এ অধ্যায়ের বিষয়সমূহ
Toggleশান্তিময় পরিবেশে ইসলামের প্রচার ও প্রসার
হুদায়বিয়ার সন্ধি মুসলমানদের জীবনে এক শান্তিপূর্ণ পরিবেশের সৃষ্টি করে। কুরাইশদের সর্বাত্মক বিরোধিতা ও আগ্রাসন এতদিন যে বাধাবিপত্তির পাহাড় গড়ে তুলেছিল হুদায়বিয়ার সন্ধি তা অপসারণ করে দিলো। এখন নবী করীম (সাঃ) অনায়াসে সর্ব সাধারণ্যে ইসলাম প্রচারের কাজ চালিয়ে যেতে পারছিলেন। ফলে আরব উপদ্বীপে ইসলামের দ্রুত প্রচার ও প্রসারের কাজে নতুন গতি সঞ্চারিত হয়। ইতোমধ্যেই মদীনার বুকে একটি আদর্শ মুসলিম সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) শুধু আল্লাহর নবী ও রসূলই ছিলেন না, তাঁর পরিচয় শুধু ধর্মপ্রচারক ও আধ্যাত্মিক–গুরুর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং আধ্যাত্মিকতা ও জাগতিক সব বিষয়েই তিনি ছিলেন মানব জাতির জন্য একজন আদর্শ ব্যক্তিত্ব এবং মানুষের ইহকালীন ও পরকালীন জীবনের এক মহা পথ–প্রদর্শক। তাঁর প্রচারিত ইসলাম ধর্মের এক ও অদ্বিতীয় আল্লাহর একত্ববাদের বাণী এবং সাম্য, মৈত্রী ও শান্তির বারতা আরব এবং আরবের বাইরেও দ্রুত প্রসার লাভ ঘটতে শুরু করে। এ মহামানবের সংস্পর্শে আসার সৌভাগ্য যাঁদের হয়েছিল তাঁরা প্রত্যেকেই আলোকিত মানুষে পরিণত হয়েছিলেন। ফলে একটি কুসংস্কারবদ্ধ বর্বর সমাজ উন্নত সভ্য সমাজের মর্যাদায় উন্নীত হয়েছিল।
খয়বরের যুদ্ধ
মক্কার কুরাইশদের সাথে হুদায়বিয়র সন্ধি চুক্তি সম্পাদনের পর মদীনার দক্ষিণাঞ্চল শান্ত ছিল। তবে মদীনার নিকটবর্তী খয়বরের ইহুদী বসতি তখনও ছিল এক বিপদজনক বিষফোঁড়ার মতো। অব্যাহত অসহযোগিতা ও বিশ্বাসঘাতকতার দরুণ তাদের সাথে মুসলমানদের শান্তি প্রচেষ্টা বার বার ব্যাহত হচ্ছিল। তারা নিজেদের সাহসী যোদ্ধা মনে করতো এবং নিজেদের সুরক্ষিত দুর্গ ও প্রচুর যুদ্ধোপকরণের জন্য আত্মম্ভরিতা ও ঔদ্ধত্য প্রকাশ করতো। অবশ্য সমগ্র আরবে তাদের বিপুল শক্তিমত্তার খ্যাতি ছিল। নিজেরা একত্ববাদী ধর্মের অনুসারী বলে দাবী করলেও তারা একত্ববাদী ধর্ম ইসলাম ও মুসলিমদের প্রতি ছিল ছিল প্রচন্ড বিদ্বেষপরায়ণ। বিভিন্ন সময়ে মুসলমানদের শত্রুদের সাথে এমনকি একত্ববাদ বিরোধী পৌত্তলিকদের সাথেও তাদের বন্ধুত্ব ছিল লক্ষ্যণীয়।
হুদায়বিয়া থেকে ফিরে আসার পর এহেন পরিস্থিতিতে নবী করীম (সাঃ) খয়বরের ইহুদী গোত্রগুলোর বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত নেন। হুদায়বিয়া থেকে ফেরত সকল মুসলিমকে এ যুদ্ধে শরীক হওয়ার আহ্বান জানান তিনি। সর্বমোট ষোল শত জনের একটি বাহিনী নিয়ে তিনি খয়বর অবরোধ করেন এবং ইহুদীদেরকে আত্মসমর্পণ করার নির্দেশ দেন। কিন্তু তারা সে নির্দেশ অমান্য করে নিজেদের সুরক্ষিত দুর্গে অবস্থান নেয় এবং সেখান থেকে মুসলিম বাহিনীর উপর আক্রমণ চালাতে শুরু করে। উভয় পক্ষে প্রচন্ড আক্রমণ ও পাল্টা–আক্রমণের সূত্রপাত হয়। ইহুদীরা আশা করেছিল তাদের মিত্র বনু গাতফান গোত্রের লোকজনেরা তাদের সাহায্যার্থে এগিয়ে আসবে। কিন্তু মুসলিম বাহিনী তাদের আগমণের সকল পথ রুদ্ধ করে রেখেছিল। মুসলিম বাহিনী আক্রমণের পর আক্রমণ চালিয়ে খয়বরের দশটি দুর্ভেদ্য দুর্গ একের পর এক দখলে নিতে থাকে। অবশেষে ইহুদীদের সবগুলো দুর্গের পতন ঘটে এবং মুসলিম বাহিনীর বিজয় সাধিত হয়। যুদ্ধের পূর্বে হযরত আলী (রাঃ) চক্ষু–পীড়ায় আক্রান্ত হয়ে পড়েছিলেন। নবীজী (সাঃ) নিজ মুখের পবিত্র লালা তাঁর চোখে লাগিয়ে দিলে তিনি আরোগ্য লাভ করেন এবং এ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। তাঁর অসামান্য বীরত্ব খয়বরের দুর্গসমূহের পতন ঘটাতে সহায়ক হয়েছিল। মুসলমানদের এ বিজয় সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে পূর্ব থেকেই আভাস দেওয়া হয়েছিল:
وَ اُخْرٰی تُحِبُّوْنَهَا ؕ نَصْرٌ مِّنَ اللّٰهِ وَفَتْحٌ قَرِیْبٌ ؕ وَ بَشِّرِ الْمُؤْمِنِیْنَ
“এবং আরও একটি অনুগ্রহ দিবেন, যা তোমরা পছন্দ কর। আল্লাহর পক্ষ থেকে সাহায্য এবং আসন্ন বিজয়। মুমিনদেরকে এর সুসংবাদ দান করুন।” (৬১:১৩)
খয়বর যুদ্ধে পরাজিত ইহুদীরা সবাই আত্মসমর্পণ করে। তাদের সকল দর্প ও প্রভাব–প্রতিপত্তি চূর্ণ হয়ে যায়। নবী করীম (সাঃ) তাদেরকে খায়বর থেকে বিতাড়িত করেননি বরং তাদেরকে সেখানে বসবাসের অনুমতি দেন। অর্ধেক ফসলের বিনিময়ে তারা তাদের ক্ষেত–খামার ও ফলের বাগানে কাজ করার অনুমতি পায়। খায়বর বিজয়ের পর মদীনার উত্তর প্রান্তে শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়।
রাজা–বাদশাহর নিকট ইসলামের দাওয়াত
কুরাইশদের সথে হুদায়বিয়ার শান্তি চুক্তি ও খয়বর যুদ্ধ পরবর্তী সময়টিতে বিরাজ করছিল মোটামুটি নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ। এ সময়টি ছিল ইসলাম প্রচার ও প্রসারের এক সুবর্ণ অধ্যায়। এ অনুকূল পরিবেশে নবী করীম (সাঃ) আরবের বিভিন্ন গোত্র এবং এমনকি আরবের বাইরেও, শক্তিশালী রাজা–বাদশাহর নিকট দূত মারফৎ পত্রযোগে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছানোর কাজ শুরু করলেন। সে সময় ইসলামের দাওয়াত পত্র যেসব রাজা–বাদশাহর নিকট পাঠানো হয়েছিল তারা হলো:
-
রোম সম্রাট হীরাক্লিয়াস,
-
পারস্য সম্রাট দ্বিতীয় খসরু,
-
আবিসিনিয়ার নেগাস আরামাহ,
-
মিসরের শাসনকর্তা মারক্যুয়িস,
-
সিরিয়ার গভর্ণর হারিছ গাসছানি,
-
বাহরাইনের শাসক মুনজির ইবনে সাওয়া,
-
ওমানের যুগ্ম শাসক আব্দ ও জায়ফর,
-
ইয়েমেনের যুবরাজ হিমাইরী হারিছ ইবনে আব্দ কুলাল ও
-
ইয়েমামার রাজকন্যাদ্বয় দুমামা ও হাওযা ইবনে আলী।
এসব পত্রে ‘মুহাম্মাদুর রসূলুল্লাহ্’ নামীয় সীলমোহরাঙ্কিত ছিল। এসব চিঠির প্রতিক্রিয়া ছিল ভিন্ন ধরনের। কেহ এ আহ্বানে সাড়া দিয়ে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন, যেমন, আবিসিনিয়ার রাজা ও ইয়েমেনের যুবরাজ। দু’য়েকজন ব্যতীত অন্যরা তা বিনয়ের সাথে প্রত্যাখ্যান করেছেন। পারস্য সম্রাট অত্যন্ত বিরূপ আচরণ দ্বারা পত্রদূতকে প্রত্যাখ্যান করে এবং বুসরার গভর্ণর শোরাহবিল মুসলিম দূতকে হত্যা করে।
সম্রাট হীরাক্লিয়াসকে প্রদত্ত দাওয়াতি চিঠির অনুলিপি নিম্নে উদ্ধৃত করা হলো:
“বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম (পরম করূণাময় দয়ালু ও দাতা আল্লাহর নামে) – আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রসূল মুহাম্মদের তরফ থেকে বায়জেন্টাইনের শাসক সম্রাট হীরাক্লিয়াসের প্রতি। যে সঠিক পথে চলে তাঁর উপার আল্লাহর শান্তি বর্ষিত হোক। অধিকন্তু, আমি আপনাকে ইসলামের দিকে দাওয়াত দিচ্ছি এবং আপনি যদি ইসলাম কবুল করেন শান্তি ও নিরাপত্তা লাভ করবেন, এবং আল্লাহ্ আপনাকে দ্বিগুন পুরস্কার দিবেন। আর যদি আপনি ইসলামের দাওয়াত প্রত্যাখ্যান করেন তাহলে আপনার প্রজাদের বিপথগামীতাজনিত পাপের ভাগীদার হবেন। আল্লাহর বাণী আপনার নিকট পাঠ করছি”: (হে নবী) বলুনঃ ‘হে আহলে–কিতাবগণ! একটি বিষয়ের দিকে আস – যা আমাদের মধ্যে ও তোমাদের মধ্যে সমান -যে, আমরা আল্লাহ্ ছাড়া অন্য কারও ইবাদত করব না, তাঁর সাথে কোন শরীক সাব্যস্ত করব না এবং একমাত্র আল্লাহকে ছাড়া কাউকে পালনকর্তা বানাব না। তারপর যদি তারা স্বীকার না করে, তাহলে বলে দিন যে, ‘সাক্ষী থাক আমরা তো মুসলমান (অনুগত)।” (৩:৬৪)
রোম সম্রাট হীরাক্লিয়াস ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও তাঁর সেনাবাহিনীর ভয়ে হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর আহ্বান গ্রহণ করেননি। হযরত আনাস ইবনে মালিক বর্ণিত হাদীসে উপরোক্ত চিঠিটি লেখার পর নবীজী (সাঃ) বলেন, ‘কে আছ যে আমার এ পত্রটি সীজারের নিকট পৌঁছাবে এবং এর বিনিময়ে জান্নাত লাভ করবে?’ উপস্থিত লোকজনের একজন বললেন, ‘এমনকি আমাকে যদি হত্যা করা না হয় তবুও?’ নবীজী (সাঃ) বললেন, ‘এমনকি তোমাকে হত্যা করা না–ও হয়।’ ঐ ব্যক্তি পত্রটি সম্রাটের হাতে পৌঁছে দিলেন। চিঠি পড়া শেষ করে সম্রাট পুরোহিত প্রধানকে ডেকে পাঠালেন। তিনি এটা পড়লেন এবং আদেশ করলেন প্রাসাদের দরজাগুলো বন্ধ করে দিতে। এরপর তিনি একজনকে ঘোষণা করতে বললেন, ‘সীজার নিশ্চিতভাবে মুহাম্মদের অনুসারী হয়ে গেছে এবং খৃস্টধর্ম ত্যাগ করেছে।’ এ ঘোষণায় সশস্ত্র সৈন্যরা তাঁকে প্রাসাদের মধ্যে অবরুদ্ধ করে ফেললো। সীজার তখন নবীজী (সাঃ) এর উদ্দেশ্যে বললেন, ‘আপনি কি দেখতে পাচ্ছেন আমি আমার সাম্রাজ্যের ভয়ে ভীত?’ এরপর তিনি একজনকে ঘোষণা দিতে বললেন, ‘অবশ্যই সীজার তোমাদের প্রতি সন্তুষ্ট যে তিনি দেখতে চেয়েছিলেন তোমরা তোমাদের ধর্ম সম্পর্কে কতটা ঐকান্তিক। সুতরাং তোমরা ফিরে যাও।’ সৈন্যরা ফিরে গেলো। সীজার তখন নবী করীম (সাঃ)-কে লিখলেন, ‘অবশ্যই, আমি একজন মুসলিম,’ এবং তিনি তাঁকে কিছু স্বর্ণমুদ্রা প্রেরণ করলেন। সীজারের পত্রটি যখন তাঁকে পড়ে শুনানো হলো নবীজী (সাঃ) বললেন, ‘আল্লাহর শত্রু মিথ্যা বলেছে। সে মুসলমান নয়, সে খৃস্ট ধর্মের উপর রয়েছে।’ (সহীহ ইবনে হিসবান ৪৫০৪)
মানবজাতির প্রতি ইসলামের উদাত্ত আহবান
বিশ্বের শাসকবৃন্দের নিকট ইসলামের দাওয়াত পৌঁছানোর মাধ্যমে একত্ববাদী ধর্ম ইসলাম এক সার্বজনীন রূপ ধারণ করে। মহান আল্লাহ্ মানবতার কল্যাণে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর মাধ্যমে মানবজাতির প্রতি যে আহ্বান জানিয়েছিলেন তার মর্মার্থ ছিলো নিম্নরূপ:
فَاَقِمْ وَجْهَكَ لِلدِّيْنِ حَنِيْفًا فِطْرَتَ اللهِ الَّتِىْ فَطَرَ النَّاسَ عَلَيْهَا لَا تَبْدِيْلَ لِخَلْقِ اللهِ ذٰلِكَ الدِّيْنُ الْقَيِّمُ وَلٰكِنَّ اَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَعْلَمُوْنَ
“(হে নবী) আপনি একনিষ্ঠভাবে নিজেকে ধর্মের উপর প্রতিষ্ঠিত রাখুন। এটাই আল্লাহর প্রকৃতি, যার উপর তিনি মানুষ সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহর সৃষ্টির কোন পরিবর্তন নেই। এটাই সরল ধর্ম। কিন্তু অধিকাংশ মানুষ জানে না।” (৩০:৩০)
یٰۤاَیُّهَا النَّاسُ قَدْ جَآءَکُمْ بُرْهَانٌ مِّنْ رَّبِّکُمْ وَ اَنْزَلْنَاۤ اِلَیْکُمْ نُوْرًا مُّبِیْنًا فَاَمَّا الَّذِیْنَ اٰمَنُوْا بِاللّٰهِ وَ اعْتَصَمُوْا بِہٖ فَسَیُدْخِلُهُمْ فِیْ رَحْمَۃٍ مِّنْهُ وَ فَضْلٍ ۙ وَّ یَہْدِیْهِمْ اِلَیْهِ صِرَاطًا مُّسْتَقِیْمًا
“হে মানবকুল! তোমাদের পরওয়ারদেগারের পক্ষ থেকে তোমাদের নিকট সনদ পৌঁছে গেছে। আর আমি তোমাদের প্রতি প্রকৃষ্ট আলো (কুরআন) অবতীর্ণ করেছি। অতএব, যারা আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছে এবং তাতে দৃঢ়তা অবলম্বন করেছে, তিনি তাদেরকে স্বীয় রহমত ও অনুগ্রহের আওতায় স্থান দেবেন এবং নিজের দিকে আসার মত সরল পথে তুলে দেবেন।” (৪:১৭৪ – ১৭৫)
یٰۤاَیُّهَا النَّاسُ قَدْ جَآءَتْکُمْ مَّوْعِظَۃٌ مِّنْ رَّبِّکُمْ وَ شِفَآءٌ لِّمَا فِی الصُّدُوْرِ ۬ۙ وَ هُدًی وَّ رَحْمَۃٌ لِّلْمُؤْمِنِیْنَ قُلْ بِفَضْلِ اللّٰهِ وَ بِرَحْمَتِہٖ فَبِذٰلِكَ فَلْیَفْرَحُوْا ؕ هُوَ خَیْرٌ مِّمَّا یَجْمَعُوْنَ
“হে মানবকুল, তোমাদের পরওয়ারদেগারের পক্ষ থেকে তোমাদের কাছে উপদেশবানী (কুরআন) এসেছে, (যা) তোমাদের অন্তরের রোগের নিরাময়স্বরূপ, (এবং) মোমেনদের জন্য হেদায়েত ও রহমতস্বরূপ। (হে নবী) বলুন, আল্লাহর দয়া ও মেহেরবাণীর কারণে এরই প্রতি তাদের আনন্দতি থাকা উচিৎ। এটিই উত্তম সে সমুদয় (জ্ঞান ও সম্পদ) থেকে যা তারা (এ যাবৎ) সঞ্চয় করছে।” (১০: ৫৭ – ৫৮)
ইসলামের অগ্রযাত্রায় সাহাবাগণের অবদান
رَّبَّنَا إِنَّنَا سَمِعْنَا مُنَادِيًا يُنَادِي لِلْإِيمَانِ أَنْ آمِنُوا بِرَبِّكُمْ فَآمَنَّا ۚ رَبَّنَا فَاغْفِرْ لَنَا ذُنُوبَنَا وَكَفِّرْ عَنَّا سَيِّئَاتِنَا وَتَوَفَّنَا مَعَ الْأَبْرَارِ
“হে আমাদের পালনকর্তা! আমরা নিশ্চিতরূপে শুনেছি একজন আহ্বানকারীকে ঈমানের প্রতি আহ্বান করতে যে, তোমাদের পালনকর্তার প্রতি ঈমান আন; তাই আমরা ঈমান এনেছি। হে আমাদের পালনকর্তা! অতঃপর আমাদের সকল গোনাহ মাফ করো এবং আমাদের সকল দোষত্রুটি দূর করে দাও, আর আমাদের মৃত্যু দাও নেক লোকদের সাথে।” (৩:১৯৩)
দ্বীন–ইসলামের প্রচার কালে নবী করীম (সাঃ) এর সঙ্গ–লাভ করেন একদল হেদায়েতপ্রাপ্ত ব্যক্তিবর্গ, যারা তাঁর সাহাবা নামে খ্যাত। তাঁর সাহচর্যে থেকে তাঁরা অর্জন করেন ঈমানী দৃঢ়তা, নেক আমলের অনুপ্রেরণা এবং প্রবল আত্মিক শক্তি। নবীজী (সাঃ)-এর সাথে তাঁরা আল্লাহর দ্বীন প্রচার ও প্রসারের কাজে সর্বাত্মকভাবে আত্মনিয়োগ করেন। তাঁর নেতৃত্বে মদীনা ও তৎপার্শ্ববর্তী অঞ্চলে ইসলামের দাওয়াতের কাজ পরিচালিত হয়। আল্লাহ্ ও নবীর প্রেমে তাঁরা ছিলেন উৎসর্গীকৃত প্রাণ। দ্বীন প্রচারে তারা ছিলেন অত্যন্ত কষ্ট–সহিষ্ণু। মক্কার মুহাজির ও মদীনার আনসারদের সমন্বয়ে অভ্যুদ্বয় ঘটে এক মুসলিম উম্মাহর। মদীনার বুকে প্রতিষ্ঠিত হয় কুরআন ও সুন্নাহ্ ভিত্তিক একটি সমাজ ও রাষ্ট্র। এ নব গঠিত সমাজ ও রাষ্ট্রের সুরক্ষার কাজে সাহাবাগণ তাঁদের জান–মাল ও সর্বস্ব উৎসর্গ করে দেন। তাঁদের সর্বোচ্চ আত্মত্যাগ মহান আল্লাহর দরবারে গৃহীত হয় এবং অবশেষে ইসলাম আল্লাহর দ্বীন হিসেবে দুনিয়ার বুকে প্রতিষ্ঠিত হয়। তাঁরা এ মহান কাজের জন্য আল্লাহ্ তায়ালার সন্তুষ্টি অর্জন করেন। তাঁদের সম্পর্কে মহান আল্লাহ্ বলেন,
فَالَّذِیْنَ اٰمَنُوْا بِہٖ وَ عَزَّرُوْهُ وَ نَصَرُوْهُ وَ اتَّبَعُوا النُّوْرَ الَّذِیْۤ اُنْزِلَ مَعَہٗۤ ۙ اُولٰٓئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُوْنَ
“……সুতরাং যেসব লোক তাঁর উপর ঈমান এনেছে, তাঁর সাহচর্য অবলম্বন করেছে, তাঁকে সাহায্য করেছে এবং সে নূরের (কুরআনের) অনুসরণ করেছে যা তার সাথে অবতীর্ণ করা হয়েছে, শুধুমাত্র তারাই নিজেদের উদ্দেশ্য সাধনে সফলতা অর্জন করতে পেরেছে।” (৭:১৫৭)
মহান আল্লাহ্ রব্বুল আলামীনের ভাষ্য অনুযায়ী নবী করীম (সাঃ)-এর সাহাবাগণ ছিলেন দ্বীন–ইসলামের খেদমতকারী সর্বোত্তম উম্মত। তাঁদেরকে মানবজাতির কল্যাণের জন্য মনোনীত করা হয়েছিল। তাঁরা নবীজীর (সাঃ) কাছ থেকে সরাসরি দ্বীনের শিক্ষা পেয়েছিলেন। তাই মহান আল্লাহ্ তাঁদেরকে তাঁর দ্বীনের প্রচার ও প্রসারে তাঁর প্রিয় নবীর (সাঃ) সাহায্যকারী ও দায়িত্ববহনকারী হিসেবে পছন্দ করেছেন। নবীজী (সাঃ) এর সংস্পর্শে তাঁদের অন্তর হয়ে উঠেছিল পবিত্র, পরিশুদ্ধ ও খাঁটি ঈমানে পরিপূর্ণ। তাঁরা সবাই নেক কাজে একে অপরের সাথে প্রতিযোগিতা করতেন, অন্যের প্রয়োজনকে নিজের প্রয়োজনের চেয়ে বেশী মূল্য দিতেন এবং সৎ কাজে আদেশ ও অসৎ কাজে নিষেধ করতেন। নবীজী (সাঃ)-কে তাঁরা নিজের জান–মাল ও সন্তান–সন্ততির চেয়েও বেশী ভালবাসতেন। আল্লাহ্ ও রাসূলের আনুগত্যে তাঁরা ছিলেন পুরোপুরি আত্মসমর্পিত। দ্বীনের প্রতি তাঁদের ভালবাসা ও আত্মোৎসর্গ ছিল সমগ্র উম্মতের জন্য এক অনুকরণীয় আদর্শস্বরূপ। রসূলুল্লাহ্ (সাঃ) তাঁর সাহাবাগণকে উজ্জ্বল নক্ষত্রের সাথে তুলনা করেছেন। বিভিন্ন হাদীসে তাঁদের উচ্চ মর্যাদার কথা বর্ণিত হয়েছে। পবিত্র কুরআনেও মহান আল্লাহ্ তাঁদের মহৎ অবদানের স্বীকৃতি দিয়ে বলেছেন:
وَ اِذَا جَآءَكَ الَّذِیْنَ یُؤْمِنُوْنَ بِاٰیٰتِنَا فَقُلْ سَلٰمٌ عَلَیْکُمْ كَتَبَ رَبُّکُمْ عَلٰی نَفْسِهِ الرَّحْمَۃَ ۙ اَنَّہٗ مَنْ عَمِلَ مِنْکُمْ سُوْٓءًۢ ابِجَهَالَۃٍ ثُمَّ تَابَ مِنْۢ بَعْدِہٖ وَ اَصْلَحَ فَاَنَّہٗ غَفُوْرٌ رَّحِیْمٌ
“(হে নবী) আর যখন তারা আপনার কাছে আসবে যারা আমার নিদর্শনসমূহে বিশ্বাস করে, তখন আপনি বলে দিন: তোমাদের উপর শান্তি বর্ষিত হোক। তোমাদের পালনকর্তা রহমত করা নিজ দায়িত্বে লিখে নিয়েছেন যে, তোমাদের মধ্যে যে কেউ অজ্ঞতাবশতঃ কোন মন্দ কাজ করে, অনন্তর এরপরে তওবা করে নেয় এবং সৎ হয়ে যায়, তবে তিনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল, করুণাময়।” (৬:৫৪)
الَّذِينَ آمَنُوا وَهَاجَرُوا وَجَاهَدُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ بِأَمْوَالِهِمْ وَأَنفُسِهِمْ أَعْظَمُ دَرَجَةً عِندَ اللَّهِ ۚ وَأُولَـٰئِكَ هُمُ الْفَائِزُونَ يُبَشِّرُهُمْ رَبُّهُم بِرَحْمَةٍ مِّنْهُ وَرِضْوَانٍ وَجَنَّاتٍ لَّهُمْ فِيهَا نَعِيمٌ مُّقِيمٌ خَالِدِينَ فِيهَا أَبَدًا ۚ إِنَّ اللَّهَ عِندَهُ أَجْرٌ عَظِيمٌ
“যারা ঈমান এনেছে, দেশ ত্যাগ করেছে এবং আল্লাহর রাহে নিজেদের জান ও মাল দিয়ে জিহাদ করেছে, তাদের বড় মর্যাদা রয়েছে আল্লাহর কাছে আর তারাই সফলকাম। তাদের সুসংবাদ দিচ্ছেন তাদের পরওয়ারদেগার স্বীয় দয়া ও সন্তোষের এবং জান্নাতের, সেখানে আছে তাদের জন্য স্থায়ী শান্তি। তথায় তারা থাকবে চিরদিন। নিঃসন্দেহে আল্লাহর কাছে আছে মহাপুরস্কার।” (৯:২০–২২)