২০ তম অধ্যায় : মক্কা বিজয়ের পটভূমি

হুদায়বিয়া সন্ধির শর্তভঙ্গ

দশবছর–মেয়াদী হুদায়বিয়া সন্ধি চুক্তি সম্পাদনের পর মুসলমান ও কুরাইশদের মধ্যে বিরাজমান ছিলো একটি শান্তিপূর্ণ পরিবেশ। ইসলামের প্রচার ও প্রসারের জন্য এটা ছিল সুবর্ণ সুযোগ। এর ফলে দিন দিন মুসলমানদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে। কিন্তু চুক্তির দু’বছর মেয়াদ পূর্তি হতে না হতেই ৬৩০ হিজরী সালে কুরাইশদের হঠকারিতা ও বিশ্বাসঘাতকতায় শান্তির রক্ষাকবচ এ চুক্তিটি সুস্পষ্ট হুমকির মুখে পড়ে। চুক্তির একটি শর্ত ভঙ্গ করে কুরাইশদের মিত্র বনু বকর গোত্রের লোকজন মুসলিম মিত্র বনু খোজাআ গোত্রের উপর অতর্কিত আক্রমণ চালিয়ে কয়েকজনকে হত্যা করে। এতে কুরাইশদের সমর্থন ও সহযোগিতা ছিল। তারা হামলার ইন্ধন যুগায় ও সমরাস্ত্র সরবারাহ করে। কুরাইশ নেতা আবু জেহেল–পুত্র ইকরামা এ ঘটনার সাথে সরাসরি জড়িত ছিল। খোজাআ গোত্রের লোকজন নবী করীম (সাঃ) এর নিকট সাহায্যপ্রার্থী হয়। এ গোত্রের সাথে মৈত্রী চুক্তির শর্তানুযায়ী তাদের উপর আক্রমণে জড়িত পক্ষগুলোর বিরুদ্ধে সাহায্য প্রদানে নবীজী (সাঃ) প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিলেন। এ কারণে তিনি খোজাআ গোত্রের পক্ষে কুরাইশদের নিকট নিম্নোক্ত প্রস্তাবসহ একজন দূতকে মারফৎ প্রেরণ করলেন :

  • ন্যায্যতার সাথে খোজাআ গোত্রকে যথাযথ ক্ষতিপূরণ প্রদান করতে হবে।

  • অথবা আক্রমণকারী বনু বকর গোত্রের সাথে সকল সম্পর্ক ছিন্ন করতে হবে।

  • অথবা হুদায়বিয়া চুক্তি বাতিল বলে গণ্য করতে হবে।

উগ্রবাদী কুরাইশগণ মুসলিম বিদ্বেষবশত পরিণতির কথা কোনরূপ চিন্তা–ভাবনা না করেই আগত দূতের নিকট শেষোক্ত প্রস্তাবটির পক্ষে তাদের সম্মতির কথা  জানিয়ে দিলো। অর্থাৎ তারা হুদায়বিয়া চুক্তি বাতিল ঘোষণা করলো।

 

কুরাইশ নেতা আবু সুফিয়ানের ব্যর্থ প্রচেষ্টা

বিচক্ষণ কুরাইশ নেতা আবু সুফিয়ান ও অন্যান্য নেতৃবর্গ হুদায়বিয়া চুক্তি বাতিলের পরিণতির কথা অনুধাবন করতে পারলো। সবার পরামর্শ মোতাবেক সিন্ধান্ত হলো যে, আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বে একটি কুরাইশ প্রতিনিধিদল মদীনায় গিয়ে নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-কে বুঝিয়ে–সুঝিয়ে চুক্তিটি বহাল রাখবে। সে অনুযায়ী আবু সুফিয়ান মদীনায় গিয়ে প্রথমে নিজ কন্যা ও নবী–পত্নী উম্মুল মু’মেনীন হযরত উম্মে হাবিবা (রাঃ) এর গৃহে যায়। তাকে দেখে উম্মে হাবীবা (রাঃ) দ্রুত নবীজী (সাঃ) এর বিছনা গুটিয়ে নেন। কন্যার এ আচরণে বিস্মিত আবু সুফিয়ান এর কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, ‘একজন অবিত্র মুশরিক ব্যক্তি এ পবিত্র বিছানায় বসুক তা আমার পছন্দনীয় নয়।’ কন্যার আচরণ ও কথায় ক্ষুব্ধ আবু সুফিয়ান সেখান থেকে বেরিয়ে গেলো এবং মসজিদে নব্বীতে নবীজী (সাঃ) এর সাথে দেখা করে তাঁকে চুক্তিটি বহাল রাখার প্রস্তাব দিলো। কিন্তু নবীজী (সাঃ) তার এ প্রস্তাবের কোন উত্তর দিলেন না। সেখান থেকে বেরিয়ে সে একের পর এক হযরত আবু বকর (রাঃ), হযরত ওমর (রাঃ), হযরত আলী (রাঃ) ও হযরত ফাতেমা (রাঃ) এর নিকট গিয়ে একই প্রস্তাব পেশ করে এবং নবীজী (সাঃ) এর নিকট সুপারিশ করার অনুরোধ জানায়। কিন্তু তাঁরা সবাই তাঁদের অপারগতা জানিয়ে দিলেন। অবশ্য হযরত ওমর (রাঃ) কঠোর ভাষায় তার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলেন। তবে হযরত আলী (রাঃ) তাকে পরামর্শ দিলেন যে, সন্ধিটি বলবৎ আছে এমন একটি ঘোষণা কোন প্রকাশ্য স্থান থেকে দিয়ে সে যেন দ্রুত মদীনা ছেড়ে চলে যায়। হতাশগ্রস্ত আবু সুফিয়ান মসজিদে নব্বীতে গিয়ে অনুরূপ একটি ঘোষণা দিল এবং বিরূপ আশঙ্কা নিয়ে মক্কায় ফেরত গেলো।

 

মক্কা অভিযানের প্রস্তুতি

মক্কা অভিযানে নবী করীম (সাঃ) প্রচুর গোপনীয়তা অবলম্বন করেন। পবিত্র মক্কা নগরী বিনা রক্তপাতে দখলে নেওয়ার চিন্তাই ছিল তাঁর এমন গোপনীয়তার কারণ। মদীনার পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন গোত্রকে সংঘবদ্ধ করে তিনি ব্যাপক যুদ্ধ প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। অস্ত্রসস্ত্রে সজ্জিত দশ হাজার সৈন্যের সমাবেশ ঘটানো হলো। কিন্তু কোন রণাঙ্গণে যুদ্ধ হবে তা তিনি প্রকাশ করলেন না। এর উদ্দেশ্য ছিল অতর্কিতে মক্কার দ্বার প্রান্তে পৌঁছে যাওয়া যাতে কুরাইশরা প্রতিরোধ করার কোন সুযোগ না পায় এবং বিনা যুদ্ধে আত্মসমর্পন করে। এত গোপনীয়তার পরও নবীজী (সাঃ) এর একজন ঘনিষ্ট সাহাবী হযরত হাতীব (রাঃ) কর্তৃক লিখিত একটি গোপন চিঠি এ সংবাদটি ফাঁস করে দেওয়ার উপক্রম ঘটিয়েছিল। তাঁর সন্তানেরা মক্কায় বসবাস করত। তিনি তাদের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে তাদের উপর কুরাইশরা যাতে সহানুভূতিশীল থাকে সে আশায় এ চিঠি প্রেরণ করেন। চিঠিটি নিয়ে মক্কায় যাচ্ছিল সারাহ্ নামে এক ক্রীতদাসী।  নবী করীম (সাঃ) ওহী মারফৎ এ বিষয়টি জানতে পেরে তৎক্ষণাৎ হযরত আলী (রাঃ) ও হযরত জোবায়ের (রাঃ)-কে পত্রটি উদ্ধারের জন্য প্রেরণ করেন। তারা পথিমধ্যে সারাহকে ধরে ফেলেন এবং তার কাছ থেকে চিঠিটি উদ্ধার করে নিয়ে আসেন। নবী করীম (সাঃ) হযরত হাতীব (রাঃ)-কে ডেকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। তিনি চিঠি পাঠানোর উদ্দেশ্য ব্যক্ত করে তাঁর অপরাধ স্বীকার ও ক্ষমা প্রার্থনা করলে নবীজী (সাঃ) তাঁকে ক্ষমা করে দেন। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআনের যে আয়াতটি নাযিল হয তা হলো:

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا عَدُوِّي وَعَدُوَّكُمْ أَوْلِيَاءَ تُلْقُونَ إِلَيْهِم بِالْمَوَدَّةِ وَقَدْ كَفَرُوا بِمَا جَاءَكُم مِّنَ الْحَقِّ يُخْرِجُونَ الرَّسُولَ وَإِيَّاكُمْ ۙ أَن تُؤْمِنُوا بِاللَّهِ رَبِّكُمْ إِن كُنتُمْ خَرَجْتُمْ جِهَادًا فِي سَبِيلِي وَابْتِغَاءَ مَرْضَاتِي ۚ تُسِرُّونَ إِلَيْهِم بِالْمَوَدَّةِ وَأَنَا أَعْلَمُ بِمَا أَخْفَيْتُمْ وَمَا أَعْلَنتُمْ ۚ وَمَن يَفْعَلْهُ مِنكُمْ فَقَدْ ضَلَّ سَوَاءَ السَّبِيلِ۝

“হে মুমিনগণ, তোমরা আমার ও তোমাদের শত্রুদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না। তোমরা তো তাদের প্রতি বন্ধুত্বের বার্তা পাঠাও, অথচ তারা যে সত্য তোমাদের কাছে  করেছে, তা অস্বীকার করছে। তারা রসূলকে ও তোমাদেরকে বহিষ্কার করে এই অপরাধে যে, তোমরা তোমাদের পালনকর্তার প্রতি বিশ্বাস রাখ। যদি তোমরা আমার সন্তুষ্টিলাভের জন্যে এবং আমার পথে জেহাদ করার জন্যে বের হয়ে থাক, তবে কেন তাদের প্রতি গোপনে বন্ধুত্বের পয়গাম প্রেরণ করছ? তোমরা যা গোপন কর এবং যা প্রকাশ কর, তা আমি খুব জানি। তোমাদের মধ্যে যে এটা করে, সে সরলপথ থেকে বিচ্যুত হয়ে যায়।” (৬০:১)

 

মক্কা অভিমুখে যাত্রা

নবীজী (সাঃ) প্রথমে তিনি মক্কার উল্টো পথ ধরে রওয়ানা দিয়ে কিছু দূর অগ্রসর হলেন এবং হঠাৎ গতিপথ পরিবর্তন করে মক্কা অভিমুখে ধাবিত হলেন। আর তখনই তিনি সবাইকে সতর্ক করে মক্কা অভিযানের ঘোষণা দিলেন যাতে অনভিপ্রেত রক্তপাতের কোন ঘটনা না ঘটে। মুসলিম বাহিনী কুরাইশদের অগোচরে দ্রুত মক্কার পানে এগিয়ে চললো। কুরাইশদের কবল থেকে মহান আল্লাহর ঘর পবিত্র কা’বাকে মুক্ত করা নেহায়েৎ জরুরী হয়ে পড়েছিল। কারণ তারা কা’বাকে পৌত্তলিকতার কেন্দ্রবিন্দু বানিয়ে যুগ যুগ ধরে প্রতিমা পূজায় লিপ্ত ছিল। মহান আল্লাহর ইচ্ছায় এখন তার অবসান ঘটতে যাচ্ছে। অচিরেই কা’বাগৃহ পৌত্তলিকতার কলুষতা থেকে চিরতরে মুক্ত হয়ে এক ও অদ্বিতীয় আল্লাহর উপাসনাগৃহ হিসেবে পুনঃ প্রতিষ্ঠিত হবে।

বিশাল মুসলিম বাহিনীর নেতৃত্ব দিচ্ছেন স্বয়ং নবী মুহাম্মদ (সাঃ)। তাঁর সাথে এগিয়ে যাচ্ছেন দশ সহস্র জিহাদী ভক্তবৃন্দ। অবশেষে তাঁরা মক্কার নিকটবর্তী নায়কুল উকাব নামক স্থানে পৌঁছে সেখানে শিবির স্থাপন করেন। রাতে বিরাট অগ্নিকুন্ড প্রজ্জ্বলন করে মুসলিম বাহিনী। এ আকস্মিক ঘটনায় বিস্মিত হয়ে পড়ে মক্কাবাসী। তাদের নেতৃবৃন্দ আশঙ্কিত হয়ে বেরিয়ে পড়ে খোঁজ খবর নেওয়ার জন্য। তাদের মধ্যে ছিল আবু সুফিয়ান, বোদায়েল ইবনে ওয়ারকা এবং হাকিম ইবনে হামযা। হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর চাচা আব্বাস (রাঃ)ও বের হন এবং মুসলিম শিবিরে নবীজী (সাঃ) এর সাথে সাক্ষাৎ করেন। তিনি বিরাট মুসলিম বাহিনীর সমাবেশ দেখে নবীজী (সাঃ)-কে জিজ্ঞেস করেন, কুরাইশ জনগণ তাঁর নিকট নিরাপত্তার আশ্রয় প্রার্থনা করলে তিনি কি ব্যবস্থা নেবেন। তিনি তাঁকে আশ্বস্থ করেন এবং দূত হিসেবে মক্কায় প্রেরণ করলেন। তিনি নবীজী (সাঃ) এর সাদা খচ্চরে চড়ে মক্কার দিকে রওয়ানা দিলেন। পথিমধ্যে তাঁর সাথে সাক্ষাৎ হয় আবু সুফিয়ান ও তার দুই সঙ্গীদ্বয়ের সাথে। তাঁর কাছ থেকে আবু সুফিয়ান নিশ্চিত হয় এটা মুসলিম বাহিনী। মুসলমানদের এ বিপুল রণ সাজে সে হতবুদ্ধি হয়ে পড়ে। সে হযরত আব্বাস (রাঃ) এর কাছে পরামর্শ চাইলো এ পরিস্থিতিতে  তাদের করণীয় কি হতে পারে। তিনি আবু সুফিয়ানকে নিজ সঙ্গী করে নবীজী (সাঃ) এর নিকট নিয়ে গেলেন। নবীজী (সাঃ) তাঁকে পরদিন সকালে নিয়ে আসার অনুমতি দিলেন।

নবীজী (সাঃ) সকাল বেলায় আবু সুফিয়ানকে প্রতিশ্রুত সাক্ষাৎকার দিলেন এবং তাকে ইসলাম গ্রহণের দাওয়াত দিলেন। প্রথমে সে ইতস্তত করলেও কোন উপায়ান্তর না দেখে এবং সার্বিক দিক বিবেচনা করে ইসলাম গ্রহণে সম্মত হলো। এরপর নবী করীম (সাঃ) ঘোষণা দেন:

‘আবু সুফিয়ানকে পূর্ণ নিরাপত্তা দেওয়া হলো, মক্কাবাসীদের মধ্যে যারা তার আশ্রয়ে থাকতে চাইবে তারাও নিরাপত্তা পাবে। এ ছাড়া যারা দ্বার বন্ধ করে  নিজ গৃহে অবস্থান করবে এবং যারা কা’বা গৃহে আশ্রয় নিবে তারাও নিরাপত্তা লাভ করবে।’

নবীজী (সাঃ)’র উপরোক্ত ঘোষণার উদ্দেশ্য ছিল যুদ্ধ এড়িয়ে বিনা রক্তপাতে ও শান্তিপূর্ণ উপায়ে মক্কা বিজয়।

 

বিনা প্রতিরোধে ও বিনা রক্তপাতে মক্কা বিজয়

নবী করীম (সাঃ) এর নেতৃত্বে বিশাল মুসলিম বাহিনী বিভিন্ন সেনাধ্যক্ষের অধীনে দলে দলে বিভিক্ত হয়ে একটি সরু গিরিপথ ধরে মুসলিম বাহিনী মক্কাভিমুখে ধাবিত হলো। নবীজী (সাঃ) মুসলিম বাহিনীর শক্তিমত্তা প্রদর্শনের একটি কৌশল হিসেবে হযরত আব্বাস (রাঃ)-কে নির্দেশ দিলেন তিনি যেন আবু সুফিয়ানকে পাশে নিয়ে গিরিপথের পাশে দাঁড়িয়ে মুসলিম বাহিনীর অগ্রযাত্রা দেখেন। এতে মুসলিম বাহিনীর শক্তিমত্তা সম্পর্কে কুরাইশ নেতা আবু সুফিয়ান তথা মক্কাবাসীর মন থেকে সব দ্বিধা–দ্বন্দ দূর হবে এবং কেহই কোন প্রতিরোধের সাহস পাবে না। বিভিন্ন দলে বিভক্ত মুসলিম বাহিনী যখন একের পর এক সে পথ অতিক্রম করছিলো তখন আবু সুফিয়ান সেসব সুশৃঙ্খল সেনাদলের অগ্রযাত্রা লক্ষ্য করে বিমোহিত হচ্ছিল। মুহাজির ও অনসারদের সমন্বয়ে যে দলটি ছিল তাতে পরিষ্টিত ছিলেন নবীজী (সাঃ)। এ বাহিনীর হাতে ছিল সবুজ পতাকা আর প্রতিটি যোদ্ধারই সর্বাঙ্গ ছিল বর্মাচ্ছাদিত।

উপরোক্ত দৃশ্যে আবু সুফিয়ানের অন্তরে মুসলিম বাহিনীর শক্তিমত্তা সম্পর্কে দৃঢ় প্রত্যয় জন্মালো এবং সে আব্বাস (রাঃ)-কে বললো:

‘আজ মুসলিম বাহিনীকে প্রতিরোধ করার ক্ষমতা মক্কাবাসীর নাই। হে আব্বাস মক্কার বুকে আপনার ভ্রাতুষ্পুত্রের রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে।’ আব্বাস (রাঃ) বললেন, ‘রাজত্ব নয় – বলো নবুওত প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।’

আবু সুফিয়ান দৌড়ে গিয়ে পাহড়ের চূড়ায় উঠলো এবং মক্কাবাসীর উদ্দেশ্যে চিৎকার করে বললো, ‘হে কুরাইশবৃন্দ! দুর্ধর্ষ মুসলিম বাহিনীর মোকাবেলা করার ক্ষমতা কারো নেই।’ এর সাথে সাথে সে নবীজী (সাঃ) এর প্রদত্ত নিরাপত্তার ঘোষণাটি বার বার উচ্চারণ করতে থাকলো। নবীজী (সাঃ) মক্কায় প্রবেশ করে দেখলেন কোথাও প্রতিরোধের কোন আভাস নেই। তিনি অত্যন্ত খুশী হলেন এবং মহান আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করলেন। এটা মহান আল্লাহর বিশেষ দয়া ও অনুগ্রহ যে, তিনি তাঁকে ও নির্যাতিত–নিপীড়িত মুহাজিরদেরকে তাঁদের নিজ মাতৃভূমিতে বিজয়ীর বেশে ফিরে আসার তওফিক দান করেছেন। তাঁদের সকলের অন্তর ছিল মহান আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতায় পরিপূর্ণ।

নবী করীম (সাঃ) এর এত সদিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও এবং কুরাইশ নেতা আবু সুফিয়ানের সতর্ক বাণী ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত ঘোষণার পরও একটি ছোটখাটো সংঘর্ষের ঘটনা সংঘটিত হয়। এর পেছনে উসকানিদাতা ছিল কুরাইশদের অন্য তিন নেতা। এরা হলো সাফওয়ান ইবনে উমাইয়া, সুহায়েল ইবনে আমর ও ইকরামা ইবনে আবু জেহেল। হযরত খালীদ ইবনে ওয়ালীদ (রাঃ) এর নেতৃত্বে একটি মুসলিম বাহিনী যখন মক্কার নিম্নভূমি ধরে নগরীতে প্রবেশ করছিল তখন তাদেরকে লক্ষ্য করে শত্রু পক্ষের লোকজন তীর নিক্ষেপ শুরু করলে সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। বীর খালীদ বাহিনীর পাল্টা আক্রমণে ১৩ কিংবা ১৮ জন আক্রমণকারী নিহত হয় এবং বাকীরা পালিয়ে যায়। দুই জন মুসলিম সৈন্য শত্রুর তীরের আঘাতে শহীদ হন। কতিপয় কুরাইশ নেতার অবিমৃশ্যকারিতায় রক্তপাতের এ দুঃখজনক ঘটনাটি ঘটে। এতে নবী করীম (সাঃ) খুবই মর্মাহত হন।

 

সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা

মক্কার পৌত্তলিক কুরাইশরা নবী করীম (সাঃ) এবং তাঁর অনুসারীগণের উপর অত্যাচার–নিপীড়ন ও অবরোধের যে মহাযজ্ঞ চালিয়েছিল তা তাঁদের অন্তরে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করে। কুরাইশদের বাড়াবাড়ির কারণে মুসলমানগণ প্রিয় মাতৃভূমি থেকে বহিষ্কৃত হয়ে প্রথমে আবিসিনিয়া ও পরে মদীনায় হিজরত করতে বাধ্য হয়েছিলেন। তখন তাদের দৃঃখ–কষ্ট ও ভোগান্তির সীমা–পরিসীমা ছিল না। সেসব জায়গায় গিয়েও তাঁরা স্বস্তি পাননি। বার বার আগ্রাসন চালিয়ে তাঁদেরকে নাস্তানাবুদ করা হয়েছে। এত কিছুর পরও মুসলমানদের ঈমানী শক্তি মোটেও দুর্বল হয়নি। তাঁরা ধৈর্য ধারণ করেছেন এবং শত্রুর মোকাবেলায় দৃঢ়তা প্রদর্শন করেছেন। বিভিন্ন সঙ্কটে তাঁরা চরমভাবে পরীক্ষিত হয়েছেন। অবশেষে তাঁদের উপর আল্লাহর মদদ ও বিজয় নাযিল হয়েছে। বিনা রক্তপাতে মক্কা বিজয় এটাতো মু’মিন বান্দাদের জন্য মহান আল্লাহর এক মহা অনুগ্রহ।

দয়া ও ক্ষমারর মূর্ত প্রতীক রহমতের নবী করীম (সাঃ) স্বজাতি কুরাইশদের উপর প্রতিহিংসা বা প্রতিশোধপরায়ণ ছিলেন না। তিনি তাঁর উদারতা ও মহত্ত্ব দিয়ে আজ অত্যাচারী–জালিম কুরাইশদের প্রতি সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেন। হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) বর্ণিত আছে নবীজী (সাঃ) কা’বা গৃহের দরজায় দাঁড়িয়ে বললেন:

‘হে মক্কাবাসী তোমরা আজ আমার কাছে কেমন ব্যবহার আশা করো?  তারা বললো, আপনি আমাদের দয়ালু ভাই ও দয়ালু ভ্রাতুষ্পুত্র এবং অত্যন্ত ধৈর্যবান।’ আল্লাহর রসূল (সাঃ) বললেন, হযরত ইউসূফ (আঃ) যেমন তাঁর ভাইদের বলেছিলেন আমিও তেমনই বলবো। আজ তোমাদের বিরুদ্ধে আমার কোন অভিযোগ নেই। মহান আল্লাহ্ তায়ালা তোমাদেরকে মাফ করুন।’

তাঁর এ মহানুভবতা সমগ্র মানবজাতির জন্য এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্তস্বরূপ চিরকাল বিরাজমান থাকবে। তবে এ ক্ষমা ঘোষণার আওতায় পড়েনি মুষ্টিমেয় কয়েকজন দুষ্কৃতিকারী যাদের অপরাধ ছিল অমার্জনীয়। তারা অতি জঘন্য অপরাধ সংঘটিত করেছিল। অবশ্য মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্তদের মধ্যে মাত্র চারজনের দন্ড কার্যকর করা হয় এবং সাহাবাগণের অনুরোধে অনুশোচনাগ্রস্ত বাকী অপরাধীদের মৃত্যুদন্ড মওকুফ করে দেওয়া হয়। মওকুফকৃতদের মধ্যে ছিল আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হিন্দা ও আবু জেহেলের পুত্র ইকরামা। তারা আত্মসমর্পণ করে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করলে তাদেরকেও ক্ষমা করা হয়। নবী করীম (সাঃ) অনন্য মহত্ত্ব ও উদারতায় মক্কাবাসী মুগ্ধ হয়ে পড়ে। তাদের প্রতি তাঁর সহানুভূতি ও ভালবাসার গভীরতা তারা উপলব্ধী করতে পারে। তারা দ্রুত ইসলাম গ্রহণে আগ্রহী হয়ে উঠে। এভাবেই তারা নিজেদেরকে ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে সমর্পিত করে দেয়। এমনকি তাদের গৃহে পুরুষাক্রমে অধিষ্ঠিত দেব–দেবীর প্রতিমাগুলোকে তারা স্বেচ্ছায় গুঁড়িয়ে ফেলে।

 

কা’বা গৃহ থেকে প্রতিমা অপসারণ

وَ اِذْ قَالَ اِبْرٰهِیْمُ رَبِّ اجْعَلْ هٰذَا الْبَلَدَ اٰمِنًا وَّ اجْنُبْنِیْ وَ بَنِیَّ اَنْ نَّعْبُدَ الْاَصْنَامَ ۝ رَبِّ اِنَّهُنَّ اَضْلَلْنَ كَثِیْرًا مِّنَ النَّاسِ ۚ فَمَنْ تَبِعَنِیْ فَاِنَّہٗ مِنِّیْ ۚ وَ مَنْ عَصَانِیْ فَاِنَّكَ غَفُوْرٌ رَّحِیْمٌ ۝

“যখন ইব্রাহীম বললেন: হে পালনকর্তা, এ (মক্কা) শহরকে শান্তিময় করে দিন এবং আমাকে ও আমার সন্তান সন্ততিকে মূর্তি পূজা থেকে দূরে রাখুন। হে পালনকর্তা, এরা অনেক মানুষকে বিপথগামী করেছে। অতএব যে আমার অনুসরণ করে, সে আমার এবং কেউ আমার অবাধ্যতা করলে নিশ্চয় আপনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” (১৪:৩৫ – ৩৬)

তৌহিদের বাণীবাহক নবী মুহাম্মাদুর রসূল্লাহ্ (সাঃ) কা’বা গৃহে প্রবেশ করলেন। তিনি সেখানে ঢুকে শত শত মূর্তি, প্রতিমা ও ছবি দেখতে পান। এসবই ছিল পৌত্তলিকদের উপাস্য দেব–দেবীর মূর্তি এবং তাদের কুসংস্কারপূর্ণ ধ্যান–ধারণার প্রতিচ্ছবি ও উপকরণ। তাদের বড় উপাস্য ‘হোবল’ দেবতার মূর্তিও সেখানে রক্ষিত ছিল। এছাড়া সেখানে ছিল জুয়া খেলারত অবস্থায় হযরত ইব্রাহীম (আঃ) এর অলীক ছবি ও কল্পনাপ্রসূত নারী আকৃতির ফেরেশতাগণের খোদাইকৃত ছবিসমূহ। এসব দেখে নবী করীম (সাঃ) পবিত্র কুরআনের নিম্নোক্ত আয়াতটি পাঠ করলেন:

وَقُلْ جَاءَ الْحَقُّ وَزَهَقَ الْبَاطِلُ ۚ إِنَّ الْبَاطِلَ كَانَ زَهُوقًا۝

“বলুনঃ সত্য এসে গেছে এবং মিথ্যা বিলুপ্ত হয়েছে। নিশ্চয় মিথ্যা বিলুপ্ত হওয়ারই ছিল।” (১৭:৮১)

এরপর নবী করীম (সাঃ) এর নির্দেশে কা’বা গৃহ ও তার আশেপাশের সকল দেব–দেবীর মূর্তি, প্রতিমা ও ছবি অপসারণ করে ফেলা হয়। মক্কায় তাঁর দু’সপ্তাহ অবস্থানকালে তিনি কা’বা গৃহ ও নগরীর আশপাশের পৌত্তলিকতার নিদর্শন মূর্তি ও প্রতিমাসমূহ চিরতরে বিলুপ্ত করে দেন। এভাবে মহান আল্লাহর ইচ্ছায় কা’বা গৃহ ও মক্কা নগরী পূত–পবিত্রময় হয়ে উঠে এবং একত্ববাদের স্বমহিমায় পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। কুরাইশরা সামনে দাঁড়িয়ে পবিত্রকরণের এ দৃশ্য অবলোকন করলো। তারা উপলব্ধী করতে পারলো এসব উপাস্য তাদের কোন কল্যাণ কিংবা অকল্যাণ করার ক্ষমতা রাখে না, এমনকি তারা নিজেদের রক্ষা করতেও সক্ষম নয়। পৌত্তলিকতার অসারতা প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ্ বলেন:

وَاتَّخَذُوا مِن دُونِهِ آلِهَةً لَّا يَخْلُقُونَ شَيْئًا وَهُمْ يُخْلَقُونَ وَلَا يَمْلِكُونَ لِأَنفُسِهِمْ ضَرًّا وَلَا نَفْعًا وَلَا يَمْلِكُونَ مَوْتًا وَلَا حَيَاةً وَلَا نُشُورًا۝

“তারা তাঁর (আল্লাহর) পরিবর্তে কত উপাস্য গ্রহণ করেছে, যারা কিছুই সৃষ্টি করে না এবং তারা নিজেরাই সৃষ্ট এবং নিজেদের ভালও করতে পারে না, মন্দও করতে পারে না এবং জীবন, মরণ ও পুনরুজ্জীবনেরও তারা মালিক নয়।” (২৫:৩)

قُلْ اَرَءَیْتُمْ مَّا تَدْعُوْنَ مِنْ دُوْنِ اللّٰهِ اَرُوْنِیْ مَاذَا خَلَقُوْا مِنَ الْاَرْضِ اَمْ لَهُمْ شِرْکٌ فِی السَّمٰوٰتِ ؕ اِیْتُوْنِیْ بِكِتٰبٍ مِّنْ قَبْلِ هٰذَاۤ اَوْ اَثٰرَۃٍ مِّنْ عِلْمٍ اِنْ کُنْتُمْ صٰدِقِیْنَ ۝ وَ مَنْ اَضَلُّ مِمَّنْ یَّدْعُوْا مِنْ دُوْنِ اللّٰهِ مَنْ لَّا یَسْتَجِیْبُ لَہٗۤ اِلٰی یَوْمِ الْقِیٰمَۃِ وَ هُمْ عَنْ دُعَآئِهِمْ غٰفِلُوْنَ ۝ وَ اِذَا حُشِرَ النَّاسُ كَانُوْا لَهُمْ اَعْدَآءً وَّ كَانُوْا بِعِبَادَتِهِمْ کٰفِرِیْنَ ۝

“বলুন, তোমরা আল্লাহ ব্যতীত যাদের পূজা কর, তাদের বিষয়ে ভেবে দেখেছ কি? দেখাও আমাকে তারা পৃথিবীতে কি সৃষ্টি করেছে? অথবা নভোমন্ডল সৃজনে তাদের কি কোন অংশ আছে? এর পূর্ববর্তী কোন কিতাব অথবা পরম্পরাগত কোন জ্ঞান আমার কাছে উপস্থিত কর, যদি তোমরা সত্যবাদী হও। যে ব্যক্তি আল্লাহর পরিবর্তে এমন বস্তুর পূজা করে, যে ক্বিয়ামত পর্যন্তও তার ডাকে সাড়া দেবে না, তার চেয়ে অধিক পথভ্রষ্ট আর কে? তারা তো তাদের পূজা সম্পর্কেও বেখবর। যখন মানুষকে হাশরে একত্রিত করা হবে, তখন তারা তাদের শত্রু হবে এবং তাদের ইবাদত অস্বীকার করবে।” (৪৬:৪ – ৬)

یٰۤاَیُّهَا النَّاسُ ضُرِبَ مَثَلٌ فَاسْتَمِعُوْا لَہٗ ؕ اِنَّ الَّذِیْنَ تَدْعُوْنَ مِنْ دُوْنِ اللّٰهِ لَنْ یَّخْلُقُوْا ذُبَابًا وَّ لَوِ اجْتَمَعُوْا لَہٗ ؕ وَ اِنْ یَّسْلُبْهُمُ الذُّبَابُ شَیْئًا لَّا یَسْتَنْقِذُوْهُ مِنْهُ ؕ ضَعُفَ الطَّالِبُ وَ الْمَطْلُوْبُ ۝ مَا قَدَرُوا اللّٰهَ حَقَّ قَدْرِہٖ ؕ اِنَّ اللّٰهَ لَقَوِیٌّ عَزِیْزٌ ۝

“হে মানুষ! একটি উপমা বর্ণনা করা হলো, অতএব তোমরা তা মনোযোগ দিয়ে শোন; তোমরা আল্লাহর পরিবর্তে যাদের পূজা কর, তারা কখনও একটি মাছি সৃষ্টি করতে পারবে না, যদিও তারা সকলে একত্রিত হয়। আর মাছি যদি তাদের কাছ থেকে কোন কিছু ছিনিয়ে নেয়, তবে তারা তার কাছ থেকে তা উদ্ধার করতে পারবে না, প্রার্থনাকারী ও যার কাছে প্রার্থনা করা হয়, উভয়েই শক্তিহীন। তারা আল্লাহর যথাযোগ্য মর্যাদা বোঝেনি। নিশ্চয় আল্লাহ শক্তিধর, মহাপরাক্রমশীল।” (২২:৭৩ – ৭৪)

 

কা’বা প্রাঙ্গণে যোহরের নামায আদায়

কা’বাকে পূত–পবিত্রকরণের পর নবী করীম (সাঃ) হযরত বিলাল (রাঃ)-কে যোহরের নামাযের আযান দিতে বললেন। কা’বা শরীফের ছাদে দাঁড়িয়ে বিলাল (রাঃ) উচ্চস্বরে আযান দিলেন। এরপর নবীজী (সাঃ) এর ইমামতিতে মুসলমানগণ সম্মিলিতভাবে যোহরের নামায আদায় করলেন। মক্কা বিজয়ের দিন থেকে পবিত্র কা’বা গৃহে দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত জামাতবদ্ধ নামাযের যে রীতি চালু হয়েছিল তা আজ অবধি বিদ্যমান এবং চিরকাল তা বিদ্যমান থাকবে। প্রতিদিন হাজার হাজার মুসলমানের নামায আদায় ও ওমরা পালন এবং প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ হাজীদের হজ্জ্ব পালনের মাধ্যমে কা’বা শরীফ এক ও অদ্বিতীয় আল্লাহর উপাসনার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হলো এবং কা’বা শরীফ তার আসল রূপে ফিরে আসলো যেভাবে মহান আল্লাহ্ তায়ালা চেয়েছিলেন:

وَ اِذْ جَعَلْنَا الْبَیْتَ مَثَابَۃً لِّلنَّاسِ وَ اَمْنًا ؕ وَ اتَّخِذُوْا مِنْ مَّقَامِ اِبْرٰہٖمَ مُصَلًّی ؕ وَ عَهِدْنَاۤ اِلٰۤی اِبْرٰہٖمَ وَ اِسْمٰعِیْلَ اَنْ طَهِرَا بَیْتِیَ لِلطَّآئِفِیْنَ وَ الْعٰكِفِیْنَ وَ الرُّكَعِ السُّجُوْدِ ۝

“যখন আমি কা’বা গৃহকে মানুষের জন্যে সম্মিলন স্থল ও শান্তির আলয় করলাম, আর তোমরা ইব্রাহীমের দাঁড়ানোর জায়গাকে নামাযের জায়গা বানাও এবং আমি ইব্রাহীম ও ইসমাঈলকে আদেশ করলাম, তোমরা আমার গৃহকে তওয়াফকারী, অবস্থানকারী ও রুকু–সেজদাকারীদের জন্য পবিত্র রাখ।” (২:১২৫)

 

আনসারদের মনোবেদনার অবসান

মদীনায় নবীজী (সাঃ) এর এতদিন অবস্থানকালে তাঁর সংস্পর্শে মদীনাবাসী আনসারগণ যেভাবে ধন্য ও গৌরবান্বিত হয়েছিলেন তা কি এখন অবসান হতে যাচ্ছে? মক্কা বিজয়ের পর আনসারগণের মনে এরূপ একটি শঙ্কাবোধ জাগ্রত হলো। তাঁরা মনে করলেন এবার বুঝি নবীজী (সাঃ) মদীনা ছেড়ে নিজ মাতৃভূমি মক্কায় অবস্থান করবেন। এ চিন্তায় তাঁরা বিরহ কাতর হয়ে পড়েন। নবীজী (সাঃ) তাঁদের এ মনোবেদনা বুঝতে পেরে তাঁদেরকে আশ্বস্থ করে বললেন, ‘আল্লাহ্ আমাদের রক্ষা করুন! আমার জীবন মরণ হবে তোমাদের সাথে।’ তাঁর এ দৃঢ় ঘোষণায় আনসারবৃন্দের বিরহ চিন্তা দূরীভূত হলো এবং তাঁরা নিশ্চিন্ত হলেন ।

 

মক্কা নগরীর পবিত্রতা রক্ষার ঘোষণা

আবহমান কাল থেকেই মক্কা নগরীর পবিত্রতা রক্ষার্থে সেখানে হত্যাকান্ড নিষিদ্ধ ছিল। মহান আল্লাহর নির্দেশেই সেখানে হানাহানি ও রক্তপাত নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। কা’বা ঘর থেকে পৌত্তলিকতার মূলোচ্ছেদ করতে নবী করীম (সাঃ) মক্কা অভিযান ছিল আল্লাহ্ কর্তৃক অনুমোদিত। তিনি সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন বিনা রক্তপাতে শান্তিপূর্ণ উপায়ে মক্কা অধিগ্রহণ সম্পন্ন করতে। তারপরও রক্তপাতের যে ঘটনা ঘটেছে তা ছিল অনভিপ্রেত। সর্বশেষ রক্তপাতের যে ঘটনাটি ঘটে তা হলো খোযাআ গোত্রের কিছু লোক হোযায়েল গোত্রের এক মুশরিককে হত্যা করে ফেলে। এতে সদ্য বিজিত হেরেম শরীফের পবিত্রতার মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হয়। নবী করীম (সাঃ) খুবই অসন্তুষ্ট হলেন এবং এ হত্যার রক্তপণ পরিশোধ করেন। তিনি ঘোষণা দেন:

‘এ শহরে রক্তপাত সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষিত হলো। যারা আল্লাহ্ ও আখিরাতে বিশ্বাস করে তাদের জন্য হেরেম শরীফে রক্তপাত ও বৃক্ষ কর্তন বৈধ নয়। আমার পূর্বে এটা নিষিদ্ধ ছিল এবং আমার পরেও এটা নিষিদ্ধ। বর্তমান পরিস্থিতিতে সাময়িকভাবে শুধুমাত্র ফেতনাবাজদের শাস্তি হিসেবে আমার জন্য বৈধ ছিল। এরপর থেকে পূর্বের মতোই এ নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকবে।’

তাঁর উপরোক্ত উদাত্ত ঘোষণায় মক্কা এক নিরাপদ নগরীতে পরিণত হয়। নবীজী (সাঃ)’র এ ঘোষণায় মক্কাবাসী প্রীত হলো এবং তারা তাঁর প্রতি শ্রদ্ধাবনত হয়ে পড়লো।

 

জুজায়মা গোত্রের ক্ষয়ক্ষতি ও রক্তপণ পরিশোধ

মক্কা বিজয়ের পর হযরত খালীদ ইবনে ওয়ালীদ মক্কার বাইরে নাখলায় অবস্থিত বনী শায়বান গোত্রের বড় দেবতা ’উযযা’ মূর্তিটি ভেঙ্গে দেন। এরপর তিনি তাঁর বাহিনী নিয়ে জুজায়মার গোত্রের দিকে যান। সে গোত্রের লোকজন ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করার পরও কিছুটা ভুল বুঝাবুঝির কারণে একটি ছোটখাটো সংঘর্ষের সূচনা হয়। ফলে সে গোত্রের কয়েক ব্যক্তি নিহত হন। এ ঘটনায় নবী করীম (সাঃ) খুবই বেদনাহত হন এবং অজ্ঞতার যুগের হানাহানির রীতি বন্ধ করার উপর সবিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন। সে সাথে তিনি জুজায়মা গোত্রের ক্ষয়ক্ষতি ও রক্তপণ পরিশোধের যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করেন।

 

মক্কা বিজয়ের প্রভাব

মক্কা বিজয় ছিল ইসলামের ইতিহাসে একটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। ইসলাম ধর্ম ও মুসলিম উম্মাহর উপর এর প্রভাব ছিল অপরিসীম। এ বিজয় দ্বারা ইসলামের অভিযাত্রা ও অগ্রগতির ক্ষেত্রে যে বিপুল সম্ভাবনা সূচিত হয়েছিল তার কয়েকটি দিক নিম্নে বর্ণিত হলো:

  • মক্কা বিজয় ছিল মহান আল্লাহ্ রব্বুল আলামীনের প্রতিশ্রুত বিজয় – মহান আল্লাহর মনোনীত ধর্ম ইসলামের বিজয়। একত্ববাদ অর্থাৎ ”আল্লাহ্ এক ও অদ্বিতীয়, তিনি ছাড়া অন্য কোন উপাস্য নেই এবং মুহাম্মদ (সাঃ) আল্লাহর দাস ও রসূল” – চির সত্য এ কালেমার বিজয়। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ্ তায়ালার প্রতিশ্রুতি হলো:

وَلَقَدْ سَبَقَتْ كَلِمَتُنَا لِعِبَادِنَا الْمُرْسَلِينَ۝ إِنَّهُمْ لَهُمُ الْمَنصُورُونَ۝ وَإِنَّ جُندَنَا لَهُمُ الْغَالِبُونَ۝

“আমার রসূল ও বান্দাগণের ব্যাপারে আমার এই বাক্য সত্য হয়েছে যে, অবশ্যই তারা সাহায্য প্রাপ্ত হবে। আর আমার বাহিনীই হবে বিজয়ী।” (৩৭:১৭১ – ১৭৩)

  • বিনা রক্তপাতে মক্কা বিজয় দুনিয়ার বুকে ইসলামকে শান্তির ধর্ম হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছে। তদুপরি নবী করীম (সাঃ) প্রাণঘাতী শত্রু কুরাইশদের অতীতের সব ঘৃণ্য কৃতকর্ম ভুলে গিয়ে তাদের প্রতি সাধারন ক্ষমা ঘোষণা করেন। তাঁর এ মহানুভবতা ক্ষমা ও সমঝোতার ক্ষেত্রে এক অনন্য নজীর স্থাপন করে।

  • কা’বা গৃহ পৌত্তলিকতামুক্ত হয়ে তার মূল অবস্থায় ফিরে আসে। মহান আল্লাহর নবী হযরত ইব্রাহীম (আঃ) কর্তৃক এ গৃহটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এক ও অদ্বিতীয় আল্লাহর উপাসনার নিমিত্তে। কিন্তু পরবর্তীতে এটি পৌত্তলিক মুশরিকদের দ্বারা দেবদেবীর প্রতিমা পূজার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। মক্কা বিজয়ের মাধ্যমে এ গৃহটি আবার তার স্বরূপে ফিরে আসে এবং পৌত্তলিকতার কলুষতা থেকে মুক্ত হয়ে শুচিতা ও পবিত্রতা ফিরে পায়। তখন থেকে এ পবিত্র কা’বা গৃহটি একত্ববাদের নিদর্শন হিসেবে বিশ্ব মুসলিমের ক্বিবলা, উপাসনালয় এবং হজ্জ্ব ও ওমরা পালনের তীর্থকেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।

  • সমগ্র আরবে সুপরিচিত এ তীর্থ কেন্দ্রটি মুসলমানদের দখলে আসায় ইসলামের প্রভাব সর্বত্র অনুভূত হয় এবং আরব উপদ্বীপ জুড়ে সত্য–ধর্ম ইসলামের প্রচার ও প্রসার ত্বরিত সাফল্য লাভে সক্ষম হয়।

মক্কা বিজয় ইসলামের শান্তি, সম্প্রীতি, সাম্য, মৈত্রী ও ভ্রাতৃত্ববোধকে উজ্জীবিত করে, ন্যায়নীতির দৃঢ় ভিত প্রতিষ্ঠা করে, বিশ্ব জুড়ে তৌহীদে বিশ্বাসী একটি মুসলিম উম্মাহ্ গড়ে উঠে এবং কুরআন ও সুন্নাহ্ ভিত্তিক ইসলামী সভ্যতার সূচনা হয়। এ বিজয় ইসলামের নীতি–নৈতিকতার উপর ভিত্তি করে একটি আধ্যাত্মিক সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার পথকে সুগম করে।

অধ্যায়সমূহ