এ অধ্যায়ের বিষয়সমূহ
Toggleযাকাত ব্যবস্থাপনার প্রবর্তন
সুপ্রাচীন তীর্থভূমি মক্কা বিজয়ের পর আরববাসীর নিকট ইসলাম ধর্মের মর্যাদা যেমন সমুন্নত হয় তেমনি মুসলমানদের প্রভাব–প্রতিপত্তি ও আর্থিক অবস্থারও পরিবর্তন ঘটে। ইসলামে যাকাত একটি বাধ্যতামূলক আর্থিক ইবাদত। সালাতের সাথে শুরুতেই যাকাতের বিধানও চালু ছিল। তবে মদীনায় হিজরতের পর এর পরিপূর্ণ বিধি–বিধান চালু করা হয়। আর্থিকভাবে সামর্থ্যবান ও সম্পদশালী মুসলমানের জন্য যাকাত আদায় করা ফরয। মুসলমানদের মধ্যে অনেকেই আর্থিক সক্ষমতা লাভ করায় যাকাত প্রদান তাদের জন্য বাধ্যতামূলক হয়ে পড়ে। প্রতি বছর ধনীর সম্পদ থেকে নির্ধারিত হারে যাকাতের অর্থ ও মাল আদায় এবং তা গরীব জনগোষ্ঠীর মধ্যে বণ্টন করার ব্যবস্থাপনা প্রবর্তিত হয়।
নবী করীম (সাঃ) রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় সামর্থ্যবান মুসলমানদের কাছ থেকে যাকাত সংগ্রহ ও তা দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে বণ্টনের ব্যবস্থা করেন। অমুসলিম জনগণের কাছ থেকে যিযিয়া কর আদায়ের ব্যবস্থাও করেন তিনি। এতে একটি জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্রীয় অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে উঠে। তিনি উদ্বৃত্ত ভূমিজ সম্পদের এক–দশমাংশ এবং উদ্বৃত্ত অর্থবিত্তের ২.৫ শতাংশ যাকাত হিসেবে আদায় করার নির্দেশ জারী করেন। এজন্য তিনি একজন তত্ত্বাবধায়কের অধীনে প্রয়োজনীয় সংখ্যক সংগ্রাহক কর্মচারী নিযুক্ত করেন এবং তাদেরকে বিভিন্ন স্থানে যাকাত ও উশর আদায়ের জন্য প্রেরণ করেন। তাদের উপর নির্দেশ ছিল যে তারা যেন যাকাতদাতার মূলধনের উপর হস্তক্ষেপ না করে।
ইসলাম যাকাত ব্যবস্থার মাধ্যমে ধনীর সম্পদে গরীবের অধিকার প্রতিষ্ঠিত করেছে। যাকাত অর্থ ও সম্পদকে পবিত্র ও বরকতময় করে তোলে। যাকাত আদায়ের মাধ্যমে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি, আধ্যাত্মিক উন্নয়ন ও পরার্থপরতা অর্জন সম্ভব হয় এবং সম্পদের উপর আল্লাহর রহমত ও বরকত বর্ষিত হয়। নবী করীম (সাঃ) প্রবর্তিত এ যাকাত ব্যবস্থা মুসলিম সমাজ ও রাষ্ট্রে আজ অবধি এক মহান কল্যাণমূলক ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। ইসলামে নামাযের মতো যাকাতের গুরুত্বও অপরিসীম। পবিত্র কুরআনের বহু আয়াতে নামাযের সাথে সাথে যাকাত আদায়ের তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
وَ الَّذِیْنَ فِیْۤ اَمْوَالِهِمْ حَقٌّ مَّعْلُوْمٌ لِّلسَّآئِلِ وَ الْمَحْرُوْمِ
“এবং যাদের ধন–সম্পদে নির্ধারিত হক আছে – ভিক্ষুকদের ও বঞ্চিতদের।” (৭০:২৪ – ২৫)
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَنفِقُوا مِن طَيِّبَاتِ مَا كَسَبْتُمْ وَمِمَّا أَخْرَجْنَا لَكُم مِّنَ الْأَرْضِ ۖ وَلَا تَيَمَّمُوا الْخَبِيثَ مِنْهُ تُنفِقُونَ وَلَسْتُم بِآخِذِيهِ إِلَّا أَن تُغْمِضُوا فِيهِ ۚ وَاعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ غَنِيٌّ حَمِيدٌ
“হে ঈমানদারগণ! তোমরা স্বীয় উপার্জন থেকে এবং যা আমি তোমাদের জন্যে ভূমি থেকে উৎপন্ন করেছি, তা থেকে উৎকৃষ্ট বস্তু ব্যয় কর এবং তা থেকে নিকৃষ্ট জিনিস ব্যয় করতে মনস্থ করো না। কেননা, তা তোমরা কখনও গ্রহণ করবে না; তবে যদি তোমরা চোখ বন্ধ করে নিয়ে নাও। জেনে রেখো, আল্লাহ অভাব মুক্ত, প্রশংসিত।” (২:২৬৭)
خُذْ مِنْ اَمْوَالِهِمْ صَدَقَۃً تُطَهِرُهُمْ وَ تُزَكِیْهِمْ بِهَا وَ صَلِّ عَلَیْهِمْ ؕ اِنَّ صَلٰوتَكَ سَكَنٌ لَّهُمْ ؕ وَ اللّٰهُ سَمِیْعٌ عَلِیْمٌ اَلَمْ یَعْلَمُوْۤا اَنَّ اللّٰهَ هُوَ یَقْبَلُ التَّوْبَۃَ عَنْ عِبَادِہٖ وَ یَاْخُذُ الصَّدَقٰتِ وَ اَنَّ اللّٰهَ هُوَ التَّوَّابُ الرَّحِیْمُ
“তাদের মালামাল থেকে যাকাত গ্রহণ করুন যাতে আপনি সেগুলোকে পবিত্র করতে এবং সেগুলোকে বরকতময় করতে পারেন এর মাধ্যমে। আর আপনি তাদের জন্য দোয়া করুন, নিঃসন্দেহে আপনার দোয়া তাদের জন্য সান্ত্বনাস্বরূপ। বস্তুত আল্লাহ সবকিছুই শুনেন, জানেন। তারা কি একথা জানতে পারেনি যে, আল্লাহ নিজেই স্বীয় বান্দাদের তওবা কবুল করেন এবং যাকাত গ্রহণ করেন? বস্তুত আল্লাহই তওবা কবুলকারী, করুণাময়।” (৯:১০৩ – ১০৪)
যাকাত আদায়ে অনীহার প্রতিবিধান
প্রাথমিক অবস্থায় কিছু সংখ্যক নব্য মুসলমানদের মধ্যে যাকাত আদায়ে অনীহা ও ক্ষোভ লক্ষ্য করা যায়। যেহেতু যাকাত ইসলামের একটি ফরয বিধান সেহেতু এ ব্যাপারে নবী করীম (সাঃ) কোন ছাড় দেন নাই। শুধু দু’টো গোত্র ছাড়া সবাই তাঁর নির্দেশ মেনে যাকাত প্রদান করে। বনু তামীম গোত্রের একটি শাখা গোত্র বনী আম্বর এবং বনী মুস্তালিক গোত্র যাকাত প্রদানে বিরোধীতা করে। বনী আম্বর গোত্রের লোকজন যাকাত আদায়কারীগণের উপর হামলা করে ও তাদেরকে তাড়িয়ে দেয়। এ সংবাদ পেয়ে নবীজী (সাঃ) তৎক্ষণাৎ এদের বিরুদ্ধে একটি ছোট অশ্বারোহী বাহিনী পাঠালে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। এ ঘটনার পর আম্বর গোত্রের সবাই ইসলাম ধর্মের প্রতি পুরোপুরি আনুগত্য পোষণ করেন। বনী মুস্তালিক গোত্রের ক্ষেত্রে উল্টো ঘটনা ঘটে। যাকাত আদায়কারীদের দেখে তারা পালিয়ে যায়। পরে তারা তাদের ভুল বুঝতে পেরে নবীজী (সাঃ) এর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করে এবং যাকাত আদায় করে।
যাকাতের বন্টন খাত
পবিত্র কুরআনের নির্দেশনা অনুযায়ী যাকাতের অর্থ–সম্পদ অভাবগ্রস্ত ও দুঃস্থ জনগোষ্ঠী যেমন ফকির, মিসকীন, দাসমুক্তি, ঋণগ্রস্ত, মুসাফির, আল্লাহর পথে জেহাদকারী এবং যাকাত আদায়কারীদের মজুরী প্রদান ইত্যাদি খাতে ব্যয়িত হয়। দারিদ্র বিমোচন এবং সামাজিক নিরাপত্তায় যাকাতের ভূমিকা অপরিসীম। এটা কল্যাণমূলক সমাজ গঠনে এবং অর্থনৈতিক সাম্যতা অর্জন ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধন সৃষ্টিতে সহায়তা করে। যাকাত বন্টন সম্পর্কিত আয়াতটি হলো:
اِنَّمَا الصَّدَقٰتُ لِلْفُقَرَآءِ وَ الْمَسٰكِیْنِ وَ الْعٰمِلِیْنَ عَلَیْهَا وَ الْمُؤَلَّفَۃِ قُلُوْبُهُمْ وَ فِی الرِّقَابِ وَ الْغٰرِمِیْنَ وَ فِیْ سَبِیْلِ اللّٰهِ وَ ابْنِ السَّبِیْلِ ؕ فَرِیْضَۃً مِّنَ اللّٰهِ ؕ وَ اللّٰهُ عَلِیْمٌ حَكِیْمٌ
“যাকাত হল কেবল ফকির, মিসকীন, যাকাত আদায়কারী ও যাদের চিত্ত আকর্ষণ প্রয়োজন তাদের হক এবং তা দাস-মুক্তির জন্যে, ঋণগ্রস্তদের জন্য, আল্লাহর পথে জেহাদকারীদের জন্যে এবং মুসাফিরদের জন্যে, এই হল আল্লাহর নির্ধারিত বিধান। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।” (৯:৬০)
নবী-দুহিতা হযরত যয়নব (রাঃ)’র ইন্তেকাল
মক্কা বিজয় শেষে মদীনায় প্রত্যাবর্তনের পর নবীজী (সাঃ) এর পারিবারিক জীবনে এক শোকাবহ ঘটনা ঘটে। নবীজী (সাঃ) মক্কা থেকে মদীনায় হিজরতের সময় তাঁর বড় কন্যা হযরত যয়নব (রাঃ) মুশরেক স্বামীর সাথে মক্কায় অবস্থান করছিলেন। পরবর্তীকালে তিনি মদীনায় হিজরত করেন। মক্কা থেকে মদীনায় হিজরতকালে তিনি গর্ভবতী ছিলেন। এ সময় হোয়ায়রেস ও হাব্বার নামক দুই কুরাইশ ব্যক্তি তাঁকে তাঁর বাহন থেকে ভূমিতে ফেলে দেয়। তাতে তাঁর গর্ভপাত হয় ও প্রচুর রক্তক্ষরণ ঘটে। এতে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাঁর এ অসুস্থতা দীর্ঘ দিন পর্যন্ত চলছিল। এর ফলে তাঁর ইন্তেকাল হয়। অবশ্য এর আগে নবীজী (সাঃ) এর অপর দুই কন্যা হযরত উম্মে কুলসুম (রাঃ) ও হযরত রোকাইয়া (রাঃ) ইন্তেকাল করেন। এখন শুধু বেঁচে রইলেন ছোট মেয়ে ফাতেমা (রাঃ)। হযরত যয়নব (রাঃ) এর ইন্তিকালে নবীজী (সাঃ) খুবই শোকাহত হয়ে পড়েন। প্রিয় কন্যার বিভিন্ন স্মৃতি তাঁর মানসপটে ভেসে উঠে। শোক–সন্তপ্ত অন্তর নিয়ে তিনি পরম ধৈর্য ধারণ করেন এবং মহান আল্লাহর দরবারে দুঃখিনী মেয়ের অনন্তকালীন জীবনের শান্তি কামনা করেন।
নবী-পুত্র হযরত ইব্রাহীমের জন্ম ও মৃত্যু
নবী করীম (সাঃ) তাঁর মিশরীয় দাসী হযরত মারিয়া কিবতিয়াকে সহধর্মিণীর মর্যাদা দেন এবং পৃথক বাসস্থানে রাখেন। হযরত মারিয়া (রাঃ) এর গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন তাঁর পুত্র সন্তান ইব্রাহীম। জীবনের শেষ পর্বে এসে অর্থাৎ ৬১ বছর বয়সে পুত্র সন্তান লাভে তাঁর অন্তর পুলকিত হয়ে উঠে – কারণ এ যাবৎ একমাত্র হযরত খাদীজা (রাঃ) ব্যতীত অন্য কোন স্ত্রীর গর্ভে তাঁর কোন সন্তনাদি জন্ম নেয়নি। এছাড়া খাদীজা (রাঃ) এর গর্ভজাত তাঁর দু’টি পুত্র সন্তানও শিশু অবস্থায় মারা যান। নবজাতক ইব্রাহীমকে পেয়ে তিনি পুত্র বাৎসল্যে উচ্ছ্বসিত হন। তবে তাঁর এত আদরের পুত্রধনটিও তাঁকে শোকের সাগরে ভাসিয়ে মাত্র দেড় বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন।
পুত্র ইব্রাহীমের অকাল মৃত্যুতে নবী করীম (সাঃ) ভীষণভাবে মর্মাহত ও শোকাতুর হয়ে উঠলেও পরম ধৈর্য ধারণ করেন। তাঁর এ দুঃসহ মনোবেদনা ছিল সম্পূর্ণ পিতৃসুলভ ও মানবিক। পুত্রের মৃত্যুদিনে ঘটনাচক্রে সূর্যগ্রহণ ঘটায় তাঁর এক ভক্ত সাহাবী ঘটনাটিকে মু’জিযা হিসেবে আখ্যায়িত করে শোকের বহিঃপ্রকাশ বলে প্রচার করেন। এ কথা শুনামাত্র নবী করীম (সাঃ) বললেন, ‘চন্দ্র-সূর্য গ্রহণ আল্লাহর সৃষ্টির কুদরতের নিদর্শন – এর সাথে কারো জন্ম–মৃত্যুর সম্পর্ক নেই।’ এ ছিল তাঁর কুসংস্কারমুক্ত ও সততাপূর্ণ মন–মানসিকতার এক অপূর্ব দৃষ্টান্ত।