এ অধ্যায়ের বিষয়সমূহ
Toggleইয়াসরিবের হজ্জ্বযাত্রীদের মধ্যে দ্বীনের প্রচার
প্রতি বছর হজ্জ্ব মওসূমে নবী করীম (সাঃ) ইসলাম ধর্ম প্রচারের কাজ চালিয়ে যেতেন। আরব–রীতি অনুযায়ী এ মওসূমটি ছিল সম্মানিত ও পবিত্র এবং একে সব ধরনের হানাহানি ও অশান্তি থেকে নিরাপদ রাখা হতো। বহিরাগত হজ্জ্বযাত্রীদের মধ্যে দ্বীনের দাওয়াত দিতে গিয়ে নবীজী (সাঃ) সাক্ষাৎ পেলেন ৬ জনের একটি কাফেলার সাথে যারা মক্কা থেকে প্রায় ৪৫০ মাইল দূরের জনপদ ইয়াসরিব (বর্তমান মদীনা) থেকে আগত। মক্কার সন্নিকটে ”আকাবা” নামক স্থানে অতি গোপনে তাদের সাথে তিনি সাক্ষাৎ করেন। ইয়াসরিবে বসবাসরত আওস ও খাযরাজ গোত্র এবং ইহুদীদের মধ্যে দ্বন্দ–সংঘাত লেগেই থাকত। ইহুদীরা তাদেরকে প্রায় সময়ই হুমকি দিয়ে বলতো, ‘একজন নবীর আগমন অত্যাসন্ন। তাঁর আগমন ঘটলে আমরাই প্রথম তাঁর অনুসারী হব এবং তোমাদেরকে নিশ্চিহ্ন করে দেব।’ তাই ইয়াসরিববাসী একজন নবীর আগমন সম্পর্কে পূর্বাহ্নে অবগত ছিল। আগত এ কাফেলার লোকজনকে নবীজী (সাঃ) ইসলামের দাওয়াত দিলেন। তাঁর কথাবার্তা শুনে তাদের মনে হলো ইনিতো সেই নবী যাঁর ভবিষ্যৎ বাণী করেছিল ইহুদীগণ। তারা তাঁর আহ্বানে সাড়া দিয়ে ইসলাম গ্রহণ করলো। নবীজী (সাঃ) এর হাতে তারা আনুগত্যের শপথ গ্রহণ করলো এবং পরবর্তী বছরে আরও লোকজন নিয়ে আসার ওয়াদা করলো। এ নব্য মুসলিম দলটি ইয়াসরিবে ফিরে গিয়ে একত্ববাদী ধর্ম ইসলাম গ্রহণের সংবাদটি ফলাও করে প্রচার করলে তা প্রতিটি পরিবারের মধ্যে সাড়া ফেলে দেয়। ইহুদীদের মত একত্ববাদী এবং এর চেয়েও উত্তম এক ধর্মের অধিকারী বলে তারা গর্ববোধ করলো।
আকাবার প্রথম বাইয়্যাত
ওয়াদা অনুযায়ী পরবর্তী হজ্জ্ব মওসূমে অর্থাৎ নবুওতের একাদশ বর্ষে ইয়াসরিবের ১২ জনের একটি দল আকাবায় এসে নবীজী (সাঃ) সাথে গোপনে মিলিত হলো। এ দলের সবাই ইসলাম গ্রহণ করলো এবং একটি শপথ চুক্তি সম্পাদন করলো যা ”আকাবার প্রথম বাইয়্যাত” নামে পরিচিত। এ চুক্তির ধারাগুলো ছিল নিম্নরূপ:
-
আমরা এক ও অদ্বিতীয় আল্লাহ্ তায়ালার উপাসনায়, তাঁর গুণাবলীতে, তাঁর শক্তিমত্তা, ক্ষমতা ও কর্তৃত্বে কাউকে শরীক করবো না।
-
আমরা ব্যভিচার ও অশ্লীলতায় নিজেদেরকে জড়াবো না।
-
আমরা চৌর্যবৃত্তি, ডাকাতি, রাহাজানি ও পরের সম্পদ আত্মসাৎ করবো না।
-
আমরা কাউকে অপবাদ দেবো না বা গীবত (পরনিন্দা) করবো না।
-
সৎ ও ন্যায় কর্মে আমরা আপনার অবাধ্য হবো না।
-
কঠিন হোক বা সহজ হোক, পছন্দ হোক বা অপছন্দ হোক – সর্বাবস্থায় আমরা আপনার অনুসরণ করবো এবং আপনার নির্দেশের বাইরে কোন কিছু করবো না, যদিও তা আমাদের নিজেদের বিপক্ষে যায় ও অন্যের পক্ষে যায়।
-
আমরা যোগ্য ব্যক্তিবর্গ বা কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধাচরণ করবো না।
-
আমরা সত্য ও ন্যায়কে সমর্থন করবো এবং এর পক্ষে সর্বাবস্থায় দৃঢ়তা অবলম্বন করবো।
-
আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে আমরা আমাদের নিজেদের খ্যাতি–অখ্যাতি, সম্মান–অসম্মান বা দোষ–গুণ কোন কিছুকেই ভয় বা পরোয়া করবো না।
শপথ–চুক্তি সম্পাদনের পর নবী করীম (সাঃ) বললেন, ‘যদি তোমরা এ শপথসমূহ পুরোপুরি মেনে চলো তবে তোমরা জান্নাতের অধিকারী হবে, আর যদি ব্যর্থ হও তবে আল্লাহর কঠিন শাস্তির সম্মুখীন হবে। তবে আল্লাহ্ অতীব ক্ষমাশীল ও দয়ালু – সবই তাঁর ইচ্ছাধীন।’ নব্য মুসলমানগণ ইবাদতের নিয়ম–কানুন ও ধর্মীয় বিধি–বিধান শিক্ষা দানের জন্য একজন শিক্ষকের প্রয়োজনীতার কথা নবীজী (সাঃ)-কে জানালে এ কাজের জন্য তিনি বিশিষ্ট সাহাবী হযরত মুসআব বিন উমাইর (রাঃ)-কে তাদের সাথে পাঠালেন। মুসআব (রাঃ) ইয়াসরিব যাওয়ার কয়েক মাসের মধ্যে অনেক লোক পৌত্তলিকতা ছেড়ে ইসলাম গ্রহণ করে। তাঁর ইসলামী শিক্ষা দান সেখানকার আওস ও খাযরাজ উভয় গোত্রের লোকদের মধ্যে দারুণ প্রভাব বিস্তার করে। এ দুই গোত্রের মধ্যে চলমান দীর্ঘ দিনের দ্বন্দ–কলহ পাশ কাটিয়ে তারা শান্তির ধর্ম ইসলামের পতাকা তলে সমবেত হতে শুরু করলো। তারা মুশরিকদের নিপীড়ন–উৎপীড়ন থেকে মুক্ত। পরের বছর তাদের একটি বড় দল মক্কায় হজ্জ্বে যাওয়া ও নবীজী (সাঃ) এর সাথে সাক্ষাৎ করার আগ্রহ ব্যক্ত করলো। পরবর্তী রজব মাসে মুসআব (রাঃ) মক্কায় ফিরে এসে এ খুশী ও সাফল্যের খবর নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-কে জানান। তিনি এ সংবাদে প্রীত ও আশান্বিত হলেন, বুঝতে পারলেন ইয়াসরিবের মাটি ইসলাম প্রচারের জন্য একটি অনুকুল ও উপযুক্ত স্থান।
আকাবার দ্বিতীয় বাইয়্যাত
নবুওতের দ্বাদশ বর্ষে ইয়াসরিবের ৭২ জনের একটি হজ্জ্বযাত্রী দল মক্কায় আগমন করলো। এ দলে ২ জন মহিলাও ছিলেন, তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল নবী করীম (সাঃ) এর সাথে সাক্ষাৎ করা। এ দলে কয়েকজন মুশরিক ব্যক্তিও ছিল। এদের কাছে নবীজী (সাঃ) এর সাথে সাক্ষাতের বিষয়টি সম্পূর্ণ গোপন রাখা হয়েছিল। একটি নির্দিষ্ট রজনীতে প্রতিনিধিদল অতি গোপনে আকাবায় হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর সাথে এক বৈঠকে মিলিত হন। নবীজীর চাচা আব্বাস ইবনে মুত্তালিব তাঁর সঙ্গে আসেন এবং এ বৈঠকে অংশগ্রহণ করেন। যদিও তিনি তখনও ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেননি, তবুও ইয়াসরিবের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভ্রাতুষ্পুত্রের নিরাপত্তার ব্যাপারটি নিশ্চিত করাই ছিল তাঁর এ বৈঠকে আসার উদ্দেশ্য। তিনি ইয়াসরিববাসী মুসলিম প্রতিনিধি দলের কাছে জানতে চান, তাদের আমন্ত্রণে মুহাম্মদ (সাঃ) সেখানে হিজরত করলে শত্রুর মোকাবেলায় তাঁর নিরাপত্তা বিধানের ব্যাপারে তারা কতটুকু দায়িত্ব বহনে সক্ষম অথবা তাদের অপারগতার কারণে কি তাঁকে শত্রুর হাতে তুলে দেওয়া হবে? তিনি আরও বলেন, এরূপ কোন আশঙ্কা থাকলে তাঁর মক্কায় অবস্থান করাকেই তিনি সমীচিন মনে করেন। এর উত্তরে ইয়াসরিবের প্রতিনিধি দল তাঁকে আশ্বস্থ করে বললো, ’আপনার বক্তব্য আমরা অনুধাবন করতে পেরেছি।’ এরপর নবীজী (সাঃ) এর উদ্দেশ্যে তারা বলেন, ‘হে আল্লাহর নবী, আপনার দাবী মোতাবেক যে কোন প্রতিশ্রুতি প্রদানে আমরা সম্পূর্ণ প্রস্তুত আছি। আপনি যা করতে বলবেন আমরা তা–ই করবো।’ নবীজী (সাঃ) বললেন, ‘আমি তোমাদের কাছ থেকে এ শর্তে বাইয়াত নিচ্ছি যে, তোমরা তোমাদের পরিবার–পরিজন ও সন্তান–সন্ততির মতোই আমার নিরাপত্তা বিধান করবে।’ এরপর সবাই হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর হাতে হাত রেখে বাইয়াত করলো এবং অঙ্গীকারাবদ্ধ হলো যে:
‘আমরা সুখে–দুঃখে, বিপদে ও শান্তিতে, সর্বাবস্থায় আপনার অনুগত থাকবো, আপনার নির্দেশ পালনে সদা দৃঢ় পদ থাকবো এবং সর্বদা সত্য প্রচারে কোন বাধা–বিপত্তি পরোয়া করবো না।’
আকাবার এটি হলো দ্বিতীয় বাইয়াত যা ইয়াসরিবের বুকে ইসলামের ভিত্তি প্রতিষ্ঠার দ্বার উম্মোচন করলো। কুরাইশদের ক্রমাগত অত্যাচার ও নির্যাতন–নিপীড়নের মুখে মক্কার মুসলমানগণ পেলো বিকল্প এক নিরাপদ আশ্রয়স্থল। ইয়াসরিববাসীর সুদৃঢ় সমর্থন ইসলামের জন্য ছিল আল্লাহর এক মহা রহমতস্বরূপ।
নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-কে হত্যার সিদ্ধান্ত
মক্কার কুরাইশরা আকাবার শপথ চুক্তির বিষয়টি শীঘ্রই জানতে পারলো। তারা দেখতে পেলো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দলে বিভক্ত হয়ে মুসলিম পরিবারগুলো ইয়াসরিবে চলে যাচ্ছে। তাদের আশঙ্কা হলো, ইয়াসরিব শীঘ্রই মুসলমানদের শক্ত ঘাঁটিতে পরিণত হবে এবং ভৌগলিক অবস্থানের কারণে সিরিয়ার সাথে মক্কার যে বাণিজ্য পথটি রয়েছে তার নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে। তাই তারা মক্কার মুসলমানদের হিজরত বন্ধ করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠলো। পথিমধ্যে হামলা চালিয়ে তারা মুসলমাদের যাত্রাভঙ্গ করতে লাগলো। সর্বোপরি তারা পরিকল্পনা করলো এসবের মূল হোতা নবী মুহাম্মদ (সাঃ)-কে হত্যা করবে। তারা সিদ্ধান্ত নিলো যে, এ কাজে শুধু একজনকে নিয়োজিত না করে সবাই সম্মিলিতভাবে তাঁর উপর আক্রমণ চালাবে যাতে বনু মুত্তালিব ও বনু হাশেম গোত্র হত্যায় অংশগ্রহণকারী সব গোত্রের উপর প্রতিশোধ গ্রহণের সাহস না পায়।
মদীনায় নবী করীম (সা) এর হিজরত
নবুওতের ত্রয়োদশ বর্ষ সমাগত। সার্বিক অবস্থা বিবেচনায় নবী করীম (সাঃ) উপলব্ধী করলেন, মক্কায় তাঁর এবং মুসলমানদের জন্য মোটেও নিরাপদ নয়। তিনি মহান আল্লাহ রব্বুল আলামীনের হিজরতের নির্দেশ প্রাপ্তির জন্য অপেক্ষা করছিলেন। ইতোমধ্যে হযরত আবু বকর (রাঃ) হিজরতের অনুমতি প্রার্থনা করলে তিনি তাঁকেও অপেক্ষা করতে বললেন। তিনি চাচ্ছিলেন আবু বকর (রাঃ) তাঁর হিজরতের সঙ্গী হোন। শীঘ্রই মহান আল্লাহর তরফ থেকে নির্দেশ এসে গেলো। তিনি নবী করীম (সাঃ)-কে কুরাইশদের হত্যা পরিকল্পনার বিষয়টি জানিয়ে দেন এবং হিজরতের অনুমতি প্রদান করেন। নবী করীম (সাঃ) জানতেন কুরাইশরা শীঘ্রই তাঁর ঘরে হানা দেবে এবং তাঁকে না পেয়ে পশ্চাদ্ধাবন করবে। তাই যাওয়ার পূর্বে হযরত আলী (রাঃ)-কে নিজের পরনের চাদর দ্বারা আবৃত করে স্বীয় বিছানায় শায়িত রেখে গেলেন। নবীজী (সাঃ) এর কাছে রক্ষিত মক্কাবাসীর আমানত সামগ্রীও তাঁর নিকট রেখে গেলেন যেন এগুলো তাদের মালিকগণ ফেরত পান।
এদিকে আবু জেহেলের নেতৃত্বে কুরাইশদের হত্যাকারী দলটি নবী গৃহের বাইরে প্রহরারত ছিল যাতে তিনি বেরিয়ে আসা মাত্রই একযোগে তাঁর উপর আক্রমণ চালিয়ে তাঁকে হত্যা করতে পারে। নবী করীম (সাঃ) তাদের অবস্থান টের পেয়ে হাতে এক মুষ্টি ধূলো তাদের দিকে ছুঁড়ে দিলেন। এতে তাদের চোখ ঝাপসা হয়ে গেলো। এ সুযোগে তিনি বেরিয়ে পড়লেন। অপরদিকে আবু বকর (রাঃ) হিজরতের সকল প্রস্তুতি নিয়ে প্রতিরাতে নিজ গৃহের দরজায় মাথা রেখে বিনিদ্র রজনী যাপন করছিলেন কখন নবীজী (সাঃ) তাঁর দরজার কড়া নাড়বেন। অবশেষে প্রতীক্ষার পালা শেষ হলো, সে রাতে দরজার কড়া নড়ে উঠলো। তাঁরা দু’জন অতি সংগোপনে এবং খুবই সতর্কাবস্থায় বেরিয়ে পড়লেন। আবু বকর (রাঃ) দু’টি উট প্রস্তুত রেখেছিলেন যাতে নির্দেশ পাওয়া মাত্র রওয়ানা দিতে পারেন। তিনি ইয়াসরিবের পথ প্রদর্শনের জন্য আব্দুল্লাহ্ ইবনে উরায়কেত নামক একজন অভিজ্ঞ ব্যক্তিকে পারিশ্রমিকের বিনিময়ে নিযুক্ত করেন। যাত্রাপথ নির্ধারণে তাঁরা কৌশলী হলেন। সাধারণ চলাচলের পথ ছেড়ে তাঁরা অপরিচিত পথ ধরলেন এবং সময়ের ক্ষেত্রেও তাঁরা ভিন্ন সময়ে পথ চলতে লাগলেন।
ভোর হওয়া মাত্র কুরাইশরা একযোগে তাঁর গৃহে ঢুকে পড়ে। চাদরাবৃত অবস্থায় শায়িত দেখে তারা তলোয়ার উঁচিয়ে আক্রমণে উদ্যত হলে আবু জেহেল তা কাপুরুষচিত মনে করে তাদেরকে থামিয়ে দিলো। সে সময় অসীম সাহসী বীর হযরত আলী (রাঃ) চাদর সরিয়ে উঠে দাঁড়ান। তাঁকে দেখে কুরাইশরা হতভম্ব হয়ে পড়ে এবং বুঝতে পারে তাদের শিকার হাতছাড়া হয়ে গেছে। তাঁর খোঁজে তৎক্ষণাৎ তারা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। এদিকে নবী করীম (সাঃ) তাঁর সঙ্গী আবু বকর (রাঃ)-কে নিয়ে মক্কার নিকটবর্তী ছওর পর্বতের এক গুহায় আশ্রয় নিলেন। মহান আল্লাহর অসীম রহমতে গুহার মুখে এটি মাকড়সা ঘন জাল বিস্তার করলো। তার উপর আবার একটি কবুতর ডিম পাড়লো। শত্রুর হাত থেকে তাঁদেরকে আড়াল করার জন্য এটি ছিল সর্বশক্তিমান আল্লাহর একটি কৌশল। এ অবস্থায় অনুসন্ধানরত কুরাইশগণ গুহা–মুখের সন্নিকটে চলে আসলো। গুহা থেকে কুরাইশদের কথাবার্তা স্পষ্ট শুনা যাচ্ছিল। আবু বকর (রাঃ) ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়লেন, আর নবীজী (সাঃ) সেই কঠিন মুহূর্তে আল্লাহর দরবারে প্রার্থনারত ছিলেন। প্রার্থনা শেষে তিনি তাঁর সঙ্গীকে বললেন, ‘ভয় পেয়ো না, আল্লাহ্ আমাদের সাথে আছেন।’ গর্ত–মুখের মাকড়সার জালটির অটুট অবস্থা ও তার উপর কবুতরের ডিম পাড়া দেখে কুরাইশরা বিশ্বাস করতে পারলো না এর ভিতরে কেউ প্রবেশ করেছে। তারা গর্তের ভিতরে না ঢুকেই সেখান থেকে প্রস্থান করলে গুহার ভিতরে এক বিরাট স্বস্তি নেমে আসলো। মহান আল্লাহর প্রশংসায় তাঁরা মুখরিত হলেন। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআনের নিম্নোক্ত আয়াতটি অনুধাবনযোগ্য:
إِلَّا تَنصُرُوهُ فَقَدْ نَصَرَهُ اللَّهُ إِذْ أَخْرَجَهُ الَّذِينَ كَفَرُوا ثَانِيَ اثْنَيْنِ إِذْ هُمَا فِي الْغَارِ إِذْ يَقُولُ لِصَاحِبِهِ لَا تَحْزَنْ إِنَّ اللَّهَ مَعَنَا
”যদি তোমরা তাঁকে (রসূলকে) সাহায্য না কর, তবে মনে রেখো, আল্লাহ তাঁর সাহায্য করেছিলেন, যখন তাঁকে কাফেররা বহিষ্কার করেছিল, তিনি ছিলেন দু’জনের একজন, যখন তারা গুহার মধ্যে ছিলেন। তখন তিনি আপন সঙ্গীকে বললেন বিষন্ন হয়ো না, আল্লাহ্ আমাদের সাথে আছেন।….” (৯:৪০)
কুরাইশরা তাদের অনুসন্ধান তৎপরতা চালিয়ে যেতে লাগলো এবং সেই সাথে নবীজী (সাঃ)-কে পাকড়াও করার জন্য এক বিরাট অঙ্কের পুরস্কারও ঘোষণা করলো। এতে যাযাবর সম্প্রদায়ের লোভী প্রকৃতির হিংস্র লোকেরাও পুরস্কার পাওয়ার লোভে তৎপর হয়ে উঠলো। সুতরাং প্রতি পদক্ষেপেই বিপদ অপেক্ষমান ছিল। ছওর গুহায় তিন দিন অবস্থানের পর সেখান থেকে নবীজী (সাঃ) রাতের বেলায় বের হয়ে আসলেন। উট দু’টি নিয়ে পথপ্রদর্শক আব্দুল্লাহ্ ইবনে উরায়কেত হাজির হলো। এ সময় আবু বকর (রাঃ) এর কন্যা আসমা (রাঃ)ও কিছু রসদপত্র নিয়ে সেখানে উপস্থিত হলেন। প্রস্তুতি সম্পন্ন হলে তাঁদের যাত্রা শুরু হলো। মক্কা থেকে ইয়াসরিবের দূরত্ব ২০০ মাইল। দীর্ঘ ও সম্পূর্ণ অপরিচিত পথ ধরে তাঁরা অত্যন্ত সতর্কাবস্থায় চলতে লাগলেন। কিন্তু এত সতর্কতার পরও কোন এক ব্যক্তি তাঁদেরকে দেখে ফেলে। এ লোকটির মাধ্যমে সুরাকা ইবনে মালিক ইবনে জু’শুম খবরটি অবগত হলো। সে পুরস্কারের লোভে একাই সশস্ত্র অবস্থায় তাঁদের পিছু পিছু অগ্রসর হলো। কিন্তু পথিমধ্যে তার ঘোড়ার পাগুলো বালুতে দেবে যাচ্ছিল এবং বারবার হোঁচট খেয়ে পড়ছিলো। অবশেষে ব্যাপারটিকে সে অশুভ লক্ষণ মনে করলো এবং নিজের জীবনাশঙ্কায় পতিত হয়ে সে তাঁর অপকর্ম থেকে বিরত হলো।
প্রখর সূর্য্য–তাপে উত্তপ্ত মরুর পথ–প্রান্তর এবং তারকার মিটিমিটি আলোয় রাতের পথ চলা যেন শেষ হতে চায় না। অপরিসীম ধৈর্য ও কষ্ট সহকারে এবং পথের শ্রান্তি–ক্লান্তি ও ভয়–ভীতি উপেক্ষা করে অবশেষে মক্কা থেকে যাত্রার আট দিন পর নবী করীম (সাঃ) তাঁর সঙ্গীকে নিয়ে ইয়াসরিবের উপকন্ঠে পৌঁছেন। মুহূর্তে তাঁর শুভাগমনের খবর চারদিকে ছড়িয়ে পড়লো। এভাবে ইয়াসরিববাসীর সকল উদ্বেগ, উৎকন্ঠা ও প্রতীক্ষার অবসান ঘটলো। নগরীতে সরাসরি প্রবেশ না করে নবীজী (সাঃ) প্রথমে পার্শ্ববর্তী কুবা নামক এক পল্লীতে যাত্রা বিরতি করেন এবং সেখানে চার দিন অবস্থান করেন। কুবায় তিনি একটি মসজিদের ভিত্তি স্থাপন করেন ও সেখানে নামায আদায় করেন। এবার মদীনাবাসীর শুধু অপেক্ষার পালা কখন তিনি নগরীতে প্রবেশ করেন। প্রতিদিন ভোরে নগরবাসী উঁচু স্থানে দাঁড়িয়ে ও পথ পানে তাকিয়ে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে লাগলো তাঁর আগমন প্রত্যাশায়। অবশেষে সেখান থেকে তিনি নগরীর উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। পথিমধ্যে তিনি জুম’আর নামায আদায় করেন। তাঁর আগমণের রাস্তায় অপেক্ষমান ইয়াসরিববাসী বিপুল উৎসাহ উদ্দীপনায় তাঁকে অভ্যর্থনা জানালো। সকল স্তরের পুরুষ–নারী ও শিশু–তরুণ–বৃদ্ধ তাঁকে এক অভূতপূর্ব প্রাণঢালা সম্বর্ধনা জ্ঞাপন করলো। যারা ইতোমধ্যে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিল অথচ নবী করীম (সাঃ)-কে এখনও স্বচক্ষে দেখেনি তাদের উৎসাহের অন্ত ছিল না।
নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছুতে পেরে নবীজী (সাঃ) মহান আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করলেন। তাঁর আগমণে ধন্য ইয়াসরিব “মদীনাতুন্নবী” নাম ধারণ করলো। সেই থেকে ইয়াসরিব মদীনা নামে পরিচিত হয়ে আসছে। এ ছাড়া নবীজী (সাঃ) এর মদীনায় হিজরতকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য হযরত ওমর (রাঃ) এর খিলাফত কালে ইসলামী বর্ষ হিসেবে “হিজরী” সালের সূচনা হয় ।
নগরীতে প্রবেশের পর নবী করীম (সাঃ)-কে বরণ করার জন্য প্রতিটি গৃহ থেকে আমন্ত্রণ আসতে লাগলো। কিন্তু তিনি কোন বিশেষ গৃহে না গিয়ে নিজের উটটিকে স্বাধীনভাবে চলার জন্য ছেড়ে দিলেন। উটটি স্বেচ্ছায় বিভিন্ন পথ পেরিয়ে একটি পতিত জমিতে বসে পড়লো। খবর নিয়ে জানা গেলো এ জমিটির মালিক সাহল ও সুহায়ল নামক দুই এতীম বালক। যথাযথ মূল্যে তিনি সেটি ক্রয় করার প্রস্তাব করলে তাদের অভিবাবক তাতে সম্মতি দেন। জমিটি ক্রয়ের পর তিনি সেখানে একটি মসজিদ ও নিজ গৃহ নির্মাণের ব্যবস্থা করেন। নিজ গৃহ নির্মাণ–পূর্ব সময়ে তিনি মদীনার বিশিষ্ট ধণাঢ্য ব্যক্তি হযরত আইয়ূব আনসারী (রাঃ) এর গৃহে অবস্থান করেন। সাহাবীবৃন্দের সহায়তায় ও নিজের দৈহিক শ্রমে অত্যন্ত সাদামাটাভাবে নবীর গৃহ ও মসজিদের নির্মাণ কাজ সমাপ্ত হয়। মসজিদটির ছাদের একাংশ তৈরী হয়েছিল খেজুর পাতার ছাউনী দ্বারা আর অপর অংশ ছিল উম্মুক্ত। এ মসজিদটিই হলো বিখ্যাত ”মসজিদে নববী” এবং তৎসংলগ্ন উম্মুল মু’মেনীন আয়েশা (রাঃ) এর বাসগৃহটি হলো নবীজী (সাঃ) এর মাজার শরীফ।