এ অধ্যায়ের বিষয়সমূহ
Toggleইসলামের শান্তিপূর্ণ নীতিমালা
মহান আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন মনোনীত ধর্ম ইসলাম মানজাতির ইহলৌকিক ও পালৌকিক শান্তি ও কল্যাণের জন্য আবির্ভূত হয়েছে। ইসলাম শব্দের অর্থ শান্তি। শব্দটির মধ্যেই এর নামকরণের সার্থকতা নিহিত রয়েছে। প্রতিদিনের সাক্ষাতে মুসলমানদের পারস্পরিক সম্ভাষণ হলো ‘আস্সালামু আলাইকুম‘ অর্থাৎ আপনার ওপর শান্তি বর্ষিত হোক। এর চেয়ে উত্তম অভিবাদন আর কি হতে পারে?
ইসলামের প্রচারক মহান আল্লাহর নবী হযরত মুহাম্মদের (সাঃ) সময় থেকেই শান্তিপূর্ণ মৌলনীতির ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়েছে ইসলামের সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা। তাই ইসলামকে বিচার করতে হলে এর প্রচারক নবী মুহাম্মদ (সাঃ) ও খোলাফায়ে রাশেদীনের যুগকেই আদর্শ হিসেবে গণ্য করতে হবে।
এরপর থেকে ইসলামী নীতি অনুযায়ী দেশের শাসন কাজ পরিচালনায় শিথিলতা ও ব্যত্যয় ঘটতে শুরু করে। পরবর্তীকালের মুসলিম শাসকগণ ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে নয়, বরং বংশতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে নিজেদের রাষ্ট্র সীমানা ও প্রতিপত্তি বৃদ্ধির জন্যই তাদের শাসন কাজ পরিচালনা করেছিলেন। তাই এ নিবন্ধের আলোচনা মূলত ইসলামের প্রাথমিক আদর্শিক যুগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ।
ইসলামের ধর্মীয় ও রাষ্ট্রীয় নীতিমালা
আল্লাহর নবী ও রসূল হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) ও তাঁর খোলাফায়ে রাশেদীনের আমলে যেসব ধর্মীয় ও রাষ্ট্রীয় নীতিমালা অনুসরণ করা হতো তা নিম্নে উল্লেখ করা হলো:
♣ ইসলামে মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি:
ইসলামে ঈমান ও সৎকর্মকেই শ্রেষ্ঠত্বের মবপকাঠি হিসেবে গণ্য করা হয় । বংশ–মর্যাদা, ঐশ্বর্য, শক্তিমত্তা, সুন্দর চেহারা বা গায়ের উজ্জ্বল রঙ, এর কোনটিই আল্লাহর কাছে শ্রেষ্ঠত্বের মানদন্ড হিসেবে গণ্য নয়। ঈমান ও সৎকর্ম ব্যতীত অন্য কোন প্রকার ভেদাভেদ দ্বারা মানুষের মর্যাদা নির্ধারণের বিধান ইসলামে নেই।
এ প্রসঙ্গে বিদায় হজ্বের ভাষণে নবী করিম (সাঃ) বলেন,
♦ “হে মানবমন্ডলী! আল্লাহ্ বলেছেন, ‘হে মানুষ, আমরা তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি একজন মানব ও একজন মানবী থেকে এবং গোত্র ও জাতিতে বিভক্ত করেছি যাতে তোমরা একে অপরকে চিনতে পার। নিশ্চয় আল্লাহর দৃষ্টিতে তোমাদের মধ্যে সে-ই সবচেয়ে মর্যাদবান যে সবচেয়ে বেশী খোদা–ভীরু।’ সকল মানুষ আদমের বংশধর এবং আদম মাটি থেকে তৈরী। অনারবের ওপর আরবের, আরবের ওপর অনারবের, কালোর ওপর সাদার অথবা সাদার ওপর কালোর কোনই শ্রেষ্ঠত্ব নেই শুধুমাত্র পরহেজগারী ছাড়া।”
♣ সর্বত্র ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করার জোর নির্দেশ
আল্লাহর আইনে সব মানুষই সমান, আর এ আইন ন্যায়নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত। আপন–পর, ধনী–গরীব, সবল–দুর্বল, জাত–পাত ও ধর্ম–বর্ণ নির্বিশেষে সর্বত্র ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করার জোর নির্দেশ এসেছে কুরআন ও হাদীস থেকে।
এ প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ্ তায়ালা বলেন,
♥ “আমি আমার রসুলগণকে সুস্পষ্ট নিদর্শনসহ প্রেরণ করেছি এবং তাঁদের সাথে অবতীর্ণ করেছি কিতাব ও ন্যায়নীতি, যাতে মানুষ ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করে (সূরা হদীদ, ৫৭:২৫)।”
♥ “হে ঈমানদারগণ, তোমরা ন্যায়ের উপর প্রতিষ্ঠিত থাক; আল্লাহর ওয়াস্তে ন্যায়সঙ্গত সাক্ষ্যদান কর, তাতে তোমাদের নিজের বা পিতা–মাতার অথবা নিকটবর্তী আত্মীয়–স্বজনের যদি ক্ষতি হয় তবুও। কেউ যদি ধনী কিংবা দরিদ্র হয়, তবে আল্লাহ তাদের শুভাকাঙ্খী তোমাদের চাইতে বেশী। অতএব, তোমরা বিচার করতে গিয়ে রিপুর কামনা–বাসনার অনুসরণ করো না। আর যদি তোমরা ঘুরিয়ে–পেঁচিয়ে কথা বল কিংবা পাশ কাটিয়ে যাও, তবে আল্লাহ তোমাদের যাবতীয় কাজ কর্ম সম্পর্কেই অবগত।” (সূরা নিসা, ৪:১৩৫)
♣ ইসলাম কখনই হত্যা, সংঘাত ও হানাহানিকে প্রশ্রয় দেয় না
♥ “যে কেউ একটি প্রাণ হত্যা করলো (হত্যা বা পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি ব্যতীত), সে যেন সমস্ত মানুষকে হত্যা করলো, আর যে একটি প্রাণ রক্ষা করলো, সে যেন সমস্ত মানুষকে রক্ষা করলো” (সূরা আল–মায়িদা, ৫:৩২)।
♣ সামাজিক শান্তি রক্ষার তাকিদ প্রদান
ইসলামে সমাজে সমঝোতা ও মীমাংসাকে উৎসাহিত করতে বলা হয়েছে। মহান আল্লাহ্ বলেন,
♥ “বিশ্বাসীরা তো ভাই ভাই, কাজেই তোমাদের দুই ভাইয়ের মধ্যে মীমাংসা করে দাও” (সূরা আল–হুজুরাত, ৪৯:১০)।
নবী (সা.) বলেছেন:
♦ “প্রকৃত মুসলিম সেই ব্যক্তি, যার জিহ্বা ও হাত থেকে অন্য মুসলিমরা নিরাপদ থাকে।” (সহীহ বুখারী)
♦ “তোমরা ততক্ষণ পর্যন্ত ঈমানদার হবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত পরস্পরকে ভালো না বাসবে” (সহীহ মুসলিম)।
♦ মৃত্যুশয্যায় শায়িত অবস্থায়ও নবী (সা.) মানুষের জীবন, সম্পদ ও সম্মানের পবিত্রতা রক্ষার নির্দেশ দিয়ে গেছেন। এ কথাটি তাঁর বিদায় হজ্জের ভাষণেও উল্লেখ আছে।
♣ ধর্মীয় ব্যাপারে জোরজবরদস্তি ও ফেতনা–ফ্যাসাদ নিষিদ্ধ
ইসলাম ধর্মে জোরপূর্বক ধর্মান্তরিত করা বা ফেতনা-ফ্যাসাদ সৃষ্টি করা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এটি ধর্মীয় স্বাধীনতার একটি মৌলিক ভিত্তি।
পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে:
♥ “লা ইকরাহা ফিদ-দ্বীন” — “দ্বীনের ব্যাপারে কোনো জবরদস্তি নেই” (সূরা বাক্বারাহ, ২:২৫৬)।
আল্লাহ্ ইচ্ছে করলেই সব সম্প্রদায়কে একই জাতি সত্তার অন্তর্ভূক্ত করতে পারতেন, কিন্তু তিনি তা চাননি। তিনি যেমন মানুষকে মতভেদ করার স্বাধীনতা দিয়েছেন, তেমনই সঠিক দিক–নির্দেশনাও দিয়েছেন। এরপরও যারা পথভ্রষ্ট হবে তারা তা নিজ দায়িত্বেই হবে। কিয়ামতের পর বিচার দিবসে আল্লাহ্ এ মতভেদের ফয়সালা করবেন।
এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ্ পবিত্র কুরআনে বলেন:
♥ “আর ধর্মের ব্যাপারে ফেতনা-ফ্যাসাদ সৃষ্টি করা নরহত্যা অপেক্ষাও মহাপাপ (সূরা বাক্বারাহ, ২:২১৭)”,
♥ “আর তোমার পালনকর্তা যদি ইচ্ছা করতেন, তবে অবশ্যই সব মানুষকে একই জাতিসত্তায় পরিণত করতে পারতেন আর তারা বিভিন্ন ভাগে বিভক্ত হতো না। (সূরা হুদ, ১১:১১৮)
মুসলিম শরীফে বর্ণিত হাদীসে কুদসীতে রসুল (সাঃ) বলেন,
♦ “আল্লাহ্ বলেছেন, জুলুম করা আমি আমার নিজের জন্য অবৈধ করেছি, তেমনই আমার বান্দাদের জন্যও অবৈধ করেছি।”
মহান আল্লাহর উপরোক্ত বাণীগুলোই হলো ইসলামের শান্তিপূর্ণ নীতির ভিত্তি। তাই ইসলামের ইতিহাসে ধর্মীয় কারণে গণহত্যার কোন নজীর নেই।
মানবজাতির কল্যাণ ও শান্তি অর্জনই ইসলামের লক্ষ্য
♣ মানব জাতির বৈচিত্র্য ও পারস্পরিক পরিচয়
জুলুম, পারস্পরিক হানাহানি বা অশান্তি নয়, বরং মানবজাতির কল্যাণ ও শান্তি অর্জনই ইসলামী জীবন ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য।
এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ্ বলেন,
♥ “হে মানবজাতি, আমি তোমাদের সৃষ্টি করেছি এক পুরুষ ও এক নারী থেকে এবং তোমাদের বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি, যাতে তোমরা একে অপরকে চিনতে পারো” (সূরা আল–হুজুরাত, ৪৯:১৩)।
♣ প্রতিবেশীর প্রতি সহমর্মিতা
প্রতিবেশীর সুখ-দুঃখ, অভাব ও কষ্টকে ভাগ করে নিতে ইসলাম নির্দেশ দেয়। প্রতিবেশীর অধিকারের ব্যাপারে ইসলাম অত্যধিক গুরুত্ব আরোপ করেছে। ভ্রাতৃত্ব, সম্প্রীতি ও ভালবাসাপূর্ণ সমাজই ইসলামের কাম্য।
এ প্রসঙ্গ নিম্নোক্ত হাদীসে রাসুল (সাঃ) বলেছেন,
♦ “প্রতিবেশী যে ধর্মেরই হোক তাকে অভুক্ত রেখে পেটপুরে খেলে ঈমানদার হওয়া যায় না।“
প্রতিবেশীর অধিকার সম্পর্কে নবী (সা.) বলেছেন:
♦ “জিবরাইল (আ.) আমাকে বারবার প্রতিবেশীর ব্যাপারে উপদেশ দিতেন, এমনকি আমি মনে করেছিলাম তাকে হয়তো উত্তরাধিকারী বানিয়ে দেওয়া হবে।” (সহীহ বুখারী ও মুসলিম)
পারিবারিক শান্তি রক্ষার্থে স্বামী–স্ত্রীর সম্পর্ক নিয়ে পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ বলন:
♥ “আর এক নিদর্শন এই যে, তিনি তোমাদের জন্যে তোমাদের মধ্য থেকে তোমাদের সঙ্গীনীদের সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে শান্তিতে থাক এবং তিনি তোমাদের মধ্যে পারস্পরিক সম্প্রীতি ও দয়া সৃষ্টি করেছেন। নিশ্চয় এতে চিন্তাশীল লোকদের জন্যে নিদর্শনাবলী রয়েছে।” (সূরা আর রোম, ৩০:২১)
রসূল্লাহ্ (সাঃ) বলেন:
♦ “তোমাদের মাঝে উত্তম লোক সে, যে তার পরবিার পরিজনের কাছে উত্তম।” (ইবনে মাজাহ)।
উপরে উল্লখিত সব ক্ষেত্রেই ইসলামের মূলনীতি হলো — ন্যায়বিচার, সংযম ও পারস্পরিক সম্মান বজায় রাখা।
♣ ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সংখ্যালঘুদের অধিকার
নবী করীম (সাঃ) মদীনায় বসবাসরত সকল ধর্মীয় সম্প্রদায়কে নিয়ে এক শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ও সম্প্রীতির পরিবেশ সৃষ্টি করেন। সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষার্থে অমুসলিমদের সাথে চুক্তি লঙ্ঘন সম্পর্কে নবী (সা.) কঠোর সতর্কতা দিয়েছেন:
♦ “যে কেউ কোনো চুক্তিবদ্ধ (অমুসলিম) ব্যক্তির উপর অত্যাচার করলো বা তার অধিকার খর্ব করলো… আমি কিয়ামতের দিন তার বিরুদ্ধে অভিযোগকারী হবো” (সুনান আবু দাউদ)।
পবিত্র কুরআনে অমুসলিমদের প্রতি সদাচরণের কথা বলা হয়েছে:
♥ “আল্লাহ তোমাদের নিষেধ করেন না তাদের সাথে সদ্ব্যবহার করতে ও ন্যায়বিচার করতে, যারা ধর্মের ব্যাপারে তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেনি।” (সূরা আল-মুমতাহিনা, ৬০:৮)
মন্দকে মন্দ পন্থায় মোকাবিলা ইসলামের নীতি নয়
মহান আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন তাঁর নবী হযরত মুহাম্মদকে (সাঃ) ’রাহমাতুল্লিল আলামীন’ অর্থাৎ সৃষ্টিকুলের রহমতস্বরূপ এ দুনিয়ায় প্রেরণ করেছেন। তিনি ছিলেন শান্তির প্রতীক এবং শান্তির ধর্ম ইসলামের প্রচারে তাঁর ছিল শান্তিপূর্ণ বলিষ্ঠ ভূমিকা। বিশ্বাসে, কথায় ও কাজে একই সরল রৈখিক অবস্থানে থেকে তিনি প্রমাণ করেছেন ইসলাম এক শান্তিপূর্ণ ধর্ম এবং এতে নেই কোন বক্রতার অবকাশ।
তিনি কখনোই মন্দকে মন্দের দ্বারা মোকাবেলা করতেন না। বিভিন্ন সময়ে তাঁর উপর যে নির্মম অত্যাচার–নির্যাতন হয়েছে সেই চরম মূহুর্তেও তিনি কারো অমঙ্গল কামনা করেননি। বরং অপরিসীম ধৈর্য ও উত্তম আচরণের মাধ্যমে চরম শত্রুকেও তিনি কাছে টেনে নিতেন। উম্মুল মু’মেনীন হযরত আয়েশা (রাঃ) তাঁর স্বামী সম্পর্কে বলেন,
♦ “তিনি মন্দের বদলে মন্দকে অনুসরণ করতেন না, বরং তিনি ক্ষমা ও মার্জনা পছন্দ করতেন।” (আহমদ:৬/১৭৪, সনদ: সহীহ)।
এ প্রসঙ্গে তাঁর প্রতি আল্লাহর নির্দেশ ছিলো:
♥ “(হে নবী) ভালো আর মন্দ কখনোই সমান হতে পারে না, আপনি ভালো’র দ্বারা মন্দকে প্রতিহত করুন, তাহলেই আপনার মধ্যে এবং যার সাথে আপনার শত্রুতা – তার মধ্যে এমন (অবস্থার সৃষ্টি) হয়ে যাবে যেন সে আপনার অন্তরঙ্গ বন্ধু। আর এ (অবস্থা) শুধু তাদেরই (ভাগ্যে লেখা) থাকে যারা ধৈর্য ধারণ করে এবং এসব লোক তারাই হয় যারা সৌভাগ্যের অধিকারী (সূরা হা–মীম সেজদাহ, ৪১:৩৪–৩৫)।”
♥ “মন্দকে প্রতিহত করুন সর্বোত্তম পন্থায় (সূরা মু’মিনূন, ২৩:৯৬)।”
রাসুল সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর ব্যক্তিগত জীবন ও রাষ্ট্র পরিচালনায় এ সর্বোত্তম পন্থাটিই অনুসরণ করেছেন। পবিত্র কুরআনের এসব নির্দেশনা ও উদার নীতি শান্তি ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠায় বিরাট অবদান রেখেছে। যার ফলে ইসলাম দ্রুত গতিতে সারা বিশ্বে প্রসার লাভ করতে পেরেছে।
মদীনা–সনদ ও সাম্প্রদায়িক সহাবস্থানের শান্তিপূর্ণ নীতিমালা
ইসলাম ধর্মের প্রবর্তক নবী মুহাম্মদ (সাঃ) চৌদ্দ শত বছর পূর্বে মদীনায় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর সকল ধর্মীয় সম্প্রদায়, গোত্র ও জনগোষ্ঠীকে সাথে নিয়ে ‘মদীনা সনদ‘ নামে যে জাতীয় ঐক্য চুক্তি সম্পাদন করেন তা বিশ্ব ইতিহাসে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অমূল্য দলিল হিসেবে চির ভাস্বর হয়ে আছে। তাঁর উদ্যোগে প্রণীত ‘মদীনা সনদ’ মানবেতিহাসে লিখিত প্রথম সংবিধান যা ইহুদি ও মুসলিমসহ বিভিন্ন গোত্রের মধ্যে সহাবস্থান, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও পারস্পরিক প্রতিরক্ষার নিশ্চয়তা দিয়েছিল।
মদীনা রাষ্ট্রের সংবিধান প্রণয়ন
মক্কাবাসী কোরেশদের অত্যাচার-নিপীড়নে অতিষ্ট হয়ে নবী করীম (সাঃ) তাঁর অনুসারীদেরকে নিয়ে মদীনায় হিজরত করলেন। সেখানকার মুসলিম জনগণ সসম্মানে তাঁকে ও তাঁর অনুসারীগণকে সৌভ্রাতৃত্বের মর্যাদায় অভিষিক্ত করলেন।
মদীনার সকল গোত্র, ধর্ম ও সম্প্রদায়ের লোকজনকে নিয়ে নবী করীম (সাঃ) একটি শান্তিপূর্ণ সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনের উদ্দেশ্যে একটি সাম্প্রদায়িক সহ–অবস্থানের নীতিমালা সম্বলিত সংবিধান রচনা করলেন যা ইতিহাসে ’মদীনা সনদ’ নামে পরিচিত। তৎকালীন সময়ে তাঁর এ সনদটি ছিল সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ইতিহাসে এক বিস্ময়কর অবদান।
- এ সনদে সকল নাগরিকের ধর্মীয় অধিকার, জীবন ও সম্পদ রক্ষার অধিকার এবং ন্যায় বিচার লাভের অধিকার সুরক্ষিত করা হয়েছিল।
- মুসলিম রাষ্ট্রে বসবাসকারী অমুসলিম যারা জিম্মী নামে পরিচিত, তারা ছিল রাষ্ট্রের পবিত্র আমানত। আল্লাহ্ ও তাঁর নবীর (সাঃ) নামের শপথ দ্বারা তাদের জীবন ও সম্পদ ছিল সুরক্ষিত।
- ন্যায় বিচার লাভে ছিল তাদের পূর্ণ অধিকার। এ ধরনের ভূরিভূরি দৃষ্টান্ত রয়েছে সে সময়ের ইতিহাসে।
পবিত্র হাদীসে নবী করিম (সাঃ) সতর্ক করে বলেছেন,
♦ “কেহ কোন জিম্মিকে (সংখ্যালঘুকে) অন্যায়ভাবে হত্যা করলে বেহেশতের গন্ধও শুঁকতে পাবে না (নাসায়ী)।”
♦ “নিষ্ঠুরতা ও অন্যায়কে পরিহর করে চলো, ….. এবং লোভ ও কার্পণ্য থেকে নিজেদেরকে রক্ষা করো, কারণ এগুলোই তোমাদের পূর্ববর্তী জাতিগুলোকে ধ্বংস করে দিয়েছে (রিয়াদুস সালেহীন)।”
ইসলামের এক অনন্য উদাহরণ
ইসলামের দ্বিতীয় খলীফা হযরত ওমর (রাঃ) যখন নামাযে ইমামতি করছিলেন তখন একজন অমুসলিম বিষ–মাখা ছুরি দিয়ে তাঁকে আহত করে। এ অবস্থায় তাঁর মৃত্যু আসন্ন হয়ে পড়ে। মৃত্যু শয্যায় তিনি অমুসলিমদের ওপর প্রতিশোধের আশংকায় উদ্বিগ্ন হয়ে বললেন,
♦ “ইসলামী রাষ্ট্রের অন্তর্ভূক্ত যে জনগোষ্ঠী (অমুসলিম জিম্মিী) আল্লাহ্ ও তাঁর নবীর (সাঃ) নামে সুরক্ষাপ্রাপ্ত তাদের পক্ষ থেকে আমি তোমাদেরকে নির্দেশ দিচ্ছি যে, তাদের ব্যাপারে আমাদের শপথ পালন করতেই হবে, তাদের রক্ষার ব্যাপারে আমাদেরকে লড়াই করতে হবে, এবং তাদের ওপর সাধ্যাতীত কোন বোঝা চাপানো যাবে না।”
সপ্তম শতাব্দীতে ইসলাম জাহানের খলীফা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ব্যাপারে উদারতার যে পরাকাষ্ঠা দেখিয়েছিলেন সংখ্যলঘুদের ব্যাপারে ইতিহাসের পাতায় চিরদিন এক সমুজ্জ্বল ও অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
বিভিন্ন সম্প্রদায়ের সাথে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের দীর্ঘ ইতিহাস
- খৃষ্টান, ইহুদী ও অন্যান্য জনগোষ্ঠী মুসলমান সাম্রাজ্যে শত শত বছর এক সাথে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করেছে। তারা ধর্মীয় স্বাধীনতার সাথে তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের সুযোগ পেয়েছে।
- ইসলামের নামে ভিন্ন ধর্মাবলম্বী কাউকে হত্যা করার অনুমোদন কখনও ছিল না। ভারত সাম্রাজ্যে আট শত বছর মুসলিম শাসন বিরাজ করলেও মুসলমানরা সব সময় সংখ্যালঘুই ছিল।
বিপরীত দৃশ্য
- তারই বিপরীত দৃশ্যটি দেখা যায় বিংশ শতাব্দীতে। এক শিখ দেহরক্ষীর হাতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী হত্যাকান্ডের পরবর্তী প্রতিশোধমূলক নৃশংস ঘটনায় সংখ্যালঘু শিখ সম্প্রদায়ের তিন হাজার মানুষ সরকারী ছত্রছায়ায় গণহত্যার শিকার হয়েছিল। মুসলিম সংখ্যালঘুরাও ভারতে প্রতি নিয়ত একই ধরনের হত্যার শিকার হচ্ছে।
- অপরদিকে খৃষ্টান ধর্মীয়-যুদ্ধারা (crusaders) ১০৯৯ সালে যখন জেরুযালেম মুসলিমদের নিকট থেকে দখল করে তখন তারা সেখানে গণহত্যা চালিয়ে সব মুসলিম ও ইহুদী জনগোষ্ঠীকে হত্যা করে।
অথচ ১৪৫৩ সালে ওটোমান সুলতান দ্বিতীয় মুহাম্মদ যখন খৃষ্টান শাসিত কন্সটান্টিনোপল (বর্তমান ইস্তাম্বুল) জয় করেন তখন সকল খৃষ্টান নাগরিককে ধর্মীয় স্বাধীনতা প্রদান করেছিলেন।
ইসলামের উদার ও মানবতাবাদী নীতি
মহান আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন তাঁর নবী হযরত মুহাম্মদকে (সাঃ) ’রাহমাতুল্লিল আলামীন’ অর্থাৎ সৃষ্টিকুলের রহমতস্বরূপ এ দুনিয়ায় প্রেরণ করেছেন। তিনি ছিলেন শান্তির প্রতীক এবং শান্তির ধর্ম ইসলামের প্রচারে তাঁর ছিল শান্তিপূর্ণ বলিষ্ঠ ভূমিকা। তাঁর প্রচারিত ইসলামের উদার ও মানবতাবাদী নীতি সমগ্র বিশ্ববাসীর জন্য এক উজ্জ্বল আদর্শ।
এ প্রসঙ্গে ইসরাইলী সাংবাদিক, মানবতাবাদী ও ইসরাইলী সংসদ ‘নেসেটের‘ প্রাক্তন সদস্য ইউরি এভনারী দুইটি উদ্ধৃতি প্রমাণ করে ইসলাম অমুসলিমদের ব্যাপারে কতটা উদার ও মানবতাবাদী ছিল। স্পেনে মুসলিম শাসনামলে অন্য ধর্মাবলম্বীদের অবস্থা বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেন,
“মুসলিম স্পেন ছিল ইহুদীদের জন্য এক স্বর্গরাজ্য, এবং মুসলিম বিশ্বে ইহুদী হত্যাযজ্ঞ (Holocaust) কখনও সংঘটিত হয়নি। এমনকি হত্যাকান্ডের ঘটনাও ছিল খুবই নগণ্য। মুহাম্মদের (সাঃ) নির্দেশ ছিল আহলে-কিতাবদের (কিতাবধারী ইহুদী ও খৃষ্টান সম্প্রদায়) সাথে সহিষ্ণু আচরণ করতে হবে এমন সব শর্তাধীনে যা ছিল অতুলনীয় ও আধুনিক ইউরোপীয় আচরণের তুলনায় বেশী উদার। মুসলমানেরা কখনোই ইহুদী ও খৃষ্টানদের ওপর তাদের ধর্ম জোরপূর্বক চাপিয়ে দেয়নি, বরং বাস্তবে দেখা গেছে, ক্যাথলিক স্পেন থেকে যেসব ইহুদীদেরকে বহিষ্কার করা হয়েছিল তারা মুসলিম দেশগুলোতে বসতি স্থাপন করেছে এবং সেখানে সমৃদ্ধি লাভ করেছে।”
অপর একটি নিবন্ধে তিনি বলেন,
“প্রতিটি সৎ ইহুদী যিনি তার জাতির ইতিহাস জানেন, ইসলামের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা অনুভব না করে পারবেন না এ জন্য যে, ইসলাম ইহুদীদেরকে পঞ্চাশ প্রজন্ম পর্যন্ত সুরক্ষা দিয়েছে, যেখানে খৃষ্টান জগৎ বহুবার ‘তরবারীর দ্বারা‘ ইহুদীদের ওপর নির্যাতন–নিপীড়ন চালিয়েছে যাতে তারা তাদের ধর্মীয় বিশ্বাস পরিত্যাগ করে।” (মুহাম্মদʼস সোর্ড : সেপ্টেম্বর ২৭, ২০০৬)
এর বিপরীতে অকৃতজ্ঞ ইহুদী জাতি ফিলিস্তিন ও গাযায় মুসলিম জনগোষ্ঠীর ওপর যে নির্মম ও বর্বর নিপীড়ন ও হত্যাকান্ড চালাচ্ছে তাতে বিশ্ববাসী হতবাক।
ইসলামের প্রতিরক্ষামূলক যুদ্ধ নীতি
ইসলাম ন্যায় প্রতিষ্ঠা ও আত্মরক্ষার্থে যুদ্ধ অনুমোদন করেছে। তাও সেটা করা হয়েছে সর্বশেষ পদক্ষেপ হিসেবে। মক্কার বুকে ইসলাম প্রচারের প্রথম তেরোটি বছর ছিল আল্লাহর নবী (সাঃ) ও তাঁর অনুসারীগণের ওপর কাফেরদের চরম অত্যাচার, নিগৃহ ও নির্যাতনের কালো অধ্যায়। অত্যাচার-নিপীড়নে অতিষ্ট হয়ে মুসলমানদের একটি দল আবিসিনিয়ায় হিজরত করেন এবং অপর একটি দল মদীনায় হিজরত করেন। নবী করিম (সাঃ) যখন জানতে পারলেন কোরেশদের একটি দল তাঁকে হত্যা করার পরিকল্পনা করেছে তখন বাধ্য হয়ে তিনিও মদীনায় হিজরত করলেন। সেখানেও ওরা তাঁদেরকে শান্তিতে থাকতে দিল না। মদীনা আক্রমণের জন্য তারা সিরিয়া থেকে অস্ত্রসস্ত্র নিয়ে আসল।
এই কঠিন পরিস্থিতিতে আল্লাহ্ ‘জিহাদের’ নির্দেশ জারী করলেন। তবে নবীকে (সাঃ) সতর্ক করলেন, প্রতিপক্ষের মোকাবেলায় ক্ষমা ও ন্যায়নীতি অবলম্বন করতে এবং সীমা লঙ্ঘন না করতে আল্লাহ্ তাঁর নবীকে এভাবে নির্দেশ দিলেন:
♥ “যদি তোমরা তাদের শাস্তি দাও, তবে ঠিক ততটুকুই শাস্তি দেবে যতটুকু অন্যায় তোমাদের প্রতি করা হয়েছে। কিন্তু যদি তোমরা ধৈর্যধারণ কর তবে সেটাই হচ্ছে ধৈর্যশীলদের জন্য সর্বোত্তম পন্থা (সূরা নহল, ১৬:১২৬)।“
♥ “………তোমাদিগকে মসজিদুল হারামে প্রবেশে বাধা দেওয়ার কারণে কোন সম্প্রদায়ের প্রতি তোমাদের ক্রোধ তোমাদেরকে যেন কখনই সীমালঙ্ঘনে প্ররোচিত না করে। সৎকর্ম ও আল্লাহ্ভীতির ব্যাপারে সবার সাথে সহযোগিতা করো এবং গুনাহ ও সীমালংঘনের কাজে কাউকে সহযোগিতা করো না। আল্লাহ্কে ভয় করো। তাঁর শাস্তি বড়ই কঠোর। (সূরা মায়েদাহ, ৫:২)।“
মহান আল্লাহর এ নির্দেশটিই প্রমাণ করে ইসলাম কতটা উদার ও সহনশীল ধর্ম। ইসলাম সব সময়ই সীমালঙ্ঘন ও বাড়াবাড়ির ব্যাপারে মুসলমানদেরকে সতর্ক করে দিয়েছে।
যুদ্ধের সময় সংযম ও মানবিকতা প্রদর্শনের নির্দেশ
যুদ্ধক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সংযম ও মানবিকতা প্রদর্শনের নির্দেশও দেওয়া হয়েছে যাতে প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার মত কোন ঘটনা না ঘটে। এখানে ইসলামের নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) কর্তৃক মুসলিম সৈন্যদের জন্য প্রণীত যুদ্ধের নীতিমালা উল্লেখ করা হলো:
১. কোন শিশু, নারী, বৃদ্ধ ও অসুস্থ ব্যক্তিকে হত্যা কর না, (হাদীস গ্রন্থ: আবু দাউদ)
২. বিশ্বাসঘাতকতার আশ্রয় নিও না বা মৃতদেহ বিকৃত কর না, (আল মুয়াত্তা)
৩. খেজুর বৃক্ষ উৎপাটন কর না বা ফলবতী বৃক্ষ কর্তন কর না, (আল-মুয়াত্তা)
৪. খাওয়ার প্রয়োজন ব্যতীত কোন প্রাণী হত্যা কর নাম, (আল-মুয়াত্তা)
৫. ধর্মীয় উপাসনালয়ে কোন সাধুকে হত্যা কর না এবং উপাসনালয়ের ভিতরে অবস্থানরত কোন ব্যক্তিকেও হত্যা কর না (মুসনাদ আহমদ ইবনে হাম্বল),
৬. কোন গ্রাম/শহর ধ্বংস কর না, কোন ফসলী জমি/বাগান নষ্ট কর না এবং এবং পশুরপাল হত্যা কর না। (সহীহ বুখারী/সুনান আবু দাউদ)
ইসলামের মানবিকতাপূর্ণ প্রতিরক্ষা নীতিমালা
- নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর রণনীতি, সন্ধি চুক্তি, যুদ্ধবন্দীদের সাথে আচরণের নীতিমালা ছিল মানবিকতায় পরিপূর্ণ ।
- কোন কায়েমী বৈষয়িক স্বার্থে, মিথ্যাচারের মাধ্যমে, ছল—চাতুরীর আশ্রয় নিয়ে, প্রতিহিংসার বশে কিংবা গণহত্যা ও বিধ্বংসী নির্মমতার দ্বারা তিনি কখনও তাঁর নীতিকে কলুষিত হতে দেননি।
- শান্তিপূর্ণ পন্থায় মক্কা বিজয়ের পর তাঁর অনুসৃত ক্ষমা ও উদার মানবিক আচরণ ইসলামের মহানুভবতাকে বিশ্ববাসীর নিকট এক সমুজ্জ্বল নজীর হিসেবে স্থাপন করেছে। চৌদ্দশত বছর পূর্বের সেই মানবিকতা সমৃদ্ধ ইসলামী যুদ্ধনীতিমালা বর্তমান কালের মানবাধিকারকেও হার মানিয়েছে।
এসবই প্রমাণ করে, তরবারীর দ্বারা নয়, বরং শান্তিপূর্ণ নীতিমালার দ্বারাই ইসলাম শত্রুর মন জয় করেছে।
পরিশেষে বলতে চাই, বর্তমান বিশ্বে পাশ্চাত্য শক্তিবর্গ ইসলামকে একটি উগ্রবাদী জঙ্গীধর্ম বলে চিহ্নিত করার দুরভিসন্ধি করছে। আইএস, আল-কায়েদা, ইত্যাদি নামের জঙ্গীবাজরা যে তাদেরই সৃষ্ট এটা এখন বিশ্ববাসী জানে। তাদের এ ভাওতাবাজী ও ধোকায় পড়ে যাতে কেহ বিভ্রান্ত না হয় সে জন্য মুসলিম উম্মাহকে আরো বেশী সোচ্চার হতে হবে।
ইসলামের অর্থনৈতিক নীতিমালা
ইসলাম ধর্ম মতে মানুষ শুধু ভোগসর্বস্ব প্রাণী নয়। সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে মানুষ এ পৃথিবীতে আল্লাহর প্রতিনিধিরূপে প্রেরিত। সৃষ্টির সার্বজনীন কল্যাণের জন্যই মানুষের উদ্ভব।
- দুনিয়ার বুকে সত্য, ন্যায়, সাম্য ও শান্তি প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব দিয়ে আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন মানুষকে প্রেরণ করেছেন।
- মানুষ এ দুনিয়ায় আল্লাহ্ প্রদত্ত নিয়ামতের সঠিক আমানতদারী করবে, মিতব্যয়ীতার সাথে এ নিয়ামত ভোগ করবে এবং সার্বজনীন উপকারে এর ন্যায্য বন্টন নিশ্চিত করবে – এটাই আল্লাহর নির্দেশ।
- আল্লাহ্ সব প্রয়োজন ও অভাবের ঊর্দ্ধে, পৃথিবীর যাবতীয় সম্পদে তাঁর নিজের কোন প্রয়োজন নেই। তিনি চান, মানুষ তাঁর প্রতিনিধি হিসেবে তাদেরকে প্রদত্ত যিম্মাদারী তাঁর নির্দেশ মোতাবেক সঠিকভাবে পালন করুক।
- তিনি তাঁর প্রতিনিধি হিসেবে মানুষকে যে জিম্মাদারীর দায়িত্ব দিয়েছেন তার সাথে তিনি যুক্ত করে দিয়েছেন কর্মের স্বাধীনতা ও জবাবদিহিতা।
উৎপাদন ও বন্টন ব্যবস্থা
জীবন–জীবিকার সাথে উৎপাদন ও বন্টন ব্যবস্থা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। মানুষ সমাজবদ্ধ জীব, তাই তারা পারস্পরিক প্রয়োজনে একে অপরের উপর নির্ভরশীল। এ কারণেই উৎপাদন ও বন্টন ব্যবস্থার সুষ্ঠু ও ন্যায্য ব্যবস্থাপনা অতীব জরুরী:
- মানুষ তার ইচ্ছামাফিক জীবিকা অর্জন ও ভোগ করতে পারবে, তবে এর জন্য পরকালে তাকে পুরোপুরি হিসেব-–নিকেশ ও জবাবদিহির সম্মুখীন হতে হবে।
- বিচার দিবসে প্রত্যেকেই তার জীবন–জীবিকার সাথে সংশ্লিষ্ট বিষয়সমূহ এবং আল্লাহ্ প্রদত্ত নিয়ামতের ব্যবহার ও ভোগ সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে।
- ন্যায়ভিত্তক সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য গরীবের প্রাপ্য হক তাকে দিয়ে দিতে হবে এবং আল্লাহ্ প্রদত্ত সম্পদের কোনরূপ অপচয় ও অপব্যবহার করা যাবে না।
জীবিকার ক্ষেত্রে তারতম্যের কারণ
আল্লাহ্ জীবিকার ক্ষেত্রে তারতম্য এজন্য করেছেন যেন মানুষের মধ্যে পারস্পরিক নির্ভরশীলতা ও সহযোগিতা বৃদ্ধি পায়, জীবন চক্র সহজ ও সাবলীল হয়ে ওঠে।
- সম্পদ, জ্ঞান, বুদ্ধি, মেধা, শক্তি, কর্ম – দক্ষতা ও জীবিকার তারতম্যের মধ্যে মানুষের জন্য নিহিত রয়েছে আল্লাহর প্রতিনিধি হিসেবে তার দায়িত্ব পালনের পরীক্ষা ও জবাবদিহিতার বিষয়টি।
- একজন ব্যক্তিবিশেষ তার একার পক্ষে বিবিধ মানবিক সীমাবদ্ধতার দরুন নিজের সব রকম চাহিদা পূরণে সক্ষম নয়। অন্যের সেবা ও সাহায্য–সহযোগিতা তার প্রয়োজন।
- আর মানুষের এ প্রয়োজনকে ঘিরেই সৃষ্টি হয়েছে যাবতীয় অর্থনৈতিক কর্মকান্ড।
- এ অর্থনৈতিক কর্মকান্ডকে ন্যায্য পন্থায় ও সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালিত করাই ইসলাম ধর্মের লক্ষ্য।
- এ লক্ষ্য অর্জনে আল্লাহ মানুষের উপর দুঃসাধ্য কষ্ট আরোপ করতে চান না, বরং তাদের জীবনকে সহজ করতে চান।
এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ বলেন:
♥ “…. আল্লাহ্ তোমাদের জন্য সহজ করতে চান; তোমাদের জন্য জটিলতা কামনা করেন না ……।” (সূরা বাক্বারাহ, ২:১৮৫)
♥ “….আল্লাহ্ কারো উপর তার সাধ্যাতীত কোন বোঝা চাপিয়ে দেন না……।” (সূরা বাক্বারাহ, ২:২৮৬)
♥ “….আল্লাহ তোমাদেরকে অসুবিধায় ফেলতে চান না; কিন্তু তোমাদেরকে পবিত্র রাখতে চান এবং তোমাদের প্রতি স্বীয় নেয়ামত পূর্ণ করতে চান–যাতে তোমরা কৃতজ্ঞাতা প্রকাশ কর।” (সূরা মায়েদাহ, ৫:৬)
ইসলামী জীবন যাপনের মান
যেহেতু আল্লাহতায়ালা ইসলামকে একটি মধ্যপন্থী ধর্ম হিসেবে মনোনীত করেছেন, সেহেতু মানুষের জীবন–যাপনও হবে মধ্যম মানের। জীবনকে লাগামহীন বানানো ইসলামের নীতি–বিরুদ্ধ।
- এ কারণেই একদিকে যেমন উগ্র বিলাসিতা, অপব্যয় ও অপচয় ইসলামে নিষেধ করা হয়েছে,
- অপরদিকে কৃচ্ছতার নামে কৃপণতা বা স্বাভাবিক জৈবিক প্রয়োজনগুলোকে অস্বীকার করে জীবন–বিমুখ হয়ে থাকা এর কোনটাই ইসলাম সমর্থন করে না।
- ভোগবাদ বা বৈরাগ্যবাদ এর কোনটাই ইসলামে কাম্য নয়। জীবনকে সহজ, সাবলীল ও সুন্দর করে তোলাই ইসলামের লক্ষ্য।
এজন্য জীবন যাপনের ক্ষেত্রে মধ্যপন্থা অবলম্বন করাকেই ইসলাম গুরুত্ব দিয়ে থাকে।
- চরমপন্থা মানব জাতির জন্য কি দুর্দশা বয়ে আনে তা আমরা বর্তমান অর্থনৈতিক ব্যবস্থার দিকে তাকালেই দেখতে পাই।
- এর একদিক যুলুম, শোষণ, বঞ্চনা, ক্ষুধা ও দারিদ্রের কালো চাদরে আবৃত, আর অপরদিক চাকচিক্যময় লাগামহীন বিলাসী জীবনের ফল্গুধারায় উচ্ছ্বসিত।
- নৈতিকতাবর্জিত সেক্যুলার আর্থ–সামাজিক ব্যবস্থা মানব সমাজে সার্বিক ইনসাফ প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থ হয়েছে।
- ‘ঋণ নিয়ে ভোগ কর আর জীবনভর সুদসহ তা ফেরত দাও’ – এ ভোগসর্বস্ব শোষণমূলক নীতি মানুষকে ভারবাহী গাধার মত আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেছে।
- আর এভাবেই মানুষ অর্থনৈতিক শোষণের দাসে পরিণত হয়েছে।
- তাই ইসলামের মধ্যমপন্থী ন্যায্য ও জবাবদিহিমূলক অর্থনৈতিক নীতিমালা একটি উৎকৃষ্ট বিকল্প জীবন ব্যবস্থার সহায়ক হতে পারে।
ইসলামের অর্থনৈতিক নীতির বৈশিষ্ট্যসমূহের সার সঙ্কেপ:
- ইসলাম সহজ–সরল ও মধ্যমপন্থী জীবন ব্যবস্থা অনুমোদন করে।
- এ লক্ষ্যে ইসলাম ন্যায়ভিত্তিক ও ভারসাম্যপূর্ণ একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থার প্রবক্তা।
- অপচয়, অপব্যয় ও বিলাসবহুল জড়বাদী জীবন বা পাশব জীবন যাপন ইসলাম সমর্থন করে না।
- ইসলাম মিতাচার ও মধ্যমমানের জীবন–যাত্রাকে প্রাধান্য দেয়, অন্যদিকে অমিতাচার ও কার্পণ্যকে অপছন্দ করে।
- আল্লাহর নিয়ামতের অপচয় ও প্রাকৃতিক সম্পদের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার ইসলাম নিরুৎসাহিত করে এবং জনকল্যাণে এসবের সদ্ব্যয় কামনা করে। কারণ প্রাকৃতিক সম্পদের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার পরিবেশ দূষণ করে, প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট করে, বিপর্যয় সৃষ্টি করে ও জনজীবনে দুর্ভোগ বয়ে আনে।
- ইসলামে প্রতিটি মানুষকে আল্লাহর নিয়ামত ভোগ এবং তার ধন–সম্পদ উপার্জন ও ব্যয়ের ব্যাপারে অল্লাহর নিকট জবাবদিহি করতে হবে।
- জীবিকা অর্জনের ক্ষেত্রে সকলের সমান সুযোগ ইসলাম নিশ্চিত করে।
- ইসলাম ধনীর সম্পদে গরীবের অধিকারকে স্বীকৃতি দেয় এবং ধনীর জন্যা যাকাত প্রদান বাধ্যতামূলক করা হয়েছে যাতে গরীব, অভাবগ্রস্ত ও দুঃস্থ মানুষ অর্থনৈতিক নিরাপত্তা লাভ করে।
- ইসলামে গরীবের মৌলিক চাহিদা পূরণের জন্য ‘বাইতুল মাল’ বা সরকারী কোষাগার থেকে ভাতা প্রদানের ব্যবস্থা করে থাকে।
- হালাল উপার্জনকে ইসলাম ইবাদত হিসেবে গণ্য করে।
- ইসলাম লাভ–লোকসানের ভিত্তিতে সৎ ও হালাল ব্যবসা অনুমোদন করে। ব্যবসায়ে প্রতারণা, শপথভঙ্গ, পণ্যে ভেজাল, ওজন ও মাপে হেরফের, মুনাফাখুরী, ইত্যাদি দুর্নীতিমূলক অপকর্ম ইসলামে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
- শোষণের হাতিয়ার সুদকে ইসলাম নিষিদ্ধ ও পাপ বলে গণ্য করে এবং সুদমুক্ত ঋণ প্রদানকে প্রাধান্য দেয়।
- ইসলাম সুনির্দিষ্ট হারে উত্তরাধিকার সম্পদের ভাগ–বাটোয়ারার মাধ্যমে সম্পদের ন্যায্য বন্টন নিশ্চিত করে।
- সম্পদ কিছু লোকের হাতে পুঞ্জীভূত হওয়া ইসলামের নীতি নয়, বরং অতিরিক্ত সম্পদ যাকাত, দান–খয়রাত, ওসীয়ত ও ওয়াকফের মাধ্যমে বিলিবন্টনের তাগিদ দেয়।
অর্থনৈতিক নীতি ও জীবিকা সম্পর্কিত আয়াতসমূহ:
♥ “আর পৃথিবীতে এমন কোন বিচরণশীল জীব নেই, যার জীবিকার দায়িত্ব আল্লাহর ওপর নেই। ……..” (সূরা হুদ, ১১:৬)
♥ “যদি আল্লাহ তাঁর সকল বান্দাকে প্রচুর রিযিক দিতেন, তবে তারা পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করত। কিন্তু তিনি যে পরিমাণ ইচ্ছা সে পরিমাণ (জীবিকা) নাযিল করেন। নিশ্চয় তিনি তাঁর বান্দাদের সম্যক খবর রাখেন ও সবকিছু দেখেন।” (সূরা আশ–শুরা, ৪২:২৭)
♥“তারা কি আপনার পালনকর্তার রহমত বণ্টন করে? আমি তাদের মধ্যে তাদের জীবিকা বণ্টন করেছি পার্থিব জীবনে এবং একের মর্যাদাকে অপরের উপর উন্নীত করেছি, যাতে একে অপরকে সেবকরূপে গ্রহণ করে। তারা যা সঞ্চয় করে, আপনার পালনকর্তার রহমত তদপেক্ষা উত্তম।” (সূরা যুখরুফ, ৪৩:৩২)
♥ “হে ঈমানদারগণ! তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না। কেবলমাত্র তোমাদের পরস্পরের সম্মতিক্রমে যে ব্যবসা করা হয় তা বৈধ ……।” (সূরা নিসা, ৪:২৯)
♥ “তিনিই উদ্যানসমূহ সৃষ্টি করেছেন …… এসব যখন ফলবান হয় তখন এগুলোর ফল–ফসল খাও ও প্রাপ্য হক দান করো ফসল তোলার সময়ে এবং অপব্যয় করো না। নিশ্চয় তিনি অপব্যয়ীদেরকে পছন্দ করেন না।” (সূরা আন’আম, ৬:১৪১)
♥ “তুমি একেবারে ব্যয়–কুণ্ঠ হয়োনা এবং একেবারে মুক্ত হস্তও হয়ো না। তাহলে তুমি তিরস্কৃত, নিঃস্ব হয়ে বসে থাকবে।” (সূরা বনি ইসরাঈল, ১৭:২৯)
ভারসাম্যপূর্ণ ও ন্যায্য বণ্টন নীতিমালা
ইসলামের সম্পদের বণ্টন নীতিমালাও ভারসাম্যপূর্ণ ও ন্যায্য এবং সম্পদ বন্টনের বিধানসমূহ সম্পূর্ণ ইনসাফের ওপর প্রতিষ্ঠিত। মানুষের চাহিদা লাগামহীন – তাই ইসলাম একে এক যৌক্তিক কাঠামোর ওপর দাঁড় করিয়েছে।
- যাদেরকে মহান আল্লাহ প্রচুর জীবনোপকরণ দিয়েছেন সেটা তাদের জন্য এক পরীক্ষা।
- তিনি চান, তারা যেন নিজেরা তা ভোগ করে, তাঁর শুকরিয়া আদায় করে এবং উদ্বৃত্তাংশ থেকে গরীব, দুঃখী ও অবাবগ্রস্তদেরকে দান করে।
- যথেচ্ছভাবে নয়, ন্যায্যতার ভিত্তিতে সবাই জীবিকা আহরণ ও ভোগ করলে সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়।
তাই আল্লাহ্ বৈধ আয় ও ন্যায্য বন্টনের একটি সুস্পষ্ট বিধি–বিধান জারী করেছেন যাতে মানুষ ন্যায্যতার ভিত্তিতে তাঁর প্রদত্ত নিয়ামত ভোগ করতে পারে। সম্পদ শুধু নিজের বেহিসেবী ভোগ ও বিলাসব্যসনের জন্য আল্লাহ্ কাউকে দেননি।
- এ সম্পদে রয়েছে আত্মীয়–স্বজন ও অবাবগ্রস্তদের জন্যেও সুনির্দিষ্ট অধিকার।
- ইসলামে হালাল উপার্জনের উর্দ্ধ–সীমা নির্ধারিত না থাকলেও বন্টনের যৌক্তিক নীতিমালার কারণে সম্পদ পুঞ্জীভূত হওয়ার সুযোগ থাকে না।
- এই নীতিমালা প্রয়োগের ফলে সম্পদ শুধুমাত্র বিত্তশালীদের হাতে কুক্ষিগত হতে পারে না।
- গরীব–নিঃস্ব, অসহায়, অভাবগ্রস্তদের সবাইকে ধনীর সম্পদে অধিকার দান করা হয়েছে।
- গরীবকে তার হক থেকে বঞ্ছিত রেখে সম্পদের অপচয় ও অপব্যবহার একটি অতি গর্হিত কাজ।
এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ বলেন:
♥ “আত্মীয়–স্বজনকে তার হক দান কর এবং অভাবগ্রস্ত ও মুসাফিরকেও। এবং কিছুতেই অপব্যয় করোনা। নিশ্চয় অপব্যয়কারীরা শয়তানের ভাই। শয়তান স্বীয় পালনকর্তার প্রতি অতিশয় অকৃতজ্ঞ।” (সূরাহ বনি ইসরাঈল, ১৭:২৬–২৭)
দারিদ্র বিমোচনে যাকাতের ভূমিকা
যাকাত ইসলামের একটি বাধ্যতামূলক আর্থিক ইবাদত। এর মবধ্যমে দুঃস্থ ও নিঃস্বদের আর্থ–সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে ইসলাম। ইসলামের বিধান মোতাবেক এটা সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত:
- যাকাত ব্যবস্থার মাধ্যমে ধনীর নীট সম্পদের (ন্যায্য খরচ বাদে অবশিষ্ট সম্পদের) ২.৫ শতাংশ প্রতি বছর গরীব জনগোষ্ঠীর মধ্যে বণ্টন করে দিতে হয়।
- রাষ্ট্রীয়ভাবে যাকাত চালু করলে তৃণমূল দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে সম্পদ বণ্টন সুনিশ্চিত হয়।
ইসলামের প্রাথমিক যুগে খোলাফায়ে রাশেদীনের আমলে যাকাতের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার কারণে দারিদ্র্য বিমোচন এতটাই সম্ভব হয়েছিল যে পরবর্তীতে যাকাত গ্রহণের মত অভাবী মানুষ পাওয়া ভার হয়ে পড়েছিল। দারিদ্র বিমোচনে যাকাতের এটাই বিরাট সাফল্য।
এতদসম্পর্কে কুরআনে আল্লাহ্–পাক বলেন:
♥ “যাকাত হল কেবল ফকির, মিসকীন, যাকাত আদায়কারী ও যাদের চিত্ত আকর্ষণ প্রয়োজন তাদের হক এবং তা দাস-মুক্তির জন্যে, ঋণগ্রস্তদের জন্য, আল্লাহর পথে জেহাদকারীদের জন্যে এবং মুসাফিরদের জন্যে, এই হল আল্লাহর নির্ধারিত বিধান। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।” (সূরা তাওবা, ৯:৬০)
♥ “আল্লাহ জনপদবাসীদের কাছ থেকে তাঁর রাসূলকে যা দিয়েছেন, তা আল্লাহর, রাসূলের, তাঁর আত্মীয়–স্বজনের, ইয়াতীমদের, অভাবগ্রস্তদের এবং মুসাফিরদের জন্যে, যাতে ধনৈশ্বর্য্য কেবল তোমাদের বিত্তশালীদের মধ্যেই পুঞ্জীভূত না হয়। রাসূল তোমাদেরকে যা দেন, তা গ্রহণ কর এবং যা নিষেধ করেন, তা থেকে বিরত থাক এবং আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয় আল্লাহ কঠোর শাস্তিদাতা।” (সূরা হাশর, ৫৯:৭)
♥ “আত্মীয়–স্বজনকে তার হক দান কর এবং অভাবগ্রস্ত ও মুসাফিরকেও। এবং কিছুতেই অপব্যয় করোনা। নিশ্চয় অপব্যয়কারীরা শয়তানের ভাই। শয়তান স্বীয় পালনকর্তার প্রতি অতিশয় অকৃতজ্ঞ।” (সূরা বনি ইসরাঈল, ১৭:২–২৭)
♥ “পিতা–মাতা ও আত্মীয়–স্বজনদের পরিত্যক্ত সম্পত্তিতে পুরুষদেরও অংশ আছে এবং পিতা–মাতা ও আত্মীয়-স্বজনদের পরিত্যক্ত সম্পত্তিতে নারীদেরও অংশ আছে; অল্প হোক কিংবা বেশী। এ অংশ নির্ধারিত। সম্পত্তি বন্টনের সময় যখন আত্মীয়–স্বজন, এতীম ও মিসকীন উপস্থিত হয়, তখন তা থেকে তাদের কিছু খাইয়ে দাও এবং তাদের সাথে কিছু সদালাপ করো।” (সূরা নিসা, ৪:৭–৮)
♥ “আল্লাহ তা‘আলা জীবনোপকরণে তোমাদের একজনকে অন্যজনের চাইতে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন। অতএব যাদেরকে শ্রেষ্ঠত্ব দেয়া হয়েছে, তারা তাদের অধীনস্থ দাস–দাসীদেরকে স্বীয় জীবিকা থেকে এমন কিছু দেয় না, যাতে তারা এ বিষয়ে তাদের সমান হয়ে যাবে। তবে কি তারা আল্লাহর নেয়ামত অস্বীকার করে?” (সূরা নহল, ১৬:৭১)
উপার্জন ও ব্যয় সংক্রান্ত দিক–নির্দেশনা
ইসলাম প্রাকৃতিক নিয়ম নির্ভর এক স্বাভাবিক ধর্ম যা উগ্র বিলাসিতা ও সন্যসাব্রত থেকে মুক্ত। তাই ইসলামের পথ সহজ, সরল ও প্রাকৃতিক নিয়মের মতই স্বাভাবিক। ইসলাম মানুষকে তার প্রয়োজন মোতাবেক বৈধ পন্থায় জীবিকা উপার্জন করা এবং তা নিজ ও নিজ–পরিবারের জন্য ব্যয় করার নির্দেশ দেয়।
- মধ্যমপন্থা ও পরিমিতিবোধ হলো ইসলাম ধর্মের প্রধান বৈশিষ্ট্য।
- প্রয়োজনাতিরিক্ত উদ্বৃত্ত সম্পদ থেকে দরিদ্র আত্মীয়–স্বজন ও প্রতিবেশীকে এবং নিঃস্ব ও অভাবগ্রস্ত মানুষকে যাকাত, সাদাকা, ফিতরা দেবে ও দান–খয়রাত করবে এটাই আল্লাহর নির্দেশ।
- কিন্তু ধনিক শ্রেণী গরীবের প্রাপ্য হক প্রদানে অস্বীকৃতি জানিয়ে হঠকারিতা প্রদর্শন করে থাকে। যেনতেন প্রকারে সম্পদ কুক্ষিগত ও পুঞ্জীভূত করা, কার্পণ্য করা ও অপচয় ও অমিতাচার এ ধর্মে নিষিদ্ধ।
- অর্থাৎ আয়–ব্যয়ের ক্ষেত্রে একটি মধ্যবর্তী পথ বেছে নিতে আল্লাহ্ অনুমোদন করেছেন।
- সম্পদ শুধু নিজের বেহিসেবী ভোগের জন্যই আল্লাহ্ কাউকে দেননি, এ সম্পদে রয়েছে আত্মীয়–স্বজন ও অভাবগ্রস্তদের জন্যেও সুনির্দিষ্ট অধিকার।
হক (অধিকার) আদায় উপর গুরুত্বারোপ
সবার প্রাপ্য হক আদায় করার তাগিদ দিয়ে আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন বলেন:
♥ “আত্মীয়–স্বজনকে তার হক দান কর এবং অভাবগ্রস্ত ও মুসাফিরকেও। এবং কিছুতেই অপব্যয় করো না। নিশ্চয় অপব্যয়কারীরা শয়তানের ভাই। শয়তান স্বীয় পালনকর্তার প্রতি অতিশয় অকৃতজ্ঞ।”
♥ “এবং তোমার পালনকর্তার করুণার প্রত্যাশায় অপেক্ষামান থাকাকালে যদি কোন সময় তাদেরকে বিমুখ করতে হয়, তখন তাদের সাথে নম্রভাবে কথা বল।”
♥ “তুমি একেবারে ব্যয়–কুষ্ঠ হয়োনা এবং একেবারে মুক্ত হস্তও হয়ো না। তাহলে তুমি তিরস্কৃত, নিঃস্ব হয়ে বসে থাকবে।”
♥ “নিশ্চয় তোমার পালকর্তা যাকে ইচ্ছা অধিক জীবনোপকরণ দান করেন এবং তিনিই তা সংকুচিতও করে দেন। তিনিই তাঁর বান্দাদের সম্পর্কে ভালোভাবে অবহিত – সব কিছু দেখছেন।”
♥ “দারিদ্রের ভয়ে তোমাদের সন্তানদেরকে হত্যা করো না। তাদেরকে এবং তোমাদেরকে আমিই জীবনোপকরণ দিয়ে থাকি। নিশ্চয় তাদেরকে হত্যা করা মারাত্মক অপরাধ।”
(সূরা বনি ইসরাঈল, ১৭:২৬–৩১)
♥ “তোমরা অন্যায়ভাবে একে অপরের সম্পদ ভোগ করো না। এবং জনগণের সম্পদের কিয়দংশ জেনে–শুনে পাপ পন্থায় আত্মসাৎ করার উদ্দেশে শাসন কর্তৃপক্ষের হাতেও তুলে দিও না।” (সূরা বাক্বরাহ, ২:১৮৮)
♥ “হে ঈমানদারগণ! তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না। কেবলমাত্র তোমাদের পরস্পরের সম্মতিক্রমে যে ব্যবসা করা হয় তা বৈধ। ………।” (সূরা নিসা, ৪:২৯)
♥ “আর তোমরা আকাঙ্খা করো না এমন সব বিষয়ে যাতে আল্লাহ্ তোমাদের একের উপর অপরের শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন। পুরুষ যা অর্জন করে সেটা তার অংশ এবং নারী যা অর্জন করে সেটা তার অংশ। আর আল্লাহর কাছে তাঁর অনুগ্রহ প্রার্থনা কর। নিঃসন্দেহে আল্লাহ্ সর্ব বিষয়ে জ্ঞাত।” (সূরা নিসা, ৪:৩২)
♥ “মানুষের (অনৈতিক ও অন্যায্য) কৃতকর্মের দরুন স্থলে ও জলে বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়েছে। আল্লাহ তাদেরকে তাদের কর্মের শাস্তি আস্বাদন করাতে চান, যাতে তারা ফিরে আসে।” (সূরা আর রোম, ৩০:৪১)
লেনদেনে ন্যায্যতা
লেনদেনে ন্যায্যতা এবং আমানতদারীর ওপর আল্লাহ্ তায়ালা সবিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। দুর্নীতির মাধ্যমে যেনতেন প্রকারে আয় ও ব্যয় ইসলাম কোনভাবেই সমর্থন করে না। অবৈধ পন্থায় উপার্জনের প্রবণতা সমাজ ও রাষ্ট্রে অশান্তি ও দুর্নীতির সৃষ্টি করে। হালাল পন্থায় পরিশ্রমলব্ধ উপার্জনই ইসলাম অনুমোদন করে।
- হারাম উপার্জনের অর্থে যারা জীবন-জীবিকা নির্বাহ করে তাদের ইবাদত–বন্দেগীও আল্লাহতায়ালার নিকট গ্রহণযোগ্য নয়।
- ওজন ও মাপে কম দেওয়া, প্রতারণা, জালিয়াতি, যুলুম, কার্পণ্য, লুন্ঠন, মজুতদারী, মুনাফাখোরী, ফটকাবাজি, মদ, জুয়া, সুদ, ঘুষ, ভেজাল, আমানতের খেয়ানত, ইত্যাদি অবৈধ পন্থায় উপার্জনকে ইসলাম সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে।
- অধিক লাভের আশায় নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য চল্লিশ দিনের বেশী মজুত রাখাও পবিত্র হাদীসে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কেননা এগুলো সামগ্রিকভাবে মানুষের জন্য ক্ষতিকর এবং অকল্যাণ বয়ে আনে।
এতদসংক্রান্ত আয়াতগুলো নীচে বর্ণিত হলো:
♥ “……. ন্যায়নিষ্ঠার সাথে ঠিকভাবে পরিমাপ কর ও ওজন দাও এবং লোকদের জিনিসপত্রে কোনরূপ ক্ষতি করো না, আর পৃথিবীতে ফাসাদ করে বেড়াবে না। আল্লাহ প্রদত্ত উদ্বৃত্ত তোমাদের জন্য উত্তম, যদি তোমরা ঈমানদার হও, আর আমি তো তোমাদের উপর সদা পর্যবেক্ষণকারী নই।” (সূরা হুদ, ১১:৮৫–৮৬)
♥ “যারা মাপে কম করে, তাদের জন্যে দুর্ভোগ, যারা লোকের কাছ থেকে যখন মেপে নেয়, তখন পূর্ণ মাত্রায় নেয় এবং যখন লোকদেরকে মেপে দেয় কিংবা ওজন করে দেয়, তখন কম করে দেয়। তারা কি চিন্তা করে না যে, তারা পুনরুত্থিত হবে – সেই মহাদিবসে।” (সূরা মুতাফফেফিন, ৮৩:১–৫)
ঋণের লেনদেন সংক্রান্ত দিক–নির্দেশনা
ইসলাম ঋণের পারস্পরিক লেন–দেনের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতায় বিশ্বাসী। তাই আল্লাহ্ তায়ালা ঋণের লেন–দেনের ক্ষেত্রে নির্ধারিত সময়, সুস্পষ্ট শর্তাবলী ও স্বাক্ষীসহ লিখিত চুক্তিপত্রের নির্দেশনা দিয়েছেন যাতে ঋণ নিষ্পত্তির সময় কোন জটিলতার সৃষ্টি না হয়। নিম্নোক্ত আয়াতটিতে তা বর্ণিত হয়েছে:
♥ “হে মু’মিনগণ! যখন তোমরা কোন নির্দিষ্ট সময়ের জন্যে ঋণের আদান–প্রদান কর, তখন তা লিপিবদ্ধ করে নাও এবং তোমাদের মধ্যে কোন লেখক ন্যায়সঙ্গতভাবে তা লিখে দেবে; লেখক লিখতে অস্বীকার করবে না। আল্লাহ তাকে যেমন শিক্ষা দিয়েছেন, তার উচিত তা লিখে দেয়া। এবং ঋণগ্রহীতা যেন লেখার বিষয় বলে দেয় এবং সে যেন স্বীয় পালনকর্তা আল্লাহকে ভয় করে এবং লেখার মধ্যে বিন্দুমাত্রও বেশ কম না করে। অতঃপর ঋণগ্রহীতা যদি নির্বোধ হয় কিংবা দুর্বল হয় অথবা নিজে লেখার বিষয়বস্তু বলে দিতে অক্ষম হয়, তবে তার অভিভাবক ন্যায়সঙ্গতভাবে লিখাবে। দুজন সাক্ষী কর, তোমাদের পুরুষদের মধ্যে থেকে। যদি দুজন পুরুষ না হয়, তবে একজন পুরুষ ও দুজন মহিলা। ঐ সাক্ষীদের মধ্য থেকে যাদেরকে তোমরা পছন্দ কর যাতে একজন যদি ভুলে যায়, তবে একজন অন্যজনকে স্মরণ করিয়ে দেয়। যখন ডাকা হয়, তখন সাক্ষীদের অস্বীকার করা উচিত নয়। তোমরা এটা লিখতে অলসতা করোনা, তা ছোট হোক কিংবা বড়, নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত। এ লিপিবদ্ধ করণ আল্লাহর কাছে সুবিচারকে অধিক কায়েম রাখে, সাক্ষ্যকে অধিক সুসংহত রাখে এবং তোমাদের সন্দেহে পতিত না হওয়ার পক্ষে অধিক উপযুক্ত। কিন্তু যদি কারবার নগদ হয়, পরস্পর হাতে হাতে আদান–প্রদান কর, তবে তা না লিখলে তোমাদের প্রতি কোন অভিযোগ নেই। তোমরা ক্রয়–বিক্রয়ের সময় সাক্ষী রাখ। কোন লেখক ও সাক্ষীকে ক্ষতিগ্রস্ত করো না। যদি তোমরা এরূপ কর, তবে তা তোমাদের পক্ষে পাপের বিষয়। আল্লাহকে ভয় কর তিনি তোমাদেরকে শিক্ষা দেন। আল্লাহ সব কিছু জানেন।” (সূরা বাক্বারাহ, ২:২৮২)
♥ “আর তোমরা যদি প্রবাসে থাক এবং কোন লেখক না পাও তবে বন্ধকী বস্তু হস্তগত রাখা উচিত। যদি একে অন্যকে বিশ্বাস করে, তবে যাকে বিশ্বাস করা হয়, তার উচিত অন্যের প্রাপ্য পরিশোধ করা এবং স্বীয় পালনকর্তা আল্লাহকে ভয় কর! তোমরা সাক্ষ্য গোপন করো না। যে কেউ তা গোপন করবে, তার অন্তর পাপপূর্ণ হবে। তোমরা যা কর, আল্লাহ সে সম্পর্কে খুব জ্ঞাত।” (সূরা বাক্বারাহ, ২:২৮৩)
সুদ ও ব্যবসা সংক্রান্ত দিক–নির্দেশনা
ইসলাম ব্যবসাকে হালাল করেছে, কারণ ব্যবসা লাভ–ক্ষতি সমভাবে ভাগ করে নেয়। সুদ শোষণ ও নির্যাতনের এক বড় হাতিয়ার। এটা কোন পরিশ্রমলব্ধ উপার্জন নয়, সুদে টাকা খাটিয়ে শুধু লাভই আসে, এতে কেউ ক্ষতির ভাগীদার হয় না। তাই ইসলাম সুদকে হারাম বা নিষিদ্ধ করেছে। মহানবী (সা) তাঁর উম্মতকে হুঁশিয়ার করে দিয়ে বলেছেন,
♦ ‘যে কয়টি বিষয়ের জবাবদিহি ব্যতীত কিয়ামতের দিবসে পার পাওয়া যাবে না তার মধ্যে অন্যতম হলো মানুষের সম্পদের হিসাব, অর্থাৎ সম্পদ কিভাবে উপার্জিত হয়েছে ও ব্যয়িত হয়েছে।’
ইসলামের এ উপার্জন নীতিমালা ও জবাবদিহির ভয় যেনতেন প্রকারে সম্পদ কুক্ষিগত করার প্রবণতাকে রোধ করে দেশ ও সমাজে শান্তির পরিবেশ সৃষ্টি করে।
- বিশ্বে প্রচলিত বর্তমান পুঁজিবাদী ও সুদযুক্ত অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় ধনী ও গরীবের অবস্থা এমন যে তারা বিপরীত দুই মেরুর দুই জনগোষ্ঠী।
- তাই আল্লাহ্ তায়ালা সুদকে হারাম করেছেন এবং ব্যবসা ও ‘কর্জে হাসানাকে’ (সুদমুক্ত ঋণ) উৎসাহিত করেছেন।
- ঋণী যদি যথা সময়ে ঋণ পরিশোধে অক্ষম হয় তবে সচ্ছলতা না আসা পর্যন্ত তাকে অবকাশ দানের কথা বলা হয়েছে। একান্ত অপরাগতায় তাকে মাফ করে দিলে তা আল্লাহর নিকট অতি উত্তম বলে বিবেচিত হবে (সূরাহ বাক্বারাহ, ২:২৮০)।
এ সংক্রান্ত আয়াতসমূহ নিম্নে দেওয়া হলো:
♥ “হে ঈমানদারগণ! তোমরা চক্রবৃদ্ধি হারে সুদ খেয়ো না। আর আল্লাহকে ভয় করতে থাক, যাতে তোমরা কল্যাণ অর্জন করতে পারো। এবং তোমরা সে আগুন থেকে বেঁচে থাক, যা কাফেরদের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে।” (সূরা অলে ইমরান, ৩:১৩০–১৩১)
♥ “যারা সুদ খায়, তারা কিয়ামতে দন্ডায়মান হবে, যেভাবে দন্ডায়মান হয় ঐ ব্যক্তি, যাকে শয়তান আছর দ্বারা মোহাবিষ্ট করে দেয়। তাদের এ অবস্থার কারণ এই যে, তারা বলেছে: ক্রয়-বিক্রয় ও তো সুদ নেয়ারই মত! অথচ আল্লাহ্ তা‘আলা ক্রয় – বিক্রয় বৈধ করেছেন এবং সুদ হারাম করেছেন। অতঃপর যার কাছে তার পালনকর্তার পক্ষ থেকে উপদেশ এসেছে এবং সে বিরত হয়েছে, পূর্বে যা হয়ে গেছে, তা তার। তার ব্যাপার আল্লাহর উপর নির্ভরশীল। আর যারা পুনরায় সুদ নেয়, তারাই দোযখে যাবে। তারা সেখানে চিরকাল অবস্থান করবে। আল্লাহ তা‘আলা সুদকে নিশ্চিহ্ন করেন এবং দান খয়রাতকে বর্ধিত করেন। আল্লাহ পছন্দ করেন না কোন অবিশ্বাসী পাপীকে।” (সূরা বাক্বারাহ, ২:২৭৫–২৭৬)
♥ “মানুষের ধন-সম্পদে তোমাদের ধন–সম্পদ বৃদ্ধি পাবে, এই আশায় তোমরা সুদে যা কিছু দাও, আল্লাহর কাছে তা বৃদ্ধি পায় না। পক্ষান্তরে, আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায় পবিত্র অন্তরে যারা দিয়ে থাকে, অতএব, তারাই দ্বিগুণ লাভ করে।” (সূরা আর রোম, ৩০:৩৯)
♥ “যদি খাতক (ঋণী) অভাবগ্রস্ত হয়, তবে তাকে সচ্ছলতা আসা পর্যন্ত সময় দেয়া উচিত। আর যদি ক্ষমা করে দাও, তবে তা খুবই উত্তম যদি তোমরা উপলব্ধি কর।” (সূরা বাক্বারাহ, ২:২৮০)
কর্জে–হাসানা (সুদমুক্ত উত্তম ঋণ)
সুদযুক্ত ঋণের বিপরীতে ইসলাম কর্জে–হাসানা বা সুদমুক্ত উত্তম ঋণকে সমর্থন ও উৎসাহিত করে। কর্জে–হাসানার মূল উদ্দেশ্য হলো:
- অভাবগ্রস্ত মানুষ যাতে সুদমুক্ত সাময়িক ঋণ নিয়ে তার অর্থকষ্ট দূরীভূত করতে পারে।
- এ ধরণের ঋণ সহমর্মীতা ও সৌভ্রাতৃত্বমূলক এবং মহান আল্লাহর নিকট খুবই পছন্দনীয় এবং সাওয়াবের দিক থেকে তা দানের চেয়েওে উত্তম।
- কর্জে–হাসানা আল্লাহকে ধার দেওয়ারই নামান্তর।
এতদসংক্রান্ত আয়াতগুলো নিম্নে উদ্ধৃত করা হলো:
♥ “কে সেই ব্যক্তি, যে আল্লাহকে উত্তম ধার দিবে, এরপর তিনি তার জন্যে তা বহুগুণে বৃদ্ধি করবেন এবং তার জন্যে রয়েছে সম্মানিত পুরস্কার।” (সূরাহ হাদীদ, ৫৭:১১)
♥ “নিশ্চয় দানশীল ব্যক্তি ও দানশীলা নারী, যারা আল্লাহকে উত্তমরূপে ধার দেয়, তাদেরকে দেয়া হবে বহুগুণ এবং তাদের জন্যে রয়েছে সম্মানজনক পুরস্কার।” (সূরাহ হাদীদ, ৫৭:১৮)
ইসলাম কেন মধ্যমপন্থী ধর্ম
প্রতিদিনের নামাযে পবিত্র কুরআনের পুনঃপুনঃ পঠিত প্রথম সূরা ফাতিহা’র একটি আয়াতে ‘সিরাতুল মুস্তাকীম’ অর্থাৎ সহজ–সরল পথে চলার প্রার্থনা করতে বলা হয়েছে। এ সহজ–সরল পথটিই হলো মধ্যমপন্থা।
ইসলাম–পূর্ব যুগগুলোতেও অনেক ধর্মের আবির্ভাব ঘটেছিল। কালের বিবর্তনে সেসব ধর্ম বিকৃতির কবলে পড়ে তাদের মৌলিক চরিত্র ও যুগোপযোগিতা হারিয়ে ফেলে। এ পরিস্থিতিতে একটি পূর্ণাঙ্গ, সার্বজনীন ও শাশ্বত ধর্মের প্রয়োজনকে সামনে রেখেই ইসলামের আবির্ভাব।
ইসলাম মানুষের স্বভাবগত ধর্ম
সর্বশেষ ধর্ম হিসেবে ইসলাম মানবজাতিকে একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান দিয়েছে, যাতে রয়েছে এ পৃথিবীতে জীবন ধারণের সব রকম দিক–নির্দেশনা। ইসলাম মানুষের স্বভাবগত ধর্ম যাতে জাগতিকতার সাথে রয়েছে আধ্যাত্মিকতার এক অপূর্ব সমন্বয়। জাগতিক প্রয়োজনকে বিবেচনায় রেখে কিভাবে পরজাগতিক মুক্তি আসবে ইসলাম সেই দিকনির্দেশনাই দেয়।
- এ কারণেই ইসলামে যেমন বৈরাগ্যবাদ নেই, তেমনি নেই অতি–ভোগবাদীতা।
- আবার ইসলাম কার্পণ্যকে যেমন নিষেধ করে, তেমনি অমিতব্যয়িতাকে অনুমোদন করে না।
- ইসলাম দানশীলতা ও মিতব্যয়িতকে উৎসাহিত করে।
- ইসলামের এ বাস্তবধর্মীতাই একে এক সরল ও স্বাভাবিক মানবধর্মে পরিণত করেছে।
ইসলামে কোন চরম পন্থা বা বাড়াবাড়ির স্থান নেই
মহান আল্লাহ্ ইসলাম ধর্মে মানুষের ওপর তার সাধ্যাতীত কোন বিধান বা দায়িত্ব চাপিয়ে দেন নাই। বরং তিনি সর্বক্ষেত্রে এমন এক মধ্যমপন্থী নীতি অবলম্বনের তাকিদ দিয়েছেন যাতে নেই কোন চরম পন্থা বা বাড়াবাড়ির স্থান। আল্লাহ্ তাঁর উত্তম নিয়ামতসমূহ তাঁর নির্ধারিত হালাল–হারামের সীমারেখার মধ্যে থেকে ভোগ করার অধিকার মানুষকে দিয়েছেন। এযহেতু তিনি সীমা লঙ্ঘনকারীদেরকে পছন্দ করেন না তাই সীমালঙ্ঘন নিষিদ্ধ করে বলেছেন:
♥ “হে মুমিনগণ, তোমরা ঐসব সুস্বাদু বস্তু হারাম করো না, যেগুলো আল্লাহ তোমাদের জন্য হালাল করেছেন এবং সীমা অতিক্রম করো না। নিশ্চয় আল্লাহ সীমা অতিক্রমকারীদেরকে পছন্দ করেন না। আল্লাহ তা’য়ালা যেসব বস্তু তোমাদেরকে দিয়েছেন, তন্মধ্য থেকে হালাল ও পবিত্র বস্তু খাও এবং আল্লাহকে ভয় কর, যার প্রতি তোমরা বিশ্বাসী।” (সূরা মায়েদাহ, ৫:৮৭–৮৮)।
এটাই প্রমাণ করে, ইসলামের পথ সহজ সরল পথ, এতে নেই কোন বক্রতা ও জটিলতা। আর প্রতিটি মুসলিম তার প্রতিদিনের নামাযে বারবার সরল পথ প্রদর্শনের প্রার্থনা জানায় আল্লাহর দরবারে।
ইসলামের আবির্ভাবের পর থেকে চৌদ্দ শত বছর যাবৎ আল্লাহর কিতাব আল-কুরআন ও আল্লাহর নবী হযরত মুহাম্মদের (সাঃ) মুখ নিঃসৃত বাণী আল-হাদীস এ ধর্মের সমুজ্জ্বল আলোবর্তিকা হিসেবে মানবজাতিকে শান্তির দিক-নির্দেশনা দিয়ে যাচ্ছে। ইসলাম যে একটি শান্তিপূর্ণ মধ্যমপন্থী ধর্ম তা ইসলামের প্রকৃত ইতিহাসের দিকে নজর দিলেই উপলব্ধী করা যাবে।
আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন পবিত্র কুরআনে মুসলমানদেরকে এক সর্বোত্তম ও মধ্যমপন্থী জাতির মর্যাদায় অভিষিক্ত করে বলেন,
♥ “তোমরাই (এই দুনিয়ায়) সর্বোত্তম জাতি, সমগ্র মানব জাতির (কল্যাণের) জন্যই তোমাদের সৃষ্টি করা হয়েছে। (তোমাদের দায়িত্ব হচ্ছে) তোমরা দুনিয়ার মানুষদেরকে সৎ কাজের আদেশ দেবে এবং অসৎ কাজ থেকে বিরত রাখবে, নিজেরাও তোমরা আল্লাহর ওপর (পুরোপুরি) ঈমান আনবে (সূরা আলে ইমরান, ৩:১১০)।“
♥ “এমনিভাবে আমি তোমাদেরকে মধ্যপন্থী সম্প্রদায় করেছি যাতে করে তোমরা সাক্ষ্যদাতা হও মানবমন্ডলীর জন্যে এবং যাতে রাসূল সাক্ষ্যদাতা হন তোমাদের জন্য।” …… (সূরাহ বাক্বারাহ, ২:১৪৩)
কেন এ মধ্যমপন্থার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে
আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন পছন্দ করেন মধ্যমপন্থা। তাই তিনি তাঁর অনুগত বান্দাদেরকে মধ্যমপন্থা অবলম্বন করতে বলেছেন ও বাড়াবাড়ি বর্জনের তাগিদ দিয়েছেন। দুনিয়াদারি সম্পূর্ণ পরিত্যাগ করে শুধুমাত্র আখিরাত ও ইবাদত–বন্দেগী নিয়ে ব্যস্ত থাকতে তিনি নিষেধ করেছেন।
♣ দুনিয়া ও আখিরাতের মধ্যে ভারসাম্য বজায রেখে জীবন যাপন করা
দুনিয়া ও আখিরাতের ভারসাম্য রক্ষার্থে মহান আল্লাহ তায়ালা তাঁর বান্দা–-বান্দীদের এই দোয়া করতে বলেছেন:
♥ “….. হে আমাদের পালনকর্তা ! আমাদিগকে দুনিয়াতেও কল্যাণ দান করুন এবং আখিরাতেও কল্যাণ দান করুন এবং আমাদিগকে দোযখের আযাব থেকে রক্ষা করুন।” (সূরা বাক্বারাহ, ২:২০১)
♣ হালাল–হারামের সীমা রেখার মধ্যে থেকে আল্লাহ প্রদত্ত দুনিয়ার নিয়ামতরাশি ভোগ করা ইসলামে সম্পূর্ণরূপে বৈধ।
♥ “হে মুমিনগণ, তোমরা ঐসব সুস্বাদু বস্তু হারাম করো না, যেগুলো আল্লাহ তোমাদের জন্য হালাল করেছেন এবং সীমা অতিক্রম করো না। নিশ্চয় আল্লাহ সীমা অতিক্রমকারীদেরকে পছন্দ করেন না। (সূরা মায়েদাহ, ৫:৮৭))
♣ দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী জীবনে ঈমান ও নেক আমল সম্বলিত এই মধ্যমপন্থা অবলম্বনের মাধ্যমে আখিরাতের চিরস্থায়ী ও অফুরন্ত নিয়ামতের অধিকারী হওয়া যাবে।
♥ “অতঃপর আল্লাহ্ তা’আলা এই নেক বান্দাদেরকে দুনিয়ার জীবনেও ভালো প্রতিফল দিয়েছেন এবং পরকালীন জীবনেও তিনি তাদের জন্য সুন্দর পুরস্কারের ব্যবস্থা করে রেখেছেন। আল্লাহ্ তা’আলা নেককার বান্দাদের ভালবাসেন।” (সূরা আলে ইমরান, ৩:১৪৮)।
♣ ইসলাম যেমন বৈরাগ্যবাদ সমর্থন করে না, তেমনি দুনিয়ার প্রতি মাত্রাতিরিক্ত আসক্তিকেও নিষেধ করে। ইসলাম এ দু’য়ের মধ্যে একটা ভারসাম্যাবস্থা এনেছে।
♥ “আল্লাহ্ তোমাদেরকে যা দিয়েছেন তা দিয়ে তোমরা পরকালের আবাস খোঁজ কর, কিন্তু ইহকাল থেকে তোমার অংশের কথা ভুলে যেও না। …” (সূরা আল কাসাস, ২৮:৭৭)
♣ তাই একজন মুসলিমের নীতি হলো জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ভারসাম্য বজায় রাখা, কোনরূপ বাড়াবাড়ি না করা, দুনিয়ার প্রতি চরম আসক্তি বা নিরাসক্তি না থাকা — অর্থাৎ মধ্যমপন্থা অবলম্বন করা।
♥ “যে কেউ দুনিয়ার কল্যাণ কামনা করবে, তার জেনে রাখা প্রয়োজন যে, দুনিয়া ও আখিরাতের (উভয় কালের) কল্যাণ আল্লাহরই নিকট রয়েছে। আর আল্লাহ সব কিছু শুনেন ও দেখেন।” (সূরা নিসা, ৪:১৩৪)
ইসলামে মধ্যমপন্থা ন্যায়নীতির সাথে সম্পৃক্ত যা প্রতিটি ক্ষেত্রে সুবিচার ও ন্যায়সঙ্গত আচরণ নিশ্চিত করে। ইসলামের নবী (সা) এর জীবনাচরণও ছিল মধ্যমপন্থী এবং সবার জন্য আদর্শ।
নিম্নোক্ত সহীহ হাদীসে এর ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে:
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর (রা) বলেন,
♦ “রাসূলুল্লাহ্ (সা) আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, হে আব্দুল্লাহ, আমাকে জানানো হয়েছে যে, তুমি প্রতিদিন রোজা রাখ এবং সারা রাত ইবাদত কর।’ আমি বললাম, ‘হে আল্লাহর রাসূল, অবশ্যই আমি তা করি।’ রাসূল (সা) বললেন, ‘এরূপ করবে না। রোজা ভেঙ্গে ভেঙ্গে রাখ আর রাতে ইবাদত কর এবং ঘুমাও। নিশ্চয়ই, তোমার উপর তোমার শরীরের হক আছে, তোমার উপর তোমার চোখের হক আছে এবং তোমার স্ত্রীর তোমার উপর হক আছে।” (সহীহ বুখারী, ৪৯০৩)।
অপর এক সহীহ হাদীসে হযরত সালমান ফারসী (রা) উদ্ধৃত করেন, রাসূল (সা) বলেছেন,
♦ “তোমাদের প্রভুর প্রতি তোমাদের দায়িত্ব রয়েছে, তোমাদের শরীরের প্রতি তোমাদের দায়িত্ব আছে, তোমাদের পরিবারের প্রতি তোমাদের দায়িত্ব আছে, সুতরাং প্রত্যেকের প্রতি তোমার দায়িত্ব পালন কর।” (সহীহ বুখারী, ১৮৬৭)
উপরোক্ত আলোচনা এটাই প্রমাণ করে যে, ইসলামের অনুসৃত মধ্যমপন্থা সংঘাতয় বিশ্ব ও বিপন্ন মানবতার জন্য এক বিরাট আশীর্বাদস্বরূপ।