এ অধ্যায়ের বিষয়সমূহ
Toggleনবী-পত্নীগণের নাম ও পরিচয়
নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর পারিবারিক জীবন ছিল দু’পর্বে বিভক্ত। প্রথম পর্বে মক্কায় হযরত খাদীজা বিনতে খুয়ালীদ (রাঃ) এর সাথে তাঁর দাম্পত্য জীবন। এ পর্বে তাঁর পঁচিশ বছরের পারিবারিক জীবনের অবসান ঘটে স্ত্রী হযরত খাদীজা ( রাঃ) এর ইন্তেকালের পর। এ দীর্ঘ সময়ে তিনি দ্বিতীয় কোন বিবাহ করেননি। তাঁদের এ পর্বের পারিবারিক জীবন ও সন্তান–সন্ততি সম্পর্কে এ গ্রন্থের দ্বিতীয় অধ্যায়ে আলোচনা করা হয়েছে। মদীনায় হিজরতের পর শুরু হয় তাঁর দ্বিতীয় পর্বের পারিবারিক জীবন। বিভিন্ন সময়ে এবং বিভিন্ন পরিস্থিতিতে তিনি একাধিক বিয়ে করেন । পরবর্তী স্ত্রীগণের মধ্যে একমাত্র হযরত আয়েশা (রা) ছিলেন কুমারী, অন্য সবাই ছিলেন বিধবা অথবা তালাকপ্রাপ্তা। তাঁরা সবাই ছিলেন অত্যন্ত সম্ভ্রান্ত, পরহেজগার, উন্নত চরিত্রের অধিকারিনী ও পবিত্রতমা। হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর একাধিক বিয়ের প্রধান একটি কারণ ছিল – তৎকালীন বিরূপ পরিবেশে ইসলামের সামাজিক ও ধর্মীয় বন্ধনকে সুদৃঢ় করা।
হযরত আয়েশা (রাঃ) এর সাথে বিবাহ
হিজরী প্রথম সালে মুহাম্মদ (সা) তাঁর ঘনিষ্ট বন্ধু ও সাহাবী হযরত আবু বকর (রাঃ) এর অনুরোধে তাঁর কন্যা হযরত আয়েশা (রাঃ) কে বিয়ে করতে সম্মত হন। এ সময় হযরত আয়েশা (রাঃ) ছিলেন অপ্রাপ্ত বয়স্কা। ৯ বছর বয়সে তিনি ঋতুমতী হলে নবীজী (সাঃ) তাঁকে ঘরে তুলে নেন। ইসলাম বিদ্বেষী সমালোচকবৃন্দ তাঁর এ বাল্যবিবাহকে বিতর্কিত করতে চাইলেও তৎকালীন আরবে ও বহু সমাজে বাল্য বিবাহ ছিল রীতিসিদ্ধ।
হযরত হাফসা (রাঃ) এর সাথে বিবাহ
হিজরী তৃতীয় সালে বিশিষ্ট সাহাবী হযরত ওমর (রাঃ) এর অনুরোধে তদীয় বিধবা কন্যা হযরত হাফসা (রাঃ)- কে নবীজী (সাঃ) বিয়ে করেন। পারিবারিকভাবে হযরত ওমরের (রাঃ) এর সাথে দৃঢ় বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার লক্ষ্যে তিনি এ বিয়ে করেছিলেন।
অন্য সব স্ত্রীগণের পরিচয়
- হযরত সাওদা বিনতে যামআর (রাঃ): তিনি ছিলেন নবীজী (সাঃ)র দ্বিতীয় স্ত্রী। তিনি ছিলেন ইসলামের প্রাথমিক যুগের মুসলমান। তাঁর প্রথম স্বামী সুকরান ইবনে আমর (রাঃ) এর সাথে তিনি আবিসিনিয়ায় হিজরত করেন এবং সেখানে মুহাজির মুসলিমদের সাথে অবর্ণনীয় দুঃখ–কষ্ট বরণ করেন। স্বামীর মৃত্যুর পর তিনি মক্কায় ফিরে আসেন। এই মহিয়সী মহিলার সম্মান ও আর্থ–সামাজিক নিরাপত্তা বিধানকল্পে নবী করীম (সাঃ) তাঁকে বিয়ে করেন।
- হযরত যয়নব বিনতে খুযায়মা (রাঃ): বদর যুদ্ধে শাহাদাতবরণকারী সাহাবী হযরত উবায়দা ইবনে হারেছ (রাঃ) এর বিধবা স্ত্রী হযরত যয়নব বিনতে খুযায়মা (রাঃ)- কে নবীজী (সাঃ) বিয়ে করেন। তিনি এত বেশী দানশীলা মহিলা ছিলেন যে, লোকজন তাঁকে “উম্মুল মাসাকীন” নামে অভিহিত করত। বিয়ের মাত্র ২/৩ বছরের মধ্যে যয়নব (রাঃ) ইন্তেকাল করেন।
- উম্মে সালামা (রাঃ): নবীজী (সাঃ)র পরবর্তী বিয়ে হয় উম্মে সালামা (রাঃ) এর সাথে। তিনি ছিলেন ওহুদ যুদ্ধে আহত ও হামারাউল আসাদ অভিযানের সফল অধিনায়ক আবু সালামার বিধবা পত্নী। তাঁর বেশ কয়েকজন সন্তান–সন্ততি ছিল। এ পরিবারের অস্বচ্ছল আর্থিক দিক বিবেচনা করে নবীজী (সাঃ) তাঁর নিকট বিয়ের প্রস্তাব পাঠান। নিজ বয়সের কথা চিন্তা করে প্রথমে উম্মে সালামা (রাঃ) এ প্রস্তাবে রাজী না হলেও পরে সম্মতি প্রদান করেন। তিনি ছিলেন বিদূষী ও নেককার মহিলা। বিয়ের পর নবীজী (সাঃ) এ পরিবারের সকল সদস্যের লালন–পালনের ব্যাপারে সবিশেষ যত্ন নেন।
- যয়নব বিনতে জাহশ (রাঃ): হিজরী পাঁচ সালে নবীজী (সাঃ) বিয়ে করেন তাঁর ফুফাত বোন তালাকপ্রাপ্তা হযরত যয়নব বিনতে জাহশ (রাঃ)কে। যয়নব (রাঃ) এর প্রথম স্বামী ছিলেন হযরত যায়েদ (রাঃ)। তিনি ছিলেন হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর পালকপুত্র । নবীজী (সাঃ) এর উদ্যোগে তাঁদের এ বিয়ে সম্পাদিত হয়েছিল। কিন্তু স্বামী–স্ত্রী বনিবনা না হওয়ায় উভয়ের মধ্যে এক পর্যায়ে বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটে। পরবর্তীতে পোষ্যপুত্রের তালাকপ্রাপ্তা বা বিধবা স্ত্রীকে বিয়ে করার বিধান সম্পর্কিত আয়াত নাযিল হলে যয়নব (রাঃ) এর সাথে তাঁর বিয়ে সম্পাদিত হয়।
নিম্নোক্ত আয়াতটিতে হযরত যয়নবের সাথে তাঁর বিয়ের প্রসঙ্গটি বিবৃত হয়:
وَ اِذْ تَقُوْلُ لِلَّذِیْۤ اَنْعَمَ اللّٰهُ عَلَیْهِ وَ اَنْعَمْتَ عَلَیْهِ اَمْسِکْ عَلَیْكَ زَوْجَكَ وَ اتَّقِ اللّٰهَ وَ تُخْفِیْ فِیْ نَفْسِكَ مَا اللّٰهُ مُبْدِیْهِ وَ تَخْشَی النَّاسَ ۚ وَ اللّٰهُ اَحَقُّ اَنْ تَخْشٰهُ ؕ فَلَمَّا قَضٰی زَیْدٌ مِّنْهَا وَطَرًا زَوَّجْنٰكَهَا لِكَیْ لَا یَکُوْنَ عَلَی الْمُؤْمِنِیْنَ حَرَجٌ فِیْۤ اَزْوَاجِ اَدْعِیَآئِهِمْ اِذَا قَضَوْا مِنْهُنَّ وَطَرًا ؕ وَ كَانَ اَمْرُ اللّٰهِ مَفْعُوْلًا
“আল্লাহ যাকে অনুগ্রহ করেছেন; আপনিও যাকে অনুগ্রহ করেছেন; তাকে (যায়েদকে) যখন আপনি বলেছিলেন, তোমার স্ত্রীকে তোমার কাছেই থাকতে দাও এবং আল্লাহকে ভয় কর। আপনি অন্তরে এমন বিষয় গোপন করছিলেন, যা আল্লাহপাক প্রকাশ করে দেবেন – আপনি লোকনিন্দার ভয় করেছিলেন অথচ আল্লাহকেই অধিক ভয় করা উচিত। অতঃপর যায়েদ যখন তার (স্ত্রীর) সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করল, তখন আমি তাকে আপনার সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ করলাম যাতে মু’মিনদের পোষ্যপুত্ররা তাদের স্ত্রীর সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করলে সেসব স্ত্রীকে বিবাহ করার ব্যাপারে মু’মিনদের কোন অসুবিধা না থাকে। আল্লাহর নির্দেশ কার্যে পরিণত হয়েই থাকে।” (৩৩:৩৭)।
- যুওয়ারিয়া বিনতে হারিছ (রাঃ): ষষ্ট হিজরীতে হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) হযরত যুওয়ারিয়া বিনতে হারিছ (রাঃ)কে বিয়ে করেন। তাঁর গোত্রটি ছিল ইসলামের এক শত্রু পক্ষ। সে গোত্রের সাথে এক যুদ্ধের পর এ বিয়ে সম্পাদিত হয়। এ বিয়ের কারণে উভয় পক্ষের শত্রুতা প্রশমিত হয় এবং সম্পর্কের উন্নয়ন ঘটে।
- উম্মে হাবিবা (রাঃ): ইসলামের এক বড় শত্রু কুরাইশ সর্দার আবু সুফিয়ানের কন্যা হযরত উম্মে হাবিবা (রাঃ)কে রসূল (সাঃ) বিয়ে করেন। তাঁর প্রথম স্বামী ছিলেন আবিসিনিয়ার এক মুসলিম শাসক। তাঁর মৃত্যুর পর নবীজী (সাঃ) এর সাথে উম্মে হাবিবার (রাঃ) এর বিয়ে হয়।
- সাফিয়া বিনতে হুয়াই (রাঃ): এরপর রসূল (সাঃ) যাঁকে বিয়ে করেন তিনি হলেন যুদ্ধবন্দীনি হযরত সাফিয়া বিনতে হুয়াই (রাঃ)। তিনি ছিলেন ইহুদী বনু নাজীর গোত্রের সর্দার হুয়াই ইবনে আখতাবের কন্যা। এর আগে তাঁর আরও দু’টি বিয়ে হয়েছিল। প্রথম স্বামী তালাক দেওয়ার পর তাঁর দ্বিতীয় বিয়ে হয় বনু নজীর গোত্রের কোষাধ্যক্ষ্য কেনানা ইবনে রাবীর সাথে। মুসলমানদের কট্টর শত্রু বনু নজীর গোত্র খায়বার যুদ্ধে পরাজিত হলে সাফিয়া যুদ্ধবন্দীনি হিসেবে মুহাম্মদ (সাঃ) এর নিকট আসেন। তিনি তাঁকে ইসলাম ধর্ম গ্রহণের আহ্বান জানান। সাফিয়া মুসলমান হতে রাজী হলেন। অতঃপর নবীজী (সাঃ) তাঁকে বিয়ের প্রস্তাব দিলে তাতে তিনি সম্মতি প্রদান করলে এ বিয়ে সম্পাদিত হয়।
- রায়হানা বিনতে যায়েদ (রাঃ): নবীজী (সাঃ) এর অপর এক স্ত্রী হযরত রায়হানা বিনতে যায়েদ (রাঃ) ছিলেন পিতৃসূত্রে ইহুদী বনূ নজীর গোত্র ও পূর্ব–পরিণয়সূত্রে বনু কোরায়জা গোত্রের সাথে সম্পৃক্ত। তিনিও যুদ্ধবন্দীনি হিসেবে নবীজী (সাঃ)র কাছে আনীত হলে প্রথমে তিনি তাঁকে মুসলমান হতে বলেন এবং ইসলাম গ্রহণের পর তাঁকে বিয়ের প্রস্তাব দেন। তাঁর সম্মতিতে এ বিয়ে সম্পাদিত হয়।
- মায়মুনা বিনতে হারিছ আল-হিলালিয়াহ্ (রাঃ): নবী মুহাম্মদ (সাঃ) এর অপর আরেক স্ত্রীর নাম হলো মায়মুনা বিনতে হারিছ আল–হিলালিয়াহ্ (রাঃ)। তাঁর পূর্ব নাম ছিল বাররা, নবীজী (সাঃ) তাঁর নাম পরিবর্তন করে রাখেন মায়মুনা। হিজরী অষ্টম সালে তাঁদের বিয়ে হয়।
- হযরত মারিয়া কিবতিয়া বিনতে শাম’উন (রাঃ): তিনি ছিলেন একজন মিশরীয় দাসী। সেখানকার খৃস্টান শাসক মুক্বাওয়াক্বিস তাঁকে উপহার হিসেবে মুহাম্মদ (সাঃ) এর নিকট প্রেরণ করেন। তিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করলে নবীজী (সাঃ) তাঁকে বিয়ে করে স্ত্রীর মর্যাদা দেন। তাঁর গর্ভে নবীজী (সাঃ) এর এক ছেলে সন্তান জন্মগ্রহণ করে যাঁর নাম ছিল ইব্রাহীম। মাত্র ১৮ মাস বয়সে শিশু ইব্রাহীম মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর নয়নমণি শিশু পুত্রের মৃত্যুতে নবীজী (সাঃ) খুবই ব্যথিত ও শোকসন্তপ্ত হয়ে পড়েছিলেন।
পোষ্যপুত্র সম্পর্কিত বিধান
তৎকালীন সমাজে পালক পুত্রের স্ত্রীকে বিয়ে করা গর্হিত কাজ বলে বিবেচিত হত। মহান আল্লাহ্ তায়ালা সামাজিক এ প্রথাকে বাতিল করে দেন এবং পোষ্যপুত্রকে নিজ পিতৃ–পরিচয়ের উপর প্রতিষ্ঠিত রেখে নিম্নোক্ত আয়াতসমূহ নাযিল করেন:
اُدْعُوْهُمْ لِاٰبَآئِهِمْ هُوَ اَقْسَطُ عِنْدَ اللّٰهِ ۚ فَاِنْ لَّمْ تَعْلَمُوْۤا اٰبَآءَهُمْ فَاِخْوَانُکُمْ فِی الدِّیْنِ وَ مَوَالِیْکُمْ ؕ وَ لَیْسَ عَلَیْکُمْ جُنَاحٌ فِیْمَاۤ اَخْطَاْتُمْ بِہٖ ۙ وَ لٰكِنْ مَّا تَعَمَّدَتْ قُلُوْبُکُمْ ؕ وَ كَانَ اللّٰهُ غَفُوْرًا رَّحِیْمًا
“তোমরা তাদেরকে তাদের (পোষ্যপুত্রদের) পিতৃ–পরিচয়ে ডাক। এটাই আল্লাহর কাছে ন্যায়সঙ্গত। যদি তোমরা তাদের পিতৃ–পরিচয় না জান, তবে তারা তোমাদের ধর্মীয় ভাই ও বন্ধুরূপে গণ্য হবে। এ ব্যাপারে তোমাদের কোন বিচ্যুতি হলে তাতে তোমাদের কোন গোনাহ নেই, তবে ইচ্ছাকৃত হলে ভিন্ন কথা। আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” (৩৩:৫)
নবী-পত্নীগণের মর্যাদা
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ্ রব্বুল আলামীন হয়রত মুহাম্মদ (সাঃ) এর পবিত্রতমা স্ত্রীগণকে “উম্মাহাতুল মু’মেনীন” বা বিশ্বাসীগণের মাতা বলে অভিহিত করেছেন। আল্লাহ্ তায়ালা তাঁদের সাথে শালীনতা ও শিষ্টাচারের নির্দেশ দিয়েছেন। নবী–পত্নীগণের মর্যাদা ছিল অনেক উঁচুতে। তাঁরা ছিলেন মু’মিন নারীদের জন্য আদর্শস্থানীয়া। নবী (সা) এর ওফাতের পর তাঁর স্ত্রীগণকে বিয়ে করা গুরুতর অপরাধ হিসেবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এ সম্পর্কিত যেসব আয়াত নাযিল হয়েছে তা নিম্নে পেশ করা হলো:
النَّبِىُّ اَوْلٰى بِالْمُؤْمِنِيْنَ مِنْ اَنْفُسِهِمْ وَاَزْوٰجُه اُمَّهٰتُهُمْ
“নবী মু’মিনদের নিকট তাদের নিজেদের অপেক্ষা অধিক ঘনিষ্ঠ এবং তাঁর স্ত্রীগণ তাদের মাতা …” (৩৩:৬)
وَ مَا كَانَ لَکُمْ اَنْ تُؤْذُوْا رَسُوْلَ اللّٰهِ وَ لَاۤ اَنْ تَنْكِحُوْۤا اَزْوَاجَہٗ مِنْۢ بَعْدِہٖۤ اَبَدًا ؕ اِنَّ ذٰلِکُمْ كَانَ عِنْدَ اللّٰهِ عَظِیْمًا
“…….আল্লাহর রসূলকে কষ্ট দেয়া এবং তাঁর ওফাতের পর তাঁর পত্নীগণকে বিবাহ করা তোমাদের জন্য বৈধ নয়। আল্লাহর কাছে এটা গুরুতর অপরাধ।” (৩৩:৫৩)
নবী করীম (সাঃ)’র পারিবারিক জীবনের কিছু ঘটনা
এ জগৎ সংসারে পারিবারিক ও দাম্পত্য কলহ এবং স্ত্রীগণের মধ্যেও পারস্পরিক ঈর্ষাকাতরতা একটি স্বাভাবিক ব্যাপার ছিল। নবীজী (সাঃ) এর পারিবারিক ও দাম্পত্য জীবনের ঘটনা প্রবাহ এর ব্যতিক্রম ছিল না। তিনি একজন আদর্শ স্বামী ছিলেন এবং স্ত্রীগণকে তিনি যথাযথ মর্যাদা দান করেছিলেন। যদিও মহান আল্লাহ্ তাঁকে স্ত্রীদের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে কিছুটা স্বাধীনতা দিয়েছিলেন কিন্তু তিনি কখনও বাড়াবাড়ি করেননি। সবার সাথে ন্যায়সঙ্গত ব্যবহারে তিনি ছিলেন সচেষ্ট ও সতর্ক। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ্ বলেন,
یٰۤاَیُّهَا النَّبِیُّ اِنَّاۤ اَحْلَلْنَا لَكَ اَزْوَاجَكَ الّٰتِیْۤ اٰتَیْتَ اُجُوْرَهُنَّ وَ مَا مَلَكَتْ یَمِیْنُكَ مِمَّاۤ اَفَآءَ اللّٰهُ عَلَیْكَ وَ بَنٰتِ عَمِّكَ وَ بَنٰتِ عَمّٰتِكَ وَ بَنٰتِ خَالِكَ وَ بَنٰتِ خٰلٰتِكَ الّٰتِیْ هَاجَرْنَ مَعَكَ ۫ وَامْرَاَۃً مُّؤْمِنَۃً اِنْ وَّهَبَتْ نَفْسَهَا لِلنَّبِیِّ اِنْ اَرَادَ النَّبِیُّ اَنْ یَّسْتَنْكِحَهَا ٭ خَالِصَۃً لَّكَ مِنْ دُوْنِ الْمُؤْمِنِیْنَ ؕ قَدْ عَلِمْنَا مَا فَرَضْنَا عَلَیْهِمْ فِیْۤ اَزْوَاجِهِمْ وَ مَا مَلَكَتْ اَیْمَانُهُمْ لِكَیْلَا یَکُوْنَ عَلَیْكَ حَرَجٌ ؕ وَ كَانَ اللّٰهُ غَفُوْرًا رَّحِیْمًا تُرْجِیْ مَنْ تَشَآءُ مِنْهُنَّ وَ تُــْٔوِیْۤ اِلَیْكَ مَنْ تَشَآءُ ؕ وَمَنِ ابْتَغَیْتَ مِمَّنْ عَزَلْتَ فَلَا جُنَاحَ عَلَیْكَ ؕ ذٰلِكَ اَدْنٰۤی اَنْ تَقَرَّ اَعْیُنُهُنَّ وَ لَا یَحْزَنَّ وَ یَرْضَیْنَ بِمَاۤ اٰتَیْتَهُنَّ کُلُّهُنَّ ؕ وَ اللّٰهُ یَعْلَمُ مَا فِیْ قُلُوْبِکُمْ ؕ وَ كَانَ اللّٰهُ عَلِیْمًا حَلِیْمًا لَا یَحِلُّ لَكَ النِّسَآءُ مِنْۢ بَعْدُ وَ لَاۤ اَنْ تَبَدَّلَ بِهِنَّ مِنْ اَزْوَاجٍ وَّ لَوْ اَعْجَبَكَ حُسْنُهُنَّ اِلَّا مَا مَلَكَتْ یَمِیْنُكَ ؕ وَ كَانَ اللّٰهُ عَلٰی کُلِّ شَیْءٍ رَّقِیْبًا
“হে নবী! আপনার জন্য আপনার স্ত্রীগণকে হালাল করেছি, যাদেরকে আপনি মোহরানা প্রদান করেন। আর দাসীদেরকে হালাল করেছি, যাদেরকে আল্লাহ আপনার করায়ত্ব করে দেন এবং বিবাহের জন্য বৈধ করেছি আপনার চাচাতো ভগ্নি, ফুফাতো ভগ্নি, মামাতো ভগ্নি, খালাতো ভগ্নিকে যারা আপনার সাথে হিজরত করেছে। কোন মু’মিন নারী যদি নিজেকে নবীর কাছে সমর্পন করে, নবী তাকে বিবাহ করতে চাইলে সেও হালাল। এটা বিশেষ করে আপনারই জন্য-অন্য মু’মিনদের জন্য নয়। আপনার অসুবিধা দূরীকরণের উদ্দেশে। মু’মিনগণের স্ত্রী ও দাসীদের ব্যাপারে যা নির্ধারিত করেছি আমার জানা আছে। আল্লাহ ক্ষমাশীল, দয়ালু। আপনি তাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা দূরে রাখতে পারেন এবং যাকে ইচ্ছা কাছে রাখতে পারেন। আপনি যাকে দূরে রেখেছেন, তাকে কামনা করলে তাতে আপনার কোন দোষ নেই। এতে অধিক সম্ভাবনা আছে যে, তাদের চক্ষু শীতল থাকবে; তারা দুঃখ পাবে না এবং আপনি যা দেন, তাতে তারা সকলেই সন্তুষ্ট থাকবে। তোমাদের অন্তরে যা আছে, আল্লাহ জানেন। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সহনশীল। এরপর আপনার জন্যে কোন নারী হালাল নয় এবং তাদের পরিবর্তে অন্য স্ত্রী গ্রহণ করাও হালাল নয় যদিও তাদের রূপলাবণ্য আপনাকে মুগ্ধ করে, তবে দাসীর ব্যাপার ভিন্ন। আল্লাহ সর্ব বিষয়ের উপর সজাগ নজর রাখেন।” (৩৩:৫০ – ৫২)
স্ত্রীগণের সাথে নবীজী (সাঃ) এর সম্পর্ক ছিল সর্বকালের জন্য আদর্শস্বরূপ। তৎকালীন আরব সমাজে তা ছিল কল্পনাতীত। তাঁর স্ত্রীগণ ছিলেন উম্মুল মু’মেনীন – উচ্চ মর্যাদাশীলা ও এবং আদর্শস্থানীয়া। তবুও মাঝে-মধ্যে তাঁরা নবীজী (সাঃ) এর সাথে মান-অভিমান করতেন, নিজেদের দাবী-দাওয়া পেশের ব্যাপারে কিছুটা উচ্চকিত হতেন এবং স্ত্রীগণের মধ্যে পারস্পরিক ঈর্ষাভাবও বিরাজ করতো। তবে কোন কোন ক্ষেত্রে স্ত্রীদের স্বাধীনতার অপব্যবহার তাঁকে বিপাকে ফেলতো এবং তাঁদের এসব কর্মকান্ড রিসালতের গুরু-দায়িত্ব পালনে তাঁর উপর মানসিক চাপ সৃষ্টি করত। এ ধরনের কতক ঘটনা নিম্নে বর্ণিত হলো:
-
নবী করীম (সাঃ) ও তাঁর স্ত্রীগণের জীবন যাপন ছিল অতি সাধারণ মানের। তাঁর ধণাঢ্য স্ত্রী খাদীজা (রাঃ) বিয়ের পর যাবতীয় সম্পদ স্বামীর পদতলে নিবেদন করেছিলেন। সে সম্পদও নবীজী (সাঃ) গরীব–দুঃখী ও অসহায়দের মধ্যে বিলিয়ে দিয়েছিলেন। প্রচুর যুদ্ধ–লব্ধ সম্পদ নবীজী (সাঃ) এর জীবন যাপনে কোনরূপ প্রভাব ফেলতে পারেনি। এসব সম্পদ তিনি আল্লাহর নামে গরীব–নিঃস্বদের মধ্যে বিলিয়ে দিতেন। এক পর্যায়ে নবী–পত্নীগণ তাঁদেরকে উচ্চতর খরচাদি প্রদানের দাবী পেশ করতে থাকেন। তাঁরা আশা করেছিলেন যে, যুদ্ধ–লব্ধ সম্পদ থেকে তিনি তাঁদের ব্যয় মেটাতে পারবেন। এতে নবীজী (সাঃ) কিছুটা মনঃক্ষুণ্ণ হয়ে পড়েন। কারণ এটা তাঁর নবীসুলভ দায়িত্বের পরিপন্থী ছিল। তাঁর এ অবস্থা দর্শনে মহান আল্লাহ্ পবিত্র কুরআনের নিম্নোক্ত আয়াতগুলো নাযিল করেন:
یٰۤاَیُّهَا النَّبِیُّ قُلْ لِّاَزْوَاجِكَ اِنْ کُنْـتُنَّ تُرِدْنَ الْحَیٰوۃَ الدُّنْیَا وَ زِیْنَتَهَا فَتَعَالَیْنَ اُمَتِّعْکُنَّ وَ اُسَرِّحْکُنَّ سَرَاحًا جَمِیْلًا وَ اِنْ کُنْـتُنَّ تُرِدْنَ اللّٰهَ وَ رَسُوْلَہٗ وَ الدَّارَ الْاٰخِرَۃَ فَاِنَّ اللّٰهَ اَعَدَّ لِلْمُحْسِنٰتِ مِنْکُنَّ اَجْرًا عَظِیْمًا
“হে নবী, আপনার পত্নীগণকে বলুন, তোমরা যদি পার্থিব জীবন ও তার বিলাসিতা কামনা কর, তবে আস, আমি তোমাদের ভোগের ব্যবস্থা করে দেই এবং উত্তম পন্থায় তোমাদের বিদায় নেই। পক্ষান্তরে যদি তোমরা আল্লাহ, তাঁর রসূল ও পরকাল কামনা কর, তবে তোমাদের সৎকর্মপরায়ণদের জন্য আল্লাহ মহা পুরস্কার প্রস্তুত করে রেখেছেন।” (৩৩:২৮ – ২৯)
- পুত্র ইব্রাহীমের জন্মের পর প্রিয় পুত্রকে দেখার জন্য স্ত্রী মারিয়া (রাঃ) এর গৃহে নবীজী (সাঃ) এর যাতায়াত বেড়ে যায়। তাঁর মধ্যে হযরত মারিয়া (রাঃ) ও পুত্র ইব্রাহীমের প্রতি এ উচ্ছ্বসিতভাব দেখে অন্যান্য স্ত্রীগণ ঈর্ষান্বিত হয়ে পড়েন। এ সময় হযরত আয়েশা (রাঃ) একটু বেশী ঈর্ষাকাতর ছিলেন। মারিয়া (রাঃ) দাসী থেকে স্ত্রীর মর্যাদায় উন্নীত হওয়ায় এবং তাঁর গর্ভে পুত্র সন্তান জন্ম নেওয়ায় অন্যসব পত্নী ঈর্ষাকাতর ছিলেন। একদিন হযরত হাফসা (রাঃ) পিতৃগৃহে থাকায় তাঁর অনুপস্থিতিতে তাঁর কক্ষে অবস্থানরত নবীজী (সাঃ) এর সাথে সাক্ষাতে হযরত মারিয়া (রাঃ) আসেন। ফিরে এসে হাফসা (রাঃ) তাঁকে দেখে ফেলেন। বেশ কিছু সময় কাটিয়ে মারিয়া (রাঃ) চলে যাওয়ার পর তিনি নিজ কক্ষে প্রবেশ করেন এবং নবীজী (সাঃ) এর কাছে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, তাঁর কক্ষে নিম্নতর মর্যাদার মারিয়া (রাঃ) এর প্রবেশ তাঁর জন্য অবমাননাকর।
- অপর এক ঘটনায় বর্ণিত আছে যে, নবী করীম (সাঃ) সাধারণত আছরের নামাযের পর স্ত্রীদের প্রত্যেকের কক্ষে কিছুটা সময় আলাপচারিতায় কাটাতেন। একদিন আছর নামাযের পর তিনি হযরত যয়নব বিনতে যাহশ (রাঃ) এর কক্ষে একটু বেশী সময় অতিবাহিত করেন। এতে অন্যসব স্ত্রী ঈর্ষান্বিত হয়ে পড়েন। তাঁরা সলাপরামর্শ করে একটা পরিস্থিতির সৃষ্টি করেন। নবীজী (সাঃ) সেখান থেকে বেরিয়ে এসে হযরত হাফসা (রাঃ) এর কক্ষে গেলে তিনি তাঁর মুখ থেকে মাগাফীর নামক এক ফলের রসের দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে এমন অভিযোগ তুলেন। নবীজী (সাঃ) তাঁকে এটা মধুর রস বললেও তিনি তা মানতে রাজী ছিলেন না। এতে নবীজী (সাঃ) কসম করে বললেন, ’আমি মধু কখনও পান করবো না।’ নবীজী (সাঃ) তাঁকে অনুরোধ করেন তিনি যেন এ ঘটনাটি অন্য কারো নিকট প্রকাশ না করেন। তিনি আশঙ্কা করলেন, অন্যেরা জানলে হয়তো যয়নব (রাঃ) মনঃক্ষুণ্ণ হতে পারেন। কিন্তু হাফসা (রাঃ) প্রতিশ্রুতি দিয়েও তা আয়েশা (রাঃ) এর নিকট তা প্রকাশ করে দিলেন। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ্ বলেন:
يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ لِمَ تُحَرِّمُ مَا أَحَلَّ اللَّهُ لَكَ ۖ تَبْتَغِي مَرْضَاتَ أَزْوَاجِكَ ۚ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ قَدْ فَرَضَ اللَّهُ لَكُمْ تَحِلَّةَ أَيْمَانِكُمْ ۚ وَاللَّهُ مَوْلَاكُمْ ۖ وَهُوَ الْعَلِيمُ الْحَكِيمُ وَ اِذْ اَسَرَّ النَّبِیُّ اِلٰی بَعْضِ اَزْوَاجِہٖ حَدِیْثًا ۚ فَلَمَّا نَبَّاَتْ بِہٖ وَ اَظْهَرَهُ اللّٰهُ عَلَیْهِ عَرَّفَ بَعْضَہٗ وَ اَعْرَضَ عَنْۢ بَعْضٍ ۚ فَلَمَّا نَبَّاَهَا بِہٖ قَالَتْ مَنْ اَنْۢبَاَكَ هٰذَا ؕ قَالَ نَبَّاَنِیَ الْعَلِیْمُ الْخَبِیْرُ اِنْ تَتُوْبَاۤ اِلَی اللّٰهِ فَقَدْ صَغَتْ قُلُوْبُکُمَا ۚ وَ اِنْ تَظٰهَرَا عَلَیْهِ فَاِنَّ اللّٰهَ هُوَ مَوْلٰىهُ وَ جِبْرِیْلُ وَ صَالِحُ الْمُؤْمِنِیْنَ ۚ وَ الْمَلٰٓئِكَۃُ بَعْدَ ذٰلِكَ ظَهِیْرٌ
“হে নবী, আল্লাহ আপনার জন্যে যা হালাল করছেন, আপনি আপনার স্ত্রীদেরকে খুশী করার জন্যে তা নিজের জন্যে হারাম করেছেন কেন? আল্লাহ ক্ষমাশীল, দয়াময়। আল্লাহ তোমাদের জন্যে কসম থেকে অব্যহতি লাভের উপায় নির্ধারণ করে দিয়েছেন। আল্লাহ তোমাদের মালিক। তিনি সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়। যখন নবী তাঁর একজন স্ত্রীর কাছে একটি কথা গোপনে বললেন, অতঃপর স্ত্রী যখন তা বলে দিল এবং আল্লাহ নবীকে তা জানিয়ে দিলেন, তখন নবী সে বিষয়ে স্ত্রীকে কিছু বললেন এবং কিছু বললেন না। নবী যখন তা স্ত্রীকে বললেন, তখন স্ত্রী বললেন: কে আপনাকে এ সম্পর্কে অবহিত করল? নবী বললেন, যিনি সর্বজ্ঞ, ওয়াকিফহাল, তিনি আমাকে অবহিত করেছেন। তোমাদের অন্তর অন্যায়ের দিকে ঝুঁকে পড়েছে বলে যদি তোমরা উভয়ে তওবা কর, তবে ভাল কথা। আর যদি নবীর বিরুদ্ধে একে অপরকে সাহায্য কর, তবে জেনে রেখ আল্লাহ জিবরাঈল এবং সৎকর্মপরায়ণ মু’মিনগণ তাঁর সহায়। উপরন্তু ফেরেশতাগণও তাঁর সাহায্যকারী।” (৬৬:১ – ৪)
-
হযরত আয়েশা (রাঃ) এর প্রতি নবী করীম (সাঃ) এর অধিকতর অনুরাগ অন্যান্য স্ত্রীগণের মধ্যে ঈর্ষাভাব সৃষ্টি করে। একদিন তিনি যখন হযরত আয়েশার (রাঃ) এর কক্ষে অবস্থান করছিলেন তখন হযরত যয়নব (রাঃ) সকলের প্রতিনিধি হয়ে সেখানে প্রবেশ করলেন এবং নবীজী (সাঃ) এর নিকট অভিযোগ পেশ করে বললেন, ’আয়েশা (রাঃ) এর প্রতি আপনার অতিরিক্ত আকর্ষণ অন্যদের অধিকার খর্ব করছে। তিনি আরও বললেন, ’হযরত সওদা (রাঃ) এর প্রতি আপনার অনাগ্রহের কারণে তাঁর জন্য বরাদ্দ সময়টুকু তিনি আয়েশা (রাঃ)কে ছেড়ে দিয়েছেন।’ এছাড়া তিনি আয়েশা (রাঃ) এর সামনেই তাঁকে উদ্দেশ্য করে কিছু একটা কটুক্তি করেন। আয়েশা (রাঃ)ও এর জবাব দেন। এতে পারিবারিক কলহ স্পষ্ট হয়ে উঠে।
সাময়িকভাবে স্ত্রী-সংস্রব বর্জন
এহেন পরিস্থিতিতে নবী করীম (সাঃ) কিছুটা কঠোর মনোভাব পোষণ করলেন। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন যে, এক মাস তিনি স্ত্রীগণের সংস্রব ত্যাগ করে নির্জন কক্ষে অবস্থান করেন। এতেও যদি তাঁরা সংশোধন না হন তা হলে তিনি তাঁদের সব দেনাপাওনা মিটিয়ে দিয়ে তাঁদের সাথে সম্পর্ক চুকিয়ে ফেলবেন। তাঁর এ ধরনের মনোভাব পবিত্র কুরআনের নিম্নোক্ত নির্দেশনার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল:
عَسٰی رَبُّہٗۤ اِنْ طَلَّقَکُنَّ اَنْ یُّبْدِلَہٗۤ اَزْوَاجًا خَیْرًا مِّنْکُنَّ مُسْلِمٰتٍ مُّؤْمِنٰتٍ قٰنِتٰتٍ تٰٓئِبٰتٍ عٰبِدٰتٍ سٰٓئِحٰتٍ ثَیِّبٰتٍ وَّ اَبْكَارًا
“যদি নবী তোমাদের সকলকে পরিত্যাগ করেন, তবে সম্ভবতঃ তাঁর পালনকর্তা তাঁকে পরিবর্তে দিবেন তোমাদের চাইতে উত্তম স্ত্রী, যারা হবে আজ্ঞাবহ, ঈমানদার, নামাযী, তওবাকারিণী, ইবাদতকারিণী, রোযাদার, অকুমারী ও কুমারী।” (৬৬:৫)
নবী পরিবারের এসব দ্বন্দের খবর জানাজানি হয়ে গেলে সাধারণ মুসলমানগণের মধ্যে ধারণা জন্মে যে, হয়তো নবীজী (সাঃ) তাঁর সকল স্ত্রীকে তালাক দিয়ে দেবেন। এহেন পরিস্থিতিতে হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রাঃ) ও হযরত ওমর (রাঃ) তাঁর সাক্ষাৎ প্রার্থনা করলেন। তাঁরা উভয়ে নবীজী (সাঃ) এর নিকট থেকে বিষয়টির আদ্যোপান্ত জেনে নিজেদের কন্যাদ্বয়কে শাসন করলেন। অবশেষে এসব বিষয়ে নবী-পত্নীগণ নিজেদের ভুল বুঝতে পারেন এবং পবিত্র কুরআনের নির্দেশ অনুযায়ী তাঁরা নিজেদেরকে শোধরে নেন।
নবী-পত্নীগণের প্রতি আল্লাহ্ রব্বুল আলামীনের উপদেশ
মহান আল্লাহর নবী ও রসূল হিসেবে নবী করীম (সাঃ) এর সম্মান ও মর্যাদা ছিল অনেক উপরে। সে হিসেবে তাঁর স্ত্রীগণ ছিলেন উচ্চ মর্যাদার অধিকারী এবং ’উম্মুল মু’মেনীন’ (বিশ্বাসীদের মাতা) – এ মহান মর্যাদায় অভিষিক্ত। নিজেদেরকে সে মর্যাদায় সমুন্নত রাখতে আল্লাহ্ রব্বুল আলামীন তাঁদের প্রতি যেসব মূল্যবান উপদেশ প্রদান করেন তা নিম্নে পেশ করা হলো:
یٰنِسَآءَ النَّبِیِّ لَسْتُنَّ كَاَحَدٍ مِّنَ النِّسَآءِ اِنِ اتَّقَیْتُنَّ فَلَا تَخْضَعْنَ بِالْقَوْلِ فَیَطْمَعَ الَّذِیْ فِیْ قَلْبِہٖ مَرَضٌ وَّ قُلْنَ قَوْلًا مَّعْرُوْفًا وَ قَرْنَ فِیْ بُیُوْتِکُنَّ وَ لَا تَبَرَّجْنَ تَبَرُّجَ الْجَاهِلِیَّۃِ الْاُوْلٰی وَ اَقِمْنَ الصَّلٰوۃَ وَ اٰتِیْنَ الزَّکٰوۃَ وَ اَطِعْنَ اللّٰهَ وَ رَسُوْلَہٗ ؕ اِنَّمَا یُرِیْدُ اللّٰهُ لِیُذْهِبَ عَنْکُمُ الرِّجْسَ اَهْلَ الْبَیْتِ وَ یُطَهِرَکُمْ تَطْهِیْرًا وَ اذْکُرْنَ مَا یُتْلٰی فِیْ بُیُوْتِکُنَّ مِنْ اٰیٰتِ اللّٰهِ وَ الْحِکْمَۃِ ؕ اِنَّ اللّٰهَ كَانَ لَطِیْفًا خَبِیْرًا
“হে নবী পত্নীগণ! তোমরা অন্য নারীদের মত নও; যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, তবে পরপুরুষের সাথে কোমল ও আকর্ষনীয় ভঙ্গিতে কথা বলো না, ফলে সেই ব্যক্তি কুবাসনা করে, যার অন্তরে ব্যাধি রয়েছে তোমরা সঙ্গত কথাবার্তা বলবে। তোমরা গৃহাভ্যন্তরে অবস্থান করবে – মূর্খতা যুগের অনুরূপ নিজেদেরকে প্রদর্শন করবে না। নামায কায়েম করবে, যাকাত প্রদান করবে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করবে। হে নবী পরিবারের সদস্যবর্গ, আল্লাহ কেবল চান তোমাদের থেকে অপবিত্রতা দূর করতে এবং তোমাদেরকে পূর্ণরূপে পূত -পবিত্র রাখতে। আল্লাহর আয়াত ও জ্ঞানগর্ভ কথা, যা তোমাদের গৃহে পঠিত হয় তোমরা সেগুলো স্মরণ করবে। নিশ্চয় আল্লাহ সূক্ষ্মদর্শী, সর্ববিষয়ে খবর রাখেন।” (৩৩:৩২ – ৩৪)
یٰنِسَآءَ النَّبِیِّ مَنْ یَّاْتِ مِنْکُنَّ بِفَاحِشَۃٍ مُّبَیِّنَۃٍ یُّضٰعَفْ لَهَا الْعَذَابُ ضِعْفَیْنِ ؕ وَ كَانَ ذٰلِكَ عَلَی اللّٰهِ یَسِیْرًا وَ مَنْ یَّقْنُتْ مِنْکُنَّ لِلّٰهِ وَ رَسُوْلِہٖ وَ تَعْمَلْ صَالِحًا نُّؤْتِهَاۤ اَجْرَهَا مَرَّتَیْنِ ۙ وَ اَعْتَدْنَا لَهَا رِزْقًا كَرِیْمًا
“হে নবী পত্নীগণ! তোমাদের মধ্যে কেউ প্রকাশ্য অশ্লীল কাজ করলে তাকে দ্বিগুণ শাস্তি দেয়া হবে। এটা আল্লাহর জন্য সহজ। তোমাদের মধ্যে যে কেউ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের অনুগত হবে এবং সৎকর্ম করবে, আমি তাকে দুবার পুরস্কার দেব এবং তার জন্য আমি সম্মানজনক রিযিক প্রস্তুত রেখেছি।” (৩৩:৩০ – ৩১)
হযরত আয়েশা (রা) এর উপর আনীত মিথ্যা অপবাদ খন্ডন
মদীনার মুনাফেকগণ ও তাদের সহযোগিরা নবী করীম (সা) এর প্রিয়তমা স্ত্রী ও উম্মুল মু’মিনীন হযরত আয়েশা (রা) এর উপর মিথ্যা অপবাদ আরোপ করে মুসলিম সমাজে ফেতনা সৃষ্টির অপচেষ্টা চালায়। ঘটনাসূত্রে জানা যায়, বনী মুস্তালিক গোত্রের বিরুদ্ধে অভিযান শেষে নবী করীম (সাঃ) মদীনায় ফেরার পথে এক জায়গায় রাত্রি যাপন করেন। এ সফরে তাঁর সঙ্গীনী ছিলেন হযরত আয়েশা (রাঃ)। প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে তিনি হাওদা থেকে বেরিয়ে আসেন। এ সময় তিনি তাঁর গলার হারটি হারিয়ে ফেলেন। এটির অনুসন্ধানে বেশ কিছু সময় ব্যয় হয়। ফিরে এসে দেখেন তাঁদের কাফেলাটি চলে গেছে। প্রচলিত রীতি অনুযায়ী কাফেলার মূল্যবান সামগ্রী পরিত্যক্ত রয়ে গেছে কিনা তা দেখার জন্য একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি থাকতেন। সে সময় দায়িত্ব পালন করছিলেন হযরত সাফওয়ান বিন মুয়াত্তাল (রাঃ)। তিনি হযরত আয়েশা (রাঃ)-কে দেখে চিনতে পারেন এবং সসম্মানে তাঁকে নিজ উটে চড়িয়ে নিজে হেঁটে উটের রশি ধরে মদীনায় ফিরে আসেন। এটি একটি সাধারণ ঘটনা ছিল বিধায় প্রথমে কারো মনে কোন প্রতিক্রিয়া ছিল না। কিন্তু পরে মুনাফেক জাতীয় কিছু লোক একে একটি অপবাদের ঘটনা বানিয়ে হযরত আয়েশা (রাঃ) এর চরিত্র হনন করার প্রয়াস চালায়। এর নেতৃত্ব দেয় মুনাফেক সর্দার আব্দুল্লাহ্ ইবনে উবাই। এতে নবী করীম (সাঃ) বিব্রত বোধ করেন ও আয়েশা (রাঃ) খুবই ব্যথিত ও মর্মাহত হন। এ অবস্থায় স্বয়ং আল্লাহ্ রব্বুল আলামীন ওহী নাযিল করে অপবাদটি খন্ডন করেন। এতদ্সংক্রান্ত আয়াতসমূহ নিম্নে উদ্ধৃত করা হলো:
وَلَوْلَا فَضْلُ اللهِ عَلَيْكُمْ وَرَحْمَتُه وَاَنَّ اللهَ تَوَّابٌ حَكِيْمٌ اِنَّ الَّذِيْنَ جَآءُوْ بِالْاِفْكِ عُصْبَةٌ مِّنْكُمْ لَا تَحْسَبُوْهُ شَرًّا لَّكُمْ بَلْ هُوَ خَيْرٌ لَّكُمْ لِكُلِّ امْرِئٍ مِّنْهُم مَّا اكْتَسَبَ مِنَ الْاِثْمِ وَالَّذِىْ تَوَلّٰى كِبْرَه مِنْهُمْ لَه عَذَابٌ عَظِيْمٌ لَّوْلَا إِذْ سَمِعْتُمُوهُ ظَنَّ الْمُؤْمِنُونَ وَالْمُؤْمِنَاتُ بِأَنفُسِهِمْ خَيْرًا وَقَالُوا هَـٰذَا إِفْكٌ مُّبِينٌ لَّوْلَا جَاءُوا عَلَيْهِ بِأَرْبَعَةِ شُهَدَاءَ ۚ فَإِذْ لَمْ يَأْتُوا بِالشُّهَدَاءِ فَأُولَـٰئِكَ عِندَ اللَّهِ هُمُ الْكَاذِبُونَوَلَوْلَا فَضْلُ اللَّهِ عَلَيْكُمْ وَرَحْمَتُهُ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ لَمَسَّكُمْ فِي مَا أَفَضْتُمْ فِيهِ عَذَابٌ عَظِيمٌإِذْ تَلَقَّوْنَهُ بِأَلْسِنَتِكُمْ وَتَقُولُونَ بِأَفْوَاهِكُم مَّا لَيْسَ لَكُم بِهِ عِلْمٌ وَتَحْسَبُونَهُ هَيِّنًا وَهُوَ عِندَ اللَّهِ عَظِيمٌوَلَوْلَا إِذْ سَمِعْتُمُوهُ قُلْتُم مَّا يَكُونُ لَنَا أَن نَّتَكَلَّمَ بِهَـٰذَا سُبْحَانَكَ هَـٰذَا بُهْتَانٌ عَظِيمٌيَعِظُكُمُ اللَّهُ أَن تَعُودُوا لِمِثْلِهِ أَبَدًا إِن كُنتُم مُّؤْمِنِينَ
“তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ ও দয়া না থাকলে এবং আল্লাহ তওবা কবুল কারী, প্রজ্ঞাময় না হলে কত কিছুই যে হয়ে যেত। যারা মিথ্যা অপবাদ রটনা করেছে, তারা তোমাদেরই একটি দল। তোমরা একে নিজেদের জন্যে খারাপ মনে করো না; বরং এটা তোমাদের জন্যে মঙ্গলজনক। তাদের প্রত্যেকের জন্যে ততটুকু আছে যতটুকু সে গোনাহ করেছে এবং তাদের মধ্যে যে এ ব্যাপারে অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছে, তার জন্যে রয়েছে বিরাট শাস্তি। তোমরা যখন একথা শুনলে, তখন ঈমানদার পুরুষ ও নারীগণ কেন নিজেদের লোক সম্পর্কে উত্তম ধারণা করনি এবং বলনি যে, এটা তো নির্জলা অপবাদ? তারা কেন এ ব্যাপারে চার জন সাক্ষী উপস্থিত করেনি; অতঃপর যখন তারা সাক্ষী উপস্থিত করেনি, তখন তারাই আল্লাহর কাছে মিথ্যাবাদী। যদি ইহকালে ও পরকালে তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ ও দয়া না থাকত, তবে তোমরা যা চর্চা করছিলে, তজ্জন্যে তোমাদেরকে গুরুতর আযাব স্পর্শ করত। যখন তোমরা একে মুখে মুখে ছড়াচ্ছিলে এবং মুখে এমন বিষয় উচ্চারণ করছিলে, যার কোন জ্ঞান তোমাদের ছিল না। তোমরা একে তুচ্ছ মনে করছিলে, অথচ এটা আল্লাহর কাছে গুরুতর ব্যাপার ছিল। তোমরা যখন এ কথা শুনলে তখন কেন বললে না যে, এ বিষয়ে কথা বলা আমাদের উচিত নয়। আল্লাহ তো পবিত্র, মহান। এটা তো এক গুরুতর অপবাদ। আল্লাহ তোমাদেরকে উপদেশ দিচ্ছেন, তোমরা যদি ঈমানদার হও, তবে কখনও পুনরায় এ ধরণের আচরণের পুনরাবৃত্তি করো না।” (২৪:১০ – ১৭)