এ অধ্যায়ের বিষয়সমূহ
Toggleনবীজী (সাঃ)’র স্বপ্ন ও কা’বা জিয়ারতের আকাঙ্ক্ষা
নবী করীম (সাঃ) ও তাঁর সাহবীগণসহ মক্কা থেকে হিজরতের পর ছয়টি বছর কেটে গেলো। মদীনায় নতুন একটি সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনের নিরলস প্রচেষ্টায় এবং অভ্যন্তরীন ষড়যন্ত্র ও বহিঃশত্রুর অব্যাহত আক্রমণ থেকে বেঁচে থাকার দুরূহ সংগ্রামে অতিবাহিত হয়েছে সারাটা সময়। এখন তাঁদের অন্তরে পবিত্র কা’বা গৃহ তাওয়াফ ও প্রিয় জন্মভূমি দর্শনের তীব্র অনুভূতি সঞ্চারিত হয়। কিন্তু এতেও প্রবল প্রতিবন্ধকতা। পবিত্র কা’বা গৃহ জিয়ারত সকলের জন্য উম্মুক্ত থাকলেও মক্কার কুরাইশরা সেখানে মুসলমানদের প্রবেশাধিকার বাধাগ্রস্ত করে রেখেছে। তারা মনে করে যেহেতু মুসলমানগণ কা’বা গৃহে স্থাপিত প্রতিমাগুলোতে বিশ্বাস করেনা সেহেতু তারা সেখানে প্রবেশ করতে পারবেনা। অথচ হযরত ইব্রাহীম (আঃ) এ গৃহ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এক ও অদ্বিতীয় আল্লাহর উপাসনা করার জন্য। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ্ বলেন:
وَ اِذْ جَعَلْنَا الْبَیْتَ مَثَابَۃً لِّلنَّاسِ وَ اَمْنًا ؕ وَ اتَّخِذُوْا مِنْ مَّقَامِ اِبْرٰہٖمَ مُصَلًّی ؕ وَ عَهِدْنَاۤ اِلٰۤی اِبْرٰہٖمَ وَ اِسْمٰعِیْلَ اَنْ طَهِرَا بَیْتِیَ لِلطَّآئِفِیْنَ وَ الْعٰكِفِیْنَ وَ الرُّكَعِ السُّجُوْدِ
“যখন আমি কা’বা গৃহকে মানুষের জন্যে সম্মিলন স্থল ও শান্তির আলয় করলাম, আর তোমরা ইব্রাহীমের দাঁড়ানোর জায়গাকে নামাযের জায়গা বানাও এবং আমি ইব্রাহীম ও ইসমাঈলকে আদেশ করলাম, তোমরা আমার গৃহকে তওয়াফকারী, অবস্থানকারী ও রুকু–সেজদাকারীদের জন্য পবিত্র রাখ।” (২:১২৫)
إِنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا وَيَصُدُّونَ عَن سَبِيلِ اللَّهِ وَالْمَسْجِدِ الْحَرَامِ الَّذِي جَعَلْنَاهُ لِلنَّاسِ سَوَاءً الْعَاكِفُ فِيهِ وَالْبَادِ ۚ وَمَن يُرِدْ فِيهِ بِإِلْحَادٍ بِظُلْمٍ نُّذِقْهُ مِنْ عَذَابٍ أَلِيمٍ وَ اِذْ بَوَّاْنَا لِاِبْرٰهِیْمَ مَكَانَ الْبَیْتِ اَنْ لَّا تُشْرِکْ بِیْ شَیْئًا وَّ طَهِرْ بَیْتِیَ لِلطَّآئِفِیْنَ وَ الْقَآئِمِیْنَ وَ الرُّكَعِ السُّجُوْدِ وَ اَذِّنْ فِی النَّاسِ بِالْحَجِّ یَاْتُوْكَ رِجَالًا وَّ عَلٰی کُلِّ ضَامِرٍ یَّاْتِیْنَ مِنْ کُلِّ فَجٍّ عَمِیْقٍ لِّیَشْهَدُوْا مَنَافِعَ لَهُمْ وَ یَذْکُرُوا اسْمَ اللّٰهِ فِیْۤ اَیَّامٍ مَّعْلُوْمٰتٍ عَلٰی مَا رَزَقَهُمْ مِّنْۢ بَهِیْمَۃِ الْاَنْعَامِ ۚ فَکُلُوْا مِنْهَا وَ اَطْعِمُوا الْبَآئِسَ الْفَقِیْرَ
“যারা কুফর করে ও আল্লাহর পথে বাধা সৃষ্টি করে এবং সেই মসজিদে হারাম থেকে বাধা দেয়, যাকে আমি প্রস্তুত করেছি স্থানীয় ও বহিরাগত সকল মানুষের জন্যে সমভাবে এবং যে মসজিদে হারামে অন্যায়ভাবে কোন ধর্মদ্রোহী কাজ করার ইচছা করে, আমি তাদেরকে যন্ত্রানাদায়ক শাস্তি আস্বাদন করাব। যখন আমি ইব্রাহীমকে বায়তুল্লাহর স্থান ঠিক করে দিয়েছিলাম যে, আমার সাথে কাউকে শরীক করো না এবং আমার গৃহকে পবিত্র রাখ তাওয়াফকারীদের জন্যে, নামাযে দন্ডায়মানদের জন্যে এবং রকু সেজদাকারীদের জন্যে। এবং মানুষের মধ্যে হজ্বের জন্যে ঘোষণা প্রচার কর। তারা তোমার কাছে আসবে পায়ে হেঁটে এবং সর্বপ্রকার কৃশকায় উটের পিঠে সওয়ার হয়ে দূর–দূরান্ত থেকে। যাতে তারা তাদের কল্যাণের স্থান পর্যন্ত পৌছে এবং নির্দিষ্ট দিনগুলোতে আল্লাহর নাম স্মরণ করে তাঁর দেয়া চতুষ্পদ জন্তু যবেহ করার সময়।” (২২:২৬ – ২৮)
নবীজী (সাঃ) স্বপ্নে দেখলেন তিনি পবিত্র কা’বাগৃহ জিয়ারত করছেন। এতে তিনি সাহাবাগণকে সঙ্গে নিয়ে হজ্জ্ব ও ওমরা পালনের জন্য উৎসাহিত হয়ে উঠলেন। তাঁর স্বপ্ন সম্পর্কে আল্লাহ্ বলেন:
لَقَدْ صَدَقَ اللّٰهُ رَسُوْلَهُ الرُّءْیَا بِالْحَقِّ ۚ لَتَدْخُلُنَّ الْمَسْجِدَ الْحَرَامَ اِنْ شَآءَ اللّٰهُ اٰمِنِیْنَ ۙ مُحَلِّقِیْنَ رُءُوْسَکُمْ وَ مُقَصِّرِیْنَ ۙ لَا تَخَافُوْنَ ؕ فَعَلِمَ مَا لَمْ تَعْلَمُوْا فَجَعَلَ مِنْ دُوْنِ ذٰلِكَ فَتْحًا قَرِیْبًا
“আল্লাহ তাঁর রসূলকে সত্য স্বপ্ন দেখিয়েছেন। আল্লাহ চাহেন তো তোমরা অবশ্যই মসজিদে হারামে প্রবেশ করবে নিরাপদে মস্তকমুন্ডিত অবস্থায় এবং কেশ কর্তিত অবস্থায়। তোমরা কাউকে ভয় করবে না। অতঃপর তিনি জানেন যা তোমরা জান না। এছাড়াও তিনি দিয়েছেন তোমাদেরকে একটি আসন্ন বিজয়।” (৪৮:২৭)।”
ওমরা পালনের উদ্দেশ্যে যাত্রা
হিজরী ষষ্ট সনের জ্বিলকদ মাস – আসন্ন হজ্জ্বের মওসুম। নবী মুহাম্মদ (সা) হজ্জ্ব ও ওমরা পালনের জন্য মদীনার মুসলিম ও অমুসলিম গোত্রগুলোকে প্রস্তুতির আহ্বান জানালেন। এ উদ্দেশ্যে ১৪০০ জনের একটি হজ্জ্ব যাত্রীদল গঠিত হলো। তাদেরকে সঙ্গে নিয়ে তিনি মক্কা অভিমুখে যাত্রা শুরু করেন। তাঁদের সাথে ছিল কুরবাণীর উদ্দেশ্যে আনীত পশুসমূহ। তাঁদের এ তীর্থ যাত্রা ছিল নিরস্ত্র অবস্থায়, আত্মরক্ষার নিমিত্তে শুধুমাত্র কোষবদ্ধ তলোয়ার ব্যতীত অন্য কোন অস্ত্র তাঁদের সাথে ছিল না। এ হজ্জ্ব ও ওমরাপালনকারী দলটি যখন মক্কার নিকটবর্তী ’উসফান’এ পৌঁছুলো তখন কুরাইশরা খবর পেয়ে খালীদ বিন ওয়ালীদ ও ইকরামা ইবনে আবু জেহেলের নেতৃত্বে দুইশত সৈন্যের একটি বাহিনী তাদের গতিরোধ করার জন্য পাঠালো। এ পবিত্র মাসে মুখোমুখী কোন সংঘর্ষ এড়ানোর জন্য হজ্জ্বযাত্রী দলটি ঘুরপথে কষ্টদায়ক গিরিখাত ধরে মক্কার দিকে এগিয়ে গেলো। মক্কার উপকন্ঠে হুদায়বিয়া নামক স্থানে পৌঁছে নবী করীম (সাঃ) সেখানে শিবির স্থাপন করার নির্দেশ দিলেন।
কুরাইশদের অন্যায্য বাধা ও উত্তেজনাকর পরিস্থিতি
হুদায়বিয়ায় পৌঁছানোর পর কুরাইশরা হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর নেতৃত্বে আগমনকারী হজ্জ্বযাত্রীদলটিকে মক্কায় প্রবেশের অনুমতি দিতে অনমনীয় মনোভাব প্রদর্শন করে। উভয় পক্ষের মধ্যে আলোচনার জন্য প্রতিনিধি বিনিময় চলে। প্রথমে নবী করীম (সা) তাঁর হজ্জ্বব্রত পালনকারী দলের নিখাদ উদ্দেশ্য ব্যক্ত করার জন্য একজন প্রতিনিধি পাঠান। কুরাইশরা প্রথমে অশালীনভাবে তাঁকে প্রত্যাখ্যান করে। পরবর্তীতে কুরাইশরাও মুসলিম শিবিরে তাদের প্রতিনিধি প্রেরণ করে। প্রতিনিধিরা নবীজী (সাঃ) এর সাথে সাক্ষাৎ করে তাঁর প্রকৃত উদ্দেশ্য বোঝতে সক্ষম হয় এবং কুরাইশদের নিকট ফিরে গিয়ে বাস্তব অবস্থা সম্পর্কে জানায়। এতেও তারা তাদের জিদ বহাল রেখে দুরভিসন্ধীমূলক চিন্তাভাবনা করতে থাকে। তখন নবী করীম (সা) মক্কায় প্রবেশের অনুমতি চেয়ে তাঁর প্রতিনিধি হিসেবে মক্কাবাসীর নিকট গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিত্ব হযরত ওসমান (রা)-কে কুরাইশদের নিকট প্রেরণ করেন। কিন্তু কুরাইশ সর্দারগণ বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে এ বছর মুসলমানদেরকে কাবাগৃহে প্রবেশ ও ওমরা পালন করতে দিতে অসম্মত হয়। তবে তারা আলোচনার মাধ্যমে একটা সুরাহায় পৌঁছানোর আগ্রহ প্রকাশ করে। হযরত ওসমান (রা) -এর ফেরত আসতে দেরী হওয়ায় মুসলমানরা উৎকন্ঠিত হয়ে পড়েন। প্রথমে মনে করা হয়েছিল তাঁকে কুরাইশরা আটক করেছে। পরে গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে, হযরত ওসমান (রা)-কে হত্যা করা হয়েছে। এতে মুসলিম শিবিরে ব্যাপক উত্তেজনার সৃষ্টি হয়।
বাইয়াতে রিদওয়ান
হযরত ওসমান (রা)-কে হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণের উদ্দেশ্যে নবী করীম (সা) তাঁর সাহাবীগণকে নিয়ে একটি গাছের নীচে শপথ গ্রহণ করেন। তাঁর হাতের ওপর হাত রেখে সাহাবীবৃন্দ আমৃত্যু লড়াই করার শপথ নেন। এ শপথ ‘বাইয়াতে রিদওয়ান’ নামে পরিচিত। হযরত ওসমান (রা)-কে হত্যার খবরটি ছিল একটি গুজব। তিনি মুসলিম শিবিরে ফিরে আসলে এ গুজবের অবসান ঘটে। তবে ‘বাইয়াতে রিদওয়ান’ ছিল মহান আল্লাহর নিকট পছন্দনীয় একটি শপথ। এ সম্পর্কে নাযিলকৃত আয়াতটিতে আল্লাহ্ পাক বলেন,
لَقَدْ رَضِیَ اللّٰهُ عَنِ الْمُؤْمِنِیْنَ اِذْ یُبَایِعُوْنَكَ تَحْتَ الشَّجَرَۃِ فَعَلِمَ مَا فِیْ قُلُوْبِهِمْ فَاَنْزَلَ السَّكِیْنَۃَ عَلَیْهِمْ وَ اَثَابَهُمْ فَتْحًا قَرِیْبًا
“আল্লাহ মু’মিনদের প্রতি সন্তুষ্ট হলেন, যখন তারা বৃক্ষের নীচে আপনার কাছে বাইয়াত (শপথ) করল। আল্লাহ অবগত ছিলেন যা তাদের অন্তরে ছিল। অতঃপর তিনি তাদের প্রতি প্রশান্তি নাযিল করলেন এবং তাদেরকে আসন্ন বিজয় পুরস্কার দিলেন।” (৪৮:১৮)
হুদায়বিয়ার সন্ধিচুক্তি সম্পাদন ও এর গুরুত্ব
কুরাইশরা সোহায়েল ইবনে আমরকে তাদের প্রতিনিধি হিসেবে হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর নিকট প্রেরণ করে। উভয়পক্ষের মধ্যে দফায় দফায় আলোচনা চলতে থাকে। সন্ধির শর্ত নির্ধারণে কুরাইশ প্রতিনিধি সোহায়েল রুক্ষ ও কঠোর মনোভাব পোষণ করলেও নবী করীম (সাঃ) অত্যন্ত প্রজ্ঞা, ধৈর্য ও সংযমের পরিচয় দেন। চুক্তির শুরুতে ‘মুহাম্মাদুর রসূলুল্লাহ্’ নাম নিয়ে কুরাইশ প্রতিনিধি সোহায়েল আপত্তি তোলে। সে বলে,’আমরা আপনাকে আল্লাহর রসূল হিসেবে স্বীকৃতি দেই না। সুতারাং চুক্তিতে ‘রসূলুল্লাহ্’ শব্দটি থাকতে পারবে না। মহানুভব নবী করীম (সাঃ) শান্তিপূর্ণ সন্ধির স্বার্থে তাতে সম্মতি দেন এবং হযরত আলী (রাঃ)-কে তাঁর নামের সাথে ‘রসূলুল্লাহ্’ শব্দটি কেটে তৎপরিবর্তে ‘ইবনে আব্দুল্লাহ্’ শব্দটি জুড়ে দিতে বললেন। হযরত আলী (রাঃ) তাঁর অপারগতার কথা জানিয়ে বললেন, ‘আমি কোন অবস্থায়ই ‘রসূলুল্লাহ্’ শব্দটি কাটতে পারব না।’ তখন নবীজী (সাঃ) নিজেই তা কেটে দিলেন। এছাড়া চুক্তির কিছু কিছু ধারা বৈষম্যমূলক ও মুসলিম স্বার্থের পরিপন্থী হলেও তিনি সার্বিক শান্তির লক্ষ্যে তা মেনে নেন। অবশেষে একটি দশবছর–মেয়াদী একটি শান্তি চুক্তি সম্পাদিত হয় যা ‘হুদায়বিয়ার সন্ধি’ নামে পরিচিত।
এ সন্ধিচুক্তির প্রধান শর্তগুলো ছিল নিম্নরূপ:
-
এ সন্ধিচুক্তির মেয়াদ হবে দশ বছর।
-
এ বছর মুসলমানদেরকে হজ্জ্ব ও ওমরা পালন ব্যতীত ফেরত যেতে হবে। আগামী বছর তারা হজ্জ্ব পালনে আসতে পারবে। তবে তিন দিনের বেশী থাকতে পারবে না। তাদের সঙ্গে শুধু কোষবদ্ধ তরবারী থাকতে পারবে।
-
আরবের অপরাপর গোত্রগুলো উভয় পক্ষের যে কোন পক্ষের সাথে মৈত্রী চুক্তিতে আবদ্ধ হতে পারবে। এতে উভয় পক্ষের কেহ বাধা প্রদান করতে পারবে না।
-
মক্কার কুরাইশদের কোন পুরুষ ব্যক্তি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে নিজ অভিবাবকদের অনুমতি ব্যতীত মদীনা চলে গেলে অভিবাবক চাওয়ামাত্র তাকে কুরাইশদের হাতে ফেরত দিতে হবে।
-
কোন মুসলমান ইসলাম ধর্ম পরিত্যাগ করে মক্কায় চলে গেলে তাকে ফেরত দেওয়া হবে না।
চুক্তির শর্ত অনুযায়ী ওই বছর হজ্জ্ব ও ওমরা পালনে সমর্থ না হওয়ায় মুসলমান হজ্জ্বযাত্রী দলটি খুবই হতাশগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন। তদুপরি উপরোক্ত চুক্তির বৈষম্যমূলক ধারাগুলো মুসলমানদের জন্য অপমানজনক ও পীড়াদায়ক হওয়ায় মুসলিম শিবিরে এক গুমোট পরিস্থিতি বিরাজ করছিল। কিন্তু প্রিয় নবীজী (সাঃ) এর প্রতি শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও আনুগত্যের বন্ধনে আবদ্ধ মুসলমানগণ তাঁর সিদ্ধান্তকেই স্বতঃসিদ্ধভাবে গ্রহণ করলেন। এ সন্ধি ছিল ইসলাম ধর্মের অগ্রগতির এক মাইল ফলক। এর কতিপয় ধারা আপাতদৃষ্টিতে মুসলমানদের জন্য বৈষম্যমূলক ও আপত্তিকর হলেও ধৈর্য, সংযম ও সহনশীলতার মাধ্যমে সুদূর প্রসারী লক্ষ্য অর্জনের নিমিত্তে তা ছিল অপরিহার্য। শান্তির বৃহত্তর স্বার্থে এবং শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ইসলামের প্রচার ও প্রসারের ক্ষেত্রে এর অবদান ছিল অপরিসীম। এ ছাড়া এ চুক্তির মাধ্যমে এটা স্বীকৃতি পেলো যে ইসলাম একটি উদীয়মান ও কুরাইশদের সমকক্ষ শক্তি। সর্বোপরি এ সন্ধিচুক্তি পবিত্র মাসে পবিত্র মক্কা নগরীতে বিবাদমান দু’পক্ষের মধ্যে এক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের শঙ্কা দূর করলো। তাই পবিত্র কুরআনে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা এ সন্ধিকে নিম্নোক্ত আয়াতে এক সুস্পষ্ট বিজয় বলে উল্লেখ করেছেন:
اِنَّا فَتَحْنَا لَكَ فَتْحًا مُّبِيْنًا لِّيَغْفِرَ لَكَ اللَّهُ مَا تَقَدَّمَ مِن ذَنبِكَ وَمَا تَأَخَّرَ وَيُتِمَّ نِعْمَتَهُ عَلَيْكَ وَيَهْدِيَكَ صِرَاطًا مُّسْتَقِيمًا
“(হে নবী) নিশ্চয়ই আমি আপনাকে (হুদায়বিয়ার সন্ধির মাধ্যমে) এক সুস্পষ্ট বিজয় দান করেছি। যাতে আল্লাহ আপনার অতীত ও ভবিষ্যত ত্রুটিসমূহ মার্জনা করে দেন এবং আপনার প্রতি তাঁর নেয়ামত পূর্ণ করেন ও আপনাকে সরল পথে পরিচালিত করেন।” (৪৮:১-২)
হুদায়বিয়ার সন্ধি প্রসঙ্গে মুসলমানদেরকে সান্ত্বনা দিয়ে মহান আল্লাহ্ আরও যেসব আয়াত নাযিল করেন তা হলো:
وَ هُوَ الَّذِیْ كَفَّ اَیْدِیَهُمْ عَنْکُمْ وَ اَیْدِیَکُمْ عَنْهُمْ بِبَطْنِ مَكَۃَ مِنْۢ بَعْدِ اَنْ اَظْفَرَکُمْ عَلَیْهِمْ ؕ وَ كَانَ اللّٰهُ بِمَا تَعْمَلُوْنَ بَصِیْرًا هُمُ الَّذِیْنَ كَفَرُوْا وَ صَدُّوْکُمْ عَنِ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ وَ الْهَدْیَ مَعْکُوْفًا اَنْ یَّبْلُغَ مَحِلَّہٗ ؕ وَ لَوْ لَا رِجَالٌ مُّؤْمِنُوْنَ وَ نِسَآءٌ مُّؤْمِنٰتٌ لَّمْ تَعْلَمُوْهُمْ اَنْ تَطَـُٔوْهُمْ فَتُصِیْبَکُمْ مِّنْهُمْ مَّعَرَّۃٌۢ بِغَیْرِ عِلْمٍ ۚ لِیُدْخِلَ اللّٰهُ فِیْ رَحْمَتِہٖ مَنْ یَّشَآءُ ۚ لَوْ تَزَیَّلُوْا لَعَذَّبْنَا الَّذِیْنَ كَفَرُوْا مِنْهُمْ عَذَابًا اَلِیْمًا اِذْ جَعَلَ الَّذِیْنَ كَفَرُوْا فِیْ قُلُوْبِهِمُ الْحَمِیَّۃَ حَمِیَّۃَ الْجَاهِلِیَّۃِ فَاَنْزَلَ اللّٰهُ سَكِیْنَتَہٗ عَلٰی رَسُوْلِہٖ وَ عَلَی الْمُؤْمِنِیْنَ وَ اَلْزَمَهُمْ كَلِمَۃَ التَّقْوٰی وَ كَانُوْۤا اَحَقَّ بِهَا وَ اَهْلَهَا ؕ وَ كَانَ اللّٰهُ بِکُلِّ شَیْءٍ عَلِیْمًا
“তিনি মক্কা শহরে তাদের হাত তোমাদের থেকে এবং তোমাদের হাত তাদের থেকে নিবারিত করেছেন তাদের উপর তোমাদেরকে বিজয়ী করার পর। তোমরা যা কিছু কর, আল্লাহ তা দেখেন। তারাই তো কুফরী করেছে এবং বাধা দিয়েছে তোমাদেরকে মসজিদে হারাম থেকে এবং অবস্থানরত কোরবানীর জন্তুদেরকে যথাস্থানে পৌঁছতে। যদি মক্কায় কিছুসংখ্যক ঈমানদার পুরুষ ও ঈমানদার নারী না থাকত, যাদেরকে তোমরা জানতে না। অর্থাৎ তাদের পিষ্ট হয়ে যাওয়ার আশংকা না থাকত, অতঃপর তাদের কারণে তোমরা অজ্ঞাতসারে ক্ষতিগ্রস্ত হতে, তবে সব কিছু চুকিয়ে দেয়া হত; কিন্তু এ কারণে চুকানো হয়নি, যাতে আল্লাহ তা’আলা যাকে ইচ্ছা স্বীয় রহমতে দাখিল করে নেন। যদি তারা সরে যেত, তবে আমি অবশ্যই তাদের মধ্যে যারা কাফের তাদেরকে যন্ত্রনাদায়ক শস্তি দিতাম। কেননা, কাফেররা তাদের অন্তরে মূর্খতা–যুগের জেদ পোষণ করত। অতঃপর আল্লাহ তাঁর রসূল ও মু’মিনদের উপর স্বীয় প্রশান্তি নাযিল করলেন এবং তাদের জন্যে সংযমের দায়িত্ব অপরিহার্য করে দিলেন। বস্তুত তারাই ছিল এর অধিকতর যোগ্য ও উপযুক্ত। আল্লাহ সর্ববিষয়ে সম্যক জ্ঞাত।” (৪৮:২৪ – ২৬)
হুদায়বিয়া সন্ধির আপত্তিকর শর্তটি বাতিল
“মক্কার কুরাইশদের কোন পুরুষ ব্যক্তি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে নিজ অভিবাবকদের অনুমতি ব্যতীত মদীনা চলে গেলে অভিবাবক চাওয়ামাত্র তাকে কুরাইশদের হাতে ফেরত দিতে হবে।” – এটি ছিল মুসলমানদের জন্য বৈষম্যমূলক ও আপত্তিকর একটি শর্ত। এ সন্ধিচুক্তি সম্পাদনের কিছুদিন পর আবু বাসীর নামক মক্কার এক ব্যক্তি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে অভিকাবকের বিনা অনুমতিতে মদীনায় চলে আসেন। তাঁর অভিবাবক তাঁকে ফিরিয়ে আনার জন্য দু’ব্যক্তিকে মদীনায় পাঠালো। আবু বাসীর (রাঃ) যেতে না চাইলে নবীজী (সাঃ) তাঁকে বুঝিয়ে বললেন যে, “সদ্য সম্পাদিত চুক্তির শর্তানুযায়ী তোমাকে ফেরত যেতে হবে। কেননা শর্ত ভঙ্গ করা ইসলাম অনুমোদন করে না।” তিনি তাঁকে ধৈর্য ধারণ এবং আল্লাহর উপর ভরসা করতে বললেন।
আবু বাসীর ফেরত যাওয়ার পথে প্রহরী দু’ব্যক্তির একজনকে কৌশলে হত্যা করেন। অপরজন পালিয়ে নবীজী (সাঃ) এর নিকট ফিরে এসে ঘটনার বিবরণ দেয়। এ সময় আবু বাসীরও সেখানে উপস্থিত হয়ে নবীজী (সাঃ)-কে বললেন, “আপনি তাদের হাতে আমাকে হস্তান্তর করে আপনার প্রতিশ্রুতি ও দায়িত্ব পালন করেছেন। পরবর্তী কাজটি আমি আমার দায়িত্বে করেছি এবং মুক্ত হয়েছি। কারণ মক্কায় গিয়ে আমি ইসলাম থেকে বিচ্যুত হতে চাইনা।” এ কথা বলে তিনি সেখান থেকে বের হয়ে পড়েন এবং মদীনা ছেড়ে সিরিয়ার নিকটবর্তী লোহিত সাগরের উপকূলে ঈস নামক এক স্থানে চলে যান।
মক্কায় অবরুদ্ধ মুসলমানগণ আবু বাসীরের ঘটনা ও তাঁর বর্তমান অবস্থানের কথা জানতে পারলেন। তারাও সুযোগ বুঝে পালিয়ে একই স্থানে এসে তাঁর সাথে যুক্ত হন। এভাবে সত্তরজন পলাতক মুসলমানের একটি দল গঠিত হলো যারা হুদায়বিয়ার চুক্তির শর্তের কারণে মদীনায় যেতে পারছিলেন না। ঈস স্থানটি ছিল সিরিয়ার সাথে কুরাইশদের বাণিজ্য–কাফেলাগামী পথ–সংলগ্ন। হুদায়বিয়ার সন্ধিচুক্তিতে এ বাণিজ্য পথের নিরাপত্তার বিষয়টি উল্লেখিত ছিল না। এ সুযোগে মক্কা থেকে পলাতক মুসলমানগণ প্রায়শই কুরাইশদের বাণিজ্য–কাফেলায় হামলা চালাতে লাগলেন। এতে কুরাইশরা ভীষণ সঙ্কটে পড়লো। তারা বুঝতে পারলো মক্কায় অবরুদ্ধ মুসলমানগ মদীনায় চলে গেলেই ভালো হতো। অবশেষে তারা নবীজী (সাঃ) এর নিকট একটি প্রতিনিধিদল পাঠিয়ে চুক্তির এ শর্তটি বাতিলের অনুরোধ জানালে তিনি তাতে অনুমোদন দেন। আর এভাবেই এ বৈষম্যমূলক ধারাটি বাতিল হয়ে গেলো এবং ঈস থেকে মুসলমানগণ মদীনায় চলে আসলেন।
এ ধরনের আরেকটি ঘটনা হলো মক্কার মহিলা মুসলিম উম্মে কুলসুম (রাঃ) যিনি সবার নজর এড়িয়ে মদীনায় চলে আসেন। তাঁকে ফেরত আনার জন্য তাঁর দুই অমুসলিম ভাই মদীনায় এসে তাঁকে ফেরত দেওয়ার দাবী জানান। কিন্তু নবীজী (সাঃ) তাঁকে ফেরত দিতে অস্বীকার করে বলেন, “ফেরত দেওয়ার ব্যাপারে চুক্তিতে পুরুষদের কথা বলা হয়েছে মহিলাদের ব্যাপারে কিছু বলা হয়নি। সুতরাং মুসলিম মহিলাদের নিরাপত্তা বিধানের দায়িত্ব আমাদের। এছাড়া মুসলিম মহিলার অমুসলিম স্বামী থাকা ইসলামের শরীয়তের পরিপন্থী।” এ ব্যাপারে পবিত্র কুরআনেও মহান আল্লাহর স্পষ্ট নির্দেশ রয়েছে:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا جَاءَكُمُ الْمُؤْمِنَاتُ مُهَاجِرَاتٍ فَامْتَحِنُوهُنَّ ۖ اللَّهُ أَعْلَمُ بِإِيمَانِهِنَّ ۖ فَإِنْ عَلِمْتُمُوهُنَّ مُؤْمِنَاتٍ فَلَا تَرْجِعُوهُنَّ إِلَى الْكُفَّارِ ۖ لَا هُنَّ حِلٌّ لَّهُمْ وَلَا هُمْ يَحِلُّونَ لَهُنَّ ۖ وَآتُوهُم مَّا أَنفَقُوا ۚ وَلَا جُنَاحَ عَلَيْكُمْ أَن تَنكِحُوهُنَّ إِذَا آتَيْتُمُوهُنَّ أُجُورَهُنَّ ۚ وَلَا تُمْسِكُوا بِعِصَمِ الْكَوَافِرِ وَاسْأَلُوا مَا أَنفَقْتُمْ وَلْيَسْأَلُوا مَا أَنفَقُوا ۚ ذَٰلِكُمْ حُكْمُ اللَّهِ ۖ يَحْكُمُ بَيْنَكُمْ ۚ وَاللَّهُ عَلِيمٌ حَكِيمٌ
“মুমিনগণ, যখন তোমাদের কাছে ঈমানদার নারীরা হিজরত করে করে, তখন তাদেরকে পরীক্ষা কর। আল্লাহ তাদের ঈমান সম্পর্কে সম্যক অবগত আছেন। যদি তোমরা জান যে, তারা ঈমানদার, তবে আর তাদেরকে কাফেরদের কাছে ফেরত পাঠিও না। এরা কাফেরদের জন্যে হালাল নয় এবং কাফেররা এদের জন্যে হালাল নয়। কাফেররা যা ব্যয় করেছে, তা তাদের দিয়ে দাও। তোমরা, এই নারীদেরকে প্রাপ্য মোহরানা দিয়ে বিবাহ করলে তোমাদের অপরাধ হবে না। তোমরা কাফের নারীদের সাথে দাম্পত্য সম্পর্ক বজায় রেখো না। তোমরা যা ব্যয় করেছ, তা চেয়ে নাও এবং তারাও চেয়ে নিবে যা তারা ব্যয় করেছে। এটা আল্লাহর বিধান; তিনি তোমাদের মধ্যে ফয়সালা করেন। আল্লাহ সর্বজ্ঞ প্রজ্ঞাময়।” (৬০:১০)