২৭ তম অধ্যায় : মহাজীবনের সায়াহ্নকাল

বিদায়ের ইঙ্গিতবাহী বার্তা

“যখন আসবে আল্লাহর সাহায্য ও বিজয় এবং আপনি মানুষকে দলে দলে আল্লাহর দ্বীনে প্রবেশ করতে দেখবেন, তখন আপনি আপনার পালনকর্তার পবিত্রতা বর্ণনা করুন এবং তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন। নিশ্চয় তিনি ক্ষমাকারী।” (১১০:১ – ৩)।

নবুওতি মিশনের সমাপ্তির ইঙ্গিতবাহী উপরোক্ত সূরা ‘নছর’ নাযিল হলে  নবীজী (সাঃ) বুঝতে পেরেছিলেন মহান আল্লাহর সান্নিধ্যে তাঁর প্রত্যাবর্তনের সময় সন্নিকটে। সূরাটি নাযিলের পর ঘনিষ্ট সহচর ও বিজ্ঞ বন্ধু হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রাঃ) প্রিয় বন্ধুর আসন্ন বিদায়ের আশঙ্কায় কেঁদেছিলেন অঝোর ধারায়। তারপর বিদায় হজ্জ্বকালে সর্বশেষ আয়াতটি নাযিল হলো:

“…… আজকের এ দিনে আমি তোমাদের ধর্মকে চূড়ান্ত করলাম, তোমাদের ওপর আমার নিয়ামত পরিপূর্ণ করে দিলাম এবং ইসলামকে ধর্ম হিসেবে তোমাদের জন্য মনোনীত করলাম…. (৫:৩)।”

এ আয়াতটির মধ্যেও আসন্ন বিদায়ের সুর প্রতিধ্বনিত হলো। সেটি বুঝতে পেরে অপর ঘনিষ্ট সহচর হযরত ওমর (রাঃ)ও কেঁদেছিলেন আসন্ন বিরহ ব্যথায়। এসবই ছিল তাঁর বিদায়ের ইঙ্গিতবাহী বার্তা।

এছাড়া তাঁর কিছু কথাবর্তায় নিজ জীবনের অন্তিম লগ্নের ইঙ্গিত প্রকাশ পায়। যেমন, তিনি তাঁর খাদেম হযরত আবু মুওয়ায়হিবা (রাঃ)-কে সঙ্গে নিয়ে জান্নাতুল বাকী কবরস্থান জিয়ারত শেষে তাঁকে বলেছিলেন:

‘আল্লাহ্ তায়ালা আমাকে দুনিয়াবী সম্পদ ও অমরত্ব লাভ অথবা আল্লাহর সান্নিধ্য ও বেহেশত লাভ  – এ দু’টির যেকোন একটি বেছে নেওয়ার অধিকার প্রদান করেছেন। আমি তাঁর দীদার ও বেহেশতকেই বেছে নিয়েছি।’

জীবনের শেষ লগ্নে এসেও নবীজী (সাঃ) তাঁর নবুওতি মিশনের কাজ শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অব্যাহত রেখেছিলেন। এগুলোর মধ্যে ছিল ইসলামী রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বিধান, মুসলমানদের বিশেষ করে মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে ঐক্য ও সংহতি সুরক্ষা, সালাতের প্রতি গুরুত্বারোপ, অধীনস্থদের প্রতি সুনজর, ইত্যাদি।

 

সর্বশেষ যুদ্ধাভিযান

ইসলামের অগ্রযাত্রায় রোমান সম্রাজ্য শঙ্কিত ও প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে উঠে। তাবুক অভিযানের সময় তারা মুসলিম বাহিনীর সাথে মোকাবিলা করতে সাহস পায়নি। বিদায় হজ্জ্ব শেষে মক্কা থেকে মদীনায় ফিরে এসে নবী করীম (সাঃ) জানতে পারলেন আরব–সিরিয়া সীমান্ত দিয়ে রোমক বাহিনী আক্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছে। তিনি কালবিলম্ব না করে সেনাবাহিনী সংগঠিত করেন। সেনাপ্রধান হিসেবে নিয়োগ দেন বিশ বছর বয়স্ক হযরত উসামা বিন যায়েদ (রাঃ)-কে। তাঁর পিতা হযরত যায়েদ বিন হারিছ (রাঃ) ছিলেন নবীজী (সাঃ) এর পালকপুত্র ও মুতার যুদ্ধের একজন শহীদ সেনাপতি। এত অল্প-বয়স্ক একজন যুবককে প্রধান সেনাপতি করায় কারো কারো আপত্তি থাকলেও নবীজী (সাঃ) তাঁর নেতৃত্বের প্রতি ছিলেন পূর্ণ আস্থাশীল। তাঁকে সেনাপতি হিসেবে নিয়োগদানের মধ্যে যে তাৎপর্য নিহিত ছিল তা হলো:

  • বিজয় লাভের মাধ্যমে পিতার শাহাদতের প্রতিশোধ গ্রহণ ও গৌরব অর্জন।

  • যুবক শ্রেণীর মধ্যে ধৈর্য ও নেতৃত্বের গুণাগুণ ও অনুপ্রেরণা সৃষ্টি করা।

  • নবীন–প্রবীন নির্বিশেষে নেতৃত্বের প্রতি আনুগত্য করা।

হযরত আবুবকর (রাঃ), হযরত ওমর (রাঃ), হযরত আবু উবায়দা (রাঃ) প্রমুখের মতো অভিজ্ঞ ও বয়স্ক সাহাবীগণও উসামা (রাঃ) এর নেতৃত্বে যুদ্ধে অংশগ্রহণের প্রস্তুতি নেন। তাঁর প্রতি নবীজী (সাঃ) এর নির্দেশ ছিল মুতার যে স্থানে তাঁর পিতা রোমক বাহিনীর সাথে যুদ্ধে শহীদ হয়েছিলেন সেখানেই শত্রুপক্ষের উপর অতর্কিত আক্রমণ চালাতে যাতে তারা পাল্টা আক্রমণের সুযোগ না পায়।

উসামা (রাঃ) এর নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনী যখন মদীনার অদূরে জুরফ নামক স্থানে শিবির স্থাপন করে প্রস্তুতি গ্রহণ করছিলো ঠিক তখনই নবী করীম (সাঃ) এর গুরতর অসুস্থতার খবর ছড়িয়ে পড়ে। ফলে নবীজী (সাঃ) এর পক্ষ থেকে যুদ্ধ-গমনের তাগিদ থাকা সত্ত্বেও তা সাময়িকভাবে স্থগিত হয়ে যায়। কারণ সিরিয়ার পথটি ছিল দীর্ঘ। তাঁকে অসুস্থ অবস্থায় রেখে এত দীর্ঘ পথে যাত্রাকে কেহই সমীচিন মনে করেননি। অবশ্য এ অভিযানটি হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর ওফাত ও হযরত আবু বকর (রাঃ) এর খিলাফত গ্রহণের অব্যবহিত পরেই উসামা (রাঃ) এর নেতৃত্বে পরিচালিত হয়েছিল।

 

অসুস্থতার সূত্রপাত ও পরপারের আহ্বান

একাদশ হিজরী সাল। ২৮শে সফর বুধবার দিবাগত রাতে নবীজী (সাঃ) বাকীয়ে গারকাদ গোরস্থান থেকে কবর জিযারত শেষে যখন গৃহে ফিরছিলেন তখন তাঁর মাথায় ব্যথা শুরু হয়। তিনি সকাল বেলায় হযরত আয়েশা (রাঃ) এর কক্ষে গিয়ে দেখতে পেলেন আয়েশা (রাঃ)ও মাথা ব্যথায় কাতরাচ্ছেন। তাঁর এ অবস্থা দেখে তিনি বললেন, ‘আমারও মাথায় ভীষণ ব্যথা হচ্ছে।’ কিন্তু তাঁর কোন সাড়া না পেয়ে নবীজী (সাঃ) পরিস্থিতি হালকা করার জন্য বললেন, ‘ও আয়েশা, তুমি যদি আমার পূর্বে মারা যাও তাহলে আমি নিজ হাতে তোমাকে গোসল করিয়ে কাফন পরিয়ে কবরে শুইয়ে দেব। এর চেয়ে উত্তম আর কি হতে পারে?’ এবার আয়েশা (রাঃ) সাড়া দিলেন, প্রত্যুত্তরে বললেন, ‘হ্যা, কতই না ভালো হবে তখন আপনি নতুন এক স্ত্রী এনে আমার স্থলাভিষিক্ত করবেন।’ তাঁর এ কথাটি নবীজী (সাঃ) নীরবে উপভোগ করলেন। এরপর থেকে তাঁর মাথা ব্যথাসহ জ্বরের প্রকোপ শুরু হলো। ওফাতের পূর্ব পর্যন্ত একনাগাড়ে তেরোদিন তিনি জ্বরাক্রান্ত ছিলেন। (ফাতহুল বারী)। অসুস্থতার মাত্রা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেলে তিনি অন্য স্ত্রীদের সম্মতিক্রমে হযরত আয়েশা (রাঃ) গৃহে অবস্থান করতে থাকেন।

 

অন্তিমকালীন ঘটনা প্রবাহ

পিতার অসুস্থতার খবর পেয়ে কন্যা ফাতেমা (রাঃ) তাঁকে দেখতে এলেন। নবীজী (সাঃ) তাঁর কন্যাকে কাছে ডেকে নিয়ে কানে কানে কিছু এটা বললেন। এতে ফাতেমা (রাঃ) অঝোর ধারায় কাঁদতে শুরু করলেন। তখন তিনি তাঁকে আবারও কাছে ডেকে নিয়ে কানে কানে কিছু একটা বললেন। এবার কন্যা হাসতে শুরু করলেন। পিতা–কন্যার এ ধরনের রহস্যময় আচরণ উপস্থিত আয়েশা (রাঃ) কিছুই বুঝতে পারলেন না। নবীজী (সাঃ) এর ওফাতের পর অবশ্য ফাতেমা (রাঃ) পিতার সাথে তাঁর কানাকানির কথা প্রকাশ করে বলেন, ’নবীজী প্রথমবারে যখন তাঁর আসন্ন ওফাতের সংবাদটি দেন তখন অমি কেঁদেছিলাম, দ্বিতীয়বারে যখন বলেন, আহলে–বাইতের মধ্যে আমিই প্রথম তাঁর সাথে মিলিত হব তখন আমি হেসেছিলাম।’ নবীজী (সাঃ) এর ওফাতের ছয় মাস পর হযরত ফাতেমা (রাঃ)ও ইন্তেকাল করেন।

নবী করীম (সাঃ) এর পীড়া বাড়তে থাকায় সালাতের জামাতে ইমামতি করা কষ্টদায়ক হলেও তিনি তা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। এরপর যখন তাঁর পক্ষে আর সম্ভব হচ্ছিল না তখন তিনি হযরত আবু বকর (রাঃ)-কে ইমামতি করার নির্দেশ দেন। কোন কোন বিশুদ্ধ মতে নবীজী (সাঃ) এর জীবৎকালে হযরত আবু বকর (রাঃ) সতেরো ওয়াক্ত ইমামতির দায়িত্ব পালন করেন। (মিরকাত শরহে মিশকাত)। কোন এক ওয়াক্তে তাঁর নামাযে উপস্থিত হতে দেরী হওয়ায় লোকজনের অনুরোধে হযরত ওমর (রাঃ) নামাযে ইমামতি করছিলেন। তাঁর কন্ঠে তকবীর ধ্বনি শুনে নবীজী (সাঃ) অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘আবু বকরের দরজা ব্যতীত মসজিদের দিকে যত লোকের দরজা তার সবগুলো বন্ধ করে দেওয়া হোক।’ (ফাতহুল বারী)। মুহাদ্দিসগণের মতে, তাঁর এ কথার মধ্যেই তাঁর অবর্তমানে হযরত আবু বকর (রাঃ) এর উপর খিলাফতের দায়িত্ব বর্তানোর প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত ছিল।

অসুস্থতার মাত্রা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছিল। জ্বর উঠানামার সাথে সাথে পেটেও অসহ্য যন্ত্রণা হচ্ছিল। তখন তাঁকে বারংবার বলতে শুনা গেলো খয়বরে ইহুদিনী কর্তৃক খাদ্যে বিষ প্রয়োগের কারণেইে এ যন্ত্রণার উৎপত্তি হয়েছে। প্রচন্ড জ্বর ও দুর্বলতার মধ্যেই একদিন মসজিদে যেতে ইচ্ছা প্রকাশ করে বললেন, ’সাতটি কূপ থেকে সাত পাত্র পানি এনে আমাকে গোসল করাও।’ সে অনুযায়ী তাঁকে গোসল করানোর পর তিনি মাথায় ভিজা–পট্টি বেঁধে মসজিদে যান। প্রথমে তিনি হযরত উসামা (রাঃ) এর সেনাপতি পদে নিয়োগদানের ব্যাপারে যে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছিল তার নিরসন করেন। তিনি উপস্থিত সাহাবীগণের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘তোমরা আমার কবরকে মূর্তি বানিও না এ কারণে যে তার পূজা করা হবে।’ (মোয়াত্তা ইমাম মালিক)। তিনি আরও বলেন, ’আমার কবরকে তোমরা সিজদার স্থান বানিও না। বনী ইসরাইলের লোকেরা তাদের নবীর মাজারকে সিজদার স্থান বানিয়ে আল্লাহ্ তায়ালার অভিশাপ কুঁড়িয়েছে।’ (সহীহ বোখারী শরীফ)।

এরপর তিনি বললেন, ‘আল্লাহ্ তায়ালা কোন এক ব্যক্তিকে পার্থিব সম্পদ কিংবা আল্লাহর সান্নিধ্যে পরকালে যা রয়েছে এ দু’টির যেকোন একটি পছন্দ করার অধিকার দিয়েছেন। কিন্তু সে ব্যক্তি  আল্লাহর সান্নিধ্যে যা রয়েছে তাই বেছে নিয়েছে।’ এ ব্যক্তি যে স্বয়ং রাসূল্লাহ্ (সাঃ) এবং এ উক্তির মধ্যে যে তাঁর আসন্ন বিদায়ের প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত রয়েছে এটা বুঝতে পেরে হযরত আবু বকর (রাঃ) কাঁদতে শুরু করেন। এ সময় নবীজী (সাঃ) বলেন যে, ’দুনিয়ায় কাউকে বন্ধু বানানোর অনুমতি থাকলে আবু বকরই হতেন আমার সে বন্ধু।’

নবীজী (সাঃ) এর অর্থসম্পদ বলতে তাঁর কাছে যে সাতটি দীনার ছিল তা তিনি ইতোমধ্যে সদকা করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। তা প্রতিপালিত হয়েছে কি না তা জানতে চাইলে হযরত আয়েশা (রাঃ) তাঁকে জানালেন ভুলবশত তা এখনও তাঁর কাছে রয়ে গেছে, সদকা করা হয়নি। তিনি আশঙ্কা করলেন যদি এগুলো থেকে যায় তাহলে আল্লাহর সাক্ষাতে কেমনে মুখ দেখাবেন। জীবদ্দশায়ই তিনি পার্থিব সম্পদ থেকে মুক্ত হতে চান। তাই তৎক্ষণাৎ তা গরীবদের মধ্যে বিলিয়ে দেওয়া হলো।

তিনি আশঙ্কাবোধ করলেন যে, কোন পাওনাদারের প্রাপ্য অর্থ হয়তো ফেরত দেওয়া হয়নি অথবা তিনি হয়তো কারো প্রতি জুলুম করে থাকতে পারেন যার ফয়সালা এখনও হয়নি। সুতরাং এসবের ফয়সালার আহ্বান জানিয়ে তিনি বললেন, ‘আমি যদি কারো পাওনা ফেরত না দিয়ে থাকি সে যেন তা ফেরত নেয়, আমি যদি কাউকে আঘাত করে থাকি তবে সে যেন আমার উপর আঘাত করে এর প্রতিশোধ নেয়, আমি যদি করো সম্মানহানি করে থাকি সে যেন আমার উপস্থিতিতে একই আচরণ করে।’ তাঁর এ আহ্বানে একজন পাওনাদার দাবী করলেন তিনি নবীজী (সাঃ) এর কাছে তিন দিরহাম পাবেন। তাঁর সে দাবী তৎক্ষণাৎ মিটিয়ে দেওয়া হয়। এরপর তিনি মুহাজিরগণকে লক্ষ্য করে বলেন, তাঁরা যেন তাদের আনসার ভাইগণের গুণগ্রাহী হন। তাঁদের প্রতি উদারতা, ক্ষমাসুন্দর ও সদাচারণের উপদেশ দিয়ে তিনি বলেন, ‘তারা ছিল আমার অন্তর ও কলিজাবিশেষ।’

দিন যতই গড়াচ্ছিল নবীজী (সাঃ) এর শারীরিক অবস্থার ততই অবনতি হচ্ছিল। রবিউল মাসের এগারো তারিখ এশার নামাযের অজু করে বার বার দাঁড়াবার চেষ্টা করেও দাঁড়াতে পারছিলেন না। তখন আবু বকর (রাঃ) নামাযের ইমামতি করার জন্য আদিষ্ট হলেন। সবাই চিন্তায় পড়ে গেলো নবীজী (সাঃ) বুঝি আর বেঁচে নেই। এটা বুঝতে পেরে তিনি দু’জনের কাঁধে ভর করে মিম্বরে আসলেন। আবু বকর (রাঃ) ইমামতির স্থান ছেড়ে সরে আসলেন। কিন্তু নবীজী (সাঃ) তাঁকে নিষেধ করলেন এবং তাঁর পাশে বসালেন। নামায শেষে সবাইকে উদ্দেশ্য করে বললেন, ‘ও আমার সাথীবৃন্দ, তোমাদেরকে মহান আল্লাহর হাতে সোপর্দ করে যাচ্ছি। তোমরা যদি খাঁটি বান্দা হিসেবে তাঁর হুকুম–আহকাম মেনে চলো তবেই তিনি তোমাদেরকে রক্ষা করবেন।’ এ কথা বলে তিনি সবার কাছ থেকে বিদায় নিলেন।

জ্বরের প্রকোপ বৃদ্ধি পাওয়ায় রাতটি তাঁর খুবই কষ্টে কাটলো। পরদিন রবিউল আউয়াল মাসের বারো তারিখ সোমবার। তিনি ফজরের নামায়ে যাওয়ার চেষ্টা করেও যেতে পারলেন না। যথারীতি আবু বকর (রাঃ) এর ইমামতিতে নামায শুরু হলো। নবীজী (সাঃ) ঘরের পর্দা সরিয়ে নির্বাক দৃষ্টিতে মুসলমানদের নামায আদায় দেখে তৃপ্তির মৃদু হাসি হাসলেন এবং ভবিষ্যত উম্মতের একটি সুমধুর দৃশ্য তাঁর দৃষ্টিপটে ভেসে উঠলো।

অজ্ঞান অবস্থায় নবীজী (সাঃ)-কে ওষুধ পান করানো হলে জ্বর কিছুটা কমে আসে – যদিও ওষুধ পান করানোয় তিনি খুবই অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন। ওষুধের প্রভাবে সে দিন সকালে তিনি কিছুটা সুস্থবোধ করলেন। প্রিয় সাহাবীগণ এতে স্বস্তিবোধ করলেন। হযরত আবু বকর (রাঃ) তাঁকে দেখতে এলেন এবং মদীনার বাইরে এক পল্লীতে অবস্থানরত তাঁর স্ত্রীকে আনতে যাওয়ার জন্য অনুমতি চাইলেন। তিনি তাঁকে যাবার সম্মতি দিলেন। এভাবে অন্য সবাই তাঁর সুস্থতা দর্শনে নিজ নিজ কাজে চলে গেলেন। তাঁর অসুস্থতায় স্থগিত অভিযানের সেনাপতি উসামা (রাঃ) এসে নবীজী (সাঃ) এর সাথে সাক্ষাৎ করলেন। তিনি তাঁর জন্য দোয়া করলেন এবং অভিযানে যাত্রার তাগিদ দিলেন।

দুপুর থেকে তাঁর অসুস্থতা পুনরায় বাড়তে থাকে। শরীরের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ায় তিনি দুর্বল হাতে পানির পাত্রে হাত ভিজিয়ে মুখমন্ডল মুছতে লাগলেন। মাঝে মাঝে তিনি হুঁশ হারিয়ে ফেলছিলেন। ফাতেমা (রাঃ) এসে তাঁর এরূপ অস্থিরতা দেখে বললেন, ’ওহ্, কত কষ্ট আমার পিতার ।’  নবীজী (সাঃ) তাঁকে কাছে ডেকে নিয়ে বললেন, ‘আজকের পর আর এ কষ্ট থাকবে না আমার।’

অন্তিমকালীন এ অবস্থায়ও তিনি উম্মতের কথা ভুলতে পারেননি – বললেন, ‘কাগজ কলম নিয়ে আস। আমি তোমাদের জন্য কিছু উপদেশ লিখে রেখে যেতে চাই – তা আমল করলে তোমরা পথভ্রষ্ট হবে না ।’  কিন্তু হযরত ওমর (রাঃ) এ মুমূর্ষাবস্থায় তাঁকে দিয়ে কিছু লিখিয়ে নেওয়া সমীচীন মনে করলেন না। তিনি বললেন, ’ইয়া রাসূল্লাহ্! লিখিত উপদেশের আর কি প্রয়োজন যেখানে আল্লাহর পবিত্র কুরআন ও আপনার সুন্নাহ্ আমাদের মধ্যে বিদ্যমান। আমাদের পথ প্রদর্শনের জন্য এ দু’টোই যথেষ্ট।’

 

মহান আল্লাহর সান্নিধ্যে

সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছিল। এ সময় তাঁর মাথা মুবারক ছিল প্রিয়তমা স্ত্রী হযরত আয়েশা (রাঃ) এর কোলে। মৃত্যু যন্ত্রণা ক্রমশ পরিস্ফুটিত হচ্ছিল তাঁর পবিত্র মুখমন্ডলে। ঈষৎ কাতর কণ্ঠে নবীজী (সাঃ) মহান আল্লাহর দরবারে হাত তুলে বললেন, ‘ইয়া আল্লাহ! আমায় সাহায্য করো।’ ক্রমশই তাঁর শরীর নিস্তেজ হয়ে আসছিল, মাথা মুবারক ভারী হয়ে উঠলো। এ সময় তাঁর ক্ষীণ–কণ্ঠে উচ্চারিত হচ্ছিল, ‘ইয়া রফিকে আ’লা।’ অর্থাৎ ‘হে মহান বন্ধু আমার! তোমারই সান্নিধ্যে।’ এরপর নবীজী (সাঃ) এর পবিত্র কণ্ঠ নীরব হলো, দেহ মুবারক হলো নিস্পন্দ এবং রুহ মুবারক তাঁর মহান প্রভুর সান্নিধ্যে প্রস্থান করলো। হযরত আয়েশা (রাঃ) নবীজী (সাঃ) এর মাথা মুবারক একটি বালিশের উপর রেখে দিলেন এবং তাঁর দেহ মুবারক একটি চাদর দিয়ে আবৃত করে দিলেন। এমন সময় নবী পরিবারে কান্নার রোল উঠলো।

یٰۤاَیَّتُهَا النَّفْسُ الْمُطْمَئِنَّۃُ ۝ ارْجِعِیْۤ اِلٰی رَبِّكِ رَاضِیَۃً مَّرْضِیَّۃً ۝ — “হে প্রশান্ত আত্মা, তুমি তোমার পালনকর্তার নিকট ফিরে যাও সন্তুষ্ট ও সন্তোষভাজন হয়ে।” (৮৯:২৭–২৮) । সৃষ্টির অমোঘ নিয়মে সবাইকে ফিরে যেতে হয় মহান প্রভু আল্লাহর নিকট। চিরঞ্জীব ও অনাদি সত্তা মহান আল্লাহর আহ্বানে তাঁর প্রিয় নবী (সাঃ)ও চলে গেলেন তাঁর সন্নিকটে। তিনি চলে গেলেও তাঁর জীবনাদর্শ চির–ভাস্বর হয়ে মানবজাতিকে পথ প্রদর্শন করবে রোজ ক্বিয়ামত পর্যন্ত।

 

“খতমে-নবুওত”- নবুওতি মিশনের পরিসমাপ্তি

ইসলামী পরিভাষায় ‘“খতমে–নবুওত” হলো নবুওত ও রিসালতের ধারার চূড়ান্ত পরিসমাপ্তি। হযরত মুহাম্মদ (সা) ছিলেন আল্লাহ তায়ালা প্রেরিত সর্বশেষ নবী ও রসূল। তাঁর আগমণ ও তিরোধানের সাথে সাথে নবুওত ও রিসালতের ধারা সমাপ্ত হয়। কারণ আল্লাহ্ স্বয়ং তাঁকে ‘খাতামান্নাবেয়ীন’ বলে অভিহিত করেছেন:

مَّا كَانَ مُحَمَّدٌ أَبَا أَحَدٍ مِّن رِّجَالِكُمْ وَلَـٰكِن رَّسُولَ اللَّهِ وَخَاتَمَ النَّبِيِّينَ ۗ وَكَانَ اللَّهُ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمًا

“মুহাম্মদ তোমাদের কোন ব্যক্তির পিতা নন; বরং তিনি আল্লাহর রাসূল এবং শেষ নবী। আল্লাহ সব বিষয়ে জ্ঞাত।” (৩৩:৪০)

উপরোক্ত আয়াতের মর্মার্থ অনুযায়ী রোজ ক্বিয়ামত পর্যন্ত আর কোন নবী বা রসূল আসবেন না। তাই হযরত মুহাম্মদ (সা) কোন একক সম্প্রদায়ের জন্য প্রেরিত হননি, বরং তিনি প্রেরিত হয়েছেন “সমগ্র মানব জাতির জন্য।” (৭:১৫৮)। তিনি চল্লিশ বছর বয়সে নবুওতের দায়িত্ব প্রাপ্ত হন। তেইশ বছর তিনি নবুওত ও রিসালতের এ দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর ওফাতের পর একই সাথে নবুওত ও রিসালতের ধারার পরিসমাপ্তি ঘটে। একইভাবে পূর্ণাঙ্গ কুরআন নাযিল হয়ে যাবার পর ওহী নাযিলের প্রক্রিয়াও বন্ধ হয়ে যায়। মক্কা বিজয়ের পর নবী করীমের (সাঃ) এর পার্থিব জীবন ও নবুওতি মিশনের পরিসমাপ্তির ইঙ্গিতপূর্ণ বার্তা এসেছিল যখন নাযিল হয়েছিল ’সুরা নছর’ (১১০:১ – ৩) এবং ইসলামকে পূর্ণাঙ্গ দ্বীন হিসেবে মনোনীত করার ঘোষণা সম্বলিত আয়াত (৫:৩)। নবী করীম (সাঃ) এর বিদায়–হজ্জ্বের ভাষণেও তাঁর বিদায়ের এ বার্তাটি প্রতিধ্বনিত হয়েছিল।

 

 

অধ্যায়সমূহ