২৮ তম অধ্যায় : ওফাত পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ

বিষাদগ্রস্ত মদীনাবাসী

নবীজী (সাঃ) এর ওফাতের খবর দ্রুত মদীনা ও তার আশপাশে ছড়িয়ে পড়লো। বিশিষ্ট সাহাবীবর্গ, ঘনিষ্ট স্বজন ও সাধারণ জনগণ সবাই মসজিদে নব্বী সংলগ্ন হযরত আয়েশার (রাঃ) এর গৃহের কাছে এসে জড়ো হচ্ছিলেন। ফজরের নামাযের পরও তাঁরা তাঁর সাক্ষাৎ পেয়েছিলেন। তাঁদের বিষাদ–ভরা অন্তর কিছুতেই সায় দিচ্ছিল না যে, নবীজী (সাঃ) আর তাদের মধ্যে নেই।

অনেকেই তাদের উচ্ছসিত হৃদয়াবেগ সংবরণ করতে পারছিলেন না। নবী–বিরহে কাতর সবাই যেন কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েছিল। হযরত ওমর (রাঃ) এর মতো উচ্চ–মার্গের ব্যক্তিত্বও নিজেকে সামাল দিতে পারছিলেন না। তাই শোকাহত ওমর (রাঃ) উচ্চ কন্ঠে বারবার  ঘোষণা দিচ্ছিলেন, ‘যারা তাঁর ওফাতের গুজব রটাচ্ছে আমি তাদের গর্দান উড়িয়ে দেব।’ ফলে ক্রমেই পরিস্থিতি জটিল হচ্ছিল এবং লোকজন দিশেহারা ও হতবুদ্ধি হয়ে পড়ছিল।

 

জ্ঞানবৃদ্ধ হযরত আবু বকর (রাঃ) এর বিচক্ষণতা

হযরত আবু বকর (রাঃ) সকাল বেলায় নবীজী (সাঃ) এর অনুমতিক্রমে তাঁর স্ত্রীকে আনতে মদীনার নিকটস্থ সুনাহ্ নামক এক পল্লীতে গিয়েছিলেন। তাঁর ওফাতের খবর পেয়ে তিনি দ্রুত মদীনায় ফিরে আসেন। সরাসরি নবী গৃহে প্রবেশ করে তাঁর মুখ থেকে চাদরখানি সরিয়ে তিনি গভীরভাবে নিরীক্ষণ করলেন। নবীজী (সাঃ)’র মুখে স্বর্গীয় উজ্জ্বলতা, কমনীয়তা ও সজীবতা দেখে তিনি কপালে চুমু খেলেন এবং বলে উঠলেন:

‘কি পবিত্র ও বরকতময় ছিল আপনার মহৎ জীবন! আমার পিতামাতা আপনার জন্য কুরবান হোক। মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে আপনার জন্য যে ওফাত নির্ধারিত ছিল তাই নিষ্পন্ন হয়েছে। এরপর আর কখনও মৃত্যু আপনাকে স্পর্শ করবে না।’

ধীর–স্থির ও শান্ত প্রকৃতির হযরত আবু বকর (রাঃ) নবী গৃহ থেকে বের হয়ে মসজিদে নব্বীতে এসে ওমর (রাঃ) এর উচ্চ কন্ঠের ঘোষণা শুনতে পান। তিনি তাঁকে শান্ত হতে বলেন। বিরহ কাতর উপস্থিত জনতাকে উদ্দেশ্য করে তিনি বললেন:

‘আপনারা যারা আল্লাহর উপাসনা করেন তারা জেনে রাখুন মহান আল্লাহ্ চিরঞ্জীব – মৃত্যু তাঁকে স্পর্শ করতে পারে না।  আর যারা মুহাম্মদ (সাঃ) এর পূজারী তারা জেনে রাখুন তিনি ইন্তেকাল করেছেন।’

এ কথা বলার পর তিনি পবিত্র কুরআনের সূরা আলে ইমরামের নিম্নোক্ত আয়াতটি পাঠ করেন:

وَمَا مُحَمَّدٌ إِلَّا رَسُولٌ قَدْ خَلَتْ مِن قَبْلِهِ الرُّسُلُ ۚ أَفَإِن مَّاتَ أَوْ قُتِلَ انقَلَبْتُمْ عَلَىٰ أَعْقَابِكُمْ ۚ وَمَن يَنقَلِبْ عَلَىٰ عَقِبَيْهِ فَلَن يَضُرَّ اللَّهَ شَيْئًا ۗ وَسَيَجْزِي اللَّهُ الشَّاكِرِينَ۝

”আর মুহাম্মদ একজন রসূল বৈ তো নয়! তাঁর পূর্বেও বহু রসূল অতিবাহিত হয়ে গেছেন। তাহলে কি তিনি যদি মৃত্যুবরণ করেন অথবা নিহত হন, তবে তোমরা পশ্চাদপসরণ করবে? বস্তুতঃ কেউ যদি পশ্চাদপসরণ করে, তবে তাতে আল্লাহর কিছুই ক্ষতি–বৃদ্ধি হবে না। আর যারা কৃতজ্ঞ, আল্লাহ তাদের সওয়াব দান করবেন।” (সূরা আলে ইমরান, ৩:১৪৪)

হযরত আবু বকর (রাঃ) এর কন্ঠে এ আয়াতটি শুনে হযরত ওমর (রাঃ) সম্বিৎ ফিরে পেলেন। তাঁর কাছে মনে হলো এ আয়াতটি যেন এখনই নাযিল হয়েছে। তিনি নীরব–নিস্তব্ধ চিত্তে প্রকৃত সত্য উপলব্ধী করতে পারলেন এবং বিরহ ব্যথায় মুষড়ে পড়লেন।

তবে এটা অবধারিত সত্য যে, নবীজী (সাঃ) দুনিয়া থেকে বিদায় নিলেও তাঁর জীবনাদর্শ চির–ভাস্বর ও চির–সমুজ্জ্বল রবে রোজ ক্বিয়ামত পর্যন্ত এবং মানবজাতিকে পথ প্রদর্শন করে যাবে।

 

উসামা বাহিনীর অভিযান পুনরায় স্থগিত

হযরত উসামা বিন যায়েদ (রাঃ) ভোরে নবীজী (সাঃ) এর সাথে সাক্ষাৎ শেষে অভিযানে বের হওয়ার জন্য সেনা ছাউনীতে পৌঁছে সৈন্য বাহিনীকে সিরিয়া অভিমুখে রওয়ানা দেওয়ার নির্দেশ দেন। কিন্তু ইতিমধ্যেই তাঁর নিকট খবর চলে আসে নবীজী (সাঃ) ওফাত ফরমিয়েছেন। খবর পাওয়া মাত্র তিনি অভিযান স্থগিত করে মদীনায় ফিরে আসেন এবং মুসলিম বাহিনীর পতাকাটি নবী গৃহের সামনে স্থাপন করে দেন। নবী–বিরহে সবাই তখন বিমর্ষ–ম্রিয়মান। তিনি মুসলমানদের পক্ষ থেকে পরবর্তী নির্দেশের জন্য অপেক্ষারত থাকলেন। অবশ্য এ অভিযানটি হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর ওফাত ও হযরত আবু বকর (রাঃ) এর খিলাফত গ্রহণের অব্যবহিত পরেই উসামা (রাঃ) এর নেতৃত্বে পরিচালিত হয়েছিল।

 

খিলাফত সংক্রান্ত মুহাজির–আনসার বিতর্ক ও নিষ্পত্তি

এ নাজুক সময়ে খিলাফেতের দায়িত্ব মুহাজির না আনসারগণের উপর বর্তাবে তা নিয়ে একটি বিতর্কের সৃষ্টি হয়। আনসারদের একটি অংশ সকীফায়ে বনু সাইদায় অসুস্থ আনসার নেতা হযরত সাআদ ইবনে উবায়দা (রাঃ) গৃহে সমবেত হয়ে খিলাফতের নেতৃত্বের ব্যাপারে তাদের দাবী উত্থাপন করলেন। এ খবরটি মসজিদে নব্বীতে অবস্থানরত হযরত আবু বকর (রাঃ) ও হযরত ওমর (রাঃ) এর কানে পৌঁছামাত্র তাঁরা কয়েকজন সাথীসহ সকীফায়ে বনু সাইদার বৈঠকস্থলে গেলেন। তাঁদেরকে দেখে আনসারদের একজন খিলাফতের আমীর পদে তাদের দাবীর কথা জানিয়ে দেন। শান্ত প্রকৃতির বিজ্ঞ সাহাবী হযরত আবু বকর সার্বিক পরিস্থিতিতি বিশ্লেষণ করে সমগ্র আরবে কুরাইশ গোত্র ও মুহাজিরগণের নেতৃত্ব ও গ্রহণযোগ্যতার পক্ষে তাঁর অবস্থান তুলে ধরেন। এ প্রসঙ্গে তিনি সূরা তওবার নিম্নের আয়াতটি তুলে ধরেন:

“আর যারা সর্বপ্রথম হিজরতকারী ও আনসারদের মাঝে পুরাতন, এবং যারা তাদের অনুসরণ করেছে, আল্লাহ সে সমস্ত লোকদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং তারাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছে। আর তাদের জন্য প্রস্তুত রেখেছেন কানন–কুঞ্জ, যার তলদেশ দিয়ে প্রবাহিত প্রস্রবণসমূহ। সেখানে তারা থাকবে চিরকাল। এটাই হল মহান কৃতকার্যতা।” (সূরা তাওবা, ৯:১০০)

হযরত আবু বকর (রাঃ) এর যৌক্তিক বক্তব্যের পরও আনসারদের মধ্যে সোরগোল চলছিল। তাদের এক যুবক উত্তেজিত কন্ঠে হযরত আবু বকর (রাঃ) এর বক্তব্য নাকচ করার প্রচেষ্টা চালায়। এতে এক নাজুক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।

হযরত আবু বকর (রাঃ)–খলীফা নির্বাচন

এ পর্যায়ে প্রত্যুৎপন্নমতি হযরত ওমর (রাঃ) উঠে দাঁড়ান এবং হযরত আবু বকর (রাঃ) এর হাতখানি নিজ হাতে টেনে নিয়ে বাইয়্যাত গ্রহণ করে বলেন,

‘হে আবু বকর (রাঃ), নবীজী (সাঃ) কি আপনাকে নামাযে ইমামতি করার নির্দেশ দেন নি? আপনি কি তাঁর নিকট সবচেয়ে প্রিয় ছিলেন না? তাঁর অসুস্থতায় ও তাঁর উপস্থিতিতে আমরা আপনার ইমামতিতেই নামায আদায় করেছি। অতএব আপনিই আমাদের আমীর – খলীফা।’

দৃঢ় চিত্ত হযরত ওমরের এ উদ্দীপ্ত ভাষণ শুনে উপস্থিত মুহাজির ও আনসার সবাই একের পর এক হযরত আবু বকরের (রাঃ) এর হাতে বাইয়্যাত গ্রহণ শুরু করেন।

প্রকৃতপক্ষে নবীজী (সাঃ) এর জীবদ্দশায় তাঁর কিছু কথা ও নির্দেশনা ইঙ্গিত বহন করে যে হযরত আবু বকর (রাঃ) পরবর্তী খলীফা পদে অভিষিক্ত হবেন। ফলত সকল বিতর্কের অবসান ঘটলো এবং খিলাফতের আমীর পদে হযরত আবু বকর (রাঃ) এর অভিষেক সম্পন্ন হয়ে গেলো। পরবর্তীতে মসজিদে নব্বীতে দ্বিতীয় দফায় সর্বসাধারণ্যে বাইয়্যাতে আ’ম অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে সবাই স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাঁর হাতে বাইয়্যাত গ্রহণ করেন।

 

ইসলামের প্রথম খলীফা হযরত আবু বকর (রাঃ) এর ভাষণ

মসজিদে নব্বীতে আ’ম বাইয়্যাতের পর এক ভাষণে হযরত আবু বকর (রাঃ) বলেন:

“ভ্রাতৃবৃন্দ! আপনারা আমাকে আপনাদের আমীর নির্বাচন করেছেন যদিও আমি আপনাদের মধ্যে উত্তম নই। আমি সঠিক কাজ করলে আপনারা আমাকে সহযোগিতা প্রদান করবেন আর ভুল কাজ করলে আমাকে বারণ করবেন। সত্য চিরন্তন এবং মিথ্যা বাতিলযোগ্য। দুর্বল আমার নিকট সবল যতক্ষণ আমি তার অধিকার প্রতিষ্ঠা না করতে পারি। সবল আমার নিকট দুর্বল যতক্ষণ না আমি তার থেকে দুর্বলের অধিকার ফিরিয়ে আনতে পারি। কোন জাতি আল্লাহর পথে সংগ্রাম–সাধনা ছেড়ে দিলে আল্লাহ্ তাদের উপর লাঞ্ছনা চাপিয়ে দেন। যে জাতি নির্লজ্জতায় লিপ্ত হয় আল্লাহ্ তাদেরকে দুর্দশাগ্রস্ত করেন। আপনারা আমার আনুগত্য করবেন যতক্ষণ আমি আল্লাহ্ ও তাঁর নবীর আনুগত্য করব। আল্লাহ্ ও তাঁর নবীর নির্দেশের বাইরে কোন গর্হিত কাজ করলে আমার আনুগত্য মেনে নেওয়া আপনাদের জন্য বাধ্যতামূলক নয়। আপনারা নামাযের জন্য দাঁড়িয়ে যান, আল্লাহ্ আপনাদের প্রতি অনুগ্রহ বর্ষণ করুন।”

ইসলামের প্রথম খলীফা হিসেবে হযরত আবু বকরের এ ভাষণ বিশ্ব ইতিহাসে চিরদিন স্বর্ণাক্ষরে লিখিত থাকবে।

 

 নবী করীম (সাঃ) এর শেষকৃত্য সম্পাদন

নবী করীম (সাঃ) এর পবিত্র মরদেহ হযরত আয়েশা (রাঃ) এর কক্ষে শোকার্ত পরিবার–পরিজনের দ্বারা পরিষ্টিত ছিল। তাঁর কবর কোথায় হবে তা নিয়ে মত–পার্থক্য সৃষ্টি হলেও শেষ পর্যন্ত হযরত আয়েশা (রাঃ) ও হযরত আবু বকর (রাঃ) বর্ণিত হাদীসের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় যে,

  • যেহেতু নবীজী (সাঃ) হযরত আয়েশা (রাঃ) এর কক্ষে ইন্তেকাল করেছেন সুতরাং এ কক্ষেই তাঁর কবর খনন ও দাফন কাজ সম্পন্ন করা হবে।
  • নবীজী (সাঃ)–কে গোসল প্রদান করেন হযরত আলী (রাঃ) এবং হযরত আব্বাস (রাঃ) ও তাঁর দুই পুত্র  হযরত ফজল (রাঃ) ও হযরত কুসাম (রাঃ)। তাঁদেরকে সহযোগিতা করেন হযরত উসামা (রাঃ) ও হযরত শুকরান (রাঃ)।
  • হযরত আলী (রাঃ) বলেন, গোসল করানোর সময় নবীজী (সাঃ) এর দেহ মুবারক থেকে সুগন্ধ ছড়িয়ে পড়ছিল।
  • তিনটি কাপড় দ্বারা নবীজী (সাঃ)–কে কাফন পরানো হয়।

 

নামাযে জানাযা ও দাফনকার্য

শেষ বারের মতো তাঁর চেহারা  মুবারক দর্শন ও জানাযার নামাযের জন্য তাঁর কক্ষের দ্বার উন্মুক্ত করে দেওয়া হলো। কক্ষে স্থান সংকুলান না হওয়ায় জামাতে জানাযার নামাযের বদলে পৃথক পৃথকভাবে নামায আদায়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এতে নির্দিষ্ট কোন ইমামের ব্যবস্থা ছিল না।

প্রথমে নবী পরিবার ও বনী হাশিম গোত্রের লোকজন জানাযার নামায আদায় করেন। এরপর হযরত আবু বকর (রাঃ) ও হযরত ওমর (রাঃ) এবং তাঁদের সাথে বিশিষ্ট সাহাবীবৃন্দ কক্ষের ভিতরে প্রবেশ করেন। দরুদ ও সালাম পেশ করার পর তাঁরা জানাযার নামায আদায় করেন। পালাক্রমে পুরুষ, নারী ও শিশু জানাযার নামাযে অংশগ্রহণ করেন। এভাবে দীর্ঘ সময় ধরে নামাযে জানাযা চলছিল।

জানাযার নামায শেষে নবী করীম (সাঃ) এর খাটিয়াটি শয়নস্থল থেকে সরিয়ে কবর খননের জায়গা করে দেওয়া হয়। হযরত আবু তালহা (রাঃ) ওই স্থানে বগলী কবর খননের কাজ সম্পন্ন করেন। কবর খননের কাজ শেষে সেখানেই নবীজী (সাঃ) এর দেহ মুবারক সমাহিত করা হয়। মসজিদে নব্বী সংলগ্ন হযরত আয়েশা (রাঃ) এর কক্ষটিতেই নবীজী (সাঃ) এর পবিত্র মাজার শরীফ অবস্থিত।

 

পবিত্র কুরআনের আলোকে হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর গুণাবলী ও মর্যাদার বর্ণনা

لَّقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللَّهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ لِّمَن كَانَ يَرْجُو اللَّهَ وَالْيَوْمَ الْآخِرَ وَذَكَرَ اللَّهَ كَثِيرً

♥ “আল্লাহর রসুলের মধ্যে রয়েছে এক অনুপম অনুকরণীয় জীবনাদর্শ তাদের জন্যে, যারা আল্লাহর সাক্ষাৎ পেতে আগ্রহী ও পরকালে (মুক্তির) আশা রাখে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে (৩৩: ২১)।”

যে মহান ব্যক্তিত্ব মানব জাতির জন্য প্রেরিত হয়েছিলেন –

♥ “একজন স্বাক্ষী, সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে এবং আল্লাহর অনুমতিক্রমে মানুষকে আল্লাহর পথে আহ্বানকারী ও প্রদীপ্ত এক আলোক–বর্তিকা হিসেবে (সূরা আহযাব, ৩৩:৪৫–৪৬),”

— তাঁকেতো হতেই হবে এমন অনুকরণীয় ও অনুসরণীয় আদর্শ চরিত্রের অধিকারী।

সর্বোত্তম গুণাবলীর অধিকারী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)

মহান আল্লাহ্ রব্বুল আলামীন তাঁর প্রিয়তম বান্দা ও মানব জাতির সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ  হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)–কে সর্বোত্তম গুণাবলীতে ভূষিত করে এ দুনিয়ায় নবী ও রসূল হিসেবে প্রেরণ করেন। তাঁর উপর নাযিলকৃত হেদায়েত গ্রন্থ পবিত্র কুরআনের আলোকে তিনি মানুষকে ‘সিরাতুল মুস্তাক্বীম’ অর্থাৎ সহজ–সরল পথের সন্ধান দিয়েছেন। কুরআনের প্রতিটি নির্দেশ তিনি নিজের জীবনে বাস্তবায়ন করে হয়েছেন পথিকৃৎ।

নবী (সাঃ) কখনও নিজের থেকে কিছু বলতেন না। তিনি যা বলতেন তা সর্বশক্তিমান আল্লাহর অনুমতিক্রমে ও তাঁর নির্দেশ অনুযায়ী। সুতরাং তাঁর কথা ছিল নির্ভুল এবং দিব্য জ্ঞানসম্পন্ন।

রাসূলুল্লাহ্‌ (ﷺ) ইরশাদ করেছেন:

“আল্লাহ্‌, জগৎসমূহের প্রতিপালক, আমাকে প্রেরণ করেছেন সুন্দর চরিত্র, উত্তম আচরণ ও মহৎ আখলাক প্রতিষ্ঠার জন্য।” (মালিক – মুয়াত্তা, আহমদ – মুসনাদ, মিশকাতুল মাসাবীহ)

তিনি মানবতার জন্য সর্বোত্তম আখলাকের মূর্ত প্রতীক হিসেবে সর্ব যুগে বিদ্যমান থাকবেন — এরই স্বীকৃতি এসেছে স্বয়ং আল্লাহ্ তায়ালার পক্ষ থেকে পবিত্র কুরআনে আয়াত নাযিলের মাধ্যমে:

♥ “আপনি অবশ্যই মহান চরিত্রের অধিকারী।” ( সূরা কলম, ৬৮:৪)

তিনি গুণাবলীর সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছে গেছেন। আর এ জন্যই মহামহিম আল্লাহর নিকট থেকে ওয়াদা এসেছে:

♥ “শীঘ্রই আপনাকে অধিষ্ঠিত করবেন সর্বোচ্চ প্রশংসিত ও গৌরবমন্ডিত স্থানে।” (সূরা বনী ইসরাঈল, ১৭: ৭৯)

আল্লাহ্ রব্বুল আলামীন তাঁর হাবীব মুহাম্মদ (সাঃ) এর স্মরণকে সমুন্নত করেছেন:

♥ “আমি আপনার আলোচনাকে সমুচ্চ করেছি।” (সূরা ইনশিরাহ, ৯৪:৪)।

তাইতো স্বর্গ–মর্ত্যে প্রতিদিন তাঁর নাম উচ্চারিত হচ্ছে, তাঁর ওপর দরুদ ও সালাম পেশ করা হচ্ছে। দুনিয়া জুড়ে প্রতিদিনই নামাযে, আযানে ও আলোচনায় তাঁর উপর দরুদ ও সালাম পেশ করা হচ্ছে, যেখানেই তাঁর নাম উচ্চারিত হচ্ছে সেখানেই তাঁকে উত্তম অভিবাদন জানানো হচ্ছে।

আল্লাহ্‌ তাআ‘লা নবী করীম (ﷺ)–কে সমগ্র সৃষ্টিজগতের জন্য রহমত হিসেবে পাঠিয়েছেন—

♥ “আমি আপনাকে সমগ্র বিশ্বজগতের জন্য রহমতস্বরূপ প্রেরণ করেছি।” (সূরা আল-আম্বিয়া, ২১:১০৭)

মহান আল্লাহ্ ও তাঁর ফেরেশতাগণ নবী (সাঃ) এর প্রতি দরুদ ও সালাম পেশ করেন এবং সাবইকে তা করার তাগিদ দিয়ে বলেন:

♥ “আল্লাহ্ ও তাঁর ফেরেশতাগণ নবীর প্রতি আশীর্বাদ প্রেরণ করেন। হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা নবীর ওপর আশিসবাণী পাঠ কর এবং তাঁর প্রতি উত্তম অভিবাদন প্রেরণ কর।” (সূরা আহযাব, ৩৩:৫৬)

আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন পবিত্র কুরআনে নবী করীম (সাঃ) এর গুণাবলী ও মর্যাদা সম্পর্কে বলেন:

♥ “আমি আপনাকে বিশ্ববাসীর জন্যে রহমতস্বরূপই প্রেরণ করেছি।” (সূরা আম্বিয়া, ২১:১০৭)

♥ “আল্লাহর রহমতেই আপনি তাদের জন্য কোমল হৃদয় হয়েছেন পক্ষান্তরে আপনি যদি রাগী ও কঠিন হৃদয় হতেন তাহলে তারা আপনার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতো। কাজেই আপনি তাদের ক্ষমা করে দিন এবং তাদের জন্য মাগফেরাত কামনা করুন এবং কাজে কর্মে তাদের সঙ্গে পরামর্শ করুন। অতঃপর যখন কোন কাজের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে ফেলেন, তখন আল্লাহ তা’আলার উপর ভরসা করুন! আল্লাহ তাওয়াক্কুলকারীদের ভালবাসেন।” (সূরা আলে ইমরান, ৩:১৫৯)

♥ “আল্লাহ ঈমানদারদের উপর অনুগ্রহ করেছেন যে, তাদের মাঝে তাদের নিজেদের মধ্য থেকে নবী পাঠিয়েছেন। তিনি তাদের জন্য তাঁর আয়াতসমূহ পাঠ করেন। তাদেরকে পরিশোধন করেন এবং তাদেরকে কিতাব ও কাজের কথা শিক্ষা দেন। বস্তুত তারা ছিল পূর্ব থেকেই পথভ্রষ্ট।” (সূরা আলে ইমরান, ৩:১৬৪)

♥ “তোমাদের কাছে এসেছেন তোমাদের মধ্য থেকেই একজন রসূল। তোমাদের দুঃখ–কষ্ট তার জন্য দুঃসহ। তিনি তোমাদের মঙ্গলকামী, মু’মিনদের প্রতি অতীব স্নেহশীল ও দয়ালু। এ সত্ত্বেও যদি তারা বিমুখ হয়ে থাকে, তবে বলে দাও, আল্লাহই আমার জন্য যথেষ্ট, তিনি ব্যতীত আর কারো বন্দেগী নেই। আমি তাঁরই উপর ভরসা করি এবং তিনিই মহান আরশের অধিপতি।” (সূরা তাওবা, ৯:১২৮–১২৯)

♥ “নিশ্চয় আমি আপনাকে কাওসার দান করেছি। অতএব আপনার পালনকর্তার উদ্দেশ্যে নামায আদায় করুন এবং কুরবানী করুন। আপনার প্রতি বিদ্বেষ–পোষণকারীইতো লেজকাটা, নির্বংশ।” (সূরা কাওসার, ১০৮:১–৩)

♥ “নিশ্চয় আমি আপনাকে সত্যধর্মসহ সুসংবাদদাতা ও ভীতি প্রদর্শনকারীরূপে পাঠিয়েছি। ….. ” (সূরা বাক্বারাহ, ২:১১৯)

♥ “আমি আপনাকে প্রেরণ করেছি অবস্থা ব্যক্তকারীরূপে, সুসংবাদদাতা ও ভয় প্রদর্শনকারীরূপে। যাতে তোমরা আল্লাহ ও রাসূলের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন কর এবং তাঁকে সাহায্য ও সম্মান কর এবং সকাল-সন্ধ্যায় আল্লাহর পবিত্রতা ঘোষণা কর।” (সূরা আল ফাত্–হা, ৪৮:৮– ৯)

অধ্যায়সমূহ