযিলের পর হযরত জিব্রাইল (আঃ) আবারও ওহী নিয়ে আসলেন। তাঁর আগমণে তিনি ঘর্মসিক্ত ও কম্পিত হলেন এবং এ অবস্থায় সূরা “মুদ্দাসসির“ এর নিম্নোক্ত ৭টি আয়াত নাযিল হয়:
يٰۤاَيُّهَا الْمُدَّثِّرُ قُمْ فَاَنْذِرْ وَرَبَّكَ فَكَبِّرْ وَثِيَابَكَ فَطَهِّرْ وَالرُّجْزَ فَاهْجُرْ وَلَا تَمْنُنْ تَسْتَكْثِرُ وَلِرَبِّكَ فَاصْبِرْ
“হে চাদরাবৃত! উঠুন, সতর্ক করুন, আপন পালনকর্তার মাহাত্ম্য ঘোষণা করুন, আপন পোশাক পবিত্র করুন এবং অপবিত্রতা থেকে দূরে থাকুন। অধিক প্রতিদানের আশায় অন্যকে কিছু দিবেন না। এবং আপনার পালনকর্তার উদ্দেশে সবর করুন।” (সূরা মুদ্দাসসির, ৭৪:১–৭)
ওহীর বিরতিকাল
ইসলাম প্রচারের সূচনা লগ্নে মহান আল্লাহর একত্ববাদের সত্যবাণী কিভাবে মানুষের নিকট পৌঁছাবেন তা নিয়ে হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) ভাবিত ছিলেন। পৌত্তলিকতার আবর্তে নিমগ্ন কুরাইশ সমাজে সম্পূর্ণ বিপরীতধর্মী তৌহিদের বাণী প্রচারে কি ধরনের প্রতিক্রিয়া হতে পারে সে সম্পর্কে তিনি সম্পূর্ণ সচেতন থেকে মানসিক প্রস্তুতি নিলেন।
বাতিলের সাথে সত্যের চিরন্তন দ্বন্দে তাঁকে এক সাহসী ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হবে বলে তিনি দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ হলেন। কিন্তু এ সময় কিছু দিনের জন্য ওহী নাযিলের বিরতি ঘটে।
- এতে মুহাম্মদ (সাঃ) মানসিকভাবে অস্থিরতা ও বিমর্ষবোধ করলেন।
- তাঁর এ অবস্থা দর্শনে বিবি খাদীজা (রাঃ) বললেন, ‘আপনি কি ভাবছেন আল্লাহ্ অসন্তুষ্ট হয়ে আপনাকে ভুলে গেছেন ?‘
- বিবি খাদীজা (রাঃ) এ কথায় তিনি চিন্তান্বিত হয়ে পড়লেন এবং পুনরায় হীরাগুহায় প্রত্যাবর্তন করে আল্লাহর দরবারে ফরিয়াদ জানিয়ে কাতর কন্ঠে বললেন,
‘হে রব! রিসালতের পবিত্র দায়িত্ব দানের পর আপনি কি আমায় ভুলে গেছেন?’
হতাশা ও মানসিক অস্থিরতার এ পর্যায়ে একদিন ওহীর শুভ বার্তা নিয়ে উপস্থিত হলেন হযরত জিব্রাইল আমীন (আঃ)। নাযিল হলো সূরা দ্বোহা:
وَالضُّحٰى وَالَّيْلِ اِذَا سَجٰى مَا وَدَّعَكَ رَبُّكَ وَمَا قَلٰى وَلَلْاٰخِرَةُ خَيْرٌ لَّكَ مِنَ الْاُوْلٰى وَلَسَوْفَ يُعْطِيْكَ رَبُّكَ فَتَرْضٰۤى اَلَمْ يَجِدْكَ يَتِيْمًا فَاٰوٰى وَوَجَدَكَ ضَآلًّا فَهَدٰى وَوَجَدَكَ عَآئِلًا فَاَغْنٰى فَاَمَّا الْيَتِيْمَ فَلَا تَقْهَرْ وَاَمَّا السَّآئِلَ فَلَا تَنْهَرْ وَاَمَّا بِنِعْمَةِ رَبِّكَ فَحَدِّثْ
“শপথ মধ্যাহ্নের, শপথ রাত্রির যখন তা গভীর হয়, আপনার পালনকর্তা আপনাকে ত্যাগ করেননি এবং আপনার প্রতি বিরূপও হননি। আপনার জন্যে পরকাল ইহকাল অপেক্ষা শ্রেয়। আপনার পালনকর্তা সত্বরই আপনাকে দান করবেন, অতঃপর আপনি সন্তুষ্ট হবেন। তিনি কি আপনাকে এতীমরূপে পাননি? অতঃপর তিনি আশ্রয় দিয়েছেন। তিনি আপনাকে পেয়েছেন পথহারা, অতঃপর পথপ্রদর্শন করেছেন। তিনি আপনাকে পেয়েছেন নিঃস্ব, অতঃপর অভাবমুক্ত করেছেন। সুতরাং আপনি এতীমের প্রতি কঠোর হবেন না; সওয়ালকারীকে ধমক দেবেন না। এবং আপনার পালনকর্তার নেয়ামতের কথা প্রকাশ করুন।” (সূরা দ্বোহা, ৯৩:১–১১)
ওহী নাযিলকালীন শারীরিক অভিঘাত
ওহী নাযিল কালীন সময়ে ঐশ্বরিক শক্তির সাথে নবী করীম (সাঃ)- এর দেহ–মন যুক্ত হয়ে যেত। বিদ্যুৎ–তরঙ্গ স্পর্শের মত অনুভূতি তাঁর সারা দেহে বয়ে যেত। এতে তিনি ভারাক্রান্ত, শ্রান্ত, ক্লান্ত ও ঘর্মসিক্ত হয়ে পড়তেন। তবে এ অবস্থায়ও তিনি আনন্দিত ও পুলকিত হতেন।
হযরত আয়েশা (রাঃ) এর ভাষ্য অনুযায়ী মুহাম্মদ (সাঃ) বলেছেন,
“ওহী দু’ভাবে নাযিল হতো – প্রথমত মৌমাছির গুঞ্জরনের মত শব্দ শুনা যেত, এতে তিনি ঘর্মসিক্ত ও ক্লান্ত হয়ে পড়তেন। প্রচন্ড শীতেও তাঁর কপাল থেকে বিন্দু বিন্দু ঘাম ঝরতো। তখন ওহী তাঁর হৃদয়ে গ্রথিত ও মুখস্থ হয়ে যেত। দ্বিতীয় প্রকারের ওহী ছিল, মানবাকৃতিতে হযরত জিব্রাইল (আঃ) যখন ওহী নিয়ে আসতেন তখন তা শুনে তিনি হৃদয়ে ধারণ করতেন। এ ধরনের ওহীতে তাঁর তেমন কষ্টবোধ হত না।”
ওহী পাঠ ও সংরক্ষণ
নবী করীম (সাঃ) এর উপর নাযিলকৃত ওহী পাঠ ও তা সংরক্ষণের দায়িত্ব স্বয়ং আল্লাহ্ রব্বুল আলামীনের দ্বায়িত্বে ছিল। তাই ওহী গ্রহণকালে দ্রুততার সাথে তা মুখস্থ না করার উপদেশ দিয়ে আল্লাহ্ তাঁর রসূলকে বলেন:
لَا تُحَرِّكْ بِهِ لِسَانَكَ لِتَعْجَلَ بِهِ إِنَّ عَلَيْنَا جَمْعَهُ وَقُرْآنَهُ
”তাড়াতাড়ি শিখে নেয়ার জন্যে আপনি দ্রুত ওহী আবৃত্তি করবেন না। এর সংরক্ষণ ও পাঠ আমারই দায়িত্ব।” (সূরা আল ক্বেয়ামাহ, ৭৫:১৬–১৭)
পূর্ববর্তী কিতাবসমূহে সর্বশেষ নবী ও রসূল মুহাম্মদ (সাঃ) এর আগমনের সুসংবাদ
মহান আল্লাহ মানবজাতির হিদায়াতের জন্য যুগে যুগে বহু নবী ও রাসূল প্রেরণ করেছেন। তাঁদের সকলের মূল আহ্বান ছিল এক ও অভিন্ন—এক আল্লাহর ইবাদত করা এবং তাঁর বিধান মেনে চলা। এ নবীগণ শুধু তাঁদের সমসাময়িক জনগোষ্ঠীকে সতর্ক ও সুসংবাদই দেননি; বরং পরবর্তীকালে আগমনকারী নবীদের সম্পর্কেও সুসংবাদ প্রদান করেছেন। এ ধারাবাহিকতার সর্বশেষ ও পরিপূর্ণ পরিণতি হলো হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-এর আগমন, যিনি সমগ্র মানবজাতির জন্য প্রেরিত শেষ নবী ও রাসূল।
পূর্ববর্তী আসমানী কিতাবসমূহে তাঁর আগমনের সুসংবাদ এবং তাঁর পরিচয় সম্পর্কে উল্লেখ ছিল। এ কারণে আহলে–কিতাবের জ্ঞানী ব্যক্তিরা তাঁর আগমনের অপেক্ষায় ছিলেন।
পবিত্র কুরআন ঘোষণা করে:
“যাদেরকে আমি কিতাব দিয়েছি, তারা তাঁকে (মুহাম্মদকে) এমনভাবে চেনে, যেমন তারা নিজেদের সন্তানদের চেনে। কিন্তু তাদের একটি দল জেনেশুনে সত্য গোপন করে।” (সূরা বাক্বারাহ, ২:১৪৬
অন্যত্র মহান আল্লাহ বলেন:
“যারা সেই রাসূল, নিরক্ষর নবীর অনুসরণ করে, যার উল্লেখ তারা নিজেদের কাছে থাকা তাওরাত ও ইঞ্জীলে লিপিবদ্ধ পায়; তিনি তাদের সৎকাজের আদেশ দেন, অসৎকাজ থেকে নিষেধ করেন, পবিত্র বস্তুসমূহ তাদের জন্য হালাল করেন এবং অপবিত্র বস্তুসমূহ হারাম করেন।” (সূরা আল–আ‘রাফ, ৭:১৫৭)
এই আয়াত থেকে সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে তাওরাত ও ইঞ্জীলে রাসূলুল্লাহ (সাঃ)–এর আগমনের বর্ণনা বিদ্যমান ছিল এবং তাঁর বৈশিষ্ট্যাবলী সম্পর্কে আহলে-কিতাব অবগত ছিল।
বিশেষভাবে হযরত ঈসা (আ.) তাঁর অনুসারীদের নিকট পরবর্তীকালে আগমনকারী এক মহান রাসূলের সুসংবাদ প্রদান করেছিলেন। মহান আল্লাহ বলেন:
“আর স্মরণ করুন, যখন মরিয়ম-পুত্র ঈসা বলেছিলেন, ‘হে বনী ইসরাঈল! আমি তোমাদের প্রতি আল্লাহর রাসূল। আমার পূর্বে আগত তাওরাতের সত্যায়নকারী এবং আমার পরে আগমনকারী একজন রাসূলের সুসংবাদদাতা, যার নাম আহমাদ।’ অতঃপর যখন সে তাদের নিকট সুস্পষ্ট নিদর্শনসহ উপস্থিত হলো, তখন তারা বলল, ‘এ তো স্পষ্ট জাদু।’” (সূরা আস–সাফ ৬১:৬)
‘আহমাদ’ রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর অন্যতম পবিত্র নাম। এ আয়াত প্রমাণ করে যে হযরত ঈসা (আ.) তাঁর উম্মতকে সর্বশেষ নবীর আগমনের সংবাদ দিয়েছিলেন।
কিন্তু দুঃখজনকভাবে আহলে–কিতাবদের একটি অংশ পার্থিব স্বার্থ, গোঁড়ামি ও নেতৃত্ব হারানোর আশঙ্কায় এ সত্যকে অস্বীকার করে। মহান আল্লাহ বলেন:
“যখন তাদের কাছে আল্লাহর পক্ষ থেকে এমন একটি কিতাব এলো, যা তাদের কাছে বিদ্যমান কিতাবের সত্যায়নকারী—অথচ এর আগে তারা কাফিরদের বিরুদ্ধে বিজয় কামনা করত—তখন যখন তাদের নিকট সেই পরিচিত বিষয় এসে গেল, তারা তা অস্বীকার করল। অতএব, আল্লাহর লানত কাফিরদের ওপর।” (সূরা বাক্বারাহ, ২:৮৯)
তবে সকল আহলে–কিতাব সমান ছিল না। তাদের মধ্যে এমন ন্যায়পরায়ণ ও সত্যনিষ্ঠ ব্যক্তিও ছিলেন, যারা সত্যকে চিনতে পেরে রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর প্রতি ঈমান আনেন। কুরআন তাদের প্রশংসা করে বলেছে:
“যাদেরকে এর আগে কিতাব দিয়েছিলাম, তারা এতে (কুরআনে) ঈমান আনে। আর যখন তাদের কাছে এটি পাঠ করা হয়, তারা বলে, ‘আমরা এর প্রতি ঈমান এনেছি; নিশ্চয়ই এটি আমাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে আগত সত্য।’” (সূরা আল–কাসাস ২৮:৫২-–৫৩)
- রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর আগমন ছিল নবুওয়তের দীর্ঘ ধারাবাহিকতার চূড়ান্ত পরিণতি।
- তাঁর মাধ্যমে আল্লাহ মানবজাতির জন্য দ্বীনের পূর্ণতা দান করেছেন, এবং
- নবুওয়তের দ্বার সমাপ্ত করেছেন।
মহান আল্লাহ ঘোষণা করেন:
“আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করলাম, তোমাদের প্রতি আমার নিয়ামত সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্য দ্বীন হিসেবে মনোনীত করলাম।” (সূরা আল–মায়িদাহ ৫:৩)
তিনি আরও ঘোষণা করেন:
“মুহাম্মদ তোমাদের পুরুষদের কারও পিতা নন; বরং তিনি আল্লাহর রাসূল এবং নবীগণের সমাপনী (খাতামুন নবিয়্যীন)।” (সূরা আল–আহযাব, ৩৩:৪০)
অতএব, পূর্ববর্তী নবী-রাসূলগণের ভবিষ্যদ্বাণী, আসমানী কিতাবসমূহের সুসংবাদ এবং মানবজাতির আধ্যাত্মিক প্রয়োজন—সবকিছুরই পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন ঘটেছে হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)–এর আগমনের মাধ্যমে।
হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)–এর নবুওতের সর্বজনীনতা
হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) শুধু আরব জাতির জন্য নন; বরং
- তিনি ছিলেন সমগ্র মানবজাতির হিদায়াতের চূড়ান্ত পথপ্রদর্শক।
- সর্বশক্তিমান আল্লাহ্ তায়ালা হযরত তাঁকে পাঠিয়েছেন সমগ্র মানবজাতির সর্বশেষ নবী ও রসূল হিসেবে।
- মানবজাতির ইহকালীন ও পরকালীন কল্যাণের জন্যে এবং সৃষ্টিকুলের রহমত স্বরূপ তিনি প্রেরিত হয়েছেন এ দুনিয়ার বুকে ।
তাঁর সর্বজনীনতা প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ্ বলেন:
— “(হে নবী) ঘোষণা করুন, হে মানবমন্ডলী! তোমাদের সবার প্রতি আমি আল্লাহ্ প্রেরিত রসূল, সমগ্র আসমান ও যমীনে তাঁর রাজত্ব। একমাত্র তাঁকে ছাড়া আর কারো উপাসনা নয়। তিনি জীবন ও মৃত্যু দান করেন। সুতরাং তোমরা সবাই বিশ্বাস স্থাপন করো আল্লাহর ওপর, তাঁর প্রেরিত নিরক্ষর নবীর উপর – যিনি বিশ্বাস রাখেন আল্লাহ্ এবং তাঁর সকল বাণীর ওপর। তাঁর (নবীর) অনুসরণ কর যাতে সরল পথপ্রাপ্ত হতে পার (সূরা আরাফ, ৭:১৫৮)।”
— “আমি আপনাকে সমগ্র মানবজাতির জন্যে সুসংবাদাতা ও সতর্ককারী রূপে পাঠিয়েছি; কিন্তু অধিকাংশ মানুষ তা জানে না।” (সূরা সাবা, ৩৪:২৮)
— “আমি আপনাকে সমগ্র জগতের জন্য রহমতস্বরূপই প্রেরণ করেছি।” (সূরা আল–আম্বিয়া, ২১:১০৭)