এ অধ্যায়ের বিষয়সমূহ
Toggleইসলামী শক্তির বিকাশ
তাবুক অভিযানের পর সমগ্র আরব জুড়ে ইসলাম ধর্মের প্রভাব ও বিকাশ অপ্রতিহত হয়ে উঠে এবং সেই সাথে মুসলিম শক্তির উত্থান ঘটে। তায়েফে ইসলামের বিস্তার ও সেখানকার লাত প্রতিমার ধ্বংস সাধনের মধ্য দিয়ে ক্রমশ আরব থেকে পৌত্তলিকতার অবসান ইসলামের অগ্রগতিকে অপ্রতিরোধ্য করে তুলে। তৎকালীন পার্শ্ববর্তী দুই পরাশক্তি খৃস্টান রোমান সাম্রাজ্য ও অগ্নিপূজক পারস্য সাম্রাজ্য ইসলামের উত্থানে প্রমাদ গুনলো। মুসলমানদের তাবুক অভিযানের সময় সীমান্ত থেকে রোমান বাহিনীর পশ্চাদপসরণ ইসলামকে একটি সমীহ শক্তিতে পরিণত করে।
তায়েফবাসীর ইসলাম গ্রহণ
নিষিদ্ধ মাস সমাগত হওয়ায় নবী করীম (সাঃ) তায়েফ অবরোধ স্থগিত করে হজ্জ্ব ও ওমরা পালনে মক্কায় চলে এসেছিলেন। তাই তায়েফবাসী তখনও ইসলামের ছায়াতলে আসেনি। তায়েফের সাকীফ গোত্রের এক অন্যতম নেতা ওরওয়া ইবনে মাসুদ ইয়েমেন থেকে ফিরে এসে প্রথমে নবী করীম (সাঃ) সাক্ষাৎ করেন এবং ইসলাম গ্রহণ করে তায়েফে ফিরে যান। সেখানে পৌঁছে তিনি স্বগোত্রের লোকজনকে ইসলামের প্রতি দাওয়াত দেন। কিন্তু ইসলাম গ্রহণের পরিবর্তে তারা তাঁকে হত্যা করে। এরপর সাকীফ গোত্রের নেতৃবৃন্দের পাঁচ–সদস্যের এক প্রতিনিধিদল মদীনায় নবী করীম (সাঃ) এর সাথে সাক্ষাৎ করে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করার ব্যাপারে কয়েকটি দাবী ও শর্ত পেশ করেন। এগুলোর মধ্যে তাদের লাত প্রতিমা ধ্বংস না করা, নামায থেকে অব্যাহতি পাওয়া, মদ্যপান ও ব্যভিচার কর্ম চালিয়ে যাওয়ার মতো বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত ছিল। কিন্তু নবীজী (সাঃ) এসব দাবীর কোনটিই গ্রহণ করেননি। তিনি তাঁদেরকে ইসলাম ধর্মের মৌলিক বিষয়গুলো বুঝিয়ে বললে তাঁরা এসব মেনে নেন। তবে তাঁরা লাত প্রতিমা ধ্বংসের কাজ থেকে তাদেরকে অব্যাহতি দিয়ে অন্য কাউকে এ দায়িত্ব দেওয়ার শর্ত দেন। নবীজী (সাঃ) তাঁদের শর্তটি মেনে নিয়ে এ কাজের দায়িত্ব দেন হযরত আবু সুফিয়ান (রাঃ) ও হযরত মুগীরা (রাঃ)-কে। তায়েফের প্রতিনিধিদলের সদস্য ওসমান ইবনে আবুল আস দ্বীন–ইসলাম শিক্ষা গ্রহণ করে তা সেখানে প্রচারের কাজে নিযুক্ত করা হন। এভাবেই তায়েফে ইসলামের প্রসার ঘটে।
বিভিন্ন আরব গোত্রের প্রতিনিধি দলের আগমন
নবম হিজরী সাল। বছরব্যাপী আরব উপদ্বীপের চতুষ্পার্শ থেকে বিভিন্ন গোত্রের প্রতিনিধি দলের আগমনে মদীনা মুখরিত হয়ে উঠে। একের পর এক প্রতিনিধিদল মদীনায় এসে নবীজী (সাঃ) এর সাথে সাক্ষাৎপূর্বক ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতে থাকেন। তায়েফের সাকীফ গোত্রের পর আরবের বিভিন্ন গোত্রের মধ্যে ইসলাম গ্রহণের সাড়া পড়ে যায়। তাই এটি ছিল পৌত্তলিক ও কিতাবধারী নির্বিশেষে সকল গোত্রের প্রতিনিধি আগমণের বর্ষ। এ যেন স্বেচ্ছায় ইসলাম গ্রহণের এক গণ–জোয়ার। আরবের বিভিন্ন স্থান থেকে আগত এসব প্রতিনিধি দলের তালিকা বেশ দীর্ঘ। ইবনে সাআদ রচিত ‘তাবাকাতে কুবরা’ নামক গ্রন্থে এর বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে।
নবী করীম (সাঃ) আগত প্রতিনিধিদলকে উপযুক্ত মর্যাদা দান করতেন, তাদেরকে যথেষ্ট যত্ন ও আপ্যায়ন করতেন, ইসলামের মৌলিক বিষয় অর্থাৎ ঈমান ও আমলের ব্যাপারে নসীহত করতেন এবং তাদের নেতৃবৃন্দকে স্বপদে বহাল রেখে সসম্মানে বিদায় জানাতেন। বিদায়ের সময় দ্বীনী শিক্ষা দানের জন্য একজন করে সাহাবীকে দ্বীনি–শিক্ষক হিসেবে তাদের সঙ্গে দিতেন।
নাজরানবাসীর প্রতি ইসলামের দাওয়াত
খৃস্টান অধ্যুষিত নাজরানবাসীর প্রতি ইসলামের দাওয়াত পাঠানো হলো। তারা ইসলাম গ্রহণে অস্বীকৃত হলে তাদেরকে জিযিয়া কর প্রদানের শর্তে বশ্যতা স্বীকার করতে বলা হয়। নাজরানের বিশপ ষাট–সদস্যের একটি খৃস্টান প্রতিনিধিদল মদীনায় প্রেরণ করেন। তারা মসজিদে নব্বীতে নবীজী (সাঃ) এর সাথে সাক্ষাৎ ও আলোচনা করেন। উভয় পক্ষের মধ্যে একটি সন্ধিচুক্তি সম্পাদিত হয়। সন্ধিপত্রে নাজরানবাসীকে তাদের নিজ ধর্ম পালনের পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া হয় এবং তাদের ধন–সম্পদসহ অন্যান্য অধিকার রক্ষা নিশ্চিত করা হয়। বিশপের ভ্রাতাসহ তাদের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণ করেন। এভাবে নাজরানে ইসলামের প্রসার ঘটে।
ইয়েমেনের একটি প্রসিদ্ধ গোত্র বনু কিন্দার যার সাথে নবী করীম (সাঃ) এর মাতুলালয়ের সম্পর্ক ছিল। তাদের একটি প্রতিনিধিদল আশআছ ইবনে কায়েসের নেতৃত্বে নবীজী (সাঃ) এর সাথে সাক্ষাৎ করে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে। এ প্রতিনিধিদলের সাথে আগত হাদ্রামাউতের সামন্ত সর্দার ওয়ায়েল ইবনে হুজর কিন্দীও ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে এবং উশর (ফসলের খাজনা) প্রদানে সম্মত হয়। সর্বশেষ ইয়েমেনের নাখআ গোত্র ইসলামের পতাকাতলে আসলে সমগ্র ইয়েমেনের বুকে ইসলাম সুপ্রতিষ্ঠিত হয়। নবীজী (সাঃ) দ্বীনী শিক্ষা প্রদানের জন্য হযরত মুয়াবিয়া (রাঃ)-কে ওয়ায়েলের সাথে প্রেরণ করেন। একই উদ্দেশ্যে হযরত মুয়ায ইবনে জাবাল (রাঃ) এর নেতৃত্বে সাহাবাগণের একটি দলকে ইয়েমেনে পাঠানো হয়। তাঁদের প্রতি নবীজী (সাঃ) উপদেশ ছিল তাঁরা যেন সদ্ভাব, বিনয় ও নম্রতাসহকারে দ্বীনের কথা মানুষকে পৌঁছে দেন।
কট্টরবাদী কাফের ও মুনাফেকের অসম্মতি ও পরিণতি
ইসলামের এ গণ–জোয়ারের মধ্যেও কিছু সংখ্যক কাফের ও মুনাফেক তাদের কট্টরবাদী মনোভাব প্রকাশ থেকে বিরত থাকেনি। তাদের মধ্যে একজন ছিল বনী আমের গোত্রের নেতা আমের ইবনে তোফায়েল। সে একটি প্রতিনিধিদল নিয়ে মদীনায় নবীজী (সাঃ) এর সাথে সাক্ষাৎ করতে আসলেও ইসলাম গ্রহণ না করে তাঁকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে ফেরত যায়। নবীজী (সাঃ) তাকে বুঝানোর চেষ্টা করলেও সে কর্ণপাত করেনি। পরিণতিতে আল্লাহর তরফ থেকে তার উপর গজব নাযিল হয় এবং সে প্লেগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু বরণ করে। এ প্রতিনিধি দলের অপর এক ব্যক্তি আরবাদ ইবনে কায়েসও ইসলাম গ্রহণ না করে ফেরত যায়। যাওয়ার পথে তার বজ্রাঘাতে মৃত্যু হয়। অবশ্য এ গোত্রের অন্য সবাই ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে। এছাড়া ইয়ামামার অধিবাসী মুসায়লামা ইবনে হাবীব তার গোত্রের প্রতিনিধি দলের সাথে নবীজী (সাঃ) এর সাক্ষাতে আসে। সে নবুওতের অংশীদার দাবী করে নিজেকে রসূল ঘোষণা করে। নামায বাতিল এবং মদ্যপান ও ব্যভিচার বৈধ ঘোষণা করে নিজ সম্প্রদায়ের কিছু ব্যক্তিকে বিপথগামী করে ফেলে। তবে অধিকাংশ লোকজনই তার দাবী প্রত্যাখ্যান করে ও তাকে বর্জন করে।
মুশরেকমুক্ত হজ্জ্ব পালনের ঘোষণাবলী
নবম হিজরী সালে নবী করীম (সাঃ) হজ্জ্ব পালনে দু’টি কারণে যেতে পারেননি। প্রথমটি হলো সে বছর আরবের বিভিন্ন জায়গা থেকে একের পর এক যেসব প্রতিনিধিদল এসেছিলো তাদের সাথে তাঁর সাথে সাক্ষাৎ ও তাদেরকে দ্বীনের দাওয়াতে ব্যস্ত থাকা। দ্বিতীয় যে কারণটি ছিলো তা হলো, মুশরিকদের সাথে হজ্জ্ব পালনের বিষয়টি। কারণ মুশরিকরা সবাই তখনও ইসলাম গ্রহণ করেনি। তাদের মধ্যে প্রচলিত জাহেলিয়াত যুগের হজ্জ্ব সম্পর্কিত আচার–অনুষ্ঠানগুলোও ছিল কুসংস্কারপূর্ণ ও অপবিত্র এবং ইসলামের একত্ববাদী ধ্যান–ধারণার পরিপন্থী। যেমন, নগ্ন অবস্থায় তাওয়াফ, কা’বা গৃহের দেওয়াল পশুর রক্ত দ্বারা রঞ্জিত করা, প্রতিমা পূজা, ইত্যাদি। মক্কা বিজয়ের পর এসব ভ্রান্ত রীতি–নীতি থেকে হজ্জ্ব অনুষ্ঠানের পরিবেশে শুচিতা ফিরিয়ে আনা নেহায়েৎ জরুরী হয়ে পড়েছিল। কিন্তু তখন পর্যন্ত মুশরিকদের হজ্জ্ব পালনে কোনরূপ বাধা–নিষেধ আরোপ করা হয়নি। এ অবস্থায় তিনি মুশরিকদের সাথে হজ্জ্ব পালনে বিরত থাকলেন। এ বিষয়ে তিনি মহান আল্লাহর নির্দেশনার প্রতীক্ষা করছিলেন। তাই ওই বছর তিনি হযরত আবু বকর (রাঃ)-কে তিনশত সদস্যের হজ্জ্ব প্রতিনিধিদলের নেতা মনোনীত করে মক্কায় পাঠিয়ে দিলেন।
এদিকে মুসলিম ও মুশরিকদের উপস্থিতিতে মক্কায় হজ্জ্ব কার্যক্রম শুরু হয়ে যায়। এসময় আল্লাহ্ তায়ালা সূরা তওবা নাযিল করে মুশরিকদের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ ও মক্কায় তাদের প্রবেশ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। নিষিদ্ধ চার মাস সময় অতিবাহিত হওয়ার পর এ ঘোষণা বলবৎ হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়। তবে তাদের সাথে যেসব চুক্তিতে সময়সীমা উল্লেখ আছে তা নির্ধারিত সময় পর্যন্ত বলবৎ থাকবে। নবী করীম (সাঃ) সদ্য নাযিলকৃত সূরা তওবার ঘোষণাটি হযরত আলী (রাঃ)-কে দিয়ে মক্কায় পাঠিয়ে দিলেন যাতে হজ্জ্ব সমাবেশে উপস্থিত সকলের সম্মুখে তিনি তা পাঠ করে শুনিয়ে দেন। পবিত্র কুরআনের ঘোষণাটির কিছু অংশ নিম্নে পেশ করা হলো:
بَرَاءَةٌ مِّنَ اللَّهِ وَرَسُولِهِ إِلَى الَّذِينَ عَاهَدتُّم مِّنَ الْمُشْرِكِينَ فَسِيحُوا فِي الْأَرْضِ أَرْبَعَةَ أَشْهُرٍ وَاعْلَمُوا أَنَّكُمْ غَيْرُ مُعْجِزِي اللَّهِ ۙ وَأَنَّ اللَّهَ مُخْزِي الْكَافِرِينَ وَأَذَانٌ مِّنَ اللَّهِ وَرَسُولِهِ إِلَى النَّاسِ يَوْمَ الْحَجِّ الْأَكْبَرِ أَنَّ اللَّهَ بَرِيءٌ مِّنَ الْمُشْرِكِينَ ۙ وَرَسُولُهُ ۚ فَإِن تُبْتُمْ فَهُوَ خَيْرٌ لَّكُمْ ۖ وَإِن تَوَلَّيْتُمْ فَاعْلَمُوا أَنَّكُمْ غَيْرُ مُعْجِزِي اللَّهِ ۗ وَبَشِّرِ الَّذِينَ كَفَرُوا بِعَذَابٍ أَلِيمٍ إِلَّا الَّذِينَ عَاهَدتُّم مِّنَ الْمُشْرِكِينَ ثُمَّ لَمْ يَنقُصُوكُمْ شَيْئًا وَلَمْ يُظَاهِرُوا عَلَيْكُمْ أَحَدًا فَأَتِمُّوا إِلَيْهِمْ عَهْدَهُمْ إِلَىٰ مُدَّتِهِمْ ۚ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُتَّقِينَ
“সম্পর্কচ্ছেদ করা হল আল্লাহ ও তাঁর রসূলের পক্ষ থেকে সেই মুশরিকদের সাথে, যাদের সাথে তোমরা চুক্তিবদ্ধ হয়েছিলে। অতঃপর তোমরা পরিভ্রমণ কর এ দেশে চার মাসকাল। আর জেনে রেখো, তোমরা আল্লাহকে পরাভূত করতে পারবে না, আর নিশ্চয়ই আল্লাহ কাফেরদিগকে লাঞ্ছিত করে থাকেন। আর মহান হজ্বের দিনে আল্লাহ ও তাঁর রসূলের পক্ষ থেকে লোকদের প্রতি ঘোষণা করে দেয়া হচ্ছে যে, আল্লাহ মুশরেকদের থেকে দায়িত্ব মুক্ত এবং তাঁর রসূলও। অবশ্য যদি তোমরা তওবা কর, তবে তা, তোমাদের জন্যেও কল্যাণকর, আর যদি মুখ ফেরাও, তবে জেনে রেখো, আল্লাহকে তোমরা পরাভূত করতে পারবে না। আর কাফেরদেরকে মর্মান্তিক শাস্তির সুসংবাদ দাও। তবে যে মুশরিকদের সাথে তোমরা চুক্তি বদ্ধ, অতপরঃ যারা তোমাদের ব্যাপারে কোন ত্রুটি করেনি এবং তোমাদের বিরুদ্ধে কাউকে সাহায্যও করেনি, তাদের সাথে কৃত চুক্তিকে তাদের দেয়া মেয়াদ পর্যন্ত পূরণ কর। অবশ্যই আল্লাহ সাবধানীদের পছন্দ করেন।” (৯:১ – ৪)