এ অধ্যায়ের বিষয়সমূহ
Toggleমদীনার পার্শ্ববর্তী শত্রু গোত্রগুলোর বিরুদ্ধে অভিযান
নবী করীম (সাঃ) মদীনার মুসলিম শক্তিকে সংহত করতে এবং পার্শ্ববর্তী শত্রু গোত্রগুলোর লুটপাট ঠেকাতে সতর্ক পরিকল্পনা গ্রহণ করলেন। তিনি খবর পেলেন বনী আসাদ গোত্রের নেতৃবৃন্দ ওহুদ যুদ্ধে মুসলমানদের শক্তি খর্ব হয়েছেেএ ধারণাবশত গবাদি পশু ও অন্যান্য মালামাল লুট করার পরিকল্পনা আঁটছে। নবীজী (সাঃ) বিশিষ্ট সাহাবী আবু সালামা (রাঃ) এর নেতৃত্বে ১৫০ জনের একটি বাহিনীকে বনী আসাদ গোত্রের বিরুদ্ধে অভিযানে প্রেরণ করলেন। তিনি নির্দেশ দিলেন অতি সন্তর্পণে এবং আকস্মিকভাবে আক্রমণ পরিচালনা করতে যাতে প্রতিপক্ষ প্রতিরোধের কোন সুযোগ না পায়। আক্রমণ টের পেয়ে আসাদ গোত্রের লোকেরা পলাতে শুরু করে। মুসলিম বাহিনী তাদের পশ্চাদ্ধাবন করে কয়েকজনকে আটক করে এবং তাদের মালামাল জব্দ করে নিয়ে আসে।
হুযালী নামীয় অপর এক গোত্রের আক্রমণ পরিকল্পনার খবর পেয়ে নবীজী (সাঃ) গোপনে তথ্য সংগ্রহের জন্য সাহাবী হযরত আব্দুল্লাহ্ ইবনে উনায়সা (রাঃ)-কে প্রেরণ করেন। তিনি ছদ্মবেশ ধারণ করে হুযালী গোত্রের নেতা খালিদ ইবনে সুফিয়ানের নিকট পৌঁছেন এবং অতর্কিত আক্রমণ চালিয়ে তাকে হত্যা করেন। ফলে তাদের মদীনা আক্রমণের পরিকল্পনা ভেস্তে যায়। এসব অভিযানে একদিকে মুসলমানদের মনোবল বৃদ্ধি পায়, অপরদিকে শত্রুদের ধারণাও ভুল প্রমাণিত হয়।
বনু লিহইয়ান গোত্রের বিশ্বাসঘাতকতার ঘটনা
হুযালী গোত্রের নেতা খালিদ হত্যার প্রতিশোধ নিতে তারা প্রতিবেশী বন্ধু গোত্র বনু লিহইয়ানের নিকট সাহয্য চাইলো। বনু লিহইয়ানের একটি প্রতিনিধি দল মদীনায় এসে প্রতারণাপূর্বক নবীজী (সাঃ)-কে জানালো তাদের গোত্রের লোকজন ইসলাম ধর্ম কবুল করেছে। তাদেরকে পবিত্র কুরআন ও ধর্মীয় হুকুম–আহকাম শিক্ষা দেওয়ার জন্য কয়েকজন মুসলিম শিক্ষক প্রয়োজন। সত্য দ্বীন ইসলাম প্রচারের মাধ্যমে মানুষজনকে হেদায়েতের পথে আনার উদ্দেশ্যে নবীজী (সাঃ) সরল বিশ্বাসে তাদের এ প্রস্তাবে রাজী হলেন। তিনি ছয়জন সাহাবীকে তাদের সঙ্গে পাঠালেন।
বনু লিহইয়ানের প্রতিনিধি দলটি মুসলিম শিক্ষকদেরকে নিয়ে হুযালী গোত্রের কাছাকাছি রাজী নামক স্থানে পৌঁছে ঐ গোত্রের লোকজনকে বেরিয়ে আসার আহ্বান জানায়। সে আহ্বানে তৎক্ষণাৎ সাড়া দিয়ে তারা সেখানে এসেই মুসলিম শিক্ষকদের ঘেরাও করে ফেললো। তাঁরা বিপদ আঁচ করতে পেরে নিজেদের অসি খাপমুক্ত করলেন এবং আত্মরক্ষার প্রস্তুতি নিলেন। হুযালী গোত্রের লোকজন তাঁদেরকে বললো, ‘আমরা তোমাদেরকে হত্যার পরিবর্তে মক্কার কুরাইশদের হাতে সমর্পণ করব।’ তাঁরা দৃঢ়তার সাথে এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বললেন, ‘আমরা তোমাদের সাথে লড়াই করেই প্রাণ দেব।’ এ কথা বলেই তাঁরা উম্মুক্ত তরবারী হাতে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। তাঁদের মধ্যে তিনজন শহীদ হয়ে গেলেন আর বাকী তিনজন বন্দী হলেন।
বন্দীদের নিয়ে মক্কায় যাওয়ার পথে সাহাবী আব্দুল্লাহ্ ইবনে তারিক (রাঃ) কাফেরদের হাত থেকে মুক্ত হয়ে পালাতে শুরু করেন। শত্রুরা তাঁর পশ্চাদ্ধাবন করলে তিনি তরবারী হাতে ঘুরে দাঁড়ান। তারা তাঁর তরবারীর সম্মুখে যাওয়ার পরিবর্তে প্রস্তর নিক্ষেপ করতে শুরু করলো। অবশেষে তিনি তাদের প্রস্তরাঘাতে শহীদ হয়ে যান। অবশিষ্ট দুই মুসলিম বন্দী হযরত যায়েদ ইবনে দাসনা (রাঃ) ও হযরত খোবায়েব (রাঃ)-কে নিয়ে তারা মক্কায় যায়। সেখানে তারা হযরত যায়েদ (রাঃ)-কে বিক্রী করে সাফওয়ান ইবনে উমাইয়ার নিকট। সাফওয়ান বদর যুদ্ধে তার পিতা কুরাইশ নেতা উমাইয়া ইবনে খালফের হত্যাকারী হযরত যায়েদ (রাঃ)-কে ক্রয় করে পিতৃহত্যার প্রতিশোধ গ্রহণার্থে। তাঁকে হত্যা করার জন্য সে তার ক্রীতদাস নাসতাসকে নির্দেশ দেয়।
বধ্যভূমিতে নিয়ে যাওয়ার পথে যায়েদ (রাঃ) এর সাথে কুরাইশ নেতা আবু সুফিয়ানের দেখা হয়। সে তাঁকে জিজ্ঞেস করে, ‘তোমার পরিবর্তে মুহাম্মদ (সাঃ)-কে হত্যা করা হবে আর তুমি নিরাপদে আমাদের সাথে জীবন কাটাতে করতে পারবে – এ প্রস্তাবে রাজী আছ কি?’ তিনি ঘৃণাভরে তার প্রস্তাব নাকচ করে দিয়ে বলেন, ‘আল্লাহর কসম, নবীজী (সাঃ) এর শরীরের একটি পশমের ক্ষতি হোক এমন প্রস্তাব কক্ষণোই আমার কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।’ তাঁর দৃঢ় প্রত্যয়যুক্ত উত্তরে আবু সুফিয়ান আশ্চর্যান্বিত হয়ে বলে উঠে, ‘মুহাম্মদ (সাঃ) এর সহচরবৃন্দের মত এত নিষ্ঠাবান লোক আমি কখনও দেখিনি।‘ নবীজী (সাঃ) এর প্রতি অপরিসীম শ্রদ্ধা ও ভালবাসার পরাকাষ্ঠা দেখিয়ে তিনি শাহাদাত বরণ করেন।
এরপর রইলেন হযরত খোবায়েব (রাঃ)। মক্কার কুরাইশরা তাঁকেও হযরত যায়েদ (রাঃ) এর মত একই রকমের প্রস্তাব দিয়েছিল। তিনিও ঘৃণাভরে তাদের সে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। তাঁকে ফাঁসীতে ঝুলানোর জন্য তারা বধ্যভুমিতে নিয়ে গেলো। তিনি দু’রাকাত নামায পড়ার জন্য তাদের কাছে অনুমতি চাইলেন। তিনি নামায আদায় করে বললেন, ‘আমি নামায দীর্ঘায়িত করিনি কারণ তোমরা মনে করতে পার যে মৃত্যুভয়ে আমি দেরী করছি।’ ফাঁসীর দড়ি পড়ানোর সময় তিনি মহান আল্লাহর দরবারে কাফেরদের অপমানজনক শাস্তি চেয়ে দোয়া করলেন। কাফেররা ভীত হয়ে দ্রুত তাঁর ফাঁসী কার্যকর করে। এভাবে সাহাবীগণ আল্লাহর দ্বীনের স্বার্থে এবং নবীজী (সাঃ) এর প্রতি তাঁদের অকুন্ঠ শ্রদ্ধা ও ভালবাসা সমুন্নত রেখে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছেন। মদীনায় এ মর্মান্তিক বিশ্বাসঘাতকতার ঘটনা ও সাহাবীদের করুণ মৃত্যুর খবর পৌঁছুলে নবী করীম (সাঃ) সহ সকল মুসলমান অত্যন্ত বেদনাহত হয়ে পড়েন।
বী’রে মাওনায় অপর এক বিশ্বাসঘাতকতার ঘটনা
বনু লিহইয়ান গোত্রের বিশ্বাসঘাতকতার ঘটনার পর হিজরী চতুর্থ বর্ষে অনুরূপ আরেকটি বিশ্বাসঘাতকতার ঘটনা ঘটে। নজদ এলাকা থেকে আগত কিলাব গোত্রের সর্দার আবুল বারা নবী করীম (সাঃ) এর সাথে সাক্ষাত করলো। তিনি তাকে ইসলাম গ্রহণের দাওয়াত দিলেন। সে ইসলাম কবুল না করেই বললো, ‘আমিতো ইসলামের শত্রু নই।’ অবশ্য এ গোত্রের সাথে মুসলমানদের মৈত্রী চুক্তি ছিল। সে নবীজী (সাঃ)-কে অনুরোধ করে বললো, ‘আপনি অমার সঙ্গে একটি মুসলিম প্রতিনিধিদল পাঠিয়ে দিন যাতে তাঁরা নজদ অঞ্চলে ইসলাম প্রচার করতে পারেন।’ লিহইয়ান গোত্রের বিশ্বাসঘাতকতার কথা স্মরণ করে তিনি এ প্রস্তাবের কোন উত্তর দিলেন না। কিন্তু গোত্রপতি আবুল বারা বারংবার অনুরোধ জানাতে থাকলো এবং মুসলমানদের নিরাপত্তা দানের ওয়াদা করলো। সে প্রভাবশালী বিধায় কাউকে নিরাপত্তা দিলে তা ভঙ্গ করার সাহস তার গোত্রের অন্য কারোর ছিল না। অবশেষে তার অনুরোধে নবী করীম (সাঃ) হযরত মুনযের (রাঃ) এর নেতৃত্বে মতভেদে সত্তর বা চল্লিশ জনের একটি মুসলিম ধর্মপ্রচারক দল তার সাথে প্রেরণ করলেন। যাত্রকালে তিনি কিলাব গোত্রের পার্শ্ববর্তী বনী আমের গোত্রের সর্দার আমের ইবনে তোফায়েলের নিকট একটি পত্র লিখে দিলেন।
তাঁরা যখন বী’রে মাওনায় পৌঁছান তখন তৎসংলগ্ন বনী আমের গোত্রের সর্দার আমেরের নিকট নবীজী (সাঃ) এর পত্রটি হস্তান্তর করতে হযরত হারাম ইবনে মালহান (রাঃ)-কে পাঠানো হয়। সে তাঁর প্রেরিত পত্রটি পাঠ না করেই পত্রবাহক হযরত হারাম (রাঃ)-কে হত্যা করে ফেলে। একই সাথে সে তার গোত্রের লোকজন ও পার্শ্ববর্তী গোত্রসমূহের লোকজনের সমাবেশ ঘটিয়ে মুসলিম প্রতিনিধিদলটিকে ঘেরাও করে। এতে অবশ্য কিলাব গোত্রের লোকজন অংশ নেয়নি কারণ তাদের গোত্রপতি আবুল বারা মুসলমানদের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিয়েছিল। অবস্থা পরিদৃষ্টে মুসমানগণ আত্মরক্ষার্থে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। কিন্তু কিলাব গোত্রে কেউ এগিয়ে এলো না। ফলে দু’জন ব্যতীত অন্য সবাই শহীদ হয়ে গেলেন। এ দু’জনের মধ্যে হযরত কাআব ইবনে যায়েদ (রাঃ) পালাতে সক্ষম হন এবং মদীনায় ফিরে আসেন। অপরজন হযরত আমর ইবনে উমাইয়া (রাঃ)-কে অন্য কারণে মুক্তি দেওয়া হয়। এ ঘটনায় ক্ষিপ্ত কিলাব গোত্রের নেতা আবুল বারা আমের গোত্রের নেতা আমেরকে হত্যা করে।
হযরত আমর ইবনে উমাইয়া (রাঃ) মদীনা ফেরার পথে কারকারা নামক এক জায়গায় কিলাব গোত্রের দু’জনকে হত্যা করেন। মদীনা ফিরে এসে এ ঘটনা তিনি নবীজী (সাঃ)-কে অবগত করেন। যেহেতু কিলাব গোত্রের সাথে মুসলমানদের মৈত্রী চুক্তি ছিল সেহেতু শর্তানুযায়ী তিনি এ দুই হত্যাকান্ডের রক্তপণ প্রদান করেন। বী’রে মাউনার ঘটনা নবীজী (সাঃ) ও সহচরবৃন্দকে ভীষণভাবে ব্যথিত করে। তাঁরা মহান আল্লাহর দরবারে পরম ধৈর্যধারণ করেন এবং তাঁর কাছে মদদ ভিক্ষা করেন। আল্লাহর দ্বীন প্রচারের স্বার্থে জীবন উৎসর্গকারী এসব সাহাবীগণকে বেহেশতে উচ্চ মর্যাদা দানের জন্য তাঁরা প্রার্থনা করতে থাকেন।
বদর ও ওহুদ যুদ্ধ পরবর্তী মদীনার পরিস্থিতি
হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর নেতৃত্বে মদীনা সনদের মৈত্রী চুক্তির অন্তর্ভুক্ত সকল সম্প্রদায়ের সমন্বয়ে নব্য প্রতিষ্ঠিত মদীনা রাষ্ট্র ছিল একটি শুভ সূচনা। এর দ্বারা আরবের শতধবিভক্ত অনগ্রসর ও কুসংস্কারপূর্ণ জনগোষ্ঠীর উন্নয়নের এক সুবর্ণ সুযোগের দ্বার উন্মোচিত হয়েছিল। ইসলাম ধর্মের সংস্পর্শে এ সম্ভাবনা ছিল খুবই উজ্জ্বল। ইসলামের সহজ সরল জীবন ব্যবস্থা ও মুহাম্মদ (সাঃ) (সাঃ) এর নবীসুলভ গুণাবলীতে মুগ্ধ মদীনাবাসী সাধারণ মানুষের মধ্যে ইসলাম গ্রহণের প্রবণতা বৃদ্ধি পায়। এর ফলে মুসলমানদের প্রভাব–প্রতিপত্তিও বাড়তে থাকে।
মদীনার বুকে স্বল্প সময়ে মুসলিম সমাজের উত্থান অন্যান্য সম্প্রদায়কে ঈর্ষান্বিত করে তোলে। এরই মধ্যে বদর যুদ্ধে মুসলমানদের বিজয় তাদের বিদ্বেষকে আরও বাড়িয়ে দেয়। মদীনার ইহুদী ও মুনাফিক সম্প্রদায়ের সম্মিলিত ষড়যন্ত্র ও প্রচার–প্ররোচনা তুঙ্গে উঠলো। তাদের মধ্যে কিছু কায়েমী স্বার্থান্বেষী মহল ইসলামের সুনাম বিনষ্ট করার চক্রান্তে মেতে উঠে। মক্কার মুশরিক কবিয়ালদের মত ইহুদী কবিয়ালরাও নবী মুহাম্মদ (সাঃ) এর বিরুদ্ধে জঘন্য অপবাদ ও বিদ্বেষপূর্ণ কবিতার আসর জমাতে শুরু করলো। ইহুদী সর্দার কাআব ইবনে আশরাফ ছিল এমনি একজন মুসলিম বিদ্বেষী কবি। আসমা বিনতে মারওয়ান নাম্নী অপর এক মহিলা কবিও যুক্ত হয়েছিল তার সাথে। বিদ্বেষ পোষণের মধ্যেই তাদের কর্মকান্ড থেমে থাকেনি, তারা এমনকি নবীজী (সাঃ)-কে হত্যার ষড়যন্ত্রেও লিপ্ত হলো। প্রথমে পাথর নিক্ষেপ ও পরে খাদ্যে বিষ মিশিয়ে তাঁর জীবন নাশের প্রচেষ্টা চালানো হয়। তাদের এ উভয় প্রচেষ্টাকে আল্লাহ তায়ালা নস্যাৎ করে দিয়ে তাঁর নবীর জীবন রক্ষা করেন। আবার এক ইহুদী স্বর্ণকার একজন মুসলিম নারী–ক্রেতার শ্লীলতাহানির চেষ্টা করে। এভাবে শান্তিপূর্ণ সহ–অবস্থানের পরিবেশ বিষিয়ে উঠে। ফলে সহিংস ঘটনার সূত্রপাত হয়।
মদীনার মুনাফিক ও মুশরিকগণ এবং পার্শ্ববর্তী ইহুদীগণ ওহুদ যুদ্ধে মুসলমানদের বিপর্যয়ে আনন্দিত হয়েছিল। তারা ভেবেছিল এবার মুসলমানদের প্রভাব–প্রতিপত্তি হ্রাস পাবে। তারা নবী করীম (সাঃ)-কে উপহাস করে বলেছিল, ’বদর যুদ্ধে বিজয় যদি হয় তাঁর নবুওতের প্রমাণ তবে ওহুদ যুদ্ধের বেলায় কি?’ এ পরিস্থিতিতে নবী করীম (সাঃ) এসব অপশক্তির মোকাবেলায় মুসলমানদের মধ্যে ঐক্য ও সংহতি গড়ে তোলা অপরিহার্য মনে করলেন। নবীজী (সাঃ) মুখ বোজে এসব অন্যায় আচরণকে প্রশ্রয় দেওয়া সমীচিন মনে করলেন না। তাই মৈত্রী চুক্তি বিরোধী শক্তির বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া তাঁর জন্য জরুরী হয়ে পড়লো।
কুরাইশ-ইহুদী-মুনাফিকদের ষড়যন্ত্র
বদর যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে ইসলামের নবী মুহাম্মদ (সাঃ) ত্রিমুখী ষড়যন্ত্র ও হুমকির সম্মুখীন হলেন। মক্কার পরাজিত কুরাইশ শক্তি পুনরায় মদীনা আক্রমণের জন্য পুরো উদ্যমে শক্তি সঞ্চয় করতে শুরু করলো। মদীনার ইহুদীরা কুরাইশদেরকে উসকানি প্রদান ও তাদেরকে সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিতে লাগলো। মুনাফিক সর্দার আব্দুল্লাহ্ ইবনে উবাই গোপনে ইহুদীদের সাথে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হলো। ইসলাম–বিদ্বেষী ইহুদী বনু কায়নুকা গোত্রের সাথে তার মৈত্রী চুক্তি ছিল। এরা সবাই মদীনায় মুসলিম শক্তির উত্থানে প্রমাদ গোনলো। এদের সবার একই লক্ষ্য মদীনা তথা দুনিয়া থেকে মুসলিম শক্তির উৎখাত। মদীনার মুশরিকরাও এদের সাথে যুক্ত হলো।
ইহুদী সর্দার কাআব ইবনে আশরাফ এতটাই মুসলিম বিদ্বেষী ও উগ্রন্থী ছিল যে সে বদর যুদ্ধে কুরাইশদের পরাজয়ের ঘটনাটি বিশ্বাস করতে পারছিল না। এর সত্যতা যাচাইয়ে সে নিজে তার দলবল নিয়ে মক্কায় যায়। সেখানে সে কিছুদিন অবস্থান করে প্রকৃত ঘটনা অবগত হয় এবং কুরাইশদেরকে তার রচিত কবিতা দিয়ে উত্তেজিত করে ও প্রতিশোধ গ্রহণের উসকানি দেয়। মদীনার ইহুদী বনী নজীর গোত্রও একটি প্রতিনিধিদল মক্কায় প্রেরণ করে। সেই দলের প্রতিনিধি হুয়াই ইবনে আখতাব কুরাইশদেরকে বললো, ’মদীনার বিভিন্ন ইহুদী গোত্রের লোকজন কুরাইশদের সাহার্যার্থে উদ্গ্রীব হয়ে আছে।’ কুরাইশরা জানতো ইহুদীরা কিতাবধারী এবং জ্ঞানী সম্প্রদায়। তাদের মনে এ চিন্তার উদয় হলো – কেন ইহুদীরা একত্ববাদী হয়েও ইসলাম ধর্মের বিরোধীতা করছে? তারা হুয়াই ইবনে আখতাবকে জিজ্ঞেস করলো, ’ইসলাম না পৌত্তলিক – কোন ধর্ম উত্তম?’ উত্তরে সে মিথ্যাচার করে বললো, ‘আপনাদের ধর্মই উত্তম।’
মদীনায় সুস্থ সামাজিক পরিবেশ সৃষ্টির স্বার্থে প্রথমে নবী করীম (সাঃ) নিন্দাবাদ ও বিদ্বেষ ছড়ানোর সাথে যুক্ত দুষ্কৃতিকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলেন। এতে কাআব ও তার সহযোগি আসমা বিনতে মারওয়ানকে হত্যা করা হলো। মুসলিম নারীর শ্লীলতাহানির জন্য ইহুদী স্বর্ণকারেরও একই পরিণতি হলো। দুষ্কৃতিকারীদের বিরুদ্ধে এটি ছিল উচিত শাস্তি। এবার নবী করীম (সাঃ) ইহুদী বনু কায়নুকা গোত্রের নেতৃবৃন্দকে ডেকে মৈত্রী চুক্তির প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে অনুরোধ করলেন। অন্যথায় বদর যুদ্ধে কুরাইশদের পরিণতির কথা তাদেরকে স্মরণ করিয়ে দিলেন। কিন্তু তারা এতে কর্ণপাত না করে বরং নিজেদের শক্তি–সামর্থ্যের কথা বলে দাম্ভিকতা প্রদর্শন করলো এবং নবী (সাঃ) এর প্রতি পাল্টা চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিলো। ফলে তাদের সাথে তাঁর শান্তির সকল প্রয়াস বিনষ্ট হয়ে যায় এবং তাদেরকে মদীনা থেকে বহিষ্কার করা হয়।
মদীনার ইহুদী ও মুনাফেক আঁতাঁত ও ষড়যন্ত্র
মদীনার অধিকাংশ ইহুদীই নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর ধর্মমত গ্রহণ থেকে বিরত ছিল। তাদের প্রত্যাশানুযায়ী সর্বশেষ নবী মুহাম্মদ (সা) বনী ইসরাইল জাতিগোষ্ঠীর না হওয়ায় তারা ছিল ঈর্ষান্বিত। অন্য কোন সম্প্রদায়ের লোক নবুওত লাভ করুক এটা তাদের কাম্য ছিল না। এদিকে মদীনায় ইসলামের দ্রুত প্রসার ঘটায় তারা নিজেদের প্রভাব–প্রতিপত্তি বজায় রাখার ব্যাপারে শঙ্কিত হয়ে উঠে। ইহুদীদের এক দলনেতা আব্দুল্লাহ্ ইবনে সালাম ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করলে তাঁর দলের অন্য সবাই ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে। মদীনার কিছু সংখ্যক ইহুদী বাহ্যিকভাবে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করলেও তাদের অন্তর ছিল মুনাফেকিতে পরিপূর্ণ। তারা মুসলিম নামধারী হলেও তাদের অন্তরে ছিল ভিন্ন। তারা মিথ্যা বলার মাধ্যমে গুপ্তচর বৃত্তি করত। তাদের মধ্যে কিতাবের জ্ঞান থাকায় বিভিন্ন বিষয়ে অবান্তর প্রশ্ন উত্থাপন করে তারা মুসলমানদের মধ্যে বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্ট করতো। তারা চাইতো মদীনার নব্য মুসলমানদেরকে পৌত্তলিকতায় ফিরিয়ে দিতে। এ ছাড়াও তারা আওস ও খাযরাজ গোত্রের পুরোনো বিবাদকে উসকে দিত এবং সময় ও সুযোগ বুঝে শান্তি চুক্তির বিভিন্ন ধারা লংঘনের পরামর্শ দিতো। যখন তারা মুসলমানদের সাথে মেলামিশা করতো তখন বলতো ‘আমরা তোমাদের সাথে আছি’, আর যখন নিজ সম্প্রদায়ের লোকজনের কাছে যেতো তখন বলতো, ‘আমরাতো মুসলমানদের সাথে ঠাট্টা-মশকরা করি।’ তাদের প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ্ বলেন:
وَلَئِن سَأَلْتَهُمْ لَيَقُولُنَّ إِنَّمَا كُنَّا نَخُوضُ وَنَلْعَبُ ۚ قُلْ أَبِاللَّهِ وَآيَاتِهِ وَرَسُولِهِ كُنتُمْ تَسْتَهْزِئُونَ لَا تَعْتَذِرُوا قَدْ كَفَرْتُم بَعْدَ إِيمَانِكُمْ ۚ إِن نَّعْفُ عَن طَائِفَةٍ مِّنكُمْ نُعَذِّبْ طَائِفَةً بِأَنَّهُمْ كَانُوا مُجْرِمِينَ الْمُنَافِقُونَ وَالْمُنَافِقَاتُ بَعْضُهُم مِّن بَعْضٍ ۚ يَأْمُرُونَ بِالْمُنكَرِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمَعْرُوفِ وَيَقْبِضُونَ أَيْدِيَهُمْ ۚ نَسُوا اللَّهَ فَنَسِيَهُمْ ۗ إِنَّ الْمُنَافِقِينَ هُمُ الْفَاسِقُونَ وَعَدَ اللَّهُ الْمُنَافِقِينَ وَالْمُنَافِقَاتِ وَالْكُفَّارَ نَارَ جَهَنَّمَ خَالِدِينَ فِيهَا ۚ هِيَ حَسْبُهُمْ ۚ وَلَعَنَهُمُ اللَّهُ ۖ وَلَهُمْ عَذَابٌ مُّقِيمٌ
”আর যদি তুমি তাদের কাছে জিজ্ঞেস কর, তবে তারা বলবে, আমরা তো কথার কথা বলছিলাম এবং কৌতুক করছিলাম। আপনি বলুন, তোমরা কি আল্লাহর সাথে, তাঁর হুকুম আহকামের সাথে এবং তাঁর রসূলের সাথে ঠাট্টা করছিলে? ছলনা কর না, তোমরা যে কাফের হয়ে গেছ ঈমান প্রকাশ করার পর। তোমাদের মধ্যে কোন কোন লোককে যদি আমি ক্ষমা করে দেইও, তবে অবশ্য কিছু লোককে আযাবও দেব। কারণ, তারা ছিল গোনাহগার। মুনাফেক নর–নারী সবারই গতিবিধি একরকম; শিখায় মন্দ কথা, ভাল কথা থেকে বারণ করে এবং নিজ মুঠো বন্ধ রাখে। আল্লাহকে ভুলে গেছে তারা, কাজেই তিনিও তাদের ভুলে গেছেন নিঃসন্দেহে মুনাফেকরাই নাফরমান। ওয়াদা করেছেন আল্লাহ, মুনাফেক পুরুষ ও মুনাফেক নারীদের এবং কাফেরদের জন্যে দোযখের আগুনের–তাতে পড়ে থাকবে সর্বদা। সেটাই তাদের জন্যে যথেষ্ট। আর আল্লাহ তাদের প্রতি অভিসম্পাত করেছেন এবং তাদের জন্যে রয়েছে স্থায়ী আযাব।” (৯:৬৫-৬৮)
মদীনার আওস ও খাযরাজ গোত্রের মধ্যেও কিছু সংখ্যক মুনাফেক ছিল। ইহুদীদের মতো তারাও মুসলমানদের সংখ্যা ও প্রভাব বৃদ্ধিতে শঙ্কিত হয়ে পড়েছিল। এদের দলনেতা ছিল আব্দুল্লাহ্ ইবনে উবাই। ইতোপূর্বে ইয়াসরিববাসী তাকে তাদের শাসকরূপে নিযুক্ত করার চিন্তাভাবনা করেছিল। কিন্তু নবী মুহাম্মদ (সাঃ) এর আগমণের পর তার শাসক হওয়ার সম্ভাবনা বাতিল হয়ে যায়। সে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করলেও অন্তরে সে ছিল নবীর প্রতি বিদ্বেষপরায়ণ। ইহুদীরা এদের সাথে গোপন সম্পর্ক রাখতে শুরু করলো যাতে মুসলমানদের প্রভাব-প্রতিপত্তিকে ঠেকিয়ে রাখা যায়। অন্যদিকে কাআব ইবনে আশরাফ, হুয়াই ইবনে আখতাব প্রমুখ ইহুদী নেতৃবৃন্দ মক্কার কুরাইশদের সাথে মিলিত হয়ে মুসলমানদেরকে মদীনা থেকে উৎখাতের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। এরা বিভিন্নভাবে কুরাইশদেরকে মদীনা আক্রমণে উসকানি দিতে থাকে। এভাবে অভ্যন্তরীন ও বহিঃশত্রুর সাথে ইহুদীদের আঁতাঁতের কারণে মদীনায় তাদের অবস্থান মুসলমানদের জন্য হুমকিস্বরূপ হয়ে উঠে।
ইহুদী বনু নজীর গোত্রের ষড়যন্ত্র
ইহুদী বনু নজীর গোত্রের বসতি ছিল মদীনা শহর থেকে দুই মাইল দূরে এবং কোবা পল্লীর সন্নিকটে। মদীনা সনদের আলোকে মুসলমানদের মৈত্রী চুক্তি বিদ্যমান ছিল তাদের সাথে। কিন্তু তা সত্ত্বেও তারা মুসলমানদের যেকোন মুসীবত কালে উৎফুল্ল বোধ করতো। রাজী ও বী’রে মাউনার দু’টি বিশ্বাসঘাতকতার ঘটনায় তারা আনন্দিত হলো। তাদের বিভিন্ন আচরণে নবী করীম (সাঃ) সন্দেহান্বিত হলেন। তিনি মনে করলেন ইহুদীরা যেকোন সময় বিপদজনক ঘটনা ঘটাতে পারে। বিষয়টি পরীক্ষার জন্য তিনি নিজে বিশিষ্ট সাহাবী হযরত আবু বকর (রাঃ), হযরত ওমর (রাঃ)ও হযরত আলী (রাঃ)-কে সঙ্গে নিয়ে তাদের বসতিতে গেলেন। কৌশল হিসেবে একজন মুসলিমের হাতে বনু কিলাব গোত্রের নিহত দু’ব্যক্তির রক্তপণ নির্ধারণের ব্যাপারে আলোচনা উত্থাপন করলেন। কিন্তু তারা নিজেদের মধ্যে কানাঘুষা শুরু করে দিলো। নবী করীম (সাঃ) একটি গৃহের প্রাচীরের পাশে বসে তাদের গতিবিধি লক্ষ্য করছিলেন। তারা গৃহের ছাদের উপর থেকে প্রাচীরে পাশে বসা নবীজী (সাঃ) এর উপর ভারী পাথর নিক্ষেপ করে হত্যার পরিকল্পনা করছিল। মহান আল্লাহ্ রব্বুল আলামীন তাঁকে ওহী মারফৎ সতর্ক করলেন। তিনি দ্রুত সে স্থান ছেড়ে মদীনার দিকে চলে গেলেন। ইহুদীরা তাঁর চলে যাওয়ার ব্যাপারটি বুঝেও সাহাবীগণের সামনে না বুঝার ভাণ করলো। সাহবীগণ নবীজী (সাঃ) জন্য কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লেন এবং তাঁর সন্ধানে বেরিয়ে পড়লেন। পথিমধ্যে তাঁরা জানতে পারলেন তিনি মসজিদে নব্বীতে পৌঁছে গেছেন। ইহুদীদের এ ষড়যন্ত্রে নবীজী (সাঃ) তাঁর আশঙ্কা সম্পর্কে নিশ্চিত হলেন।
বনু নজীর গোত্রের নির্বাসন
এ ঘটনার পর নবী করীম (সাঃ) বনু নজীর গোত্রের ইহুদীদেরকে মদীনা থেকে নির্বাসিত করার সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি সাহাবী মুহাম্মদ ইবনে মাসলামা (রাঃ) এর মারফৎ তাদের উপর নির্দেশ জারী করলেন – ’চুক্তি ভঙ্গের কারণে তাদেরকে দশদিনের মধ্যে মদীনা ছাড়তে হবে নতুবা তাদের হত্যা করা হবে।’ নির্দেশ পেয়ে তারা মদীনা ছাড়ার প্রস্তুতি নিলো। এ সংবাদ পেয়ে ইহুদীদের মিত্র ও মদীনার মুনাফেক সর্দার আব্দুল্লাহ্ ইবনে উবাই তাদেরকে মদীনা না ছাড়তে আশ্বাস দিয়ে বললো, ’আমরা দুই হাজার সৈন্য দিয়ে তোমাদেরকে সাহায্য করবো। তোমরা যদি বহিস্কৃত হও, তবে আমরাও তোমাদের সাথে বের হয়ে যাব এবং তোমাদের ব্যাপারে আমরা কখনও কারও কথা মানব না।’ কিন্তু ইহুদীরা তার এ আশ্বাসের ব্যাপারে আশ্বস্ত হতে পারলো না, কারণ সে ইতোপূর্বে বনু কায়নুকা গোত্রকে প্রদত্ত আশ্বাসও ভঙ্গ করেছে। তাদের অধিকাংশই মনস্থ করলো মদীনার অদূরে খায়বর অঞ্চলে অপর এক ইহুদী বসতির কাছাকাছি স্থানে বসতি স্থাপন করবে এবং মদীনায় তাদের ফল বাগানগুলো ভোগদখল করবে। কিন্তু তাদের নেতা হুয়াই ইবনে আখতাব এ সিদ্ধান্তে অসম্মতি জানিয়ে বললো, ‘আমরা আমাদের বসতভিটা ছেড়ে যাব না, নিজ নিজ দূর্গে অবস্থান করবো, প্রতিটি গৃহের ছাদে পাথর রেখে তা দিয়ে অবরোধকারীদের আক্রমণ প্রতিরোধ করবো। আমাদের বছর ব্যাপী খাদ্য ও পনীয়ের মজুত আছে। সুতরাং মুসলমানদের দীর্ঘমেয়াদী অবরোধ কার্যকর সম্ভব হবে না। আমরা তাদের দশ দিনের চূড়ান্ত মেয়াদ পার করে দিতে পারব।’ তার এ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ইহুদীরা নিজ নিজ দুর্গে অবস্থান নিলো।
নবীজী (সাঃ) এর নেতৃত্বে মুসলমানগণ ইহুদীদের দূর্গগুলো অবরোধ করেন। কিন্তু বিশ দিন অবরোধের পরও যখন তারা বেরিয়ে এলো না, তখন তিনি ইহদীদের ফলের বাগানের কিছু অংশ কেটে ফেলে এবং জ্বালিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিলেন। অবস্থাদৃষ্টে ইহুদীদের টনক নড়লো। তারা সমূহ ক্ষতির আশঙ্কা করলো। এ অবস্থায় তারা তাদের দূর্গগুলো থেকে বেরিয়ে এলো এবং নবীজীর সামনে এসে বললো, ‘আপনি ফয়-ফসলের ক্ষেত বিনষ্ট করতে যেখানে নিষেধ করেন সে ক্ষেত্রে আমাদের বাগানগুলো কেটে ফেলছেন ও পুড়িয়ে দিচ্ছেন। এটাতো একটি বেইনসাফী কাজ হচ্ছে।’ এর উত্তরে পবিত্র কুরআনের নিম্নোক্ত আয়াত নাযিল হলো:
مَا قَطَعْتُم مِّن لِّينَةٍ أَوْ تَرَكْتُمُوهَا قَائِمَةً عَلَىٰ أُصُولِهَا فَبِإِذْنِ اللَّهِ وَلِيُخْزِيَ الْفَاسِقِينَ
”তোমরা যে কিছু কিছু খর্জুর বৃক্ষ কেটে দিয়েছ এবং কতক না কেটে ছেড়ে দিয়েছ, তা তো আল্লাহরই আদেশ এবং যাতে তিনি অবাধ্যদেরকে লাঞ্ছিত করেন।” (৫৯:৫)
এ বিপদে বাইরের কোন সাহায্য তারা পেলো না, এমনকি মুনাফেক সর্দার আব্দুল্লাহ্ ইবনে উবাই যে নিজ থেকে তাদেরকে সাহায্যের যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল সেও এগিয়ে আসলো না। সুতরাং আত্মসমর্পণ ছাড়া কোন উপায় নেই এ কথা চিন্তা করে তারা নবীজী (সাঃ)-কে অনুরোধ জানালো, ’আমাদের জীবন রক্ষা করুন এবং আমাদের সহায়–সম্পদ নিয়ে চলে যাওয়ার অনুমতি দিন।’ তিনি ইহুদীদের অনুরোধ রক্ষা করলেন এবং প্রতি তিন জনে এক উট বোঝাই খাদ্যশস্য ও অন্যান্য মালামাল সাথে নিয়ে যাবার অনুমতি দিলেন। প্রথমে তারা খায়বরে বসতি স্থাপন করে বসবাস করতে থাকে। কিছুকাল পরে এক সময়ে সিরিয়া অভিমুখে চলে যায়। মুনাফেক সর্দার আব্দুল্লাহ্ ইবনে উবাইয়ের ভাঁওতাবাজী প্রতিশ্রুতি সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ্ বলেন:
أَلَمْ تَرَ إِلَى الَّذِينَ نَافَقُوا يَقُولُونَ لِإِخْوَانِهِمُ الَّذِينَ كَفَرُوا مِنْ أَهْلِ الْكِتَابِ لَئِنْ أُخْرِجْتُمْ لَنَخْرُجَنَّ مَعَكُمْ وَلَا نُطِيعُ فِيكُمْ أَحَدًا أَبَدًا وَإِن قُوتِلْتُمْ لَنَنصُرَنَّكُمْ وَاللَّهُ يَشْهَدُ إِنَّهُمْ لَكَاذِبُونَ لَئِنْ أُخْرِجُوا لَا يَخْرُجُونَ مَعَهُمْ وَلَئِن قُوتِلُوا لَا يَنصُرُونَهُمْ وَلَئِن نَّصَرُوهُمْ لَيُوَلُّنَّ الْأَدْبَارَ ثُمَّ لَا يُنصَرُونَ لَأَنتُمْ أَشَدُّ رَهْبَةً فِي صُدُورِهِم مِّنَ اللَّهِ ۚ ذَٰلِكَ بِأَنَّهُمْ قَوْمٌ لَّا يَفْقَهُونَ
”আপনি কি মুনাফিকদেরকে দেখেন নি? তারা তাদের কিতাবধারী কাফের ভাইদেরকে বলে: তোমরা যদি বহিস্কৃত হও, তবে আমরা অবশ্যই তোমাদের সাথে দেশ থেকে বের হয়ে যাব এবং তোমাদের ব্যাপারে আমরা কখনও কারও কথা মানব না। আর যদি তোমরা আক্রান্ত হও, তবে আমরা অবশ্যই তোমাদেরকে সাহায্য করব। আল্লাহ তা’আলা সাক্ষ্য দেন যে, ওরা নিশ্চয়ই মিথ্যাবাদী। যদি তারা বহিস্কৃত হয়, তবে মুনাফিকরা তাদের সাথে দেশত্যাগ করবে না আর যদি তারা আক্রান্ত হয়, তবে তারা তাদেরকে সাহায্য করবে না। যদি তাদেরকে সাহায্য করে, তবে অবশ্যই পৃষ্ঠপ্রদর্শন করে পলায়ন করবে। এরপর কাফেররা কোন সাহায্য পাবে না। নিশ্চয় তোমরা তাদের অন্তরে আল্লাহ তা’আলা অপেক্ষা অধিকতর ভয়াবহ। এটা এ কারণে যে, তারা এক নির্বোধ সম্প্রদায়।” (৫৯:১১–১৩)
কুরাইশদের দ্বিতীয় বদর যুদ্ধের ঘোষণা ও বিফলতা
বনু নজীর গোত্রের ইহুদীদের নির্বাসনের পর মদীনায় অভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্র বন্ধ থাকে। ফলে সেখানে বছর খানেক শান্তির পরিবেশ বিরাজ করছিলো। কিন্তু এরই মধ্যে খবর এলো আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বে মক্কার কুরাইশরা বদর প্রান্তরে দুই হাজার সৈন্য নিয়ে সমবেত হওয়ার পরিকল্পনা করছে। অবশ্য ওহুদের রণাঙ্গণ থেকে ফেরার সময় সে হুঙ্কার দিয়েছিল বদর প্রান্তরে আবার মোকাবেলা হবে। কারণ সে যুদ্ধে মুসলমানদের নির্মূল করার লক্ষ্য অর্জনে তারা ব্যর্থ হয়েছিল। এ খবরে মুসলমানগণ কিছুটা শঙ্কিত হলেন এবং বদরের পরিবর্তে মদীনায় থেকেই মোকাবেলা করার চিন্তা করলেন। কিন্তু নবী করীম (সাঃ) বদর প্রান্তরেই কুরাইশদের মোকাবেলা করতে সিদ্ধান্ত নিলেন। তাঁর অটল সিদ্ধান্তে মুসলমানগণ অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে তাঁরই নেতৃত্বে বদর অভিমুখে রওয়ানা হলেন। বদরে পৌঁছে তাঁরা শিবির স্থাপন করেন ও কুরাইশদের আগমণের অপেক্ষায় থাকেন।
এদিকে মক্কার কুরাইশরা আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বে দুই হাজার সৈন্য নিয়ে বদর প্রান্তর অভিমুখে যাত্রা করে। কিন্তু দিন দু’য়েক চলার পর আবু সুফিয়ানের সাহস স্তিমিত হয়ে আসে এবং মাঝপথে সে অভিযান স্থগিত করে দেয়। সে তার দলবলকে বলে, ‘এ বছরটি আমাদের অনুকূলে নয়। সুতরাং আমাদের জন্য ফিরে যাওয়াই শ্রেয় হবে।’ এ কথা বলে সে তার বাহিনী নিয়ে মক্কায় ফিরে যায়। দ্বিতীয়বার বদর যুদ্ধে মোকাবেলা করার খায়েশ তার এভাবেই মিটে যায়। অপরদিকে নবীজী (সাঃ) বদর প্রান্তরে আটদিন অপেক্ষা করার পর জানতে পারেন কুরাইশ বাহিনী যুদ্ধাভিযান পরিত্যাগ করে মক্কার দিকে ফিরে গেছে। কুরাইশদের এ অবমাননাকর প্রত্যাবর্তন মুসলমানদেরকে আনন্দিত করে ও তাঁদের মনোবলকে উদ্দীপ্ত করে।
এরপর নবীজী (সাঃ) আরও দু’টি অভিযান পরিচালনা করেন। এর একটি হলো বনু গোফতান গোত্রের বিরুদ্ধে যাতুররিকা অভিযান ও অপরটি হলো দুমাতুল যান্দাল অভিযান। তিনি খবর পেলেন বনু গোফতান গোত্র নজদ এলাকা থেকে মদীনা আক্রমণের পরিকল্পনা করছে। তিনি তৎক্ষণাৎ চারশত সৈন্য নিয়ে তাদেরকে অতর্কিত আক্রমণ করলে তারা সবকিছু ফেলে পালিয়ে যায়। অপর অভিযানটি হলো মদীনা থেকে বেশ দূরে হিজাজ ও সিরিয়া সীমান্ত সংলগ্ন দুমাতুল যান্দাল। সেখানেও তিনি একই পদ্ধতিতে অতর্কিত আক্রমণ পরিচালনা করেন। শত্রুবাহিনী প্রতিরোধের কোন সুযোগ না পেয়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। পেছনে ফেলে যায় তাদের সহায়–সম্পদ। এসব অভিযানের ফলে অনেক দূরবর্তী এলাকাতেও মুসলমানদের প্রভাব–প্রতিপত্তি বৃদ্ধি পেতে থাকে।