এ অধ্যায়ের বিষয়সমূহ
Toggleমহোত্তম চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের অধিকারী
হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম (সাঃ) ছিলেন বিশ্ব–মানবতার ধারক, সততা, নিষ্ঠা ও বিশ্বস্ততার দৃষ্টান্ত এবং মহান ও উন্নত চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। নবুওত লাভের পূর্বেই জনগণ তাঁর গুণাবলীর স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে দিয়েছিল “আল–আমিন” বা বিশ্বস্ত উপাধি। মহান আল্লাহ্ রব্বুল আলামীন তাঁর প্রিয় নবীকে সর্বোত্তম গুণাবলী ও অনুপম চারিত্রক মাধুর্য দ্বারা ভূষিত করে বানালেন সর্বযুগের সকল মানুষের জন্য এক অনুকরণীয় ও অনুসরণীয় আদর্শ হিসেবে। তিনি তাঁকে অভিহিত করলেন “রাহমাতুল্লিল আলামীন” অর্থাৎ জগতসমূহের অশীর্বাদস্বরূপ।
বিশুদ্ধ চরিত্রের এক মূর্ত প্রতীক
বিশুদ্ধ চরিত্রের এক মূর্ত প্রতীক হিসেবে তিনি বিশ্বে যে উদাহরণ সৃষ্টি করে গেছেন তা অতুলনীয়। তিনি ছিলেন সৃষ্টিকুলের পরম হিতৌষী। তমসাচ্ছন্ন সমাজের তিনি এক আলোক–বর্তিকা, পথ-প্রদর্শক ও বিশ্ব –মানবতার শিক্ষক। দাস প্রথা ও মানুষে মানুষে বৈষম্যের যুগে সব শ্রেণীর মানুষের সাথে তাঁর আচার–আচরণ ছিল শালীন ও সৌহার্দপূর্ণ। তাঁর প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ্ বলেন:
♥ “আল্লাহর রসুলের মধ্যে রয়েছে এক অনুপম অনুকরণীয় জীবনাদর্শ তাদের জন্যে, যারা আল্লাহর সাক্ষাৎ পেতে আগ্রহী ও পরকালে (মুক্তির) আশা রাখে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে (সূরা আহযাব, ৩৩: ২১)।”
এর চেয়ে আর বেশী কি আছে যা কোন ব্যক্তিত্বকে সর্বোত্তম মানবীয় সম্মানে ভূষিত করতে পারে। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব হওয়ার এটাইতো পরম স্বীকৃতি।
একজন আদর্শ মানব হিসেবে হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর চারিত্রিক গুণাবলী স্বল্প পরিসরে বর্ণনা করা সম্ভব নয়। তবে তাঁর চারিত্রিক বৈশিষ্ঠ্যগুলোর একটি সংক্ষিপ্ত সার নিম্নে বর্ণনা করা হলো:
বিনম্র ও অমায়িক স্বভাববিশিষ্ট
নবীর মর্যাদাপ্রাপ্ত হয়েও নবী করীম (সাঃ) ছিলেন অত্যন্ত বিনয় ও অমায়িক স্বভাবের অধিকারী। তাঁর বিনম্র ও সদয় আচরণে ছোট–বড়, শত্রু–মিত্র সবাই ছিল মুগ্ধ। তাঁর স্বভাবসুলভ সত্যবাদীতা, বিশ্বস্ততা, সহমর্মীতা, উদারতা ও আন্তরিকতায় আকৃষ্ট হয়ে কঠিন–কঠোর স্বভাবের মানুষও ইসলামের পতাকাতলে সমর্পিত হয়েছে। এ বিশাল ব্যক্তিত্বের মধ্যে আত্ম–অহমিকা বলতে কিছুই ছিল না।
পবিত্র কুরআনের নিম্নোক্ত আয়াত দু’টি তাঁর বেলায় ছিল সর্বোতভাবে প্রযোজ্য:
♥ “ভাল ও মন্দ সমান নয় – মন্দকে দূরীভূত করুন সর্বোত্তম (আচরণ দিয়ে)। তাহলে আপনার জানের শত্রুও হয়ে যাবে প্রাণের বন্ধু। এ মহৎ চরিত্র তারাই লাভ করে যারা সবর করে এবং এ গুণের অধিকারী তারাই হয়, যারা অত্যন্ত ভাগ্যবান।” (সূরা হা–মীম সেজদাহ, ৪১:৩৪–৩৫)
কোন উদ্ধত বা উগ্র আচরণ নয় বরং বিনয় এবং অপরিসীম ধৈর্য ও সংযমের অবলম্বনের দ্বারা তিনি অর্জন করেছিলেন এ মহৎ চরিত্র।
তিনি বলতেন,
“আমি তোমাদের মতই রক্তমাংসে গড়া একজন মানুষ। আমি কোন কিছুই নিজের থেকে তোমাদের কাছে নিয়ে আসিনি। এসব কিছুই মহান আল্লাহ্ আমার ওপর নাযিল করেছেন। আমার নিকট যা আছে তার সব কিছুর মালিকই আল্লাহ্। এই কুরআন যা কোন মানবের পক্ষে রচনা করা সম্ভব নয়, তা শুধুমাত্র আল্লাহরই বাণী। এটা আমার মনগড়া কোন রচনা নয়। এর প্রতিটি শব্দ তাঁরই নিকট থেকে নাযিল হয়েছে, সমস্ত গৌরব তাঁর – যাঁর বাণী এই কুরআন। বিস্ময়কর সব কীর্তি যা তোমাদের চোখে আমার কৃতিত্ব বলে মনে হয়, যতসব বিধি–বিধান আমার মাধ্যমে তোমরা পেয়েছ, যতসব নীতি–উপদেশ আমি তোমাদের দিয়েছি – এসবই আমার নিজস্ব বলে কিছু নয়। এসব কিছু রচনার কোন যোগ্যতাও আমার নেই। সব ব্যাপারেই আমি ঐশী নির্দেশনা লাভের ওপর নির্ভর করি। আল্লাহ্ যা ইচ্ছা করেন আমি তাই করি, তিনি যা নির্দেশ দেন আমি তাই ঘোষণা করি।”
কি এক অপূর্ব অনুপ্রেরণাদায়ক তাঁর এ ঘোষণা, যাতে প্রকাশ পেয়েছে মহান আল্লাহর প্রতি তাঁর বিনীত সমর্পন ও কৃতজ্ঞতাবোধ, তাঁর উদ্দেশ্যের সততা ও আন্তরিকতা, সত্য প্রকাশের নিষ্ঠা ও সাহসিকতা, নির্মল চরিত্র ও পবিত্র আত্মার দ্যুতিময়তা। এ প্রসঙ্গে নিম্নোক্ত আয়াতটি অনুধাবনযোগ্য:
♥ “(হে নবী) বলুনঃ আমিও তোমাদের মতই একজন মানুষ, আমার প্রতি প্রত্যাদেশ হয় যে, তোমাদের ইলাহই একমাত্র ইলাহ। অতএব, যে ব্যক্তি তার পালনকর্তার সাক্ষাত কামনা করে, সে যেন, সৎকর্ম সম্পাদন করে এবং তার পালনকর্তার এবাদতে কাউকে শরীক না করে।” (সূরা কাহাফ, ১৮:১১০)
তাঁর স্বভাব–প্রকৃতি
নবীজী (সাঃ) ছিলেন নম্র, ভদ্র, স্বল্পভাষী ও লাজুক প্রকৃতির। তিনি মৃদু হাস্যজ্জ্বোল মুখে কথা বলতেন। তাঁর মুখে থাকত আভিজাত্যের লক্ষণ। তাঁর কথাবার্তা ছিল আন্তরিক ও আকর্ষণীয়। তিনি ছিলেন ধৈর্যশীল, সহনশীল ও ক্ষমাশীল। দয়া ও দানশীলতায় তিনি ছিলেন সবার চেয়ে অগ্রগামী। ওয়াদাপালন ও ন্যায়নীতিতে তিনি অটল ছিলেন। প্রতিশোধ স্পৃহা নয়, বরং ক্ষমা ও উদারতায় তিনি ছিলেন দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী। উম্মুল মু’মেনীন হযরত আয়েশা (রাঃ) তাঁর স্বামী সম্পর্কে বলেন, “তিনি মন্দের বদলে মন্দকে অনুসরণ করতেন না, বরং তিনি ক্ষমা ও মার্জনা পছন্দ করতেন।” (আহমদ:৬/১৭৪, সনদ: সহীহ)।
সততা ও বিশ্বস্ততার প্রতীক
হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) ছিলেন সততা ও বিশ্বস্ততার প্রতীক। তিনি সততা, নিষ্ঠা ও আন্তরিকতায় ছিলেন সম্পূর্ণ অকৃত্রিম। কথায়, কাজে ও বিশ্বাসে তাঁর সামন্যতম পার্থক্য ছিল না। তিনি কখনও তাঁর কোন ওয়াদা ভঙ্গ করেন নি। নবুওত প্রাপ্তির পূর্ব থেকেই তিনি সর্স্তরের মানুষের নিকট “আল-আমীন”(বিশ্বস্ত) উপাধি অর্জন করেন। তাঁর আমানতদারী এতই প্রসিদ্ধি লাভ করেছিল যে, সবাই তাঁর কাছে মূল্যবান দ্রব্যসামগ্রী আমানত রাখতে কোনরূপ দ্বিধাবোধ করত না। কুরাইশদের অত্যাচার ও প্রাণহানির হুমকির মুখে তিনি যখন প্রিয় জন্মভূমি মক্কা ছেড়ে চলে যান তখনও তিনি তাঁর আমানতদারীর কথা ভুলে যাননি। তাঁর কাছে মক্কাবাসীর আমানতের যেসব সামগ্রী রক্ষিত ছিল তা তিনি হযরত আলী (রাঃ) জিম্মায় রেখে যান যাতে মালিকগণ তাদের আমানত ফেরত পায়। সততা ও বিশ্বস্ততার কি অনন্য দৃষ্টান্ত!
উম্মাহর প্রতি দয়া–সহানুভূতি–মমত্ববোধের প্রতীক
উম্মাহর প্রতি দয়া, সহানুভূতির ও মমত্ববোধের এক মূর্ত প্রতীক ছিলেন মুহাম্মদ (সাঃ)। অসহায়–আর্ত মানুষ এমনকি জীব-জানোয়ারের প্রতিও ছিল তাঁর অসাধারণ মমত্ববোধ। হেরা পর্বত গুহায় প্রথম ওহী নাযিলের পর তাঁর যে মানসিক অস্থিরতা প্রকাশ পেয়েছিল তা দেখে তাঁর প্রিয়তমা স্ত্রী খাদীজা (রাঃ) তাঁকে সান্ত্বনা দিয়ে যে উক্তি করেছিলেন তা প্রণিধাণযোগ্য:
“আপনি যে বিষয়ে ধ্যানমগ্ন ছিলেন এ ঘটনা তাঁরই সাফল্যের ইঙ্গিতবাহী। যার হাতে আমার জীবন সে মহা সত্তার শপথ করে বলছি, আপনি নবুওতের শুভ সংবাদ পেতে যাচ্ছেন। আল্লাহর শপথ আপনি কখনও ব্যর্থ হবেন না। কারণ আপনি সদা সত্যবাদী, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষাকারী ও হক আদায়কারী, মেহমান, এতীম ও দুঃস্থদের প্রতি যত্নবান এবং পরোপকারী।”
পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ্ তাঁর সম্পর্কে বলেন:
♥ “তোমাদের কাছে এসেছেন তোমাদের মধ্য থেকেই একজন রসূল। তোমাদের দুঃখ–কষ্ট তার জন্য দুঃসহ। তিনি তোমাদের মঙ্গলকামী, মু’মিনদের প্রতি অতীব স্নেহশীল ও দয়ালু। এ সত্ত্বেও যদি তারা বিমুখ হয়ে থাকে, তবে বলে দাও, আল্লাহই আমার জন্য যথেষ্ট, তিনি ব্যতীত আর কারো বন্দেগী নেই। আমি তাঁরই উপর ভরসা করি এবং তিনিই মহান আরশের অধিপতি।” (সূরা তাওবা, ৯:১২৮–১২৯)
দয়া–দাক্ষিণ্য ও করুণার প্রতীক
দয়া–দাক্ষিণ্যে তিনি ছিলেন উদার হস্ত। তাঁর ধনাঢ্য স্ত্রী হযরত খাদীজা (রাঃ) থেকে প্রাপ্ত সব সম্পদ তিনি গরীব–দুঃখীর প্রয়োজনে বিলিয়ে দেন। দয়া ও দানশীলতায় তিনি ছিলেন অনন্য। তিনি অত্যন্ত সহজ সরল জীবন যাপন করতেন। ধন-সম্পদ জমিয়ে রাখার কোন প্রবণতাই তাঁকে স্পর্শ করেনি। যা পেতেন গরীব–দুঃখী ও অভাবীদের মধ্যে তৎক্ষণাৎ তা বিলিয়ে দিতেন। তিনি ছিলেন দয়া, ক্ষমা ও করুণার এক মূর্ত প্রতীক। মৃত্যুর সময় তাঁর অর্থ–সম্পদ কিছুই ছিল না। যে কয়েকটি দীনার তাঁর হাতে ছিল তাও তিনি দান করে যান।
ক্ষমা ও উদারতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত
ক্ষমা ও উদারতায় তিনি ছিলেন অগ্রণী। কাফেররা অত্যাচার-নির্যাতন ও ঠাট্টা–বিদ্রূপ দ্বারা তাঁর জীবন দুর্বিষহ করে তুলেছিল। তিনি নীরবে সব ধরনের জুলুম সহ্য করেছেন। তাঁর অন্তরে কোন প্রতিশোধ স্পৃহা ছিল না। কোন এক সাহাবী তাঁকে জালিমদেরকে অভিশাপ দেওয়ার অনুরোধ করলে তিনি বলেন,
♦ “আল্লাহ্ আমাকে রহমতের নবী করে পাঠিয়েছেন, অভিশাপ দেওয়ার জন্য নয়।”
বরং তিনি তাদেরকে ক্ষমা এবং তাদের হেদায়েতের জন্য আল্লাহর দরবারে দোয়া করাকেই পছন্দ করতেন।
- তায়েফবাসী তাঁকে ক্ষতবিক্ষত ও রক্তাক্ত করে ফেললেও তিনি তাদেরকে কোন অভিশাপ দেননি, বরং ক্ষমা করে দিয়েছিলেন।
- কুরাইশদের শত অত্যাচার–নিপীড়ন ও প্রাণ–হুমকির মুখে তিনি ও তাঁর অনুসারীগণ মক্কা ছেড়ে মদীনায় হিজরত করেন। সেখানেও গিয়েও নিস্তার পাননি। তারা প্রতি বছর আক্রমণ চালাতে থাকল।
- এত সবের পরেও আল্লাহর নবী এক রক্তপাতহীন অভিযানে মক্কা বিজয় করেন। তিনি কুরাইশদের ওপর কোনরূপ প্রতিশোধ নেননি, সবাইকে তিনি ক্ষমা করে দেন। এটা বিশ্ব ইতিহাসে ক্ষমা ও উদারতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
আল্লাহর উপর ভরসা, ধৈর্যশীলতা ও অবিচলতার এক অনুপম দৃষ্টান্ত
আল্লাহর উপর পরম ভরসায়, ধৈর্যশীলতায় ও অবিচলতায় তিনি ছিলেন অনুপম। জন্মলগ্ন থেকেই তিনি আপন–জনদের হারিয়েছেন। জীবনের সর্বক্ষেত্রে বিপদ–আপদ, দুঃখ–দুর্দশা, প্রতিকূলতা ও বিরোধীতা তাঁকে বিচলিত করতে পারেনি।
- এতীম ও নিঃস্ব অবস্থায়, নবুওতের কঠিন দায়িত্ব পালনকালে, কুরাইশদের নিপীড়ন–নির্যাতনের মুখে, শেবা উপত্যকায় নির্বাসিত জীবন যাপনকালে, তায়েফবাসীর নির্মম আচরণে, হিজরতের সময় সওর পর্বত গুহায়, ওহুদ যুদ্ধের বিপর্যয়কালে, এমনতরো অনেক কঠিন সময়ে মহান আল্লাহর উপর পরম আস্থা ও ভরসাই ছিল তাঁর দুর্গম পথ উত্তরণের উপায়। চরম বিপদেও তিনি ধৈর্যহারা হতেন না, বরং পরম নির্ভরতায় আল্লাহর ওপর ভরসা করতেন।
- বিভিন্ন নাজুক পরিস্থিতিতে তাঁর ধৈর্য ও মহান আল্লাহর প্রতি তাঁর পরম নির্ভরতা মানব জাতির জন্য বিশেষ শিক্ষণীয় বিষয়।
- ওহুদের যুদ্ধের বিপর্যয়ের কালে শত্রুর আঘাতে আহত অবস্থায় এবং শাহাদতবরণকারী চাচা বীর হামযা (রাঃ) এর বিকৃত মৃতদেহ দর্শনকালে – এ ধরনের সকল নারকীয় ঘটনায় তাঁর বেদনাহত চিত্ত সব সময় মহান আল্লাহর উপর পরম ধৈর্য ধারণ করেছে।
এ অবস্থায় আল্লাহ্ তাঁকে সান্তনা দান করেছেন এবং প্রতিহিংসাপরায়ণ না হতে উপদেশ দিয়েছেন।
একই অবস্থা হয়েছিল তায়েফে ধর্ম প্রচার কালে। সেখানে তাঁকে ও তাঁর সহচর যায়েদ (রাঃ)কে উন্মাদ বলে প্রস্তরাঘাতে রক্তাক্ত করে ফেলা হয়। সেই কঠিন পরিস্থিতিতে নবী মুহাম্মদ (সাঃ) শুধু ধৈর্যই ধারণ করেননি, বরং এসব পাপিষ্ঠদের জন্য অভিশাপের বদলে মহান আল্লাহর দরবারে দোয়া করেছেন যাতে তারা হেদায়েতপ্রাপ্ত হয়।
- তাঁর চরম শত্রু, বিদ্রূপ ও কটাক্ষকারীদের প্রতিও তিনি ছিলেন ক্ষমার্হ।
- শত উস্কানিতেও তিনি রাগান্বিত হতেন না। তিনি তাঁর অনুসারীগণকেও রাগ করতে নিষেধ করতেন।
- কারণ রাগের মাথায় মানুষ কান্ডজ্ঞান হারিয়ে অনেক ক্ষতিকর ঘটনা ঘটিয়ে ফেলতে পারে।
মানবতার নবীর এমনই ছিল প্রজ্ঞা ও মহানুভবতা।
সুবিচার ও ন্যায়ের প্রতীক
ধনী, গরীব, ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, শত্রু–মিত্র নির্বিশেষে তিনি ছিলেন সুবিচার ও ন্যায়ের প্রতীক। জালিম শত্রুর প্রতিও তিনি ছিলেন ন্যায়পরায়ণ। তিনি বলেন,
- “তোমার ভাইকে সাহায্য কর যদিও সে অত্যাচারী বা অত্যাচারিত হয়।” অর্থাৎ কেউ যেন ন্যায় বিচার থেকে বঞ্ছিত না হয়।
- তাঁর প্রতিষ্ঠিত ন্যায় নীতির নিকট ছোট–বড়, ধনী–গরীব, আত্মীয়–অনাত্মীয় কোন ভেদাভেদ ছিল না।
- আল্লাহর নবী ও রসুল মুহাম্মদ (সাঃ) এমন কোন উপদেশ দিতেন না যা তিনি নিজে পালন করেননি। তাঁর মধ্যে ছিল না বিন্দুমাত্র দ্বৈততা বা দ্বিচারিতা।
এ প্রসঙ্গে একটি ঘটনার কথা এখানে উল্লেখ করা বাঞ্ছনীয়। ইহুদীদের একটি গোষ্ঠী তাদের হীন স্বার্থোদ্ধারে নবীজী (সাঃ)–কে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পেতে চেয়েছিল। এরা অন্য একটি গোত্রের সাথে বিরোধপূর্ণ বিষয়ে বিচার–সালিশে তাঁকে তাদের পক্ষে রায় প্রদানের অনুরোধ জানায়। তারা বলে, তিনি তাতে সম্মত হলে তারা ঈমান আনবে এবং তাঁর অনুসারী হয়ে যাবে। নবী করীম (সাঃ) তাদের প্রস্তাব তৎক্ষণাৎ নাকচ করে দেন।
এ সম্পর্কে পবিত্র কুরআনের মাধ্যমে নির্দেশ নাযিল হলো:
♥ “আর আমি আদেশ করছি যে, আপনি তাদের পারস্পরিক ব্যাপারাদিতে আল্লাহ যা নাযিল করেছেন তদনুযায়ী ফয়সালা করুন; তাদের প্রবৃত্তির অনুসরণ করবেন না এবং তাদের থেকে সতর্ক থাকুন – যেন তারা আপনাকে এমন কোন নির্দেশ থেকে বিচ্যুত না করে, যা আল্লাহ আপনার প্রতি নাযিল করেছেন। অনন্তর যদি তার মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে জেনে নিন, আল্লাহ তাদেরকে তাদের গোনাহের কিছু শাস্তি দিতেই চেয়েছেন। মানুষের মধ্যে অনেকেই নাফরমান। তারা কি জাহেলিয়াত আমলের ফয়সালা কামনা করে? আল্লাহ অপেক্ষা বিশ্বাসীদের জন্যে উত্তম ফয়সালাকারী কে?“ (সূরা মায়েদাহ, ৫:৪৯–৫০)
পরিবার–পরিজনের প্রতি দয়াদ্রতা ও দায়িত্বশীলতার প্রতীক
পরিবারের কর্তা হিসেবে তিনি ছিলেন একজন দৃষ্টান্ত-স্থাপনকারী অভিবাবক। তাঁর অনুপম স্নেহ ও ভালবাসায় পরিবার–পরিজন ছিল আপ্লুত। নিজ পরিবারে তিনি ছিলেন একজন দায়িত্বশীল আদর্শ গৃহকর্তা। সামাজিকভাবে আত্মীয়–পরিজনের সাথে তাঁর গভীর অন্তরঙ্গতা, বন্ধু-বান্ধবের সাথে মধুর সম্পর্ক, প্রতিবেশী এবং গরীব–দুঃখীর প্রতি তাঁর দয়া ও দানশীলতা সবই ছিল অনন্যসুলভ। তাঁর স্ত্রী হযরত খাদীজা (রাঃ) ছিলেন প্রভূত সম্পদের মালিক। বিয়ের পর তিনি তাঁর সব সম্পদ স্বামীর পদতলে নিবেদন করেন। সম্পদের প্রতি নির্মোহ হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) স্ত্রীর সম্মতিক্রমে এ বিপুল বিত্ত গরীব–দুঃখী ও এতীমদের কল্যাণে বিলিয়ে দেন।
তাঁর দাম্পত্য জীবন ছিল অত্যন্ত মধুর। খাদীজা (রাঃ) এর প্রগাঢ় ভালবাসা ও আনুগত্যে তাঁর জীবনে এক গভীর প্রশান্তি নেমে আসে। খাদীজা (রাঃ) এর জীবদ্দশায় তিনি দ্বিতীয় কোন বিয়ে করেননি। তিনি যেমন ছিলেন প্রেমময় স্বামী, তেমনি স্নেহশীল পিতা এবং দায়িত্বপূর্ণ গৃহকর্তা। আরব সমাজে কন্যাসন্তানের জন্মদান খুবই অবমাননাকর হলেও খাদীজা (রাঃ) এর গর্ভে তাঁর চারটি কন্যাসন্তান ছিল তাঁর অতি প্রিয়। তাঁদের প্রতি তাঁর মমত্ববোধ ছিল অফুরন্ত। তিনি আত্মীয়তার সম্পর্ককে বিশেষ গুরুত্ব দিতেন। তাঁর নিকট রক্তের বন্ধন ছিল পবিত্র। প্রতিবেশীদের প্রতি তাঁর সদাচরণ ছিল দৃষ্টান্তমূলক। তাঁর সান্নিধ্যে শিশুরা থাকত প্রীত ও হাস্যময়। এক কথায় সমাজের সর্বস্তরে তিনি ছিলেন একজন গ্রহণযোগ্য ও সমাদৃত ব্যক্তিত্ব।
অধীনস্থদের প্রতি সদয় ও উত্তম আচরণকারী
অধীনস্থ সেবকদের প্রতি তিনি ছিলেন খুবই মানবিক, সদয় ও সহানুভূতিশীল। সংযত ও শোভন আচরণ ছিল তাঁর ভূষণ। তিনি বলতেন,
♦ ‘মহান আল্লাহ্ আমাকে প্রেরণ করেছেন পরিশুদ্ধ আচরণ ও উত্তম কাজ করতে।’ (সহীহ বুখারী শরীফ)।
♦ “তোমাদের মধ্যে সে–ই উত্তম যার জিহ্বা ও হাত থেকে অন্যেরা নিরাপদ।”
♦ “যে অপরের প্রতি দয়ার্দ্র নয় আল্লাহও তাকে দয়া করবেন না।’’ (সহীহ বুখারী শরীফ)।
♦ “একজন উত্তম পুরুষ নারীর সাথে মর্যাদাপূর্ণ ব্যবহার করে।”
প্রায় দুই হাজার হাদীসের বর্ণনাকারী হযরত আনাস (রাঃ) বালক বয়স থেকেই ছিলেন নবীজী (সাঃ) এর সেবক। তিনি দীর্ঘ দশ বছর নবীজী (সাঃ) এর গৃহে অবস্থান করেছেন। তিনি বলেন,
♦ “তাঁর দীর্ঘ সাহচর্যকালে কর্তব্যে অবহেলার কারণে আমি কখনও তাঁর কাছ থেকে কোনরূপ বিরূপ আচরণের সম্মুখীন হইনি।”
মানবতার আদর্শ শিক্ষক
তিনি উম্মতের শুধু আধ্যাত্মিক গুরুই ছিলেন না, জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তাঁর শিক্ষা ও উপদেশ তাদের জন্য ছিল অনুকরণীয় ও অনুসরণীয়। মানব জাতির শিক্ষক হিসেবে মহান আল্লাহ্ তাঁকে যে দায়িত্ব দিয়েছিলেন তা হলো:
♥ “আপনি বলুন: এস, আমি তোমাদেরকে ঐসব বিষয় পাঠ করে শুনাই, যা তোমাদের প্রতিপালক তোমাদের জন্যে হারাম করেছেন। তা এই যে, আল্লাহর সাথে কোন কিছুকে শরীক করো না, পিতা–মাতার সাথে সদয় ব্যবহার করো, স্বীয় সন্তানদেরকে দারিদ্রের কারণে হত্যা করো না, আমি তোমাদেরকে ও তাদেরকে আহার দেই, নির্লজ্জতার কাছেও যেয়ো না, প্রকাশ্য হোক কিংবা অপ্রকাশ্য, যাকে হত্যা করা আল্লাহ্ হারাম করেছেন, তাকে হত্যা করো না; কিন্তু ন্যায়ভাবে। তোমাদেরকে এ নির্দেশ দিয়েছেন, যেন তোমরা বোঝতে পার (সূরা আন’আম, ৬: ১৫১)।”
জ্ঞানার্জনের উপর গুরুত্বারোপকারী
পবিত্র হাদীসে জ্ঞানার্জন সম্পর্কে আল্লাহর রসূল (সা) বলেন, (তিরমিজী)। একই গ্রন্থের অন্য হাদীসে উল্লেখ আছে, ‘জ্ঞান অর্জন কর এবং তা অন্যকে শিক্ষা দাও।’
এ প্রসঙ্গে আল্লাহর রাসুল আরও বলেন,
♦ “জ্ঞান শিক্ষার জন্য যে ব্যক্তি একটি রাস্তায় ভ্রমন করে আল্লাহ্ তাকে জান্নাতের রাস্তায় ভ্রমণ করাবেন। যে জ্ঞান অনুসন্ধান করে তার ওপর ফেরেশতাকুল তাদের মনোমুগ্ধকর পক্ষ বিস্তৃত করে দেন। স্বর্গ ও পৃথিবীর অধিবাসী এমনকি জলের গভীরে বিচরণরত মাছও জ্ঞানী লোকের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে। ধার্মিক ব্যক্তির ওপর জ্ঞানী লোকের শ্রেষ্ঠত্বের নমুনা হলো এমন যে, নক্ষত্ররাজির ওপর রাতের ভরা পুর্ণিমার চাঁদের মত। জ্ঞানীজন নবীদের উত্তরাধিকারী, নবীগণ কোন সহায়–সম্পদ রেখে যান না, তাঁরা রেখে যান শুধু জ্ঞান এবং জ্ঞানীরাই এ থেকে আহরণ করে বিপুল পরিমাণে।” (সুনান আবু দাউদ – হাদীস সং ১৬৩১)।
পবিত্র কুরআন ও হাদীস শরীফে জ্ঞানার্জনের ওপর সবিশেষ গুরুত্বারোপ: ইসলামের মৌলিক গ্রন্থ পবিত্র কুরআন, যা ওহীর মাধ্যমে আল্লাহর নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর উপর অবতীর্ণ হয়েছে। এ গ্রন্থের সুরা ইয়াসীনে আল্লাহ্ এ কুরআনকে জ্ঞানময় বলে উল্লেখ করেছেন। পবিত্র কুরআন অধ্যয়নের উপর আল্লাহ্ ও তাঁর নবী (সাঃ) বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছেন।
পবিত্র কুরআনের সর্বপ্রথম নাযিলকৃত বাণীটি ছিল: “পড়”। এ শব্দটির মাধ্যমে মানুষকে জ্ঞান অর্জনের আহ্বান জানানো হয়। কেননা অজ্ঞতা বিপদজনক, যা সবকিছু ধ্বংস করে দেয়। প্রকৃত জ্ঞানার্জনের মাধ্যমেই মানুষ তার নিরাপত্তা ও কল্যাণ নিশ্চিত করতে পারে।
- প্রথম মানব হযরত আদম আলাইহিস সালামকে সৃষ্টির পর বিশ্বস্রষ্টা আল্লাহ্ রব্বুল আলামীন তাঁকে জ্ঞান শিক্ষা দেন এবং তাঁর মর্যাদাকে ফেরেশতা ও জিনদের ওপরে উন্নীত করেন।
- মহাজ্ঞানী আল্লাহ্ জ্ঞানের বলে বলীয়ান করে মানব জাতিকে পৃথিবীতে খেলাফতের দায়িত্ব দিয়েছেন এবং তাঁর অপরাপর সকল সৃষ্টিকে মানব জাতির অধীন করে দিয়েছেন।
সুতরাং এই খেলাফতের দায়িত্ব পালন করতে হলে জ্ঞানার্জন অবশ্য কর্তব্য। তাই বয়োবৃদ্ধির সাথে সাথে প্রতিটি শিশুর জন্য বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে দ্বীনি শিক্ষা ও জ্ঞান অর্জন করা অপরিহার্য।
এতদসম্পর্কিত কুরআনের আয়াতগুলো নিম্নে পেশ করা হলো:
♥ “পাঠ করুন আপনার পালনকর্তার নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন, সৃষ্টি করেছেন মানুষকে জমাট রক্ত থেকে। পাঠ করুন, আপনার পালনকর্তা মহা দয়ালু, যিনি কলমের সাহায্যে শিক্ষা দিয়েছেন, শিক্ষা দিয়েছেন মানুষকে যা সে জানত না (সূরা আলাক্ব, ৯৬:১–৫)।”
♥ “….. এটি একটি গ্রন্থ, যা আমি আপনার প্রতি নাযিল করেছি― যাতে আপনি মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের করে আনেন― পরাক্রান্ত, প্রশংসারযোগ্য পালনকর্তার নির্দেশে তাঁরই পথের দিকে।” (সূরা ইব্রাহীম, ১৪:১)
সুবক্তা ও সাবলীল উপস্থাপক
তিনি অত্যন্ত প্রাঞ্জল ভাষায় তাঁর বক্তব্য উপস্থাপন করতেন। তাঁর বক্তব্য হত নাতিদীর্ঘ – তা এমন সংক্ষিপ্ত হত না যা সাধারণ মানুষের বোধগম্য নয়, আবার ধৈর্যচ্যুতি ঘটানোর মত দীর্ঘও নয়। বিদায় হজ্বে প্রদত্ত তাঁর খুৎবাটি ছিল সর্বকালের শ্রেষ্ঠ এক অনবদ্য ভাষণ। আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী নবী মুহাম্মদ (সাঃ) অত্যন্ত মার্জিত, যুক্তিপূর্ণ ও সাবলীল ভাষায় লোকজনকে ধর্মোপদেশ দিতেন।
তাঁর প্রতি নির্দেশ ছিল:
♥ “জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও সুন্দর উপদেশের মাধ্যমে মানুষকে আপনার প্রভুর দিকে আহ্বান করুন এবং তাদের সামনে যুক্তি উত্থাপন করুন সর্বোত্তম পন্থায় ।” (সূরা নহল, ১৬:১২৫)
মধ্যমপন্থী নীতির ধারক
জীবনের সর্বক্ষেত্রে তিনি মধ্যমপন্থী নীতির অনুসরণ করেছেন। জীবন ধারণে তিনি বাড়াবাড়ি ও উগ্রতা যেমন পরিহার করেছেন তেমনি বৈরাগ্যবাদও বর্জন করেছেন। একটি সহজ–সরল, সংযত ও শালীন জীবনবোধ তাঁর মধ্যে সব সময় সক্রিয় ছিল। ধর্মীয় ব্যাপারেও তার একই নীতি ছিল। কারণ:
♥ “আল্লাহ্ কখনও মানুষের ওপর তার সাধ্যাতীত কোন দায়িত্বভার চাপিয়ে দেননি।” (সূরা বাক্বারাহ, ২:২৮৬)
ধর্ম জোর করে মানুষের ওপর চাপিয়ে দেওয়া আল্লাহ্ ও তাঁর নবীর নীতি ছিল না।
এ ব্যাপারে সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে:
♥ “ধর্মের ব্যাপারে কোন জোর-জবরদস্তি বা বাধ্যবাধকতা নেই। নিঃসন্দেহে সত্য সুস্পষ্টভাবে ভ্রান্তি থেকে পৃথক হয়ে গেছে। এখন যারা বিপথগামী মূর্খদের পরিহার করবে এবং আল্লাহে বিশ্বাস স্থাপন করবে, সে যেন ধারণ করল এমনই সুদৃঢ় হাতল যা কখনও ভাঙবে না। আর আল্লাহ্ সবই শুনেন এবং জানেন (সূরা বাক্বারাহ, ২: ২৫৬)।”
♥ “এমনিভাবে আমি তোমাদেরকে মধ্যপন্থী সম্প্রদায় করেছি যাতে করে তোমরা সাক্ষ্যদাতা হও মানবমন্ডলীর জন্যে এবং যাতে রসূল সাক্ষ্যদাতা হন তোমাদের জন্য।” …… (সূরা বাক্বারাহ, ২:১৪৩)
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর (রা) বলেন,
♦ “রসূলুল্লাহ্ (সা) আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, হে আব্দুল্লাহ, আমাকে জানানো হয়েছে যে, তুমি প্রতিদিন রোজা রাখ এবং সারা রাত ইবাদত কর।’ আমি বললাম, ‘হে আল্লাহর রসূল, অবশ্যই আমি তা করি।’ রসূল (সা) বললেন, এরূপ করবে না। রোজা ভেঙ্গে ভেঙ্গে রাখ আর রাতে ইবাদত কর এবং ঘুমাও। নিশ্চয়ই, তোমার উপর তোমার শরীরের হক আছে, তোমার উপর তোমার চোখের হক আছে এবং তোমার স্ত্রীর তোমার উপর হক আছে।” (সহীহ বুখারী, ৪৯০৩)।
অপর এক সহীহ হাদীসে হযরত সালমান ফারসী (রা) উদ্ধৃত করেন, রসূল (সা) বলেছেন,
♦ “তোমাদের প্রভুর প্রতি তোমাদের দায়িত্ব রয়েছে, তোমাদের শরীরের প্রতি তোমাদের দায়িত্ব আছে, তোমাদের পরিবারের প্রতি তোমাদের দায়িত্ব আছে, সুতরাং প্রত্যেকের প্রতি তোমার দায়িত্ব পালন কর।” (সহীহ বুখারী, ১৮৬৭)
সহজ—সরল জীবন যাপনকারী
জীবন যাপনের ক্ষেত্রে তাঁর সংযম, সারল্য, শালীনতা, নিরাভিমান ও পরিমিতিবোধ ছিল অসামান্য। সহজ, সরল ও সাধারণ জীবন যাপনেই তিনি পেতেন পরম তৃপ্তিবোধ। সৎ উপার্জনের দ্বারা অতি সাধারণভাবে তিনি জীবন যাপন করতেন। কোন কিছুতেই তাঁর বাড়াবাড়ি ছিল না, তিনি ছিলেন মধ্যমপন্থী। নবীসুলভ অভিজ্ঞায় তিনি জানতেন, ক্ষণস্থায়ী দুনিয়ার সাময়িক চাকচিক্য, সুখ–সম্ভোগ ও বিলাস–ব্যসন অধিকাংশ মানুষকে মোহাবিষ্ট করে রাখে। সম্পদ ও ক্ষমতা কুক্ষিগত করার এক অশুভ প্রতিযোগিতায় তারা মেতে ওঠে। ফলে মানুষ হিসেবে তাদের ওপর অর্পিত পার্থিব দায়িত্ব ও কর্তব্যের এবং পরকালীন জবাবদিহির কথা তারা ভুলে যায়। তাই তিনি তাঁর প্রবর্তিত সহজ সরল জীবন ব্যবস্থায় আধ্যাত্মিকতার সাথে জাগতিকতার এক অপূর্ব সমন্বয় সাধন করেন। এই ইসলামী জীবন ব্যবস্থা সমাজিক বৈষম্যের সকল কৃত্রিম ও জটিল বেড়াজালগুলোকে ছিন্নভিন্ন করে দেয় এবং মানুষে মানুষে সকল ভেদাভেদের অবসান ঘটায়। এর ফলে অধঃপতিত মানব সমাজ শির উঁচু করে দাঁড়াবার সুযোগ পায় এবং সৎকর্মপরায়ণতা ও পরহেজগারীর মানদন্ডে স্বমহিমায় উন্নীত হয়।
আদর্শ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা
নবীজী (সাঃ) শুধু একজন নবী ও রসূল কিংবা ধর্মগুরুই ছিলেন না তিনি ছিলেন একটি আধ্যাত্মিক সম্রাজের প্রতিষ্ঠাতা – অসাম্প্রদায়িক চেতনার ভিত্তিতে একটি আধুনিক রাষ্ট্রের জনক। চৌদ্দ শত বছর পূর্বে মদীনায় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সময় সকল ধর্মীয় সম্প্রদায়, গোত্র ও জনগোষ্ঠীকে সাথে নিয়ে তিনি ’মদীনা সনদ’ নামে যে জাতীয় ঐক্য চুক্তি সম্পাদন করেন তা বিশ্ব ইতিহাসে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অমূল্য দলিল হিসেবে চির ভাস্বর হয়ে আছে।
রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে তাঁর নেতৃত্বসুলভ আচরণ, কূটনৈতিক দক্ষতা ও ন্যায়নিষ্ঠা এবং একজন সমরনায়ক হিসেবে তাঁর অসাধারণ সাফল্য বিশ্বজনীনভাবে স্বীকৃত। তিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ন্যায়, সমতা ও তাক্কওয়া (খোদাভীতি) ভিত্তিক সমাজ ও রাষ্ট্র।
- তাঁর প্রতিষ্ঠিত রণনীতি, সন্ধি চুক্তি এবং যুদ্ধের চরম উত্তেজনাকর মূহুর্তে শত্রুর ও নিরস্ত্র লোকজনের সাথে তাঁর সংযমপূর্ণ আচরণ, যুদ্ধবন্দীদের সাথে উদার মানবিক ব্যবহার বর্তমানের আধুনিক সভ্যতাকেও হার মানায়।
- কোন কায়েমী বৈষয়িক স্বার্থে, মিথ্যাচারের মাধ্যমে, ছল–চাতুরীর আশ্রয় নিয়ে, প্রতিহিংসার বশে কিংবা গণহত্যা ও বিধ্বংসী নির্মমতার দ্বারা তিনি কখনও তাঁর নীতিকে কলুষিত হতে দেননি।
বৈষম্যহীন অর্থনৈতিক ব্যবস্থার প্রবর্তক
পবিত্র কুরআনের নির্দেশনার আলোকে তিনি এমন এক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রবর্তন করেছে যা ধর্মীয় নীতি–নৈতিকতার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
♠ ইসলামে হালাল উপার্জন ও বৈধ ও পরিমিত ব্যয় ইবাদততুল্য গণ্য করা হয়।
♠ ইসলাম ধনীর হাতে সমস্ত সম্পদ কুক্ষিগত হওয়া থেকে বিরত রাখে, অপরদিকে গরীবকে ধনীর সম্পদে অংশীদার হওয়ার সুযোগ করে দেয়। এভাবে ধনী ও গরীবের মধ্যে বৈষম্য কমে আসে।
♠ অর্থনৈতিক বৈষম্য সৃষ্টির হাতিয়ার শোষণমূলক সুদকে ইসলাম হারাম করেছে।
♠ গরীবের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য গরীবের হক হিসেবে যাকাতের ফরজ বিধান চালু করা হয়েছে।
♠ ইসলামের হালাল উপার্জনের বাধ্যবাধকতা, দান–খয়রাত ও কাফফারা এবং রাষ্ট্রীয় খাজনা ও কর আদায়, জনকল্যাণে ’বাইতুল মালের’ অর্থ ব্যয়, ইত্যাদি ক্ষেত্রে এমন এক ন্যায়সঙ্গত ব্যবস্থার উদ্ভাবন ঘটিয়েছে যা মানবতার কল্যাণ ও সামাজিক শান্তি প্রতিষ্ঠায় ব্যাপক অবদান রাখতে সক্ষম হয়েছে।
মদীনা রাষ্ট্রে নবী (সাঃ) ও তাঁর খলীফাগণ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত অর্থনৈতিক জীবন ব্যবস্থা তাই প্রমাণ করে।
সমাজ সংস্কারক ও মানবিক মূল্যবোধের প্রতিষ্ঠাতা
একজন সমাজ সংস্কারক হিসেবে হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) একটি চরম বর্বর, অসংস্কৃত ও দারিদ্রপীড়িত জাতিকে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ সুসভ্য, গরীয়ান ও মহিমান্বিত জাতিতে রূপান্তরিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন।
- আরব জাতি ছিল মরুচারী বেদুঈন। তাদের কোন সরকার ছিল না। একমাত্র নিজ গোত্রের প্রতি আনুগত্য ছাড়া আর অন্য কোন কিছুর পরোয়া তারা করত না।
- হত্যা, লুটপাট, দস্যুবৃত্তি, মদ্যপান, জুয়াখেলা, বেশ্যাবৃত্তির মত এমন কোন অপরাধ বা অপকর্ম বাদ ছিল না যা তারা করত না।
- এমন কি নিজের কন্যা সন্তানকেও জীবন্ত কবর দিতেও তাদের কোন দ্বিধাবোধ ছিল না।
- বেপরোয়া জীবনের অধিকারী এসব মানুষ ছিল অনেকটা হৃদয়হীন পাষাণতুল্য।
- রুক্ষ প্রতিকূল পরিবেশে গড়ে ওঠা শত শত বছরের লালিত নির্মম কঠিন চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের এসব মানুষ বন্যপশুর হিংস্রতাকেও হার মানায়।
- পৌত্তলিকতায় তাদের মন–প্রাণ ছিল আচ্ছন্ন। পাথর, গাছ, তারকা, মূর্তি, প্রেতাত্মা, এমন কিছু নেই যার উপাসনা তারা করত না।
তেইশ বছরের নবুওতি জীবনে তিনি ধর্মীয় ও সামাজিক ক্ষেত্রে যে বিপ্লব সাধন করেছিলেন তাতে একটি বর্বর জাতি মানবেতিহাসের সবচেয়ে মর্যাদাশীল মানুষে রূপান্তরিত হয় এবং বিশ্বের বুকে এক সুমহান গৌরবোজ্জ্বল ইসলামী সভ্যতার জন্ম দেয়।
ঐক্যবদ্ধ উম্মার জনক
গোত্রে গোত্রে হানাহানি, রেষারেষি ও কোন্দল এবং প্রতিহিংসার বশে প্রজন্ম থেকে প্রজান্মান্তর অবধি যুদ্ধ–বিগ্রহ চালিয়ে যাওয়াই ছিল যাদের রীতি সেই বহুধা–বিভক্ত একটি জাতিকে–
- তিনি একত্ববাদের ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ করেন,
- তিনি তাদের অন্তরে যে খোদাভীতি ও ঈমানী শক্তি জাগ্রত করেছিলেন,
- তার ফলে কিছু দিন পূর্বেও যারা অন্যায়ভাবে অপরের ধন–সম্পদ ও জীবন হরণে দ্বিধাবোধ করত না, এখন তারা নিজেদের জান-মাল দিয়ে অন্যকে রক্ষা করে।
- তিনি তাদের মধ্যে উত্তম নৈতিক ও আধ্যাত্মিক গুণের সঞ্চার করতে সক্ষম হয়েছিলেন।
- তারই বলে বলীয়ান হয়ে তারা এক আলোকিত ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সক্ষম হয়।
- এক সময়ের এ পশ্চাদপদ জাতি বিশ্বের শক্তিশালী জাতিগুলোর ক্ষমতা ও অহমিকাকে নস্যাৎ করে দেয়।
- এরা এমন এক ঐক্যবদ্ধ জাতিতে পরিণত হয় কুরআনের ভাষায় যেন “সীসা–ঢালা প্রাচীর”।
তাঁরই চারিত্রিক মাধুর্য ও আধ্যাত্মিকতার পরশে আরবের উদ্দাম বুনো পাশবিক চরিত্রের মানুষগুলো সৃষ্টির সেরা জীবে পরিণত হয়।
নারী জাতির অধিকার প্রতিষ্ঠাতা
বিশ্ব জুড়ে যখন নারী জাতির কোন অধিকার ছিল না, তখন তিনি নারীর অধিকারকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেন। “মায়ের পদতলে সন্তানের বেহেশত” – এ বিখ্যাত উক্তির মাধ্যমে তিনি মাতৃত্ব করেছেন মহীয়ান-গরীয়ান। ভক্তি ও শ্রদ্ধা প্রদর্শনে মায়ের স্থান নির্ধারণ করেছেন প্রথম থেকে তৃতীয় এবং পিতাকে রেখেছেন চতুর্থ স্থানে। মাতৃ–জাতির প্রতি এ এক অনন্য সম্মান। পবিত্র কুরআন ও হাদীসে নারী অধিকার বিষয়ে অনেক নির্দেশনা রয়েছে, তম্মধ্য়ে:
- পিতৃগৃহে কন্য়াদের সযত্নে লালন-পালন ও শিক্ষা গ্রহণ,
- বিবাহে তাদের সম্মতি ও মোহরানার বাধ্যবাধকতা,
- উত্তরাধিকার সম্পত্তিতে তাদের একটি নির্দিষ্ট অংশ,
- নিজস্ব ধন–সম্পদ অর্জন, এবং তা থেকে দান–খয়রাত ও ব্যয়ে তাদের স্বাধীনতা, ইত্যাদি ।
এসব অধিকার নারী জাতির প্রতি ইসলামের এক মহা অবদান। এ ছাড়া যে কোন নিপীড়ন– নির্যাতনের মত নারী নির্যাতনও ইসলামে নিষিদ্ধ। স্ত্রীকে শারীরিক বা মানসিক কোন ভাবেই নির্যাতন করা ইসলাম কখনো সমর্থন করে না। স্ত্রীর ওপর কোন কঠোর শাস্তি আরোপ করার ব্যাপারে নবী করীম (সাঃ) মানুষকে হুশিয়ার করে বলেছেন,
♦ ”তুমি (স্ত্রীর) মুখমন্ডলের ওপর আঘাত করো না, তাকে অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজ করো না এবং গৃহ ব্যতীত অন্য কোথাও তাকে পৃথক করে রেখো না।” (সুনান আবু দাউদ)।
♦ ”তোমাদের মধ্যে সে–ই উত্তম যে নিজ স্ত্রীর কছে উত্তম, এবং তোমাদের মধ্যে আমিই আমার স্ত্রীগণের কাছে সর্বোত্তম।” (ইবনে মাজাহ্, কিতাব নং ৯, হাদীস নং ১৯৭৭)
দাসত্ব প্রথা মুক্তির পথ–নির্দেশক
স্মরণাতীত কাল থেকেই দাস–প্রথার প্রচলন ছিল। সকল যুগেই দাস কেনাবেচা চলতো এবং তাদেরকে ব্যক্তিগত সম্পদ হিসেবে ব্যবহার করা হতো। ব্যক্তিস্বাধীনতা বলতে তাদের কোন কিছু ছিল না। মালিকগণ তাদের সাথে নির্মম আচরণ ও যথেচ্ছ দুর্ব্যবহার করতো এবং তাদের উপর মৌখিক ও শারীরিক নির্যাতন চালাতো। কঠিন কাজের বোঝা তাদের উপর চাপিয়ে দেওয়া হতো। লম্বা ও বিরতিহীন সময় ধরে তাদেরকে কাজ করতে হতো। বিশ্রাম বলতে কিছু ছিল না। বিনিময়ে তারা পেতো স্বল্প আহার ও নিম্নমানের পোষাক। নবী করীম (সাঃ) এর যুগেও দাসদের একই অবস্থা বিরাজমান ছিল।
দাস মুক্তির ব্যাপরে তাঁর উৎসাহ ছিল অপরিসীম। হযরত আবু বকর (রাঃ) এর মাধ্যমে ক্রীতদাস হযরত বেলাল (রাঃ) কে মুক্ত করার পর তাঁর ধার্মিকতার কারণে আল্লাহর নবী (সাঃ) তাঁকে ইসলামের প্রথম মুয়াজ্জিন নিযুক্ত করেন। কি অপূর্ব মানবিকতা! ইসলামের প্রথম মুয়াজ্জিন হযরত বেলাল (রাঃ) এর মত আরো অনেকেই দাসত্ব থেকে মুক্তি পাওয়ার পূর্বে একই দুর্ভোগের শিকার হন। এ অবস্থায় দাস–মুক্তির ব্যাপারে নবীজী (সাঃ) এর ভূমিকা ছিল অপরিসীম।
তৎকালীন সামাজিক পরিস্থিতিতে সম্পূর্ণভাবে দাস–প্রথার উচ্ছেদ সম্ভব না হলেও তিনি যেসব ব্যবস্থা নিয়েছিলেন তাতে অনেক দাস মুক্তি পেয়েছিল এবং তারা উন্নত জীবনে প্রবেশ করতে পেরেছিল।
দাস মুক্তির ব্যাপারে গৃহীত পদক্ষেপ সমূহ:
-
দাসমুক্তিকে অতীব পূণ্যের কাজ হিসেবে ঘোষণা করা।
-
পাপ স্খলনের কাফফারা হিসেবে দাসমুক্তির বিধান জারী।
-
দাসমুক্তির জন্য যাকাতের অর্থ বরাদ্দের বিধান।
-
দাসীদের মুক্তি দিয়ে সম–মর্যাদায় তাদের সাথে বিয়ের বিধান।
-
দাস–দাসী ব্যক্তিগত সম্পত্তি হওয়ার ধারণা থেকে অব্যাহতি দান।
-
দাস–দাসীর সাথে মানবিক আচরণ, সুন্দর ও মর্যাদাপূর্ণ আচার–ব্যবহার নিশ্চিতকরণ।
পবিত্র কুরআনের নির্দেশের আলোকে তাঁর গৃহীত উপরোক্ত পদক্ষেপগুলো ছিল দাস–দাসীর অধিকার সুরক্ষা ও সমাজ থেকে ক্রমশ দাস প্রথা বিলুপ্ত করার জন্য অতীব কার্যকরী। এ ব্যাপারে মানুষকে উৎসাহিত করার জন্য নবী করীম (সাঃ) বলেন,
♦ “যে একজন মুসলমান ক্রীতদাসকে মুক্তি দিবে আল্লাহ্ তার দেহের অঙ্গ–প্রত্যঙ্গগুলোকে দোযখের আগুন থেকে মুক্তি দিবেন। কারণ সে ক্রীতদাসের অঙ্গ–প্রত্যঙ্গকে মুক্তি দিয়েছে।” (বুখারী, খন্ড নং ৩, পুস্তক নং ৪৬, হাদীস নং ৬৯৩) ।
♦ “তিন ব্যক্তিকে দ্বিগুণ সাওয়াব দেওয়া হবে…… তম্মধ্যে এক ব্যক্তি যে ক্রীতদাসীর মুনিব, যদি সে তার দাসীকে উত্তম আচরণ শিক্ষা দেয়, তাকে সুশিক্ষা দান করে, তাকে দাসত্ব থেকে মুক্তি দেয়, অতঃপর তাকে বিয়ে করে।” (বুখারী খন্ড নং ১, পুস্তক নং ৩, হাদীস নং ৯৭ক)।
তিনি তাঁর বিখ্যাত বিদায় হজ্জ্বের ভাষণে বলেন,
♦ “সাবধান, তোমাদের দাসদাসী সম্পর্কে; নিজে যা খাও তাদেরকে তা খাওয়াও, নিজে যা পরো তাদেরকে তা পরতে দাও। তাদের সাথে মানবিক আচরণ করো।”
মানবিক মর্যাদার সংরক্ষক
মানবতার নবী (সাঃ) মানুষের মানবিক মর্যাদা সংরক্ষণের বিষয়ে তাঁর বিদায় হজ্জ্বের ভাষণে বলেন,
♦“হে জনমন্ডলী! আল্লাহ বলেছেন, “হে মানুষ, আমরা তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি একজন মানব ও একজন মানবী থেকে এবং গোত্র ও জাতিতে বিভক্ত করেছি যাতে তোমরা একে অপরকে চিনতে পার। নিশ্চয় আল্লাহর দৃষ্টিতে তোমাদের মধ্যে সে–ই সবচেয়ে মর্যাদবান যে সবচেয়ে বেশী খোদা–ভীরু।”
♦ “সকল মানুষ আদমের বংশধর এবং আদম মাটি থেকে তৈরী। অনারবের ওপর আরবের, আরবের ওপর অনারবের, কালোর ওপর সাদার অথবা সাদার ওপর কালোর কোনই শ্রেষ্ঠত্ব নেই শুধুমাত্র পরহেজগারী ছাড়া।”
অর্থাৎ আল্লাহর কাছে মানুষের মর্যাদা নিরুপিত হয় মানুষের শক্তি–সম্পদ ও বংশ-গৌরবের ভিত্তিতে নয়, বরং তার পরহেজগারী বা সদ্গুণাবলী, সচ্চরিত্রতা, সততা ও ঈমানী শক্তির ভিত্তিতে। একই ভাষণে তিনি আরো বলেন:
♦ “হে মানুষ! যদি একজন আবিসিনীয় বিকৃতাঙ্গ দাসও তোমাদের নেতা নিযুক্ত হয়, তোমরা তার কথা শুনো এবং তাকে মেনে চলো যতক্ষণ পর্যন্ত সে আল্লাহর কিতাব অনুযায়ী কার্য সম্পাদন করে।”
সুতরাং বর্ণ–গোত্র, ধন–সম্পদ, ইত্যাদি নির্বিশেষে এক মুসলমান অপর মুসলমানের ভাই, তাদের মধ্যে কোন ভেদাভেদ নাই – শুধু পরহেজগারি ছাড়া।
ইহলৌকিক ও পারলৌকিক জীবনের সমন্বয়সাধনকারী
হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর প্রচারিত ধর্ম ইসলামের বিশ্বাস অনুযায়ী মানবজাতির জীবন দু’টি প্রধান কালে বিভক্ত। একটি হলো ক্ষণস্থায়ী ইহকাল বা দুনিয়ার জীবন, অপরটি হলো চিরস্থায়ী পরকাল অর্থাৎ আখিরাতের জীবন। এটা আল্লাহর সৃষ্টির মহাপরিকল্পনার অংশ । সুতরাং এ উভয় কালের মধ্যে একটি সুপরিকল্পিত সমন্বয় সাধন অতীব জরুরী বিষয়।
- মহান সৃষ্টকর্তা আল্লাহ সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে মানবজাতিকে এ দুনিয়ায় তাঁর খলীফা বা প্রতিনিধি মনোনীত করেছেন । তাই তিনি মানবজাতিকে এক আলোকিত পথ প্রদর্শনের জন্য সর্বশেষ নবী মুহাম্মদ (সাঃ) এর উপর হেদায়েতের গ্রন্থ এ পবিত্র কুরআন নাযিল করেছেন যাতে প্রতিটি মানুষ এ উভয়কাল সম্পর্কে সঠিক পথের দিশা পায় এবং তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে পারে।
- পবিত্র কুরআনের বাণী কোন চমকপ্রদ কথার ফুলঝুরি নয়, বরং তা মানব জাতির ইহকালীন ও পরকালীন জীবনরে জন্য এক গুরুত্বর্পূণ উপদেশ বাণীসমগ্র। পবিত্র কুরআনে বর্ণিত আখিরাতের চিরস্থায়ী জীবনের অনন্ত সুখ–শান্তি এবং কঠোর শাস্তির দৃশ্য সামনে রেখে দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী জীবনকে সাজাতে হবে। কারণ,
- মহান আল্লাহ্ দুনিয়াকে বানিয়েছেন এক পরীক্ষাগার হিসেবে। দুনিয়ার পরীক্ষায় সাফল্যের সাথে উত্তীর্ণ হতে পারলে আখিরাতে অনন্ত সুখ–শান্তি নিশ্চিত হবে।
- মহান আল্লাহর রসূল মুহাম্মদ (সা:) তাঁর উপর নাযিলকৃত এ পবিত্র গ্রন্থ কুরআনের বিধি–বিধানসমূহ নিজ জীবনে যথাযথভাবে অনুসরণ করে একজন দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী, সতর্ককারী ও সুসংবাদদাতা হিসেবে সর্বোত্তম পন্থায় মানবজাতিকে আল্লাহর হেদায়েতের আলোর পথে আহ্বান জানিয়েছেন।
ইসলাম একটি সামগ্রিক জীবন ব্য়বস্থা যা দুনিয়া ও আখিরাতের মধ্যে সমন্বয় সাধন করেছে।
♠ দুনিয়ার নিয়ামতকে অস্বীকার করে বৈরাগ্য সাধন যেমন ইসলামে কাম্য নয়, তেমনি আখিরাতকে উপেক্ষা করে শুধু দুনিয়ার জৌলুসে মগ্ন থাকাও কাম্য নয়।
♠ তাই নবী করীম (সাঃ) ইসলামী শরীয়াহ ভিত্তিক একটি ভারসাম্যপূর্ণ সমন্বিত জীবন ব্যবস্থা প্রবর্তন করেছেন।
এর উপর ভিত্তি করেই চলমান ছিল ইসলামের প্রাথমিক যুগের মুসলমানদের সামগ্রিক জীবন যাপন:
- তারা এক অদ্বীতিয় আল্লাহর ওপর অটল বিশ্বাস রেখে সৎ কাজে প্রতিযোগিতা করতো,
- সত্য ও সঠিক পথের ওপর নিজেদেরকে নিয়োজিত রাখতো,
- একে অপরকে সে পথে চলার এবং ধৈর্য ধারণ করার তাগিদ দিত,
- সৎকর্মের নির্দেশ এবং অসৎকর্মে নিষেধ ও বাধা দান করা ছিল তাদের ঈমানী দায়িত্ব।
আল্লাহর ওপর সুদৃঢ় বিশ্বাস রেখে সত্য ও ন্যায়ের পথে চলার কারণেই তাদের জন্য আল্লাহর অসীম রহমতের দুয়ার খুলে গিয়েছিলো এবং দুনিয়ার নেতৃত্ব ও আখিরাতের সাফল্য তাদের হাতের মুঠোয় চলে এসেছিলো।
প্রতিটি মুসলমানের জন্য দুনিয়া ও আখিরাত উভয় কালের কল্যাণ সাধন করা তার ঈমানের অঙ্গ। যারা শুধু দুনিয়ার কল্যাণ চায় তারা আখিরাতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে – কেননা আখিরাতের কল্যাণে তাদের কোন অংশ থাকবে না। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ বলেন:
♥ “…তারপর অনেকেতো বলে যে, পরওয়াদেগার! আমাদিগকে দুনিয়াতে দান কর। অথচ তার জন্যে পরকালে কোন অংশ নেই।” (সূরা বাক্বারাহ, ২:২০০)
দুনিয়া ও আখিরাত এ উভয় কালের কল্যাণ কামনার জন্য যে দোয়া করতে আল্লাহ্ মানুষকে শিখিয়েছেন তা হলো:
♥ “… হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদিগকে দুনিয়াতেও কল্যাণ দান কর এবং আখিরাতেও কল্যাণ দান কর এবং আমাদিগকে দোযখের আযাব থেকে রক্ষা কর।” (সূরা বাক্বারাহ, ২:২০১)।
নিষ্ঠাপূর্ণ ইবাদত–বন্দেগীর প্রতীক
নিষ্ঠাপূর্ণ ইবাদত-বন্দেগীর মাধ্যমে শুধুমাত্র আল্লাহ্ রব্বুল আলামীনের সন্তুষ্টি অর্জনই ছিল তাঁর পরম ধ্যান–জ্ঞান। নামায ছিল তাঁর অতি প্রিয় এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভের শ্রেষ্ঠ মাধ্যম। গভীর রাতে তিনি নামায, তেলাওয়াত, দীর্ঘ সিজদা ও মূনাজাতের মাধ্যমে নবুওতি দায়িত্ব পালন এবং উম্মতের কল্যাণ ও মুক্তির জন্য মহান আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করতেন। তিনি প্রতিদিনের প্রতিটি কাজ, কথা ও আচরণে পবিত্র কুরআনের নির্দেশ একান্ত নিষ্ঠার সাথে পালন করেছেন। তাঁর প্রতি নির্দেশ ছিল:
♥ “(হে নবী)বলুন, আমি নিষ্ঠার সাথে আল্লাহর এবাদত করতে আদিষ্ট হয়েছি। আরও আদিষ্ট হয়েছি, সর্ব প্রথম নির্দেশ পালনকারী হওয়ার জন্যে। বলুন, আমি আমার পালনকর্তার অবাধ্য হলে এক মহাদিবসের শাস্তির ভয় করি। বলুন, আমি নিষ্ঠার সাথে আল্লাহ তা’আলারই এবাদত করি। অতএব, তোমরা আল্লাহর পরিবর্তে যার ইচ্ছা তার এবাদত কর। বলুন, কেয়ামতের দিন তারাই বেশী ক্ষতিগ্রস্ত হবে, যারা নিজেদের ও পরিবারবর্গের তরফ থেকে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। জেনে রাখ, এটাই সুস্পষ্ট ক্ষতি।” (সূরা আল যুমার, ৩৯:১০—১৫)
উপসংহার
সর্বশ্রেষ্ঠ নবী ও রাসূল হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) ছিলেন আল্লাহর রঙে রঞ্জিত, আল্লাহর গর্বে গর্বিত ও আল্লাহর জন্য আত্ম–নিবেদিত এক আদর্শ মহামানব। নবুওতি জীবন শেষে তিনি তাঁর উম্মতের ইহলৌকিক ও পারলৌকিক কল্যাণের জন্য যে দু’টি মূল্যবান সম্পদ রেখে গেছেন তা হলো তাঁর ওপর নাযিলকৃত আল্লাহর কিতাব পবিত্র কুরআন এবং তাঁর জীবনাদর্শ “সুন্নাহ্”। আল্লাহর নবী মুহাম্মদ (সাঃ) এর জীবনাদর্শ সমুজ্জ্বল আলোকবর্তিকার মতো পথ–প্রদর্শক হিসেবে কিয়ামত পর্যন্ত মানব জাতিকে সুপথ দেখাবে।
হযরত মুহাম্মদ (ﷺ) সম্পর্কে ভিন্ন–ধর্মী মনীষীদের উক্তিসমূহ
বিশ্বের বহু অমুসলিম মনীষী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পর্কে অনেক প্রশংসামূলক উক্তি করেছেন। এঁদের মধ্য থেকে কয়েক জনের উক্তি উদ্ধৃত করা হলো:
মাইকেল এইচ হার্ট: ‘THE 100: A RANKING OF THE MOST INFLUENTIAL PERSONS IN HISTORY’ গ্রন্থের প্রণেতা বলেন,
“বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের তালিকায় আমার পছন্দ হিসেবে মুহাম্মদের নাম সর্বাগ্রে আসায় কিছু পাঠক বিস্ময়বোধ করতে পারেন, আবার কেউ তা প্রশ্নবিদ্ধও করতে পারেন, কিন্তু তিনিই ছিলেন একমাত্র ব্যক্তি যিনি ধর্মীয় ও ধর্ম-নিরপেক্ষতা উভয় ক্ষেত্রেই সর্বোতভাবে সফলতম ব্যক্তিত্ব।” (Michael H. Hart, Author of ‘THE 100: A RANKING OF THE MOST INFLUENTIAL PERSONS IN HISTORY’, New York: Hart Publishing Company, Inc., 1978, p. 33.)
টমাস কার্লাইল: ঊনিশ শতকের এক বিখ্যাত মনীষী স্কটিশ দার্শনিক, চিন্তাবিদ ও ইতিহাসবিদ টমাস কার্লাইল ১৮৪১ সালে প্রকাশিত তাঁর গ্রন্থে হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পর্কে বিস্ময়বোধ করে বলেছিলেন,
“কি করে এককভাবে একজন মানুষ বিবাদমান গোত্রসমূহ এবং যাযাবর বেদুঈনদেরকে দুই দশকেরও কম সময়ে ঐক্যবদ্ধ করতে পারলেন?” [Heroes and Hero-worship: The Hero as Prophet Muhammad: Islam]
বসওয়ার্থ স্মিথ: মনীষী বসওয়ার্থ স্মিথ তাঁর গ্রন্থে এ বলেন,
“তিনি ছিলেন একাধারে সীজার এবং পোপ; কিন্তু পোপের আত্মম্ভরিতা ছাড়াই তিনি ছিলেন পোপ, সৈন্য-সামন্ত ছাড়াই তিনি ছিলেন সীজার: নিয়মিত সেনাবাহিনী নেই, নেই কোন দেহরক্ষী, নেই রাজপ্রাসাদ, নেই কোন নির্দিষ্ট রাজস্ব আয়; যদি কোন মানুষ কখনো দাবী করে বলতে পারে যে, তিনি সঠিক ঐশী শক্তি দ্বারা শাসন করেছেন, তবে তিনি হলেন মুহাম্মদ, কারণ কোন পার্থিব উপায়–উপকরণ ছাড়াই তিনি ছিলেন সমস্ত শক্তির অধিকারী।” (Bosworth Smith, MOHAMMAD AND MOHAMMADANISM, London, 1874, p. 92.)
লামারটিন: বিখ্যাত ঐতিহাসিক লামারটিন তাঁর গ্রন্থে বলেন,
“মুহাম্মদ ছিলেন একাধারে একজন সত্যান্বেষী, বাগ্মী, প্রচারক, আইন প্রণেতা, যোদ্ধা, সর্বমতের ওপর বিজয়ী, যৌক্তিক মতবাদের প্রতিষ্ঠাতা, প্রতিমাবিহীন ধর্মের প্রবর্তক; যিনি বিশটি পার্থিব সম্রাজ্য এবং একটি আধ্যাত্মিক সম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা। মানবিক মহত্ত্বের সকল মানদন্ডের নিরিখে আমাদের জিজ্ঞাস্য হতেই পারে: তাঁর চেয়ে মহোত্তম কোন ব্যক্তিত্ব আছে কি?” [Lamartine, HISTOIRE DE LA TURQUIE, Paris, 1854, Vol. II, pp. 276-277.]
জর্জ বার্নার্ড শ: বিখ্যাত মনীষী জর্জ বার্নার্ড শ তাঁর নিবন্ধে বলেন,
“তাঁকে মানবতার রক্ষক বলাই শ্রেয়। আমি বিশ্বাস করি যে, তাঁর মত একজন ব্যক্তিত্ব যদি আধুনিক বিশ্বের একনায়কের দায়িত্ব গ্রহণ করতেন তবে তিনি এর সমস্যাসমূহের সমাধান এমনভাবে করতে সফল হতেন যা বিশ্বের অতীব প্রয়োজনীয় শান্তি ও সুখ বয়ে আনত।” [George Bernard Shaw, The Genuine Islam, Singapore, Vol. 1, No. 8, 1936]
এম, কে গান্ধী: আধুনিক ভারতের জনক এম, কে গান্ধী বলেন,
“আমি জানতে চেয়েছিলাম সর্বোত্তম একজনের কথা যিনি আজও অবিসংবাদিতভাবে অগণিত মানুষের হৃদয় দখল করে আছেন …. আমি সমধিক নিশ্চিত হতে পেরেছিলাম যে, তৎকালীন জীবন ব্যবস্থায় তরবারী ইসলামের জন্য কোন স্থান নির্ধারণ করেনি। এটা ছিল নবীর ঋজুপ্রকৃতি, বিনম্রতা, ওয়াদা পালনের অগাধ বিশ্বস্ততা, তাঁর বন্ধু ও অনুসারীগণের প্রতি গভীর সহৃদয়তা, তাঁর বীরত্বব্যঞ্জক সাহসিকতা, তাঁর অকুতোভয়তা, ঈশ্বরের প্রতি এবং তাঁর নিজ লক্ষ্যের প্রতি সার্বিক আস্থা ও বিশ্বাস। তরবারী নয় বরং তাদের সম্মুখে এসবকিছুই নিয়ে যাওয়া হয়েছিল যা সকল বাধা–বিপত্তি অতিক্রম করতে পেরেছিল। আমি যখন (নবীর জীবন চরিতের) দ্বিতীয় খন্ড পাঠ সমাপ্ত করলাম তখন দুঃখবোধ হলো যে, মহৎ জীবন সম্পর্কে পাঠ করার মত এর অধিক কিছু আমার জন্য রইল না।” [Mahatma Gandhi, ‘Young India’]
জেমস এ মিচেনার: প্রখ্যাত লেখক জেমস এ মিচেনার বলেন,
“সকল ব্যাপারেই মুহাম্মদ ছিলেন অত্যন্ত বাস্তবধর্মী। যখন তাঁর প্রিয় পুত্র ইব্রাহীম মারা গেলেন তখন সূর্যগ্রহণ সংঘটিত হয়, এতে গুজব ছড়িয়ে পড়ল এটা ঈশ্বরের পক্ষ থেকে শোকের ছায়া। এ গুজবকে বাতিল করে মুহাম্মদ যা বললেন তা হলো, “সূর্যগ্রহণ একটা প্রাকৃতিক ঘটনা। এটাকে কোন ব্যক্তির মৃত্যু বা জন্মের সাথে সম্পৃক্ত করা নেহায়েৎ বোকামী’।” এ লেখকের অপর মন্তব্য যা হযরত আবুবকর (রাঃ) সম্পর্কিত তা হলো: “মুহাম্মদের নিজের মৃত্যুর পর তাঁর ওপর অমরত্ব আরোপের চেষ্টা করা হলে, যিনি তাঁর উত্তরসূরী শাসক হবেন, তিনি ধর্মীয় ইতিহাসের এক মহোত্তম ভাষণে সে আবেগের তাড়নাকে নস্যাৎ করে দিয়ে বললেন: “তোমাদের মধ্যে যদি কেহ মুহাম্মদের উপাসনা করে থাক তবে জেনে রাখ তাঁর মৃত্যু হয়েছে। আর যদি তোমরা আল্লাহর উপাসনা করে থাক তবে জেনে রাখ তিনি (আল্লাহ্) চিরঞ্জীব’।” [James A. Michener, “ISLAM: THE MISUNDERSTOOD RELIGION,” in READER’S DIGEST (American edition), May 1955, pp. 68-70.]
নবী করীম (সাঃ) এর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাপুঞ্জী
| বর্ষ (খ্রিষ্টাব্দ) | গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাপুঞ্জী |
| ৫৭০ | Ο জন্ম তারিখ: ৯ অথবা ১২ ই রবিউল আউয়াল। |
| ৫৯৫ | Ο হযরত খাদীজা (রাঃ) এর সাথে বিবাহ। |
| ৬১০ | Ο প্রথম ওহী নাযিল ও নবুওতের সূচনা, ঘনিষ্ট স্বজন প্রতি ইসলামের দাওয়াত। |
| ৬১৩ | Ο প্রকাশ্যে ইসলামের প্রচার শুরু। কুরাইশ নেতৃবৃন্দের বিরোধীতা। পিতৃব্য আবু তালিব কর্তৃক সুরক্ষা প্রদান। |
| ৬১৫ | Ο মক্কার নির্যাতিত মুসলমানদের আবিসিনিয়ায় (বর্তমান ইথিওপিয়া) প্রথম হিজরত। |
| ৬১৬ | Ο আবিসিনিয়ায় দ্বিতীয় হিজরত।
Ο হযরত হামযা (রাঃ) ও হযরত ওমর (রাঃ) এর ইসলাম গ্রহণ। Ο মুসলমান ও হাশেমী গোত্রের সাথে কুরাইশদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক বয়কট। Ο মুসলমান ও হাশেমী গোত্রের লোকজন মক্কার নিকটবর্তী শেবা উপত্যকায় আশ্রয় গ্রহণ। |
| ৬১৯ | Ο বয়কটের অবসান। |
| ৬২০ | Ο দুঃখের বর্ষ: আবু তালিব ও হযরত খাদীজা (রাঃ) এর ইন্তেকাল।
Ο ইসলাম প্রচারে তায়েফ গমন ও সেখানকার বিষাদময় ঘটনা। Ο ইয়াসরিবের (মদীনা) একদল হজ্জ্বযাত্রীর নিকট ইসলাম প্রচার ও তাদের ইসলাম গ্রহণ। |
| ৬২১ | Ο ইসরা ওয়াল মি’রাজের অলৌকিক ঘটনা।
Ο পাঁচ ওয়াক্ত নামাযের বিধান চালু। Ο ইয়াসরিব থেকে আগত হজ্জ্বযাত্রীদলের আকাবার প্রথম বাইয়্যাত (শপথ)। |
| ৬২২ | Ο ইয়াসরিব থেকে আগত হজ্জ্বযাত্রীদলের আকাবার দ্বিতীয় বাইয়্যাত (শপথ)।
Ο নবীজী (সাঃ) সহ সকল মুসলমানকে মদীনায় হিজরতের দাওয়াত। Ο মদীনায় মুসলমানদের হিজরত শুরু। Ο কুরাইশ কর্তৃক নবী মুহাম্মদ (সাঃ)-কে হত্যার চক্রান্ত। Ο হযরত আবু বকর (রাঃ)-কে সঙ্গে নিয়ে নবীজী (সাঃ) এর মদীনায় হিজরত। Ο মদীনার নিকটে ইসলামের প্রথম মসজিদ নির্মাণ। Ο প্রথম জুম’আর নামায আদায়। Ο মদীনার মসজিদে নববী এর প্রতিষ্ঠা। |
| ৬২৩ | Ο মদীনা সনদ প্রণয়ন ও মদীনা রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠ।
Ο জিহাদের অনুমতি সংক্রান্ত ওহী নাযিল। |
| ৬২৪ | Ο কুরাইশ বাহিনীর সাথে বদর প্রান্তরে যুদ্ধ ও কুরাইশদের শোচনীয় পরাজয়।
Ο হযরত আয়েশা (রাঃ) এর সাথে নবীজী (সাঃ) এর বিবাহ। Ο মসজিদুল হারাম অভিমুখে ক্বিবলার পরিবর্তন। Ο রমযানে মাসব্যাপী ফরয রোযা পালনের নির্দেশ জারী। Ο বনু কুনাইকা গোত্রের বিরুদ্ধে অভিযান। Ο যাকাত আদায়ের নির্দেশ জারী। |
| ৬২৫ | Ο উহুদের যুদ্ধ।
Ο বনু নাদির গোত্রে বিরুদ্ধে অভিযান। |
| ৬২৭ | Ο বনু মুস্তালিক ও বনু কুরাইযা গোত্রের বিরুদ্ধে অভিযান।
Ο খন্দকের যুদ্ধ। Ο মুনাফেক সম্প্রদায় কর্তৃক হযরত আয়েশা (রাঃ) এর উপর অপবাদ আরোপ। |
| ৬২৮ | Ο উমরাহ পালানে মক্কার উদ্দেশ্যে যাত্রা।
Ο কুরাইশ কর্তৃক মক্কার নিকটস্থ হুদায়বিয়া নামক স্থানে বাধা প্রদান। Ο বাইয়্যাতে রিদওয়ান। Ο কুরাইশদের সাথে সন্ধিচুক্তি সম্পাদন। Ο সাময়িক শান্তির পরিবেশ সৃষ্টি ও বিদেশী রাজন্যবর্গের নিকট ইসলামের দাওয়াত পত্র প্রেরণ। Ο আবিসিনিয়ার রাজা ও ইয়েমেনের গভর্ণর কর্তৃক ইসলাম গ্রহণ। Ο মিশরের শাসনকর্তা কর্তৃক নবীজী (সাঃ)-কে মারিয়া নামক এক দাসী উপহার। Ο খায়বরের যুদ্ধ। |
| ৬২৯ | Ο উমরাতুল কাযা পালন।
Ο হযরত খালিদ বিন ওয়ালীদ (রাঃ), হযরত আমর বিন আস (রাঃ) ও হযরত উসমান বিন তালহা (রাঃ) এর ইসলাম। Ο মুতার যুদ্ধ। Ο বনু সুলাইম ও বনু গিফার গোত্রের ইসলাম গ্রহণ। Ο কুরাইশ কর্তৃক হুদায়বিয়ার চুক্তি ভঙ্গ। |
| ৬৩০ | Ο মক্কা বিজয়।
Ο হুনায়েনের যুদ্ধ। Ο তায়েফ অভিযান। Ο উমরাহ পালন। Ο সানা ও হাদ্রামাউত অভিযান। Ο ওমান ও বাহরাইনের শাসনকর্তার নিকট প্রতিনিধি প্রেরণ। Ο নবী–পুত্র হযরত ইব্রাহীমের জন্ম। Ο তাবুক অভিযান। Ο তাবুক থেকে বাইজেন্টাইন সম্রাট হীরাক্লিয়াসের নিকট দ্বিতীয়বার ইসলামের দাওয়াত প্রেরণ। Ο খ্রীষ্টান গোত্র বনু তগলিব কর্তৃক শান্তিচুক্তি সম্পাদনের জন্য মদীনায় আগমন। Ο মুনাফেকদের নির্মিত মসজিদে যেরার ধ্বংস। Ο হিমাইর রাজার ইসলাম গ্রহণ। Ο আরবের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বহু গোত্রের প্রতিনিধি দলের ইসলাম গ্রহণের জন্য মদীনায় আগমন। |
| ৬৩১ | Ο হযরত আবু বকর (রাঃ) এর নেতৃত্বে ফরজ ইবাদত হিসেবে হজ্জ্ব পালন।
Ο মক্কা শহরকে কাফেরমুক্ত ও পবিত্রকরণের উদ্দেশ্যে সূরা তওবা নাযিল। Ο মুনাফেক সর্দার আব্দুল্লাহ্ ইবনে উবাই এর মৃত্যু। Ο নাজরানের খ্রীষ্টান প্রতিনিধিদলের মদীনায় আগমন ও শান্তিচুক্তি সম্পাদন। |
| ৬৩২ | Ο নবী-পুত্র হযরত ইব্রাহীমের ইন্তেকাল।
Ο সর্বশেষ হজ্জ্ব ও ওমরাহ পালন এবং বিদায় হজ্জ্বের খুৎবা প্রদান। Ο ইসলামকে মানবজাতির চূড়ান্ত ধর্ম হিসেবে ঘোষণার আয়াত নাযিল। Ο ইয়েমেনের গভর্ণর বাযানীর ইন্তেকাল। Ο মিথ্যাবাদী আসওয়াদ আনসী কর্তৃক ইয়েমেনের ক্ষমতা দখল ও নিজেকে নবী বলে দাবী। নবীজী (সাঃ) এর নির্দেশে তাকে হত্যা। Ο ইসলামের বিজয় ও নবীজী (সাঃ) এর বিদায়ের ইঙ্গিতবাহী সূরা নছর নাযিল। Ο হযরত ওসামা বিন যায়েদ (রাঃ)-কে সেনাপ্রধান নিযুক্ত করে সিরিয়ায় রোমান বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রেরণ। Ο নবীজী (সাঃ) এর অসুস্থতা ও পার্থিব জীবনের সমাপ্তি। |