এ অধ্যায়ের বিষয়সমূহ
Toggleবিদায়–হজ্জ্বের প্রস্তুতি
হিজরী নবম ও দশম সাল। সমগ্র আরব জুড়ে ইসলামের প্রচার ও প্রসারের এক সুবর্ণ কাল। একই সাথে নবী করীম (সাঃ) এর নবুওতি মিশনের সমাপ্তি কালও বটে। জীবন সায়াহ্নের পদধ্বনি তিনি শুনতে পেলেন যখন নাযিল হলো সূরা নছর। এ সূরায় মহান আল্লাহ্ বলেন:
إِذَا جَاءَ نَصْرُ اللَّهِ وَالْفَتْحُ وَرَأَيْتَ النَّاسَ يَدْخُلُونَ فِي دِينِ اللَّهِ أَفْوَاجًا فَسَبِّحْ بِحَمْدِ رَبِّكَ وَاسْتَغْفِرْهُ ۚ إِنَّهُ كَانَ تَوَّابًا
“যখন আসবে আল্লাহর সাহায্য ও বিজয় এবং আপনি মানুষকে দলে দলে আল্লাহর দ্বীনে প্রবেশ করতে দেখবেন, তখন আপনি আপনার পালনকর্তার পবিত্রতা বর্ণনা করুন এবং তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন। নিশ্চয় তিনি ক্ষমাকারী।” (সূরা আন নছর, ১১০:১–৩)
এ অবস্থায় তাঁর জন্য অসমাপ্ত কাজগুলো গুছিয়ে ফেলা জরুরী হয়ে পড়লো। হিজরী দশম সালে নবীজী (সাঃ) হযরত মুয়াজ বিন জাবাল (রাঃ)–কে ইয়েমেনের গভর্ণর পদে নিযুক্ত করলেন। ইয়েমেনের পথে তাঁর বিদায়কালে তিনি তাঁকে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ উপদেশাবলী দেন এবং সে সাথে নিজের আসন্ন বিদায় বার্তা ব্যক্ত করে তিনি বলেন, ‘হে মুয়াজ, এ বছরের পর তোমার–আমার সাক্ষাৎ আর না–ও হতে পারে। তখন হয়তো–বা তোমরা আমার এ মসজিদ ও আমার কবরের পাশ দিয়ে যাতায়াত করবে।’
এ সময়ের গুরুত্বপূর্ণ কাজ গুলোর মধ্যে ছিল:
- সীমান্ত সুরক্ষা ও প্রশাসনিক কাজ-কর্ম গুছানো,
- সাথে সাথে চললো কুরআন ও দ্বীনি শিক্ষা এবং ইসলামের দাওয়াতী কার্যক্রম।
- এসব কাজে সম্পাদনের জন্য নিয়োগ করা হলো বিজ্ঞ ও অভিজ্ঞ সাহাবীগণকে।
- যাকাত (সাদাকা) এবং উশর, যিযিয়া কর আদায় ও এগুলোর বন্টন ব্যবস্থাপনা, ইত্যাদি।
এসব ব্যস্ততায় যখন কাটছির সময় তখনই আল্লাহর দ্বীন ও ইসলামী রাষ্ট্রকে সুসংহত করার দিক–নির্দেশনা এলো আল্লাহর তরফ থেকে:
”তারা এমন লোক যাদেরকে আমি পৃথিবীতে শক্তি–সামর্থ্য দান করলে তারা নামায কায়েম করবে, যাকাত দেবে এবং সৎকাজে আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধ করবে। প্রত্যেক কর্মের পরিণাম আল্লাহর এখতিয়ারভূক্ত।” (সূরা হাজ্জ্ব, ২২:৪১)
এসব ব্যস্ততার মধ্যেই দ্রুত সমাগত হলো হজ্জ্ব মওসূম। নবীজী (সাঃ) হজ্জ্বব্রত পালনের নিয়ত করলেন। তাঁর সাথে হজ্জ্ব পালনের জন্য সাড়া পড়ে গেলো আরব জুড়ে। এবার মুশরেকমুক্ত পরিবেশে হজ্জ্ব অনুষ্ঠানের আয়োজন চললো।
বিদায়–হজ্জ্ব অনুষ্ঠান
দশম হিজরী সাল, জ্বিলহজ্ব মাস – পবিত্র হজ্জ্ব পালনের মাস। নবীজী (সাঃ) এর নবুওত কালের তথা জীবনের শেষ হজ্জ্ব পালনের সর্বাত্মক প্রস্তুতি সমাপ্ত। লক্ষাধিক হাজীর সমাগম ঘটলো পবিত্র মক্কা নগরীতে। উম্মুল মু’মেনীনগণও নবীজী (সাঃ) এর সাথে হজ্জ্ব পালনে সহযাত্রী হলেন।
- জ্বিলক্বাদ মাসের শেষ সপ্তাহ শনিবার যোহর নামাযের পূর্বে তিনি গোসল করলেন এবং হজ্জ্ব ও ওমরাহ্ পালনের নিয়ত করলেন এবং যুল হুলাইফা নামক স্থান থেকে হ্জ্জ্বের ইহরাম বাঁধলেন।
- ইহরামের কাপড় পরিধান করে তিনি যোহরের সালাত আদায় করলেন।
- এরপর সঙ্গী–সাথীদের নিয়ে কন্ঠে ‘লাব্বায়েক’ ধ্বনিসহকারে মক্কা অভিমুখে তাঁদের যাত্রা শুরু হলো।
মক্কার পথ অতিক্রমকালে আট রাত কেটে গেলো। অবশেষে জ্বিলহজ্ব মাসের ৪ তারিখ সকালে তাঁরা প্রবেশ করলেন পবিত্র নগরীতে। তাঁদের সাথে ছিল গলায় মালা পরিহিত কুরবানীর পশু। এরপর শুরু হয় হজ্জ্বের আনুষ্ঠানিকতা পালন:
- কা’বা গৃহ তাওয়াফ এবং সাফা–মারওয়া সা’য়ী করার মাধ্যমে শুরু হয় হজ্জ্ব ও ওমরার আনুষ্ঠানিকতা পালন।
- ৮ই জ্বিলহজ্ব তারবিয়ার দিনে তিনি মীনায় অবস্থান করলেন, তারপর ৯ তারিখে আরাফায় গমন করেন।
- তিনি সেখানে লক্ষাধিক লোকের সমাবেশে বিখ্যাত বিদায়–হজ্জ্বের গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ দান করেন।
- রাতে মুজদালেফায় খোলা আকাশের নীচে অবস্থান করলেন।
- অতঃপর ১০ই জ্বিলহজ্জ্ব তারিখে মীনায় এসে পশু কুরবানী ও মস্তক মুন্ডন করে তিনি ইহরাম মুক্ত হন।
- জামরায় কংকর নিক্ষেপ ও সর্বশেষ বিদায়ী তাওয়াফ, ইত্যাদি যথারীতি পালনের মাধ্যমে হজ্জ্বের সকল আনুষ্ঠানিকতা সমাপ্ত হয়।
বিশ্বনবী (সাঃ) এর বিদায়–হজ্জ্বের ভাষণ
দশম হিজরীর জ্বিলহজ্জ্ব মাসের নয় তারিখ আরাফা দিবস। নবী করীম (সাঃ) হজ্জ্বযাত্রীদেরকে নিয়ে আরাফার মাঠে অবস্থান করছেন। তাঁর তেইশ বছরের নবুওতি মিশন সমাপ্তির শেষ লগ্নে এবং জীবনের অন্তিম পর্বে আরাফাতের ময়দানে দাঁড়িয়ে বিদায় হজ্জ্বের বিশাল সমাবেশে তিনি যে ভাষণ প্রদান করে ছিলেন তা মানব জাতির ইতিহাসে এক অমূল্য দলিলরূপে সংরক্ষিত হয়ে আছে।
মহানবী ﷺ-এর বিদায় হজ্জের ভাষণ (خطبة حجة الوداع) মানব ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভাষণ। এটি কেবল মুসলিমদের জন্য নয়, বরং সমগ্র মানবজাতির জন্য ন্যায়, ইনসাফ, মানবাধিকার, সামাজিক ন্যায়বিচার, পারিবারিক জীবন, অর্থনীতি, ভ্রাতৃত্ব, নারী-পুরুষের মর্যাদা এবং আল্লাহভীতির এক চিরন্তন সনদ। এই ভাষণে তিনি এমন মৌলিক নীতিমালা প্রদান করেছেন, যা কিয়ামত পর্যন্ত মানবজাতির জন্য পথনির্দেশক।
মহানবী (সাঃ) ভাষণের প্রারম্ভে মহান আল্লাহ্ রব্বুল আলামীনের প্রতি প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করে বলেন:
“সকল প্রশংসা একমাত্র আল্লাহরই প্রাপ্য, অতএব আমরা তাঁরই প্রশংসা করি, এবং তাঁরই নিকট ক্ষমা ভিক্ষা করি এবং তাঁরই দিকে প্রত্যাবর্তন করি। আমরা আমাদের নফসের মন্দ এবং আমাদের কর্মের অশুভ পরিণাম থেকে আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করি। আল্লাহ্ যাকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে চান তাকে কেহই বিপথে নিতে পারে না; এবং তাকে কেহই সুপথে চালাতে পারে না যাকে আল্লাহ পথভ্রষ্ট করেন। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ব্যতীত কোন উপাস্য নেই, তিনি এক, তাঁর কোন অংশীদার নেই। তিনি সার্বভৌম এবং সকল প্রশংসা তাঁরই প্রাপ্য। তিনি জীবন দান করেন এবং মৃত্যু ঘটান এবং সকল কিছুর ওপর রয়েছে তাঁর ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব। আল্লাহ ছাড়া কোন মাবুদ নেই, তিনি একক; তিনি তাঁর অঙ্গীকার পূর্ণ করেছেন এবং তাঁর বান্দাকে বিজয় দান করেছেন, এবং ষড়যন্ত্রকারী শত্রুদেরকে পরাভূত করেছেন।”
অতঃপর তিনি হজ্জ্বে উপস্থিত লক্ষাধিক জনতার উদ্দেশ্যে তাঁর বক্তব্য পেশ করেন:
♦ “হে মানব মন্ডলী, আমার কথায় কর্ণপাত করো, যেহেতু আমি জানি না এ বছরের পর আমি আর তোমাদের সাথে হজ্জ্বব্রত পালন করতে পারব কি না। যারা আজ এখানে উপস্থিত হতে পারেনি আমার বাণী তাদের কাছে পৌঁছে দাও। হে জনমন্ডলী! আল্লাহ বলেন, ‘হে মানুষ, আমরা তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি একজন মানব ও একজন মানবী থেকে এবং গোত্র ও জাতিতে বিভক্ত করেছি যাতে তোমরা একে অপরকে চিনতে পার। নিশ্চয় আল্লাহর দৃষ্টিতে তোমাদের মধ্যে সে–ই সবচেয়ে মর্যাদবান যে সবচেয়ে বেশী খোদা-ভীরু।’ (সূরা আল—হুজুরাত, ৪৯:১৩)। সকল মানুষ আদমের বংশধর এবং আদম মাটির তৈরী। অনারবের ওপর আরবের, আরবের ওপর অনারবের, কালোর ওপর সাদার অথবা সাদার ওপর কালোর কোনই শ্রেষ্ঠত্ব নেই শুধুমাত্র পরহেজগারী ছাড়া।”
♦ “দেখো, কাবা শরীফের দায়িত্বভার ও হাজীদেরকে পানি বিতরণের কাজ ছাড়া রক্ত কিংবা সম্পদসহ সব ধরনের দাবীকে আজ আমি আমার পায়ের তলায় দলিত করে দিলাম। হে কুরাইশ জনগণ, এই দুনিয়ার বোঝা ঘাড়ে নিয়ে (বিচার দিবসে আল্লাহর সামনে) উপস্থিত হয়ো না, যেখানে অন্যেরা পরকালের পুরস্কার নিয়ে হাজির হয়ে যেতে পারে। তখন কিন্তু আল্লাহর বিপক্ষে তোমরা আমাকে পাবে না।”
♦ “লক্ষ্য করো! আজ আমি অজ্ঞতার যুগের সকল প্রথাকে পদদলিত করলাম। অজ্ঞতার যুগের রক্তের প্রতিশোধ রহিত করা হলো। সর্ব প্রথমে ইবনে রাবিয়া বিন্ হারিছ যিনি সা’দ গোত্রে লালিত হয়েছিলেন এবং যাকে হুদাইল হত্যা করেছিল, তার রক্তের দাবী আমি ছেড়ে দিলাম। আল্লাহ্ তোমাদেরকে নিষেধ করেছেন সুদ গ্রহণ না করতে, সুতরাং অজ্ঞতার যুগের সকল প্রাপ্য সুদ এখন থেকে রদ হয়ে গেলো। তবে তোমাদের মূলধন তোমরা রাখতে পারবে। সর্বপ্রথম আমি আব্বাস ইবনে মুত্তালিবের (নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চাচা) প্রাপ্য সুদের দাবী সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাহার করে নিলাম।”
♦ “হে লোকসকল! এই মাস, আজকের এই দিন, এই পবিত্র নগরী ঠিক যেমনি পবিত্র ঠিক তেমনি পবিত্র আমানত হলো একজন মানুষের জীবন, সম্পদ ও সম্মান যত দিন পর্যন্ত না তোমরা তোমাদের প্রভুর সামনে হাজির হয়েছো। তোমাদের নিকট গচ্ছিত দ্রব্য তার সঠিক মালিককে ফেরত দাও। কাউকে আঘাত দিও না যাতে কেহ তোমাদেরকে প্রত্যাঘাত করতে পারে। স্মরণ রেখো, তোমাদের প্রভুর সাথে অবশ্যই তোমাদের সাক্ষাত হবে, এবং তিনি নিশ্চিতভাবেই তোমাদের কৃতকর্মের হিসাব নেবেন। তোমরা কারো ওপর অন্যায় করবে না এবং কেহ তোমাদের ওপর অন্যায় করতে পারবে না।”
♦ “তোমাদের দ্বীনের নিরাপত্তার ব্যাপারে শয়তান থেকে সাবধান থেকো। সে তোমাদের মধ্যে সকল বড় ধরনের পদস্খলন ঘটানোর ব্যাপারে নিরাশ হয়ে গেছে, সুতরাং ছোটখাট পদস্খলনের ব্যাপারে তাকে অনুসরণ করা থেকে তোমরা সাবধান থেকো।”
♦ “হে মানুষ! তোমাদের স্ত্রীদের ওপর তোমাদের কিছু অধিকার রয়েছে আবার স্ত্রীদেরও তোমাদের ওপর কতক অধিকার আছে। তোমাদের দায়িত্ব হলো তাদের বৈবাহিক অধিকারের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা, এবং তাদের প্রতি অসদাচরণ করা থেকে বিরত থাকা, যদি তারা কোন অসদাচরণ করে তবে আল্লাহ্ তোমাদের জন্য জায়েয করেছেন তাদের কাছ থেকে বিছানা পৃথক করে ফেলা এবং মৃদু শাস্তি প্রদান করা, এবং এতে যদি তারা বিরত হয় তবে তাদেরকে সঠিকভাবে খোরপোষ দেবে।”
♦ “দেখো! স্বামীর অনুমতি ব্যতিরেকে কোন স্ত্রীরই উচিত নয় স্বামীর সম্পদ থেকে কাউকে কিছু প্রদান করা। স্ত্রীদের সাথে সদয় ব্যবহার করো যেহেতু তারা তোমাদের সাহায্যকারীনি এবং নিজেরা নিজেদের বিষয়সমূহ সামলাতে অপারগ। স্ত্রীদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো, যেহেতু তোমরা তাদেরকে বস্তুত আল্লাহ্ প্রদত্ত নিরাপত্তায় গ্রহণ করেছো এবং তাদেরকে আল্লাহর কালাম উচ্চারণের দ্বারা বৈধ করে নিয়েছো।”
♦ “হে লোকসকল! সর্বশক্তিমান আল্লাহ তা’আলা প্রত্যেকের প্রাপ্য উত্তরাধিকার নির্দ্ধারণ করে দিয়েছেন। সুতরাং কোন উত্তরাধিকারের ব্যাপারে (শরীয়ার দলিল ভিন্ন) অন্য কোন দলিলের প্রয়োজন নেই। বৈবাহিক সূত্রেই শিশুর জন্ম পরিচয় এবং যিনাকারীর শাস্তি প্রস্তরাঘাতে কার্যকর হবে; এবং তাদের কর্মের পরিণাম আল্লাহর হাতে ন্যস্ত। আল্লাহর অভিশাপ তার ওপর যে তার পিতৃ–পরিচয় অস্বীকার করে অথবা যে দাস তার মালিককে অস্বীকার করে।”
♦ “সকল ঋণ পরিশোধ করে দিতে হবে, সকল ধার করা বস্তু ফেরত দিতে হবে, উপহারের প্রতিদান দেওয়া উচিত এবং ক্ষতি হলেও ওয়াদা পূর্ণ করতে হবে।”
♦ “সাবধান! নিজের কৃত অপরাধের দায়িত্ব নিজের ওপরই বর্তাবে, অন্য কারো ওপর নয়। সন্তান পিতৃ–অপরাধে অপরাধী হবে না, না পিতা সন্তানের অপরাধের বোঝা বহন করবে। একজন মুসলমানের জন্য বৈধ হবে না তার ভাইয়ের মাল, যদি না সে স্বেচ্ছায় তাকে দেয়। সুতরাং নিজেরা অন্যায়ে লিপ্ত হয়ো না।”
♦ “হে লোকসকল! প্রত্যেক মুসলমানই পরস্পর ভাই ভাই এবং সবাই একই ভ্রাতৃত্ব বন্ধনে আবদ্ধ। সাবধান, তোমাদের দাস সম্পর্কে; তোমরা যা খাও এবং যা পরিধান করো তাদেরকেও তা খাওয়াবে–পরাবে। সাবধান, আমার পরে তোমরা যেন বিপথে চলে না যাও এবং পরস্পরের ঘাড়ে আঘাত না হানো।”
♦ “হে মানুষ! যদি একজন আবিসিনীয় বিকৃতাঙ্গ দাসও তোমাদের নেতা নিযুক্ত হয়, তোমরা তার কথা শুনো এবং তাকে মেনে চলো যতক্ষণ পর্যন্ত সে আল্লাহর কিতাব অনুযায়ী কার্য সম্পাদন করে। হে মানুষ, আমার পরে আর কোন নবীর আগমন ঘটবে না এবং তোমাদের পরে নতুন কোন উম্মতেরও আবির্ভাব হবে না। বস্তত, আমি তোমাদের মধ্যে রেখে যাচ্ছি আল্লাহর কিতাব এবং আমার সুন্নাহ্ যা আঁকড়ে ধরলে তোমরা কখনোই বিপথগামী হবে না। সাবধান! ধর্মের ব্যাপারে যে সীমারেখা বেঁধে দেওয়া হয়েছে তা ভেঙ্গে ফেলো না, কেননা তোমাদের পূর্বে বহু জাতি ধর্মের বৈধ সীমা লঙ্ঘন করার কারণে ধ্বংস হয়ে গেছে।”
♦ “হে মানুষ! অবিশ্বাসীরা বর্ষপঞ্জীকে ওলটপালট করে দেয় যাতে করে আল্লাহ যা (যেসব মাসে) হারাম করেছেন তারা তা (ওই সব মাসে) হালাল করে নিতে পারে এবং আল্লাহ যা (যেসব মাসে) বৈধ করেছেন তাকে (ওই সব মাসে) তারা অবৈধ বানিয়ে নিতে পারে। আল্লাহর নিকট মাসের সংখ্যা বারটি, এর মধ্যে চারটি পবিত্র – তিনটি পরপর (জ্বিলক্বদ, জ্বিলহজ্ব, মুহররম) এবং একটি জুমাদাআসসানী ও শাবানের মধ্যবর্তী (রজব)।”
♦ “লক্ষ্য করো! তোমাদের প্রভুর ইবাদত করো; দিনে পাঁচবার নামায কায়েম করো; রমযান মাসে রোযা রাখো; তোমাদের সম্পদের যাকাত আদায় করো; আল্লাহর ঘরে হজ্জ্ব পালন করো এবং তোমাদের শাসককে মান্য করো; তা হলে তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে।”
♦ “আজ যারা এখানে হাজির হয়েছ আমার বাণী পৌঁছে দাও তাদের কাছে যারা এখানে উপস্থিত নেই, হতে পারে উপস্থিত শ্রোতৃমন্ডলীর চেয়ে অনুপস্থিত ব্যক্তিবর্গের নিকট আমার কথাগুলো বেশী গুরুত্ব বহন করবে।”
বক্তব্য শেষে মহানবী (সাঃ) সমবেত মানুষদেরকে উদ্দেশ্য করে বললেন, “আমার সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হলে তোমরা কি বলবে?” লক্ষ কন্ঠে উচ্চারিত হলো, “আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি, আপনি দ্বীনের কথা পৌঁছে দিয়েছেন এবং আপনার নবুওতি দায়িত্ব পালন করেছেন এবং আমাদের কল্যাণের প্রতি লক্ষ্য রেখেছেন।”
এরপর তিনি অত্যন্ত আবেগভরে আকাশের দিকে তাকিয়ে তাঁর শাহাদাত আঙুলী তুললেন এবং পরে জনতার দিকে আঙুলী নির্দেশ করে বললেন,
♦ “হে আমার প্রভু! তুমি সাক্ষী থেকো, আমি তোমার বাণী মানুষের নিকট পৌঁছে দিয়েছি, হে প্রভু! তুমি সাক্ষী থেকো।”
ভাষণ শেষে তিনি উপস্থিত লাখো জনতার উদ্দেশ্যে বললেন – বিদায়, বিদায়, বিদায়!
বিদায়–হজ্জ্বের ভাষণের তাৎপর্য ও বৈশিষ্টসমূহ
মহানবী (সাঃ) এর বিদায় হজ্জ্বের ভাষণটির প্রতিটি কথা ছিল হৃদয়াগ্রাহী ও মানব জাতির কল্যাণ ও মুক্তির জন্য নিবেদিত এবং পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে বর্তমান ও ভবিষ্যতের দিক নির্দেশনাস্বরূপ। উপদেশবাণী সম্বলিত তাঁর জ্ঞানগর্ভ ভাষণটি ছিল মানবজাতির হেদায়েতের জন্য খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। এ ভাষণের বৈশিষ্টসমূহ নিম্নে ব্যক্ত করা হলো:
- সমগ্র মানবজাতিকে সম্বোধন করে তিনি তাঁর বক্তব্য পেশ করেছিলেন এবং সকল মানুষকে উদ্দেশ্য করেই ছিল তাঁর এ উদাত্ত আহ্বান।
- সকল কৌলীন্য প্রথার অবসান ঘটিয়ে মানুষে মানুষে সাম্য ও ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানিয়েছেন এবং পরহেজগারীর ভিত্তিতে মানুষের মর্যাদা নির্দ্ধারণ করেছেন।
- তাঁর এ ভাষণে তিনি সকল প্রকার কুপ্রথা ও কুসংস্কারকে পদদলিত করেছেন, শুধু কথায় নয় কাজেও তিনি সর্ব প্রথম এসব কুপ্রথার সাথে নিজের ও নিজ গোত্রের সম্পৃক্ততা ছিন্ন করেন।
- তাঁর ভাষণে তিনি মানুষের সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর অধিকারকে সমুন্নত করেছেন এবং এক ও অদ্বিতীয় আল্লাহর উপাসনা ও আনুগত্যের মাধ্যমে তৌহিদের বাণীকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছেন।
- তিনি সকল মানুষকে সত্য ও ন্যায়ের ভিত্তিতে তাদের পারস্পরিক অধিকার আদায়ের তাকিদ দিয়েছেন। মানুষের ওপর অর্পিত দায়িত্ব ও জবাবদিহিতাকে তিনি এ ভাষণের মাধ্যমে শাণিত করেছেন।
তাঁর এ বিশ্বজনীন ভাষণ যুগ যুগ ধরে মানবতার কল্যাণ ও মুক্তির পথকে সুগম করেছে এবং তা তাঁর ‘রাহমাতুল্লীল আলামীন’ খেতাবের স্বার্থকতা যুগ যুগ ধরে বহন করে চলেছে।
বিদায় হজ্জের ভাষণ: মানবজাতির জন্য চিরন্তন দিকনির্দেশনা
হিজরি ১০ম সালের ৯ই জিলহজ্জ, আরাফাতের ময়দানে এক লক্ষেরও অধিক সাহাবীর সমাবেশে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (ﷺ) তাঁর ঐতিহাসিক বিদায় হজ্জের ভাষণ প্রদান করেন। এটিই ছিল তাঁর জীবনের সর্বশেষ এবং সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ জনসম্মুখের ভাষণ। এই ভাষণে তিনি ইসলামের মৌলিক আদর্শ, মানবাধিকারের মূলনীতি, সামাজিক ন্যায়বিচার, অর্থনৈতিক শোষণমুক্ত সমাজব্যবস্থা, নারী-পুরুষের পারস্পরিক দায়িত্ব, মুসলিম ভ্রাতৃত্ব এবং কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার নির্দেশ প্রদান করেন। তাই এই ভাষণকে ইসলামের একটি সারসংক্ষেপ এবং মানবজাতির জন্য একটি চিরন্তন নীতিমালা বলা হয়।
এ মহতী ভাষণের দিকনির্দেশনাগুলো নিম্নে বর্ণিত হলো:
১. মানবজীবনের পবিত্রতা ও নিরাপত্তার ঘোষণা
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ঘোষণা করেন—
“তোমাদের রক্ত, তোমাদের সম্পদ এবং তোমাদের সম্মান তোমাদের জন্য ততটাই পবিত্র, যেমন এই দিন, এই মাস এবং এই নগরী পবিত্র।”
এর মাধ্যমে তিনি মানুষের জীবন, সম্পদ ও সম্মানকে অবিচ্ছেদ্য মৌলিক অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন।
কুরআনের আলোকে :
♥ “যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে একজন মানুষকে হত্যা করল, সে যেন সমগ্র মানবজাতিকেই হত্যা করল।” (সূরা আল–মায়িদাহ, ৫:৩২)
২. সুদ (রিবা) সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত ঘোষণা
তিনি জাহিলী যুগের সমস্ত সুদ বাতিল ঘোষণা করেন এবং সর্বপ্রথম তাঁর চাচা আব্বাস (রাঃ)–এর প্রাপ্য সুদ পরিত্যাগ করেন। এতে বোঝা যায়, ইসলামে আইন প্রয়োগ আত্মীয়–স্বজন দিয়ে শুরু হয়।
কুরআনের আয়াত :
♥ “আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন।” (সূরা আল-বাক্বারাহ, ২:২৭৫)
৩. জাহিলী যুগের রক্তপ্রতিশোধের অবসান
তিনি ঘোষণা করেন যে জাহিলিয়াতের সকল রক্তের দাবি ও গোত্রীয় প্রতিশোধের প্রথা রহিত করা হলো।
এর মাধ্যমে প্রতিহিংসার পরিবর্তে ন্যায়বিচার ও আইনের শাসনের ভিত্তি স্থাপিত হয়।
৪. নারী অধিকার ও পারিবারিক জীবনের ভারসাম্য
তিনি বলেন—
“নারীদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো। তোমরা তাদের আল্লাহর আমানত হিসেবে গ্রহণ করেছ।”
তিনি স্বামী–স্ত্রীর পারস্পরিক অধিকার ও দায়িত্ব সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করেন।
কুরআনের আয়াত :
♥ “তোমরা তাদের সঙ্গে সদ্ভাবে জীবনযাপন কর।” (সূরা আন–নিসা, ৪:১৯)
৫. মুসলিম ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠা
তিনি ঘোষণা করেন—
“প্রত্যেক মুসলিম অপর মুসলিমের ভাই।”
জাতি, গোত্র ও বংশের অহংকার পরিহার করে ঈমানভিত্তিক ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠার শিক্ষা দেন।
কুরআন :
♥ “নিশ্চয়ই মুমিনরা পরস্পর ভাই।” (সূরা আল–হুজুরাত, ৪৯:১০)
৬. বর্ণবাদ ও জাতিগত বৈষম্যের অবসান
তিনি ঘোষণা করেন—
“কোনো আরবের ওপর অনারবের, অনারবের ওপর আরবের, শ্বেতাঙ্গের ওপর কৃষ্ণাঙ্গের কিংবা কৃষ্ণাঙ্গের ওপর শ্বেতাঙ্গের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই; একমাত্র তাকওয়াই মর্যাদার ভিত্তি।”
এটি মানবসমতার সর্বশ্রেষ্ঠ ঘোষণা।
কুরআনের আয়াত :
♥ “আল্লাহর নিকট তোমাদের মধ্যে সেই অধিক মর্যাদাসম্পন্ন, যে অধিক মুত্তাকী।” (সূরা আল–হুজুরাত, ৪৯:১৩)
৭. শয়তানের ষড়যন্ত্র সম্পর্কে সতর্কতা
তিনি বলেন, শয়তান বড় বিষয়ে পূজিত হওয়ার আশা ছেড়ে দিয়েছে; কিন্তু ছোট ছোট কাজে মানুষকে বিভ্রান্ত করতে সচেষ্ট থাকবে।
অর্থাৎ ছোট গুনাহকে তুচ্ছ মনে না করার শিক্ষা দেওয়া হয়েছে।
৮. কুরআন ও সুন্নাহকে দৃঢ়ভাবে অনুসরণের নির্দেশ
তিনি ঘোষণা করেন—
“আমি তোমাদের মাঝে এমন দুটি জিনিস রেখে যাচ্ছি, যতদিন তোমরা তা দৃঢ়ভাবে ধারণ করবে ততদিন কখনো পথভ্রষ্ট হবে না—আল্লাহর কিতাব এবং তাঁর রাসূলের সুন্নাহ।”
এই নির্দেশ মুসলিম উম্মাহর চিরস্থায়ী সংবিধান।
আল্লাহ বলেন—
♥ “রাসূল তোমাদের যা দেন তা গ্রহণ কর এবং যা থেকে নিষেধ করেন তা থেকে বিরত থাক।” (সূরা আল–হাশর, ৫৯:৭)
৯. আমানত রক্ষা ও দায়িত্বশীলতা
তিনি নির্দেশ দেন যে প্রত্যেকের নিকট যে আমানত রয়েছে তা যথাযথভাবে তার মালিকের কাছে ফিরিয়ে দিতে হবে।
কুরআনের আয়াত :
♥ “আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দেন যে, তোমরা আমানতসমূহ যথাযথভাবে তার হকদারদের কাছে পৌঁছে দাও।” (সূরা আন–নিসা, ৪:৫৮)
১০. দ্বীনের বার্তা পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব
তিনি উপস্থিত সাহাবীদের উদ্দেশে বলেন—
“যারা উপস্থিত আছে তারা যেন অনুপস্থিতদের কাছে এ বাণী পৌঁছে দেয়।”
এর মাধ্যমে ইসলামের দাওয়াত ও জ্ঞান প্রচারের দায়িত্ব সমগ্র উম্মাহর ওপর অর্পিত হয়।
কুরআনের আযাত :
♥ “তোমাদের মধ্য থেকে এমন একটি দল থাকা উচিত যারা কল্যাণের দিকে আহ্বান করবে।” (সূরা আলে ইমরান, ৩:১০৪)
১১. জবাবদিহিতার চেতনা
তিনি সাহাবীদের জিজ্ঞাসা করেন—
“আমি কি আল্লাহর বাণী পৌঁছে দিয়েছি?”
সকল সাহাবী উত্তর দেন—
“হ্যাঁ, আপনি পৌঁছে দিয়েছেন।”
তখন তিনি আকাশের দিকে আঙুল তুলে তিনবার বলেন—
“হে আল্লাহ! আপনি সাক্ষী থাকুন।”
এটি নবুওয়াতের দায়িত্ব পূর্ণাঙ্গভাবে সম্পাদনের ঐতিহাসিক ঘোষণা।
♣ বিদায় হজ্জের ভাষণের মূল শিক্ষা
বিদায় হজ্জের ভাষণ মানবসভ্যতার জন্য একটি সর্বজনীন নৈতিক সনদ। এতে মানবজীবনের মর্যাদা, সম্পদের নিরাপত্তা, সামাজিক ন্যায়বিচার, অর্থনৈতিক শোষণমুক্তি, নারী-পুরুষের পারস্পরিক অধিকার, জাতিগত সাম্য, মুসলিম ভ্রাতৃত্ব, তাকওয়ার শ্রেষ্ঠত্ব, আমানতদারিতা, কুরআন ও সুন্নাহর অনুসরণ এবং দ্বীনের দাওয়াত প্রচারের মৌলিক নীতিমালা সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। আধুনিক বিশ্বে মানবাধিকার, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের যে নীতিগুলোকে আদর্শ হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তার অধিকাংশই এই ঐতিহাসিক ভাষণে প্রায় চৌদ্দশত বছর পূর্বেই ঘোষিত হয়েছিল।
♣ বিদায় হজ্জের ভাষণের প্রামাণ্য উৎস
বিদায় হজ্জের ভাষণের বর্ণনা একক কোনো হাদীসে পূর্ণাঙ্গভাবে সংরক্ষিত হয়নি; বরং বিভিন্ন সাহাবীর বর্ণনায় এর বিভিন্ন অংশ সংকলিত হয়েছে। প্রধান উৎসগুলোর মধ্যে রয়েছে—
- সহীহ মুসলিম — হজ্জ অধ্যায় (বিশেষত জাবির ইবন আবদুল্লাহ (রাঃ)-এর দীর্ঘ হাদীস)।
- সহীহ বোখারী — হজ্জ, ইলম, ফিতান প্রভৃতি অধ্যায়ে ভাষণের বিভিন্ন অংশ।
- আত–তিরমিযী।
- সুনান আবু দাউদ।
- সুনান ইবনে মাজাহ।
- মুসনাদ আহমদ ইবনে হাম্বল।
- আল– সিরাহ্ আল–নাবীয়্যা।
উপসংহার
বিদায় হজ্জের ভাষণ কেবল একটি ঐতিহাসিক বক্তৃতা নয়; এটি মানবজাতির জন্য আল্লাহপ্রদত্ত জীবনবিধানের একটি সংক্ষিপ্ত কিন্তু পূর্ণাঙ্গ ঘোষণাপত্র। ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র—সকল স্তরে ন্যায়, দয়া, সাম্য, দায়িত্বশীলতা এবং আল্লাহভীতির যে আদর্শ এতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তা কিয়ামত পর্যন্ত মানবজাতির জন্য কল্যাণ ও মুক্তির পথপ্রদর্শক হয়ে থাকবে। মুসলিমদের কর্তব্য হলো এই ভাষণের শিক্ষা কেবল পাঠ করা নয়, বরং ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে বাস্তবায়ন করা এবং পরবর্তী প্রজন্মের কাছে তা বিশ্বস্তভাবে পৌঁছে দেওয়া।
ইসলামকে চূড়ান্ত দ্বীন মনোনীত করার ঘোষণা
বিদায় হজ্জ্বের ভাষণ শেষে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) যখন আরাফাতের ময়দান থেকে প্রস্থানের জন্য উদ্যত হলেন ঠিক তখনই পবিত্র কুরআনের সর্বশেষ আয়াতটি নাযিল হলো:
♥ “…… আজকের এ দিনে আমি তোমাদের ধর্মকে চূড়ান্ত করলাম, তোমাদের ওপর আমার নিয়ামত পরিপূর্ণ করে দিলাম এবং ইসলামকে ধর্ম হিসেবে তোমাদের জন্য মনোনীত করলাম…. ।” (সূরা মায়েদাহ, ৫:৩)।
উরোক্ত এ আয়াতটি ছিল মানব জাতির জন্য ইসলামকে মহান আল্লাহর চূড়ান্ত দ্বীন হিসেবে মনোনীত করার ঘোষণা। এরই সাথে সমাপ্ত হলো নবুওত ও রিসালত এবং ওহী নাযিলের ধারাবাহিকতা। এরপর যেমন আর কোন নবী–রসূল ও নতুন ধর্মের আগমন ঘটবে না তেমনই আর কোন আসমানী কিতাবও নাযিল হবে না অর্থাৎ সর্বশেষ নবী ও রসূল হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর প্রচারিত ইসলাম ধর্ম আল্লাহর দ্বীন হিসেবে এবং তাঁর উপর নাযিলকৃত পবিত্র কুরআন আল্লাহর কিতাব হিসেবে রোজ ক্বিয়ামত পর্যন্ত বলবৎ থাকবে।
বিদায়ের ইঙ্গিতবাহী বার্তা
নবুওতি মিশনের সমাপ্তির ইঙ্গিতবাহী সূরা ‘নছর’ নাযিল হলে নবীজী (সাঃ) বুঝতে পেরেছিলেন মহান আল্লাহর সান্নিধ্যে তাঁর প্রত্যাবর্তনের সময় সন্নিকটে। সূরাটি নাযিলের পর ঘনিষ্ট সহচর ও বিজ্ঞ বন্ধু হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রাঃ) প্রিয় বন্ধুর আসন্ন বিদায়ের আশঙ্কায় কেঁদেছিলেন অঝোর ধারায়। তারপর বিদায় হজ্জ্বকালে মানব জাতির জন্য ইসলামকে মহান আল্লাহর চূড়ান্ত দ্বীন হিসেবে মনোনীত করার ঘোষণা সম্বলিত যে আয়াতটি নাযিল হয়েছিল তার মধ্য়েও নিহিত ছিল তাঁর বিদায়ের ইঙ্গিত বার্তা। এ আয়াতটির মধ্যেও আসন্ন বিদায়ের সুর প্রতিধ্বনিত হলে সেটা বুঝতে পেরে অপর ঘনিষ্ট সহচর হযরত ওমর (রাঃ)ও কেঁদেছিলেন আসন্ন বিরহ ব্যথায়। এসবই ছিল তাঁর বিদায়ের ইঙ্গিতবাহী বার্তা।
এছাড়া তাঁর কিছু কথাবর্তায় নিজ জীবনের অন্তিম লগ্নের ইঙ্গিত প্রকাশ পায়। যেমন, তিনি তাঁর খাদেম হযরত আবু মুওয়ায়হিবা (রাঃ)-কে সঙ্গে নিয়ে জান্নাতুল বাকী কবরস্থান জিয়ারত শেষে তাঁকে বলেছিলেন:
‘আল্লাহ্ তায়ালা আমাকে দুনিয়াবী সম্পদ ও অমরত্ব লাভ অথবা আল্লাহর সান্নিধ্য ও বেহেশত লাভ – এ দু’টির যেকোন একটি বেছে নেওয়ার অধিকার প্রদান করেছেন। আমি তাঁর দীদার ও বেহেশতকেই বেছে নিয়েছি।’
জীবনের শেষ লগ্নে এসেও নবীজী (সাঃ) তাঁর নবুওতি মিশনের কাজ শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অব্যাহত রেখেছিলেন। এগুলোর মধ্যে ছিল ইসলামী রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বিধান, মুসলমানদের বিশেষ করে মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে ঐক্য ও সংহতি সুরক্ষা, সালাতের প্রতি গুরুত্বারোপ, অধীনস্থদের প্রতি সুনজর, ইত্যাদি।