১৩ তম অধ্যায় : বদর যুদ্ধের পটভূমি ও ইসলামের প্রথম বিজয়

নব্য–গঠিত মদীনা রাষ্ট্রের নিরাপত্তার হুমকি

রাসূলুল্লাহ (সা) এর নবুওতি জীবনের মক্কায় অবস্থানকালীন সময়ে তিনি সার্বক্ষণিক নফসের বিরুদ্ধে জিহাদে নিয়োজিত ছিলেন। এর মাধ্যমে তিনি ও তাঁর সাহাবীগণ লাভ করেন অপরিসীম ধৈর্য, সংযম ও ঈমানী দৃঢ়তা। মক্কায় কুরাইশদের শত–সহস্র নির্যাতন ও নিপীড়নের মুখে মুসলমানগণের জীবন অতিষ্ট হয়ে পড়েছিল। ফলে তারা দেশ থেকে বহিষ্কৃত হয়ে নিজেদের ভিটামাটি ছেড়ে আবিসিনিয়া ও মদীনায় হিজরত করতে বাধ্য হয়েছিলেন।

মক্কায় তাঁরা যেভাবে কুরাইশদের দ্বারা জুলুম–নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন মদীনায়ও অনুরূপ অবস্থাই ঘটবে যদি না আত্মরক্ষামূলক কোনরূপ প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়। এ আশঙ্কাটি প্রবল হয়ে উঠছিল কারণ মদীনায় মুনাফেক ও ইহুদীরা ছিল মুসলমানদের জন্য বড় হুমকি। এদের উসকানি ও সহযোগিতায় মক্কার কুরাইশরাও শীঘ্রই একটি বড় ধরনের হুমকি সৃষ্টির সুযোগ পাবে বলে নবীজী (সাঃ) নিশ্চিত হলেন।

ত্রিমুখী ষড়যন্ত্রর মুখে প্রতিরক্ষা কর্মসূচীর প্রয়োজনীয়তা

হিজরতের পর মাদীনায় নব্য প্রতিষ্ঠিত মদীনা রাষ্ট্র এক ত্রিমুখী ষড়যন্ত্র ও আক্রমণের শিকার হলো। মক্কার কুরাইশগণ মদীনার মুনাফিক ও পার্শ্ববির্তী ইহুদীগণের সহায়তায় মুসলমানগণকে মদীনা থেকে উচ্ছেদ করার পরিকল্পনা করে। এ নাজুক পরিস্থিতিতে মুসলমানদের ধর্মীয় বিশ্বাস ও জান–মালের নিরাপত্তায় একটি সশস্ত্র প্রতিরোধ ব্যবস্থা তৈরীর প্রয়োজনীয়তা প্রবলভাবে অনুভূত হচ্ছিল।

জিহাদের অনুমতি

অব্যাহত অভ্যন্তরীন ষড়যন্ত্র ও বিশ্বাসঘাতকতা ও বহিঃশত্রুর হুমকির মুখে নবী করীম (সাঃ) যখন মুসলমানদের সুরক্ষার জন্য একটি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার  ব্যাপারে আল্লাহর নির্দেশের অপেক্ষা করছিলেন। ঠিক তখনই আল্লাহ্ তায়ালা সশস্ত্র জিহাদের অনুমতি প্রদান করে নিম্নোক্ত আয়াতসমূহ নাযিল করেন:

“যুদ্ধের অনুমতি দেয়া হল তাদেরকে যাদের সাথে কাফেররা যুদ্ধ করে; কারণ তাদের প্রতি অত্যাচার করা হয়েছে। আল্লাহ তাদেরকে সাহায্য করতে অবশ্যই সক্ষম। যাদেরকে তাদের ঘর-বাড়ী থেকে অন্যায়ভাবে বহিষ্কার করা হয়েছে শুধু এই অপরাধে যে, তারা বলে আমাদের পালনকর্তা আল্লাহ। আল্লাহ যদি মানবজাতির একদলকে অপর দল দ্বারা প্রতিহত না করতেন, তবে (খ্রীষ্টানদের) নির্জন গির্জা, ইবাদত খানা, (ইহুদীদের) উপাসনালয় এবং মসজিদসমূহ বিধ্বস্ত হয়ে যেত, যেগুলাতে আল্লাহর নাম অধিক স্মরণ করা হয়। আল্লাহ নিশ্চয়ই তাদেরকে সাহায্য করবেন, যারা আল্লাহর সাহায্য করে। নিশ্চয়ই আল্লাহ পরাক্রমশালী শক্তিধর।” (সূরা হাজ্জ্ব, ২২:৩৯–৪০)

 

টহলবাহিনী গঠন

যুদ্ধের অনুমতি পেয়ে রসূলুল্লাহ্ (সাঃ) একটি সশস্ত্র টহলবাহিনী গঠন করেন এবং আব্দুল্লাহ্ ইবনে জাহশ (রাঃ) এর নেতৃত্বে নাখলায় এ দলটিএক প্রেরণ করলেন। উদ্দেশ্য ছিল যাতে তারা একটি কুরাইশ কাফেলার ব্যাপারে খোঁজখবর নিতে পারেন।

পথিমধ্যে টহলবাহিনীর দু’জন সাহাবী তাদের উট হারিয়ে ফেলেন এবং তা খুঁজতে গিয়ে কুরাইশদের হাতে ধরা পড়েন। আব্দুল্লাহ্ ইবনে জাহশ (রাঃ) ও অন্যান্য সঙ্গীরা যেদিন নাখলায় পৌঁছান সেদিন ছিল রজব মাসের শেষ দিবস। তাঁরা সেখানে কুরাইশ আমর ইবনে হাযামীর নেতৃত্বে একটি শত্রু কাফেলার সন্ধান পান। আরবী পবিত্র মাস চতুষ্টয়ের একটি হলো রজব যখন লড়াই ও খুনোখুনি হারাম। এতদসত্ত্বেও নিজেদের নিরাপত্তার স্বার্থে মুসলিম বাহিনী কাফেলাটির উপর আক্রমণ চালিয়ে দলনেতাকে হত্যা ও পরাভূত করে এবং তাদের দু’জনকে বন্দী করে।

তাঁরা মদীনায় ফিরে আসলে নবী করীম (সাঃ) নিষিদ্ধ মাসে যুদ্ধে লিপ্ত হওয়ায় অসন্তুষ্ট হলেন এবং যুদ্ধলব্ধ মাল ও বন্দীকে গ্রহণ করতে অস্বীকার করলেন। কুরাইশ ও ইহুদীগণ ঘটনাটি নিয়ে মুসলমানদের বিরুদ্ধে ব্যাপক অপপ্রচার শুরু করলো। তখন আল্লাহ্ রব্বুল আলামীন এসব অপপ্রচারের উত্তরে নিম্নোক্ত আয়াতটি নাযিল করলেন:

“সম্মানিত মাস সম্পর্কে তোমার কাছে জিজ্ঞেস করে যে, তাতে যুদ্ধ করা কেমন? বলে দাও এতে যুদ্ধ করা ভীষণ বড় পাপ। আর আল্লাহর পথে প্রতিবন্দ্বকতা সৃষ্টি করা এবং কুফরী করা, মসজিদে–হারামের পথে বাধা দেয়া এবং সেখানকার অধিবাসীদেরকে বহিস্কার করা, আল্লাহর নিকট তার চেয়েও বড় পাপ। আর ধর্মের ব্যাপারে ফেতনা সৃষ্টি করা নরহত্যা অপেক্ষাও মহা পাপ। বস্তুতঃ তারা তো সর্বদাই তোমাদের সাথে যুদ্ধ করতে থাকবে, যাতে করে তোমাদিগকে দ্বীন থেকে ফিরিয়ে দিতে পারে যদি সম্ভব হয়। তোমাদের মধ্যে যারা নিজের দ্বীন থেকে ফিরে দাঁড়াবে এবং কাফের অবস্থায় মৃত্যুবরণ করবে, দুনিয়া ও আখেরাতে তাদের যাবতীয় আমল বিনষ্ট হয়ে যাবে। আর তারাই হলো দোযখবাসী। তাতে তারা চিরকাল বাস করবে।” (সূরা বাক্বারাহ, ২:২১৭)

উপরোক্ত আয়াতটি নাযিল হওয়ার পর কুরাইশরা মুসলমানদের সাথে কৃত জুলুম–নিপীড়নের সমুচিত জবাব পেলো আর বিব্রত মুসলিম সমাজে স্বস্তির ভাব ফিরে আসলো।

 

ইসলাম ধর্মে জিহাদের নীতিমালা

হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর নবুওতি জীবনের প্রথম ১৩টি বছর মক্কায় অবস্থান করেছেন। সেখানে তিনি ও তাঁর অনুসারী সংখ্যালঘু মুসলমান সম্প্রদায় কুরাইশদের শত–সহস্র নির্মম অত্যাচার–নির্যাতন, সামজিক বয়কট ও নানা ধরনের অন্যায়ের শিকার হয়ে জীবনাতিপাত করেছেন। দীর্ঘ তেরোটি বছর তাঁরা নীরবে মুখ বুঁজে সব সহ্য করেছেন। শেষ পর্যন্ত তারা নিজ জন্মভূমি থেকে নিঃস্ব, অপমানিত ও লাঞ্ছিত অবস্থায় বহিষ্কৃত হয়েছেন।

প্রথমে তারা আবিসিনিয়াস হিজরত করেন। কুরাইশরা সেখান থেকেও তাদেরকে বহিষ্কৃত করার জন্য সম্রাট নাজ্জাশীর নিকট প্রচুর উপঢৌকনসহ তাদের দূত পাঠিয়েছিল। তারপর মদীনায় হিজরতের পরও কুরাইশ ও ইহুদীদের হুমকির মুখে তাদের জীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় নিজেদের অস্তিত্ব ও ধর্মীয় স্বাধীনতা রক্ষায় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে ন্যায্য পন্থায় আল্লাহর রাহে জিহাদে অবতীর্ণ হতে মুসলমানগণ বাধ্য হয়েছেন।

ইতোমধ্যে মুসলমানরা আত্মরক্ষামূলক জিহাদের অনুমতি পেয়েছেন – তবে পবিত্র কুরআনে বর্ণিত একটি বিশেষ শর্তে – তা হলো বাড়াবাড়ি বা সীমালঙ্ঘন না করা। পবিত্র কুরআনে আল্লাহর নির্দেশ হলো:

وَقَاتِلُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ الَّذِينَ يُقَاتِلُونَكُمْ وَلَا تَعْتَدُوا ۚ إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ الْمُعْتَدِينَ۝

”আর লড়াই কর আল্লাহর ওয়াস্তে তাদের সাথে, যারা লড়াই করে তোমাদের সাথে। অবশ্য কারো প্রতি বাড়াবাড়ি করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সীমা-লঙ্ঘনকারীদেরকে পছন্দ করেন না।” (সূরা বাক্বারাহ, ২:১৯০)

উপরোক্ত আয়াতটির মধ্যেই বিধৃত রয়েছে ইসলামের জিহাদ সংক্রান্ত নীতিমালা। ইসলামে জিহাদ দু’প্রকার:

  • প্রথমটি হলো বড় জিহাদ যা মানুষের আত্মশুদ্ধি ও আধ্যাত্মিক উন্নয়নের জন্য নিজ নফসের বিরুদ্ধে জিহাদ। অর্থাৎ সব ধরনের পার্থিব লোভ–লালসা, অন্যায় ও পাপকর্ম থেকে নিজেকে মুক্ত রাখার নিরন্তর সংগ্রাম ও চেষ্টা–সাধনা। এ প্রসঙ্গে এক হাদীসে আল্লাহর রসূল (সা) বলেন, ”মুজাহিদ সেই ব্যক্তি যে সর্বশক্তিমান মহামহিম আল্লাহর আনুগত্য পালনে নিজ নফসের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে।” (তিরমিজী ও ইবনে মাজা)। ইসলামে জিহাদের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো সংযম পালন ও ধৈর্য ধারণ করা ।

  • দ্বিতীয় যে জিহাদ তা হলো ছোট জিহাদ অর্থাৎ আত্ম-রক্ষার্থে ও প্রতিপক্ষের অন্যায়, নিপীড়ন–নির্যাতন থেকে মুক্তি পাওয়ার উদ্দেশ্যে ন্যায়সঙ্গত প্রতিরোধ সংগ্রাম এবং বহিঃশত্রুর আগ্রাসন থেকে দেশ ও জাতিকে সুরক্ষা প্রদান। সমাজে ন্যায় ও শান্তি প্রতিষ্ঠার সব প্রচেষ্টা যখন ব্যর্থ হয়ে যায় তখনই এ জিহাদ অপরিহার্য হয়ে উঠে। এ জিহাদ প্রতিটি মানুষ ও জাতি–গোষ্ঠীর মৌলিক অধিকার। বস্থানকে গুরুত্ব প্রদান করে, বিরোধ মীমাংসায় পারস্পরিক আলাপ–আলোচনাকে অগ্রাধিকার দেয় ও যেকোন অশান্তিকে নিরুৎসাহিত করে।

ইসলামে ঘোষিত সশস্ত্র জিহাদের নীতিমালায় যেসব শর্ত অন্তর্ভুক্ত হয়েছে তা নিম্নরূপ:

  • ইসলামে ধর্মীয় ব্যাপারে জোরজবরদস্তি নিষিদ্ধ। ইসলাম মানুষের নিকট শান্তিপূর্ণ উপায়ে ও সর্বোত্তম ভাষায় দ্বীনের দাওয়াত পৌঁছানোর নির্দেশ দেয়।

  • জিহাদ হতে হবে ন্যায্য ও বৈধ পন্থায় আত্মরক্ষামূলক, নিরীহ মানুষের জীবন রক্ষার্থে, জুলুম–অত্যাচার প্রতিরোধকরণে ও সামজিক শান্তি প্রতিষ্ঠার স্বার্থে।

  • অন্যায় ও হুমকি মোকাবেলায় আনুপাতিক হারে শক্তি প্রয়োগ করতে হবে। যেকোন ধরনের বাড়াবাড়ি ও সীমালঙ্ঘন পরিহার করতে হবে।

  • যুদ্ধ বন্দীদের সাথে মানবিক ব্যবহার করতে হবে।

  • সন্ধিচুক্তির শর্তসমূহ যথাযথভাবে পালন করতে হবে।

  • শিশু, নারী, বৃদ্ধ, পুরোহিতসহ এমনসব নিরীহ লোকজন যারা আগ্রাসনে নিয়োজিত নয় তাদের উপর ইচ্ছাকৃতভাবে আক্রমণ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

  • ইসলামী রাষ্ট্র জনগণের নিরাপত্তার স্বার্থে জিহাদ ঘোষণা করতে পারবে।

  • বিরোধ নিরসনের সকল শান্তি প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পরই সর্বশেষ উপায় হিসেবে জিহাদ করা যাবে।

  • নির্বিচারে অত্যাচার–নির্যাতন, জান–মাল, ফসল–বৃক্ষ ও পরিবেশের ক্ষতি এবং উপাসলায় ধ্বংস সাধনকে যুদ্ধের কৌশল বানানো যাবে না।

 

অনন্যসাধারণ রণনীতি ও সন্ধিচুক্তি

নবী করীম (সাঃ) এর রণনীতি ও সন্ধিচুক্তি ছিল ন্যায্যতা ও বৈধতার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। যুদ্ধের চরম উত্তেজনাকর মূহুর্তেও শত্রুপক্ষ ও নিরস্ত্র লোকজনের সাথে তাঁর সংযমপূর্ণ আচরণ এবং যুদ্ধবন্দীদের সাথে উদার মানবিক ব্যবহার আধুনিক যুগের রণনীতি ও নীতি–নৈতিকতাকেও হার মানায়। কোন বৈষয়িক ও কায়েমী স্বার্থে, মিথ্যাচারের মাধ্যমে, ছল–চাতুরীর আশ্রয় নিয়ে, প্রতিহিংসার বশে কিংবা গণহত্যা ও বিধ্বংসী নির্মমতার দ্বারা তিনি কখনও তিনি তাঁর নীতিকে কলুষিত হতে দেননি।

আল্লাহর নবী (সাঃ) এক রক্তপাতহীন অভিযানে মক্কা বিজয় করেন। তিনি কুরাইশদের ওপর কোনরূপ প্রতিশোধ নেননি, সবাইকে তিনি ক্ষমা করে দেন। এটা বিশ্ব ইতিহাসে উদারতা, ক্ষমা ও ধৈর্য ধারণের এক অনন্য দৃষ্টান্ত।

এ প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআনের নিম্নোক্ত আয়াতগুলো প্রণিধানযোগ্য:

♣হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহর উদ্দেশে ন্যায় সাক্ষ্যদানের ব্যাপারে অবিচল থাকবে এবং কোন সম্প্রদায়ের শত্রুতার কারণে কখনও ন্যায়বিচার পরিত্যাগ করো না। সুবিচার কর — এটাই খোদাভীতির অধিক নিকটবর্তী। আল্লাহকে ভয় কর। তোমরা যা কর, নিশ্চয় আল্লাহ সে বিষয়ে খুব জ্ঞাত।” (সূরা মায়েদাহ, ৫:৮)

♣“আর যদি তারা সন্ধি করতে আগ্রহ প্রকাশ করে, তাহলে তুমিও সে দিকেই আগ্রহী হও এবং আল্লাহর উপর ভরসা কর। নিঃসন্দেহে তিনি শ্রবণকারী; পরিজ্ঞাত। পক্ষান্তরে তারা যদি তোমাকে প্রতারণা করতে চায়, তবে তোমার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট, তিনিই তোমাকে শক্তি যুগিয়েছেন স্বীয় সাহায্যে ও মুসলমানদের মাধ্যমে।” (সূরা আনফাল, ৮:৬১–৬২)

♣“আর তারা যদি বিরত থাকে, তাহলে আল্লাহ অত্যন্ত দয়ালু। আর তোমরা তাদের সাথে লড়াই কর, যে পর্যন্ত না ফেতনার অবসান হয় এবং আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠিত হয়। অতঃপর যদি তারা নিবৃত হয়ে যায় তাহলে কারো প্রতি কোন জবরদস্তি নেই, কিন্তু যারা যালিম (তাদের ব্যাপারে আলাদা)। সম্মানিত মাসই সম্মানিত মাসের বদলা। আর সম্মান রক্ষা করারও বদলা রয়েছে। বস্তুত যারা তোমাদের উপর জবরদস্তি করেছে, তোমরা তাদের উপর জবরদস্তি কর, যেমন জবরদস্তি তারা করেছে তোমাদের উপর। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং জেনে রাখ, যারা পরহেযগার, আল্লাহ তাদের সাথে রয়েছেন।” (বাক্বারাহ, ২:১৯২–১৯৪)

♣“আর মুশরেকদের কেউ যদি তোমার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করে, তবে তাকে আশ্রয় দেবে, যাতে সে আল্লাহর কালাম শুনতে পায়, অতঃপর তাকে তার নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দেবে। এটি এজন্যে যে এরা জ্ঞান রাখে না।” (৯:৬)

♣”……. অতএব, যে পর্যন্ত তারা তোমাদের জন্যে সরল থাকে, তোমরাও তাদের জন্য সরল থাক। নিঃসন্দেহের আল্লাহ সাবধানীদের পছন্দ করেন।” (৯:৭)

 

নবী করীম (সা) পরিচালিত জিহাদসমূহের বাস্তবতা

নবী করীম (সাঃ) আল্লাহর রসূল হিসেবে প্রেরিত হয়েছিলেন একটি যুদ্ধবাজ হিংস্র জাতির প্রতি। তাঁর আবির্ভাবের সময়টি ছিল নীতি–নৈতিকতাহীন এক বর্বরতার প্রতিচ্ছবি। এ সময়টি আরবদের ইতিহাসে ’আইয়ামে জাহিলিয়াত’ অর্থাৎ অন্ধকার যুগ নামে পরিচিত ছিল। রোমক ও পারসিক তৎকালীন দুটো বিশাল সভ্যতার অতি কাছাকাছি অবস্থান করেও সে সব সভ্যতার কোন প্রভাব তাদের ওপর ছিল না।

বহু গোত্রে বিভক্ত আরব জাতি ছিল মরুচারী বেদুঈন। স্বগোত্রীয় আনুগত্য ছাড়া কোন কিছুর পরোয়া করত না তারা। ফলে গোত্রে গোত্রে অনৈক্য ও হানাহানি, রেষারেষি ও কোন্দল এবং প্রতিহিংসারবশে প্রজন্ম থেকে প্রজান্মান্তর অবধি যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়াই ছিল এদের রীতি। হত্যা, লুটপাট, দস্যুবৃত্তি, মদ্যপান, জুয়াখেলা, বেশ্যাবৃত্তির মত কোন অপরাধ বা অপকর্ম বাদ ছিল না যা তারা করত না। এমন কি নিজের কন্যা সন্তানকেও জীবন্ত কবর দিতেও তাদের কোন দ্বিধাবোধ ছিল না। বেপরোয়া জীবনের অধিকারী এসব মানুষ ছিল অনেকটা হিংস্র বন্য পশুর সমতুল্য।

পৌত্তলিকতা, ভ্রান্ত বিশ্বাস, কুসংস্কার, অশ্লীলতা ও নির্লজ্জতায় আসক্ত এহেন একটি জাতিকে সুপথ প্রদর্শনের জন্য প্রেরিত হয়েছিলেন আল্লাহর নবী ও রসূল হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)। ইসলাম প্রচারের পূর্বে তিনি ছিলেন স্বজাতির কাছে ”আল–অমীন” বা বিশ্বস্ত একজন আমানতদার ব্যক্তি। নবুওত প্রাপ্তির পর যখন তিনি তাদেরকে পৌত্তলিকতা পরিহার করে শান্তির ধর্ম ইসলাম গ্রহণের আহ্বান জানালেন। রহমতের নবী অত্যন্ত বিনম্র ও প্রজ্ঞাপূর্ণ ভাষায় সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর সর্বভৌমত্ব, মহত্ত্ব ও একত্ববাদ প্রচার শুরু করলেন।

তিনি স্বজাতির লোকদেরকে এক ও অদ্বিতীয় আল্লাহর উপাসনা এবং সৎকর্মের উপদেশ দিলেন ও যাবতীয় অসৎ কর্ম পরিহার করতে বললেন। কিন্তু মক্কার কুরাইশ নেতৃবৃন্দ বাপ–দাদার পৌত্তলিক ধর্ম ও তাদের সামাজিক অন্যায় কর্মসমূহ পালন থেকে বিরত থাকতে অস্বীকার করলো। নবী করীম (সাঃ) এর নতুন ধর্ম যখন সাধারণ গরীব মানুষের মধ্যে জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করলো তখনই তারা তাঁর ও তাঁর অনুসারীগণের উপর তীব্র নির্যাতন ও নিপীড়ন চালাতে লাগলো। এমনকি তারা তাঁকে হত্যার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হলো।

প্রাণঘাতী হুমকির মুখে নবী করীম (সা) ও তাঁর সহচরবৃন্দ মাতৃভূমি মক্কা ছেড়ে মদীনায় হিজরত করতে বাধ্য হয়েছিলেন। সেখানে গিয়েও তাঁরা স্বস্তিতে ছিলেন না। মদীনায় প্রতিষ্ঠিত নব্য ইসলামী রাষ্ট্র ও মুসলিম সমাজ মক্কার কুরাইশ এবং মদীনার ইহুদী ও মুনাফিকদের দ্বারা সৃষ্ট এক ত্রিমুখী হুমকির সম্মুখীন হলো। এ নাজুক অবস্থায় আল্লাহ্ রব্বুল আলামীন তাঁর নবী (সাঃ) এর প্রতি জিহাদের নির্দেশ জারী করেন।

সত্য প্রচার ও ন্যায় প্রতিষ্ঠা এবং অন্যায়, অবিচার ও জুলুম–নির্যাতনের বিরুদ্ধে লড়াই করা অপরিহার্য হয়ে পড়েছিল। এ জিহাদ ছিল যৌক্তিক ও ন্যায়নীতির উপর প্রতিষ্ঠিত। নবী করীম (সাঃ) সর্বোচ্চ সতর্কতা, ধৈর্য্য, সংযম ও ন্যায়নীতি বজায় রেখে শত্রুর বিরুদ্ধে জিহাদ পরিচালনা করেছিলেন।

 

 বদরের যুদ্ধের পটভূমি

হিজরী দ্বিতীয় বর্ষের রমযান মাসের ১৭ তারিখে মদীনার মুসলমান ও মক্কার কুরাইশদের মধ্যে এ যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এটাই ছিল ইসলামের প্রথম যুদ্ধ। নবী করীম (সাঃ) এর হিজরতের পর থেকেই কুরাইশরা মদীনা আক্রমণের জন্য যুদ্ধ প্রস্তুতি গ্রহণ করছিল। এতুদ্দেশ্যে কুরাইশ নেতা আবু সুফিয়ান পণ্য ও যুদ্ধ সরঞ্জাম সংগ্রহ করার জন্য এক বিরাট বাণিজ্য কাফেলা নিয়ে সিরিয়া সফরে রওয়ানা দেয়।

গোয়েন্দা মারফৎ নবী করীম (সাঃ) এ খবর জানতে পেরে পথিমধ্যে কাফেলাটি আটকানোর চেষ্টা করেন, কিন্তু সময়ের হেরফেরে তা সম্ভব হয়নি। তিনি এবার কাফেলাটির বাণিজ্যসম্ভারসহ সিরিয়া থেকে ফিরে আসার সময় আটকানোর পরিকল্পনা করলেন। ফেরার পথে হাওরা নামক স্থানে পৌঁছে ধূর্ত আবু সুফিয়ান বুঝতে পারলো আশেপাশেই মুসলিম বাহিনী ওঁৎ পেতে আছে। সে ভিন্ন এক পথে কাফেলা পরিচালিত করলো।

ইতোমধ্যে মক্কায় গুজব ছড়িয়ে পড়লো আবু সুফিয়ানের কাফেলা মুসলমানদের দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে। মুহূর্তে কুরাইশ নেতা যুদ্ধংদেহী আবু জেহেলের নেতৃত্বে মক্কায় যুদ্ধান্মোদনা সৃষ্টি হলো এবং বড় বড় নেতাদের সমন্বয়ে গঠিত ও বিপুলভাবে সুসজ্জিত এক হাজার সৈন্যের একটি বাহিনী মদীনা অভিমুখে যাত্রা করলো। পথিমধ্যে তারা খবর পেলো আবু সুফিয়ানের কাফেলা মুসলমানদের আক্রমণ এড়িয়ে নিরাপদে মক্কায় পৌঁছুতে সক্ষম হয়েছে। এতে তাদের অনেকেই ফিরে আসার চিন্তা করলেও যুদ্ধবাজ নেতা আবু জেহেল জেদবশত মুসলমানদেরকে আক্রমণের উদ্দেশ্যে মদীনার নিকটবর্তী বদর নামক এক প্রান্তরে উপনীত হলো।

বদর যুদ্ধের সূচনা

অপরদিকে বিরাট কুরাইশ বাহিনীর যুদ্ধযাত্রার খবর পেয়ে নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) অস্ত্রসস্ত্র ও জনবলে দুর্বল অথচ ঈমানী বলে বলীয়ান মাত্র ৩১৩ জনের একটি ক্ষুদ্র মুসলিম বাহিনী নিয়ে সেখানে উপস্থিত হলেন। কুরাইশদের এ বিরাট বাহিনীর সাথে অসম যুদ্ধ মোকাবেলায় মুসলমানগণ সাহস হারাননি। বরং নবী করীম (সাঃ) সর্বশক্তিমান আল্লাহর তরফ থেকে ফেরেশতাবাহিনীর দ্বারা সাহায্যের প্রতিশ্রুতি পেয়ে দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ ছিলেন।

দ্বন্দ–যুদ্ধে মুসলিমদের বিজয়

আরব দেশীয় রীতি অনুযায়ী প্রথমে দ্বন্দ–যুদ্ধ শুরু হয়। দ্বন্দ যুদ্ধের প্রাক্কালে কুরাইশ আসওয়াদ মুসলমানদের পানীয় জলের কূপে অতর্কিতে হামলা করে তা বিনষ্ট করতে চায়। নবীজীর চাচা হযরত হামযা (রাঃ) তড়িৎ গতিতে তাকে প্রতিহত করেন এবং তার হাতে আসওয়াদ নিহত হয়। এরপর কুরাইশরা তাদের ৩ জন বীর যোদ্ধাকে দ্বন্দ যুদ্ধে প্রেরণ করে। এরা হলো কুরাইশ বীর শায়বা,  ওয়ালীদ ও উতবা। এর বিপরীতে মুসলমানদের পক্ষে ছিলেন হযরত হামযা (রাঃ), হযরত আলী (রাঃ) ও হযরত উবায়দা (রাঃ)। হযরত হামযা (রাঃ) হত্যা করেন শায়বাকে এবং ওয়ালীদ নিহত হয় হযরত আলী (রাঃ) এর হাতে। অন্যদিকে হযরত উবায়দা (রাঃ) তখনও কুরাইশ বীর উতবার সাথে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছিলেন। এমতাবস্থায় হযরত হামযা (রাঃ) ও হযরত আলী (রাঃ) একযোগে আক্রমণ চালিয়ে উতবাকে হত্যা করেন।

কুরাইশ বাহনীর সম্মিলিত আক্রমণ

এভাবে কুরাইশ বীরদের নিহত হওয়ার দৃশ্যে তাদের শিবিরে প্রবল উত্তেজনার সৃষ্টি হয় এবং তারা সম্মিলিতভাবে মুসলিম শিবিরের দিকে এগিয়ে আসে। এমতাবস্থায় নবী করীম (সাঃ) নিজ তাঁবুতে গিয়ে আল্লাহর দরবারে প্রতিশ্রুত সাহায্যের জন্য প্রার্থনারত হন। মহান আল্লাহ্ তাঁর প্রার্থনা কবুল করলেন এবং প্রার্থিত সাহয্য এসে গেলো।

ঈমানী বলে বলীয়ান মুসলিম বাহিনী বীরবিক্রমে শত্রুপক্ষের উপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন। বদর যুদ্ধে কুরাইশ বাহিনীর নেতা আবুজেহেলসহ তাদের ৭০ জন নিহত ও অপর ৭০ জন মুসলমানদের হাতে বন্দী হয়। অন্যদিকে এ যুদ্ধে ১৪ জন মুসলমান শহীদ হয়েছিলেন। পরাজিত ও বিপর্যস্ত কুরাইশ বাহিনী তাদের বিপুল পরিমাণ রণসম্ভার ফেলে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে দ্রুত পালিয়ে গেলো।

পবিত্র কুরআনে বর্ণিত বদর যুদ্ধ সংক্রান্ত আয়াতসমূহের উদ্ধৃতি নীচে পেশ করা হলো:

♣“নিশ্চয়ই দুটো দলের মোকাবিলার মধ্যে তোমাদের জন্য নিদর্শন ছিল। একটি দল আল্লাহর রাহে যুদ্ধ করে। আর অপর দল ছিল কাফেরদের এরা স্বচক্ষে তাদেরকে দ্বিগুণ দেখছিল। আর আল্লাহ যাকে ইচ্ছা নিজের সাহায্যের মাধ্যমে শক্তি দান করেন। এরই মধ্যে শিক্ষণীয় রয়েছে দৃষ্টি সম্পন্নদের জন্য।” (সূরা আলে ইমরান, ৩:১৩)

♣“বস্তুত আল্লাহ বদরের যুদ্ধে তোমাদের সাহায্য করেছেন, অথচ তোমরা ছিলে দুর্বল। কাজেই আল্লাহকে ভয় করতে থাক, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞ হতে পারো।” (সূরা আলে ইমরান, ৩:১২৩)

ইসলামে বদর যুদ্ধের গুরুত্ব ও প্রভাব

ইসলামের ইতিহাসে বদর যুদ্ধের গুরুত্ব অপরিসীম। বদর যুদ্ধে বিজয় লাভের ফলে মুসলমানদের সাহস ও মনোবল বৃদ্ধি পায়।  প্রাথমিক যুগের মুসলমানদের উপর এর প্রভাব ছিল বিস্তর ও বহুমুখী। এ যুদ্ধে মুসলমানদের বিজয় ঈমানী শক্তি ও স্বর্গীয় সাহায্যের এক অনবদ্য প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। এটা মুসলমানদের ধর্মীয়, রাজনৈতিক ও সামাজিক ভিত্তিকে করেছিল সুদৃঢ় এবং হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর নবুওতকে করেছিল সুপ্রতিষ্ঠিত। বদর যুদ্ধের গুরুত্ব ও প্রভাব নিম্নে আলোচিত হলো:

  • মু’মিনদের প্রতি আল্লাহর প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন: শত্রুপক্ষ মক্কার শক্তিশালী ও বিত্তবান কুরাইশদের হুমকির মুখে মদীনার সদ্য প্রতিষ্ঠিত ইসলামী রাষ্ট্রের সহায়-সম্পদহীন জনবলে দুর্বল মুসলিম জনগোষ্ঠী এক নাজুক পরিস্থিতির মধ্যে বসবাস করছিল। এমতাবস্থায় প্রবল শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিরূদ্ধে মুসলমানদের বিজয় ছিল আল্লাহর প্রতিশ্রুত সাহায্যের সুস্পষ্ট বাস্তবায়ন।

    মুসলমানদের প্রতি মহান আল্লাহর ওয়াদা সর্বক্ষেত্রে নিম্নরূপ:

“আর তোমরা নিরাশ হয়ো না এবং দুঃখ করো না। যদি তোমরা মু’মিন হও তবে, তোমরাই জয়ী হবে।” (৩:১৩৯)

  • মুসলমানদের নৈতিক শক্তির উদ্বোধন: বদর যুদ্ধে বিজয়ের মাধ্যমে মুসলমানগণ ঈমানী ও নৈতিক শক্তিতে বলীয়ান হয়ে উঠে। তাঁরা এটা উপলব্ধী করতে পারে যে, নৈতিক সাহস ও ঈমানী শক্তি অর্জনের মাধ্যমে যেকোন অপশক্তির বিরুদ্ধে বিজয় লাভ করা যায়।

  • মিথ্যার বিরুদ্ধে সত্যের অবশ্যাম্ভাবী বিজয়: পরম ধৈর্য ও আল্লাহর প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস থাকলে মিথ্যা পরাভূত হয় এবং অবশেষে সত্যের চূড়ান্ত বিজয় ঘটে –বদর যুদ্ধে বিজয় এই উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করলো।

  • ইসলামী শক্তির স্বীকৃতি: এ যুদ্ধে বিজয় লাভের মাধ্যমে ইসলাম সত্য ও ন্যায়ের ধর্ম হিসেবে আরবে স্বীকৃতি পেলো এবং একই সাথে ইসলামের রাজনৈতিক শক্তির উত্থান ঘটলো। যেকোন পরিস্থিতিতে প্রতিপক্ষকে মোকাবেলা ও দর–কষাকষির শক্তি ও সাহস অর্জন করলো।

  • মদীনার ইহুদীদের প্রতিক্রিয়া: মদীনা সনদের আওতায় ইহুদীদের সাথে মুসলমানদের মৈত্রী চুক্তি বলবৎ থাকা সত্ত্বেও মুসলিম বাহিনীর হাতে শক্তিশালী কুরাইশদের শোচনীয় পরাজয়ে তারা খুশী হতে পারেনি। তাদের নেতা কা’ব ইবনে আশরাফ পৌত্তলিক কুরাইশদের পরাজয়ে খুবই বিমর্ষবোধ করে। মুসলমানদের ঈমানী শক্তি ও ক্রমবর্ধমান প্রভাব–প্রতিপত্তি তাদের মনে বিদ্বেষভাব ও মুনাফেকির মাত্রা বাড়িয়ে দেয়।

 

যুদ্ধ পরবর্তী ঘটনাসমূহ

যুদ্ধলব্ধ মালামালের বন্টন  

ইসলামী পরিভাষায় যুদ্ধলব্ধ মালামালকে গনীমত বলা হয়। ইসলাম এসব মালকে হালাল হিসেবে গণ্য করেছে এবং এগুলোর ন্যায্য বিলিবন্টনের বিধান পবিত্র কুরআনে উল্লেখিত হয়েছে।

  • গনীমতের এক–পঞ্চমাংশ হল আল্লাহর জন্য, রাসূলের জন্য, তাঁর নিকটাত্নীয়–স্বজনের জন্য এবং এতীম–অসহায় ও মুসাফিরদের জন্য,
  • আর বাকী চার–পঞ্চমাংশ যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী ও সাহায্যকারী সবার মধ্যে সমভাবে বন্টন হবে। আল্লাহ্ প্রদত্ত এ নিয়ম অনুসারী রসূল (সাঃ) গনীমতের মাল বন্টন করেছিলেন।

এ প্রসঙ্গে  সূরা আনফালে আল্লাহ্ তায়ালা বলেন,

♣”আপনার কাছে জিজ্ঞেস করে, গনীমতের হুকুম। বলে দিন, গণীমতের মাল হল আল্লাহর এবং রসূলের। অতএব, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং নিজেদের অবস্থা সংশোধন করে নাও। আর আল্লাহ এবং তাঁর রসূলের হুকুম মান্য কর, যদি ঈমানদার হয়ে থাক।” (সূরা আনফাল, ৮:১)

♣”আর এ কথাও জেনে রাখ যে, কোন বস্তু–সামগ্রীর মধ্য থেকে যা কিছু তোমরা গনীমত হিসাবে পাবে, তার এক পঞ্চমাংশ হল আল্লাহর জন্য, রসূলের জন্য, তাঁর নিকটাত্নীয়-স্বজনের জন্য এবং এতীম–অসহায় ও মুসাফিরদের জন্য; যদি তোমাদের বিশ্বাস থাকে আল্লাহর উপর এবং সে বিষয়ের উপর যা আমি আমার বান্দার প্রতি অবতীর্ণ করেছি ফয়সালার দিনে, যেদিন সম্মুখীন হয়ে যায় উভয় সেনাদল। আর আল্লাহ সব কিছুর উপরই ক্ষমতাশীল।” (সূরা আনফাল, ৮:৪১)

♣”সুতরাং তোমরা খাও গনীমত হিসাবে তোমরা যে পরিচ্ছন্ন ও হালাল বস্তু অর্জন করেছ তা থেকে। আর আল্লাহকে ভয় করতে থাক। নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমাশীল, মেহেরবান।” (সূরা আনফাল, ৮:৬৯)

 

যুদ্ধবন্দীদের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত

বদরের যুদ্ধবন্দীদের মধ্যে দু’জন গুরুতর অপরাধী নযর ইবনে হারিছ ও উকবা ইবনে আবীকে মৃত্যুদন্ড দেওয়া হয়। তারা মক্কায় মুসলমানদের উপর নৃশংস নির্যাতন চালিয়েছিল। বাকী সব বন্দীদের ব্যাপারে দু’টি বিকল্প সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

  • প্রথমটি হলো ইসলাম ধর্ম গ্রহণের মাধ্যমে মুক্তি লাভ।
  • দ্বিতীয়টি হলো মুক্তিপণ প্রদানের মাধ্যমে মুক্তকরণ।
  • তবে যারা মুক্তিপণ প্রদানে অক্ষম তারা মদীনার দশজন নিরক্ষরকে অক্ষরজ্ঞান প্রদানের মাধ্যমে মুক্তি পাবে।

যুদ্ধবন্দীদের মধ্যে নবীজী (সাঃ) এর আপন চাচা আব্বাস ইবনে মুত্তালিবও ছিলেন। তিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে মুক্তি লাভ করেন এবং মক্কায় ফিরে আসেন। তবে কুরাইশদের নিকট তিনি তাঁর মুসলিম হওয়ার বিষয়টি গোপন রাখেন।

প্রাথমিক পর্যায়ে যুদ্ধবন্দীদের ব্যাপারে নবী করীম (সাঃ) সাহাবীগণের পরামর্শ আহ্বান করেন। এ ব্যাপারে মুসলমানদের মধ্যে দু’টি ভিন্ন মত পরিলক্ষিত হয়। সাহাবীগণের অনেকেরই ঘনিষ্ট স্বজন বন্দী হয়েছিল। তাঁরা এসব বন্দীর ব্যাপারে সহানুভূতিপরায়ণ হলেন এবং হযরত আবু বকর (রাঃ) এর নেতৃত্বে তাঁদের একটি প্রতিনিধি দল রসূল (সাঃ) এর সাক্ষাৎ করে বললেন, ‘যেহেতু বন্দীদের অনেকেই  আমাদের আত্মীয়–স্বজন সেহেতু তাদেরকে মুক্তিপণ আদায়ের মাধ্যমে ছেড়ে দেওয়া হোক। আমাদের এ উদারতায় মুগ্ধ হয়ে হয়তো তারা ইসলাম গ্রহণ করবে। এছাড়া মুক্তিপণ আদায়ের দ্বারা মুসলমানগণ তাদের আর্থিক সঙ্কট কাটাতে পারবে।’

এবার হযরত ওমর (রাঃ) তাঁর অভিমত ব্যক্ত করে বললেন, ‘যেহেতু যুদ্ধবন্দীরা আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের দুশমন এবং যেহেতু তারা আপনাকে ও মুসলমানদেরকে নির্যাতন করে জন্মভূমি থেকে বহিষ্কার করেছে ও সর্বশেষ বদর প্রান্তরে আমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে, আশঙ্কা হচ্ছে ভবিষ্যতেও তারা এমনটিই করবে, সুতরাং তাদেরকে হত্যা করাই শ্রেয় হবে।’

এ দু’টি অভিমতই যথেষ্ট যুক্তিপূর্ণ ছিল, তবে মানবতার প্রতীক দয়াল নবী (সাঃ) হযরত আবু বকর (রাঃ) এর অভিমতটি গ্রহণ করলেন। শেষ পর্যন্ত মৃত্যুদন্ডের বদলে মুক্তিপণ প্রদান করে বন্দীগণ মুক্তি পেলো।

মুক্তিপণের পরিমাণ ছিল সামর্থ্যানুযায়ী ১০০০ থেকে ৪০০০ দিরহাম। যারা বিত্তহীন ছিল তাদের কেহ কেহ বিনা মুক্তিপণে, আবার কেহ কেহ মদীনার নিরক্ষরদেরকে অক্ষরজ্ঞান দান করে মুক্তি লাভ করে।

তবে মহান আল্লাহ্ এ সিদ্ধান্তে অসন্তোষ প্রকাশ করলেও তা ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখলেন। নিম্নের আয়াতটি নাযিল করে আল্লাহ্ তাঁর নবীকে সাবধান করলেন:

”নবীর পক্ষে উচিত নয় বন্দীদিগকে নিজের কাছে রাখা, যতক্ষণ না দেশময় প্রচুর রক্তপাত ঘটাবে। তোমরা পার্থিব সম্পদ কামনা কর, অথচ আল্লাহ চান আখেরাত। আর আল্লাহ হচ্ছেন পরাক্রমশালী হেকমতওয়ালা।” (সূরা আনফাল, ৮:৬৭)

 

বন্দীদের প্রতি সদাচারণ

বন্দীকালীন অবস্থায় তাদের প্রতি মানবিক আচরণ ইসলামের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। মুসলমানগণ যুদ্ধবন্দীদের সাথে সদ্ব্যবহার করেছে এবং আর্থিক দুরাবস্থার মধ্যেও তাদেরকে উত্তম খাবার খাইয়েছে। পশ্চিমা ঐতিহাসিক ও জীবন–চরিতকারক উইলিয়াম ম্যুর তাঁর “The Life of Mahomet” গ্রন্থে বলেন:

“মুহাম্মদের নির্দেশ অনুযায়ী মদীনার নাগরিক ও মুহাজিরদের মধ্যে যাদের গৃহ ছিল তারা বন্দীদের দায়িত্ব নেন এবং তাদের সাথে সদয় আচরণ করেন। তাদের মধ্যে একজন বন্দী পরবর্তী সময়ে বলেন, ‘মদীনাবাসীর উপর আশীর্বাদ বর্ষিত হোক! তারা আমাদেরকে বাহনে চড়িয়েছে অথচ নিজেরা পায়দলে চলেছে, তারা আমাদেরকে গমের রুটি খাইয়েছে যখন তা দুষ্প্রাপ্য ছিল, অথচ নিজেরা খেজুর খেয়ে সন্তুষ্ট থেকেছে’।”

বন্দীদের সাথে মানবিক ব্যবহার প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ্ বলেন,

”তারা মান্নত পূর্ণ করে এবং সেদিনকে ভয় করে, যেদিনের অনিষ্ট হবে সুদূরপ্রসারী। তারা আল্লাহর প্রেমে অভাবগ্রস্ত, এতীম ও বন্দীকে আহার্য দান করে। তারা বলে: কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যে আমরা তোমাদেরকে আহার্য দান করি এবং তোমাদের কাছে কোন প্রতিদান ও কৃতজ্ঞতা কামনা করি না।” (সূরা আদ দাহর, ৭৬:৭–৯)

অধ্যায়সমূহ