এ অধ্যায়ের বিষয়সমূহ
Toggleওমরাতুল ক্বাযা পালন
الشَّهْرُ الْحَرَامُ بِالشَّهْرِ الْحَرَامِ وَالْحُرُمَاتُ قِصَاصٌ ۚ فَمَنِ اعْتَدَىٰ عَلَيْكُمْ فَاعْتَدُوا عَلَيْهِ بِمِثْلِ مَا اعْتَدَىٰ عَلَيْكُمْ ۚ وَاتَّقُوا اللَّهَ وَاعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ مَعَ الْمُتَّقِينَ
“একটি সম্মানিত মাসের বদলে একটি সম্মানিত মাস এবং সম্মানিত সবকিছুতেই সমতার নীতি। কেউ যদি তোমাদের উপর বল প্রয়োগ করে তোমরাও বল প্রয়োগ করো যেমনি তারা তোমাদের উপর করেছে। এবং (বাড়াবাড়ির ব্যাপারে) আল্লাহকে ভয় কর – (বাড়াবাড়িমুক্ত) ভয়কারীদের সাথে আল্লাহ্ আছেন।” (২:১৯৪)
হুদায়বিয়া সন্ধির এক বছর শেষে আবারও হজ্জ্ব মওসূম এসে গেলো। পূর্ববর্তী বছরের হজ্জ্ব ও ওমরা পালন করতে বাধাগ্রস্ত হওয়ায় এ বছর এর ক্বাযা পালন করার জন্য নবী করীম (সাঃ) প্রস্তুত হয়ে গেলেন। বিপুল উৎসাহ উদ্দীপনায় এবার দুই হাজার সদস্যের একটি হজ্জ্ব কাফেলা প্রস্তুত হয়ে গেলো। প্রিয় মাতৃভূমির বিরহে কাতর মুহাজির মুসলমানগণের মধ্যে আনন্দের বন্যা বইছে – কারণ দীর্ঘদিন পর তারা স্বদেশের মুখ দেখতে পাবেন। গত বছর তাঁরা মক্কার দ্বারপ্রান্ত থেকে আশাহত হয়ে ফিরে এসেছিলেন। কিন্তু এবার তাঁরা বুকভরা আশা নিয়ে স্বদেশ পানে যাত্রা করছেন। নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে নবী করীম (সাঃ) একশত সদস্যের একটি অগ্রবর্তী দল পাঠালেন। এ দলের অধিনায়ক করলেন মুহাম্মদ ইবনে মাসলামা (রাঃ)-কে। তাঁকে নির্দেশ দিলেন তিনি যেন মক্কার হেরেমে প্রবেশ না করে নিকটস্থ মাররায যাহরানে অবস্থান করেন। এর উদ্দেশ্য ছিল কুরাইশরা কোনরূপ দুরভিসন্ধি করছে কি না তা নিরীক্ষণ করা।
নবীজী (সাঃ) এর নেতৃত্বে হজ্জ্ব কাফেলার যাত্রা শুরু হলো। তাঁর বাহন ছিল ’কাসওয়া’ নামক একটি উট। সঙ্গে ছিল ষাটটি কুরবানীর পশু। তাঁরা ছিলেন নিরস্ত্র – শুধু ভ্রমণকালীন কোষবদ্ধ তরবারী ছিল তাঁদের হাতে। ’ইহরাম’ (হজ্জ্ব পালনের নিমিত্তে দু’প্রস্ত শ্বেতশুভ্র সেলাইবিহীন কাপড়) বাঁধা অবস্থায় মক্কার হেরেমে প্রবেশ করার সময় সমবেত কন্ঠে মুহুর্মুহু উচ্চারিত হতে থাকলো “লাব্বায়েক আল্লাহুম্মা লাব্বায়েক (আমি উপস্থিত ইয় আল্লাহ্ তোমার দরবারে আমি উপস্থিত)।” চার দিক প্রকম্পিত করে কুরাইশদের কর্ণকুহরে প্রবেশ করলো এ মধুর ধ্বনি এবং তারা দেখতে পেলো দুই হাজার মানুষের সমাবেশের এক শুভ্র সমুজ্জ্বল দৃশ্য। সন্ধিচুক্তির শর্তানুযায়ী তাদের নেতৃবর্গ ও বিত্তশালীরা ইতোমধ্যেই শহর খালি করে দিয়ে তিন দিনের জন্য অদূরবর্তী পাহাড়ে আশ্রয় নিয়েছিল। তবে অনেক সাধারণ মানুষ শহরেই অবস্থান করছিল।
নবীজী (সাঃ) কা’বা গৃহ তাওয়াফের মাধ্যমে হজ্জ্বের আনুষ্ঠানিকতা শুরু করেন। তিনি ’হজরে আসওয়াদ’ পাথরটি চুম্বন করেন। কা’বা সাতবার তাওয়াফ করার সময় সাহবাগণ তাঁকে অনুসরণ করেন। এরপর তাঁরা সাফা-মারওয়া সাতবার প্রদক্ষিণ করেন। মারওয়া পাহাড়ের কাছে পশু কুরবানী সম্পন্ন করে তাঁরা মস্তক মুন্ডন করেন। এসব আনুষ্ঠানিকতা শেষে তিনি কা’বা গৃহে যান যোহরের নামায আদায়ের উদ্দেশ্যে। হযরত বিলাল (রাঃ) কা’বা গৃহের ছাদে উঠে আযান দেওয়ার পর নামায শুরু হয়। বিনীত ও সুশৃঙ্খলভাবে পালিত হয় হজ্জ্বের সকল আনুষ্ঠানিকতা। মক্কার কুরাইশরা বিভিন্ন স্থান থেকে বিমোহিত চিত্তে অবলোকন করছিল মুসলমানদের এসব কর্মকান্ড। হজ্জ্বের আনুষ্ঠানিকতা শেষে মুসলিম মুহাজির ভাইগণ তাঁদের আনসার ভাইদের নিয়ে শহর ঘুরতে বের হলেন এবং নিজেদের ফেলে যাওয়া বাড়িঘর তাঁদের দেখালেন। খুবই অন্তরঙ্গভাবে মক্কায় তাঁদের জন্য নির্ধারিত তিনদিন সময় কেটে গেলো।
মক্কা ছাড়ার ক্ষণ ঘনিয়ে আসলো। এমন সময় মক্কার একজন মুসলিম মহিলা হযরত মায়মূনা (রাঃ) নবীজী (সাঃ) এর নিকট বিয়ের প্রস্তাব পাঠালে তিনি তা গ্রহণ করলেন। বিয়ের পর তিনি সেখানে ওলীমা ভোজের আয়োজন করার ইচ্ছা পোষণ করেন এবং তাতে কুরাইশদেরকে দাওয়াত করতে চাইলেন। কিন্তু কুরাইশরা তা প্রত্যাখ্যান করে নবীজী (সাঃ)-কে মক্কা ছাড়ার তাগিদ দিলো। নির্ধারিত সময়ে নবীজী (সাঃ) সবাইকে নিয়ে মদীনার পথে রওয়ানা দিলেন। মুসলমানদের এ হজ্জ্ব পালনকালীন দৃশ্য মক্কার কুরাইশদের অনেকের মনেই দোলা দিয়েছিল। তাদের কয়েকজন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি ইসলামের প্রতি প্রবলভাবে ঝুঁকে পড়েছিলেন।
বিশিষ্ট জনের ইসলামের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ
মুসলমানদের ওমরাতুল ক্বাযা পালনকালীন অপূর্ব স্বর্গীয় দৃশ্য অবলোকন করে মক্কাবাসীরা বিমোহিত হয়ে পড়েছিল। এর প্রভাব তাদের মধ্যে এক অন্তর্বিপ্লব সৃষ্টি করে। ফলে ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে তাদের কট্টর মনোভাব পরিবর্তনের সূচনা ঘটে। এর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ছিলেন খালীদ বিন ওয়ালীদ। বদর যুদ্ধে তিনি তাঁর পিতা, পিতৃব্য ও পিতৃব্য ভাইকে হারিয়ে ছিলেন। ওহুদ যুদ্ধে মুসলমানদের বিপর্যয় ঘটানোর নায়ক ছিলেন তিনি। বছরখানেক পূর্বেও তিনি মুসলিম হজ্জ্ব যাত্রীদলকে মক্কা প্রবেশে বাধা দেওয়ার জন্য কুরাইশ বাহিনীর নেতৃত্ব দেন। সেই খালীদ বিন ওয়ালীদের অন্তর ইসলামের আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে উঠে। তিনি প্রকাশ্যে ইসলাম গ্রহণের ঘোষণা দিলেন। এতে কুরাইশ নেতৃবর্গ ক্ষিপ্ত হয়ে পড়ে। তারা তাঁকে স্মরণ করিয়ে দেয় বদর যুদ্ধে তাঁর স্বজন হারানোর বিয়োগ ব্যথা। তিনি বললেন, ’সে তো অজ্ঞতার যুগের কথা। এখন সত্য আমার কাছে সমাগত। তাই আমি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছি।’ এরপর তিনি মদীনায় গিয়ে নবীজী (সাঃ) এর সাথে মিলিত হন। এর অব্যবহিত পরে আরও দু’জন বিশিষ্ট ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণ করেন। তাঁরা হলেন আমর ইবনে আস ও ওসমান ইবনে তালহা। এঁদের ইসলাম গ্রহণ মক্কায় ইসলামের দ্বার ক্রমশ উম্মুক্ত হয়ে পড়লো।
ইসলাম প্রচারক দলের উপর হামলা
ইসলাম প্রচারক দলের উপর দু’টি পৃথক হৃদয় বিদারক ঘটনা ঘটলো। নবীজী (সাঃ) পঁচিশ সদস্যের একটি দলকে ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে বনু সুলায়ম গোত্রে প্রেরণ করেন। এ গোত্রের লোকেরা বিশ্বাসঘাতকতা করে একজন ব্যতীত সবাইকে হত্যা করে। এ ঘটনায় নবীজী (সাঃ) সুলায়ম গোত্রের বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক অভিযান চালিয়ে তাদেরকে পরাস্ত করেন। অপর এক ঘটনায় তিনি পনেরো সদস্যের আরেকটি দলকে সিরিয়া সীমান্তের নিকটে ‘যাতুত তালহা’ নামক স্থানে মুররা গোত্রের মুশরিকদের মধ্যে ইসলাম প্রচার করতে পাঠান। সেখানেও একই ঘটনা ঘটে। বিশ্বাসঘাতকতাপূর্বক একজন বাদে সবাইকে তারা হত্যা করে।
মুতার যুদ্ধ
অষ্টম হিজরী সনে নবী করীম (সাঃ) বুসরার রোমান প্রাদেশিক গভর্ণর শোরাহবিল ইবনে আমর গাসসানী কর্তৃক মুসলিম পত্রদূতকে হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য তিন হাজার সৈন্যের একটি বাহিনী প্রেরণ করেন – যার অধিনায়কত্বে ছিলেন হযরত যায়েদ ইবনে হারেছ (রাঃ)। নবীজী (সাঃ) এর নির্দেশ ছিল যায়েদ (রাঃ) শহীদ হলে হযরত জাফর ইবনে আবু তালিব (রাঃ) নেতৃত্ব দিবেন। আর তিনিও যদি শহীদ হন তখন হযরত আব্দুল্লাহ্ ইবনে রাওহা (রাঃ) অধিনায়কত্ব করবেন। উল্লেখ্য যে, নব্য মুসলিম খালীদ বিন ওয়ালীদ (রাঃ) স্বেচ্ছায় এ বাহিনীতে যোগ দেন। মুসলিম বাহিনী মায়ান নামক স্থানে পৌঁছে শত্রু বাহিনীর বিপুল সংখ্যক সৈন্য সমাবেশের খবর জানতে পারেন – যাদের সংখ্যা ছিল প্রায় দেড় লক্ষ। রোমান সৈন্য ছাড়াও এ বাহিনীতে তাদের সহযোগি ছিল সেখানকার বাধ্যগত আরবীয় খৃস্টান ও মুশরিক গোত্রের লোকজন। এত বড় একটি বাহিনীর মোকাবেলায় এত ক্ষুদ্র একটি বাহিনীর সামর্থ্যের ব্যাপারে মুসলমানগণ দ্বিধান্বিত হয়ে পড়েন। তাঁরা বিষয়টি নবীজী (সাঃ)-কে জানানোর চিন্তা করলেন। কিন্তু হযরত আব্দুল্লাহ্ ইবনে রাওহা (রাঃ) এর তেজস্বী বক্তব্যে তাঁদের মধ্যে ঈমানী ও শহীদী চেতনা উজ্জীবিত ও সুদৃঢ় হয়ে উঠলো। তাঁরা সর্বশক্তিমান মহান আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করলেন। ফলে সংখ্যাল্পতার চিন্তা তাঁদের মন থেকে দূরীভূত হয়ে গেলো। তাঁরা শত্রু বাহিনীর মোকাবেলার জন্য সম্মুখ পানে অগ্রসর হলেন। জর্ডান নদীর পূর্ব তীরে মুতা নামক এক পল্লীতে মুসলিম বাহিনীর শিবির স্থাপিত হলো। এক বিশাল শত্রুবাহনীর বিরুদ্ধে অসম যুদ্ধে লিপ্ত হলো অতি ক্ষুদ্র এক মুসলিম বাহিনী।
ইসলামের পতাকা বহনকারী সেনাপতি হযরত যায়েদ (রাঃ) এর নেতৃত্বে ঈমানী শক্তিতে বলীয়ান ও শহীদী চেতনায় অনুপ্রাণিত মুসলিম বাহিনী শত্রু ব্যুহ ভেদ করে ঢুকে পড়লো রণাঙ্গনের অভ্যন্তরে। একের পর এক শত্রু নিধন করে চললেন তাঁরা। রোমান সৈন্যরা চারদিক থেকে হযরত যায়েদ (রাঃ) এর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। আঘাতের পর আঘাতের শিকার হয়ে এক সময় তিনি শাহাদৎ বরণ করেন। নিমিষে পতাকা ধারণ করেন হযরত জাফর ইবনে আবু তালিব (রাঃ)। ডান হাতে পতাকা ও বাম হাতে অসি নিয়ে নির্নিমেষ আক্রমণে শত্রুবাহিনীকে তূলোধুনো করতে থাকেন তিনি। তাঁকেও শত্রুবাহিনী ঘিরে ধরে। তিনি লাফ দিয়ে ঘোড়া থেকে নেমে শত্রুর ঝাঁপিয়ে পড়লেন। এক সময় শত্রুরা তাঁর ডান হাতটি কেটে ফেললে তিনি বাম হাতে পতাকা ধারণ করেন। এরপর বাম হাতটি কাটা পড়লে তিনি দুই বাহু দিয়ে পতাকা উঁচিয়ে রাখলেন। অবশেষে তিনিও শাহাদৎ বরণ করেন। এবার পতাকা ধরার পালা হযরত আব্দুল্লাহ্ ইবনে রাওহা (রাঃ) এর উপর। যুদ্ধ পরিস্থিতির কথা চিন্তা করে তিনি কয়েক মুহূর্ত দেরী হলো তাঁর পতাকা ধারণ করতে। অবশেষে সব চিন্তা ঝেড়ে ফেলে তিনি তৎক্ষণাৎ পতাকা হাতে শত্রুর ব্যুহে ঢুকে পড়লেন এবং ক্রমাগত অসি চালিয়ে শত্রু নিধন করতে থাকেন। শেষ পর্যন্ত তিনিও শহীদ হয়ে গেলেন।
এভাবে পরপর তিনজন সেনাপতি শাহাদৎ বরণ করলে মুসলিম বাহিনীর সিদ্ধান্তে সেনাপতিত্বের দায়িত্বভার অর্পিত হয় নব্য মুসলিম বিখ্যাত কুরাইশ বীর হযরত খালীদ ইবনে ওয়ালীদ (রাঃ) এর উপর। অত্যন্ত বিচক্ষণ সেনাপতি খালীদ (রাঃ) দ্রুত মুসলিম বাহিনীর মধ্যে মনোবল ও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনলেন। নতুন এক পদ্ধতিতে নিজ বাহিনীকে পুনর্বিন্যস্ত করে তিনি শত্রুর আক্রমণ প্রতিহত করে দিলেন। এ যুদ্ধে শত্রু নিধনে হযরত খালীদ (রাঃ) এর নয়টি তরবারি ভেঙ্গে যায়। এ অসামান্য বীরত্বের জন্য নবীজী (সাঃ) তাঁকে ‘সাইফুল্লাহ্’ (আল্লাহর তরবারি) উপাধি দেন।
এদিকে সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসলে প্রথম দিনের যুদ্ধ বিরতি ঘটলো। প্রথম দিনে মুসলিম বাহিনীর মনোবল, সাহসিকতা ও দৃঢ়তা এবং শত্রুবাহিনীর বিপুল সৈন্যক্ষয় ছিল লক্ষ্যণীয়। রাতে খালীদ (রাঃ) এক কৌশলের আশ্রয় নিলেন। সৈন্য বাহিনীর একটি অংশকে তিনি রণাঙ্গণ থেকে সামান্য পিছু হটিয়ে রাখলেন এবং পরদিন ভোরবেলা এসব সৈন্য তকবীর ধ্বনিসহকারে মুসলিম বাহিনীর সাথে মিলিত হলো। এতে শত্রুবাহিনী মনে করলো মুসলিম বাহিনীতে নতুন সৈন্য সমাবেশ ঘটেছে। বিপুল সংখ্যাধিক্য থাকা সত্ত্বেও দ্বিতীয় দিনে শত্রুবাহিনী সাহস হারিয়ে ফেললো। মুসলিম সৈন্যদের অদম্য সাহসিকতা ও বীরত্বে তাদের যুদ্ধ স্পৃহা কমে গেলো এবং পুনরায় আক্রমণে শৈথিল্য প্রদর্শন করলো। তাদেরকে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মুসলিম বাহিনীও পুনঃ আক্রমণ থেকে নিবৃত হলো। অবশেষে সেনাধ্যক্ষ খালীদ (রাঃ) সুকৌশলে নিজ বাহিনীকে রণাঙ্গণ থেকে প্রত্যাহার করে নেন এবং মদীনায় ফিরে আসেন। বস্তুত এ যুদ্ধে কোন পক্ষই চূড়ান্ত বিজয় লাভ করতে পারেনি।
শোকাহত মদীনাবাসী
মুতার যুদ্ধে মুসলিম বাহিনীর তিন জন সেনাপতিসহ মোট বারো বা পনেরো জন শহাদাৎ লাভ করেন। তবে রোমানদের কত জন মারা গিয়েছিল তা জানা যায়নি। হযরত জাফর (রাঃ) এর শরীরে নব্বইটি আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গিয়েছিলো। (সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৪২৬১)। তাঁর দু’টি হাত কাটা পড়ায় তাঁকে দু’ডানার মানুষ বলে অভিহিত করা হয়। (সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৪২৬৪)। হযরত আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত এক হাদীসে জানা যায় হযরত যায়েদ, জাফর ও ইবনে রাওহার শাহাদাতের সংবাদ মদীনায় পৌঁছার পূর্বেই নবী করীম (সাঃ) ওহী মারফৎ রণাঙ্গণের সব খবর জেনে গিয়েছিলেন এবং (মদীনার) জনগণকে বলেছিলেন, “যায়েদ পতাকা ধারণ করলো ও শহীদ হলো, এরপর জাফর তা ধারণ করলো এবং শাহাদাৎ বরণ করলো, শেষে ইবনে রাওহা পতাকা তুলে নিলো এবং সেও শহীদ হয়ে গেলো। এ সময় নবীজী (সাঃ) এর চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরছিলো।” তিনি আরও বলেন, “এরপর পতাকা ধারণ করলো এক তরবারি যে হলো ‘আল্লাহর তরবারি” (‘সাইফুল্লাহ্’ উপাধি প্রাপ্ত হযরত খালীদ রাঃ)। (সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৪২৬২)। হযরত খালীদ (রাঃ) বলেন, “মুতার যুদ্ধের দিনে আমার হাত দিয়ে নয়টি তরবারি ভেঙ্গে যায়, শুধুমাত্র একটি ইয়েমেনী তরবারি আমার হাতে অবশিষ্ট ছিল।” (সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৪২৬৬)
শোকাহত পরিবারগুলোর নারী–শিশুদের বুকফাটা কান্নায় নবীজী (সাঃ) এর চোখ বেয়ে অশ্রু ঝরছিল। আরবের রীতি অনুযায়ী কান্না ও বিলাপের মাধ্যমে মৃতের শোক পালন করা হতো। নবীজী (সাঃ) এ প্রথা নিষিদ্ধ করে দেন। তিনি মৃতের জন্য ধৈর্য ধারণ ও মাগফেরাতের দোয়া করার উপদেশ দিতেন। তাঁর চোখে পানি দেখে অনেকে বিস্মিত হলে তিনি বললেন, ‘আমিও তো একজন মানুষ এবং চোখের পানি মানবিক অভিব্যক্তির প্রকাশমাত্র।’
‘যাতুস সালাসিলে’ অভিযান
নবী করীম (সাঃ) মুতার যুদ্ধের কিছুদিন পর সিরিয়ার সীমান্তবর্তী ‘যাতুস সালাসিলে’ অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত নেন। তিনি নব্য মুসলিম হযরত আমর ইবনে আস (রাঃ)-কে অধিনায়ক করে একটি ক্ষুদ্র বাহিনী সে এলাকায় প্রেরণ করেন। আমর (রাঃ) এর বাড়ি ঐ এলাকায় ছিল বিধায় তিনি তাঁকে সেখানকার বাসিন্দাদেরকে সে অভিযানে শরীক করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু অবস্থা বেগতিক দেখে তিনি নবীজী (সাঃ) এর নিকট আরও সৈন্য পাঠাবার অনুরোধ করলেন। নবীজী (সাঃ) হযরত আবু উবায়দার (রাঃ) এর নেতৃত্বে একটি সহায়ক বাহিনী পাঠালেন। তাঁকে নির্দেশ দিলেন নব্য মুসলিম আমর (রাঃ) এর সাথে কোনরূপ মতবিরোধ ছাড়াই যেন যুদ্ধ পরিচালনা করেন। এ দলে ছিলেন হযরত আবু বকর (রাঃ) ও হযরত ওমর (রাঃ) এর মতো উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন সাহাবাবৃন্দ। মুসলিম বাহিনী সে এলাকায় অভিযান চালিয়ে সিরীয় বাহিনীকে ছত্রভঙ্গ করে দেয়। ফলে সিরীয় সীমান্ত অঞ্চলে মুসলমানদের প্রভাব–প্রতিপত্তি বৃদ্ধি পায় এবং মদীনার মুসলিম রাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়।