এ অধ্যায়ের বিষয়সমূহ
Toggleনবুওয়তী মিশনের সত্যতার ব্যাপারে আশ্বস্তকরণ
আল্লাহ তাআলা বারবার রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে আশ্বস্ত করেছেন যে তাঁর মিশন ছিল আল্লাহপ্রদত্ত এবং মানুষের পক্ষ থেকে যে প্রত্যাখ্যান ও বিরোধিতার সম্মুখীন তাঁকে হতে হয়েছে, তা ছিল একটি পরীক্ষা।
“আমি অবশ্যই জানি যে, তারা যা বলে তাতে আপনার হৃদয় সংকুচিত হয়ে পড়ে।” (সূরা আল-হিজর, ১৫:৯৭)
“অতএব, তারা যা বলে সে বিষয়ে আপনি ধৈর্য ধারণ করুন এবং সূর্যোদয়ের পূর্বে ও সূর্যাস্তের পূর্বে আপনার প্রতিপালকের প্রশংসাসহ তাঁর পবিত্রতা ঘোষণা করুন।” (সূরা কাফ, ৫০:৩৯)
এই আয়াতগুলোতে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে অবিচল থাকার এবং ইবাদত ও আল্লাহর স্মরণের মাধ্যমে সান্ত্বনা লাভ করার উপদেশ দেওয়া হয়েছে।
শত্রুতা ও বিরোধিতা সত্ত্বেও আল্লাহ তাআলা ওহীর মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে সান্ত্বনা ও আশ্বাস দিয়েছেন এবং প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে শেষ পর্যন্ত সত্যেরই বিজয় হবে এবং তাঁর মিশন চূড়ান্ত সফলতায় পৌঁছবে।
কুরআনে আল্লাহ তাআলা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে দৃঢ় থাকার নির্দেশ দিয়ে তাঁর সাহায্যের আশ্বাস প্রদান করেন:
“নিশ্চয়ই বিদ্রূপকারীদের মোকাবিলায় আমিই আপনার জন্য যথেষ্ট।” (সূরা আল-হিজর, ১৫:৯৫)
“কাফিররা ষড়যন্ত্র করে, আর আল্লাহও পরিকল্পনা করেন; আর আল্লাহই সর্বোত্তম পরিকল্পনাকারী।” (সূরা আল–আনফাল, ৮:৩০)
[আরও দেখুন: সূরা আল–আম্বিয়া ২১:৪১, সূরা আর–রা‘দ ১৩:৩২, সূরা আল–মুজাদালাহ ৫৮:২০, সূরা আল–আ‘রাফ ৭:১২৮]
এই আয়াতগুলো রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর অন্তরে আত্মবিশ্বাস সঞ্চার করেছিল এবং নিশ্চিত করেছিল যে সত্যের সংগ্রাম শেষ পর্যন্ত বিজয়ের মাধ্যমেই সমাপ্ত হবে।
এসব প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা তাঁর সংকল্পকে আরও দৃঢ় করেছিলেন এবং ধৈর্য ও অধ্যবসায়ের সঙ্গে ইসলামের দাওয়াত অব্যাহত রাখতে উৎসাহিত করেছিলেন। এই ঐশী সহায়তা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে সকল পরীক্ষা ও কষ্ট অতিক্রম করে বিজয়ী হতে সাহায্য করেছিল এবং ইসলামকে মানবজাতির জন্য হেদায়াতের আলোকবর্তিকা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল।
অদৃশ্য বিষয়ে আল্লাহর সর্বজ্ঞতার ওপর নির্ভরতা
রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে এ কথাও স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছিল যে আল্লাহ তাআলা সবকিছু দেখেন এবং প্রত্যেক অন্তরের সত্য অবস্থা সম্পর্কে অবগত আছেন।
“আর আপনি পরাক্রমশালী, পরম দয়ালু আল্লাহর ওপর ভরসা করুন; যিনি আপনাকে দেখেন যখন আপনি দাঁড়ান (নামাজে), এবং সিজদাকারীদের মধ্যে আপনার চলাফেরাও দেখেন।” (সূরা আশ–শু‘আরা, ২৬:২১৭–২১৯)
এই উপদেশ রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে মানসিক প্রশান্তি দিয়েছিল, কারণ তিনি জানতেন যে আল্লাহ তাআলা তাঁর সব কষ্ট ও তাঁর প্রতি সংঘটিত অন্যায় সম্পর্কে সম্পূর্ণ অবগত।
আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনায় উৎসাহ দান
মক্কার অবিশ্বাসীরা নিরবচ্ছিন্নভাবে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর বিরোধিতা করত। তারা তাঁকে উপহাস করত, কটূক্তি করত এবং শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার করত। তারা সর্বপ্রকারে তাঁর মিশনকে ব্যাহত করতে এবং ইসলামের ক্রমবর্ধমান দাওয়াতকে দমন করতে সচেষ্ট ছিল।
এমন পরিস্থিতিতে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে অবিশ্বাসীদের ক্ষতিকর কার্যকলাপ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য আল্লাহর আশ্রয় কামনা করতে উৎসাহিত করা হয়েছিল।
“আর বলুন, ‘হে আমার প্রতিপালক! আমি শয়তানদের কুমন্ত্রণা থেকে আপনার আশ্রয় চাই। আর হে আমার প্রতিপালক! আমি আপনার আশ্রয় চাই, যাতে তারা আমার কাছে উপস্থিত না হয়।’” (সূরা আল–মু’মিনূন, ২৩:৯৭–৯৮)
এই নির্দেশনা আল্লাহর ওপর নির্ভরশীলতার গুরুত্ব এবং তাঁর কাছ থেকে সুরক্ষা ও শক্তি লাভের প্রয়োজনীয়তাকে আরও সুদৃঢ় করেছিল।
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর দায়িত্ব সম্পর্কে অবহিতকরণ
আল্লাহ তাআলা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে তাঁর দায়িত্ব কেবল আল্লাহর বাণী পৌঁছে দেওয়া; কাউকে জোরপূর্বক ঈমান গ্রহণ করানো নয়।
“অতএব, আপনি উপদেশ দিন; আপনি তো কেবল একজন উপদেশদাতা। আপনি তাদের ওপর কোনো কর্তৃত্বকারী নন।” (সূরা আল–গাশিয়াহ, ৮৮:২১–২২)
[আরও দেখুন: সূরা আর–রা‘দ ১৩:৪০, সূরা ইউসুফ ১২:১০৮]
এই আয়াতগুলো তাঁর সম্প্রদায়ের অবিশ্বাসের কারণে যে মানসিক ভার তিনি অনুভব করতেন তা হালকা করেছিল এবং এ বিষয়টি স্পষ্ট করেছিল যে হেদায়াত দানের ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহর হাতেই।
পূর্ববর্তী নবীদের ন্যায় ধৈর্য ধারণের উপদেশ
আল্লাহ তাআলা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে উপদেশ দিয়েছেন যেন তিনি পূর্ববর্তী নবীদের মতো ধৈর্য ধারণ করেন, কারণ তারাও একই ধরনের বিরোধিতা ও উপহাসের সম্মুখীন হয়েছিলেন।
“আপনার পূর্বেও অনেক রাসূলকে উপহাস করা হয়েছে; অতঃপর যারা তাদের উপহাস করেছিল, তারা সেই বিষয় দ্বারাই পরিবেষ্টিত হয়েছে, যা নিয়ে তারা উপহাস করত।” (সূরা আল–আন‘আম, ৬:১০)
“অতএব, আপনি ধৈর্য ধারণ করুন, যেমন ধৈর্য ধারণ করেছিলেন দৃঢ়সংকল্প রাসূলগণ।” (সূরা আল–আহকাফ, ৪৬:৩৫)
“মন্দকে উত্তম পন্থায় প্রতিহত করুন। তারা আপনার সম্পর্কে যা বলে, সে সম্পর্কে আমি সম্যক অবগত।” (সূরা আল–মু’মিনূন, ২৩:৯৬)
[আরও দেখুন: সূরা ইউসুফ ১২:১১০]
এই আয়াতগুলো তুলে ধরে যে বিরোধিতা, উপহাস ও নির্যাতন সহ্য করা আল্লাহর সকল রাসূলেরই অভিন্ন অভিজ্ঞতা ছিল। এ শিক্ষা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর মনোবলকে আরও দৃঢ় করেছিল এবং তাঁকে আল্লাহর পথে অবিচল থাকার শক্তি যুগিয়েছিল।
দুই বিশিষ্ট ব্যক্তির ইসলাম গ্রহণ
ইসলামের প্রারম্ভিক যুগ ছিল মুসলমানদের জন্য কঠিন পরীক্ষা ও সীমাহীন ত্যাগের সময়। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এবং তাঁর অনুসারীরা মক্কার মুশরিকদের পক্ষ থেকে অবিরাম নির্যাতন, উপহাস, সামাজিক বয়কট এবং শারীরিক ও মানসিক নিপীড়নের সম্মুখীন হচ্ছিলেন। বিশেষ করে নবদীক্ষিত মুসলমানদের ওপর অত্যাচারের মাত্রা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছিল। এমন এক সংকটময় সময়ে মক্কার দুই প্রভাবশালী ও সম্মানিত ব্যক্তি হযরত হামযা (রাঃ) ও হযরত উমর (রাঃ)–এর ইসলাম গ্রহণ মুসলিম সমাজের জন্য এক বিরাট শক্তি ও সাহসের উৎস হয়ে দেখা দেয়।
এই দুই মহান ব্যক্তিত্বের ইসলাম গ্রহণ শুধু মুসলমানদের মনোবলই বৃদ্ধি করেনি, বরং মক্কার সমাজে ইসলামের অবস্থানকেও আরও সুদৃঢ় করেছিল। তাঁদের প্রভাব, সাহসিকতা এবং দৃঢ় ব্যক্তিত্ব ইসলামের দাওয়াতকে নতুন গতি প্রদান করে এবং নির্যাতিত মুসলমানদের অন্তরে আশা ও আত্মবিশ্বাসের সঞ্চার করে।
এই দুই সৌভাগ্যবান সাহাবির মধ্যে প্রথম ছিলেন রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর চাচা, বীর যোদ্ধা ও অকুতোভয় ব্যক্তিত্ব হযরত হামযা ইবন আবদুল মুত্তালিব (রা.) এবং দ্বিতীয় ছিলেন দৃঢ়চেতা, ন্যায়পরায়ণ ও দূরদর্শী নেতা হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)। তাঁদের ইসলাম গ্রহণ ইসলামের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় সৃষ্টি করেছিল এবং মুসলমানদের জন্য আল্লাহ তাআলার এক বিশেষ অনুগ্রহ হিসেবে পরিগণিত হয়।
১. হযরত হামযা (রাঃ) এর ইসলাম গ্রহণ
একদিন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সাফা পাহাড়ের নিকটবর্তী এক নির্জন স্থানে মহান আল্লাহর ইবাদতে নিমগ্ন ছিলেন। এমন সময় আবু জাহল সেখানে এসে তাঁকে বিভিন্ন কটূক্তি ও বিদ্রূপের মাধ্যমে উত্যক্ত করতে শুরু করে। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (ﷺ) অসীম ধৈর্য ও সহনশীলতার পরিচয় দিয়ে নীরব থাকলেন এবং ইবাদতে মশগুল রইলেন। এতে আবু জাহলের ক্রোধ আরও বেড়ে গেল। সে গালিগালাজ করতে লাগল এবং ইসলামের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করতে শুরু করল। তবুও রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর ধৈর্যের বাঁধ ভাঙল না।
অবশেষে ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে আবু জাহল একটি পাথরখণ্ড নিক্ষেপ করল, যা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর মাথায় আঘাত হানে। তাঁর পবিত্র মাথা থেকে রক্ত প্রবাহিত হতে লাগল। এত বড় নির্যাতনের পরও তিনি কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালেন না; বরং নীরবে নিজের গৃহে ফিরে গেলেন। ঘটনাটি নিকটবর্তী এক দাসী প্রত্যক্ষ করেছিলেন।
রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর চাচা হযরত হামযা ইবন আবদুল মুত্তালিব (রা.) ছিলেন তাঁর সমবয়সী এবং আরবের অন্যতম সাহসী ও বলিষ্ঠ ব্যক্তিত্ব। অসি, বর্শা ও তীরন্দাজিতে তিনি ছিলেন অতুলনীয় দক্ষ। সে সময় তিনি এখনও ইসলাম গ্রহণ করেননি। ভ্রাতুষ্পুত্রের প্রচারিত নতুন ধর্ম সম্পর্কে তিনি নিরপেক্ষ অবস্থান গ্রহণ করেছিলেন এবং অধিকাংশ সময় শিকার নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন।
সেদিন শিকার থেকে ফিরে তিনি সেই প্রত্যক্ষদর্শী দাসীর কাছ থেকে আবু জাহলের নির্মম আচরণের বিস্তারিত বিবরণ শুনলেন। এ সংবাদ তাঁর হৃদয়ে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করল। একদিকে ভ্রাতুষ্পুত্রের ওপর এমন বর্বর নির্যাতনের কারণে তাঁর অন্তর ক্ষোভে ফেটে পড়ল, অন্যদিকে তাঁর চিন্তাজগতে সত্যের এক নতুন অনুসন্ধান শুরু হলো।
তিনি তখনও শিকারির বেশে ছিলেন। প্রচণ্ড ক্রোধে ধনুক হাতে সরাসরি কাবা প্রাঙ্গণে উপস্থিত হলেন, যেখানে আবু জাহল তার সঙ্গীদের নিয়ে ঘটনাটি স্মরণ করে হাসি-তামাশায় মেতে ছিল। হযরত হামযা (রা.) কোনো কথা না বলে ধনুক দিয়ে তাকে আঘাত করলেন এবং দৃপ্ত কণ্ঠে ঘোষণা করলেন,
“তুমি কি মুহাম্মদকে গালি দিয়েছ? জেনে রাখো, আমিও তাঁর ধর্ম গ্রহণ করেছি এবং তিনি যা বলেন আমিও তাই বিশ্বাস করি।”
এ ঘোষণায় আবু জাহলের সঙ্গীরা উত্তেজিত হয়ে হামযা (রা.)-এর বিরুদ্ধে এগিয়ে আসতে উদ্যত হলো। কিন্তু তিনি একাই তাদের মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত হয়ে দাঁড়ালেন। পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবন করে আবু জাহল নিজেই তার সঙ্গীদের থামিয়ে দিল এবং স্বীকার করল যে সে মুহাম্মদ (ﷺ)-এর সঙ্গে অন্যায় আচরণ করেছে। তার ধারণা ছিল, এতে হয়তো হামযা (রা.) তাঁর সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসবেন। কিন্তু ততক্ষণে আল্লাহর হিদায়াতের আলো তাঁর অন্তরে প্রবেশ করেছে।
অতঃপর তিনি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং আন্তরিকভাবে ঈমান গ্রহণ করেন। এভাবেই তিনি ইসলামের একজন নিষ্ঠাবান ও সাহসী অনুসারীতে পরিণত হন।
- হযরত হামযা (রা.)-এর ইসলাম গ্রহণ মুসলমানদের জন্য ছিল এক বিরাট শক্তির উৎস।
- তাঁর বীরত্ব, সামাজিক মর্যাদা এবং অটল সাহস মুসলিম সমাজের মনোবল বহুগুণে বৃদ্ধি করেছিল।
- অপরদিকে কুরাইশ নেতারা গভীরভাবে হতাশ ও উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিল।
- পরবর্তীকালে বদর ও উহুদ যুদ্ধে তাঁর অতুলনীয় বীরত্ব ইসলামের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে আছে।
বিশেষত উহুদের যুদ্ধে তিনি শাহাদাতের অমর মর্যাদা লাভ করেন। তাঁর শাহাদাত সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন:
“শহীদদের নেতা হলেন হামযা ইবন আবদুল মুত্তালিব।” (আল-মু‘জামুল কাবীর, তাবারানী, হাদিস নং ২৯৫৮)
তাঁর জীবন সাহস, আত্মত্যাগ ও ঈমানের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত, যা কিয়ামত পর্যন্ত মুসলমানদের অনুপ্রেরণা জোগাবে।
২. হযরত উমর (রাঃ) এর ইসলাম গ্রহণ
নবুওতের ষষ্ঠ বছরে হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর ইসলাম গ্রহণ ইসলামের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হয়। তিনি ছিলেন অত্যন্ত সাহসী, দৃঢ়চেতা, স্পষ্টভাষী এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বের অধিকারী। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) নবুওত লাভের সময় তাঁর বয়স ছিল প্রায় পঁয়ত্রিশ বছর। ইসলামের প্রথম দিকে তিনি এর অন্যতম কঠোর বিরোধী ছিলেন এবং অন্যান্য কুরাইশ নেতাদের মতো তিনিও নবদীক্ষিত মুসলমানদের প্রতি কঠোর আচরণ করতে দ্বিধাবোধ করতেন না।
এদিকে ইসলামের ক্রমবর্ধমান প্রসার কুরাইশ নেতাদের উদ্বিগ্ন করে তুলেছিল। একদিন আবু জাহল ও অন্যান্য নেতারা এক বৈঠকে মিলিত হয়ে ইসলামের অগ্রযাত্রা রোধ করার উপায় নিয়ে আলোচনা করছিল। আবু জাহল ক্রুদ্ধ কণ্ঠে বলল,
“মুহাম্মদ আমাদের পূর্বপুরুষদের ধর্মকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছে এবং আমাদের সমাজে বিভেদ সৃষ্টি করেছে। এ অবস্থার অবসান ঘটাতে হলে তাঁকে সরিয়ে দিতে হবে।”
সে ঘোষণা করল,
“যে মুহাম্মদের মাথা কেটে আনতে পারবে, তাকে আমি বিপুল পুরস্কার প্রদান করব।”
সভায় উপস্থিত উমর ইবনুল খাত্তাব এ কথা শুনে উত্তেজিত হয়ে উঠলেন। তিনি মনে করতেন যে, মুহাম্মদ (ﷺ)-এর দাওয়াতই মক্কার সামাজিক অস্থিরতার মূল কারণ। তাই তিনি দৃঢ় সংকল্প করলেন যে, এ সমস্যার সমাধান তিনি নিজেই করবেন। উন্মুক্ত তরবারি হাতে দাঁড়িয়ে তিনি ঘোষণা করলেন,
“আমি নিজেই মুহাম্মদের মোকাবিলা করব এবং তাঁকে হত্যা না করে ফিরে আসব না।”
উমরের সাহস, দৃঢ়তা ও প্রতিজ্ঞা শুনে কুরাইশ নেতারা আশ্বস্ত হলো। তারা মনে করল, এবার হয়তো ইসলামের বিস্তার রোধ করা সম্ভব হবে। কিন্তু মানুষের পরিকল্পনার ঊর্ধ্বে ছিল আল্লাহ তাআলার পরিকল্পনা।
প্রচণ্ড ক্রোধে উন্মত্ত উমর (রা.) তরবারি হাতে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সন্ধানে রওয়ানা হলেন। পথিমধ্যে তাঁর সাক্ষাৎ হলো নু‘আইম ইবন আবদুল্লাহ (রা.)–এর সঙ্গে, যিনি গোপনে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন।
উমর (রা.)–কে এ অবস্থায় দেখে নু‘আইম (রা.) জিজ্ঞেস করলেন,
“উমর, কোথায় যাচ্ছ এভাবে?”
উমর তাঁর উদ্দেশ্যের কথা অকপটে জানিয়ে দিলেন। তখন নু‘আইম (রা.) বললেন,
“তুমি কি মনে কর, মুহাম্মদকে হত্যা করলে বানু হাশিম তোমাকে ছেড়ে দেবে? তার চেয়ে আগে নিজের পরিবারের খবর নাও। তোমার বোন ও ভগ্নীপতিও তো ইসলাম গ্রহণ করেছে!”
এই সংবাদ শুনে উমরের ক্রোধ আরও বেড়ে গেল। তিনি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কাছে যাওয়ার পরিকল্পনা স্থগিত করে প্রথমে নিজের বোন ও ভগ্নীপতির গৃহের দিকে রওয়ানা হলেন।
তাঁর বোন ফাতিমা বিনতে খাত্তাব এবং ভগ্নীপতি সাঈদ ইবন যায়েদ (রা.) ইতোমধ্যেই ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। তাঁদের গৃহে পৌঁছে উমর (রা.) কুরআন তিলাওয়াতের মধুর ধ্বনি শুনতে পেলেন। তাঁকে আসতে দেখে তারা কুরআনের লিখিত পৃষ্ঠাগুলো আড়াল করে রাখলেন।
ঘরে প্রবেশ করেই উমর প্রশ্ন করলেন,
“আমি কীসের শব্দ শুনছিলাম?”
তাঁরা প্রথমে বিষয়টি গোপন করার চেষ্টা করলেন। কিন্তু কিছুক্ষণ পর উমর জানতে পারলেন যে তাঁরা ইসলাম গ্রহণ করেছেন।
এ কথা শুনে তিনি ভগ্নীপতি সাঈদ (রা.)-এর ওপর আক্রমণ করলেন। স্বামীকে রক্ষা করতে এগিয়ে এলে তাঁর বোনও আঘাতপ্রাপ্ত হলেন। বোনের মুখমণ্ডল থেকে রক্ত ঝরতে দেখে পরিস্থিতি আরও আবেগঘন হয়ে ওঠে।
রক্তাক্ত অবস্থায় ফাতিমা (রা.) দৃঢ় কণ্ঠে বললেন,
“হ্যাঁ, আমরা ইসলাম গ্রহণ করেছি। আল্লাহর শপথ! প্রাণ চলে গেলেও আমরা এ সত্য ধর্ম ত্যাগ করব না।”
বোন ও ভগ্নীপতির অবিচল ঈমান, আত্মত্যাগের মানসিকতা এবং তাঁদের রক্তাক্ত অবস্থা উমরের অন্তরকে গভীরভাবে নাড়া দিল। তাঁর ক্রোধ ধীরে ধীরে প্রশমিত হতে লাগল এবং হৃদয়ে এক নতুন অনুভূতির জন্ম হলো।
তিনি শান্ত কণ্ঠে বললেন,
“তোমরা যা পড়ছিলে, তা আমাকে দেখাও।”
ফাতিমা (রা.) বললেন,
“আপনি অপবিত্র অবস্থায় আছেন। আগে পবিত্র হয়ে আসুন, তারপর কুরআন স্পর্শ করুন।”
উমর (রা.) গোসল বা অজু করে পবিত্র হলেন। এরপর তাঁকে সূরা ত্বা–হা’র কিছু আয়াত পড়তে দেওয়া হলো।
পবিত্র কুরআনের সেই মহিমান্বিত বাণী তাঁর হৃদয়ের গভীরে প্রবেশ করল। প্রতিটি আয়াত যেন তাঁর অন্তরের অন্ধকার দূর করে সত্যের আলো জ্বালিয়ে দিল। তিনি উপলব্ধি করলেন যে, এ বাণী কোনো মানুষের রচনা হতে পারে না; এটি অবশ্যই আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ।
পবিত্র কুরআনের আয়াত পাঠ শেষ করেই তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে বললেন,
“মুহাম্মদ এখন কোথায়? আমাকে তাঁর কাছে নিয়ে চলো।”
এ সময় হযরত খাব্বাব ইবন আল-আরাত (রা.), যিনি গৃহের ভেতরে আত্মগোপন করে ছিলেন, বেরিয়ে এলেন এবং বললেন,
“হে উমর! আমি আপনাকে সুসংবাদ দিচ্ছি। গত রাতে আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে এ দোয়া করতে শুনেছি:
‘হে আল্লাহ! উমর ইবনুল খাত্তাব অথবা আবু জাহলের মাধ্যমে ইসলামকে শক্তিশালী করুন।’
আমার বিশ্বাস, আল্লাহ আপনার ব্যাপারেই সেই দোয়া কবুল করেছেন।”
এ কথা শুনে উমর (রা.) আর বিলম্ব করলেন না। তিনি অবিলম্বে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কাছে যাওয়ার জন্য উদগ্রীব হয়ে উঠলেন।
খাব্বাব (রা.)-কে সঙ্গে নিয়ে তিনি দারুল আরকামে উপস্থিত হলেন, যেখানে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ও সাহাবিগণ সমবেত ছিলেন। প্রথমে মুসলমানরা তাঁর আগমন দেখে শঙ্কিত হয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাঁকে ভেতরে আসতে বললেন।
উমর (রা.) সামনে এগিয়ে এসে দৃঢ়তার সঙ্গে কালিমা শাহাদাত পাঠ করলেন এবং ইসলাম গ্রহণ করলেন।
আল্লাহু আকবার!
- যে উমর কিছুক্ষণ আগেও উন্মুক্ত তরবারি হাতে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে হত্যা করার উদ্দেশ্যে বেরিয়েছিলেন, সেই উমরই এখন তাঁর হাতে হাত রেখে ইসলামের পতাকাতলে আত্মসমর্পণ করলেন। এটি ছিল আল্লাহর হেদায়াতের এক বিস্ময়কর নিদর্শন।
- হযরত উমর (রা.)-এর ইসলাম গ্রহণ মুসলমানদের মনোবল বহুগুণে বৃদ্ধি করেছিল। তাঁর সাহস, প্রভাব ও নেতৃত্বগুণ ইসলামী সমাজকে নতুন শক্তি প্রদান করে। তিনি প্রকাশ্যে ইসলাম গ্রহণের ঘোষণা দেন এবং মুসলমানদের সঙ্গে কাবা শরিফে গিয়ে নির্ভয়ে সালাত আদায় করেন। এর ফলে ইসলামের দাওয়াত নতুন গতি লাভ করে এবং মুসলমানরা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে নিজেদের ঈমান প্রকাশ করতে সক্ষম হন।
- পরবর্তীকালে তিনি ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং তাঁর শাসনামলে ইসলামী রাষ্ট্র অভূতপূর্ব বিস্তার লাভ করে। আরব উপদ্বীপের বাইরে সিরিয়া, ইরাক, মিসর, পারস্য এবং বায়তুল মুকাদ্দাসসহ বিস্তীর্ণ অঞ্চল ইসলামী শাসনের অন্তর্ভুক্ত হয়।
- হযরত আবু বকর (রা.)-এর পর ইসলামের ইতিহাসে হযরত উমর (রা.)-এর স্থান অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ। তাঁর দূরদর্শিতা, ন্যায়বিচার, আল্লাহভীতি এবং নেতৃত্বের গুণাবলি তাঁকে ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রাষ্ট্রনায়কে পরিণত করেছে।
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাঁর মর্যাদা সম্পর্কে বলেছেন:
“আমার পরে যদি কোনো নবী হতেন, তবে উমর ইবনুল খাত্তাবই নবী হতেন।” (জামে‘ আত-তিরমিযী)
ইসলামের ইতিহাসে তাঁর জীবন সত্য, ন্যায়, সাহস ও আল্লাহভীতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে চিরস্মরণীয় হয়ে আছে।