এ অধ্যায়ের বিষয়সমূহ
Toggleইহুদীদের মুসলিম বিদ্বেষ ও মদীনা সনদের শর্ত ভঙ্গ
বনী ইসরাইল সম্প্রদায়ের একটি গোষ্ঠীর নাম হলো ইহুদী যারা নিজেদেরেকে হযরত মূসা (আ) এর অনুসারী বলে দাবী করে। নবী করীম (সাঃ) এর মদীনায় আগমণের প্রাথমিক পর্যায়ে ইহুদী সম্প্রদায়ের সাথে সুসম্পর্ক গড়তে সচেষ্ট হন। কারণ তারা ছিল “আহলে–কিতাব” অর্থাৎ আল্লাহর কিতাবের অধিকারী ও আল্লাহর একত্ববাদে বিশ্বাসী সম্প্রদায়।
কিন্তু তাদের এক শ্রেণীর ধর্মবেত্তার বিশ্বাস ছিল শেষ নবীর আবির্ভাব তাদের সম্প্রদায় থেকেই ঘটবে। এ ভ্রান্ত ধারণা তাদেরকে হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর উপর ঈমান আনতে বিরত রাখে।
হিজরতের পর মদীনা ছিল বিভিন্ন ধর্ম ও গোত্রের মানুষের আবাসস্থল। সেখানে আওস ও খাযরাজ গোত্রের আরবদের পাশাপাশি বেশ কয়েকটি ইহুদী গোত্রও বসবাস করত। তাদের মধ্যে প্রধান ছিল বানূ কাইনুকা, বানূ নাজীর এবং বানূ কুরাইযা।
মহানবী মুহাম্মদ (সাঃ) মদীনায় আগমনের পর বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে শান্তি, নিরাপত্তা ও পারস্পরিক সহযোগিতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে যে ঐতিহাসিক মদীনা সনদ (Constitution of Madinah) প্রণয়ন করেন, তার আওতায় ইহুদীরাও মদীনা রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। তাদের ধর্মীয় স্বাধীনতা, জান-মাল ও সম্মানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয় এবং রাষ্ট্র রক্ষার ক্ষেত্রে পারস্পরিক সহযোগিতার অঙ্গীকার নেওয়া হয়।
কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই মদীনার সাধারণ জনগণের মধ্যে সাম্য, শান্তি ও সম্প্রীতির ধর্ম ইসলামের দ্রুত বিস্তার এবং মহানবী (সাঃ)–এর ক্রমবর্ধমান প্রভাব অনেক ইহুদী নেতার মধ্যে ঈর্ষা ও বিদ্বেষের জন্ম দেয় — যদিও তারা জানত যে, শেষ নবীর আগমনের বার্তা তাদের ধর্মগ্রন্থসমূহে উল্লেখ রয়েছে। তাদের প্রত্যাশা ছিল তিনি তাদের বনী–ইসরাঈল বংশীয় হবেন, কিন্তু তিনি ছিলেন বনী–ইসমা্ইল বংশোদ্ভুত। এটাও ছিল তাদের ঈর্ষার অন্যতম কারণ।
এ প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন:
“যাদেরকে আমি কিতাব দিয়েছি, তারা তাঁকে (মুহাম্মদকে) নিজেদের সন্তানদের মতো চিনে। কিন্তু তাদের একদল জেনে–শুনে সত্য গোপন করে।” (সূরা বাক্বারাহ, ২:১৪৬)
অন্যত্র আল্লাহ বলেন:
“যখন তাদের কাছে আল্লাহর পক্ষ থেকে এমন এক রাসূল এলেন, যিনি তাদের কাছে থাকা কিতাবের সত্যায়নকারী, তখন কিতাবপ্রাপ্তদের একদল আল্লাহর কিতাবকে নিজেদের পেছনে নিক্ষেপ করল, যেন তারা কিছুই জানে না।” (সূরা বাক্বারাহ, ২:১০১)
ইসলামের ক্রমবর্ধমান প্রভাব তাদের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রাধান্যের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। ফলে তারা প্রকাশ্য ও গোপনে ইসলামের বিরুদ্ধে নানা অপতৎপরতায় লিপ্ত হয়। তারা মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি, মুনাফিকদের উসকানি প্রদান, গুজব ছড়ানো এবং ইসলামের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাতে থাকে।
পবিত্র কুরআন তাদের এ ধরনের আচরণের প্রতি ইঙ্গিত করে বলেছে:
“কিতাবধারীদের একদল বলল, ‘মুমিনদের প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে, দিনের শুরুতে তা বিশ্বাস কর এবং দিনের শেষে তা অস্বীকার কর; হয়তো তারা (ইসলাম থেকে) ফিরে আসবে।’” (সূরা আলে ইমরান ৩:৭২)
নবী (সাঃ)–কে হত্যার ষড়যন্ত্র
পাথর নিক্ষেপের মাধ্যমে হত্যার চেষ্টা
মদীনার ইহুদীদের মধ্যে বিশেষ করে বানূ নাজীর গোত্র মহানবী (সাঃ)-কে হত্যার এক ভয়ঙ্কর ষড়যন্ত্র করেছিল। একবার নবী (সাঃ) তাদের এলাকায় গেলে তারা পরিকল্পনা করেছিল যে, একটি বড় পাথর উপর থেকে ফেলে তাঁকে হত্যা করবে। কিন্তু মহান আল্লাহ ওহীর মাধ্যমে তাঁর প্রিয় নবীকে এ ষড়যন্ত্রের সংবাদ জানিয়ে দেন। ফলে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে সেখান থেকে চলে আসেন এবং তাদের পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়। (সহীহ আল-বুখারী, কিতাবুল মাগাযী)
আল্লাহ তাআলা বলেন:
“হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর সেই অনুগ্রহ স্মরণ কর, যখন এক সম্প্রদায় তোমাদের বিরুদ্ধে হাত প্রসারিত করতে চেয়েছিল, কিন্তু তিনি তাদের হাত তোমাদের থেকে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন।” (সূরা আল–মায়িদাহ ৫:১১)
অনেক মুফাসসির এই আয়াতকে বানূ নাজীরের ষড়যন্ত্রের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে উল্লেখ করেছেন।
বিষ প্রয়োগের মাধ্যমে হত্যার অপচেষ্টা
অপর এক ঘটনায় খয়বরের যয়নব নাম্নী এক ইহুদীনি তাঁকে খাবারের নিমন্ত্রণ জানিয়ে খাদ্যে বিষ প্রয়োগের মাধ্যমে হত্যা করার চেষ্টা চালায়। নবী করীম (সাঃ) তাঁর কয়েকজন সাহাবীসহ উক্ত নিমন্ত্রণে যোগ দেন। খাদ্য মুখে দিয়েই তিনি বুজতে পারলেন তাতে বিষ মিশ্রিত আছে। তিনি তৎক্ষণাৎ তাঁর সঙ্গীদেরকে খাদ্য গ্রহণে বিরত হতে বললেন। ইতোমধ্যেই একজন তা খেয়ে ফেলায় মৃত্যুবরণ করেন। কিন্তু নবী করীম (সাঃ) তখনকার মতো বিষক্রিয়ার হাত থেকে নিষ্কৃতি পান।
মুশরিকদের সঙ্গে আঁতাত
ইহুদীরা নিজেদেরকে একত্ববাদের অনুসারী বলে দাবি করলেও ইসলামের বিরোধিতার ক্ষেত্রে তারা মক্কার মুশরিক কুরাইশদের সঙ্গে মিত্রতা গড়ে তোলে। এমনকি তারা মুশরিকদেরকে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য উৎসাহিত করত। কুরআনে বলা হয়েছে:
“তুমি কি তাদের দেখনি, যারা কিতাবের কিছু অংশ পেয়েছে? তারা জিবত ও তাগূতের প্রতি বিশ্বাস করে এবং কাফিরদের সম্পর্কে বলে, ‘এরা মুমিনদের চেয়ে অধিক সঠিক পথে রয়েছে।’” (সূরা আন–নিসা ৪:৫১)
তাফসীরকারগণ উল্লেখ করেছেন যে, মক্কার কুরাইশরা যখন ইহুদী নেতাদের নিকট গিয়ে নিজেদের ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে মতামত জানতে চেয়েছিল, তখন ইসলামের বিরোধিতার কারণে কিছু ইহুদী নেতা মুশরিকদের পক্ষ সমর্থন করেছিল।
চুক্তিভঙ্গ ও বিশ্বাসঘাতকতা
মদীনার ইহুদী গোত্রসমূহ পর্যায়ক্রমে মদীনা সনদের শর্ত ভঙ্গ করতে থাকে।
- বানূ কাইনুকা মুসলমানদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হয়;
- বানূ নাজীর নবী (সাঃ)-কে হত্যার ষড়যন্ত্র করে; এবং
- বানূ কুরাইযা খন্দকের যুদ্ধের সময় শত্রুপক্ষের সঙ্গে যোগ দিয়ে মদীনার নিরাপত্তাকে চরম হুমকির মুখে ফেলে।
পবিত্র কুরআনে এ ধরনের চুক্তিভঙ্গকারীদের সম্পর্কে বলা হয়েছে:
“যারা প্রত্যেকবার অঙ্গীকার করে, অতঃপর তাদের অঙ্গীকার ভঙ্গ করে এবং তারা আল্লাহকে ভয় করে না।” (সূরা আল–আনফাল ৮:৫৬)
ষড়যন্ত্রের পরিণতি
ইহুদী গোত্রগুলোর বিরুদ্ধে গৃহীত ব্যবস্থা তাদের ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে নয়; বরং রাষ্ট্রদ্রোহ, চুক্তিভঙ্গ, যুদ্ধকালীন বিশ্বাসঘাতকতা এবং হত্যার ষড়যন্ত্রের কারণে ছিল। ইসলামী রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও জনকল্যাণ রক্ষার্থে নবী (সাঃ) পরিস্থিতি অনুযায়ী বিচার ও ব্যবস্থা গ্রহণ করেন।
ফলে বানূ কাইনুকা ও বানূ নাদীর মদীনা ত্যাগ করতে বাধ্য হয় এবং বানূ কুরাইযার ব্যাপারে তাদের নিজেদের মিত্র গোত্র আওসের মনোনীত বিচারক হযরত সা‘দ ইবন মু‘আয (রাঃ)–এর রায় কার্যকর করা হয়।
এসব ঘটনার মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যে, ইসলামের বিরুদ্ধে যত ষড়যন্ত্রই করা হোক না কেন, মহান আল্লাহ তাঁর দ্বীনকে রক্ষা করেন এবং সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করেন।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
“তারা চায় আল্লাহর নূরকে নিজেদের মুখের ফুঁয়ে নিভিয়ে দিতে; কিন্তু আল্লাহ তাঁর নূরকে পূর্ণতা দান করবেন, যদিও কাফিররা তা অপছন্দ করে।” (সূরা আছ–ছফ ৬১:৮)
তিনি আরও বলেন:
“তারা ষড়যন্ত্র করেছে এবং আল্লাহও কৌশল অবলম্বন করেছেন; আর আল্লাহ সর্বোত্তম কৌশলকারী।” (সূরা আলে ইমরান ৩:৫৪)
অতএব, মদীনার ইহুদী গোত্রগুলোর ইতিহাস থেকে শিক্ষা পাওয়া যায় যে, সত্যকে অস্বীকার, হিংসা, চুক্তিভঙ্গ এবং ষড়যন্ত্র সাময়িকভাবে কিছু সুবিধা এনে দিলেও শেষ পর্যন্ত তা ধ্বংস ও লাঞ্ছনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। পক্ষান্তরে, আল্লাহর উপর ভরসা, সত্যের প্রতি অবিচলতা এবং ন্যায়নীতির অনুসরণই সফলতার প্রকৃত পথ।
তাদের এরূপ কর্মকান্ডের মোকাবেলায় আল্লাহ্ তায়ালা নিম্নোক্ত তিনটি আয়াতে তাঁর নবী (সাঃ)–কে উপদেশ দিয়ে বলেন:
♣“তাদের কাছে জ্ঞান আসার পরই তারা পারস্পরিক বিভেদের কারণে মতভেদ করেছে। যদি আপনার পালনকর্তার পক্ষ থেকে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত অবকাশের পূর্ব সিদ্ধান্ত না থাকত, তবে তাদের ফয়সালা হয়ে যেত। তাদের পর যারা কিতাব প্রাপ্ত হয়েছে, তারা অস্বস্তিকর সন্দেহে পতিত রয়েছে।
♣”সুতরাং (হে নবী) আপনি এর প্রতিই দাওয়াত দিন এবং হুকুম অনুযায়ী অবিচল থাকুন; আপনি তাদের খেয়ালখুশীর অনুসরণ করবেন না। আপনি বলুন, ‘আল্লাহ যে কিতাব নাযিল করেছেন, আমি তাতে বিশ্বাস স্থাপন করেছি। আমি তোমাদের মধ্যে ন্যায় বিচার করতে আদিষ্ট হয়েছি। আল্লাহ আমাদের পালনকর্তা ও তোমাদের পালনকর্তা। আমাদের জন্যে আমাদের কর্ম এবং তোমাদের জন্যে তোমাদের কর্ম। আমাদের মধ্যে ও তোমাদের মধ্যে বিবাদ নেই। আল্লাহ আমাদেরকে সমবেত করবেন এবং তাঁরই দিকে প্রত্যাবর্তণ হবে।”
♣”আল্লাহর দ্বীন মেনে নেয়ার পর যারা সে সম্পর্কে বিতর্কে প্রবৃত্ত হয়, তাদের বিতর্ক তাদের পালনকর্তার কাছে বাতিল, তাদের প্রতি আল্লাহর গযব এবং তাদের জন্যে রয়েছে কঠোর আযাব’।” (সূরা আশ–শুরা, ৪২:১৪–১৬)
ইহুদী জাতির চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য
ইহুদীদের উপর আল্লাহর অশেষ নিয়ামত থাকা সত্ত্বেও তাদের অধিকাংশের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ছিল শঠতাপূর্ণ ও অকৃতজ্ঞতাস্বরূপ:
- তাদের অধিকাংশই ছিল অকৃতজ্ঞ, অহংকারী ও ওয়াদাভঙ্গকারী।
- আল্লাহর প্রতি মিথ্যারোপ ও নাফরমানীতে তারা ছিল সিদ্ধহস্ত।
- তারা ছিল অত্যন্ত লোভী প্রকৃতির এবং পাপচারের প্রতি আকৃষ্ট।
- র্পূর্ববর্তী নবীগণের সাথেও তাদের আচরণ ছিল ধৃষ্টতাপূর্ণ। এমনকি অনেক নবীকে তারা হত্যাও করেছিল।
- ইহুদীরা হযরত মূসা নবী (আঃ) এর অনুসারী বলে দাবী করলেও তাঁর আদেশ–নির্দেশ পালনে তাদের ছিল প্রবল অনীহা। তাঁকে তারা কষ্ট দিতেও পিছ–পা হয়নি।
- পার্থিব সুবিধা লাভের জন্য তাদের কিতাব ‘তৌরাত’ কে মনগড়া কথা দ্বারা বিকৃত করতে তারা দ্বিধা করেনি।
এ প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ্ তায়ালা বলেন,
“অতএব তাদের জন্যে আফসোস! যারা নিজ হাতে গ্রন্থ লেখে এবং বলে, এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ – যাতে এর বিনিময়ে সামান্য অর্থ গ্রহণ করতে পারে। অতএব তাদের প্রতি আক্ষেপ, তাদের হাতের লেখার জন্য এবং তাদের প্রতি আক্ষেপ, তাদের উপার্জনের জন্যে।” (সূরা বাক্বারাহ, ২:৮০)
মদীনার ইহুদীরা নবী হযরত মূসা (আঃ) এর একত্ববাদী ধর্মের অনুসারী হওয়া সত্ত্বেও বিদ্বেষবশত একত্ববাদী ধর্ম ইসলামকে বর্জন করে পৌত্তলিক কুরাইশদেরকে সমর্থন করে। অথচ তারা তাদের ধর্মগ্রন্থ তৌরাত থেকে নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর আবির্ভাবের ভবিষ্যদ্বাণী সম্পর্কে জানতো।
এতদসত্ত্বেও মুসলমানদের প্রতি প্রচন্ড বিদ্বেষভাবাপন্ন ইহুদী গোত্রগুলো নানা রকম ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল। তারা মদীনার মোনাফেক ও মক্কার কাফেরদের সহযোগিতায় মুসলমানদেরকে মদীনা থেকে উৎখাতের সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়েছিল।
বিচার–সালিশের প্রস্তাব
ইহুদীদের একটি গোষ্ঠী তাদের হীন স্বার্থোদ্ধারে নবীজী (সাঃ)–কে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পেতে চেয়েছিল। এরা অন্য একটি গোত্রের সাথে বিরোধপূর্ণ বিষয়ে বিচার–সালিশে তাদের পক্ষে রায় প্রদানের অনুরোধ জানায়। তারা বলে, তিনি তাতে সম্মত হলে তারা ঈমান আনবে এবং তাঁর অনুসারী হয়ে যাবে। নবী করীম (সাঃ) তাদের প্রস্তাব তৎক্ষণাৎ নাকচ করে দেন।
এ প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআনের আয়াত নাযিল হলো:
“আর আমি আদেশ করছি যে, আপনি তাদের পারস্পরিক ব্যাপারাদিতে আল্লাহ যা নাযিল করেছেন তদনুযায়ী ফয়সালা করুন; তাদের প্রবৃত্তির অনুসরণ করবেন না এবং তাদের থেকে সতর্ক থাকুন – যেন তারা আপনাকে এমন কোন নির্দেশ থেকে বিচ্যুত না করে, যা আল্লাহ আপনার প্রতি নাযিল করেছেন। অনন্তর যদি তার মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে জেনে নিন, আল্লাহ তাদেরকে তাদের গোনাহের কিছু শাস্তি দিতেই চেয়েছেন। মানুষের মধ্যে অনেকেই নাফরমান। তারা কি জাহেলিয়াত আমলের ফয়সালা কামনা করে? আল্লাহ অপেক্ষা বিশ্বাসীদের জন্যে উত্তম ফয়সালাকারী কে?“ (সূরা মায়েদাহ, ৫:৪৯–৫০)
ইহুদীদের অবাধ্যতা ও পরিণতি সম্পর্কে পবিত্র কুরআনের ভাষ্য
ইহুদীগণ কর্তৃক বিভিন্ন গুরুতর নাফরমানী, পাপ ও অপরাধে লিপ্ত হওয়ার কাহিনী ইতিহাসে সুবিদিত। তারা বিভিন্ন সময়ে পথভ্রষ্ট হয়ে পড়ে আল্লাহর নাফরমানীতে লিপ্ত হয়। ফলে তাদের উপর আল্লাহর লা’নত ও গজব নাযিল হয়েছিল। তারা আল্লাহর আদেশ অমান্য করায় এবং তাঁর নিয়ামতসমূহকে অবজ্ঞা ও অস্বীকার করায় বারবার তাদের উপর নেমে আসে মহাবিপদ।
পবিত্র কুরআনের ২নং সূরা বাকারা ও ১৭নং সূরা বনী ইসরাঈলের বহু আয়াতে এর বিশদ বিবরণ রয়েছে।
এ প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআনের ভাষ্য হলো:
♦“(স্মরণ কর,) যখন মূসা (আ) তাঁর সম্প্রদায়কে বলল: ‘হে আমার সম্প্রদায়, তোমরা কেন আমাকে কষ্ট দাও, অথচ তোমরা জান যে, আমি তোমাদের কাছে আল্লাহর রসূল।’ অতঃপর তারা যখন বক্রতা অবলম্বন করল, তখন আল্লাহ তাদের অন্তরকে বক্র করে দিলেন। আল্লাহ্ পাপাচারী সম্প্রদায়কে পথপ্রদর্শন করেন না।” (সূরা আছ–ছফ, ৬১:৫)
♦“বলুন, হে ইহুদীগণ, যদি তোমরা দাবী কর যে, তোমরাই আল্লাহর বন্ধু – অন্য কোন মানব নয়, তবে তোমরা মৃত্যু কামনা কর যদি তোমরা সত্যবাদী হও। তারা নিজেদের কৃতকর্মের কারণে কখনও মৃত্যু কামনা করবে না। আল্লাহ যালেমদের সম্পর্কে সম্যক অবগত আছেন।” (সূরা আল জুমু’আহ, ৬২:৬–৭)
♦“আল্লাহর প্রতিশ্রুতি কিংবা মানুষের প্রতিশ্রুতি ব্যতীত ওরা যেখানেই অবস্থান করেছে সেখানেই তাদের ওপর লাঞ্ছনা চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। আর ওরা উপার্জন করেছে আল্লাহর গযব। ওদের উপর চাপানো হয়েছে গলগ্রহতা। তা এজন্যে যে, ওরা আল্লাহর আয়াতসমূহকে অনবরত অস্বীকার করেছে এবং নবীগণকে অন্যায়ভাবে হত্যা করেছে। তার কারণ, ওরা নাফরমানী করেছে এবং সীমা লংঘন করেছে।” (সূরা আলে ইমরান, ৩:১১২)
♦“আর সে সময়ের কথা স্মরণ করুন, যখন আপনার পালনকর্তা সংবাদ দিয়েছেন যে, অবশ্যই ক্বিয়ামত দিবস পর্যন্ত তাদের (ইহুদীদের) উপর এমন লোক পাঠাতে থাকবেন যারা তাদেরকে নিকৃষ্ট শাস্তি দান করতে থাকবে। নিঃসন্দেহে আপনার পালনকর্তা শীঘ্র শাস্তিদানকারী এবং তিনি ক্ষমাশীল, দয়ালু।” (সূরা আরাফ, ৭:১৬৭)
♦“আমি বনী ইসরাঈলকে কিতাবে পরিষ্কার বলে দিয়েছি যে, তোমরা পৃথিবীর বুকে দুবার অনর্থ সৃষ্টি করবে এবং অত্যন্ত বড় ধরনের অবাধ্যতায় লিপ্ত হবে। অতঃপর যখন প্রতিশ্রুতি সেই প্রথম সময়টি এল, তখন আমি তোমাদের বিরুদ্ধে প্রেরণ করলাম আমার কঠোর যোদ্ধা বান্দাদেরকে। অতঃপর তারা প্রতিটি জনপদের আনাচে–কানাচে পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ল। এ ওয়াদা পূর্ণ হওয়ারই ছিল।” (সূরা বনী ইসরাঈল, ১৭:৪–৫)
♦“অতঃপর আমি তোমাদের জন্যে তাদের বিরুদ্ধে পালা ঘুরিয়ে দিলাম, তোমাদেরকে ধন-সম্পদ ও পুত্রসন্তান দ্বারা সাহায্য করলাম এবং তোমাদেরকে জনসংখ্যার দিক দিয়ে একটা বিরাট বাহিনীতে পরিণত করলাম। তোমরা যদি ভাল কর, তবে নিজেদেরই ভাল করবে এবং যদি মন্দ কর তবে তাও নিজেদের জন্যেই। এরপর যখন দ্বিতীয় সে সময়টি এল, তখন অন্য বান্দাদেরকে প্রেরণ করলাম, যাতে তোমাদের মুখমন্ডল বিকৃত করে দেয়, আর মসজিদে ঢুকে পড়ে যেমন প্রথমবার ঢুকেছিল এবং যেখানেই জয়ী হয়, সেখানেই পুরোপুরি ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। হয়ত তোমাদের পালনকর্তা তোমাদের প্রতি অনুগ্রহ করবেন। কিন্তু যদি পুনরায় তদ্রূপ কর, আমিও পুনরায় তাই করব। আমি জাহান্নামকে কাফেরদের জন্যে কয়েদখানা করেছি।” (সূরা বনী ইসরাঈল, ১৭:৬–৮)
মদীনায় মুনাফিক সর্দার আব্দুল্লাহ্ ইবনে উবাইয়ের ইসলাম বিদ্বেষ
হিজরতের পর মদীনায় ইসলামের দ্রুত প্রসার এবং নবী করীম (সাঃ)-এর নেতৃত্বে মুসলিম সমাজের সুসংগঠিত উত্থান কিছু লোকের মনে ঈর্ষা ও অসন্তোষের জন্ম দেয়। তাদের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছিল আব্দুল্লাহ্ ইবনে উবাই ইবনে সলূল।
সে ছিল মদীনার আউস গোত্রীয় নেতা ইয়াসরিবের একজন বিশিষ্ট নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি। সে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করলেও অন্তরে ইসলামের নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) প্রতি বিদ্বেষভাব পোষণ করত। সে মসজিদে নব্বীতে নবীজী (সাঃ) এর সাথে নামায পড়তো এবং মাঝে মধ্যে ইসলাম বিষয়ে খুৎবাও প্রদান করতো। বাহ্যিকভাবে তাকে মুসলমান মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে সে ছিল কপটচারী। তার কার্যকলাপ ছিল ইসলাম বিরোধী।
সুযোগ পেলেই সে ইসলামের স্বার্থের পরিপন্থী কাজে লিপ্ত হতো, ইসলামের শত্রুদের উসকানি দিতো এবং ফেতনা–ফ্যাসাদ সৃষ্টির প্রয়াস পেতো। ইসলামের সঙ্কটকালে সে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখতো। তার বেশ কিছু মুনাফিক অনুসারীও ছিল যারা তাকে নেতা হিসেবে গ্রহণ করেছিল। এ জন্য সে মুনাফেক সর্দার নামে ব্যাপক পরিচিতি পেয়েছিল। তার এ মুসলিম বিদ্বেষ ও মুনাফেক পরিচিতির পেছনে কয়েকটি কারণ ছিল। সেগুলো হলো:
- ইসলাম–পূর্ব যুগে আব্দুল্লাহ্ ইবনে উবাই মদীনার শাসক হওয়ার স্বীকৃতি পেতে যাচ্ছিল। ঠিক এ সময়ে মদীনায় নবীজী (সাঃ) সহ মুসলমানদের আগমন মদীনাবাসীর মধ্যে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। তাঁর মহৎ গুণাবলী, অপরিসীম ব্যক্তিত্ব ও চারিত্রিক মাধুর্য আব্দুল্লাহ্ ইবনে উবাইকে ম্রিয়মান করে ফেলেছিল। মদীনায় নবীজী (সাঃ) এর প্রভাব তার নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন করলো।
- সে মদীনার শাসক হওয়ার বাসনা পোষণ করছিল, কিন্তু নবীজী (সাঃ) এর আগমন ও তাঁর ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব সে পথে বিরাট অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
- ইসলামের উদার নীতি, সাম্য, মৈত্রী ও ভ্রাতৃত্ববোধ তৎকালীন সঙ্কীর্ণ গোত্রীয় ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের ধারাকে অবলুপ্ত করে দিয়েছিল।
উপরোক্ত কারণে আব্দুল্লাহ্ ইবনে উবাই ও তার অনুসারীরা নবীজী (সাঃ) ও ইসলামের বিরোধীতায় লিপ্ত হয়। তারা কপটচারীতা, গুজব ও অপবাদ ছড়ানো এবং ফেতনা–ফ্যাসাদ সৃষ্টির মাধ্যমে মুসলিম সমাজে অনৈক্য ও অশান্তি সৃষ্টির প্রচেষ্টা চালিয়েছিল।
কিন্তু তাদের এসব অপচেষ্টা সত্ত্বেও মদীনায় ইসলামের প্রভাব–প্রতিপত্তি ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছিলো। মুনাফেক চরিত্রের কিছুসংখ্যক লোকজন ছাড়া অধিকাংশ মদীনাবাসী নবীজী (সাঃ) এর অনুরুক্ত ছিল এবং তারা আন্তরিকভাবে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিল। এমনকি আব্দুল্লাহ্ ইবনে উবাইয়ের পুত্রও নবীজী (সাঃ) এর একজন প্রিয় সাহাবী ছিলেন।
পবিত্র কুরআনে মুনাফিকদের পরিচয় দিতে গিয়ে মহান আল্লাহ বলেন:
“মানুষের মধ্যে কেউ কেউ এমন আছে, যারা বলে, ‘আমরা আল্লাহ ও পরকালের প্রতি ঈমান এনেছি’, অথচ তারা আদৌ মুমিন নয়। তারা আল্লাহ ও মুমিনদেরকে প্রতারিত করতে চায়, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তারা নিজেদেরকেই প্রতারিত করে, অথচ তা উপলব্ধি করে না।” (সূরা বাক্বারাহ ২:৮–৯)
আব্দুল্লাহ্ ইবনে উবাইয়ের চক্রান্তমূলক কিছু ঘটনা
মদীনার মুনাফেক সর্দার আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই ও তার অনুসারীরা প্রকাশ্যে মুসলমানের পরিচয় দিত, মসজিদে নববীতে নামায আদায় করত এবং মুসলিম সমাজের অংশ হিসেবে নিজেদের উপস্থাপন করত। কিন্তু গোপনে তারা ইসলামের শত্রুদের সহযোগিতা করত এবং মুসলিম সমাজে বিভেদ, সন্দেহ ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করার চেষ্টা চালাত। এরা বিভিন্ন সময়ে মুসলিম স্বার্থের পরিপন্থী যেসব চক্রান্তে জড়িত ছিল।
মদীনার মুনাফেক সর্দার আব্দুল্লাহ্ ইবনে উবাই বিভিন্ন সময়ে মুসলিম স্বার্থের পরিপন্থী ঘটনাসমূহে জড়িত ছিল। এগুলোর মধ্যে প্রধানতম হলো:
- ওহুদ যুদ্ধের কঠিন সময়ে সে তার তিন শত অনুসারীসহ মুসলিম বাহিনী ছেড়ে চলে আসে।
- মুসলমানদের শত্রু ইহুদী বনু কায়নুকা গোত্রকে মুসলমানদের বিরুদ্ধে উসকে দেয় এবং তাদেরকে সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দেয়।
- নবীজী (সাঃ)-কে হত্যার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত অপর শত্রু ইহুদী বনু নজীর গোত্রকে সর্বাত্মক সাহায্যের আশ্বাস দিয়ে তাদেরকে মদীনা না ছাড়ার পরামর্শ দেয়।
- বনী মুস্তালিক গোত্রের বিরুদ্ধে অভিযানকালে সে অনসার–মুহাজির কলহের সময় মুহাজিরদের বিরুদ্ধে উসকানি দিয়েছিল ও বিদ্বেষ ছড়িয়েছিল এবং মুহাজিরদেরকে মদীনা থেকে বের করে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিল।
- তার নেতৃত্বে মদীনার কিছু মোনাফেক নবী করীম (সা) এর প্রিয়তমা স্ত্রী ও উম্মুল মু’মিনিন হযরত আয়েশা (রা) এর উপর মিথ্যা অপবাদ আরোপ করে তাঁর এর চরিত্র হনন করার প্রয়াস চালায়।
উহুদের যুদ্ধে বিশ্বাসঘাতকতা
আব্দুল্লাহ ইবনে উবাইয়ের অন্যতম কুখ্যাত কর্মকাণ্ড ছিল ওহুদ যুদ্ধের সময়। যুদ্ধের উদ্দেশ্যে মুসলিম বাহিনী মদীনা ত্যাগ করার পর সে প্রায় তিনশত অনুসারী নিয়ে মাঝপথ থেকে ফিরে আসে। এর ফলে মুসলিম বাহিনীর মনোবলে আঘাত লাগে এবং সামরিক শক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে।
এ ঘটনা সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন:
“আর যাতে তিনি মুনাফিকদেরও প্রকাশ করে দেন। তাদেরকে বলা হয়েছিল, ‘এসো, আল্লাহর পথে যুদ্ধ কর অথবা প্রতিরোধ কর।’ তারা বলেছিল, ‘যুদ্ধ হবে বলে জানলে আমরা অবশ্যই তোমাদের অনুসরণ করতাম।’” (সূরা আলে ইমরান, ৩:১৬৭)
আনসার–মুহাজির দ্বন্দ সৃষ্টির পাঁয়তারা
বনী মুস্তালিক গোত্রের বিরুদ্ধে অভিযানকালে একটি অনাকাঙ্খিত ঘটনা ঘটে। হযরত ওমর (রাঃ) এর একজন সহচর মুসলিম শিবিরের কাছেই মুরায়সী কূপে পানি সংগ্রহের জন যান। মদীনার খাযরাজ গোত্রের একজন মুসলিম আনসারও সে সময় কূপে পানি আনতে যান। এ সময় উভয়ের মধ্যে বচসা ও এক পর্যায়ে হাতাহাতি শুরু হয়ে যায়। উভয়েই নিজ নিজ পক্ষের লোকজনকে সাহায্যের জন্য আহ্বান জানায়। ফলে মুহাজির ও আনসার উভয় পক্ষের লোকজন সেখানে জড়ো হন।
মুনাফেক আব্দুল্লাহ্ ইবনে উবাইও মুস্তালিক অভিযানে অংশগ্রহণ করেছিল। সে এ দ্বন্দে মুহাজিরদের বিরুদ্ধে উসকানি দান ও বিদ্বেষ ছড়ানোর সুযোগ পেলো এবং ঔদ্ধত্যপূর্ণ ঘোষণা দিলো যে, ‘মদীনায় ফিরে গিয়ে সে সেখান থেকে মুহাজিরদেরকে বের করে দেবে।’ এ সংবাদ যখন নবীজী (সাঃ) কানে গেলো, তিনি তৎক্ষণাৎ এ দ্বন্দের সমাধান করেন। এ সময় হযরত ওমর (রাঃ) আব্দুল্লাহ্ ইবনে উবাইকে হত্যা করার অনুমতি চাইলে তিনি তা নাকচ করে দেন এবং দ্রুত মদীনার দিকে যাত্রা করেন।
এর জবাবে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন:
“সম্মান তো আল্লাহর, তাঁর রাসূলের এবং মুমিনদেরই; কিন্তু মুনাফিকরা তা জানে না।” (সূরা আল–মুনাফিকূন, ৬৩:৮)
আব্দুল্লাহ্ ইবনে উবাইয়ের মৃত্যুদন্ড থেকে রেহাই
আব্দুল্লাহ্ ইবনে উবাইয়ের পুত্র আব্দুল্লাহ্ ইবনে আব্দুল্লাহ্ ইবনে উবাই (রাঃ) একজন নিষ্ঠাবান মুসলমান ছিলেন। তিনি বুঝতে পারলেন, পবিত্র কুরআনের এ আয়াত নাযিলের কারণে তাঁর মুনাফেক পিতার মৃত্যুদন্ড হতে পারে। এ ব্যাপারে তিনি নবীজী (সাঃ)-কে বললেন, ‘যদি আপনি তাকে মৃত্যুদন্ড দেন তবে আমি অপনার অনুমতিক্রমে এ অনুরোধ করব যে, গোত্রগত প্রতিহিংসা যাতে মাথাচাড়া দিয়ে না উঠে সে জন্য আমি নিজেই আমার পিতার মৃত্যুদন্ড কার্যকর করব।’
মুনাফিক আব্দুল্লাহ্ ইবনে উবাই শপথ করে তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ অস্বীকার করায় নবীজী (সাঃ) তাকে মৃত্যুদন্ড থেকে রেহাই দেন।
‘ইফক’-এর অপবাদে অংশগ্রহণ
মুনাফিকদের আরেকটি জঘন্য ষড়যন্ত্র ছিল উম্মুল মুমিনীন আয়েশা (রাঃ)-এর বিরুদ্ধে মিথ্যা অপবাদ রটানো। এই অপপ্রচারের প্রধান উসকানিদাতাদের মধ্যে আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই ছিল অন্যতম। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে মুসলিম সমাজে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছিল। মহান আল্লাহ্ ওহী নাযিল করে এ মিথ্যা অপবাদটি খন্ডন করেন। তিনি সূরা আন-নূরের ১১–২০ নম্বর আয়াতে হযরত আয়িশা (রাঃ)-এর পবিত্রতা ঘোষণা করেন এবং অপবাদ রটনাকারীদের কঠোরভাবে নিন্দা করেন।
হযরত আয়েশা (রা) এর উপর আনীত মিথ্যা অপবাদের ঘটনাটি এই গ্রন্থের ২৩তম অধ্যায়ে বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হয়েছে।
মসজিদে যেরার নির্মাণ
মুনাফিকরা মুসলিম সমাজে বিভক্তি সৃষ্টি করার উদ্দেশ্যে একটি পৃথক মসজিদ নির্মাণ করে, যা ইতিহাসে “মসজিদে যেরার” নামে পরিচিত। বাহ্যিকভাবে এটি ইবাদতের স্থান মনে হলেও এর উদ্দেশ্য ছিল মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করা এবং ইসলামের শত্রুদের জন্য ঘাঁটি প্রস্তুত করা। আল্লাহ তাআলা এ সম্পর্কে বলেন:
“আর যারা একটি মসজিদ নির্মাণ করেছে ক্ষতিসাধন, কুফরী এবং মুমিনদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে…” (সূরা আত–তাওবাহ ৯:১০৭)
পরবর্তীতে আল্লাহর নির্দেশে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) সেই মসজিদে নামায আদায় করতে অস্বীকৃতি জানান এবং তা অপসারণের ব্যবস্থা করেন (সূরা আত-তাওবাহ ৯:১০৭–১১০)।
“মসজিদে যেরার” সংক্রান্ত বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে এ গ্রন্থের ২৪তম অধ্যায়ে।
মৃত্যু শয্যায় শায়িত আব্দুল্লাহ্ ইবনে উবাই এর জন্য দোয়া প্রার্থনার আবেদন
মুনাফিক আব্দুল্লাহ্ ইবনে উবাই যখন পীড়িত হয়ে মৃত্যু শয্যায় তখন তার পুত্র আব্দুল্লাহ্ ইবনে আব্দুল্লাহ্ ইবনে উবাই (রাঃ) নবীজী (সাঃ) এর নিকট এসে বললো, ’হে আল্লাহর রসূল (সাঃ) আমার পিতার ক্ষমার জন্য আল্লাহর দরবারে দোয়া করুন।’ তাঁর অনুরোধে সাড়া দিয়ে নবীজী (সাঃ) দোয়া করতে উদ্যত হলে নিম্নোক্ত আয়াতটি নাযিল হয়:
“তাদের জন্য অপনার ক্ষমা প্রার্থনা করা আর না করা উভয়ই সমান। যদি আপনি তাদের জন্য সত্তরবারও ক্ষমা প্রার্থনা করেন, তথাপি কখনোই তাদেরকে আল্লাহ ক্ষমা করবেন না। তা এজন্য যে, তারা আল্লাহকে এবং তাঁর রসূলকে অস্বীকার করেছে। বস্তুতঃ আল্লাহ না-ফামানদেরকে হেদায়েত দেন না।” (সূরা আত তাওবা, ৯:৮০)
মুনাফিকদের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে হাদীস
রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন:
“মুনাফিকের নিদর্শন তিনটি: যখন কথা বলে মিথ্যা বলে, যখন ওয়াদা করে তা ভঙ্গ করে এবং যখন আমানত রাখা হয় তখন খিয়ানত করে।” (সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৩৩; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৫৯)
আরেক বর্ণনায় এসেছে:
“চারটি স্বভাব যার মধ্যে থাকবে, সে খাঁটি মুনাফিক; আর যার মধ্যে এর একটি থাকবে, তার মধ্যে মুনাফিকির একটি স্বভাব রয়েছে— যতক্ষণ না সে তা পরিত্যাগ করে।” (সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৩৪; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৫৮)
পবিত্র কুরআনে নাযিলকৃত “সুরা মুনাফিকুনে” মহান আল্লাহ মুনাফিকদের সম্পর্কে বলেন:
- “মুনাফিকরা আপনার কাছে এসে বলেঃ আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি যে আপনি নিশ্চয়ই আল্লাহর রসূল। আল্লাহ জানেন যে, আপনি অবশ্যই আল্লাহর রসূল এবং আল্লাহ সাক্ষ্য দিচ্ছেন যে, মুনাফিকরা অবশ্যই মিথ্যাবাদী।
- “তারা তাদের শপথসমূহকে ঢালরূপে ব্যবহার করে। অতঃপর তারা আল্লাহর পথে বাধা সৃষ্টি করে। তারা যা করছে, তা খুবই মন্দ।”
- “এটা এজন্য যে, তারা বিশ্বাস করার পর পুনরায় কাফের হয়েছে। ফলে তাদের অন্তরে মোহর মেরে দেয়া হয়েছে। অতএব তারা বুঝে না।”
- “আপনি যখন তাদেরকে দেখেন, তখন তাদের দেহাবয়ব আপনার কাছে প্রীতিকর মনে হয়। আর যদি তারা কথা বলে, তবে আপনি তাদের কথা শুনেন। তারা প্রাচীরে ঠেকানো কাঠসদৃশ্য। প্রত্যেক শোরগোলকে তারা নিজেদের বিরুদ্ধে মনে করে। তারাই শত্রু, অতএব তাদের সম্পর্কে সতর্ক হোন। ধ্বংস করুন আল্লাহ তাদেরকে। তারা কোথায় বিভ্রান্ত হচ্ছে?”
- “যখন তাদেরকে বলা হয়ঃ তোমরা এস, আল্লাহর রসূল তোমাদের জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করবেন, তখন তারা মাথা ঘুরিয়ে নেয় এবং আপনি তাদেরকে দেখেন যে, তারা অহংকার করে মুখ ফিরিয়ে নেয়।“
- “আপনি তাদের জন্যে ক্ষমাপ্রার্থনা করুন অথবা না করুন, উভয়ই সমান। আল্লাহ কখনও তাদেরকে ক্ষমা করবেন না। আল্লাহ পাপাচারী সম্প্রদায়কে পথপ্রদর্শন করেন না।“
- “তারাই বলেঃ আল্লাহর রাসূলের সাহচর্যে যারা আছে তাদের জন্যে ব্যয় করো না। পরিণামে তারা আপনা-আপনি সরে যাবে। ভূ ও নভোমন্ডলের ধন-ভান্ডার আল্লাহরই কিন্তু মুনাফিকরা তা বোঝে না।”
- “তারাই বলেঃ আমরা যদি মদীনায় প্রত্যাবর্তন করি তবে সেখান থেকে সবল অবশ্যই দুর্বলকে বহিস্কৃত করবে। শক্তি তো আল্লাহ তাঁর রসূল ও মুমিনদেরই কিন্তু মুনাফিকরা তা জানে না।”
(সুরা মুনাফিকুন, ৬৩:১–৮)
মুনাফিকদের করুণ পরিণতি
মুনাফিকদের করুণ পরিণতি সম্পর্কে আল্লাহ্ তায়ালা বলেন,
♦”নিঃসন্দেহে মুনাফিকরা রয়েছে দোযখের সর্বনিম্ন স্তরে। আর তোমরা তাদের জন্য কোন সাহায্যকারী কখনও পাবে না।” (সূরা আন–নিসা, ৪:১৪৫)
♦”মুনাফিক নর-নারী সবারই গতিবিধি একরকম; শিখায় মন্দ কথা, ভাল কথা থেকে বারণ করে এবং নিজ মুঠো বন্ধ রাখে। আল্লাহকে ভুলে গেছে তার, কাজেই তিনিও তাদের ভূলে গেছেন নিঃসন্দেহে মুনাফেকরাই নাফরমান। ওয়াদা করেছেন আল্লাহ, মুনাফিক পুরুষ ও মুনাফিক নারীদের এবং কাফেরদের জন্যে দোযখের আগুনের–তাতে পড়ে থাকবে সর্বদা। সেটাই তাদের জন্যে যথেষ্ট। আর আল্লাহ তাদের প্রতি অভিসম্পাত করেছেন এবং তাদের জন্যে রয়েছে স্থায়ী আযাব।” (সূরা আত–তাওবাহ, ৯:৬৭–৬৮)
উপসংহার
আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই এবং তার অনুসারীরা বাহ্যিকভাবে মুসলমানের পরিচয় দিলেও অন্তরে ইসলাম ও মুসলমানদের কল্যাণ কামনা করত না।
- তারা ইসলামের সংকটকালে পিছু হটত,
- শত্রুদের সঙ্গে গোপন যোগাযোগ রক্ষা করত,
- অপপ্রচার চালাত এবং মুসলিম সমাজে বিভেদ সৃষ্টির অপচেষ্টা করত।
- তাদের ষড়যন্ত্রের কারণে মুসলিম সমাজ বহুবার পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছে।
তাই পবিত্র কুরআনে মুনাফিকদের ব্যাপারে বারবার সতর্ক করা হয়েছে এবং মুমিনদেরকে আন্তরিক ঈমান, সত্যবাদিতা ও আনুগত্যের উপর অটল থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এই ঘটনাবলী প্রমাণ করে যে ইসলামের জন্য বাহ্যিক শত্রুর চেয়ে অভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্রকারী মুনাফিকরা অনেক সময় অধিক বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। তাদের বিরুদ্ধে সর্বোত্তম প্রতিরক্ষা হলো দৃঢ় ঈমান, ঐক্য, সততা এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সাঃ)–এর প্রতি পূর্ণ আনুগত্য।