৯ম অধ্যায় : কিছু বিস্ময়কর ঘটনা

পবিত্র কুরআনের আয়াত শ্রবণে জিন জাতির হেদায়েত প্রাপ্তির ঘটনা

হযরত মুহাম্মদ (সা) তায়েফে সংঘটিত দৃঃখজনক ঘটনার পর সেখান থেকে মক্কায় ফেরার পথে নাখলা নামক স্থানে যাত্রা বিরতি করেন। তিনি ফজরের নামাযে যখন পবিত্র কুরআন তেলাওয়াতরত ছিলেন তখন একদল জিন এর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে তাঁর কন্ঠ নিঃসৃত কুরআনের বাণী শ্রবণ করে। এতে তাদের অন্তরে হেদায়েত প্রাপ্তি ঘটে। পবিত্র কুরআনের ৭২নং সূরা জিন নাযিল করে আল্লাহ্ রব্বুল আলামীন তাঁর নবীকে এ ঘটনা বিবৃত করেছেন:

قُلْ اُوْحِیَ اِلَیَّ اَنَّهُ اسْتَمَعَ نَفَرٌ مِّنَ الْجِنِّ فَقَالُوْۤا اِنَّا سَمِعْنَا قُرْاٰنًا عَجَبًا ۝ یَّہْدِیْۤ اِلَی الرُّشْدِ فَاٰمَنَّا بِہٖ ؕ وَ لَنْ نُّشْرِكَ بِرَبِّنَاۤ اَحَدًا ۝ وَّ اَنَّہٗ تَعٰلٰی جَدُّ رَبِّنَا مَا اتَّخَذَ صَاحِبَۃً وَّ لَا وَلَدًا ۝

“বলুন : আমার প্রতি ওহী নাযিল করা হয়েছে যে, জিনদের একটি দল কুরআন শ্রবণ করেছে, অতঃপর তারা বলেছে: আমরা বিস্ময়কর কুরআন শ্রবণ করেছি; যা সৎপথ প্রদর্শন করে। ফলে আমরা তাতে বিশ্বাস স্থাপন করেছি। আমরা কখনও আমাদের পালনকর্তার সাথে কাউকে শরীক করব না। এবং আরও বিশ্বাস করি যে, আমাদের পালনকর্তার মহান মর্যাদা সবার উর্ধ্বে। তিনি কোন পত্নী গ্রহণ করেননি এবং তাঁর কোন সন্তান নেই।” (সূরা জিন, ৭২:১–৩)

এ ঘটনাটি অন্য আরেকটি সূরাতেও বর্ণিত হয়েছে:

وَاِذْ صَرَفْنَاۤ اِلَيْكَ نَفَرًا مِّنَ الْجِنِّ يَسْتَمِعُوْنَ الْقُرْاٰنَ فَلَمَّا حَضَرُوهُ قَالُوۤا اَنْصِتُوْا فَلَمَّا قُضِىَ وَلَّوْا اِلَىٰ قَوْمِهِمْ مُّنْذِرِيْنَ۝ قَالُوا يٰقَوْمَنَاۤ اِنَّا سَمِعْنَا كِتٰبًا أُنْزِلَ مِنْۢ بَعْدِ مُوسَىٰ مُصَدِّقًا لِّمَا بَيْنَ يَدَيْهِ يَهْدِىۤ اِلَى الْحَقِّ وَاِلَىٰ طَرِيْقٍ مُّسْتَقِيْمٍ۝ یٰقَوْمَنَاۤ اَجِیْبُوْا دَاعِیَ اللّٰهِ وَاٰمِنُوْا بِہٖ یَغْفِرْ لَکُمْ مِّنْ ذُنُوْبِکُمْ وَیُجِرْکُمْ مِّنْ عَذَابٍ اَلِیْمٍ ۝ وَمَنْ لَّا یُجِبْ دَاعِیَ اللّٰهِ فَلَیْسَ بِمُعْجِزٍ فِی الْاَرْضِ وَلَیْسَ لَہٗ مِنْ دُوْنِہٖۤ اَوْلِیَآءُ ؕ اُولٰٓئِكَ فِیْ ضَلٰلٍ مُّبِیْنٍ

“যখন আমি একদল  জিনকে আপনার প্রতি আকৃষ্ট করছেলিাম, তারা কুরআন পাঠ শুনছলি, তারা যখন কুরআন পাঠের জায়গায় উপস্থতি হল, তখন পরস্পর বলল, চুপ থাক। অতঃপর যখন পাঠ সমাপ্ত হল, তখন তারা তাদের সম্প্রদায়রে কাছে সর্তককারীরূপে ফিরে গলে । তারা বলল, হে আমাদের সম্প্রদায়, আমরা এমন এক কিতাব শুনেছি যা মূসার পর অবর্তীণ হয়েছে। এ কিতাব র্পূবর্বতী সব কিতাবের প্রত্যায়ন করে,  সত্যর্ধম ও সরলপথরে দিকে পরচিালতি করে । হে আমাদের সম্প্রদায়, তোমরা আল্লাহর দিকে আহ্বানকারীর কথা মান্য কর এবং তাঁর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন কর । তিনি তোমাদের গুনাহ মার্জনা করবেন । আর যে ব্যক্তি আল্লাহর দিকে আহ্বানকারীর কথা মানবে না, সে পৃথিবীতে আল্লাহকে অপারগ করতে পারবে না এবং আল্লাহ ব্যতীত তার কোন সাহায্যকারী থাকবে না। এ ধরনের লোকই প্রকাশ্য পথভ্রষ্টতায় লিপ্ত ।” (সূরা আহক্বাফ, ৪৬:২৯–৩২)

উপরোক্ত ঘটনায় এ কথা প্রমাণিত হয় যে, নবী করীম (সাঃ) শুধু মানবজাতির পথ–প্রদর্শক ছিলেন না তাঁর মুখ–নিসৃত পবিত্র কুরআনের বাণী জিন জাতিকেও পথ–প্রদর্শন করেছিল অর্থাৎ তিনি ছিলেন সৃষ্টিকুলের রহমত স্বরূপ।

 

 ইসরা ওয়াল মি’রাজের বিস্ময়কর ঘটনা

হযরত মুহাম্মদুর রাসূল্লাহ (সা) এর জীবনের একটি অলৌকিক ঘটনা হলো “আল ইসরা ওয়াল মি‘রাজ,” অর্থাৎ নৈশ ভ্রমণ ও ঊর্ধ্বলোক গমন যা সংঘটিত হয়েছিল তাঁর নবুওতের দশম বর্ষে, মতভেদে রজব মাসের ছাব্বিশ তারিখের রাতে। এ রজনীর এক স্বল্পতম সময়ে অল্লাহ্ রব্বুল আলামীন তাঁর প্রিয় নবীকে তাঁর কুদরতের নিদর্শন ও গুপ্ত রহস্যসমূহ অবলোকন করানোর জন্য মক্কার কা’বা প্রাঙ্গণ থেকে  মসজিদুল আক্বসা ও ঊর্ধলোক ভ্রমণ করিয়েছিলেন।

নবুওয়তের দশম বছরে প্রিয়তমা স্ত্রী খাদীজা বিনতে খুওয়াইলিদ এবং স্নেহময় পিতৃব্য আবু তালিব–এর ইন্তেকালের পর রাসূলুল্লাহ (সা.) অত্যন্ত দুঃখ–কষ্টের মধ্য দিয়ে সময় অতিবাহিত করছিলেন। উপরন্তু তায়েফে গিয়ে তিনি চরম অবহেলা ও নির্যাতনের শিকার হন। এমন কঠিন সময়ে মহান আল্লাহ তাঁর প্রিয় রাসূল (সা.)–কে সান্ত্বনা, সম্মান ও বিশেষ নিদর্শন প্রদর্শনের জন্য এক অভূতপূর্ব অলৌকিক সফরে নিয়ে যান, যা ইতিহাসে ইসরা ওয়াল মি‘রাজ নামে পরিচিত।

যে মহান প্রভু রাব্বুল আলামীন তাঁর প্রিয় রাসূলকে বিশ্বমানবতার পথপ্রদর্শক হিসেবে নির্বাচিত করেছেন, তিনি তাঁকে একাকী ছেড়ে দেননি। পৃথিবীর মানুষ যখন তাঁকে অবজ্ঞা করছিল, তখন আসমানের অধিপতি তাঁকে ডেকে নিলেন নিজের সান্নিধ্যে। এভাবেই সংঘটিত হয় ইতিহাসের এক অনন্য ও অলৌকিক ঘটনা—ইসরা ওয়াল মি‘রাজ।

দু’টি পর্বে এ ঘটনটি সংঘটিত হয়েছিল । প্রথম পর্বে মক্কার ’মসজিদুল হারাম’ থেকে জেরুযালেমের ’মসজিদুল আক্বসা’ পর্যন্ত ভ্রমণ যা ইসরা নামে অভিহিত। এবং দ্বিতীয় পর্বে মসজিদুল আক্বসা থেকে ঊর্ধ্বলোকে আরশে–আযীম পর্যন্ত ভ্রমণ যা মি’রাজ নামে পরিচিত।

অলৌকিক যাত্রার সূচনা

রজব মাসের ছাব্বিশ তারিখের রাতে এশার নামাযের পর হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) কা’বা শরীফের সন্নিকটে তাঁর চাচাত বোন উম্মে হানীর গৃহে ঘুমিয়েছিলেন। এমন সময় হযরত জিব্রাইল (আঃ) এসে তাঁকে ঘুম থেকে জাগিয়ে তুললেন এবং এক মহা-যাত্রার প্রস্তুতি নিতে বললেন। নবীজী  (সাঃ) ওযু করে নিলেন। ঘরের বাইরে এসে তিনি দেখতে পেলেন “বুরাক” নামক দু’পাখা বিশিষ্ট একটি শ্বেতবর্ণ জন্তু যার অবয়ব গাধার মত। তবে আকারে তা ছিল গাধার চেয়ে বড় আর খচ্চরের চেয়ে ছোট। নবীজী  (সাঃ) এর  ভ্রমণের বাহন হিসেবে এটিকে জিব্রাইল (আঃ) সঙ্গে নিয়ে এসেছেন। উল্লেখযোগ্য যে, বিদ্যুৎ–গতিসম্পন্ন বলেই এর নাম হয়েছে ‘বুরাক’

প্রথম পর্বের যাত্রারম্ভ

জিব্রাইল (আঃ) এর নির্দেশ মোতাবেক রসূল (সাঃ) বুরাকের উপর আরোহণ করলেন। এটি তীব্র বেগে বায়তুল মুকাদ্দাসের দিকে ছুটে চললো। সঙ্গে ছিলেন জিব্রাইল (আঃ)। পথিমধ্যে তাঁরা সিনাই পর্বতের যে স্থানে আল্লাহ্ তায়ালা হযরত মূসা নবী (আঃ)-র সাথে কথোপকথন হয়েছিল সে স্থানটি যিয়ারত করলেন। এরপর তাঁরা হযরত ঈসা (আঃ) এর জন্মস্থান জেরুযালেমের বেথেলহেম ‍যিয়ারত করে  মসজিদুল আক্কসায় পৌঁছান। পুরো ঘটনাটি মুহূর্তের মধ্যেই সংঘটিত হয়েছিল।

বোরাকটিকে তিনি একটি পাথরের সাথে বেঁধে রেখে মসজিদুল আক্কসায় প্রবেশ করেন এবং সেখানে তাঁর সম্মানে আগত বিশিষ্ট নবীগণের সাথে তিনি নিজ ইমামতীতে নামায আদায় করেন।

ইসরা সম্পর্কিত পবিত্র কুরআনের আয়াতটি নিম্নে উল্লেখ করা হলো:

سُبْحٰنَ الَّذِىۤ اَسْرٰى بِعَبْدِه لَيْلًا مِّنَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ اِلَى الْمَسْجِدِ الْاَقْصَا الَّذِىْ بٰرَكْنَا حَوْلَه لِنُرِيَه مِنْ اٰيٰتِنَآ اِنَّه هُوَ السَّمِيْعُ الْبَصِيْرُ۝

“পরম পবিত্র ও মহিমাময় সত্তা তিনি, যিনি স্বীয় বান্দাকে রাত্রি বেলায় ভ্রমণ করিয়েছিলেন মসজিদে হারাম থেকে মসজিদে আকসা পর্যন্ত – যার চার দিকে আমি পর্যাপ্ত বরকত দান করেছি যাতে আমি তাঁকে কুদরতের কিছু নিদর্শন দেখিয়ে দেই। নিশ্চয়ই তিনি পরম শ্রবণকারী ও দৃষ্টিসম্পন্ন।” (সূরা ইসরা, ১৭:১)

 দ্বিতীয় পর্বে মহাকাশের পথে মহিমান্বিত যাত্রার বিবরণ

এরপর শুরু হয় ঊর্ধ্বলোক অভিমুখে তাঁর দ্বিতীয় পর্বের ভ্রমণ যা মিরাজ নামে পরিচিত। নবীজী (সাঃ)–কে নিয়ে বুরাক ছুটে চলেলো নিঃসীম নীলিমায়।  জিবরাইল (আঃ)–এর সঙ্গে তিনি একের পর এক সাত আসমান অতিক্রম করেন। প্রতিটি আসমানে তিনি আল্লাহর নবীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। প্রত্যেক নবী তাঁকে আন্তরিক অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জানান এবং তাঁর আগমনে আনন্দ প্রকাশ করেন। এ দৃশ্য ছিল নবুওয়তের ধারাবাহিকতা ও ঐক্যের এক অনুপম প্রতীক।

মুহূর্তেই তাঁরা পৌঁছে গেলেন প্রথম আসমানের দ্বারপ্রান্তে। সেখানে প্রহরায় নিয়োজিত আছেন অসংখ্য ফেরেশতা যাতে জিন–শয়তানেরা প্রবেশ না করতে পারে। প্রবেশ দ্বারে জিব্রাইল (আঃ)-কে প্রশ্ন করা হলো: ‘আপনার সঙ্গী কি প্রবেশের অনুমতিপ্রাপ্ত?

জিব্রাইল (আঃ) উত্তরে নবীজী (সাঃ) এর পরিচয় দিয়ে বললেন, ’ইনি মুহাম্মদ (সাঃ) – আল্লাহ্ রব্বুল আলামীনের প্রেরিত সর্বশেষ নবী ও রসূল এবং আসমানে প্রবেশের জন্য অনুমতিপ্রাপ্ত।’

একই প্রশ্ন প্রতিটি আসমানের প্রবেশ দ্বারে করা হয়েছিল এবং জিব্রাইল (আঃ) একই উত্তর দিয়েছিলেন।

প্রথম আসমানে তিনি সাক্ষাৎ করেন মানবজাতির আদি পিতা আদম (আ.)-এর সঙ্গে। দ্বিতীয় আসমানে সাক্ষাৎ হয় ইয়াহইয়া (আ.) ও ঈসা (আ.)-এর সঙ্গে। তৃতীয় আসমানে তিনি দেখেন অপরূপ সৌন্দর্যের অধিকারী ইউসুফ (আ.)-কে। চতুর্থ আসমানে ছিলেন ইদরিস (আ.), পঞ্চম আসমানে হারুন (আ.), ষষ্ঠ আসমানে মূসা (আ.) এবং সপ্তম আসমানে সাক্ষাৎ হয় ইবরাহিম (আ.)-এর সঙ্গে।

সিদরাতুল মুনতাহা ও আল্লাহর মহান নিদর্শন

এভাবেসাত আসমান অতিক্রম করে রাসূলুল্লাহ (সা.) পৌঁছেন সিদরাতুল মুনতাহা–য়—সৃষ্টিজগতের এক সীমান্তবিন্দু, যার পরবর্তী জগতের জ্ঞান একমাত্র মহান আল্লাহর কাছেই রয়েছে।  মহাকাশের শেষ প্রান্তে আরশের ডান দিকে অবস্থিত “সিদরাতুল মুন্তাহা” নামক বৃক্ষটি  যা মহাকাশ সীমান্ত নামে অভিহিত।

সেখানে তিনি মহান আল্লাহর অসংখ্য নিদর্শন প্রত্যক্ষ করেন। তিনি জান্নাতের মনোমুগ্ধকর দৃশ্য এবং জাহান্নামের ভয়াবহ পরিণতির কিছু নমুনা দেখেন। তিনি প্রত্যক্ষ করেন মানবকর্মের ফলাফল এবং আল্লাহর ন্যায়বিচারের বিভিন্ন প্রকাশ।

পবিত্র কুরআনে এ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে—

“নিশ্চয়ই তিনি তাঁর প্রতিপালকের মহান নিদর্শনসমূহের কিছু প্রত্যক্ষ করেছিলেন।” (সূরা আন-নাজম, ৫৩:১৮)

জিব্রাইল (আঃ) ও বুরাকের যাত্রা এখানেই সমাপ্ত হলো। এর পরই অবস্থিত অনন্ত বিস্তৃত “আরশে আযীম” যেখানে মহান আল্লাহ্ সমাসীন রয়েছেন।

ইতোমধ্যে নবীজী (সাঃ) এর সাথে প্রথম আসমানে মানবজাতির আদিপিতা আদম (আঃ) এর সাক্ষাৎ ঘটে। এছাড়াও সেখানে তিনি অসংখ্য মখলুককে মহান আল্লাহর প্রশংসারত অবস্থায় দেখতে পান। এভাবে একের পর এক আসমান পরিভ্রমণকালে তিনি হযরত ঈসা, মূসা, দাউদ, নূহ, ইব্রাহীম, প্রমুখ বিশিষ্ট নবীবর্গের সাক্ষাৎ পান। সপ্তম আসমান যেখানে ফেরেশতাদের নিবাসস্থল সেখানে তাঁদের ইবাদতখানা ‘বায়তুল মা’মুর’ অবস্থিত। নবী করীম (সাঃ) সেখানে মওতের ফেরেশতা আজ্রাইল (আঃ)-কে তাঁর অধীনস্থ ফেরেশতাবাহিনীসহ কর্মরত অবস্থায় দেখতে পান। প্রতিটি আসমানে তিনি বিভিন্ন ধরনের অভিনব দৃশ্যাবলী অবলোকন করেন।

আরশে আযীমে ভ্রমণ

“সিদরাতুল মুন্তাহা” থেকে নবীজী (সাঃ)–কে “রফরফ” নামক আরেকটি বাহনে একাকী নিয়ে যাওয়া হয় আরশে আযীমে — এ ধরনের একটি দুর্বল বর্ণনা রয়েছে। এতে বলা হয়েছে যে, এ বাহনের মাধ্যমে আরশের অতি সন্নিকটে দুই ধনুকের জ্যা পরিমাণ দূরত্বে তিনি পৌঁছে যান এবং দিব্যদৃষ্টিতে মহান আল্লাহর নূর প্রত্যক্ষ করেন।

সেখানে আল্লাহ্ রব্বুল আলামীনের সাথে তাঁর যে কথোপকথন হয় তার সূচনাটি ছিল এরূপ:

প্রথমে নবী করীম (সাঃ) তাঁর প্রভুর সনে নিবেদন করেন: ”যাবতীয় সম্মান, যাবতীয় ইবাদত – বন্দেগী ও যাবতীয় পবিত্রতা আল্লাহর জন্য।”

উত্তরে মহান আল্লাহ বলেন: ”হে নবী; আপনার উপর আল্লাহর শান্তি বর্ষিত হোক এবং রহমত ও বরকত নাযিল হোক।”

উম্মতের কান্ডারী নবী করীম (সাঃ) এর উত্তরে বলেন: ”আল্লাহর শান্তি বর্ষিত হোক আমাদের প্রতি এবং আল্লাহর সৎকর্মশীল বান্দাগণের প্রতি।”

মহান আল্লাহ এবং নবীজী (সাঃ)-র এ কথোপকথন শুনে জিব্রাইল (আঃ) বললেন: ”আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ব্যতীত অন্য কোন উপাস্য নেই, আমি আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ (সাঃ) তাঁর বান্দা ও রসূল।”

উপরোক্ত কথোপকথনটি “তাশাহুদ” নামে  সুপরিচিত যা প্রতিটি নামাযের বৈঠকে পঠিত হয়।

মি’রাজের উপহার

হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) এর বর্ণনা মতে, ‘মি’রাজে মহান আল্লাহর তরফ থেকে উম্মতে মুহাম্মদীর জন্য বিশেষ উপহার হিসেবে পাঁচ ওয়াক্ত নামাযের বিধান জারী করা হয়।

পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ সালাতের বিধান জারী

মি‘রাজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা ছিল মুসলিম উম্মাহর জন্য সালাত ফরজ হওয়া। প্রথমে পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামাযের বিধান দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু মূসা (আঃ)--এর পরামর্শে এবং উম্মতের কথা চিন্তা করে নবীজী (সাঃ) আল্লাহ্ তায়ালার কাছে তা কমানোর জন্য অনুরোধ জানান। অতীব দয়ালু আল্লাহ্ তায়ালা তা কমিয়ে পাঁচ ওয়াক্ত নির্ধারণ করেন, তবে তিনি এর সাওয়াব পঞ্চাশ ওয়াক্তের সমান বহাল রাখেন।’ (তিরমিযি শরীফ)। এভাবে সালাত এমন এক ইবাদতে পরিণত হয়, যা সরাসরি আকাশে আরশের নিকট রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে প্রদান করা হয়েছিল। তাই সালাতকে যথার্থই ‘মুমিনের মি‘রাজ’ বলা হয়।

এছাড়া আরও দু’টি উপহার ছিল। মি’রাজের রজনীতে আল্লাহর তরফ থেকে ’সূরা বাকারা’র শেষ দু’টি আয়াত নাযিল হয়েছিল এবং উম্মতে মুহাম্মদীর মধ্যে যারা শিরক করেনি তাদের গুনাহসমূহ মাফ করে দেওয়ার ওয়াদা প্রদান করা হয়েছিল।

মি’রাজে নবী করীম (সাঃ) যা অবলোকন করেন

মি’রাজে আল্লাহর রসূল (সাঃ) বেহেশত ও দোযখ অবলোকন করেন। বেহেশতে স্বর্গীয় মনোরম দৃশ্যাবলী ও পরম সুখ – শান্তির আবাসসমূহ এবং নেক বান্দাদের জন্য সংরক্ষিত আল্লাহর বিশেষ নিয়ামতসমূহ তাঁকে দেখানো হয়। অপরদিকে দোযখের ভয়াবহ অগ্নিকুন্ড ও ভীষণ শাস্তিসমূহের নমুনা তাঁকে প্রদর্শন করা হয়। বোখারী শরীফ ও মুসলিম শরীফের বিভিন্ন হাদীসে মি’রাজের বিভিন্ন ঘটনার বিবরণ রয়েছে। এছাড়া মেশকাত শরীফের ৫৬১২ থেকে ৫৬১৫ পর্যন্ত হাদীসসমূহে এর বিশদ বর্ণনা রয়েছে।

ইসরা–ওয়াল–মি’রাজ বিষয়ক প্রতিক্রিয়া ও বিতর্ক

পরদিন রাসূলুল্লাহ (সা.) যখন এ ঘটনার কথা ঘোষণা করলেন, তখন মক্কার কাফের কুরাইশরা মি’রাজের ঘটনাটি অবিশ্বাস ও অস্বীকার করেছিল। অতি স্বল্প সময়ে ঘটে যাওয়া এ ঘটনাটি তাদের কাছে অদ্ভূত মনে হয়েছিল। তাই তারা এ নিয়ে নবীজী (সাঃ)-কে উন্মাদ আখ্যা দিয়ে তাঁর সাথে হাস্যরস ও ঠাট্টা–বিদ্রূপ করতে শুরু করে।

কিন্তু মহান সাহাবী আবু বকর সিদ্দীক (রা.) বিনা দ্বিধায় তা সত্য বলে মেনে নেন। এ কারণেই তিনি “আস-সিদ্দীক” (সত্যের অকুণ্ঠ সমর্থনকারী) উপাধিতে ভূষিত হন। (আল-মুস্তাদরাক লিল-হাকিম; আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ)

ইসরা–ওয়াল-মি’রাজ শারীরিক না আত্মিকভাবে সংঘটিত হয়েছিল তা নিয়েও বেশ বিতর্ক রয়েছে।

পবিত্র কুরআনে মি’রাজ সম্পর্কিত আয়াতসমূহ নিম্নে উল্লেখ করা হলো:

مَا كَذَبَ الْفُؤَادُ مَا رَاٰىۤ۝ اَفَتُمٰرُوْنَه عَلٰى مَا يَرٰى۝ وَلَقَدْ رَاٰهُ نَزْلَةً اُخْرٰى۝ عِنْدَ سِدْرَةِ الْمُنْتَهٰى۝ عِنْدَهَا جَنَّةُ الْمَاْوٰىۤ۝ اِذْ يَغْشَى السِّدْرَةَ مَا يَغْشٰى۝ مَا زَاغَ الْبَصَرُ وَمَا طَغٰى۝ لَقَدْ رَاٰى مِنْ اٰيٰتِ رَبِّهِ الْكُبْرٰىۤ۝

“রাসূলের অন্তর মিথ্যা বলেনি যা সে দেখেছে। তোমরা কি বিষয়ে বিতর্ক করবে যা সে দেখেছে? নিশ্চয় সে তাকে আরেকবার দেখেছিল, সিদরাতুলমুন্তাহার নিকটে, যার কাছে অবস্থিত বসবাসের জান্নাত। যখন বৃক্ষটি যদ্দ্বারা আচ্ছন্ন হওয়ার, তদ্দ্বারা আচ্ছন্ন ছিল। তাঁর দৃষ্টি–বিভ্রম হয় নি এবং সীমালংঘনও করেনি। নিশ্চয় সে তার পালনকর্তার মহান নিদর্শনাবলী অবলোকন করেছে ।” (সূরা আন নজম, ৫৩:১১–১৮)

وَاِذْ قُلْنَا لَكَ اِنَّ رَبَّكَ اَحَاطَ بِالنَّاسِ وَمَا جَعَلْنَا الرُّءْيَا الَّتِىۤ اَرَيْنٰكَ اِلَّا فِتْنَةً لِّلنَّاسِ وَالشَّجَرَةَ الْمَلْعُوْنَةَ فِى الْقُرْاٰنِ وَنُخَوِّفُهُمْ فَمَا يَزِيْدُهُمْ اِلَّا طُغْيٰنًا كَبِيْرًا۝

“এবং স্মরণ করুন, আমি আপনাকে বলে দিয়েছিলাম যে, আপনার পালনকর্তা মানুষকে পরিবেষ্টন করে রেখেছেন এবং যে দৃশ্য আমি আপনাকে দেখিয়েছি তাও কুরআনে উল্লেখিত অভিশপ্ত বৃক্ষ কেবল মানুষের পরীক্ষার জন্যে। আমি তাদেরকে ভয় প্রদর্শন করি। কিন্তু এতে তাদের অবাধ্যতাই আরও বৃদ্ধি পায়।” (সূরা ইসরা, ১৭:৬০)

ঘটনা থেকে প্রাপ্ত শিক্ষা

ইসরা ও মি‘রাজ কেবল একটি অলৌকিক ভ্রমণের কাহিনি নয়; বরং এটি ঈমান, ধৈর্য, ত্যাগ এবং আল্লাহর সাহায্যের এক জীবন্ত দলিল। এ ঘটনা আমাদের শিক্ষা দেয় যে, দুঃখ-কষ্ট ও পরীক্ষার পরেই আল্লাহ তাঁর বান্দাদের জন্য সম্মান ও সফলতার দ্বার উন্মুক্ত করেন। এটি আরও স্মরণ করিয়ে দেয় যে, সালাত একজন মুমিনের জীবনের কেন্দ্রবিন্দু এবং আল্লাহর সঙ্গে তার সবচেয়ে শক্তিশালী সম্পর্কের মাধ্যম।

শিক্ষণীয় বিষয়

১. আল্লাহ তাঁর প্রিয় বান্দাদের কঠিন পরীক্ষার পর বিশেষ সাহায্য ও সম্মান দান করেন।
২. পাঁচ ওয়াক্ত সালাত হলো মি‘রাজের সর্বশ্রেষ্ঠ উপহার।
৩. আল্লাহর অসীম ক্ষমতার সামনে মানবীয় যুক্তির সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
৪. ঈমানদার ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সংবাদকে নির্দ্বিধায় বিশ্বাস করে।
৫. দুঃখ-কষ্টের পরই স্বস্তি ও বিজয় আসে।

পৃথিবীর মানুষ যখন রাসূলুল্লাহ (সাঃ)–কে প্রত্যাখ্যান করেছিল, তখন আসমানের অধিপতি তাঁকে নিজের মহিমাময় দরবারে আহ্বান করেছিলেন। তাই ইসরা ওয়াল মি‘রাজ মানব ইতিহাসে আল্লাহর পক্ষ থেকে তাঁর প্রিয় রাসূলের প্রতি প্রদত্ত সর্বশ্রেষ্ঠ সম্মান ও সান্ত্বনার এক অবিস্মরণীয় নিদর্শন হয়ে আছে।

অধ্যায়সমূহ