১৬ তম অধ্যায় : খন্দক বা পরিখার যুদ্ধ

ইসলাম বিরোধী শক্তির সম্মিলিত যুদ্ধ প্রস্তুতি

বনু নজীর গোত্রের নেতা হুয়াই ইবনে আখতাব কুরাইশদেরকে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের উসকানি দিতে মক্কায় যায়। সেখানে কুরাইশদের সাথে তার সমঝোতা হয়। ব্যাপক যুদ্ধ প্রস্তুতির ব্যাপারে কুরাইশরা তাকে সমর্থন করে। এবার অন্যান্য ইহুদী গোত্রগুলোকে মুসলমানদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ করার জন্য সে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালায়। প্রতিটি গোত্রে ঘুরে ঘুরে সে প্রচারাভিযান চালায় এবং মুসলমানদের বিরুদ্ধে তাদেরকে উত্তেজিত ও অনুপ্রাণিত করতে থাকে। তার এ প্রচারাভিযান সফল হয় এবং একমাত্র মদীনা–সংলগ্ন বনু কুরায়যা ব্যতীত সকল ইহুদী গোত্রই সর্বশক্তি নিয়োগ করে মুসলমানদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ার প্রস্তুতি নিতে থাকে। এভাবে ইহুদীদের বিভিন্ন গোত্র যেমন, বনী গোফতান, বনী আসাদ, বনী সাআদ, বনী মুররাহ্, বনী সুলায়মান, বনী ফাজারাহ্, বনী আশজা, ইত্যাদি গোত্রসমূহ কুরাইশদের সাথে সম্মিলিতভাবে মদীনা আক্রমণের প্রস্তুতি গ্রহণ করে।

অপরদিকে কুরাইশরাও তাদের সবগুলো গোত্রকে ঐক্যবদ্ধ করে এবং ব্যাপক যুদ্ধ প্রস্তুতি গ্রহণ করে। কুরাইশ সেনাপতি আবু সুফিয়ান চার হাজার সৈন্যের সমাবেশ ঘটায় তাতে ছিল দেড় হাজার উট ও তিন শত অশ্বারোহী এবং বিপুল যুদ্ধাস্ত্র। অন্যসব মুশরিক গোত্রগুলোকেও তাদের সাথে একত্রিত করে।  এভাবে মুশরিক ও ইহুদীসহ সম্মিলিত দশ হাজার লোকের একটি সৈন্যবাহিনী গঠিত হয়। এ সম্মিলিত বাহিনীর প্রধান সেনাপতি নির্বাচিত হয় কুরাইশ নেতা আবু সুফিয়ান। এ বিপুল বাহিনী নিয়ে তারা মদীনার উদ্দেশ্যে যাত্রা করে।

 

খন্দক বা পরিখা যুদ্ধের ভিন্ন কৌশল পরিকল্পনা

পঞ্চম হিজরী, শাওয়াল মাস। নবীজী (সাঃ) গোয়েন্দা মারফৎ সংবাদ পেলেন আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বে কুরাইশ বাহিনী ও বনু নজীর গোত্রের নেতা হুয়াই ইবনে আখতারেবর নেতৃত্বে এক বিশাল ইহুদী বাহিনী সম্মিলিতভাবে দশ হাজার সৈন্য নিয়ে মদীনা অভিযানে বের হয়েছে। এ বিরাট শত্রুবাহিনীর মোকাবেলায় মুসলমানগণের সৈন্য সংখ্যা ছিল মাত্র তিন হাজার। তাদের অধিকাংশই রণাঙ্গণে যাওয়ার পরিবর্তে মদীনা শহর থেকেই প্রতিরোধ গড়ে তোলার চিন্তা করলেন। বিশিষ্ট সাহাবী সালমান ফার্সী (রাঃ) ভিন্ন এক রণকৌশল প্রণয়ণের পরামর্শ দিলেন। তিনি ছিলেন মূলত পারস্যবাসী এবং এ ধরনের যুদ্ধ কৌশল সেখানে প্রচলিত ছিল। তিনি নবীজী (সাঃ)-কে বললেন, ’যেহেতু মদীনার তিন দিকে পাহাড় বেষ্টিত এবং সম্মুখভাগ উম্মুক্ত, সুতরাং সম্মুখদিকে পরিখা খনন করে শত্রুর আক্রমণ প্রতিহত করা যেতে পারে।’ তাঁর এ পরামর্শ নবীজী (সাঃ) এর মনঃপুত হলো। তিনি সাহাবীদেরকে নিয়ে ছয়দিনে এ পরিখা খননের কাজ সমাপ্ত করে একটি পাহড়ের পাদদেশে শিবির স্থাপন করলেন। এ কষ্টসাধ্য খনন কাজে তিনি নিজে অংশগ্রহণ করেন। মহান আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠায় সব ধরনের কষ্ট সহ্য করার এ ছিল অনুপম দৃষ্টান্ত।

কুরাইশ বাহিনী ওহুদ পাহাড়ের পাদদেশে পৌঁছে মুসলমানদের দেখা পেলো না। তারা মদীনা অভিমুখে অগ্রসর হলো। সেখানে পৌঁছে তাদের চোখ ছানাবড়া হয়ে গেলো। তারা দেখতে পেলো এক বিরাট পরিখা তাদের অগ্রযাত্রাকে প্রতিহত করে দিয়েছে। এ অভিনব রণকৌশলে তারা কিছুটা হতভম্ব হয়ে পড়ে। পরিখা অতিক্রম করে হামলা চালানো তাদের জন্য দুরূহ হয়ে উঠলো। প্রথমে তারা তীর ছুঁড়ে আক্রমণ শুরু করে। মুসলিম বাহিনীও তীর নিক্ষেপ করে পাল্টা জবাব দেয়। এদিকে মদীনার উম্মুক্ত প্রান্তরে হাড়–কাঁপানো শীত শত্রুবাহিনীর জন্য দুঃসহ হয়ে উঠে। দীর্ঘদিন অবরোধ চালানো যে তাদের জন্য দুঃসাধ্য তারা তা বুঝতে পারলো। কারণ ওহুদ যুদ্ধ তারা একদিনেই সমাপ্ত করতে পেরেছিল, কিন্তু এবার তা একদিনের বিষয় না। তারা যুদ্ধ সংক্ষিপ্ত করার অন্য উপায় খোঁজতে লাগলো।

 

বনু কোরায়যা গোত্রের চুক্তি ভঙ্গের ঘটনা

মদীনায় বসবাসরত বনু কোরায়যাই ছিল একমাত্র ইহুদী গোত্র যার সাথে মুসলমানদের মৈত্রী চুক্তি তখন পর্যন্ত বলবৎ ছিল। ইহুদী বনী নজীর গোত্রের নেতা হুয়াই ইবনে আখতাব মদীনার বনু কোরায়যা গোত্রের নেতা কাআব ইবনে আসাদের সাথে রাতের আঁধারে সাক্ষাৎ করলো। সে মুসলমানদের সাথে এ চুক্তি বাতিল করে তাদেরকে সহায়তা করার জন্য কাআব ইবনে আসাদকে রাজী করানোর চেষ্টা করতে লাগলো। সে বললো, ‘তোমাদের সহায়তা পেলে আমরা মদীনার অভ্যন্তরে ঢুকে মুসলিম বাহিনীকে পর্যুদস্ত করতে পারব।’ প্রথমে কাআব অস্বীকৃতি জানালেও শেষ পর্যন্ত সম্মত হলো। তবে শর্ত দিলো যে যুদ্ধ প্রস্তুতি গ্রহণের জন্য তাদেরকে দশ দিনের সময় দিতে হবে এবং এ সময়ে ইহুদী–কুরাইশ বাহিনী যেন মুসলমানদের উপর অব্যাহত আক্রমণ চালিয়ে যায়। এ প্রস্তাব মেনে নিয়ে হুয়াই ইবনে আখতাব খুশী মনে বিদায় হলো।

নবী করীম (সাঃ) চুক্তি ভঙ্গের এ ঘোষণা জানতে পেরে এর সত্যতা যাচাইয়ের জন্য দু’জন সাহাবীকে বনু কোরায়যা গোত্রের নেতা কাআব ইবনে আসাদের নিকট পাঠালেন। ঘটনার সত্যতা জানার পর তাঁরা তাকে চুক্তি ভঙ্গের ব্যাপারে সতর্ক করেন। কিন্তু সে তাঁদেরকে সাফ জানিয়ে দিলো মুসলমানদের সাথে তাদের কোন চুক্তি নেই। এদের বিশ্বাসঘাতকতার ফলে যে কোন অঘটন ঘটার আশঙ্কায় নবীজী (সাঃ) উৎকন্ঠিত হলেন। অপরদিকে হুয়াইয়ের কূটনৈতিক সাফল্যে ইহুদী–কুরাইশ বাহিনীর যুদ্ধোম্মাদনা বৃদ্ধি পেলো।

 

শত্রুবাহিনীর পরিখা আক্রমণ

বনু কোরায়যার সাথে সমঝোতার পরদিন শত্রুবাহিনী পরিখার এক সরু স্থান দিয়ে আক্রমণ চালিয়ে ভিতরে ঢুকে পড়ে। তৎক্ষণাৎ হযরত আলী (রাঃ) ও হযরত ওমর (রাঃ) তাদেরকে প্রতিহত করেন। হযরত আলী (রাঃ) এর হাতে কুরাইশ বীর আমর ইবনে আব্দুদ নিহত হয়। অপর এক কুরাইশ নেতা নওফেল পরিখা অতিক্রম করতে গিয়ে গর্তে পড়ে নিহত হয়। অন্যেরা পালিয়ে যায়। এদিকে বনু কোরায়যা গোত্ররের ইহুদীরা মুসলিম বসতির কাছে ঘুরাফেরা শুরু করে। এদের একজন নবীজী (সাঃ) এর ফুফু হযরত সুফিয়া (রাঃ) এর গৃহের কাছে ঘুরে ঘুরে দেখছিল। তিনি তার গতিবিধি সন্দেহজনক মনে করে তরবারির আঘাতে তাকে হত্যা করলেন।

এ ভীষণ সঙ্কটে মদীনার একজন নব্য মুসলিম সাহাবী হযরত নুআয়েম (রাঃ) নবীজী (সাঃ) এর নিকট একটি কূট–কৌশলের প্রস্তাব দিলেন। তিনি বললেন, ‘আপনি আমাকে অনুমতি দিলে আমি ইহুদী–কুরাইশ জোট ও বনু কোরায়যার মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাস ভঙ্গ ও সন্দেহ সৃষ্টির কৌশল প্রয়োগ করতে পারি।’ তিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে মুসলমান হয়েছেন এ খবর ইহুদীরা তখনও জানতো না। তারা তাঁকে  তাদের একজন ঘনিষ্ট মিত্র বলেই জানতো। নবীজী (সাঃ) তাঁর এ প্রস্তাবে রাজী হলে নুআয়েম (রাঃ) প্রথমে বনু কোরায়যা গোত্রের নেতা কাআব ইবনে আসাদের নিকট গিয়ে বললেন:

‘ইহুদী–কুরাইশ জোট আপনাকে যে ‍নিরাপত্তার আশ্বাস দিয়েছে তারা পরাজিত হলে তা বাস্তবে কতটা পালন করতে পারবে এ নিয়ে সন্দেহ আছে। আপনি বরং তাদেরকে বলুন, জামানত হিসেবে তাদের কিছু লোককে আপনার নিকট পাঠিয়ে দিতে। এটাই হবে বিচক্ষণতার কাজ।’

তাঁর এ যৌক্তিক পরামর্শ কাআব  গ্রহণ করে। এরপর তিনি গেলেন কুরাইশ শিবিরে এবং তাদেরকে বললেন:

‘বনু কোরায়যার অধিকাংশ লোক মুসলমানদের সাথে চুক্তি ভঙ্গের বিরোধী। তারা নিরাপত্তার স্বার্থে কুরাইশদের কিছু লোককে জামানত হিসেবে তাদের নিকট রাখতে চায়। কোন অঘটন ঘটলে এদেরকে তারা জিম্মি হিসেবে মুসলমানদের হাতে তুলে দিবে। এখন যদি তারা আপনাদের কিছু লোক জামানত রাখার প্রস্তাব পাঠায় তবে সেটা গ্রহণ করা আপনাদের জন্য সমীচিন হবে না।’

তাঁর উপরোক্ত কূট–চালে জোটের উভয় পক্ষের মধ্যে সন্দেহের দানা বাঁধে। এর প্রেক্ষিতে ইহুদী–কুরাইশ জোট বনু কোরায়যা গোত্রের নেতা কাআব ইবনে আসাদকে তাঁর প্রতিশ্রুত সাহায্য প্রদানের জোর তাগিদ দিলো। কিন্তু কাআব উত্তরে জানালো যে, ‘আগামী কাল শনিবার – এ দিনে যুদ্ধ করা তাদের ধর্মীয় বিধানে নিষেধ বিধায় তারা অপারগ।’ তাদের বারংবার অনুরোধ সত্ত্বেও সে তার সিদ্ধান্তে অবিচল রইলো। উল্টো সে যখন তাদের কিছু লোককে জিম্মি হিসেবে পাঠাবার প্রস্তাব করলো তখন ইহুদী–কুরাইশ জোটের মধ্যে সন্দেহ আরও জোরদার হলো এবং তারা নিরাশ হয়ে পড়লো। অন্য দিকে ইহুদী জোটের অপর এক পক্ষ গোফতান গোত্র যুদ্ধ পরিত্যাগ চলে যাওয়ার বিনিময়ে মদীনার মুসলমানদের ফসলের অর্ধেক প্রদানের যে দাবী জানিয়েছিল তা প্রত্যাখ্যাত হওয়ায় তারাও নিরাশ হয়ে পড়েছিল। প্রতিকূল আবহাওয়ায় তারা ভীষণ কষ্ট ও বিপদগ্রস্ত পড়েছিল এবং তাদের মনোবল একেবরেই ভেঙ্গে পড়েছিল।

 

মরু ঝড়ে বিপর্যস্ত শত্রুবাহিনীর পলায়ন

রাতের বেলায় শুরু হলো শৈত্য প্রবাহ ও মরু ঝড়। প্রচন্ড মরু ঝড়ে উড়ে গেলো তাদের তাঁবু, মাল–সামানা ও সাজ–সরঞ্জাম, দড়ি ছিঁড়ে পালালো তাদের উট–ঘোড়া। তীব্র ঠান্ডায় জোট বাহিনীর শীতার্ত লোকজনও পালাতে শুরু করলো। তারা আশঙ্কা করলো মুসলিম বাহিনী এখনই তাদেরকে আক্রমণ করে বসবে। ভোর হওয়ার পুর্বেই তারা বিধ্বস্ত শিবির ছেড়ে পলায়ণ করতে বাধ্য হলো। সকাল বেলায় একজন মুসলমান শত্রুর রণাঙ্গণের এ করুণ দৃশ্য প্রত্যক্ষ করে নবীজী (সাঃ)-কে এ সংবাদ দিলো। সংবাদ পেয়ে সবাই খুবই আনন্দিত হলেন এবং মহান আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করলেন।। তাঁরা শত্রুর অনুসন্ধানে বেরিয়ে পড়লেন। কিন্তু কোথাও শত্রুর কোন চিহ্ন পাওয়া গেলো না। এ যুদ্ধের পরিণতি সম্পর্কে আল্লাহ্ পবিত্র কুরআনের সূরা আল–আহযাবে বলেন:

وَرَدَّ اللَّهُ الَّذِينَ كَفَرُوا بِغَيْظِهِمْ لَمْ يَنَالُوا خَيْرًا ۚ وَكَفَى اللَّهُ الْمُؤْمِنِينَ الْقِتَالَ ۚ وَكَانَ اللَّهُ قَوِيًّا عَزِيزًا۝

“আল্লাহ কাফেরদেরকে তাদের ক্রোধোম্মত্ততাসহ ফিরিয়ে দিলেন। তারা কোন কল্যাণ পায়নি। যুদ্ধে আল্লাহই মুমিনদের জন্যে যথেষ্ট। আল্লাহ শক্তিধর, পরাক্রমশালী।” (৩৩:২৫)

 

বনু কোরায়যার পরিণতি

চুক্তি ভঙ্গ ও বিশ্বাসঘাতকতার পরিণতি কি হতে পারে বনু কোরায়যা গোত্র ঠিকই উপলব্ধী করতে পারলো। এ চরম নাশকতামূলক কাজের নায়ক ও উসকানিদাতা বনু নজীর গোত্রের নেতা হুয়াই ইবনে আখতাব তখনও বনু কোরায়যা গোত্রেই অবস্থান করছিল।  সে ও বনু কোরায়যার লোকেরা নবী করীম (সাঃ) ও মুসলমানদের উপর ক্রোধে ফেটে পড়লো এবং যা–তা গালিগালাজ শুরু করলো। নবীজী (সাঃ) বনু কোরায়যা গোত্রের দূর্গগুলো অবরোধ করার জন্য মুসলমানদেরকে নির্দেশ দিলেন। দীর্ঘ পঁচিশ দিন এ অবরোধ চললো। অবশেষে তারা নতি স্বীকার করে একজন দূত পাঠালো তাদের এক সময়ের মিত্র আউস গোত্রীয় হযরত আবু লুবাবা (রাঃ)-কে যেন আলোচনার জন্য তাদের কাছে পাঠানো হয়। তাদের আহ্বানে তাঁকে পাঠানো হলো। অবস্থাদৃষ্টে তিনি তাদের প্রতি যথেষ্ট সহানুভূতিশীল হলেও ইঙ্গিতে করুণ পরিণতির বিষয়টি বুঝিয়ে দিলেন।

এত বড় বিশ্বাসঘাতকতার পরও বনু কোরায়জার লোকেরা আশা করছিল হয়তো তাদের সাথেও সদাচারণ করা হতে পারে। তারা পুরোনো মিত্র আউস গোত্রের নিকট অপর একজন দূত পাঠিয়ে অনুরোধ জানালো, ’খাযরাজ গোত্রের অনুরোধে যেভাবে বনু নজীর গোত্রকে নির্বাসন দেওয়া হয়েছে ঠিক সেইভাবে আমাদেরকেও যেন আমাদের লোকজন ও মাল–সামানাসহ নির্বাসনে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়।’ তাঁরা নবী করীম (সাঃ)-কে বনু কোরায়যার প্রস্তাবটি গ্রহণের অনুরোধ জানালে তিনি বললেন, ‘তারা যদি আউস গোত্র থেকে নিজেদের একজন পছন্দনীয় ব্যক্তিকে বিচারক মনোনীত করে তবে আমিও তাকে বিচারক হিসেবে মেনে নিব। তার ফয়সালাই হবে চূড়ান্ত।’

নবীজী (সাঃ) এর এ প্রস্তাবে রাজী হয়ে বনু কোরায়জা আউস গোত্রের তাদের পুরোনো মিত্র হযরত সাআদ ইবনে মুয়ায (রাঃ)-কে সালিস হিসেবে মনোনীত করে। হযরত সাআদ (রাঃ) প্রথমে উভয় পক্ষকে তাঁর রায় মানতে বাধ্য কি না তা জানতে চান। উভয় পক্ষ সম্মতি জানালে তিনি তাঁর রায় প্রদান করেন। প্রথমে তিনি বনু কোরায়জার লোকজনকে নিরস্ত্র অবস্থায় দূর্গ থেকে বেরিয়ে আসার নির্দেশ দেন। তারা সবাই বেরিয়ে এলে পরবর্তী নির্দেশে তিনি বললেন, ’বনু কোরায়জার প্রতিটি যোদ্ধা পুরুষকে হত্যা করা হোক, শিশু ও নারীদেরকে বন্দী করা হোক, এবং তাদের যাবতীয় সম্পদ জব্দ করে তা মুসলমানদের মধ্যে বন্টন করা হোক।’ যেহতেু রায় মেনে নিতে উভয় পক্ষই প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিল তাই রায় সেভাবেই কার্যকর করা হলো। বনু কোরায়জা বিশ্বাঘাতকতার উপযুক্ত শাস্তিই পেয়েছিল।

 

খন্দক যুদ্ধ পরবর্তী ঘটনাবলী

মরু ঝড়ে বিপর্যস্ত ইহুদী–কুরাইশ জোট মদীনা ছেড়ে পলায়নের পর বেশ কয়েক মাস মুসলমানগণ শান্তিপূর্ণ জীবন যাপন করলেন। এর মধ্যে নবীজী (সাঃ) কয়েকটি ছোটখাটো অভিযানও পরিচালনা করেন। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো বনু লিহইয়ান গোত্রের বিরুদ্ধে অভিযান, যী–কারাদ অভিযান ও মুস্তালিক গোত্রের বিরুদ্ধে অভিযান। মুস্তালিক গোত্রের বিরুদ্ধে অভিযানের সময় মুনাফেক সর্দার আব্দুল্লাহ্ ইবনে উবাই একজন আনসার ও একজন মুহাজিরের মধ্যে দ্বন্দকে উসকানি দিয়ে আনসার–মুহাজিরদের মধ্যে ফেতনা সৃষ্টির চেষ্টা করে। নবীজী (সাঃ) এর হস্তক্ষেপে এ সংকটের নিরসন ঘটে। এ অভিযন শেষে তিনি যখন মদীনায় ফিরে আসেন তখন উম্মুল মু’মিনীন হযরত আয়েশা (রাঃ) এর উপর অপবাদ আরোপের মিথ্যা প্রচারণায় মুনাফেক সর্দার আব্দুল্লাহ্ ইবনে উবাইয়ের সংশ্নিষ্টতা পাওয়া যায়। মহান আল্লাহ্ ওহী নাযিল করে এ মিথ্যা অপবাদটি খন্ডন করেন। হযরত আয়েশা (রা) এর উপর আনীত মিথ্যা অপবাদের ঘটনাটি ২৩ অধ্যায়ে বর্ণিত হয়েছে।

 

আনসার-মুহাজির দ্বন্দ সৃষ্টির পাঁয়তারা

বনী মুস্তালিক গোত্রের বিরুদ্ধে অভিযানকালে একটি অনাকাঙ্খিত ঘটনা ঘটে। হযরত ওমর (রাঃ) এর একজন সহচর মুসলিম শিবিরের কাছেই মুরায়সী কূপে পানি সংগ্রহের জন যান। মদীনার খাযরাজ গোত্রের একজন মুসলিম আনসারও সে সময় কূপে পানি আনতে যান। এ সময় উভয়ের মধ্যে বচসা ও এক পর্যায়ে হাতাহাতি শুরু হয়ে যায়। উভয়েই নিজ নিজ পক্ষের লোকজনকে সাহায্যের জন্য আহ্বান জানায়। ফলে মুহাজির ও আনসার উভয় পক্ষের লোকজন সেখানে জড়ো হন। মুনাফেক আব্দুল্লাহ্ ইবনে উবাইও মুস্তালিক অভিযানে অংশগ্রহণ করেছিল। সে এ দ্বন্দে মুহাজিরদের বিরুদ্ধে উসকানি দান ও বিদ্বেষ ছড়ানোর সুযোগ পেলো এবং ঔদ্ধত্যপূর্ণ ঘোষণা দিলো যে, মদীনায় ফিরে গিয়ে সে সেখান থেকে মুহাজিরদেরকে বের করে দেবে। এ সংবাদ যখন নবীজী (সাঃ) কানে গেলো, তিনি তৎক্ষণাৎ এ দ্বন্দের সমাধান করেন। এ সময় হযরত ওমর (রাঃ) আব্দুল্লাহ্ ইবনে উবাইকে হত্যা করার অনুমতি চাইলে তিনি তা নাকচ করে দেন এবং দ্রুত মদীনার দিকে যাত্রা করেন। মদীনায় পৌঁছে আব্দুল্লাহ্ ইবনে উবাই কসম করে বলে যে, এ ধরনের কোন উক্তি সে করেনি। কিন্তু আল্লাহ্ পবিত্র কুরআনের নিম্নোক্ত আয়াতটি নাযিল করে তাকে মিথ্যাবাদী প্রমাণিত করেন:

يَقُولُونَ لَئِن رَّجَعْنَا إِلَى الْمَدِينَةِ لَيُخْرِجَنَّ الْأَعَزُّ مِنْهَا الْأَذَلَّ ۚ وَلِلَّهِ الْعِزَّةُ وَلِرَسُولِهِ وَلِلْمُؤْمِنِينَ وَلَـٰكِنَّ الْمُنَافِقِينَ لَا يَعْلَمُونَ۝

“তারাই বলে: আমরা যদি মদীনায় প্রত্যাবর্তন করি তবে সেখান থেকে সবল অবশ্যই দুর্বলকে বহিস্কৃত করবে। শক্তি তো আল্লাহ তাঁর রসূল ও মুমিনদেরই কিন্তু মুনাফিকরা তা জানে না।” (৬৩:৮)

আব্দুল্লাহ্ ইবনে উবাইয়ের পুত্র আব্দুল্লাহ্ ইবনে আব্দুল্লাহ্ ইবনে উবাই (রাঃ) একজন নিষ্ঠাবান মুসলমান ছিলেন। তিনি বুঝতে পারলেন, পবিত্র কুরআনের এ আয়াত নাযিলের কারণে তাঁর মুনাফেক পিতার মৃত্যুদন্ড হতে পারে। এ ব্যাপারে তিনি নবীজী (সাঃ)-কে বললেন, ‘যদি আপনি তাকে মৃত্যুদন্ড দেন তবে আমি অপনার অনুমতিক্রমে এ অনুরোধ করব যে, গোত্রগত প্রতিহিংসা যাতে মাথাচাড়া দিয়ে না উঠে সে জন্য আমি নিজেই আমার পিতার মৃত্যুদন্ড কার্যকর করব।’ আব্দুল্লাহ্ ইবনে উবাই শপথ করে তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ অস্বীকার করায় নবীজী (সাঃ) তাকে মৃত্যুদন্ড থেকে রেহাই দেন।

 

মুনাফেক সর্দার আব্দুল্লাহ্ ইবনে উবাইয়ের বিদ্বেষ

আব্দুল্লাহ্ ইবনে উবাই ইবনে সলূল ছিল মদীনার আউস গোত্রীয় নেতা ইয়াসরিবের একজন বিশিষ্ট নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি। সে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করলেও অন্তরে ইসলামের নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) প্রতি বিদ্বেষভাব পোষণ করত। সে মসজিদে নব্বীতে নবীজী (সাঃ) এর সাথে নামায পড়তো এবং মাঝে মধ্যে ইসলাম বিষয়ে খুৎবাও প্রদান করতো। বাহ্যিকভাবে তাকে মুসলমান মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে সে ছিল কপটচারী। তার কার্যকলাপ ছিল ইসলাম বিরোধী। সুযোগ পেলেই সে ইসলামের স্বার্থের পরিপন্থী কাজে লিপ্ত হতো, ইসলামের শত্রুদের উসকানি দিতো এবং ফেতনা–ফ্যাসাদ সৃষ্টির প্রয়াস পেতো। ইসলামের সঙ্কটকালে সে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখতো। তার বেশ কিছু মুনাফেক অনুসারীও ছিল যারা তাকে নেতা হিসেবে গ্রহণ করেছিল। এ জন্য সে মুনাফেক সর্দার নামে ব্যাপক পরিচিতি পেয়েছিল। তার এ মুসলিম বিদ্বেষ ও মুনাফেক পরিচিতির পেছনে কয়েকটি কারণ ছিল। সেগুলো হলো:

  • ইসলাম–পূর্ব যুগে আব্দুল্লাহ্ ইবনে উবাই মদীনার শাসক হওয়ার স্বীকৃতি পেতে যাচ্ছিল। ঠিক এ সময়ে মদীনায় নবীজী (সাঃ) সহ মুসলমানদের আগমন মদীনাবাসীর মধ্যে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। তাঁর মহৎ গুণাবলী, অপরিসীম ব্যক্তিত্ব ও চারিত্রিক মাধুর্য আব্দুল্লাহ্ ইবনে উবাইকে ম্রিয়মান করে ফেলেছিল। মদীনায় নবীজী (সাঃ) এর প্রভাব তার নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন করলো।

  • সে মদীনার শাসক হওয়ার বাসনা পোষণ করছিল, কিন্তু নবীজী (সাঃ) এর আগমন ও তাঁর ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব সে পথে বিরাট অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

  • ইসলামের উদার নীতি, সাম্য, মৈত্রী ও ভ্রাতৃত্ববোধ তৎকালীন সঙ্কীর্ণ গোত্রীয় ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের ধারাকে অবলুপ্ত করে দিয়েছিল।

উপরোক্ত কারণে আব্দুল্লাহ্ ইবনে উবাই ও তার অনুসারীরা নবীজী (সাঃ) ও ইসলামের বিরোধীতায় লিপ্ত হয়। তারা কপটচারীতা, গুজব ও অপবাদ ছড়ানো এবং ফেতনা–ফ্যাসাদ সৃষ্টির মাধ্যমে মুসলিম সমাজে অনৈক্য ও অশান্তি সৃষ্টির প্রচেষ্টা চালিয়েছিল। কিন্তু তাদের এসব অপচেষ্টা সত্ত্বেও মদীনায় ইসলামের প্রভাব–প্রতিপত্তি ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছিলো। মুনাফেক চরিত্রের কিছুসংখ্যক লোকজন ছাড়া অধিকাংশ মদীনাবাসী নবীজী (সাঃ) এর অনুরুক্ত ছিল এবং তারা আন্তরিকভাবে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিল। এমনকি আব্দুল্লাহ্ ইবনে উবাইয়ের পুত্রও নবীজী (সাঃ) এর একজন প্রিয় সাহাবী ছিলেন।

 

আব্দুল্লাহ্ ইবনে উবাইয়ের চক্রান্তমূলক কিছু ঘটনা

মদীনার মুনাফেক সর্দার আব্দুল্লাহ্ ইবনে উবাই বিভিন্ন সময়ে মুসলিম স্বার্থের পরিপন্থী ঘটনাসমূহে জড়িত ছিল। এগুলোর মধ্যে প্রধানতম হলো:

  • ওহুদ যুদ্ধের কঠিন সময়ে সে তার তিন শত অনুসারীসহ মুসলিম বাহিনী ছেড়ে চলে আসে।

  • মুসলমানদের শত্রু ইহুদী বনু কায়নুকা গোত্রকে মুসলমানদের বিরুদ্ধে উসকে দেয় এবং তাদেরকে সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দেয়।

  • নবীজী (সাঃ)-কে হত্যার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত অপর শত্রু ইহুদী বনু নজীর গোত্রকে সর্বাত্মক সাহায্যের আশ্বাস দিয়ে তাদেরকে মদীনা না ছাড়ার পরামর্শ দেয়।

  • বনী মুস্তালিক গোত্রের বিরুদ্ধে অভিযানকালে সে অনসার-মুহাজির কলহের সময় মুহাজিরদের বিরুদ্ধে উসকানি দিয়েছিল ও বিদ্বেষ ছড়িয়েছিল এবং মুহাজিরদেরকে মদীনা থেকে বের করে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিল।

  • তার নেতৃত্বে মদীনার কিছু মোনাফেক নবী করীম (সা) এর প্রিয়তমা স্ত্রী ও উম্মুল মু’মিনিন হযরত আয়েশা (রা) এর উপর মিথ্যা অপবাদ আরোপ করে হযরত আয়েশা (রাঃ) এর চরিত্র হনন করার প্রয়াস চালায়।

আব্দুল্লাহ্ ইবনে উবাই যখন পীড়িত হয়ে মৃত্যু শয্যায় তখন তার পুত্র আব্দুল্লাহ্ ইবনে আব্দুল্লাহ্ ইবনে উবাই (রাঃ) নবীজী (সাঃ) এর নিকট এসে বললো, ’হে আল্লাহর রসূল (সাঃ) আমার পিতার ক্ষমার জন্য আল্লাহর দরবারে দোয়া করুন।’ তাঁর অনুরোধে সাড়া দিয়ে নবীজী (সাঃ) দোয়া করতে উদ্যত হলে নিম্নোক্ত আয়াতটি নাযিল হয়:

اسْتَغْفِرْ لَهُمْ أَوْ لَا تَسْتَغْفِرْ لَهُمْ إِن تَسْتَغْفِرْ لَهُمْ سَبْعِينَ مَرَّةً فَلَن يَغْفِرَ اللَّهُ لَهُمْ ۚ ذَٰلِكَ بِأَنَّهُمْ كَفَرُوا بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ ۗ وَاللَّهُ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الْفَاسِقِينَ۝

“তাদের জন্য অপনার ক্ষমা প্রার্থনা করা আর না করা উভয়ই সমান। যদি আপনি তাদের জন্য সত্তরবারও ক্ষমা প্রার্থনা করেন, তথাপি কখনোই তাদেরকে আল্লাহ ক্ষমা করবেন না। তা এজন্য যে, তারা আল্লাহকে এবং তাঁর রসূলকে অস্বীকার করেছে। বস্তুতঃ আল্লাহ না-ফামানদেরকে হেদায়েত দেন না।” (৯:৮০)

অধ্যায়সমূহ