২১ তম অধ্যায় : মক্কা বিজয় পরবর্তী ঘটনাসমূহ

হাওয়াযিন গোত্রের ষড়যন্ত্র ও হুনায়েন অভিযান

অষ্টম হিজরী সাল। মক্কা বিজয়ের অব্যাহতি পরেই নবী করীম (সাঃ) গোপনসূত্রে খবর পেলেন হুনায়েন উপত্যকার মুশরিক হাওয়াযিন গোত্রপতি মালেক ইবনে আওফ মক্কা অভিযানের প্রস্তুতি গ্রহণ করছে। যে কোন সময় তারা অতর্কিত আক্রমণ চালাতে পারে। মক্কায় পৌত্তলিক কুরাইশদের পতনে হাওয়াযিন গোত্রপতি মনে করলো, এবার মুসলিম বাহিনী তাদেরকে লক্ষ্যস্থল বানাবে। তাই সে পার্শ্ববর্তী বন্ধু গোত্র বনু সাকীফ,বনু নাসার ও বনু জুশামকে সংঘবদ্ধ করে আগাম অতর্কিত হামলার পরিকল্পনা নেয়। সে ছিল একজন সাহসী যুবক এবং দুর্ধর্ষ যোদ্ধা এবং তার পক্ষে ছিল প্রচুর জনসমর্থন। সে সব গোত্রের  লোকজন ও তাদের পরিবার–পরিজনকে একত্রিত করে। এমনকি তাদের পশুপালসহ এক বিরাট যুদ্ধ–সমাবেশ ঘটায়। নবী করীম (সাঃ) তার এ যুদ্ধ পরিকল্পনা নস্যাৎ করতে মুসলিম বাহিনীকে নির্দেশ দিলেন। মক্কা অভিযানের দশ সহস্র মুহাজির–আনসার বাহিনীর সাথে যুক্ত হলো কুরাইশ নেতা আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বে আরও দুই হাজার মক্কাবাসী নব্য মুসলিম বাহিনী। এ বিরাট বাহিনীর সমাবেশ মুসলমানদের মধ্যে উৎফুল্লভাব সৃষ্টি করে।

হাওয়াযিন উপত্যকাটি ছিল মক্কা থেকে তায়েফগামী রাস্তার পাশে অবস্থিত। এ পথ ধরে মুসলিম বাহিনীর যুদ্ধযাত্রা করলো। এ সংবাদ হাওয়াযিন গোত্রপতি মালেক ইবনে আওফের নিকট পৌঁছুলে সে তৎক্ষণাৎ চার হাজার সৈন্যকে পথিপার্শ্বস্থ গিরিখাদের বিভিন্ন জায়গায় অবস্থান নেওয়ার নির্দেশ দেয়। মুসলিম বাহিনী তাদের নিকটবর্তী হওয়ামাত্র তারা প্রস্তর ও তীর নিক্ষেপ দ্বারা অতর্কিত আক্রমণ শুরু করে। তাদের এ আকস্মিক আক্রমণে মুসলিম বাহিনীর  কয়েকজন সেনা শহীদ হলেন। ফলে মুসলিম শিবিরে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয় এবং পিছু হটতে বাধ্য হয়। অনেকেই পলায়নপর হয়ে উঠে।

এ কঠিন পরিস্থিতিতে নবী করীম (সাঃ) দৃঢ় চিত্তে ও উচ্চ কন্ঠে সবাইকে স্থির থাকার আহ্বান জানান। তিনি মহান আল্লাহর দরবারে সাহায্য প্রার্থনা করেন এবং এক মুষ্টি ধূলি শত্রু বাহিনীর দিকে নিক্ষেপ করে তাদের হীন পরাজয় কামনা করেন। এ সময় তাঁর পাশে ছিলেন হযরত আবু বকর (রাঃ), হযরত ওমর (রাঃ) হযরত আলী (রাঃ), হযরত আব্বাস (রাঃ), হযরত উসামা ইবনে যায়েদ (রাঃ), হযরত আব্দুল্লাহ্ ইবনে মাসুদ, হযরত ফজল ইবনে আব্বাস (রাঃ), হযরত আয়মান ইবনে উবায়েদ (রাঃ), হযরত আবু সুফিয়ান, প্রমুখ। তাঁদের মধ্যে হযরত আয়মান ইবনে উবায়েদ (রাঃ) শত্রুর আক্রমণে শাহাদত বরণ করেন। হযরত অব্বাস (রাঃ) ব্যাঘ্রগর্জনে মুসলিম সেনাদের ঘুরে দাঁড়ানোর ডাক দেন। দ্রুতই মুসলিম বাহিনীর মধ্যে শৃঙ্খলা ফিরে আসে এবং পাল্টা আক্রমণ চালিয়ে তাঁরা শত্রুদের পরাস্ত করেন। শত্রু বাহিনীর প্রচুর সংখ্যক সেনা নিহত হয়, বহু লোক বন্দীত্ব বরণ করে এবং তাদের বিপুল পরিমাণ ধনসম্পদ ও পশুপাল মুসলমানদের হস্তগত হয়। এ যুদ্ধ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ্ পবিত্র কুরআনে বলেন:

لَقَدْ نَصَرَكُمُ اللَّهُ فِي مَوَاطِنَ كَثِيرَةٍ ۙ وَيَوْمَ حُنَيْنٍ ۙ إِذْ أَعْجَبَتْكُمْ كَثْرَتُكُمْ فَلَمْ تُغْنِ عَنكُمْ شَيْئًا وَضَاقَتْ عَلَيْكُمُ الْأَرْضُ بِمَا رَحُبَتْ ثُمَّ وَلَّيْتُم مُّدْبِرِينَ۝ ثُمَّ أَنزَلَ اللَّهُ سَكِينَتَهُ عَلَىٰ رَسُولِهِ وَعَلَى الْمُؤْمِنِينَ وَأَنزَلَ جُنُودًا لَّمْ تَرَوْهَا وَعَذَّبَ الَّذِينَ كَفَرُوا ۚ وَذَٰلِكَ جَزَاءُ الْكَافِرِينَ۝ ثُمَّ يَتُوبُ اللَّهُ مِن بَعْدِ ذَٰلِكَ عَلَىٰ مَن يَشَاءُ ۗ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ۝

“আল্লাহ তোমাদের সাহায্য করেছেন অনেক ক্ষেত্রে এবং হুনায়েনের দিনে, যখন তোমাদের সংখ্যাধিক্য তোমাদের প্রফুল্ল করেছিল, কিন্তু তা তোমাদের কোন কাজে আসেনি এবং পৃথিবী প্রশস্ত হওয়া সত্ত্বেও তোমাদের জন্য সংকুচিত হয়েছিল। অতঃপর পৃষ্ঠ প্রদর্শন করে পলায়ন করেছিলে। তারপর আল্লাহ নাযিল করেন নিজের পক্ষ থেকে সান্ত্বনা, তাঁর রসূল ও মুমিনদের প্রতি এবং অবতীর্ণ করেন এমন সেনাবাহিনী যাদের তোমরা দেখতে পাওনি। আর শাস্তি প্রদান করেন কাফেরদের এবং এটি হল কাফেরদের কর্মফল। এরপর আল্লাহ যাদের প্রতি ইচ্ছা তওবার তওফীক দেবেন, আর আল্লাহ অতীব ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” (৯:২৫ – ২৭)

 

হাওয়াযিন গোত্রের প্রতি অনুকম্পা প্রদর্শন

পরাজিত হাওয়াযিন গোত্রের অনেকেই ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে। যুদ্ধে তাদের সমূহ ক্ষয়ক্ষতির কথা তুলে ধরে নবীজী (সাঃ) এর নিকট তাঁর অনুকম্পা ও সুবিবেচনা কামনা করে।  তিনি তাদের প্রতি সদয় হন এবং জানতে চান সম্পদ না পরিবার–পরিজন কোনটি তাদের কাছে বেশী কাম্য। তারা সম্পদের বদলে শিশু ও  নারীদের বন্দীদশা থেকে মুক্তি দেওয়ার অনুরোধ জানায়। তিনি তাদেরকে পরামর্শ দিয়ে বললেন, ‘এ অনুরোধটি সর্ব সমক্ষে করতে হবে। আমি তখন আমার অংশে যেসব বন্দী আসবে আমি তাদের মুক্ত করে দেব।’ সে অনুযায়ী তারা যখন সবার সামনে এ অনুরোধ জানালো তখন প্রথমে তিনি তাঁর নিজের ও বনু মুত্তালিবের অংশ ফেরত দেওয়ার ঘোষণা দিলেন। এটা শুনে মুহাজির ও আনসারগণও তাদের অংশ আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের নামে ফেরত দেওয়ার ঘোষণা দিলো। তবে বনু তামীম ও বনু সুলায়েম গোত্রের কয়েকজন এতে অসম্মতি জানায়। নবীজী (সাঃ) আশ্বাস দিলেন যে, পরবর্তীতে এর বিনিময়ে তাদেরকে অধিক পরিমাণে দেওয়া হবে। তখন তারাও তাদের অংশ ফেরত দিতে রাজী হন। এতে  হাওয়াযিন গোত্রের নব্য মুসলমানগণ স্বস্তি ও সন্তুষ্টি লাভ করেন।

হাওয়াযিন গোত্রপতি মালেক ইবনে আওফ পালিয়ে তায়েফের সাকীফ গোত্রে আশ্রয় নেয়। নবী করীম (সাঃ) ঘোষণা দিলেন – সে আত্মসমর্পণ করে ইসলাম গ্রহণ করলে তার পরিবার–পরিজনকে মুক্তি দেওয়া হবে এবং একই সাথে সে একশত উটও পাবে। এ ঘোষণা শ্রবণ করে মালেক নবীজী (সাঃ) এর সকাশে হাজির হয় এবং ইসলাম গ্রহণ করে। প্রতিশ্রুতি মোতাবেক পরিবার–পরিজনসহ একশত উট তাকে দেওয়া হয়। এর ফলে পুরো গোত্রই ইসলামের পতাকা তলে এসে যায়। হাওয়াযিন গোত্রের প্রতি তাঁর এ অনুকম্পা মহানুভবতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত বহন করে।

 

তায়েফ অভিযান

নবী করীম (সাঃ) হুনায়েন যুদ্ধের অব্যাহতি পর তায়েফ অভিযানে রওয়ানা দেন। হুনায়েনে হাওয়াযিন গোত্রের সাথে তায়েফের সাকীফ গোত্রও মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল। কৃষি–সমৃদ্ধ তায়েফ উপত্যকা ছিল একটি সুরক্ষিত অঞ্চল। তাদের দুর্গগুলোও ছিল অত্যন্ত সুরক্ষিত এবং অর্থনৈতিক দিক থেকেও তারা ছিল স্বচ্ছল। মুসলিম সৈন্যবাহিনীর অভিযানের খবর পেয়ে তায়েফবাসী শহরের প্রবেশ দ্বার বন্ধ করে দেয়। সেখানে পৌঁছে নবীজী (সাঃ) দুর্গের পাদদেশে শিবির স্থাপন করেন। সুরক্ষিত দুর্গে অবস্থানরত তায়েফের যোদ্ধারা মুসলিম শিবিরে তীর নিক্ষেপ শুরু করে। মুসলিম শিবিরগুলো ওদের তীরের আওতায় পড়ায় কয়েকজন মুসলমান হতাহত হন। এরপর শিবিরগুলোকে পিছিয়ে আনা হলো।

খায়বর যুদ্ধের মতো এখানেও একই যুদ্ধ কৌশল গ্রহণ করা হলো। মুসলিম বাহিনী অবরোধের সাথে সাথে প্রতি-আক্রমণ শুরু করলেন। তাঁরা ’মিনজানিক’ নামীয় শকট থেকে প্রস্তর-গোলা নিক্ষেপ করে দুর্গের প্রাচীর ধ্বংস করতে লাগলেন। কিন্তু প্রতিপক্ষ দুর্গের উপর থেকে অগ্নি-বোমা নিক্ষেপ করে শকটটি ধ্বংস করে দেয়। এমতাবস্থায় অবরোধ দীর্ঘায়িত করা ছাড়া যুদ্ধ চালানো দুঃসাধ্য হয়ে পড়ে। কিন্তু তাতেও দু’টি বাধা ছিল – প্রথমত দুর্গে দীর্ঘদিন অবস্থান করার মত প্রচুর খাদ্য সামগ্রী ও যুদ্ধাস্ত্র তায়েফবাসীর কাছে মজুত ছিল। দ্বিতীয়ত আরবের প্রচলিত রীতি অনুযায়ী যুদ্ধ–নিষিদ্ধ মাস ছিল অত্যাসন্ন এবং একই সাথে হজ্জ্ব মওসূমও সমাগত হওয়ায় অবরোধ প্রলম্বিত করা মুসলমানদের পক্ষে সম্ভবপর ছিল না।

এহেন পরিস্থিতিতে নবী করীম (সাঃ) সর্বশেষ একটি কৌশলের আশ্রয় নেন। তায়েফবাসীর মূল্যবান ফলের বাগানগুলো ধ্বংস করার পরিকল্পনা করেন যাতে তারা তাদের সম্পদ রক্ষার্থে দুর্গ থেকে বেরিয়ে আসে। তিনি তাদের বাগানগুলোতে অগ্নি–সংযোগ ও বৃক্ষ কর্তনের নির্দেশ দেন। তাঁর এ পরিকল্পনা ফলপ্রসূ হয়। কয়েকটি বাগানে অগ্নি সংযোগ ও বৃক্ষ কর্তন শুরু হলে তায়েফের একটি প্রতিনিধিদল নবীজী (সাঃ) এর সাথে সাক্ষাৎ করে তাদের প্রিয় ফল বাগানগুলো ধ্বংস না করার অনুরোধ জানায় এবং বলে এসব বাগানের অধিকার তিনি নিতে পারেন অথবা আত্মীয়তার খাতিরে তিনি এগুলো তাদের কাছেও রেখে দিতে পারেন। তাদের প্রস্তাবে সম্মতি দিয়ে তিনি বাগান ধ্বংসের কাজ বন্ধ করে দেন এবং তাদেরকে বলেন, যারা তাঁর কাছে আশ্রয় নেবে তিনি তাদের নিরাপত্তা দান করবেন। এরপর তিনি অবরোধ প্রলম্বিত করা সমীচীন মনে করলেন না এবং হজ্জ্ব পালনের উদ্দেশ্যে মক্কার দিকে ফিরে গেলেন।

 

হুনায়েনের যুদ্ধলব্ধ সম্পদের বন্টন

তায়েফ থেকে মক্কা ফেরার পথে জিরানা নামক এক স্থানে নবীজী (সাঃ) মুসলিম বাহিনীসহ যাত্রা বিরতি করেন। এ স্থানটিতেই হুনায়েনের যুদ্ধলব্ধ সম্পদ জমা করা হয়েছিল। তিনি সিদ্ধান্ত নেন যে গনীমতের মাল এখান থেকেই বন্টন করা হবে। এ মালের পরিমাণ এত বিশাল ছিল যে ইতোপূর্বে মুসলমানগণ তা কখনোই লাভ করেননি। নওমুসলিমদের ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করতে গনীমতের মাল বন্টনে বেশ উদারতা প্রদর্শন করেন। ফলে যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী কিছু সংখ্যক মুসলিমের মনে এর ভাগ–বাটোয়ারা নিয়ে দ্বিধা-দ্বন্দের সৃষ্টি হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে আবেগ ও উদ্বেগ দু’টোই কাজ করছিলো। নবীজী (সাঃ) এর এরূপ উদার বন্টনের কারণে তাদের মধ্যে শঙ্কা জাগে যে গনীমতের মালে তাদের অংশের কমতি হতে পারে। নবী করীম (সাঃ) তাঁদের মনোভাব বুঝতে পেরে অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে এ সংক্রান্ত প্রতিটি অনুযোগ ও উৎকন্ঠার নিরসন করেন। তিনি সবাইকে ডেকে বললেন, ‘এরূপ আশঙ্কা অমূলক – তোমাদের মালে আমার কোন লোভ নেই। তোমরা তোমাদের অংশ পাবে এবং আমার এক পঞ্চমাংশ থেকেও তোমাদেরকে দেওয়া হবে।’ এছাড়া তিনি সবাইকে সতর্ক করে বলেন, তারা যেন নিজেদের কাছে রক্ষিত গনীমতের সকল মালামাল এক জায়গায় সমবেত করে এবং কারো কাছে যেন বিন্দুমাত্র কোন কিছু অবশিষ্ট না থাকে। অন্যথায় তারা ক্বিয়ামত পর্যন্ত অপমানিত ও লাঞ্ছিত হবে।

নবীজী (সাঃ) কর্তৃক হাওয়াযিন গোত্রের নব্য মুসলিমদের প্রতি অপূর্ব বদান্যতা প্রদর্শনের পর মক্কার নও–মুসলিমদের প্রতিও তাঁর রহমতের দৃষ্টিপাত হয়। তিনি গনীমতে তাঁর এক পঞ্চমাংশ সম্পদ থেকে কুরাইশ নেতা আবু সুফিয়ানসহ মক্কার নেতৃস্থানীয় দশজন নওমুসলিম ব্যক্তির প্রত্যেককে একশতটি করে উট দান করেন। এছাড়াও অন্যসব বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ প্রত্যেকে পঞ্চাশটি করে উট পান। নবীজী (সাঃ) এর মহত্ত্ব ও উদারতায় মক্কার নওমুসলিমগণ মুগ্ধ ও বিমোহিত হন। কয়েকদিন আগেও যারা ছিল তাঁর প্রাণঘাতী শত্রু – ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আসার পর তারা এখন কতই না আপনজন! দীর্ঘদিনের শত্রুতার অবসান ঘটিয়ে তাদের মধ্যে বইতে শুরু করলো শান্তির সুবাতাস।

নবীজী (সাঃ) মক্কার নওমুসলিমদের মধ্যে উদার হস্তে গনীমতের মালামাল বন্টন করায় আনসারগণের মধ্যে ঈর্ষাভাব জাগ্রত হয়। তাঁরা মনে করেন, আপনজন হিসেবে তিনি মক্কাবাসীর প্রতি এমন উদারতা প্রদর্শন করেছেন। হযরত সাআদ ইবনে উবাদ (রাঃ) মারফৎ তিনি তাঁদের এ মনোভাবের কথা জানতে পেরে সকল আনসারকে একত্রিত করেন। তিনি তাঁদের উদ্দেশ্যে বলেন. ‘হে আনসারবৃন্দ! এটা কি সত্য নয় – তোমরা যখন পথভ্রষ্ট ছিলে মহান আল্লাহ্ তোমাদের পথভ্রষ্টতা দূর করে সত্যপথ প্রদর্শন করেছেন, তোমরা পরস্পর শত্রু ছিলে তিনি তোমাদের মধ্যে ভ্রাতৃবোধ ও সম্প্রীতি সৃষ্টি করে দিয়েছেন, তোমরা ছিলে দরিদ্র তিনি তোমাদেরকে স্বচ্ছলতা দান করেছেন?’ উত্তরে তাঁরা বললেন, ‘ইয়া রসূলুল্লাহ্! মহান আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের তরফ থেকে আমরা অশেষ নিয়ামত লাভ করেছি।’ নবীজী (সাঃ) তাঁদের নিকট থেকে আরও বেশী কিছু জানতে চান, কিন্তু তাঁরা কি বলবেন তা বুঝতে পারছিলেন না। তখন তিনি তাঁদেরকে বললেন, ‘আমি তোমাদের কাছে আরও স্পষ্ট জবাব আশা করেছিলাম – যদি তোমরা বলতে, ‘যখন সবাই আপনাকে অবিশ্বাস করেছিল তখন আমরা আপনাকে সত্যনবী বলে বিশ্বাস করেছি, যখন স্বজাতি আপনাকে মাতৃভূমি থেকে বহিষ্কার করেছিল তখন আমরা আপনাকে আশ্রয় দিয়েছি, যখন সবাই আপনাকে পরিত্যাগ করেছিল আমরা আপনার সাহায্যে এগিয়ে এসেছি, আপনার দুঃখ–কষ্টে আমরা সমব্যথী হয়েছি।’ এরপর তিনি তাঁদের উদ্দেশ্যে বললেন, ‘নও–মুসলিমদেরকে ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করার জন্য দুনিয়াবী কিছু সম্পদ তাদের দিয়েছি। এতে তোমাদের মনোকষ্টের কিছু নেই – কারণ তোমরা দৃঢ় ঈমানের বলে বলীয়ান। তারা যা পেয়েছে তা হলো কিছু উট, ছাগল, ভেড়া – আর তোমরা সঙ্গে নিয়ে যাবে আল্লাহর রসূলকে। এতে কি তোমরা সন্তুষ্ট নও?’ এরপর তিনি আনসার ও তাদের পরিবার-পরিজনের জন্য দোয়া করলেন। নবী করীম (সাঃ) এর এসব কথায় আনসারগণ আবেগোচ্ছ্বসিত হয়ে কেঁদে ফেললেন এবং বলতে থাকেন, ‘আমরা নবীজী (সাঃ)-কে পেয়েই সন্তুষ্ট।’ নবী করীম (সাঃ) তাঁর অসাধারণ প্রজ্ঞা ও বিচক্ষণতা দিয়ে গনীমতের মালামালের বন্টন এমনভাবে সম্পন্ন করেন যে, অবশেষে সকল দ্বিধা–দ্বন্দ কাটিয়ে সবাই সন্তুষ্টি অর্জন করতে পেরেছিল।

 

মক্কার প্রতিনিধিত্ব ও কা’বা শরীফের দায়িত্বভার অর্পণ

তায়েফ অবরোধ এবং জিরানায় হুনায়েনের যুদ্ধলব্ধ সম্পদ বন্টন শেষে নবী করীম (সাঃ) হজ্জ্ব ও ওমরা পালনের জন্য মক্কা অভিমুখে যাত্রা করেন। সেখানে পৌঁছে তিনি হজ্জ্ব ও ওমরা পালন সম্পন্ন করে মক্কায় তাঁর প্রতিনিধি নিযুক্ত করেন। হযরত আত্তাব ইবনে উসায়দ (রাঃ)-কে তিনি তাঁর প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ দান করেন। মক্কাবাসী নব্য মুসলমানদেরকে ইসলামের বিধি–বিধান ও কুরআন শিক্ষা প্রদানের জন্য তিনি হযরত মুআজ ইবনে জাবাল (রাঃ)-কে তাঁর প্রতিনিধি নিয়োগ দেন। এ ছাড়া তিনি কা’বা শরীফের ব্যবস্থাপনার দায়িত্বও বন্টন করেন। মক্কার কুরাইশদের বিভিন্ন গোত্র কা’বা শরীফের ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করতো। এসব দায়িত্বের মধ্যে শুধুমাত্র কা’বা গৃহের চাবি সংরক্ষণ এবং হাজীদের পানি পান করানো ও তাদের সেব–যত্নের দায়িত্ব ছাড়া অন্য সব দায়িত্ব তিনি বিলোপ করে দেন। যমযম কূপের পানি পান করানোর দায়িত্ব পান হযরত আব্বাস ইবনে আব্দুল মুত্তালিব (রাঃ)। উল্লেখ্য যে, তাঁর পিতা আব্দুল মুত্তালিব যমযম কূপটি পুনর্খনন করে এর পানি হাজীদের পান করানোর ব্যবস্থাটি চালু করেছিলেন। উত্তরাধিকার সূত্রে হযরত আব্বাস (রাঃ) এর উপর পানি পান করানোর দায়িত্ব বহাল থাকে। কা’বা গৃহের চাবি সংরক্ষণের দায়িত্ব পান হযরত ওসমান ইবনে তালহা ও তাঁর উত্তরাধিকারীগণ। বংশ–পরম্পরাগতভাবে তাঁরাই এ দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন এবং ভবিষ্যতেও তাঁরা এ দায়িত্ব পালন করতে থাকবেন। তাই এর কোন ব্যত্যয় ঘটানো যাবে না। নবীজী (সাঃ) এর এ সুন্দর ব্যবস্থাপনা সবাই খুশী মনে মেনে নেয়।

অধ্যায়সমূহ