এ অধ্যায়ের বিষয়সমূহ
Toggleতাঁর আবির্ভাবকালীন সামাজিক ও পারিপার্শ্বিক অবস্থা
হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) যে যুগে জন্ম গ্রহণ করেছিলেন ইতিহাসের পাতায় তা ’আইয়ামে জাহিলিয়াত’ অর্থাৎ অন্ধকার যুগ নামে পরিচিত। রোমক ও পারসিক তৎকালীন দুটো বিশাল সভ্যতার অতি কাছাকাছি অবস্থান করেও আরব ছিল সম্পূর্ণ স্বাধীন। সেই সব সভ্যতার ছিটেফোঁটা প্রভাবও তাদের পড়েনি। বহু গোত্রে বিভক্ত আরব জাতি ছিল মরুচারী বেদুঈন। তাদের কোন সরকার ছিল না। একমাত্র নিজ গোত্রের প্রতি আনুগত্য ছাড়া আর অন্য কোন কিছুর পরোয়া তারা করত না। ফলে গোত্রে গোত্রে হানাহানি, রেষারেষি ও কোন্দল এবং প্রতিহিংসার বশে প্রজন্ম থেকে প্রজান্মান্তর অবধি যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়াই ছিল তাদের রীতি। হত্যা, লুটপাট, দস্যুবৃত্তি, মদ্যপান, জুয়াখেলা, বেশ্যাবৃত্তির মত কোন অপরাধ বা অপকর্ম বাদ ছিল না যা তারা করত না। এমন কি নিজের কন্যা সন্তানকেও জীবন্ত কবর দিতেও তাদের কোন দ্বিধাবোধ করত না। রুক্ষ প্রতিকূল পরিবেশে গড়ে ওঠা শত শত বছরের লালিত নির্মম কঠিন চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের মানুষ ছিল তারা। বেপরোয়া জীবনের অধিকারী এসব মানুষ ছিল অনেকটা হৃদয়হীন পাষাণতুল্য।
“আইয়্যামে জাহেলিয়াত” নামে পরিচিত এক অন্ধকার যুগে মুহাম্মদ (সাঃ) জন্মগ্রহণ করেন। শিরকের মত মহাপাপ এবং যুলুম ও কুসংস্কারের আবর্তে পড়ে তখন মানবজাতি ছিল কলুষিত ও দিশাহারা। পৌত্তলিকতা, ভ্রান্ত বিশ্বাস, কুসংস্কার, অশ্লীলতা ও নির্লজ্জতা, পারস্পরিক অনৈক্য, গোত্রে গোত্রে হানাহানি, বংশ পরম্পরায় প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধের স্পৃহা এবং বিভিন্ন ধরনের অপকর্মে লিপ্ত ছিল মানব সমাজ। এক ও অদ্বিতীয় আল্লাহর উপাসনাগৃহ কা’বায় ৩৬০টি মূর্তি স্থাপন করে এর পবিত্রতা সম্পূর্ণ নষ্ট করে ফেলা হয়। আবসিনিয়িায় হিজরতকারী মুসলিম অভিবাসীদের নেতা হযরত জাফর ইবনে আবু তালেব (রাঃ) সে দেশের সম্রাট নেগাসের সম্মুখে হিজরতের প্রেক্ষাপট বর্ণনাকালে যে বক্তব্য তুলে ধরেছিলেন তাতে সে সময়ের অবস্থার একটি চিত্র নিখুঁতভাবে ফুটে ওঠে। তিনি সম্রাটকে বলেন,
“হে রাজন! আমাদের অবস্থা এমন ছিল যে, লোকজন অজ্ঞানতা, র্ববরতা ও অনতৈকতিা, স্বহস্তে গড়া প্রস্তর নির্মিত মূর্তিকে পূজা, হারাম খাদ্য যেমন, মৃত পশুর মাংস ভক্ষণ, অবাধ যৌনাচার, লুন্ঠন, আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্নকরণ, অতিথি ও প্রতবিশেীর সাথে দুর্ব্যবহার, সবল কর্তৃক দুর্বলের ওপর শোষণ ও নির্যাতনের মতো সব ধরনের পাপাচারে লিপ্ত ছিল …. ।”
সেটিই ছিল তৎকালীন সমাজের বাস্তব চিত্র। পথভ্রষ্ট বনী–ইসরাঈলীরা যখন নবী হযরত ঈসা (আঃ)-কে হত্যার ষড়যন্ত্র করে তখন তাঁকে আল্লাহ্ রব্বুল আলামীন ঊর্ধাকাশে নিজের কাছে তুলে নেন। এরপর এক দীর্ঘ সময় ধরে মানুষের আধ্যাত্মিক পরিমন্ডলে চলছিল এক তীব্র খরা। শতসহস্র উপাস্যের আরাধনা ও দাসত্বের শৃঙ্খলে বাঁধা পড়েছিল মানবাত্মা। মানবজাতির নীতি – নৈতিকতায় নেমেছিল ভয়াবহ ধস। শিরকের মত মহাপাপ এবং যুলুম ও কুসংস্কারের আবর্তে পড়ে তখন মানবজাতি ছিল কলুষিত ও দিশাহারা। সমগ্র আরবভূমি ছিল নীতি–নৈতিকতাহীন এক বর্বরতার প্রতিচ্ছবি। পৌত্তলিকতায় তাদের মন – প্রাণ ছিল আচ্ছন্ন। পাথর, গাছ, তারকা, মূর্তি, প্রেতাত্মা, এমন কিছু নেই যার উপাসনা তারা করত না। পবিত্র মক্কা নগরীর কাবা গৃহে অধিষ্ঠিত ৩৬০টি মূর্তির পূজা -অর্চনায় তারা ছিল নিবেদিত। তাদের লক্ষ্যহীন জীবন ধর্মীয় নীতি ও মূল্যবোধ থেকে বহু দূরে সরে গিয়েছিল। যদিও তাদের মাতৃভাষা আরবী তৎকালীন সময়ের এক সমৃদ্ধ সাবলীল ভাষা হিসেবে সুনাম অর্জন করেছিল এবং আরবদের কাব্য প্রতিভাও ছিল উন্নত, তবুও তাদের চিন্তাধারা, কৃষ্টি ও সংস্কৃতি ছিল বন্ধ্যা ও পশ্চাদমুখী।
প্রায় চৌদ্দশত বছর পূর্বে মহান আল্লাহ্ রব্বুল আলামীন সর্বশেষ নবী ও রসূল হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-কে এ দুনিয়ার বুকে প্রেরণ করেছিলেন সেই “আইয়্যামে জাহেলিয়াত” নামীয় এক অন্ধকার যুগে। এহেন বিরূপ ও ঘন তমসাচ্ছন্ন পরিস্থিতিতে এক দীর্ঘ বিরতির পর মহান আল্লাহ্ তায়ালা হযরত মুহাম্মদ (সা)-কে তাঁর সর্বশেষ নবী ও রসূল হিসেবে পাঠালেন এ দুনিয়ার বুকে।
এ প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ্ বলেন,
هُوَ الَّذِیْ بَعَثَ فِی الْاُمِّیّٖنَ رَسُوْلًا مِّنْهُمْ یَتْلُوْا عَلَیْهِمْ اٰیٰتِہٖ وَ یُزَكِیْهِمْ وَ یُعَلِّمُهُمُ الْكِتٰبَ وَ الْحِکْمَۃَ ٭ وَ اِنْ كَانُوْا مِنْ قَبْلُ لَفِیْ ضَلٰلٍ مُّبِیْنٍ وَّ اٰخَرِیْنَ مِنْهُمْ لَمَّا یَلْحَقُوْا بِهِمْ ؕ وَ هُوَ الْعَزِیْزُ الْحَكِیْمُ
“তিনিই নিরক্ষরদের মধ্য থেকে একজন রসূল প্রেরণ করেছেন, যিনি তাদের কাছে পাঠ করেন তার আয়াতসমূহ, তাদেরকে পবিত্র করেন এবং শিক্ষা দেন কিতাব ও হিকমত। ইতিপূর্বে তারা ছিল ঘোর পথভ্রষ্টতায় লিপ্ত। এই রসূল প্রেরিত হয়েছেন অন্য আরও লোকদের জন্যে, যারা এখনও তাদের সাথে মিলিত হয়নি। তিনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।” (৬২:২ – ৩)
كَمَاۤ اَرْسَلْنَا فِيْكُمْ رَسُوْلًا مِّنْكُمْ يَتْلُوْا عَلَيْكُمْ اٰيٰتِنَا وَيُزَكِّيْكُمْ وَيُعَلِّمُكُمُ الْكِتٰبَ وَالْحِكْمَةَ وَيُعَلِّمُكُمْ مَّا لَمْ تَكُوْنُوْا تَعْلَمُوْنَ
“আমি পাঠিয়েছি তোমাদেরই মধ্য থেকে তোমাদের জন্যে একজন রসূল, যিনি তোমাদের নিকট আমার বাণীসমূহ পাঠ করবেন এবং তোমাদের পবিত্র করবেন; আর তোমাদের শিক্ষা দেবেন কিতাব ও তাঁর তত্ত্বজ্ঞান এবং শিক্ষা দেবেন এমন বিষয় যা কখনো তোমরা জানতে না।” (২:১৫১)
الٓر كِتٰبٌ اَنْزَلْنٰهُ اِلَيْكَ لِتُخْرِجَ النَّاسَ مِنَ الظُّلُمٰتِ اِلَى النُّوْرِ بِاِذْنِ رَبِّهِمْ اِلٰى صِرٰطِ الْعَزِيْزِ الْحَمِيْدِ
“আলিফ-লাম-রা; এটি একটি গ্রন্থ, যা আমি আপনার প্রতি নাযিল করেছি – যাতে আপনি মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের করে আনেন — পরাক্রান্ত, প্রশংসারযোগ্য পালনকর্তার নির্দেশে তাঁরই পথের দিকে।” (১৪:০১)
وَاعْتَصِمُوا بِحَبْلِ اللَّهِ جَمِيعًا وَلَا تَفَرَّقُوا ۚ وَاذْكُرُوا نِعْمَتَ اللَّهِ عَلَيْكُمْ إِذْ كُنتُمْ أَعْدَاءً فَأَلَّفَ بَيْنَ قُلُوبِكُمْ فَأَصْبَحْتُم بِنِعْمَتِهِ إِخْوَانًا وَكُنتُمْ عَلَىٰ شَفَا حُفْرَةٍ مِّنَ النَّارِ فَأَنقَذَكُم مِّنْهَا ۗ كَذَٰلِكَ يُبَيِّنُ اللَّهُ لَكُمْ آيَاتِهِ لَعَلَّكُمْ تَهْتَدُونَ
“আর তোমরা সকলে আল্লাহর রজ্জুকে সুদৃঢ় হস্তে ধারণ কর; পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না। আর তোমরা সে নেয়ামতের কথা স্মরণ কর, যা আল্লাহ তোমাদিগকে দান করেছেন। তোমরা পরস্পর শত্রু ছিলে। অতঃপর আল্লাহ তোমাদের মনে সম্প্রীতি দান করেছেন। ফলে, এখন তোমরা তাঁর অনুগ্রহের কারণে পরস্পর ভাই ভাই হয়েছ। তোমরা এক অগ্নিকুন্ডের পাড়ে অবস্থান করছিলে। অতঃপর তা থেকে তিনি তোমাদেরকে মুক্তি দিয়েছেন। এভাবেই আল্লাহ নিজের নিদর্শনসমূহ প্রকাশ করেন, যাতে তোমরা হেদায়েত প্রাপ্ত হতে পার।” (৩:১০৩)
তাঁর পিতা-মাতা ও বংশ পরিচয়
হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) পারিবারিকভাবে সম্ভ্রান্ত মক্কার কুরাইশ বংশের হাশেমী গোত্রের অন্তর্ভুক্ত। তিনি ছিলেন নবী হযরত ইব্রাহীম (আঃ) ও তদীয় পুত্র নবী হযরত ইসমাঈল (আঃ) এর উত্তরসূরী এবং একই বংশের ধারক ও বাহক । নবী করীম (সাঃ)- এর দ্বাদশ পূর্বপুরুষ নযর ইবনে কেনানাহ ছিলেন কা’বা গৃহের খাদেম এবং তাঁর বংশধরগণ হলেন কুরাইশ। তাঁর দাদা আব্দুল মুত্তালিব (প্রকৃত নাম শায়বা) ছিলেন কুরাইশদের নেতা বিত্তশালী হাশিমের পুত্র এবং আবদে মান্নাফের পৌত্র।। শায়বা। পরবর্তীতে আব্দুল মুত্তালিব নামে সুপরিচিত হন। তিনি ছিলেন মক্কার অন্যতম গোত্রপতি ও পবিত্র কা’বা গৃহের রক্ষাণাবেক্ষণকারী। তাঁরই সর্বকনিষ্ঠ পুত্র আব্দুল্লাহ হলেন নবী করীম (সাঃ)- এর পিতা। নবী–মাতা আমেনা ছিলেন মদীনার পার্শ্ববর্তী যোহরা গোত্রভুক্ত।
পুত্র সন্তান কুরবানীর মা’নত পূরণ সংক্রান্ত ঘটনা
প্রথমদিকে সন্তানাদি কম থাকায় মক্কার কুরাইশ সমাজে প্রভাব–প্রতিপত্তি ক্ষুন্ন হতে পারে – এমন আশংকা করছিলেন গোত্রপতি আব্দুল মুত্তালিব। “জমজম” কূপ পুনর্খননের সময় এ সত্য উপলব্ধী করেন তিনি। তাই তিনি দশটি পুত্র সন্তান কামনা করে মা’নত করলেন, মনোবাসনা পূর্ণ হলে এবং সন্তানেরা বয়ঃপ্রাপ্ত হলে তিনি একটি সন্তানকে কা’বা গৃহের সম্মুখে কুরবানী করবেন। মহান আল্লাহর অশেষ রহমতে তাঁর মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হয় এবং তিনি দশজন পুত্র সন্তান লাভ করেন। এদের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ ছিলেন আব্দুল্লাহ্। তিনি ছিলেন সুদর্শন ও আব্দুল মুত্তালিবের সবচেয়ে প্রিয় সন্তান। তাঁর সৌন্দর্য ও অমায়িক ব্যবহারের জন্য আত্মীয়–স্বজন ও মক্কাবাসীর নিকট ছিলেন খুবই প্রিয়। আব্দুল মুত্তালিব তাঁর মা’নত পূরণে কাকে কুরবানী দেবেন এ নিমিত্তে এক লটারীর আয়োজন করেন। সন্তানেরা লটারীর সিদ্ধান্ত মেনে নিতে নির্দ্বিধায় সম্মত হলেন। লটারীতে নাম উঠে প্রিয়তম পুত্র আব্দুল্লাহর। এতে আব্দুল মুত্তালিব বিমর্ষবোধ করলেও ওয়াদা পালনে ছিলেন বদ্ধপরিকর। প্রিয় ভ্রাতা আব্দুল্লাহর জন্য বোনেরা কাঁদতে শুরু করলেন। তাঁর মাতুল এবং মক্কাবাসীরা আব্দুল মুত্তালিবকে এ সিদ্ধান্ত থেকে বিরত রাখার জন্য বিকল্প হিসেবে তৎকালীন প্রথা অনুযায়ী দশটি উট কুরবানীর প্রস্তাব করেন। তখন তিনি নিজ সন্তুষ্টির জন্য এক ধর্মগুরুর সাথে পরামর্শে করেন। তার পরামর্শে একদিকে দশটি উট ও অপরদিকে আব্দুল্লাহর নাম লিখে লটারী করা হয়। কিন্তু লটারীতে প্রতিবারই আব্দুল্লাহর নাম উঠতে থাকে। এভাবে উপর্যুপরি দশম লটারীতে উট নামটি উঠে আসে। অবশেষে লটারীর মাধ্যমে মোট একশত উট নির্ধারিত হয়। এভাবে একশত উট কুরবানীর বিনিময়ে প্রিয় পুত্র আব্দুল্লাহর জীবন রক্ষা পায়।
পিতা আব্দুল্লাহর স্বল্পকালীন জীবন
হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর পিতা আব্দুল্লাহ্ কুরবানী হওয়া থেকে রেহাই পেলেও তাঁর জীবন ছিল স্বল্পস্থায়ী। তিনি যেমন ছিলেন সুদর্শন তেমনই ছিলেন অমায়িক ও নীতিবান পুরুষ। যৌবনে পদার্পনের পর চব্বিশ বছর বয়সে তাঁর বিয়ে হয় মদীনার যোহরা গোত্রের আমেনা বিনতে ওয়াহাব এর সাথে। তিনি ব্যবসা-বাণিজ্যের সাথে যুক্ত থাকলেও তেমন সম্পদশালী হওয়ার সুযোগ পাননি। উল্লেখ্য যে, আব্দুল্লাহ ব্যবসা উপলক্ষ্যে সিরিয়া গমন করেছিলেন। সেখান থেকে ফেরার পথে তিনি মদীনায় তাঁর নানার বাড়ীতে অবস্থানকালে অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং মৃত্যুবরণ করেন। এসময় মুহাম্মদ (সাঃ) মাতৃগর্ভে ছিলেন। প্রিয়তম পুত্রের অকাল মৃত্যুতে পিতা আব্দুল মুত্তালিব অতীব মর্মাহত হলেন এবং আমেনা স্বামীকে হারিয়ে বিরহে কাতর হয়ে পড়েন। দুর্ভাগ্যের বিষয়, পিতা আব্দুল্লাহ্ তাঁর পুত্র – সর্বকালের শ্রেষ্ঠ মানব, নবী ও রসূল হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)–কে স্বচক্ষ্যে দেখে যেতে পারেননি।
তাঁর জন্ম ও নামকরণ
আরবের ঊষর মরুর বুকে পূর্ব পুরুষ হযরত ইব্রাহীম (আঃ) ও তাঁর পুত্র হযরত ইসমাইল (আঃ) এর স্মৃতি বিজড়িত পবিত্র মক্কা নগরীতে পিতা আব্দুল্লাহর ঔরসে ও মাতা আমেনার গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন বিশ্বনবী মুহাম্মদ (সাঃ)। ৫৭০ খৃস্টাব্দের ১২ই রবিউল আওয়াল তাঁর জন্ম তারিখ হিসেবে ব্যাপকভাবে পরিগণিত। হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর জন্মের চার মাস পূর্বে তাঁর পিতা আব্দুল্লাহ ইন্তেকাল করেন। ফলে এতীমরূপেই দুনিয়ার বুকে তাঁর আগমন। তিনি পারিবারিকভাবে সম্ভ্রান্ত মক্কার কুরাইশ বংশের হাশেমী গোত্রের অন্তর্ভুক্ত। তিনি ছিলেন নবী হযরত ইব্রাহীম (আঃ) ও তদীয় পুত্র নবী হযরত ইসমাঈল (আঃ) এর উত্তরসূরী এবং একই বংশোদ্ভূত ।
হযরত মুহাম্মদ (সা) জন্মের মাত্র দু’মাস পূর্বে পিতৃহারা হন। এ অবস্থায় তাঁর জন্ম হলে পিতামহ আব্দুল মুত্তালিব তাঁর অভিবাকত্ব গ্রহণ করেন। নবজাত শিশুটিকে কোলে নিয়ে তিনি উৎফুল্ল চিত্তে কা’বা গৃহে গমন করেন এবং তাঁর নাম রাখেন ’মুহাম্মদ’। তাঁর জন্মোপলক্ষ্যে তিনি একটি উট জবাই করে আত্মীয়–স্বজন ও কুরাইশ নেতৃবৃন্দকে দাওয়াত করেন। উপস্থিত অতিথিবৃন্দ শিশুটির নাম শুনে আব্দুল মুত্তালিবের নিকট এ ব্যতিক্রমধর্মী ও অনন্য নামকরণের রহস্য জানতে চান। এর উত্তরে তিনি বললেন, স্বর্গ–মর্ত্য সর্বত্র যেন আমার পৌত্রের প্রশংসা কীর্তিত হয় – এ আশায় তাঁর নাম রেখেছি ‘মুহাম্মদ’ – যার অর্থ প্রশংসিত।
তাঁর শৈশব ও কৈশোরকাল
তৎকালীন আরবদেশীয় রীতি অনুযায়ী সম্ভ্রান্ত পরিবারে নবজাত শিশুর দুগ্ধপান ও লালন–পালনের জন্য পারিশ্রমিকের বিনিময়ে ধাত্রীমাতা নিয়োগ দেওয়া হতো। মাতা আমেনা মক্কার পার্শ্ববর্তী তায়েফের বনূ সাআদ গোত্রের হালিমা সাদিয়া নাম্নী এক মহিলাকে তাঁর সন্তানের ধাত্রীমাতা ও স্তন্যপানের দায়িত্বে নিযুক্ত করেন। তাঁর আগমণে ধাত্রী হালিমার গৃহটি রহমত ও বরকতে পরিপূর্ণ হয়ে উঠে। হালিমার মাতৃসম সেবা–যত্নে শিশু মুহাম্মদ (সাঃ) লালিত–পালিত হতে থাকেন এবং সেখানকার স্বাস্থকর পরিবেশে তিনি শারীরিকভাবে পরিপুষ্ট ও সুস্বাস্থের অধিকারী হন। দু’বছর পর তিনি তাঁকে মাতা আমেনার গৃহে নিয়ে আসেন। কথিত আছে যে, এ সময়ে মক্কায় মহামারী বিরাজ করায় আমেনা ধাত্রী হালিমার কাছে তাঁকে ফেরত দিয়ে আরও কিছুকাল রাখার অনুরোধ করেন। এভাবে পাঁচ বছর তিনি হালিমার গৃহে অবস্থান করেন। সাধারণত আট–দশ বছর ধাত্রীগৃহে থাকার নিয়ম তৎকালীন সমাজে প্রচলিত ছিল। তায়েফে বিশুদ্ধ আরবী ভাষার প্রচলন থাকায় মুহাম্মদ (সাঃ) সেখানে আরবীতে পারদর্শী হয়ে উঠেন। এ সময়ে পরিবারের অন্যান্য সদস্য তাঁর নম্র ও সদাচরণে বিমোহিত ছিলেন। পরবর্তী জীবনেও তিনি তাঁর ধাত্রীমাতা ও দুধ ভাইবোনদের প্রতি ছিলেন শ্রদ্ধাশীল ও সহমর্মী ।
তাঁর বক্ষ-বিদারণ ঘটনা
ধাত্রী-মাতা সাদিয়া হালিমার গৃহে অবস্থানকালীন সময়ে শিশু মুহাম্মদ (সাঃ) এর জীবনে ’সিনা–চাক’ বা বক্ষ–বিদরণের একটি অলৌাকক ঘটনা ঘটে – তখন তাঁর বয়স চার কিংবা পাঁচ। ঘটনাটি সম্পর্কে বিখ্যাত হাদীস গ্রন্থ সহীহ মুসলিম শরীফে হযরত আনাস (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত হাদীসে বলা হয়েছে: মুহাম্মদ (সাঃ) অন্যান্য শিশুদের সাথে খেলা করছিলেন এমন সময় হযরত জিব্রাইল (আঃ) তাঁর নিকট আগমন করলেন এবং তাঁকে চিৎ করে শুইয়ে তাঁর বক্ষ চিরে হৃদপিন্ড বের করে আনলেন এবং সেখান থেকে একটি অংশ তাঁকে দেখিয়ে বললেন এটা শয়তানী প্ররোচনার একটি অংশ। এরপর তিনি হৃদপিন্ডটিকে একটি তশতরীতে রেখে “জমজম” কূপের পবিত্র পানি দ্বারা ধৌত করে তা যথাস্থানে প্রতিস্থাপন করে দিলেন। এ ঘটনায় তাঁর দুধ ভাই–বোন দৌড়ে গিয়ে মা হালিমাকে বললো মুহাম্মদ (সাঃ)-কে মেরে ফেলা হয়েছে। পরিবারের লোকজনেরা দৌড়ে এসে দেখলেন তিনি ভীত ও বিবর্ণমুখে বসে আছেন। তারা এটাকে ’জ্বিনের আছর’ মনে করেন। আসলে এটা ভবিষ্যত নবীর অন্তরকে পূত–পবিত্র রাখার এক ঐশী পরিকল্পনা হিসেবেই সংঘটিত হয়েছিল। এ সম্পর্কিত পবিত্র কুরআনের ইঙ্গিতপূর্ণ একটি আয়াত হলো:
أَلَمْ نَشْرَحْ لَكَ صَدْرَكَ وَوَضَعْنَا عَنكَ وِزْرَكَ الَّذِي أَنقَضَ ظَهْرَكَ
”আমি কি আপনার বক্ষ উম্মুক্ত করে দেইনি? আমি লাঘব করেছি আপনার বোঝা, যা ছিল আপনার জন্যে অতিশয় দুঃসহ।” (৯৪:১ – ৩)
মাতা আমেনার ইন্তেকাল
আপন গৃহে ফিরে আসার কিছুদিন পর স্নেহময়ী মাতা আমেনা পুত্র মুহাম্মদ (সাঃ) ও দাসী উম্মে আয়মনকে নিয়ে তাঁর নিজ পিতৃালয় মদীনায় আত্মীয়–স্বজনের সাথে সাক্ষাৎ করতে যান। সেখানে তাঁর স্বামী আব্দুল্লাহর কবরটি তিনি পুত্র মুহাম্মদ (সাঃ)-কে দেখান। মদীনায় একমাস অবস্থানের পর আমেনা মক্কার পথে রওয়ানা করেন। পথিমধ্যে মদীনা থেকে তিন মাইল দূরে আবওয়া নামক স্থানে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং মৃত্যুমুখে পতিত হন। নিজ চোখের সামনে স্নেহময়ী মায়ের মৃত্যুতে এতীম বালক মুহাম্মদ (সাঃ) শোকে অভিভূত হয়ে পড়েন। পিতৃ- মাতৃহারা বালকের জন্য এটা ছিল এক নিদারুণ দুঃসময়।
পিতামহ আব্দুল মুত্তালিবের অভিবাকত্বে মুহাম্মদ (সাঃ)
মাতৃ বিয়োগের পর মুহাম্মদ (সাঃ) এর লালন–পালনে এগিয়ে আসেন পিতামহ আব্দুল মুত্তালিব। তিনি তাঁকে আগলে রাখেন পরম স্নেহ–মমতায়। সর্বক্ষণ তিনি নাতিকে তাঁর পাশে রাখতেন। এমনকি কা’বা চত্তরে তিনি যখন গোত্রপ্রধান হিসেবে আলোচনায় বসতেন তখনও তাঁকে পাশে বসাতেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত তিনিও আর বেশীদিন বেঁচে থাকেননি। বিপদ যেন এতীম বালকের পিছু ছাড়তেই চায় না। মাতৃবিয়োগের শোক কাটাতে না কাটাতেই দু’বছর পর স্নেহপরায়ণ দাদাও পরপারে চলে যান। আশি বছর বয়সে তিনি পরলোক গমন করেন। তাঁর মতো জ্ঞানী, বুদ্ধিদীপ্ত, বিত্তশালী ও ব্যক্তিত্বশীল নেতৃত্বের অবসানে হাশেমী গোত্রের প্রভাব–প্রতিপত্তি অত্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ অবস্থায় চাচা আবু তালিব বালক মুহাম্মদের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন।
পিতৃব্য আবু তালিবের অভিবাকত্বে মুহাম্মদ (সাঃ)
উপর্যপুরি বিপর্যয়ের সম্মুখীন দুঃখী এতীম বালক মুহাম্মদ (সাঃ)পাশে এবার দাঁড়ালেন তাঁর পিতৃব্য আবু তালিব। তিনি ছিলেন একজন ব্যবসায়ী ও গোত্রপতি। আব্দুল মুত্তালিবের পুত্রগণের মধ্যে জ্ঞানী–গুণী আবু তালিব ব্যক্তিত্ব ও উদারতার কারণে সামাজিক মান–মর্যাদায় ছিলেন তাদের সবার ঊর্দ্ধে। পিতা আব্দুল মুত্তালিবের মৃত্যুর পর তিনি কুরাইশ সর্দারের দায়িত্ব লাভ করেন। কিন্তু আর্থিক দিক দিয়ে তিনি তেমনটা স্বচ্ছল ছিলেন না। তারপরও ভ্রাতষ্পুত্র মুহাম্মদ (সাঃ) এর দায়িত্ব তিনি খুশী মনেই গ্রহণ করেন। অল্পবয়সী ভ্রাতুষ্পুত্রটির মধ্যে তিনি এমনসব মহৎ গুণাবলী লক্ষ্য করেন যা তাঁকে অভিভূত করে। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে তিনি তাঁর আগলে রাখেন পরম স্নেহ–মমতায় ও দায়িত্বশীলতায়। তাঁর অভিবাকত্বে বালক মুহাম্মদ (সাঃ) কৈশোরকাল অতিক্রম করে যৌবনে পদার্পণ করেন। কৈশোরে তিনি পিতৃব্যের সাথে বাণিজ্য কাফেলায় যোগ দিয়ে সিরিয়া ভ্রমণ করেন। পিতৃব্যের অস্বচ্ছলতার কারণে তিনি লেখাপড়ার সুযোগ পাননি। বরং চাচার সংসারে টুকটাক গৃহকর্ম এবং রাখাল হিসেবে মেষ ও বকরী চরানোর দায়িত্ব পালন করেন। লেখাপড়ার সুযোগ না পেলেও উন্মুক্ত প্রকৃতি ছিল তাঁর পাঠশালা। বিশ্ব প্রকৃতি তাঁর চিন্তা চেতনায় সেই ছোট বেলা থেকেই গভীর রেখাপাত করে। নীরব–নিভৃতাচরণে অন্তর্মুখী শিক্ষায় তিনি পারদর্শী হয়ে উঠেন। তিনি অন্য শিশুদের মত ছিলেন না। তাঁর চলন–বলন ও আচার–আচরণে এক ঐশ্বরিক প্রভাব পরিলক্ষিত হত। বাল্যকাল থেকেই তাঁর চরিত্র ছিল নির্মল।
তাঁর যৌবনকাল
পিতৃব্য আবু তালিবের অভিবাকত্বে মুহাম্মদ (সাঃ) কৈশোর পেড়িয়ে যৌবনে পদার্পণ করেন। তিনি ছিলেন সদা সত্যবাদী, মিথ্যা কখনও তাঁকে স্পর্শ করেনি। বিশ্বস্ততায় তিনি ছিলেন অনন্য। তিনি ছিলেন ধীর–স্থির ও নম্র প্রকৃতির। আরবের উদ্দাম বুনো পাশবিক সংস্কৃতির লেশ মাত্র প্রভাব তাঁর চরিত্রে ছিল না। স্বভাবগতভাবেই তিনি বড় হয়ে ওঠেছিলেন আপন বলয়ে এক ঐশী পরশে যা তাঁর ব্যক্তিত্ব ও চিন্তা-চেতনায় ছিল দীপ্তিমান। তৎকালীন পৌত্তলিকতা এবং অন্ধ ও কুসংস্কারপূর্ণ ধর্মীয় বিশ্বাস তাঁকে বিন্দুমাত্র স্পর্শ করতে পারেনি। এ ধরনের বিশ্বাস ছিল তাঁর কাছে জঘণ্যতম। আপন সমাজের দ্বন্দ–সংঘাত, বেহায়া– বেলেল্লেপনা এবং অনৈতিক কর্মকান্ড থেকে তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ মুক্ত। সমাজের পদস্খলন তাঁকে বেদনাহত করত ঠিকই, কিন্তু সমাজের এ দুরারোগ্য ব্যাধি উপশমের পথ তিনি খুঁজে পাচ্ছিলেন না। একটি শ্বাশ্বত সত্যের সন্ধানে তাঁর মন সদা উন্মুখ হয়ে থাকত, তিনি শুধু ভাবতেন এ তমসাচ্ছন্ন সমাজ কবে আলোকিত হয়ে ওঠবে।
বয়োবৃদ্ধির সাথে সাথে তাঁর চারিত্রিক মাহাত্ম্যে চারদিক প্রতিভাত হয়ে ওঠল। তিনি সমাজে ‘সাদেক’ (সত্যবাদী) ও ‘আল–আমীন’ (বিশ্বস্ত) নামে পরিচিতি পেলেন। দ্বন্দ–সংঘাতের সময় বিভিন্ন গোত্রের, এমন কি প্রতিপক্ষ গোত্রের লোকজনও তাঁর নিকট তাদের মূল্যবান সামগ্রী আমানত রাখত। সে সময়ে যে কোন ঘটনাকে কেন্দ্র করে বছরের পর বছর ধরে যুদ্ধ চলত। এসব যুদ্ধের বিভিষীকা দূরীকরণ এবং যুদ্ধপীড়িত মানুষের সেবার উদ্দেশ্যে ‘হিলফুল ফুযুল’ নামে একটি সামাজিক সংগঠন তৈরী হয়েছিল। এ সংগঠনের সাথে মুহাম্মদ (সাঃ) সরাসরি যুক্ত থেকে আর্ত-মানবতার সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করেন। কৈশোর বয়সে তিনি পিতৃব্যের সাথে বাণিজ্য কাফেলায় সফরসঙ্গী ও রাখালির মতো বিভিন্ন কাজে সহায়তা প্রদান করে আসছিলেন। সফরে তিনি চাচার সাথে সুদূর বুসরা নগরী পর্যন্ত ভ্রমণ করেন। সিরিয়ায় এক খৃস্টান পাদ্রীর সাথে তাঁর সাক্ষাত হলে তিনি তাঁর মধ্যে ভবিষ্যত নবীর আলামত অবলোকন করেন। এ সম্পর্কে তিনি তাঁর চাচা আবু তালিবকে তাঁর নিরাপত্তার ব্যাপারে সাবধান করে বলেন, নবুওত পেলে তিনি অনেক বাধা–বিপত্তি ও শত্রুতার সম্মুখীন হবেন।
চাচা আবু তালিব দেখলেন ভ্রাতুষ্পুত্র মুহাম্মদ (সাঃ) যৌবনে পদার্পণ করেছেন। এখন তাঁর নিজ পায়ে দাঁড়ানোর মোক্ষম সময়। তাঁর অসচ্ছল পরিবারের নগণ্য কাজে আর তাঁকে নিয়োজিত রাখা রাখা সমীচীন হবে না। তিনি জানতে পারলেন, মক্কার ধনাঢ্য ব্যবসায়ী মহিলা খাদীজা বিনতে খুলায়েদের ব্যবসায়িক কাজে কিছু সংখ্যক প্রতিনিধি নিয়োগ দেওয়া হবে। তিনি মুহাম্মদ (সাঃ)-কে ডেকে বললেন, ’তুমি রাজী থাকলে যথাযথ সম্মানীর বিনিময়ে তোমাকে নিয়োগ দানের জন্য আমি খাদীজাকে অনুরোধ করব।’ এ প্রস্তাবে তিনি সম্মত হলে আবু তালিব খাদীজা সমীপে তাঁর চাকুরীর অনুরোধ জানালেন। খাদীজা মুহাম্মদ (সাঃ) এর সততা ও বিশ্বস্ততার ব্যাপারে পূর্ব থেকেই অবগত ছিলেন। প্রস্তাব পাওয়া মাত্রই তিনি দ্বিগুণ পারিশ্রমিকের বিনিময়ে তাঁকে নিয়োগ প্রদান করেন।
খাদীজার বাণিজ্য কাফেলা নিয়ে মুহাম্মদ (সাঃ) সিরিয়া অভিমুখে যাত্রার প্রস্তুতি নেন। খাদীজা নিজ বিশ্বস্ত ক্রীতদাস মাইসারাকে তাঁর সফরসঙ্গী ও সাহায্যকারী হিসেবে নিযুক্ত করেন। চাচা আবু তালিব তাঁকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দান করেন। ইতিপূর্বে চাচার সাথে সিরিয়া সফরের অভিজ্ঞতাও তাঁর কাজে লেগেছিল। এসময় বিভিন্ন জনপদ অতিক্রমকালে তিনি বেশ কয়েকটি সভ্যতা ও জাতিসমূহের ধ্বংসাবশেষ প্রত্যক্ষ্য করেন। এ ছাড়াও তিনি বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী, তাদের ধর্মীয় বিশ্বাস ও আচার–আচরণ সম্পর্কে বিবিধ অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। বাণিজ্য শেষে তিনি মক্কায় ফিরলেন প্রচুর মুনাফা ও পণ্যসামগ্রী নিয়ে। বাণিজ্য কাফেলার লোকজনের সাথে তাঁর সহৃদয় ব্যবহার, ব্যবসা পরিচালনায় তাঁর সততা ও দক্ষতা খাদীজা (রাঃ)-কে বিমুগ্ধ করে। খাদীজা তাঁর অপরিসীম সাফল্যে প্রীত ও সন্তুষ্ট হলেন।
খাদীজাতুল কুবরা (রাঃ) এর সাথে তাঁর বিবাহ
মুহাম্মদ (সাঃ) ইতোমধ্যে পঁচিশ বছর বয়সে উপনীত হয়েূছেন। তিনি ছিলেন সুদর্শন পুরুষ ও সুন্দর দেহসৌষ্ঠবের অধিকারী এবং অবিবাহিত। স্বভাব–চরিত্র ও বিশ্বস্ততার কারণে তিনি সবার কাছে ছিলেন প্রিয়। ব্যবসায়িক কাজেও তিনি হয়ে উঠেন কর্মকুশলী। অপরদিকে চল্লিশ বছর বয়স্ক খাদীজা বিনতে খুলায়েদ ছিলেন সম্ভ্রান্ত বংশীয়া এক ধনাঢ্য বিধবা মহিলা। ইতোপূর্বে তাঁর দু’টি বিয়ে হয়েছিল। কোন স্বামীই বেঁচে না থাকায় তিনি বৈধব্য জীবন যাপন করছিলেন। আরবের দূষিত সমাজে খাদীজা (রাঃ) তাঁর অনুপম চরিত্রের কারণে ‘তাহীরা’ বা পবিত্রা নামে ভূষিত হয়েছিলেন। দু’বার বিধবা হওয়ার পর পরবর্তী বিয়েতে তাঁর আর কোন আগ্রহ ছিল না। তাঁর আভিজাত্য, অর্থ–বিত্ত ও গুণপনার কারণে আরবের কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি তাঁর প্রতি আকৃষ্ট হন ও তাঁর নিকট বিয়ের প্রস্তাব পাঠিয়ে প্রত্যাখ্যাত হন। যুবক মুহাম্মদ (সাঃ) এর গুণাবলী, সততা ও নিষ্ঠা খাদীজা (রাঃ)-কে চমৎকৃত করেছিল। তিনি তাঁর প্রতি তিনি অনুরুক্ত হয়ে পড়েন এবং তাঁর নিকট বিবাহের প্রস্তাব পাঠান। মুহাম্মদ (সাঃ) প্রস্তাবটি তাঁর চাচা ও অভিবাক আবু তালিবের মাধ্যমে পাঠাতে বললেন। সে অনুযায়ী খাদীজা (রাঃ) পিতৃব্য আবু তালিবের সাথে যোগাযোগ করেন। তিনি তাঁদের উভয়ের সম্মতিক্রমে বিয়ে সম্পাদন করে দিলেন। এ সময় খাদীজা (রাঃ) এর বয়স চল্লিশ বছর এবং মুহাম্মদ (সাঃ) মাত্র পঁচিশ বছরের যুবক ছিলেন। এ অসম বয়সী বিয়েতে তিনি রাজী হয়েছিলেন খাদীজার (রাঃ) প্রভূত সম্পদের কারণে নয়, বরং তাঁর সুন্দর চরিত্র ও সদাচারের কারণে। তাঁরা উভয়ে ছিলেন সুখী দম্পতি। প্রিয় বিবি খাদীজা (রাঃ) তাঁর সমস্ত ধন–সম্পদ স্বামীর পায়ে অর্পণ করেন। মুহাম্মদ (সাঃ) ছিলেন এসব ধন–সম্পদের প্রতি নিরাসক্ত। এগুলো তিনি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য দুঃস্থ মানবতার কল্যাণে দান করে দেন।
মক্কায় অবস্থানকালে হয়রত মুহাম্মদ (সাঃ) এর প্রথম পর্বের দাম্পত্য জীবনের সূচনা হয়েছিল স্ত্রী হযরত খাদীজা (রাঃ) এর সাথে। পঁচিশ বছরের সুখী দাম্পত্য জীবনে তাঁরা ছিলেন আদর্শ স্বামী–স্ত্রী। খাদীজা (রাঃ) এর প্রগাঢ় ভালবাসা ও আনুগত্যে তাঁর জীবনে এক গভীর প্রশান্তি নেমে আসে। তিনি যখন চল্লিশ বছর বয়সে উপনীত হন তখন আল্লাহ্ রব্বুল আলামীনের তরফ থেকে নবুওতী দায়িত্ব প্রাপ্ত হলেন। মক্কার বৈরী ও প্রতিকূল পরিবেশে নবুওতের কঠিন দায়িত্ব পালনকালে বিবি খাদীজা (রা) তাঁকে সর্বাত্মক সহযোগিতা প্রদান করেন। পতিব্রতা খাদীজা (রাঃ) ৬৫ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন, তাঁর জীবৎকালীন সময়ে নবী মুহাম্মদ (সা) দ্বিতীয় কোন বিয়ে করেননি কিংবা এরূপ কোন চিন্তাও করেননি।
হয়রত মুহাম্মদ (সাঃ) এর দাম্পত্য জীবন ছিল অত্যন্ত মধুর। তিনি বলতেন, ‘আমি যখন গরীব ছিলাম তিনি তখন আমাকে ধনৈশ্বর্য দিয়েছেন, যখন তারা আমাকে মিথ্যাবাদী বলেছে তখন একমাত্র তিনিই আমার উপর বিশ্বাস এনেছেন।’ এটা স্বীকৃত সত্য যে, তাঁর নবুওতের প্রতি খাদীজা (রাঃ)-ই ছিলেন প্রথম বিশ্বাসী মুসলিম এবং তাঁর অসহায়ত্ব ও দুর্ভাবনার সময় তিনিই ছিলেন পরম সান্ত্বনাদাত্রী। প্রথম ওহী নাযিলের অভিঘাতে যখন নবীজী (সাঃ) ছিলেন বিমূঢ় ও দিশেহারা তখন প্রিয় স্বামীর অবস্থা দর্শনে তাঁর সান্ত্বনার বাণী ছিল,
‘মহান আল্লাহর শপথ, আপনি ভীত হবেন না, আল্লাহ্ আপনাকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলবেন না। আপনি আত্মীয়–স্বজনের কল্যাণ করেন, অভাবগ্রস্তের অভাব মোচন করেন, দুঃস্থ–পীড়িতদের সেবা–যত্ন করেন, অতিথি অপ্যায়ন করেন, বিপদে–সঙ্কটে সত্যের উপর অবিচল থাকেন। অতএব, আল্লাহ্ আপনার প্রতি বিমুখ হবেন না। আমি বিশ্বাস করি, আপনার দ্বারা তিনি তাঁর কোন মহান উদ্দেশ্য সাধন করবেন।’
মহীয়সী এক নারীর কি অপূর্ব সান্ত্বনার বাণী!
পারিবারিক জীবনে নবীজী (সাঃ) যেমন ছিলেন প্রেমময় স্বামী, তেমনি স্নেহশীল পিতা এবং দায়িত্বপূর্ণ গৃহকর্তা। আরব সমাজে কন্যাসন্তানের জন্মদান খুবই অবমাননাকর হলেও খাদীজা (রাঃ) এর গর্ভে তাঁর চারটি কন্যাসন্তান ছিল তাঁর অতি প্রিয়। তাঁদের প্রতি তাঁর মমত্ববোধ ছিল অফুরন্ত। তিনি আত্মীয়তার সম্পর্ককে বিশেষ গুরুত্ব দিতেন। তাঁর নিকট রক্তের বন্ধন ছিল পবিত্র। প্রতিবেশীদের প্রতি তাঁর সদাচরণ ছিল দৃষ্টান্তমূলক। তাঁর সান্নিধ্যে শিশুরা থাকত প্রীত ও হাস্যময়। এক কথায় পারিবারিক তথা সমাজের সর্বস্তরে তিনি ছিলেন একজন গ্রহণযোগ্য ও সমাদৃত ব্যক্তিত্ব।
বিবি খাদীজার গর্ভে তাঁর সন্তান-সন্ততি
নবী করীম (সাঃ) এর ছয়টি সন্তান বিবি খাদীজার গর্ভে জন্মগ্রহণ করে। তম্মধ্যে দু’জন পুত্র সন্তান ও চারজন কন্যা সন্তান। পুত্রদ্বয়ের নাম ছিল কাসেম ও আব্দুল্লাহ্। তারা শিশু বয়সেই ইন্তেকাল করেন। এতে পিতা–মাতা উভয়ে পুত্র শোকে কাতর এবং পরম ব্যথিত ও মর্মাহত হন। পুত্র শোক কাটাতে তাঁরা ক্রীতদাস য়ায়েদ ইবনে হারেসকে পালক–পুত্র হিসেবে গ্রহণ করেন। তিনি তখন যায়েদ ইবনে মুহাম্মদ নামে পরিচিতি লাভ করেন। নবীজী (সাঃ) এর চার কন্যা সন্তানের নাম ছিল–-হযরত যয়নব (রাঃ), হযরত রোকেয়া (রাঃ), হযরত উম্মে কুলসুম (রাঃ) ও হযরত ফাতেমা (রাঃ)। নবুওত–পূর্ব যুগে তিন কন্যার বিয়ে হয়। প্রথম কন্যা যয়নবের বিয়ে হয় বিবি খাদীজা (রাঃ) এর ভাগিনা আবুল আছের সাথে। দ্বিতীয় কন্যা রোকেয়া ও তৃতীয় কন্যা উম্মে কুলসুমের বিয়ে হয়েছিল আবু লাহাবের দুই পুত্রের সাথে। হযরতের নবুওত প্রাপ্তির পর আবু লাহাবের সাথে ধর্মীয় বিরোধের কারণে তাঁদের বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটে। বিচ্ছেদের পর রোকেয়া (রাঃ)এর বিয়ে হয় হযরত ওসমান (রাঃ) এর সাথে। তাঁর মৃত্যুর পর হযরত ওসমান (রাঃ) বিয়ে করেন উম্মে কুলসুম (রাঃ)-কে। সর্ব কনিষ্ঠ কন্যা ফাতেমা (রাঃ) এর জন্ম হয় পিতার নবুওত প্রাপ্তির পর এবং হিজরী দ্বিতীয় সালে হযরত আলী (রাঃ) এর সাথে তাঁর বিয়ে হয়। প্রথম তিন কন্যা মুহম্মদ (সাঃ) এর জীবদ্দশায় ইন্তেকাল করেন। ফাতেমা (রাঃ) পিতার ওফাতের ছয় মাস পর ইন্তেকাল করেন। হযরত আলী (রাঃ) ও ফাতেমা (রাঃ) এর দুই পুত্র সন্তান হযরত হাসান (রাঃ) ও হযরত হুসাইন (রাঃ) ছিলেন তাঁদের পিতা–মাতার নয়নমণি ও নানাজান মুহাম্মদ (সাঃ) এর অতীব স্নেহধন্য ।
সমাজ কল্যাণমূলক কাজে তাঁর অংশগ্রহণ
হযরত মুহাম্মদ (সা) তাঁর স্বভাবজাত মিশুক ও সুন্দর আচরণ এবং সত্যবাদিতা, সততা ও বিশ্বস্ততার কারণে মক্কার সর্বস্তরের মানুষের প্রিয়পাত্র হিসেবে গণ্য ছিলেন। পরোপকার ও দানশীলতা ছিল তাঁর চারিত্রিক বৈশিষ্ঠ্য। আমনতদারির ব্যাপারে তাঁর সুনাম ছড়িয়ে পড়ায় সবাই নিঃশঙ্ক চিত্তে তাঁর নিকট মূল্যবান দ্রব্যসামগ্রী গচ্ছিত রাখতে পছন্দ করতেন। এভাবে তিনি সামাজিকভাবে “আল–অমীন” নামে সুপরিচিত হয়ে উঠেন। বিভিন্ন সামাজিক কল্যাণমূলক কাজে তাঁর অংশগ্রহণ ছিল সুবিদিত।
প্রাক্–ইসলামী আমলে আরববাসীদের নিকট মুহাররম, রজব, যিলক্বদ ও যিলহজ্জ্ব এ চারটি মাস ছিল অতি পবিত্র এবং এ মাসগুলোতে যুদ্ধ–বিগ্রহ ছিল নিষিদ্ধ। শান্তিপূর্ণভাবে হজ্জ্ব পালন ও ব্যবসা–বাণিজ্য পরিচালনার জন্য এ পবিত্র মাসগুলোতে কেহ যুদ্ধে জড়াত না। কিন্তু আরবদের এ রীতি ভঙ্গ করে এমন একটি মাসে কুরাইশ গোত্রের এক লোক বাণিজ্যিক স্বার্থে হাওয়াযেন গোত্রের এক লোককে হত্যা করে এবং তার কাফেলার সব মালামাল লুট করে। এতে হাওয়াযেন গোত্রের লোকজন ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে এবং উভয় পক্ষের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়। এ যুদ্ধের নাম ছিল ”ফুজ্জারের” যুদ্ধ। মুহাম্মদ (সা) এ যুদ্ধে অংশ নেন এবং চাচাদেরকে তীর–ধনুক কুঁড়িয়ে এনে সরবরাহ করেন। নিজেও তীর ছুঁড়ে যুদ্ধ করেন বলে জনশ্রুতি আছে। অবশেষে উভয় পক্ষের পারস্পরিক ক্ষতিপূরণ প্রদানের শর্তে চার বছর ব্যাপী এ যুদ্ধের অবসান ঘটে।
সামাজিক সংগঠন হিলফুল ফুযুলে তাঁর অংশগ্রহণ
ফুজ্জারের যুদ্ধে কুরাইশদের ক্ষয়ক্ষতি এবং গোত্রীয় ঐক্যে দুর্বলতা দেখা দেওয়ায় বহিঃশত্রুর হুমকির আশঙ্কা বৃদ্ধি পায়। এহেন পরিস্থিতিতে মুহাম্মদ (সা) এর চাচা যুবাইর ইবনে আব্দুল মুত্তালিবের প্রচেষ্টায় মক্কার সব গোত্রের প্রতিনিধিবৃন্দ এক সভায় মিলিত হন। এ সভায় সর্বসম্মতিক্রমে ’হিলফুল ফুযুল’ নামে একটি সামাজিক কল্যাণমূলক সংগঠন গঠিত হয় যার উদ্দেশ্য ছিলো মক্কার বিভিন্ন গোত্রগুলোর মধ্যে ঐক্য ও সংহতি বজায় রাখা, নিপীড়িত ও দুঃস্থ মানবতার অধিকার সুরক্ষা, ন্যায়নীতির প্রতিষ্ঠা ও মানবিক কল্যাণে সর্বোতভাবে আত্মনিয়োগ করা। এখানে উল্লেখ্য যে, ইয়েমেন থেকে আগত এক ব্যবসায়ী মক্কার প্রভাবশালী এক ব্যক্তির কাছে কিছু পণ্য বিক্রী করে অর্থ আদায় করতে ব্যর্থ হয়ে কা’বা শরীফের নিকটে দাঁড়িয়ে মক্কাবাসীর নিকট এর প্রতিকার প্রার্থনা করেন। সেখানে উপস্থিত ব্যক্তিবর্গ সেই সাহায্যপ্রার্থী ব্যবসায়ীর অর্থ আদায়ে সহযোগিতা করেন। দুর্বলের অধিকার প্রতিষ্ঠা করাও ছিল তাঁদের এ উদ্যোগের একটি লক্ষ্য। সভায় উপস্থিত সবাই মহান আল্লাহর নামে শপথ গ্রহণ করলেন, এ কাজে তাঁরা যথাসাধ্য সাহায্য–সহযোগিতা করবেন। কথিত আছে যে, মুহাম্মদ (সা) এ সভায় উপস্থিত থেকে শপথ অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন এবং নিপীড়িতের পাশে দাঁড়াতে সংকল্পবদ্ধ হন। নবুওত পরবর্তীকালে তিনি এ সংগঠনের সাথে তাঁর সম্পৃক্ততা ও অঙ্গীকারের কথা ব্যক্ত করেছেন।
কা’বা শরীফের সংস্কার কাজে তাঁর অংশগ্রহণ
হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) কা’বা শরীফের সংস্কার কাজে সক্রিয় ও অনবদ্য ভূমিকা পালন করেন। তাঁর প্রাক্–নবুওয়ত কালে বিভিন্ন কারণে কা’বা গৃহের সংস্কার অপরিহার্য হয়ে উঠে। এ সময় জেদ্দার উপকূলে সামুদ্রিক ঝড়ে পতিত একটি জাহাজ–ডুবির খবর আসে। মক্কাবসীরা কা’বা গৃহের নির্মাণ কাজে ব্যবহারের জন্য জাহাজটির ধ্বংসাবশেষ কিনে নেন। নির্মাণ কাজে মুহাম্মদ (সাঃ) অংশগ্রহণ করেন। সংস্কার কাজ চলাকালে পবিত্র পাথর “হজরে আসওয়াদ” যথাস্থানে স্থাপনের ব্যাপারে মক্কার প্রধান প্রধান গোত্রগুলোর মধ্যে তীব্র বিরোধের সৃষ্টি হয়। সবাই এর দায়িত্ব একাই পালন করতে চায়। বিরোধ চরমে পৌঁছুলে সিদ্ধান্ত হয় যে, পরের দিন ভোরে যে ব্যক্তি সর্বপ্রথম ’সাফা’ সংলগ্ন দরজা দিয়ে কা’বায় প্রবেশ করবে তাঁকে সালিশ মেনে তাঁর উপর ফয়সালার দায়িত্ব অর্পণ করতে হবে এবং তাঁর প্রদত্ত ফয়সালা সবাইকে গ্রহণ করতে হবে। পর দিন দেখা গেলো, মুহাম্মদ (সাঃ) সর্বপ্রথম এ পথে কা’বা চত্তরে প্রবেশ করছেন। তাঁকে দেখে সবাই খুশী মনে তাঁকেই সালিশ নিযুক্ত করলো। কারণ তারা তাঁর সততা ও ন্যায়নিষ্ঠার ব্যাপারে পূর্ব থেকেই অবগত ছিল। তিনি এ ব্যাপারে গোত্রসমূহের তীব্র ভাবাবেগ ও সহিংস মনোভাবের বিষয়টি চিন্তা করে একটি সুন্দর কৌশল অবলম্বন করেন যাতে সবাই শান্তিপূর্ণ উপায়ে এ কাজে শরীক হতে পারে। তিনি একটি চাদর বিছিয়ে এর মাঝখানে পাথরটি রাখলেন এবং গোত্র প্রধানদেরকে চাদরের চার পাশের প্রান্ত ধরে একে তার স্বস্থানে নিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানালেন। তাঁর পরামর্শ মোতাবেক সবাই তাই করলো। এরপর তিনি নিজ হাতে পাথরটি উঠিয়ে যথাস্থানে স্থাপন করলেন। তাঁর এ সর্বগ্রহণযোগ্য মীমংসায় সবাই প্রীত হলো এবং একটি সহিংস বিরোধের শান্তিপূর্ণ মীমাংসা ঘটলো।
হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর জীবনী আলোচনার গুরুত্ব
সর্ব যুগের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহ্ রব্বুল আলামীনের প্রেরিত নবী ও রাসুল। মানব জাতিকে সরল ও সঠিক পথ প্রদর্শনের জন্য মহান আল্লাহ্ যুগে যুগে যে সব নবী ও রাসুল প্রেরণ করেছেন তাদের মধ্যে হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ। তিনি সমগ্র মানব জাতির জন্য প্রেরিত হয়েছেন। আরবের বিখ্যাত কুরাইশ বংশে তাঁর জন্ম। তাঁর আবির্ভাব ঘটেছিল সত্য ও ন্যায়ের সমুজ্জ্বল এক বার্তাবাহক ও পথ–প্রদর্শক হিসেবে। সে অন্ধকার যুগে আল্লাহ্ রব্বুল আলামীন তাঁকে সমগ্র মানবজাতির জন্য মনোনীত করলেন সর্বশেষ নবী ও রসূল। চল্লিশ বছর বয়সে মহান আল্লাহর তরফ থেকে তিনি লাভ করলেন নবুওত। তাঁর আবির্ভাব প্রসঙ্গে মহন আল্লাহ্ রব্বুল আলামীন বলেন,
“হে নবী, আমি আপনাকে একজন স্বাক্ষী, সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে এবং আল্লাহর অনুমতিক্রমে মানুষকে আল্লাহর পথে আহ্বানকারী ও প্রদীপ্ত এক আলোক–বর্তিকা হিসেবে প্রেরণ করেছি।” (৩৩:৪৫ – ৪৬)
ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা। এ ব্যবস্থার প্রবর্তক হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) ছিলেন সর্বগুণে গুণান্বিত একজন পরিপূর্ণ আদর্শ মানব। ঘরে বাইরে তাঁর ভূমিকা ছিল ব্যাপক। তিনি ছিলেন একাধারে একজন ধর্ম প্রচারক ও সমাজ সংস্কারক রাষ্ট্রনায়ক, প্রশাসক, বিচারক ও সমরবিদ। আবার নিজ পরিবারে ছিলেন একজন দায়িত্বশীল আদর্শ গৃহকর্তা। সামাজিকভাবে তিনি সবার কাছে ছিলেন সমাদৃত। আত্মীয়–পরিজনের সাথে তাঁর গভীর অন্তরঙ্গতা, বন্ধু–বান্ধবের সাথে মধুর সম্পর্ক, প্রতিবেশী এবং গরীব–দুঃখীর প্রতি তাঁর দয়া ও দানশীলতা সবই ছিল অনন্যসুলভ। তিনি ঘরের ভেতরে যেমন গড়ে তুলেছিলেন এক শান্তি ও সৌহার্দময় পরিবেশ, তেমনই প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ন্যায়, সমতা ও তাক্কওয়া (খোদাভীতি) ভিত্তিক সমাজ ও রাষ্ট্র। তাঁর প্রতিষ্ঠিত ন্যায়–নীতির নিকট ছোট–বড়, ধনী–গরীব, আত্মীয়–অনাত্মীয় কোন ভেদাভেদ ছিল না।
আল্লাহর নবী ও রসুল মুহাম্মদ (সাঃ) এমন কোন উপদেশ দিতেন না যা তিনি নিজে পালন করেননি। অর্থাৎ তাঁর মধ্যে বিন্দুমাত্র দ্বৈততা ছিল না। সৎ উপার্জনের দ্বারা অতি সাধারণভাবে তিনি জীবন যাপন করতেন। কোন কিছুতেই তাঁর বাড়াবাড়ি ছিল না, তিনি ছিলেন মধ্যমপন্থী। তিনি প্রতিদিনের প্রতিটি কাজ, কথা ও আচরণে পবিত্র কুরআনের নির্দেশ পালন করেছেন। হযরত আয়েশা (রাঃ) এর নিকট আল্লাহর রসুলের জীবনাচরণ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বললেন, ‘আপনি কি কুরআন পড়েননি – কুরআনই হলো রাসূল (সাঃ) এর জীবনের দর্পণ।’ পবিত্র কুরআনের এক জীবন্ত নিদর্শন ছিল তাঁর জীবনাচরণ।
নবী (সাঃ) এর প্রিয় সাহাবী ও প্রখ্যাত ওহী লিপিকার হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেন, “সর্বোত্তম বাণী হলো আল্লাহর কিতাব পবিত্র কুরআন আর সর্বোত্তম আদর্শ হলো হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)- এর জীবনাদর্শ।” (বোখারী শরীফ)। তিনি ছিলেন কুরআনী জিন্দেগীর এক জীবন্ত রূপ বা উদাহরণ। কুরআন এবং সুন্নাহর মধ্যেই নিহিত রয়েছে হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)- এর জীবনের বাস্তব চিত্র। সুতরাং তাঁর জীবনের আদ্যোপান্ত জানতে হলে কুরআন ও হাদীস অবশ্যই পাঠ করতে হবে।
প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ ও সীরাত গ্রন্থলেখক ইবনে হিশাম (রঃ) ও ইবনে ইসহাক (রঃ) এর গ্রন্থদ্বয়ে তাঁর জীবনের উপর বিশদ আলোচনা রয়েছে। এছাড়া অনেক খৃস্টান প্রাচ্যবিদরাও তাঁর জীবনী সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। এসব গ্রন্থে অনেক বিতর্কিত বিষয় ও মনগড়া কাহিনী রয়েছে। তাই কুরআন ও হাদীসের আলোকে তাঁর জীবন–চরিত অধ্যয়ন করা অতীব জরুরী। আল্লাহর নবী (সাঃ) এর জীবনাদর্শ অনুসরণ করতে হলে তাঁর জীবনী অবশ্যই পঠনীয়। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ্ বলেন:
قُلْ يٰۤاَيُّهَا النَّاسُ اِنِّىْ رَسُوْلُ اللهِ الَيْكُمْ جَمِيْعًا الَّذِىْ لَه مُلْكُ السَّمٰوٰتِ وَالْاَرْضِ لَاۤ اِلٰهَ اِلَّا هُوَ يُحْى وَيُمِيْتُ فَـَٔامِنُوْا بِاللهِ وَرَسُوْلِهِ النَّبِىِّ الْاُمِّىِّ الَّذِىْ يُؤْمِنْ بِاللهِ وَكَلِمٰتِه وَاتَّبِعُوْهُ لَعَلَّكُمْ تَهْتَدُوْنَ
“(হে নবী) ঘোষণা করুন, হে মানবমন্ডলী! আমি তোমাদের সবার প্রতি আল্লাহ প্রেরিত রসূল, সমগ্র আসমান ও যমীনে তাঁর রাজত্ব। একমাত্র তাঁকে ছাড়া আর কারো উপাসনা নয়। তিনি জীবন ও মৃত্যু দান করেন। সুতরাং তোমরা সবাই বিশ্বাস স্থাপন করো আল্লাহ তায়ালার উপর, তাঁর প্রেরিত উম্মী নবীর উপর – যিনি বিশ্বাস রাখেন আল্লাহ্ এবং তাঁর সকল বাণীর ওপর। তাঁর (নবীর) অনুসরণ কর যাতে সরল পথপ্রাপ্ত হতে পার।” (৭:১৫৮)
وَمَاۤ اَرْسَلْنٰكَ اِلَّا كَآفَّةً لِّلنَّاسِ بَشِيْرًا وَّنَذِيْرًا وَّلٰكِنَّ اَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَعْلَمُوْنَ
“আমি আপনাকে সমগ্র মানবজাতির জন্যে সুসংবাদাতা ও সতর্ককারীরূপে পাঠিয়েছি; কিন্তু অধিকাংশ মানুষ তা জানে না।” (৩৪:২৮)