এ অধ্যায়ের বিষয়সমূহ
Toggleহযরত হামযা (রাঃ) এর ইসলাম গ্রহণ
একদা নবী করীম (সাঃ) সাফা পাহাড়ের এক নির্জন স্থানে বসে মহান আল্লাহর ইবাদতে মশগুল ছিলেন। আবু জেহেল ব্যাপারটি লক্ষ্য করে বিভিন্ন কটুক্তি দ্বারা তাঁকে উত্তক্ত্য করতে লাগলো। কিন্তু তিনি ধৈর্যসহকারে নীরবতা অবলম্বন করলেন ও ইবাদতে নিমগ্ন থাকলেন। এরপর সে তাঁকে গালিগালাজ শুরু করলো ও ইসলাম ধর্মের কুৎসায় মেতে উঠলো। এতেও সে তাঁর ধৈর্যচ্যুতি ঘটাতে পারছিল না। তখন সে উত্তেজিত হয়ে এক খন্ড পাথর তাঁর দিকে ছুঁড়ে মারলো। এতে আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে তাঁর মাথা থেকে রক্ত ঝরতে লাগলো। এরপরও তিনি কিছুই বললেন না, নীরবে গৃহে ফিরে আসলেন। জনৈক দাসী অনতিদূর থেকে এ অকথ্য নির্যাতনের ঘটনাটি প্রত্যক্ষ্য করেছিল।
হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর পিতৃব্য হামযা ইবনে আব্দুল মুত্তালিব (রাঃ) বয়সে ছিলেন তাঁর সমসাময়িক। তিনি ছিলেন বীর পুরুষ এবং অসি, বর্শা ও তীর চালনায় সুদক্ষ। তিনি তখনও ইসলাম গ্রহণ করেননি। ভ্রাতুষ্পুত্রের নতুন ধর্মের প্রতি তিনি ছিলেন উদাসীন এবং প্রায়শই পশু শিকারে ব্যতিব্যস্ত থাকতেন। একদা তিনি শিকার থেকে ফিরে এসে সেই প্রত্যক্ষ্যদর্শীনি ক্রীতদাসীর মুখে আবু জেহেল কর্তৃক ভ্রাতুষ্পুত্রের উপর করুণ নির্যাতনের বিবরণ শুনতে পেলেন। এ ঘটনাটি তাঁর অন্তরে যেরূপ বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছিল ঠিক তেমনি তাঁর চিন্তার জগতে এক গভীর ভাবোদয়ের সূচনাও হয়েছিল। তিনি অতীব ক্রদ্ধাবস্থায় শিকারীর বেশেই তৎক্ষণাৎ কা’বা প্রাঙ্গণে আবু জেহেলের নিকট গেলেন। সে তখন এ ঘটনাটি নিয়ে তার লোকজনের সাথে হাস্যরসে মজে ছিল। তিনি প্রচন্ড রাগে তাকে ধনুক দিয়ে প্রহার শুরু করলেন এবং সর্বসমক্ষে মুহাম্মদের ধর্ম গ্রহণ করবেন বলে ঘোষণা দিলেন। এতে আবু জেহেলের সাথীরা তাঁকে পাল্টা আক্রমণ চালাতে উদ্যত হলো। হামযা (রাঃ) একাই তা ঠেকাতে প্রস্তুতি নিলেন। চতুর আবু জেহেল তার সঙ্গীদেরকে বিরত করলো এবং চালাকিবশত স্বীকার করলো যে, মুহাম্মদ (সাঃ) এর সাথে সে অন্যায় আচরণ করেছে। এর দ্বারা সে আশা করেছিল যে, হামযা (রাঃ)-কে ইসলাম গ্রহণে বিরত রাখা যাবে। কিন্তু তাঁর মনে ততক্ষণে হেদায়েতের আলো প্রবেশ করেছে। তিনি আর দেরী না করে মুহাম্মদ (সাঃ) এর সাথে সাক্ষাৎ করে ঈমান আনলেন এবং ইসলামের একজন একনিষ্ঠ অনুসারীতে পরিণত হলেন। তাঁর ইসলাম ধর্ম গ্রহণে কুরাইশরা হতাশ হলো – অপরদিকে মুসলমানদের শক্তি বিশেষভাবে বৃদ্ধি পেলো।
ইসলামের ইতিহাসে বদর ও ওহুদের যুদ্ধে তাঁর বীরত্ব গাঁথা অবিস্মরণীয় হয়ে আছে। ওহুদ যুদ্ধে তিনি শাহাদতের মর্যাদা লাভ করেন। হযরত আলী ইবনে আবু তালিব (রাঃ) বর্ণিত এক হাদীসে হযরত হামযা (রাঃ) এর শাহাদাত সম্পর্কে রসূল (সাঃ) বলেন, ‘শহীদদের নেতা হলেন হামযা ইবনে আব্দুল মুত্তালিব।’ (আল-মু’জাম আল-কবীর লিল-তাবারানী ২৯৫৮)
হযরত ওমর (রাঃ) এর ইসলাম গ্রহণ
নবুওতের ষষ্ঠ বছরে হযরত ওমর (রাঃ) এর ইসলাম গ্রহণ ছিল ইতিহাসের এক অভিনব ঘটনা। তিনি অত্যন্ত রাগী প্রকৃতির, সাহসী ও স্পষ্টবাদী ব্যক্তি ছিলেন। হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর নবুওত লাভের সময় তাঁর বয়স ছিল ৩৫ বছর। প্রথম দিকে তিনি ইসলামের ঘোর বিরোধী ছিলেন এবং অন্যান্য কাফের–মুশরেকদের মত তিনিও নব্য মুসলিমদের সাথে দুর্ব্যবহারে কুন্ঠাবোধ করতেন না। এদিকে আবু জেহেল অন্যান্য কুরাইশ নেতৃবর্গের সাথে এক বৈঠকে ইসলামের অব্যাহত প্রসারে প্রমাদ গুণলো। সে বললো, ’নিজেদের বাপ–দাদার ধর্ম আজ বিনাশ হতে বসেছে সামান্য এক ব্যক্তির কারণে। সুতরাং তাঁর মূলোৎপাটন করেতে হবে।’ সে উত্তেজিত কন্ঠে ঘোষণা করলো, ’যে মুহাম্মদের মস্তক কেটে আনতে পারবে তাকে আমি এক সহস্র স্বর্ণ মুদ্রা ও একশত উট পুরস্কার দেব।’ সভায় উপস্থিত বীর কেশরী ওমর ইবনে খাত্তাব সমাজে বিভক্তি ও অশান্তি সৃষ্টি হওয়ায় চিন্তিত হয়ে পড়েছিলেন এবং এর মূলোৎপাটনে তিনি দৃঢ় সংকল্পব্ধ হলেন। তিনি মনে করলেন, এসবের মূল হোতা মুহাম্মদ (সাঃ)-কে হত্যা করলেই সব সমস্যার সমাধান হবে। আবু জেহেলের এ প্রস্তাবে তিনি উন্মুক্ত তরবারি হাতে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘আমি পণ করলাম আমিই মুহাম্মদের শির কেটে আনব, তাঁর শিরচ্ছেদ না করে ফিরে আসব না।’ এ মহাবীরের প্রতিজ্ঞা ও হুঙ্কারে সবাই আশ্বস্ত হলো। তারা ভাবলো এতদিনে এর একটা সমাধান হবে। কিন্তু মহান আল্লাহর কৌশল ছিল ভিন্ন।
ক্রোধান্বিত ওমর উলঙ্গ তরবারি হাতে মুহাম্মদ (সাঃ) এর সন্ধানে ছুটে চললেন — তাঁকে যে আজ প্রতিজ্ঞা রক্ষা করতেই হবে। পথিমধ্যে তাঁর সাক্ষাৎ ঘটলো নিজ গোত্রের হযরত নাঈম ইবনে আব্দুল্লাহ (রাঃ) এর সাথে। তিনি ইতিপূর্বে গোপনে ইসলাম ধর্ম কবুল করেছিলেন। ওমরকে যুদ্ধংদেহী বেশে দেখে জিজ্ঞেস করলেন, ‘এমন বেশে কোথায় যাচ্ছ?’ এর উত্তরে তিনি তাঁর উদ্দেশ্য বিবৃত করলেন। নাঈম (রাঃ) বললেন, ’তুমি যদি মুহাম্মদ (সাঃ)-কে হত্যা করো এতে ক্ষিপ্ত হয়ে হাশেম গোত্রের লোকজন তোমাকেও হত্যা করে ফেলবে। তাছাড়া তোমার নিজ আত্মীয়–স্বজনের ধর্মান্তরিত হওয়ার খোঁজ–খবর না নিয়ে মুহাম্মদ (সাঃ)-কে হত্যা করার কি যুক্তি থাকতে পারে?’ তখন তিনি তাঁকে এ কাজ থেকে বিরত রাখার নিমিত্তে তাঁর আপন বোন ও ভগ্নীপতির ইসলাম গ্রহণের খবর তাঁকে জানিয়ে দিলেন। এ খবরে মহাক্ষিপ্ত ওমর মুহাম্মদ (সাঃ) এর পরিবর্তে প্রথমে তিনি নিজ বোন ও ভগ্নীপতিকে শায়েস্তা করার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলেন।
বোন ফাতেমা বিনতে খাত্তাব ও ভগ্নীপতি সাইদ ইবনে যায়েদ ইতিপূর্বে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। বোনের গৃহে পৌঁছে তিনি পবিত্র কুরআন পাঠের শব্দ শুনে স্তম্ভিত হলেন। রণবেশে ভাইকে দেখে তাঁরা কুরআনের পৃষ্ঠাগুলো লুকিয়ে ফেললেন। প্রথমে তিনি জানতে চাইলেন, ’এতক্ষণ কি পাঠ করা হচ্ছিল?’ এর কোন সদুত্তর না পেয়ে তিনি বললেন, ‘আমি জানতে পেরেছি তোমরা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছ।’ এ কথা বলেই তিনি সাইদের উপর আক্রমণ চালালেন। স্বামীকে বাঁচাতে বোন ফাতেমা এগিয়ে এলেন। আঘাতে বোনের শরীর থেকে রক্ত ঝরতে থাকলো। উভয়েই তখন রক্তাক্ত অবস্থায় বেপরোয়া হয়ে বলে উঠলেন, ‘হ্যাঁ, আমরা সত্য ধর্ম ইসলাম গ্রহণ করেছি। এতে যদি আমাদের প্রাণ চলে যায় তবুও আমরা এ ধর্ম পরিত্যাগ করব না।’ তাঁদের রক্তপাত দর্শনে তিনি বিচলিত বোধ করলেন, সেই সাথে তাঁদের ঈমানের সুদৃঢ়তায় কঠোর প্রকৃতির ওমরের অন্তরে ভাবান্তর ঘটলো, তাঁর রাগ প্রশমিত হতে থাকলো। তিনি বললেন, ‘তোমরা এতক্ষণ যা পাঠ করছিলে তা আমাকে দেখাও।’ ভাইয়ের এ পরিবর্তনে বোন ফাতেমা আশ্বস্তবোধ করলেন এবং কুরআনের ”সূরা ত্বাহা” -র পৃষ্ঠাগুলো বের করে আনলেন। ওমর তা পাঠ করতে উদ্যত হলেন। বোন বললেন, ‘নাপাক অবস্থায় এটা পাঠ করা যাবে না। প্রথমে আপনি ওযু করে পাক–পবিত্র হোন, তারপর পাঠ করুন।’ তিনি তাই করলেন। এর প্রতিটি বাণী তাঁর অন্তরকে বিমুগ্ধ ও বিমোহিত করে ফেললো এবং হেদায়েতের অনুপ্রেরণা সৃষ্টি করলো।
ওমর তৎক্ষণাৎ ঈমান গ্রহণে উদগ্রীব হয়ে উঠলেন। তিনি ভগ্নীপতি সাইদ (রাঃ)-কে অনুরোধ করলেন, ’এক্ষণি আমাকে নিয়ে চলো নবীজী (সাঃ) এর কাছে।’ এমন সময় হযরত খাব্বাব (রাঃ) সেখানে হাজির হয়ে বললেন, আমি আপনাকে সুসংবাদ দিচ্ছি – গত রাতে হুজুর (সাঃ)-কে মহান আল্লাহর দরবারে দোয়া করতে শুনেছি: ‘ইয়া আল্লাহ্! আপনি ওমর ও আবু জেহেলের মধ্যে যাকে অধিক পছন্দ করেন তাকে ইসলাম গ্রহণের তওফিক দান করুন।’ এখন এটা বুঝা গেলো যে, নবীজী (সাঃ) এর দোয়া আপনার জন্যই কবুল হয়েছে। তখন ওমর (রাঃ) আর স্থির থাকতে পারলেন না। তাঁকে অবিলম্বে হুজুর সমীপে নিয়ে যাওয়া তাগিদ দিলেন। হযরত খাব্বাব (রাঃ)-কে সঙ্গে নিয়ে তিনি দ্রুত নবীজী (সাঃ) এর দরবারে হাজির হলেন এবং তাঁর সম্মুখে কলেমা শাহাদাত পাঠ করে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করলেন।
সুবহানাল্লাহ্! আল্লাহর কি বিচিত্র লীলা – যে ওমর পণ করে উন্মুক্ত তরবারি হাতে মুহাম্মদ (সাঃ) এর শিরচ্ছেদ করতে রওয়ানা দিয়েছিলেন এখন তিনিই কি–না তাঁর চরণতলে আত্মসমর্পন করলেন। ইসলামের খেদমতে তাঁর জীবন হলো ধন্য। তাঁর ইসলাম গ্রহণ মুসলমানদের মনোবলকে খুবই উজ্জীবিত করলো এবং তাদের শক্তি বহুগুণে বৃদ্ধি পেলো । তিনি প্রকাশ্যে ইসলাম গ্রহণের ঘোষণা দিয়ে মুসলমানদেরকে সঙ্গে নিয়ে কা’বা গৃহে নামায আদায় করলেন। এরপর থেকে তিনি নবীজী (সাঃ) এর পাশে থেকে সর্বক্ষণ ইসলামের খেদমত করে গেছেন।
ইসলামের ইতিহাসে হযরত আবু বকর (রাঃ) এর পরেই হযরত ওমর (রাঃ) এর স্থান। ইসলামের বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর দূরদর্শী চিন্তার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ওহী নাযিল হয়েছিল বেশ কয়েবকবার। তাঁর সম্পর্কে নবী করীম (সাঃ) এর বিখ্যাত উক্তিটি ছিলো: ‘আমার পর যদি নবী হওয়ার বিধান থাকতো তবে সে নবী হতেন হযরত ওমর (রাঃ)।’ তিনি ছিলেন ইসলামের দ্বিতীয় খলীফা। তাঁর খিলাফতকালে সমগ্র আরব, যেরুজালেম, সিরিয়া, ইরাক, পারস্য, মিসর অর্থাৎ তৎকালীন দুনিয়ার অর্ধাংশ ইসলামী সম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল।