এ অধ্যায়ের বিষয়সমূহ
Toggleমজলুম মুসলিমদের আবিসিনিয়ায় হিজরত
ইসলাম ধর্ম গ্রহণের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ার সাথে সাথে কুরাইশদের অত্যাচার–নিপীড়নের মাত্রাও বৃদ্ধি পেতে লাগলো। অবিরত নির্মম জুলুমের শিকার মুসলমানগণ স্বাভাবিক জীবন যাপনে ও তাঁদের ধর্ম–কর্ম পালনে মহাসঙ্কটে পতিত হলেন। তাঁরা অতিষ্ঠ হয়ে মক্কায় অবস্থান অনিরাপদ মনে করলেন। নবী করীম (সাঃ) তাঁদের এ করুণ অবস্থায় বিকল্প হিসেবে পার্শ্ববর্তী খৃস্টান দেশ আবিসিনিয়ায় হিজরতের চিন্তা করলেন।
প্রথমে ১১/১২ জন মুসলিম পুরুষ ও ৪/৫ জন মুসলিম মহিলার সমন্বয়ে গঠিত একটি দল চুপিসারে আবিসিনিয়ায় পাড়ি জমালেন। এদের সঙ্গে ছিলেন হযরত উসমান (রাঃ) ও তদীয় স্ত্রী –নবীজী (সাঃ) এর কন্যা হযরত রোকেয়া (রাঃ) এর মত সম্ভ্রান্ত ও বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ । কুরাইশগণ বিষয়টি টের পেয়ে তাঁদের পশ্চাদ্ধাবন করলো, কিন্তু ততক্ষণে হিজরতকারীদের বহনকারী জাহাজটি জেদ্দা বন্দর ছেড়ে চলে গেছে। আবিসিনিয়ার সম্রাট নাজ্জাশী তাঁদেরকে সম্মানের সাথে আশ্রয় দিলেন। সেখানে তাঁরা নির্বিঘ্নে ধর্ম-কর্ম পালনসহ শান্তিতে জীবন যাপনের সুযোগ পেলেন।
এর কিছুদিন পর নবীজী (সাঃ)-র নির্দেশে তাঁর চাচাত ভাই হযরত জাফর ইবনে আবু তালিবের নেতৃত্বে ৮৩ জন পুরুষ ও ১৮ জন নারীর দ্বিতীয় একটি দল আবিসিনিয়ায় হিজরত করেন। সেখানে তাঁরা পূর্ববর্তী দলের সাথে একত্র হয়ে শান্তিপূর্ণ জীবন যাপন করতে লাগলেন।
হিজরত প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ্ রব্বুল আলামীন বলেন:
وَ الَّذِیْنَ هَاجَرُوْا فِی اللّٰهِ مِنْۢ بَعْدِ مَا ظُلِمُوْا لَـنُبَوِّئَنَّهُمْ فِی الدُّنْیَا حَسَنَۃً ؕ وَ لَاَجْرُ الْاٰخِرَۃِ اَکْبَرُ ۘ لَوْ كَانُوْا یَعْلَمُوْنَ الَّذِیْنَ صَبَرُوْا وَ عَلٰی رَبِّهِمْ یَتَوَكَلُوْنَ
“যারা নির্যাতিত হওয়ার পর আল্লাহর জন্যে গৃহত্যাগ করেছে, আমি অবশ্যই তাদেরকে দুনিয়াতে উত্তম আবাস দেব এবং পরকালের পুরস্কার তো সর্বাধিক; হায়! যদি তারা জানত। (তারাই হলো ওইসব লোক) যারা ধৈর্যাবলম্বনে দৃঢ়পদ রয়েছে এবং তাদের পালনকর্তার উপর ভরসা করেছে।” (সূরা নহল, ১৬:৪১–৪২)
وَ مَنْ یُّهَاجِرْ فِیْ سَبِیْلِ اللّٰهِ یَجِدْ فِی الْاَرْضِ مُرٰغَمًا كَثِیْرًا وَّ سَعَۃً ؕ وَ مَنْ یَّخْرُجْ مِنْۢ بَیْتِہٖ مُهَاجِرًا اِلَی اللّٰهِ وَ رَسُوْلِہٖ ثُمَّ یُدْرِکْهُ الْمَوْتُ فَقَدْ وَقَعَ اَجْرُہٗ عَلَی اللّٰهِ ؕ وَ كَانَ اللّٰهُ غَفُوْرًا رَّحِیْمًا
“যে কেউ আল্লাহর পথে দেশত্যাগ করে, সে এর বিনিময়ে অনেক স্থান ও সচ্ছলতা প্রাপ্ত হবে। যে কেউ নিজ গৃহ থেকে বের হয় আল্লাহ ও রাসূলের প্রতি হিজরত করার উদ্দেশে, অতঃপর মৃত্যুমুখে পতিত হয়, তবে তার সওয়াব আল্লাহর কাছে অবধারিত হয়ে যায়। আল্লাহ ক্ষমাশীল, করুণাময়।” (সূরা নিসা, ৪:১০০)
সম্রাট নাজ্জাশীর দরবারে কুরাইশ প্রতিনিধিদল
ক্ষিপ্ত কুরাইশগণ হাতছাড়া হওয়া মুসলমানদেরকে ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনা করলো। তারা প্রচুর মূল্যবান উপঢৌকনসহ একটি প্রতিনিধিদল আবিসিনিয়ার সম্রাট নাজ্জাশীর নিকট পাঠালো। প্রতিনিধি দলটিতে ছিল আমর ইবনে আস ও আব্দুল্লাহ্ ইবনে রাবীআ নামীয় দু’জন বিশিষ্ট ব্যক্তি। তারা প্রথমে খৃস্টান পাদ্রী ও অমাত্যবর্গের সাথে সাক্ষাৎ করে উপঢৌকন উপহার দিয়ে তাদেরকে হাত করলো যাতে তাদের দাবীর পক্ষে সম্রাটের নিকট সুপারিশ করে।
পরদিন কুরাইশ প্রতিনিধি দল মূল্যবান উপঢৌকন সামগ্রীসহ রাজ দরবারে প্রবেশ করে সম্রাটের সামনে বিনীতভাবে তাদের বক্তব্য উত্থাপন করে বলে:
‘রাজন! মক্কার বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ ও সম্ভ্রান্ত সমাজ আমাদেরকে তাদের প্রতিনিধি হিসেবে আপনার দরবারে পাঠিয়েছেন। আমাদের কিছু বিপথগামী ও ধর্মদ্রোহী লোক মক্কা থেকে পালিয়ে আপনার দেশে আগমন করেছে। তারা স্বধর্ম ত্যাগ করে এমন এক অভিনব ধর্মের অনুসরণ করছে যা আমাদের এবং আপনাদের ধর্মের বিরোধী। এদের আত্মীয়বর্গ ও মনিবগণ আপনার সমীপে অনুরোধ জানিয়েছেন যেন আপনি তাদেরকে আমাদের সাথে ফেরত পাঠিয়ে দেন।’
পাদ্রী ও অমাত্যবর্গ তৎক্ষণাৎ কুরাইশদের এ দাবীর প্রতি সমস্বরে সমর্থন জানালো। কিন্তু ন্যায়পরায়ণ সম্রাট তাদের একতরফা বক্তব্য শুনে জানিয়ে দিলেন,
’প্রতিপক্ষের বক্তব্য না শুনে আমি কোন সিদ্ধান্ত দেবো না।’
মুসলমানদেরকে রাজ দরবারে তলব করা হলো। মুসলিম প্রতিনিধিদল হযরত জাফর ইবনে আবু তালিবের নেতৃত্বে তথায় উপস্থিত হলে সম্রাট জানতে চাইলেন, তাঁরা কেন বাপ–দাদার ত্যাগ করেছেন? প্রচলিত অন্য কোন ধর্ম গ্রহণ না করে কেনই বা নব্য ধর্ম ইসলাম গ্রহণ করলেন? হযরত জাফর (রাঃ) মুসলমানদের পক্ষ থেকে উত্তরে তখনকার আরবের অবস্থা উল্লেখ করে বললেন:
‘হে রাজন! আমাদের ধর্ম ইসলাম এক ও অদ্বিতীয় আল্লাহর অস্তিত্বে ও উপসনায় বিশ্বাস করতে বলে। এর পূর্বে আমরা ও আমাদের পিতৃ-পুরুষগণ বিশ্বস্রষ্টা এক ও অদ্বিতীয় আল্লাহকে ভুলে চন্দ্র–সূর্য – নক্ষত্র, বৃক্ষ–প্রস্তর, জিন–ভূত ও আমাদের স্বহস্তে নির্মিত দেব–দেবীর পূজা করতাম। আমরা বিভিন্ন ধরনের কুসংস্কার, অন্ধ বিশ্বাস ও মিথ্যাচারে লিপ্ত ছিলাম। হারাম ও মৃত জন্তুর মাংস ভক্ষণ করতাম। ব্যভিচার, হত্যা, রাহাজানি, লুটতরাজ, ইত্যাদি ছিল আমাদের নিত্য–নৈমিত্তিক কাজ। অসহায়–এতীমের সম্পদ আত্মসাৎ ও তাদের সাথে দুর্ব্যবহার, আত্মীয়তার সম্পর্কচ্ছেদ, প্রতিবেশীর সাথে অসাদাচরণে আমরা কুণ্ঠিত হতাম না। সব ধরনের পাপাচারে আমরা ছিলাম নিমগ্ন।’
তারপর নবী মুহাম্মদ (সাঃ)— এর আগমনের কথা বর্ণনায় তিনি বললেন,
‘এহেন এক তমসাচ্ছন্ন ও অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে তাওহীদের শাশ্বত বাণী নিয়ে আমাদের মাঝে এলেন নবী মুহাম্মদ (সাঃ) – আল্লাহর নূর ও রহমতস্বরূপ। বংশীয় মর্যাদা, সততা ও আমানতদারির ক্ষেত্রে তিনি নবুওতের পূর্ব থেকেই সর্বত্র সুপরিচিত ছিলেন। সমাজের মানুষ তাঁকে ”আল-আমীন” অর্থাৎ বিশ্বস্ততা ও সত্যবাদীতার প্রতীকরূপে গণ্য করতো। আমরা তাঁর নবুওতের উপর ও সকল নবী–রসূলগণের উপর এবং তাঁর উপর নাযিলকৃত কুরআন ও সকল আসমানী কিতাবের উপর ঈমান এনেছি। তাঁর আহ্বানে:
- আমরা পৌত্তলিকতা ছেড়ে এক ও অদ্বিতীয় আল্লাহর উপাসনা করি।
- তিনি আমাদেরকে নামায, রোযা, দান –খয়রাত ও উত্তম চরিত্র গঠন শিক্ষা দিয়েছেন।
- তিনি আমাদেরকে সৎ কাজে আদেশ দেন ও অসৎ কাজে নিষেধ করেন।
- তিনি আত্মীয়–স্বজন, পাড়া–প্রতিবেশী ও দুঃস্থ মানুষের হক আদায় এবং ন্যায়নীতির চর্চা করতে উৎসাহ দেন এবং মিথ্যাচার, অশ্লীলতা, জুলুম ও হত্যা থেকে বিরত থাকতে বলেন।
- আমরা তাঁর উপদেশ মোতাবেক সকল পূণ্য কাজে আত্মনিয়োগ করেছি এবং সব ধরনের পাপাচার ও অবৈধ কাজ থেকে নিজেদেরকে বিরত রাখছি।’
তিনি আরও বলেন,
’আমাদের নষ্ট ও উগ্র সম্প্রদায় এ কারণেই আমাদের উপর নির্মম অত্যাচার ও নির্যাতন চালিয়েছে। আমাদের নবী (সাঃ) আপনার ন্যায়নীতির সুনাম ও সুখ্যাতির কথা জেনেই আমাদেরকে এ দেশে প্রেরণ করেছেন। তাই আমরা অন্য কোথাও না গিয়ে আপনার রাজ্যে আশ্রয় নিয়েছি। আশা করি, অপনার রাজ্যে আমরা সুবিচার পাব।’
হযরত জাফর (রাঃ) এর বিনয়পূর্ণ সত্যভাষণ সম্রাটের অন্তরকে বিগলিত করে ফেললো। তিনি অশ্রুসিক্ত নয়নে পবিত্র কুরআনের বাণী শুনতে উদগ্রীব হলেন। হযরত জাফর (রাঃ) তখন ”সূরা মরিয়ম” এর প্রথম কয়েকটি আয়াত পাঠ করে শুনালেন। হযরত ঈসা (আঃ) ও তদীয় মাতা মরিয়ম সম্পৃক্ত আয়াতগুলো শুনে তিনি অভিভূত হয়ে বলতে লাগলেন, ‘আল্লাহর কসম, নবী মুহাম্মদ (সাঃ) এর উপর অবতীর্ণ এই কালাম এবং নবী ঈসা (আঃ)–র প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছিল তার উৎস একই।’ এরপর তিনি কুরাইশ প্রতিনিধিদেরকে বললেন, ‘আপনারা ফিরে যান, আমি কখনোই মুসলমানদেরকে আপনাদের সাথে যেতে দিতে পারি না।’
পরদিন কুরাইশ নেতারা আবরও রাজ দরবারে হাজির হয়ে বললো,
‘এটা অপমানজনক যে, মুসলমানরা ঈসা (আঃ)-কে আল্লাহর পুত্র হিসেবে স্বীকার করে না।’
সম্রাট নাজ্জাশী এ বিষয় সম্পর্কে জানতে পুনরায় মুসলমানদেরকে ডেকে পাঠালেন। হযরত জাফর (রাঃ) বাদশাহের জ্ঞাতার্থে বললেন:
‘রাজন! আমাদের নবীর শিক্ষানুসারে আমরা হযরত ঈসা (আঃ)-কে আল্লাহর রূহ, সতী–সাধ্বী হযরত মরিয়ম (আঃ) এর পুত্র, এবং আল্লাহর প্রেরিত নবী–রসূল ও তাঁর দাস হিসেবে মান্য করি।’
অতঃপর তিনি এ সম্পর্কিত পবিত্র কুরআনের সত্য বাণী তাঁর সামনে পাঠ করে শুনালেন। সম্রাট এসব বৃত্তান্ত শুনে বললেন,
‘আমাদের উভয়ের ধর্মের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। হযরত ঈসা (আঃ) নিজেও এর বেশী কিছু বলেননি।’
মুসলমানদেরকে অভয় দিয়ে তিনি বললেন, ‘যান, আমার রাজ্যে আপনারা নির্বিঘ্নে বসবাস করুন।’ কাফের কুরাইশদের চক্রান্ত এভাবেই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হলো।
আর্থ–সামাজিক বয়কট আরোপ
এ পর্যন্ত গৃহীত মক্কার কুরাইশদের সব কৌশল ও নির্যাতন–নিপীড়ন যখন মুসলমানদের অগ্রযাত্রাকে রোধ করতে পারলো না, তখন তারা ভিন্ন এক ষড়যন্ত্রের ফাঁদ পাতলো। তারা ভাবলো, বনু হাশেম ও বনু আব্দুল মুত্তালিবের গোত্রের সমর্থনের কারণেই মুহাম্মদ (সাঃ) তাঁর নবুওতি মিশন চালিয়ে যেতে সক্ষম হচ্ছেন। তাই তারা এ দু’গোত্রের লোকজনের উপর সামাজিক ও আর্থিক বয়কট আরোপের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলো। তারা প্রতিজ্ঞা করলো,
- এ দু’গোত্রের লোকজনের সাথে কথা–বার্তা, উঠা–বসা, বিয়ে–শাদী, চলা–ফেরা, ক্রয়–বিক্রয়সহ সব ধরনের সামাজিক ও আর্থিক লেনদেন বন্ধ রাখবে।
- এ মর্মে তারা একটি লিখিত প্রতিজ্ঞাপত্রে আল্লাহর নামে শপথপূর্বক ঘোষণা করলো,
‘যে পর্যন্ত মুহাম্মদ (সাঃ)–কে তাদের হাতে সমর্পণ করা না হবে ততদিন এ প্রতিজ্ঞাপত্রটি বলবৎ থাকবে।’
তারপর এটি তারা কা’বা গৃহের দরজায় টাঙ্গিয়ে রাখলো।
এ অন্যায় ও অন্যায্য বয়কট মুহাম্মদ (সাঃ) এর অনুসারীসহ তাঁর গোত্রেদ্বয়ের সবাইকে দুঃসহ এক দুর্বিপাকে নিপতিত করলো। আবু তালিব ঘটনার আকস্মিকতায় বিমূঢ় হয়ে পড়লেন। তিনি বনু হাশেম ও বনু আব্দুল মুত্তালিবের গোত্রের লোকজনের সাথে পরামর্শে বসলেন। সিদ্ধান্ত হলো, তারা আবু তালিবের মালিকানাধীন মক্কার নিকটবর্তী ‘শেবা’ গিরি উপত্যকায় বসবাস করবেন। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তারা নিজেদের বাসগৃহ ছেড়ে অস্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য সেখানে চলে গেলেন।
‘শেবা’ গিরি উপত্যকায় দুর্ভিক্ষাবস্থার সৃষ্টি
কিন্তু বয়কটের শিকার এ দুই গোত্রের লোকজন খাদ্য–পানীয় ও জরুরী সামগ্রীর যথেষ্ট মজুদ সঙ্গে নিয়ে যেতে পারলেন না। অল্প কিছুদিনের মধ্যেই তারা খাদ্য ও বস্ত্র সঙ্কটে পড়লেন। বয়কটের ফলে এসব জরুরী সামগ্রীর অভাব ঘটে এবং দুর্ভিক্ষাবস্থার সৃষ্টি হয়। ফলে তাদেরকে গাছের পাতা খেয়েও জীবন ধারণ করতে হয়। শিশু, মহিলা ও বৃদ্ধদের কষ্ট চরমে উঠে। কিন্তু সবাই অপরিসীম ধৈর্যসহকারে বিপদের মোকাবেলা করেছিলেন।
এ অবস্থায়ও নবী (সাঃ) আল্লাহর কাছে কোন অভিযোগ পেশ না করে হজ্জ্ব মওসুমে তাঁর নবুওতি দায়িত্ব পালনে সক্রিয় ছিলেন। হজ্জ্বের পবিত্র দু’টি মাসে কলহ–বিবাদ, মারামারি, খুনো–খুনি বন্ধ থাকার রীতি প্রচলিত থাকায় হজ্জ্ব যাত্রীদের সমাবেশে তিনি ইসলামের অমিয় বাণী প্রচারের সুযোগ পান।
মক্কার সাধারণ মানুষের মধ্যে অসন্তোষ
প্রাকৃতিক নিয়মেই এ অযৌক্তিক অবরোধের বিরুদ্ধে মক্কার সাধারণ মানুষের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেয়। অবরুদ্ধ এ দু’গোত্রের মানুষের সাথে তাদের অনেকেরই আত্মীয়তার সম্পর্ক থাকায় এ অমানবিক ও দুর্বিষহ বয়কটে তারা ছিলেন তাদের সমব্যথী। তাদের কেহ কেহ চুপিসারে ক্ষুধার্ত স্বজনের কাছে খাবার সামগ্রী পাঠাতেন। এদের মধ্যে বদান্যতায় অন্যতম ছিলেন হিশাম ইবনে আমর।
দু’বছরেরও বেশী সময় ধরে চলমান এ বয়কটের বিরুদ্ধে সহানুভূতিশীল ব্যক্তিবর্গ সোচ্চার হয়ে উঠেন। হিশাম উদ্যোগী হয়ে প্রথমে মুহাম্মদ (সাঃ) এর ফুফাত ভাই যুহাইর ইবনে উমাইয়ার সাথে সাক্ষাৎ করেন। উভয়ে পরামর্শ করে মুতইম ইবনে আদি, আবুল বখতারী ইবনে হিশাম, যামআ ইবনে আসওয়াদ প্রমুখ সমমনা বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের সাথে অবরোধবাসীদের উপর সৃষ্ট অমানবিক দুর্ভোগের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেন। তাঁরা একমত হন যে, এ সংক্রান্ত প্রতিজ্ঞাপত্রটি ছিঁড়ে ফেলতে হবে।
পরদিন যুহাইর কা’বা শরীফ তাওয়াফ করার পর সর্বসমক্ষে এ অবরোধের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে উঠেন। তিনি কা’বা গৃহে লটকানো প্রতিজ্ঞাপত্রটি ছিঁড়ে ফেলার ঘোষণা দেন। তাঁকে সমর্থন করেন তার সঙ্গী–সাথীগণ। এতে সেখানে উপস্থিত আবু জেহেল প্রতিবাদমুখর হয়ে উঠলো। ফলে দুই পক্ষের মধ্যে তুমুল বচসা শুরু হলো।
নবী করীম (সাঃ) এর বার্তা নিয়ে পিতৃব্য আবু তালিবের কা’বায় আগমন
অপরদিকে নবী করীম (সাঃ) তাঁর চাচা আবু তালিবকে কিছু কথা বলে কা’বা গৃহে পাঠালেন। নবীজী (সাঃ) এর পরামর্শক্রমে সেখানে পৌঁছে তিনি ঘোষণা দিলেন,
’তোমাদের এ প্রতিজ্ঞাপত্রটি আল্লাহ্ মনোনীত নয়। তাই শুধু আল্লাহ্ নামটি ছাড়া এর বাকী সব অংশ কীটে খেয়ে ফেলেছে। তোমাদের বিশ্বাস না হলে সেটি খুলে দেখতে পারো। এটা যদি মিথ্যে হয় তবে নিশ্চিত যে, আমি মুহাম্মদকে তোমাদের হাতে তুলে দেব। আর যদি সত্য হয়, তবে এ বয়কট এখানেই সমাপ্ত হতে হবে।’
তাঁর এ বক্তব্যটি শেষ হওয়া মাত্র মুতইম তৎক্ষণাৎ প্রতিজ্ঞাপত্রটি নামিয়ে আনলেন। সবার সামনে এটি খুলে দেখলেন – ঘটনা সত্য। শুধু আল্লাহ্ নামটি ছাড়া এর বাকী সব অংশ কীটদষ্ট হয়ে পাঠের অযোগ্য হয়ে পড়েছে।
বয়কটের অবসান
কুরাইশগণ কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়লো। যুহাইর ও মুতইম তখনই ছুটে গেলেন শেবা উপত্যকায় এবং অবরোধবাসীদেরকে মুক্ত করে আনলেন। সত্যের পথে বাধা–বিঘ্ন পাহাড়সম, তবে চূড়ান্তভাবে সত্যের জয় অবশ্যাম্ভাবী।
পিতৃব্য আবু তালিবের ওফাত
পিতামহ আব্দুল মুত্তালিবের মৃত্যুর পর সেই আট বছর বয়স থেকে পিতৃব্য আবু তালিবের স্নেহ স্পর্শে নবীজী (সাঃ) বড় হয়ে উঠেন। অভিবাকত্বের দায়িত্ব পালনে তিনি কোনদিনই পিছ–পা হননি। আজীবন তিনি এ দায়িত্ব পালন করে গেছেন। ইসলাম ধর্ম গ্রহণ না করলেও তিনি ভ্রাতুষ্পুত্রের নবুওতকে বিশ্বাস করেছেন এবং নবুওতি কার্যক্রম পালনে তাঁকে সর্বাত্মক সাহায্য–সহযোগিতা করেছেন। সর্বশেষ সবাইকে নিয়ে তিনি শেবা উপত্যকায় অবরুদ্ধ জীবন যাপন করেছেন। এখন বয়স তাঁর আশি পেরিয়ে গেছে। সে সাথে মৃত্যুরোগ তাঁকে ঘিরে ধরেছে। মৃত্যু শয্যায় শায়িত আবু তালিবকে দেখতে কুরাইশ নেতৃবৃন্দ তাঁর গৃহে উপস্থিত হলো।
সেখানে নবী করীম (সাঃ)-ও উপস্থিত ছিলেন। তিনি তাঁর চাচাকে শেষ মুহূর্তে ঈমান আনার ব্যাপারে অনুরোধ জানাচ্ছিলেন। কুরাইশরা তাঁকে সর্বশেষ অনুরোধ জানিয়ে বললো,
’আপনি স্বধর্ম পরিত্যাগ করবেন না, আমাদের ধর্মের উপর বলবৎ থাকুন।’ এছাড়া তারা মুহাম্মদ (সাঃ)–কে পৌত্তলিকতার বিরোধীতা থেকে বিরত রাখার অনুরোধও জানান।’
তাদের কথা শুনে মুহাম্মদ (সাঃ) বললেন,
‘আপনারা আমার একটি কথায় একমত হোন, তবেই দেখবেন আরব–অনারব সবাই আপনাদের অধীন হয়ে যাবে।’
কুরাইশরা সাগ্রহে সে কথাটি কি জানতে চাইলে তিনি বললেন,
“আপনারা স্বীকার করুন: আল্লাহ্ ছাড়া অন্য কোন মাবুদ নেই। আর পৌত্তলিকতা ছেড়ে দিন।”
তাঁর এ কথা তারা তৎক্ষণাৎ নাকচ করে দিলো এবং আবু তালিবের গৃহ পরিত্যাগ করলো।
আবু তালিব ঈমান আনার ব্যাপারে দ্বিধান্বিত হয়ে বললেন,
’আমি বাপ–দাদার ধর্ম ত্যাগ করলে লোকজন আমাকে কাপুরুষ বলবে।’
এটা বলার পর তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করলেন। মৃত্যুর সময় পিতৃব্যের ঈমান নসীব না হওয়ায় নবী করীম (সাঃ) খুবই বিমর্ষবোধ করলেন। তাঁর এ অবস্থায় মহান আল্লাহ্ নিম্নের আয়াতটি নাযিল করেন:
إِنَّكَ لَا تَهْدِي مَنْ أَحْبَبْتَ وَلَـٰكِنَّ اللَّهَ يَهْدِي مَن يَشَاءُ ۚ وَهُوَ أَعْلَمُ بِالْمُهْتَدِينَ
“আপনি যাকে পছন্দ করেন, তাকে সঠিক পথে আনতে পারবেন না, তবে আল্লাহ তা’আলাই যাকে ইচ্ছা সঠিক পথে আনয়ন করেন। কে সঠিক পথে আসবে, সে সম্পর্কে তিনিই ভাল জানেন।” (সূরা কাসাস, ২৮:৫৬)
পিতৃব্য আবু তালিবের মৃত্যুতে এক বিরাট মহীরুহের পতন হলো। কুরাইশদের সাহস বেড়ে গেলো এবং তারা পুরো উদ্যমে মুসলিম নির্যাতনের মাত্রা বাড়িয়ে দিলো। একদিন এক যুবক নবীজী (সাঃ) এর চোখে–মুখে ধুলিবালি নিক্ষেপ করলো। তিনি যুবকটিকে কিছু না বলে নীরবে বাড়ী ফিরলেন। ফাতেমা (রাঃ) পিতার এ অবস্থা দেখে কেঁদে ফেললেন। তিনি তাঁকে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন,
“কেঁদো না মা, মহান আল্লাহ্ তোমার পিতাকে হেফাজত করবেন।” এরপর বললেন, “আমার চাচার অবর্তমানে আমার সাথে এমন দুর্ব্যবহারের সাহস পেলো।”
প্রিয়তমা স্ত্রী খাদীজা (রাঃ) এর ইন্তেকাল
পিতৃব্য আবু তালিবের মৃত্যুর শোক এখনো মহানবী (সাঃ)-এর হৃদয়ে তাজা। এমন সময় আরেকটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক ঘটনা তাঁর জীবনকে গভীর বিষাদের ছায়ায় আচ্ছন্ন করে দিল। তাঁর প্রিয়তমা স্ত্রী, ইসলামের প্রথম বিশ্বাসী, উম্মুল মুমিনীন হযরত খাদীজাতুল কুবরা (রাঃ) প্রায় ৬৫ বছর বয়সে ইন্তেকাল করলেন। এই মৃত্যু ছিল শুধু একজন স্ত্রীর মৃত্যু নয়; বরং ছিল মহানবী (সাঃ)-এর জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য সহচরী, অকৃত্রিম বন্ধু, নির্ভরযোগ্য পরামর্শদাতা এবং সর্বশ্রেষ্ঠ সমর্থকের বিদায়।
নবুওত লাভের প্রাক্কালে হেরা পর্বতের গুহায় সাধনকালে প্রেমময়ী স্ত্রী খাদীজা (রাঃ) তাঁকে পুরোপুরি সহযোগিতা করতেন, কিছু দিন পরপরই তিনি খাদ্য ও পানীয় নিয়ে প্রিয় স্বামীর সেবায় হীরা গুহায় যেতেন। এ মহিয়সী মহিলা অনুধাবন করতে পেরেছিলেন তাঁর স্বামী ভবিষ্যতের একজন মহাপুরুষ হিসেবে পরিগণিত হবেন।
দাম্পত্য জীবনের দীর্ঘ সময়জুড়ে হযরত খাদীজা (রাঃ) সুখে-দুঃখে, স্বচ্ছলতা ও সংকটে সর্বদা স্বামীর পাশে থেকেছেন। নবুওয়ত প্রাপ্তির পর যখন সমগ্র মক্কা তাঁর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল, যখন আত্মীয়-স্বজন ও কুরাইশ নেতারা তাঁকে উপহাস, নির্যাতন ও অপমানের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছিল, তখন খাদীজা (রাঃ) ছিলেন তাঁর সবচেয়ে বড় আশ্রয়স্থল। তিনি সর্বপ্রথম মহানবী (সাঃ)–এর সত্যতার প্রতি ঈমান আনেন এবং দৃঢ়চিত্তে তাঁর নবুওয়তের মিশনকে সমর্থন করেন।
হেরা গুহায় প্রথম ওহী লাভের পর মহানবী (সাঃ) যখন উদ্বিগ্ন ও শঙ্কিত অবস্থায় গৃহে প্রত্যাবর্তন করেছিলেন, তখন খাদীজা (রাঃ)–ই তাঁকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেছিলেন যে,
“আল্লাহ্ কখনো তাঁকে অপমানিত করবেন না; কারণ তিনি আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা করেন, অভাবগ্রস্তদের সাহায্য করেন এবং সত্য ও ন্যায়ের পথে অবিচল থাকেন।”
তাঁর এই আশ্বাসবাণী নবীজী (সাঃ)-এর হৃদয়ে প্রশান্তি এনে দিয়েছিল।
মক্কার কাফিরদের অব্যাহত নির্যাতন, সামাজিক বয়কট এবং অর্থনৈতিক অবরোধের কঠিন দিনগুলোতেও খাদীজা (রাঃ) অসীম ধৈর্য ও ত্যাগের পরিচয় দেন। তিনি নিজের বিপুল সম্পদ ইসলামের কল্যাণে ব্যয় করেন এবং প্রতিটি সংকটে স্বামীর পাশে অটলভাবে দাঁড়িয়ে থাকেন। তাঁর আন্তরিক ভালোবাসা, প্রজ্ঞাপূর্ণ পরামর্শ এবং অনুপ্রেরণামূলক কথামালা মহানবী (সাঃ)-কে বারবার সাহস ও শক্তি যুগিয়েছে।
আজ সেই প্রিয় সঙ্গিনীর বিদায়ে মহানবী (সাঃ) গভীরভাবে শোকাহত হলেন। তাঁর জীবন থেকে যেন একটি বিশাল অবলম্বন সরে গেল। অল্প সময়ের ব্যবধানে পিতৃব্য আবু তালিব ও প্রিয়তমা স্ত্রী খাদীজা (রাঃ)–এর মৃত্যু তাঁকে অত্যন্ত মর্মাহত করে তোলে। এ দুই মহান ব্যক্তিত্ব ছিলেন তাঁর জীবনের দুর্দিনের প্রধান সহায়ক ও রক্ষাকবচ। তাঁদের প্রস্থান তাঁর জন্য ছিল এক অপূরণীয় ক্ষতি।
পরপর এই দুটি শোকাবহ ঘটনার ফলে মহানবী (সাঃ) মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে গভীর বেদনা অনুভব করলেও তিনি ধৈর্য ও আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থার পরিচয় দেন। তিনি স্বীয় প্রভু, আল্লাহ্ রব্বুল আলামীনের শরণাপন্ন হন, তাঁর নিকট সাহায্য, শক্তি ও পথনির্দেশনা প্রার্থনা করেন। আল্লাহর ওপর অটল ভরসা এবং তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের অদম্য আকাঙ্ক্ষাই তাঁকে এই কঠিন পরীক্ষার সময় দৃঢ় রাখে। পরবর্তীকালে ইসলামের ইতিহাসে এই বছরটি “আমুল হুযন” বা “দুঃখের বছর” নামে পরিচিতি লাভ করে, কারণ এ বছর মহানবী (সাঃ) তাঁর জীবনের সবচেয়ে প্রিয় ও সহায়ক দুই ব্যক্তিত্বকে হারানোর বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছিলেন।
উপসংহার
হযরত খাদীজা (রাঃ)-এর জীবন ইসলামের ইতিহাসে ত্যাগ, আনুগত্য, ঈমান, ভালোবাসা ও আত্মনিবেদনের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তাঁর অবদান ছাড়া ইসলামের প্রাথমিক যুগের অনেক কঠিন অধ্যায় আরও দুরূহ হয়ে উঠতে পারত। মহানবী (সাঃ)-এর প্রতি তাঁর অকৃত্রিম ভালোবাসা ও সমর্থন যুগে যুগে মুসলিম নারী-পুরুষের জন্য অনুকরণীয় আদর্শ হয়ে থাকবে।
তায়েফের হৃদয় বিদারক ঘটনা
পিতৃব্য আবু তালিব ও প্রিয়তমা স্ত্রী হযরত খাদীজাতুল কুবরা (রাঃ)–এর ইন্তেকালের পর মহানবী (সাঃ) জীবনের এক অত্যন্ত কঠিন ও বেদনাময় সময় অতিক্রম করছিলেন। এই দুই মহান ব্যক্তিত্ব ছিলেন তাঁর দুঃসময়ের প্রধান অবলম্বন। তাঁদের মৃত্যুতে তিনি গভীরভাবে শোকাহত ও নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েন। অন্যদিকে কুরাইশদের নির্যাতন, বিদ্বেষ ও বিরোধিতাও দিন দিন তীব্রতর হচ্ছিল। এমন প্রতিকূল পরিস্থিতিতে তিনি মক্কার বাইরে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে দেওয়ার নতুন সম্ভাবনার সন্ধান করতে লাগলেন।
এই উদ্দেশ্যে তিনি কাউকে কিছু না জানিয়ে তাঁর বিশ্বস্ত পালকপুত্র ও সাহাবী হযরত যায়েদ ইবনে হারিসা (রাঃ)-কে সঙ্গে নিয়ে পায়ে হেঁটে মক্কা থেকে প্রায় ষাট মাইল দূরে অবস্থিত পাহাড়ি জনপদ তায়েফের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন। তাঁর আশা ছিল, তায়েফের অধিবাসীরা হয়তো ইসলামের আহ্বান গ্রহণ করবে এবং সত্যের বাণীকে স্বাগত জানাবে। কিন্তু সেখানে তাঁর জন্য অপেক্ষা করছিল এক ভিন্ন ও অত্যন্ত বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতা।
তায়েফে পৌঁছে তিনি সাকীফ গোত্রের নেতৃবৃন্দের নিকট ইসলামের দাওয়াত পেশ করলেন এবং এক আল্লাহর ইবাদতের প্রতি তাদের আহ্বান জানালেন। কিন্তু তারা তাঁর কথার প্রতি সামান্যতম গুরুত্বও দিল না। বরং অবজ্ঞা, উপহাস ও তাচ্ছিল্যের মাধ্যমে তাঁকে প্রত্যাখ্যান করল। শুধু তাই নয়, তারা শহরের উচ্ছৃঙ্খল যুবক ও অর্বাচীন ছেলেদের তাঁর পেছনে লেলিয়ে দিল। তারা চিৎকার-চেঁচামেচি, গালাগাল ও বিদ্রূপ করতে করতে নবীজী (সাঃ)-কে লক্ষ্য করে পাথর নিক্ষেপ করতে লাগল।
এই নির্মম প্রস্তরাঘাতে মহানবী (সাঃ) ও হযরত যায়েদ (রাঃ) উভয়েই রক্তাক্ত হয়ে পড়েন। তাঁদের পা থেকে অবিরাম রক্ত ঝরতে থাকে। হযরত যায়েদ (রাঃ) নিজের শরীর দিয়ে নবীজী (সাঃ)-কে আড়াল করার চেষ্টা করেন এবং নিজেও আঘাতপ্রাপ্ত হন। অবশেষে তারা শহরের বাইরে একটি খেজুর বাগানে আশ্রয় গ্রহণ করেন।
ক্লান্ত, আহত ও রক্তাক্ত অবস্থায় তাঁরা একটি বৃক্ষের ছায়ায় বসে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। এমন সময় তায়েফে অবস্থানরত মক্কার দুই কুরাইশ নেতা, রাবীআর পুত্র উতবা ও শায়বা, দূর থেকে নবীজী (সাঃ)-এর করুণ অবস্থা লক্ষ্য করল। তাদের হৃদয়ে সাময়িকভাবে কিছুটা সহানুভূতির সঞ্চার হলো। তারা আদ্দাস নামক এক খ্রিস্টান ভৃত্যকে দিয়ে এক থোকা আঙুর নবীজী (সাঃ)-এর নিকট পাঠিয়ে দিল।
আল্লাহর রাসূল (সাঃ) আঙুর গ্রহণ করে “বিসমিল্লাহ” বলে খেতে শুরু করলেন। এই শব্দ শুনে আদ্দাস বিস্মিত হয়ে গেল, কারণ আরবদের মধ্যে এমন কথা প্রচলিত ছিল না। পরবর্তীতে নবীজী (সাঃ)-এর সঙ্গে তাঁর সংলাপ হয় এবং তিনি নবুওয়তের সত্যতার কিছু নিদর্শন প্রত্যক্ষ করেন।
এরপর মহানবী (সাঃ) গভীর ব্যথাভারাক্রান্ত হৃদয়ে মহান আল্লাহর দরবারে হাত তুলে এক মর্মস্পর্শী দোয়া করেন। তাঁর জীবনের সবচেয়ে বেদনাদায়ক মুহূর্তগুলোর একটিতে উচ্চারিত এই দোয়া মানব ইতিহাসের অন্যতম হৃদয়স্পর্শী প্রার্থনা হিসেবে বিবেচিত। তিনি আরজ করলেন—
“হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছেই আমার দুর্বলতা, অসহায়ত্ব এবং মানুষের কাছে আমার অমর্যাদার অভিযোগ পেশ করছি। আপনি সর্বাধিক দয়ালু। আপনি দুর্বলদের প্রতিপালক এবং আপনিই আমার প্রতিপালক। আপনি আমাকে কার হাতে সোপর্দ করছেন? কোনো দূরবর্তী শত্রুর হাতে, যে আমার প্রতি কঠোর আচরণ করবে? নাকি কোনো প্রতিপক্ষের হাতে, যাকে আপনি আমার ব্যাপারে কর্তৃত্ব দান করেছেন? যদি আপনি আমার প্রতি অসন্তুষ্ট না হন, তবে আমি কোনো কষ্টকেই পরোয়া করি না। তবে আপনার নিরাপত্তা ও অনুগ্রহই আমার জন্য অধিক প্রশস্ত ও কল্যাণকর। আমি আশ্রয় প্রার্থনা করছি আপনার সেই নূরের মাধ্যমে, যার আলোয় সব অন্ধকার দূরীভূত হয় এবং দুনিয়া ও আখিরাতের সকল বিষয় সুশৃঙ্খল হয়। আমি আপনার ক্রোধ ও অসন্তোষ থেকে আশ্রয় চাই। আপনার সন্তুষ্টি অর্জন না করা পর্যন্ত আমি আপনারই নিকট নিবেদিত থাকব। সকল শক্তি ও ক্ষমতার উৎস একমাত্র আপনিই।”
এই দোয়ার প্রতিটি বাক্যে ফুটে উঠেছিল এক আহত অথচ অবিচল নবীর হৃদয়ের আর্তনাদ, তাঁর বিনয়, ধৈর্য এবং আল্লাহর প্রতি সীমাহীন আস্থা।
এ সময় আল্লাহর নির্দেশে হযরত জিবরীল (আঃ) নবীজী (সাঃ)-এর নিকট আগমন করেন। তাঁর সঙ্গে পাহাড়সমূহের দায়িত্বপ্রাপ্ত ফেরেশতাও উপস্থিত ছিলেন। তাঁরা জানালেন যে, যদি নবীজী (সাঃ) ইচ্ছা করেন, তবে তায়েফের দুই পার্শ্ববর্তী পাহাড়কে একত্রিত করে এ জনপদের অবাধ্য লোকদের ধ্বংস করে দেওয়া হবে।
কিন্তু মানবজাতির প্রতি অফুরন্ত দয়া ও মমতার প্রতীক রহমতের নবী (সাঃ) প্রতিশোধ বা অভিশাপের পথ বেছে নিলেন না। তিনি বললেন—
“বরং আমি আশা করি, আল্লাহ তাদের বংশধরদের মধ্য থেকে এমন লোক সৃষ্টি করবেন, যারা এক আল্লাহর ইবাদত করবে এবং তাঁর সঙ্গে কাউকে শরিক করবে না।”
কত মহান ছিল তাঁর হৃদয়! যারা তাঁকে রক্তাক্ত করল, অপমান করল এবং শহর থেকে বিতাড়িত করল, তাদের বিরুদ্ধেও তিনি অভিশাপ করেননি; বরং তাদের হেদায়েত ও কল্যাণ কামনা করেছেন। মানবতার ইতিহাসে ক্ষমা, সহনশীলতা ও উদারতার এমন দৃষ্টান্ত সত্যিই বিরল।
তায়েফের এই হৃদয়বিদারক ঘটনা হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)–এর মহান চরিত্রের এক উজ্জ্বল অধ্যায়। আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠার দৃঢ় অঙ্গীকার, অক্লান্ত পরিশ্রম, অসীম ধৈর্য, অপরিসীম সহনশীলতা এবং আল্লাহর প্রতি অটল ভরসাই ছিল তাঁর দাওয়াতি মিশনের প্রধান চালিকাশক্তি। ইসলামের প্রচার শুধু মুখের কথার বিষয় ছিল না; এর পেছনে ছিল সীমাহীন ত্যাগ, কষ্ট, রক্ত, অশ্রু ও আত্মনিবেদনের এক গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস।
তায়েফের ঘটনা মক্কায় ছড়িয়ে পড়ার পর কুরাইশদের বিরোধিতা ও মুসলিম নির্যাতনের মাত্রা আরও বৃদ্ধি পেল। কিন্তু মহানবী (সাঃ) কখনো হতাশ বা হতোদ্যম হননি। তিনি অবিচলভাবে তাঁর দাওয়াতি কার্যক্রম চালিয়ে যেতে থাকেন। বিশেষ করে হজের মৌসুমে আরবের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আগত তীর্থযাত্রীদের তাঁবুতে গিয়ে তিনি ইসলামের বাণী পৌঁছে দিতেন।
কুরাইশ নেতারা, বিশেষত তাঁর চাচা আবু লাহাব, দলবল নিয়ে তাঁর পেছনে ঘুরে বেড়াত এবং মানুষকে তাঁর কাছ থেকে দূরে থাকার জন্য উসকানি দিত। তারা নানাভাবে তাঁর প্রচারকার্যে বাধা সৃষ্টি করত। কিন্তু আল্লাহর রাসূল (সাঃ) ধৈর্য, প্রজ্ঞা ও দৃঢ়তার সঙ্গে তাঁর দায়িত্ব পালন করে যেতে থাকেন। কোনো বিরোধিতা, উপহাস বা নির্যাতনই তাঁকে তাঁর মহান মিশন থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি। বরং প্রতিটি বাধাই তাঁর ঈমান, সাহস ও সংকল্পকে আরও দৃঢ় করে তুলেছিল।