এ অধ্যায়ের বিষয়সমূহ
Toggleআহলে-কিতাবগণের পথভ্রষ্টতা ও মতবিরোধ
পবিত্র কুরআন নাযিলের পূর্বে যেসব জাতি মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে আসমানী কিতাব লাভ করেছিল, তারা ‘আহলে–কিতাব’ নামে পরিচিত। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো হযরত মূসা (আ.)-এর অনুসারীদের প্রতি নাযিলকৃত তাওরাত, হযরত দাউদ (আ.)-এর প্রতি নাযিলকৃত যাবূর এবং হযরত ঈসা (আ.)-এর প্রতি নাযিলকৃত ইঞ্জীল। মহান আল্লাহ মানবজাতির হিদায়াতের জন্য এসব কিতাব অবতীর্ণ করেছিলেন এবং সেগুলোর মাধ্যমে মানুষকে একত্ববাদ, ন্যায়পরায়ণতা ও সৎকর্মের শিক্ষা দিয়েছিলেন।
পূর্ববর্তী আসমানী কিতাবসূহের বিকৃতি সাধন
কিন্তু সময়ের প্রবাহে আহলে-কিতাবদের একটি বড় অংশ তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে ব্যর্থ হয়। তারা আল্লাহর বাণী গোপন করা, বিকৃত ব্যাখ্যা প্রদান করা এবং নিজেদের প্রবৃত্তি ও পার্থিব স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়ার মাধ্যমে সত্য পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়ে।
এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন:
“অতএব, ধ্বংস তাদের জন্য, যারা নিজ হাতে কিতাব লিখে, তারপর বলে, ‘এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে’, যাতে এর বিনিময়ে সামান্য মূল্য লাভ করতে পারে।” (সূরা বাক্বারাহ, ২:৭৯)
তিনি আরও বলেন:
“তাদের মধ্যে একদল আছে যারা কিতাব পাঠের সময় নিজেদের জিহ্বা বক্র করে, যাতে তোমরা মনে করো তা কিতাবের অংশ; অথচ তা কিতাবের অংশ নয়।” (সূরা আলে ইমরান ৩:৭৮)
আসমানী কিতাবসমূহ যথাযথভাবে সংরক্ষিত না থাকার ফলে এবং মানুষের হস্তক্ষেপের কারণে তাদের মধ্যে নানাবিধ মতভেদ, বিভ্রান্তি ও দলাদলির সৃষ্টি হয়।
পবিত্র কুরআনে এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ তায়ালা ঘোষণা করেন:
“মানুষ ছিল এক জাতি; অতঃপর আল্লাহ নবীগণকে সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী হিসেবে প্রেরণ করেন এবং তাদের সঙ্গে সত্যসহ কিতাব নাযিল করেন, যাতে তারা মানুষের মধ্যে তাদের মতবিরোধের মীমাংসা করেন। আর যাদেরকে কিতাব দেওয়া হয়েছিল, তাদের কাছেই সুস্পষ্ট নিদর্শন পৌঁছার পর পারস্পরিক বিদ্বেষবশত তারাই এতে মতভেদ সৃষ্টি করে।” (সূরা বাক্বারাহ ২:২১৩)
তদুপরি, পূর্ববর্তী আসমানী কিতাবসমূহে সর্বশেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর আগমনের সুসংবাদ ও তাঁর পরিচয় উল্লেখ ছিল। কিন্তু আহলে–কিতাবদের অনেকেই তা জেনেও গোপন করেছিল।
মহান আল্লাহ বলেন:
“যাদেরকে আমি কিতাব দিয়েছি, তারা তাঁকে (মুহাম্মদকে) এমনভাবে চেনে যেমন তারা নিজেদের সন্তানদের চেনে। কিন্তু তাদের একটি দল জেনেশুনে সত্য গোপন করে।” (সূরা বাক্বারাহ ২:১৪৬)
অন্যত্র আল্লাহ তাআলা বলেন:
“যারা আমার নাযিলকৃত সুস্পষ্ট নিদর্শন ও হিদায়াত গোপন করে, মানুষের জন্য কিতাবে তা স্পষ্টভাবে বর্ণনা করার পরও, তাদের ওপর আল্লাহ লানত করেন এবং লানতকারীরাও তাদের ওপর লানত করে।” (সূরা বাক্বারাহ, ২:১৫৯)
এভাবে আহলে–কিতাবদের একাংশ আল্লাহর কিতাবের প্রকৃত শিক্ষা থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়েছিল এবং নিজেদের মধ্যে বিভেদ ও মতবিরোধে লিপ্ত হয়েছিল। তাই মানবজাতিকে পুনরায় সত্য ও নির্ভুল হিদায়াত প্রদানের জন্য মহান আল্লাহ সর্বশেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ওপর পবিত্র কুরআন নাযিল করেন, যা কিয়ামত পর্যন্ত অবিকৃত ও সংরক্ষিত থাকবে এবং সমগ্র মানবজাতির জন্য চূড়ান্ত পথনির্দেশনা হিসেবে বিদ্যমান থাকবে (সূরা আল–হিজর ১৫:৯)।
এ সম্পর্কে আহলে–কিতাব বনী–ইসরাঈলদেরকে লক্ষ্য করে মহান আল্লাহ্ বলেন:
“আর তোমরা সে গ্রন্থের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন কর, যা আমি অবতীর্ণ করেছি সত্যবক্তা হিসেবে তোমাদের কাছে। বস্তুত তোমরা তার প্রাথমিক অস্বীকারকারী হয়ো না আর আমার আয়াতের অল্প মূল্য দিও না। এবং আমার (আযাব) থেকে বাঁচ। তোমরা সত্যকে মিথ্যার সাথে মিশিয়ে দিও না এবং জানা সত্ত্বেও সত্যকে তোমরা গোপন করো না।” (সূরা বাক্বারাহ, ২:৪১–৪২)
মহান আল্লাহ তায়ালা তাঁর সর্বশেষ নবী ও রসূল হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর উপর নাযিলকৃত সর্বশেষ গ্রন্থ পবিত্র কুরআনকে স্বয়ং সংরক্ষণ করেছেন এবং একে সব ধরনের বিকৃতি থেকে মুক্ত রেখেছেন। এ পবিত্র কুরআনে তিনি আহলে–কিতাবগণের সকল মতভেদ ও বিভ্রান্তির জবাব দিয়েছেন। হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) যে সর্বশেষ নবী ও রসূল হিসেবে নাযিল হবেন তা পূর্ববর্তী তৌরাত ও ইঞ্জিল কিতাবে বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু তারা মহান আল্লাহ্ প্রদত্ত এ খবরটি ইচ্ছাকৃতভাবে চেপে গেছে।
এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ্ বলেন:
“আমি আপনার প্রতি এ জন্যেই গ্রন্থ নাযিল করেছি, যাতে আপনি সরল পথ প্রদর্শনের জন্যে তাদেরকে পরিষ্কার বর্ণনা করে দেন, যে বিষয়ে তারা মতবিরোধ করছে এবং মু’মিনদের জন্য তা পথনির্দেশ ও দয়াস্বরূপ।” (সূরা নহল, ১৬:৬৪)
পবিত্র কুরআনের নিখুঁত সংরক্ষণ পদ্ধতি ও পূর্ববর্তী কিতাবসমূহের সাথে এর পার্থক্য
পূর্ববর্তী কিতাবসমূহের বিকৃতি
মানবজাতির হিদায়াতের জন্য মহান আল্লাহ যুগে যুগে বহু নবী–রাসূল প্রেরণ করেছেন এবং তাঁদের ওপর আসমানী কিতাব নাযিল করেছেন। কিন্তু পূর্ববর্তী কিতাবসমূহ নির্দিষ্ট জাতি ও নির্দিষ্ট সময়ের জন্য প্রেরিত হয়েছিল। সেগুলোর সংরক্ষণের দায়িত্ব মূলত সংশ্লিষ্ট সম্প্রদায়ের ওপর ন্যস্ত ছিল। তারা সেই দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে ব্যর্থ হওয়ায় কালের প্রবাহে বিভিন্ন পরিবর্তন, সংযোজন-বিয়োজন ও ভুল ব্যাখ্যার অনুপ্রবেশ ঘটে। ফলে মূল শিক্ষার অনেকাংশ মানুষের কাছে অস্পষ্ট হয়ে পড়ে।
পবিত্র কুরআন এ প্রসঙ্গে ইহুদীদের সম্পর্কে বলে:
“নিশ্চয়ই আমি তাওরাত নাযিল করেছিলাম, যাতে ছিল হিদায়াত ও আলো। … আল্লাহর কিতাব রক্ষার যে দায়িত্ব তাদেরকে দেওয়া হয়েছিল, তারা তার রক্ষণাবেক্ষণ করত।” (সূরা আল–মায়িদাহ ৫:৪৪)
কিন্তু পরবর্তীকালে তাদের একাংশ আল্লাহর বাণী পরিবর্তন ও বিকৃত করতে শুরু করে।
এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ বলেন:
“তাদের মধ্যে একদল আল্লাহর বাণী শুনত, তারপর তা বুঝে নেওয়ার পর জেনেশুনে বিকৃত করে দিত।” (সূরা আল-বাকারাহ, ২:৭৫)
অন্যত্র তিনি বলেন:
“তারা শব্দগুলোকে তাদের যথাস্থান থেকে পরিবর্তন করে দেয়।” (সূরা আন–নিসা, ৪:৪৬)
পবিত্র কুরআন চূড়ান্ত ও সর্বজনীন জীবনবিধান
অপরদিকে, পবিত্র কুরআন সমগ্র মানবজাতির জন্য কিয়ামত পর্যন্ত চূড়ান্ত ও সর্বজনীন জীবনবিধান হিসেবে নাযিল হয়েছে। তাই এর সংরক্ষণের দায়িত্ব মহান আল্লাহ নিজেই গ্রহণ করেছেন। তিনি ঘোষণা করেন:
“নিশ্চয়ই আমিই এ উপদেশ (কুরআন) নাযিল করেছি এবং আমিই এর সংরক্ষক।” (সূরা আল–হিজর ১৫:৯)
এটি কুরআনের একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য। পৃথিবীর অন্য কোনো ধর্মগ্রন্থ সম্পর্কে এমন সুস্পষ্ট ঐশী নিশ্চয়তা পাওয়া যায় না।
- কুরআন নাযিলের সময় থেকেই লক্ষাধিক সাহাবি তা মুখস্থ করেছেন, লিখে সংরক্ষণ করেছেন এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে অবিকৃতভাবে পৌঁছে দিয়েছেন।
- ফলে চৌদ্দশত বছরেরও অধিক সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পরও এর একটি বর্ণ, একটি শব্দ কিংবা একটি আয়াতও পরিবর্তিত হয়নি।
- পবিত্র কুরআন পূর্ববর্তী আসমানী কিতাবসমূহের অবিকৃত অংশের সত্যতা স্বীকার করে এবং তাদের মীমাংসাকারী ও সত্য–মিথ্যার মানদণ্ড হিসেবে অবতীর্ণ হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ বলেন:
“আমি আপনার প্রতি সত্যসহ কিতাব নাযিল করেছি, যা তার পূর্ববর্তী কিতাবসমূহের সত্যায়নকারী এবং সেগুলোর ওপর তত্ত্বাবধায়ক (মুহাইমিন)।” (সূরা আল–মায়িদাহ, ৫:৪৮)
কুরআন শুধু একটি ধর্মগ্রন্থ নয়; এটি মানবজীবনের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা, নৈতিক বিধান, আধ্যাত্মিক দিকনির্দেশনা এবং মুক্তির সনদ। মহান আল্লাহ ঘোষণা করেন:
“নিশ্চয়ই এই কুরআন এমন পথ প্রদর্শন করে যা সর্বাধিক সরল ও সুদৃঢ়।” (সূরা আল–ইসরা, ১৭:৯)
আরও বলেন:
“রমযান মাস, যাতে কুরআন নাযিল করা হয়েছে; যা মানুষের জন্য হিদায়াত এবং সৎপথের সুস্পষ্ট নিদর্শন ও সত্য–মিথ্যার পার্থক্যকারী।” (সূরা বাক্বারাহ, ২:১৮৫)
অতএব, পূর্ববর্তী কিতাবসমূহের অনুসারীদের মধ্যে যে মতভেদ, বিভ্রান্তি ও বিকৃতির সৃষ্টি হয়েছিল, তার অবসান ঘটিয়ে:
- পবিত্র কুরআন মানবজাতিকে এক চূড়ান্ত ও নির্ভুলভাবে সংরক্ষিত জীবনবিধান প্রদান করেছে।
- এ কারণেই কুরআন কিয়ামত পর্যন্ত সমগ্র মানবজাতির জন্য হিদায়াত, কল্যাণ ও মুক্তির একমাত্র নির্ভরযোগ্য ঐশী গ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত।
ধর্মীয় বিভেদ ও বিরোধ নিরসনে নবীজী (সাঃ) এর আহ্বান
পবিত্র কুরআন ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি, অনৈক্য ও মতবিরোধকে নিরুৎসাহিত করে বিভিন্ন বিষয়ে বিভ্রান্তি ও মতবিরোধের যৌক্তিক জবাব প্রদান করেছে এবং মানুষের মধ্যে ঐক্য, শান্তি ও সম্প্রীতির আহ্বান জানিয়েছে। ধর্মীয় মতভেদ ছাড়াও বিভিন্ন স্বার্থ–সংশ্লিষ্ট কারণে মানুষের মধ্যে যে পারস্পরিক হানাহানি, অশান্তি ও ফেতনা–ফ্যাসাদের উদ্ভব ঘটেছে পবিত্র কুরআনের আলোকে তার ন্যায়সঙ্গত সমাধান অতীব জরুরী। এ পরিস্থিতিতে মহান আল্লাহ্ তাঁর নবী (সাঃ)-কে নির্দেশ দিলেন:
“সুতরাং আপনি এর প্রতিই দাওয়াত দিন এবং (আমার) হুকুম অনুযায়ী অবিচল থাকুন; আপনি তাদের খেয়ালখুশীর অনুসরণ করবেন না। বলুন, আল্লাহ যে কিতাব নাযিল করেছেন, আমি তাতে বিশ্বাস স্থাপন করেছি। আমি তোমাদের মধ্যে ন্যায় বিচার করতে আদিষ্ট হয়েছি। আল্লাহ আমাদের পালনকর্তা ও তোমাদের পালনকর্তা। আমাদের জন্যে আমাদের কর্ম এবং তোমাদের জন্যে তোমাদের কর্ম। আমাদের মধ্যে ও তোমাদের মধ্যে বিবাদ নেই। আল্লাহ আমাদেরকে সমবেত করবেন এবং তাঁরই দিকে প্রত্যাবর্তন হবে।” (৪২:১৫)
পবিত্র কুরআনের ভাষ্য মতে মানবজাতি প্রথমে একই উম্মতভুক্ত ছিল। পৃথিবী ব্যাপী বিভিন্ন ধর্ম, জাতিগোষ্ঠী, ভাষা, সংস্কৃতি ও অঞ্চলের মানুষ একই স্রষ্টা আল্লাহর সৃষ্টি। কিন্তু
- পরে তারা পথভ্রষ্ট হয়ে পৃথক হয়ে গেছে। (১০:১৯)।
- তারা তাদের নবী–রসূলগণের প্রদর্শিত পথ থেকেও বিচ্যুত হয়ে নিজেদের মধ্যে বহু মতবিরোধ, কুসংস্কার ও অনৈক্যের সৃষ্টি করেছে।
- পারস্পরিক মতভেদ, হানাহানি ও হিংসা–বিদ্বেষ মানবতাকে ভূলুণ্ঠিত করেছে ও মানব ঐক্য বিনষ্ট করেছে।
নবী করীম (সা) ধর্মীয় মতভেদ নিয়ে বাড়াবাড়ি করা থেকে নিষেধ করে বলেন,
‘মতভেদ করোনা। তোমাদের পূর্বে যারা মতভেদ করেছিল, তারা ধ্বংস হয়ে গেছে।’ (সহীহ বুখারী)।
- তিনি বিভিন্ন বিষয়ে কুরআনের আলোকে বিভ্রান্তি ও মতবিরোধের যৌক্তিক জবাব প্রদান করেছেন।
- মানুষের মধ্যে ঐক্য, শান্তি ও সম্প্রীতির আহ্বান জানিয়েছেন।
- ধর্মীয় মতভেদ ছাড়াও বিভিন্ন স্বার্থ–সংশ্লিষ্ট কারণে মানুষের মধ্যে যে পারস্পরিক হানাহানি, অশান্তি ও ফেতনা–ফ্যাসাদের উদ্ভব ঘটেছে তার যৌক্তিক মীমাংসায় কুরআনের আলোকে একটি ন্যুনতম বিষয়ে মানব ঐক্যের আহ্বান জানিয়েছেন।
এ প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআনের নিম্নোক্ত আয়াতসমূহ প্রণিধানযোগ্য:
- “সকল মানুষ একই জাতি সত্তার অন্তর্ভুক্ত ছিল। অতঃপর আল্লাহ তায়ালা পয়গম্বর পাঠালেন সুসংবাদদাতা ও ভীতি প্রদর্শনকরী হিসাবে। আর তাঁদের সাথে অবতীর্ণ করলেন সত্য কিতাব, যাতে মানুষের মাঝে বিতর্কমূলক বিষয়ে মীমাংসা করতে পারেন। বস্তুত কিতাবের ব্যাপারে অন্য কেউ মতভেদ করেনি; কিন্তু পরিষ্কার নির্দেশ এসে যাবার পর নিজেদের পারস্পরিক জেদবশত তারাই করেছে, যারা কিতাব প্রাপ্ত হয়েছিল। অতঃপর আল্লাহ ঈমানদারদেরকে হেদায়েত করেছেন সেই সত্য বিষয়ে, যে ব্যাপারে তারা মতভেদ লিপ্ত হয়েছিল। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা, সরল পথ বাতলে দেন।” (সূরা বাক্বারাহ, ২:২১৩)
- “হে মানব সমাজ, আমি তোমাদেরকে একজন পুরুষ ও একজন নারী থেকে সৃষ্টি করেছি এবং তোমাদেরকে বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি, যাতে তোমরা পরস্পরের সাথে পরিচিতি হতে পার। নিশ্চয় আল্লাহর কাছে সে–ই সর্বাধিক সম্ভ্রান্ত যে সর্বাধিক সৎকর্মশীল। নিশ্চয় আল্লাহ্ সর্বজ্ঞ, সবকিছুর খবর রাখেন।” (সূরা হুজুরাত, ৪৯:১৩)
- “ইহুদীরা বলে, খৃস্টানরা কোন ভিত্তির উপরেই নয় এবং খ্রীস্টানরা বলে, ইহুদীরা কোন ভিত্তির উপরেই নয়। অথচ ওরা সবাই কিতাব পাঠ করে! এমনিভাবে যারা মূর্খ, তারাও ওদের মতই উক্তি করে। অতএব, আল্লাহ কেয়ামতের দিন তাদের মধ্যে ফয়সালা দেবেন, যে বিষয়ে তারা মতবিরোধ করছিল।” (সূরা বাক্বারাহ, ২:১১৩)
- “(হে নবী,) আমি আপনার প্রতি অবতীর্ণ করেছি সত্যগ্রন্থ, যা পূর্ববতী গ্রন্থ সমূহের সত্যায়নকারী এবং সেগুলোর বিষয়বস্তুর রক্ষণাবেক্ষণকারী। অতএব, আপনি তাদের পারস্পারিক ব্যাপারাদিতে আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন, তদনুযায়ী ফয়সালা করুন এবং আপনার কাছে যে সৎপথ এসেছে, তা ছেড়ে তাদের প্রবৃত্তির অনুসরণ করবেন না। আমি তোমাদের প্রত্যেককে একটি আইন ও পথ দিয়েছি। যদি আল্লাহ চাইতেন, তবে তোমাদের সবাইকে এক উম্মত করে দিতেন, কিন্তু এরূপ করেননি –যাতে তোমাদেরকে যে ধর্ম দিয়েছেন, তাতে তোমাদের পরীক্ষা নেন। অতএব, দৌড়ে কল্যাণকর বিষয়াদি অর্জন কর। তোমাদের সবাইকে আল্লাহর কাছে প্রত্যাবর্তন করতে হবে। অতঃপর তিনি অবহিত করবেন সে বিষয়, যাতে তোমরা মতবিরোধ করতে।” (সূরা মায়েদাহ, ৫:৪৮)
- “(হে নবী) বলুন: হে আহলে–কিতাবগণ, তোমরা স্বীয় ধর্মে অন্যায় বাড়াবাড়ি করো না এবং এতে ঐ সম্প্রদায়ের প্রবৃত্তির অনুসরণ করো না, যারা পূর্বে পথভ্রষ্ট হয়েছে এবং অনেককে পথভ্রষ্ট করেছে। তারা সরল পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়েছে।” (সূরা মায়েদাহ, ৫:৭৭)
সকল দ্বীনের মৌলিক বিষয় এক
দ্বীনের মৌলিক বিষয়ের ক্ষেত্রে আল্লাহ সব নবী ও রসূলগণের উম্মতের জন্য একই পথ নির্ধারণ করেছিলেন, যদিও যুগের প্রয়োজনে তাদের শরীয়তের মধ্যে কিছুটা ভিন্নতা ছিল। কিন্তু মানবজাতি তাদের নবী–রসূলগণের প্রদর্শিত পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে নিজেদের মধ্যে বহু মতবিরোধ, কুসংস্কার ও অনৈক্যের সৃষ্টি করেছে।
পৃথিবী ব্যাপী বিভিন্ন ধর্ম, জাতিগোষ্ঠী, ভাষা, সংস্কৃতি ও অঞ্চলের মানুষ একই স্রষ্টা আল্লাহর সৃষ্টি। সুতরাং পারস্পরিক মতভেদ, হানাহানি ও হিংসা-–বিদ্বেষ দ্বারা মানবতাকে ভূলুণ্ঠিত করা ও মানব ঐক্য বিনষ্ট করা মোটেই সমীচিন নয়।
এ সম্পর্কে আল্লাহ্ তায়ালা বলেন,
- “আমি প্রত্যেক উম্মতের জন্যে এবাদতের একটি নিয়ম–কানুন নির্ধারণ করে দিয়েছি, যা তারা পালন করে। অতএব তারা যেন এ ব্যাপারে আপনার সাথে বিতর্ক না করে। আপনি তাদেরকে পালনকর্তার দিকে আহ্বান করুন। নিশ্চয় আপনি সরল পথেই আছেন। তারা যদি আপনার সাথে বিতর্ক করে, তবে বলে দিন, তোমরা যা কর, সে সর্ম্পকে আল্লাহ অধিক জ্ঞাত। তোমরা যে বিষয়ে মতবিরোধ করছ, আল্লাহ কিয়ামতের দিন সেই বিষয়ে তোমাদের মধ্যে ফায়সালা করবেন।” (সূরা হবজ্জ্ব, ২২:৬৭–৬৯)
- “তিনি তোমাদের জন্যে দ্বীনের ক্ষেত্রে সে পথই নির্ধারিত করেছেন, যার আদেশ দিয়েছিলেন নূহকে, যা আমি প্রত্যাদেশ করেছি আপনার প্রতি এবং যার আদেশ দিয়েছিলাম ইব্রাহীম, মূসা ও ঈসাকে এই মর্মে যে, তোমরা দ্বীনকে প্রতিষ্ঠিত কর এবং তাতে অনৈক্য সৃষ্টি করো না……. ।” (সূরা আশ–শুরা, ৪২:১৩)
সর্বশক্তিমান আল্লাহ্ মনোনীত সকল দ্বীনের মৌলিক বিষয় ছিল একই। সব দ্বীনের মূল কথা ছিল ”তাওহীদ” অর্থাৎ আল্লাহ্ এক ও অদ্বিতীয় – এই মতবাদ। তিনি ছাড়া অন্য কোন উপাস্য নেই। একদিন সবাইকে তাঁর কাছে ফিরে যেতে হবে। পবিত্র কুরআনের ভাষায়:
“তিনি কাউকে জন্ম দেননি এবং কেউ তাকে জন্ম দেয়নি এবং তার সমতুল্য কেউ নেই।” (সূরা ইখলাস, ১১২:৩–৪)।
মানুষের কাছে তাওহীদের এই বাণী পৌঁছে দেওয়ার জন্য আল্লাহ্ রব্বুল আলামীন যুগে যুগে সকল জাতির কাছে তাঁর নবী ও রসূল প্রেরণ করেছেন। তিনি সব নবী ও রাসূলের উম্মতের জন্য একই দ্বীন বা পথ নির্ধারণ করেছেন, যদিও যুগের প্রয়োজনে তাদের শরীয়তের মধ্যে কিছুটা ভিন্নতা ছিল।
পবিত্র কুরআনের নিম্নোক্ত আয়াতসমূহে এ বিষয়টিই সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে:
- “তাঁরা (নবী ও রসূলগণ) সকলেই তোমাদের ধর্মের; একই ধর্মে তো বিশ্বাসী সবাই এবং আমিই তোমাদের পালনকর্তা, অতএব আমার বন্দেগী কর। এবং মানুষ তাদের কার্যকলাপ দ্বারা পারস্পরিক বিষয়ে বিভেদ সৃষ্টি করেছে। প্রত্যেকেই আমার কাছে প্রত্যাবর্তিত হবে। অতঃপর যে বিশ্বাসী অবস্থায় সৎকর্ম সম্পাদন করে, তার প্রচেষ্টা অস্বীকৃত হবে না এবং আমি তা লিপিবদ্ধ করে রাখি।” (সূরা আম্বিয়া, ২১:৯২–৯৪)
- “আর সমস্ত মানুষ একই উম্মতভুক্ত ছিল, পরে পৃথক হয়ে গেছে। আর একটি কথা যদি তোমার পরওয়ারদেগারের পক্ষ থেকে পূর্ব নির্ধারিত না হয়ে যেত; তবে তারা যে বিষয়ে বিরোধ করছে তার মীমাংসা হয়ে যেত।” (সূরা ইউনূস, ১০:১৯)
আহলে–কিতাবগণকে একত্ববাদের দিকে আহ্বান
আল্লাহ্ তায়ালার দ্বীনের মৌলিক বিষয় হলো তৌহীদ বা একত্ববাদ। আহলে–কিতাবগণ আল্লাহর একত্ববাদ থেকে দূরে সরে গিয়ে পথভ্রষ্ট হয়ে পড়েছিল। মহান আল্লাহর নির্দেশক্রমে নবী করীম (সাঃ) আহলে–কিতাবগণকে একত্ববাদের প্রতি আহ্বান জানালেন যাতে তারা এর উপর পুনপ্রতিষ্ঠিত হতে পারে।
মহান আল্লাহ্ তাঁর নবীকে বললেন,
- “(হে নবী) বলুন: ‘হে আহলে–কিতাবগণ! একটি বিষয়ের দিকে আস– যা আমাদের মধ্যে ও তোমাদের মধ্যে সমান– যে, আমরা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও ইবাদত করব না, তাঁর সাথে কোন শরীক সাব্যস্ত করব না এবং একমাত্র আল্লাহকে ছাড়া কাউকে পালনকর্তা বানাব না। তারপর যদি তারা স্বীকার না করে, তাহলে বলে দিন যে, ‘সাক্ষী থাক আমরা তো অনুগত।” (সূরা আলে ইমরান, ৩:৬৪)
- “বলে দিন: এই আমার পথ। আমি দাওয়াত দেই আল্লাহর দিকে সজ্ঞানে বুঝে–সুঝে – আমি এবং আমার অনুসারীগণও। আল্লাহ্ পবিত্র। আমি অংশীবাদীদের অন্তর্ভুক্ত নই।” (সূরা ইউছুফ, ১২:১০৮)
মুবাহালার প্রস্তাব
নবী করীম (সাঃ) এর উপরোক্ত আহ্বানের পরও যখন বিতর্কের অবসান ঘটলো না এবং ইসলাম ধর্মের প্রতি তাদের অনীহা থেকেই গেলো তখন আল্লাহর নির্দেশ মোতাবেক নবী করীম (সাঃ) ইহুদী–খৃস্টানদের প্রতি পবিত্র কুরআনের আয়াত উল্লেখ করে মুবাহালার প্রস্তাব পেশ করেন।
পবিত্র কুরআনের এতদ্সংক্রান্ত নির্দেশটি হলো:
“অতঃপর তোমার নিকট সত্য সংবাদ এসে যাওয়ার পর যদি এই কাহিনী সম্পর্কে তোমার সাথে কেউ বিবাদ করে, তাহলে বল– এসো, আমরা ডেকে নেই আমাদের পুত্রদের এবং তোমাদের পুত্রদের এবং আমাদের স্ত্রীদের ও তোমাদের স্ত্রীদের এবং আমাদের নিজেদের ও তোমাদের নিজেদের আর তারপর চল আমরা সবাই মিলে প্রার্থনা করি এবং তাদের প্রতি আল্লাহর অভিসম্পাত করি যারা মিথ্যাবাদী। নিঃসন্দেহে এটাই হলো সত্য ভাষণ। আর এক আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন ইলাহ নেই। আর আল্লাহ; তিনিই হলেন পরাক্রমশালী মহাপ্রাজ্ঞ।” (সূরা অলে ইমরান, ৩:৬১–৬২)
এ প্রস্তাবে ইহুদীরা হতভম্ব হয়ে পড়লো। তারা তাদের সাথে নবীজী (সাঃ) এর সম্পাদিত মৈত্রী চুক্তির দোহাই দিয়ে কৌশলে সরে পড়লো। অপরদিকে খৃস্টানগণও এ প্রস্তাবে রাজী হওয়ার সাহস পেলো না। প্রকৃতপক্ষে পবিত্র কুরআনের যুক্তির বিপরীতে তাদের কাছে এমন কোন যুক্তি ছিল না যে তারা মোকাবিলা করতে পারে।
মদীনায় মুসলিম–ইহুদী-খৃস্টান সম্মেলন
খৃস্টান–অধ্যুষিত নাজরান থেকে মদীনায় ৬০ সদস্যের খৃস্ট–ধর্মীয় একটি প্রতিনিধি দল হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর সাথে সাক্ষাৎ করতে আসে। মদীনায় মুসলমানদের প্রভাব বলয় বৃদ্ধি পাওয়ায় ইহুদীগণ ঈর্ষান্বিত বোধ করছিল। ইহুদী–মুসলিম মানসিক দ্বন্দের জেরে খৃস্টান পাদ্রীগণ মনে করলো ইয়াসরিব ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে খৃস্টান ধর্মের প্রভাব বিস্তারে এটাই মোক্ষম সময়। ইসলামকে প্রতিপক্ষ হিসেবে গণ্য করে তারা ইহুদীদেরকে সাথে নিয়ে একটি ত্রিপক্ষীয় ধর্মীয় সম্মেলনের আয়োজন করে।
এ সম্মেলনে ইসলামের বিশুদ্ধ একত্ববাদের বিপরীতে খৃস্টান ও ইহুদী মতবাদের বিভিন্ন দিক আলোচিত হয়। খৃস্টনদের ত্রিত্ববাদ দ্বারা হযরত মরিয়ম–পুত্র হযরত ঈসা (আঃ)-কে আল্লাহর পুত্র এবং ইহুদীদের হযরত উযায়ের (আঃ)-কে আল্লাহর পুত্র সাব্যস্তকরণ বিষয়ক বিতর্ক তুঙ্গে উঠে। অন্যান্য নবী বিশেষ করে হযরত ইব্রাহীম (আঃ) এর প্রসঙ্গও এ বিতর্কে উঠে আসে। নবী করীম (সাঃ) পবিত্র কুরআনের আলোকে এসব বিতর্কের জবাব দেন।
এসব বিতর্কের জবাবে পবিত্র কুরআনের ভাষ্য হলো:
- ”নিঃসন্দেহে আল্লাহর নিকট ঈসার দৃষ্টান্ত হচ্ছে আদমেরই মতো। তাকে মাটি দিয়ে তৈরী করেছিলেন এবং তারপর তাকে বলেছিলেন হয়ে যাও, সঙ্গে সঙ্গে হয়ে গেলেন।” (সূরা আলে ইমরান, ৩:৫৯)
- ”ইহুদীরা বলে, ‘ওযাইর আল্লাহর পুত্র’ এবং নাসারারা বলে, ‘মসীহ আল্লাহর পুত্র’। এ হচ্ছে তাদের মুখের কথা। এরা পূর্ববর্তী কাফেরদের মত কথা বলে। আল্লাহ এদের ধ্বংস করুন, এরা কোন উল্টা পথে চলে যাচ্ছে। তারা তাদের পন্ডিত ও সংসার–বিরাগীদিগকে তাদের পালনকর্তারূপে গ্রহণ করেছে আল্লাহ ব্যতীত এবং মরিয়মের পুত্রকেও। অথচ তারা আদিষ্ট ছিল একমাত্র মাবুদের এবাদতের জন্য। তিনি ছাড়া কোন মাবুদ নেই, তারা তাঁর শরীক সাব্যস্ত করে, তার থেকে তিনি পবিত্র।” (সূরা তাওবা, ৯:৩০–৩১)
এরপর নবী করীম (সাঃ) পূর্ববর্তী অন্যান্য নবীগণের বিষয়ে তাদের জিজ্ঞাসার উত্তরে পবিত্র কুরঅনের নিম্নোক্ত আয়াতগুলো উদ্ধৃত করেন:
”তোমরা বল, আমরা ঈমান এনেছি আল্লাহর উপর এবং যা অবতীর্ণ হয়েছে আমাদের প্রতি এবং যা অবতীর্ণ হয়েছে ইব্রাহীম, ইসমাঈল, ইসহাক, ইয়াকুব এবং তদীয় বংশধরের প্রতি এবং মূসা, ঈসা, অন্যান্য নবীকে পালনকর্তার পক্ষ থেকে যা দান করা হয়েছে, তৎসমুদয়ের উপর। আমরা তাদের মধ্যে পার্থক্য করি না। আমরা তাঁরই আনুগত্যকারী। অতএব তারা যদি ঈমান আনে, তোমাদের ঈমান আনার মত, তবে তারা সুপথ পাবে। আর যদি মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে তারাই হঠকারিতায় রয়েছে। সুতরাং এখন তাদের জন্যে আপনার পক্ষ থেকে আল্লাহই যথেষ্ট। তিনিই শ্রবণকারী, মহাজ্ঞানী।” (সূরা বাক্বারাহ ২:১৩৬–১৩৭)
হযরত ইব্রাহীম (আঃ) সম্পর্কিত বিতর্কের জবাবে তিনি কুরআনের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন:
”তারা বলে, তোমরা ইহুদী অথবা খ্রীষ্টান হয়ে যাও, তবেই সুপথ পাবে। আপনি বলুন, কখনই নয়; বরং আমরা ইব্রাহীমের ধর্মে আছি যাতে বক্রতা নেই। তিনি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না।” (সূরা বাক্বারাহ, ২:১৩৫)
”হে আহলে কিতাবগণ! কেন তোমরা ইব্রাহীমের বিষয়ে বাদানুবাদ কর? অথচ তওরাত ও ইঞ্জিল তাঁর পরেই নাযিল হয়েছে। শুনো! ইতিপূর্বে তোমরা যে বিষয়ে কিছু জানতে, তাই নিয়ে বিবাদ করতে। এখন আবার যে বিষয়ে তোমরা কিছুই জান না, সে বিষয়ে কেন বিবাদ করছ? ইব্রাহীম ইহুদী ছিলেন না এবং নাসারাও ছিলেন না, কিন্তু তিনি ছিলেন ‘হানীফ’ অর্থাৎ, সব মিথ্যা ধর্মের প্রতি বিমুখ এবং আত্নসমর্পণকারী, এবং তিনি মুশরিক ছিলেন না। মানুষদের মধ্যে যারা ইব্রাহীমের অনুসরণ করেছিল, তারা, আর এই নবী এবং যারা এ নবীর প্রতি ঈমান এনেছে তারা ইব্রাহীমের ঘনিষ্ঠতম – আর আল্লাহ হচ্ছেন মুমিনদের বন্ধু।“ (সূরা অলে ইমরান, ৩:৬৫–৬৮)
ইহুদীদের সাথে সম্পর্কোন্নয়নের প্রচেষ্টা
মদীনায় হিজরতের পর নবী করীম (সাঃ) বিভিন্ন ধর্ম ও গোত্রের মানুষের মধ্যে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান, ন্যায়বিচার এবং পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে একটি আদর্শ সমাজ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। মদীনার ইহুদী সম্প্রদায়ের প্রতিও তিনি সদাচরণ ও সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপনে বিশেষ গুরুত্ব দেন। এর অন্যতম কারণ ছিল, তারা ছিল “আহলে-কিতাব”—অর্থাৎ আল্লাহপ্রদত্ত আসমানী কিতাবের অনুসারী এবং মূলত তাওহীদ বা এক আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসী একটি সম্প্রদায়।
তারা তাদের কিতাব থেকে জানতে পেরেছিল একজন নবীর আগমন অত্যাসন্ন। তাই তারা নবীজী (সাঃ)–কে তাদের মধ্যে পেতে আগ্রহী ছিল। তাঁর নবীসুলভ গুণাবলী ও অমায়িক ব্যবহার এবং ন্যায়সঙ্গত আচরণে মুগ্ধ হয়ে বেশ কিছু বিজ্ঞ ইহুদী ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। আবার কেহ কেহ তাঁর নবুওতের যথার্থতা পরীক্ষা করে ও সুস্পষ্ট প্রমাণের ভিত্তিতে নিশ্চিত হয়ে তাঁর প্রতি ঈমান আনেন।
ইহুদীরা তাদের ধর্মগ্রন্থে বর্ণিত শেষ নবীর আগমনের ভবিষ্যদ্বাণী সম্পর্কে অবগত ছিল। তারা দীর্ঘদিন ধরে সেই প্রতিশ্রুত নবীর প্রতীক্ষা করছিল। কুরআন মাজীদে আল্লাহ তাআলা বলেন:
“তাদের কাছে যখন আল্লাহর পক্ষ থেকে এমন এক কিতাব এল, যা তাদের কাছে বিদ্যমান কিতাবের সত্যায়নকারী, অথচ এর আগে তারা কাফিরদের বিরুদ্ধে বিজয়ের জন্য (এই নবীর আগমনের) অপেক্ষা করত; অতঃপর যখন তাদের নিকট সেই পরিচিত বিষয় এসে গেল, তখন তারা তা অস্বীকার করল।” (সূরা বাক্বারাহ, ২:৮৯)
মহানবী (সাঃ)-এর সত্যবাদিতা, বিশ্বস্ততা, উন্নত চরিত্র, ন্যায়পরায়ণতা এবং নবুওতের সুস্পষ্ট নিদর্শন প্রত্যক্ষ করে অনেক বিবেকবান ইহুদী সত্যকে গ্রহণ করেন। তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন প্রখ্যাত ইহুদী পণ্ডিত হযরত আবদুল্লাহ ইবন সালাম (রাঃ)। তিনি নবী করীম (সাঃ)-এর আগমনের সংবাদ পূর্ববর্তী কিতাবসমূহে অধ্যয়ন করেছিলেন এবং নবীজীর সঙ্গে সাক্ষাতের পর তাঁর নবুওতের সত্যতা উপলব্ধি করে ইসলাম গ্রহণ করেন। (সহীহ আল-বুখারী)
এছাড়াও কিছু ইহুদী আলেম নবী করীম (সাঃ)-কে বিভিন্ন প্রশ্ন করে তাঁর নবুওত পরীক্ষা করেন এবং সন্তোষজনক উত্তর ও সুস্পষ্ট প্রমাণ লাভের পর ঈমান আনেন। কুরআন তাদের সম্পর্কে বলেছে:
“যাদেরকে আমি পূর্বে কিতাব দিয়েছি, তারা এর (কুরআনের) প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে। আর যখন তাদের কাছে এটি পাঠ করা হয়, তখন তারা বলে, ‘আমরা এর প্রতি ঈমান এনেছি; নিশ্চয়ই এটি আমাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে আগত সত্য।’” (সূরা আল-কাসাস, ২৮:৫২–৫৩)
ইহুদীদের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার উদ্দেশ্যে নবী করীম (সাঃ) তাদেরকে মদীনা সনদে অন্তর্ভুক্ত করেন। এই সনদের মাধ্যমে তাদের ধর্মীয় স্বাধীনতা, জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা এবং সামাজিক ও সাংস্কৃতিক রীতি–নীতি অনুসরণের অধিকার নিশ্চিত করা হয়। তারা মদীনা রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে এবং রাষ্ট্রের শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষায় অংশগ্রহণের অঙ্গীকার করে।
তবে ইহুদী সমাজের একটি বড় অংশের মধ্যে এক ধরনের গোপন অসন্তোষ ও ঈর্ষা কাজ করছিল। তারা আশা করেছিল যে প্রতিশ্রুত শেষ নবী বনী ইসরাঈল বংশ থেকেই আবির্ভূত হবেন। কিন্তু যখন আল্লাহ তাআলা তাঁর সর্বশেষ রাসূলকে বনী ইসমাঈল বংশে প্রেরণ করলেন, তখন তাদের অনেকেই সত্যকে জেনেও তা গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানায়।
কুরআন তাদের এ মনোভাবের প্রতি ইঙ্গিত করে বলেছে:
“তারা কি মানুষের প্রতি এজন্য হিংসা করে যে, আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে দান করেছেন?” (সূরা আন–নিসা, ৪:৫৪)
অন্য আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন:
“যাদেরকে আমি কিতাব দিয়েছি, তারা তাঁকে (মুহাম্মদকে) নিজেদের সন্তানদের মতো চিনে; তবুও তাদের একটি দল জেনে-শুনে সত্য গোপন করে।” (সূরা বাক্বারাহ, ২:১৪৬)
এভাবে মহানবী (সাঃ) ইহুদীদের সঙ্গে শান্তি, ন্যায়বিচার ও পারস্পরিক সহযোগিতার সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন। কিন্তু তাদের একাংশ পার্থিব স্বার্থ, গোত্রীয় অহংকার এবং ঈর্ষার বশবর্তী হয়ে তাঁর নবুওতকে অস্বীকার করে এবং পরবর্তীকালে ইসলামের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়।
মদীনার ইহুদী গোত্রগুলোর ইসলামবিদ্বেষ, চুক্তিভঙ্গ, বিশ্বাসঘাতকতা, মক্কার কুরাইশদের সাথে আঁতাত, নবী (সাঃ)–কে হত্ষযার ষড়যন্ত্র , ইত্যাদি ঘটনা ও তার পরিণতি সম্পর্কে এই গ্রন্থের ১৮তম অধ্যায়ে বর্ণিত হয়েছে।
মুসলিম উম্মাহর নতুন ক্বিবলা নির্ধারণ
মুসলিম উম্মাহর ক্বিবলা হলো মক্কাস্থ বায়তুল্লাহ্ বা কা’বা শরীফ যেদিকে মুখমন্ডল রেখে মুসলমানগণ প্রতিদিনের নামায আদায় করেন। ক্বিবলা পরিবর্তন সংক্রান্ত আয়াত নাযিল না হওয়া পর্যন্ত জেরুযালেমস্থ বায়তুল মোকাদ্দাসই ছিল মুসলমানদের ক্বিবলা। হযরত ইব্রাহীম (আঃ) থেকে শুরু করে পরবর্তী সকল নবীর উম্মতের ক্বিবলা ছিল বায়তুল মোকাদ্দাস।
নবী করীম (সাঃ) এর মদীনায় হিজরতের পর ক্বিবলা পরিবর্তনের নির্দেশ জারী হয়। একটি একত্ববাদী ধর্ম হিসেবে ইসলামের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য প্রতিষ্ঠাকল্পে ক্বিবলার এ দিক–পরিবর্তন ঘটে। নবীজী (সাঃ) কা’বা শরীফকে ক্বিবলা হিসেবে নির্ধারণের আশায় বারবার আকাশ পানে তাকিয়ে থাকতেন। অবশেষে মহান আল্লাহর তরফ থেকে ক্বিবলা পরিবর্তনের ওহী নাযিল হয়। ক্বিবলার এ নতুন দিক নির্ধারণ ইসলামী উপাসনার ক্ষেত্রে এক প্রতীকি ও বাস্তব পরিবর্তন হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।
- ক্বিবলা পরিবর্তনের লক্ষ্য হলো কা’বা কেন্দ্রীক মুসলিম ঐক্য ও সংহতি প্রতিষ্ঠা করা।
- সর্বশক্তিমান আল্লাহর উপাসনাকল্পে সমগ্র মুসলিম উম্মাহর ক্বিবলাভিমুখী হওয়ার মাধ্যমে ইসলাম একটি সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য–সম্পন্ন একত্ববাদী ধর্ম হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে।
- কা’বা ইসলামের ইতিহাস ও আধ্যাত্মিকতার ক্ষেত্রে একটি কেন্দ্রীয় অবস্থানে অধিষ্ঠিত হয়েছে।
- মক্কা ইসলামের একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ ও পবিত্রতম নগরীর মর্যাদা লাভ করেছে।
তবে মদীনার ইহুদীগণ ক্বিবলা পরিবর্তনের বিষয়টিকে অপছন্দ করেছিল। পরবর্তী আয়াতসমূহে আল্লাহ্ তাদের এ সংক্রান্ত ধারণাগুলোকে নাকচ করে দেন।
’সূরা বাক্বারাহর’ ১৪৪ থেকে ১৫০ পর্যন্ত আয়াতসমূহে ক্বিবলা পরিবর্তনের বিষয়টি উল্লেখিত হয়েছে। তম্মধ্যে একটি আয়াত হলো:
”নিশ্চয়ই আমি আপনাকে বার বার আকাশের দিকে তাকাতে দেখি। অতএব, অবশ্যই আমি আপনাকে সে কেবলার দিকেই ঘুরিয়ে দেব যাকে আপনি পছন্দ করেন। এখন আপনি মসজিদুল–হারামের দিকে মুখ করুন এবং তোমরা যেখানেই থাক, সেদিকে মুখ কর। যারা আহলে–কিতাব, তারা অবশ্যই জানে যে, এটাই ঠিক পালনকর্তার পক্ষ থেকে। আল্লাহ বেখবর নন, সে সমস্ত কর্ম সম্পর্কে যা তারা করে।” (সূরা বাক্বারাহ, ২:১৪৪)