৬ষ্ঠ অধ্যায় : নবী করীম (সা)-এর দাওয়াতী কার্যক্রম

নবী করীম (সা)-এর দাওয়াতী কার্যক্রম

প্রকাশ্যে আল্লাহর দ্বীন প্রচারের ঘোষণা আসার পর থেকে ইসলামের অনুসারীদের সংখ্যা ক্রমশ বাড়তে থাকে। তিনি জনে জনে দ্বীনের দাওয়াত পৌঁছাতে লাগলেন। বেশ কিছু বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গসহ সমাজের বিভিন্ন ধরনের মানুষ বিশেষ করে দরিদ্র ও নিপীড়িত অংশ ইসলামের নবীর যৌক্তিক ও বলিষ্ঠ আহ্বানে সাড়া দিচ্ছিলো। নবী (সাঃ) এর মুখে ইসলামের একত্ববাদ, সাম্য, মৈত্রী ও শান্তির অমিয় বাণী তাদেরকে আকৃষ্ট করেছিল। তাঁর অমায়িক ব্যবহার, ন্যায়নিষ্ঠ আচরণ ও সত্যবাদীতা তাদের মনের উপর যেমন প্রভাব বিস্তার করেছিল তেমনই তাদের ঈমানকে বলিষ্ঠ রূপ দান করেছিল। তাঁর কাছ থেকে তারা ঈমান ও আমল সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় ধর্মীয় বিধি–বিধান বিশেষ করে আখিরাতের প্রতি বিশ্বাস, ইবাদতের পদ্ধতি, হালাল ও হারাম সংক্রান্ত নির্দেশনা জেনে নিয়ে সৎ ও আনুগত্যপূর্ণ জীবন যাপনে সচেষ্ট হয়েছিলেন। ইসলামের সূচনায় পৌত্তলিক কুরাইশদের ভয়ে তারা নতুন ধর্ম পালনে গোপনীয়তা অবলম্বন করেছিলেন। তারপর আসলো প্রকাশ্যে প্রচারের ঘোষণা। মানুষের কাছে নবীজী (সাঃ) এর আহ্বান ছিল তা–ই যা মহান আল্লাহ্ তায়ালা তাঁকে যখন যেরূপ নির্দেশ দান করেছিলেন।

নিম্নোক্ত আয়াতসমূহে ইসলামী জীবন বিধান সম্পর্কিত বিষয়ে মহান আল্লাহর দিক–নির্দেশনা ক্রমশ সুস্পষ্ট হয়ে উঠতে থাকে। তাঁর দাওয়াতী কার্যক্রমের বিষয়বস্তু ছিল:

  • আল্লাহ্ ও অদৃশ্য বিষয় এবং পরকালের প্রতি ঈমান,

  • এক ও অদ্বিতীয় আল্লাহর উপাসনা, মহিমা ও গুণকীর্তন,

  • পার্থিব জীবন বনাম পরকালীন জীবন, পরকালীন জীবনের শাস্তি ও পুরস্কার,

  • নেক আমল ও আধ্যাত্মিক উৎকর্ষ সাধন,

  • হালাল ও হারাম সংক্রান্ত নির্দেশনা, ইত্যাদি। 

    উপরোক্ত বিষয়ে পবিত্র কুরআনের আয়াতসমূহ প্রণিধানযোগ্য:

يٰۤاَيُّهَا الْمُدَّثِّرُ۝ قُمْ فَاَنْذِرْ۝ وَرَبَّكَ فَكَبِّرْ۝ وَثِيَابَكَ فَطَهِّرْ۝ وَالرُّجْزَ فَاهْجُرْ۝ َ

“হে চাদরাবৃত! উঠুন, সতর্ক করুন, আপন পালনকর্তার মাহাত্ম্য ঘোষণা করুন, আপন পোশাক পবিত্র করুন এবং অপবিত্রতা থেকে দূরে থাকুন।” (৭৪:১ – ৫)

قُلْ اِنَّ صَلَاتِىْ وَنُسُكِىْ وَمَحْيَاىَ وَمَمَاتِىْ لِلّٰهِ رَبِّ الْعٰلَمِيْنَ۝ لَا شَرِيْكَ لَه وَبِذٰلِكَ اُمِرْتُ وَاَنَا اَوَّلُ الْمُسْلِمِيْنَ۝

“(হে নবী) আপনি বলুন: আমার নামায, আমার কুরবাণী এবং আমার জীবন ও মরণ বিশ্ব-প্রতিপালক আল্লাহরই জন্যে। তাঁর কোন অংশীদার নেই। আমি তাই আদিষ্ট হয়েছি এবং আমি প্রথম আনুগত্যশীল (মুসলমান)।” (৬:১৬২ – ১৬৩)

قُلْ أَغَيْرَ اللَّهِ أَتَّخِذُ وَلِيًّا فَاطِرِ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَهُوَ يُطْعِمُ وَلَا يُطْعَمُ ۗ قُلْ إِنِّي أُمِرْتُ أَنْ أَكُونَ أَوَّلَ مَنْ أَسْلَمَ ۖ وَلَا تَكُونَنَّ مِنَ الْمُشْرِكِينَ ۝ قُلْ إِنِّي أَخَافُ إِنْ عَصَيْتُ رَبِّي عَذَابَ يَوْمٍ عَظِيمٍ۝

“আপনি বলে দিন: আল্লাহ -যিনি নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলের স্রষ্টা এবং যিনি সবাইকে আহার্য দান করেন ও তাঁকে কেউ আহার্য দান করে না – আমি কি তাঁকে ব্যতীত এমন অপরকে সাহায্যকারী স্থির করব? আপনি বলে দিন: আমি আদিষ্ট হয়েছি যে, সর্বাগ্রে আমিই আজ্ঞাবহ হব। আপনি কদাচ অংশীবাদীদের অন্তর্ভুক্ত হবেন না। আপনি বলুন, আমি আমার প্রতিপালকের অবাধ্য হতে ভয় পাই কেননা, আমি একটি মহাদিবসের শাস্তিকে ভয় করি।” (৬:১৪ – ১৫)

قُلْ اِنَّمَا حَرَّمَ رَبِّیَ الْفَوَاحِشَ مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَ مَا بَطَنَ وَ الْاِثْمَ وَ الْبَغْیَ بِغَیْرِ الْحَقِّ وَ اَنْ تُشْرِکُوْا بِاللّٰهِ مَا لَمْ یُنَزِّلْ بِہٖ سُلْطٰنًا وَّ اَنْ تَقُوْلُوْا عَلَی اللّٰهِ مَا لَا تَعْلَمُوْنَ۝

“আপনি বলে দিন: আমার পালনকর্তা কেবলমাত্র অশ্লীল বিষয়সমূহ হারাম করেছেন যা প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য এবং হারাম করেছেন গোনাহ, অন্যায়-অত্যাচার আল্লাহর সাথে এমন বস্তুকে অংশীদার করা, তিনি যার কোন, সনদ অবতীর্ণ করেননি এবং আল্লাহর প্রতি এমন কথা আরোপ করা, যা তোমরা জান না।” (৭:৩৩)

قُلْ مَتَاعُ الدُّنْیَا قَلِیْلٌ ۚ وَ الْاٰخِرَۃُ خَیْرٌ لِّمَنِ اتَّقٰی ۟ وَ لَا تُظْلَمُوْنَ فَتِیْلًا ۝

…. “(হে রাসূল) তাদেরকে বলে দিন, পার্থিব ফায়দা সীমিত। আর আখেরাত পরহেযগারদের জন্য উত্তম। আর তোমাদের অধিকার একটি সুতা পরিমাণও খর্ব করা হবে না।” (৪:৭৭)

یٰۤاَیُّهَا النَّاسُ اتَّقُوْا رَبَّکُمْ وَ اخْشَوْا یَوْمًا لَّا یَجْزِیْ وَالِدٌ عَنْ وَّلَدِہٖ ۫ وَ لَا مَوْلُوْدٌ هُوَ جَازٍ عَنْ وَّالِدِہٖ شَیْئًا ؕ اِنَّ وَعْدَ اللّٰهِ حَقٌّ فَلَا تَغُرَّنَّکُمُ الْحَیٰوۃُ الدُّنْیَا وَ لَا یَغُرَّنَّکُمْ بِاللّٰهِ الْغَرُوْرُ۝

“হে মানব জাতি! তোমরা তোমাদের পালনকর্তাকে ভয় কর এবং ভয় কর এমন এক দিবসকে, যখন পিতা পুত্রের কোন কাজে আসবে না এবং পুত্রও তার পিতার কোন উপকার করতে পারবে না। নিঃসন্দেহে আল্লাহর ওয়াদা সত্য। অতএব, পার্থিব জীবন যেন তোমাদেরকে ধোঁকা না দেয় এবং আল্লাহ সম্পর্কে প্রতারক শয়তানও যেন তোমাদেরকে প্রতারিত না করে।” (৩১:৩৩)

تِلْكَ الدَّارُ الْاٰخِرَۃُ نَجْعَلُهَا لِلَّذِیْنَ لَا یُرِیْدُوْنَ عُلُوًّا فِی الْاَرْضِ وَ لَا فَسَادًا ؕ وَ الْعَاقِبَۃُ لِلْمُتَّقِیْنَ ۝ مَنْ جَآءَ بِالْحَسَنَۃِ فَلَہٗ خَیْرٌ مِّنْهَا ۚ وَ مَنْ جَآءَ بِالسَّیِّئَۃِ فَلَا یُجْزَی الَّذِیْنَ عَمِلُوا السَّیِّاٰتِ اِلَّا مَا كَانُوْا یَعْمَلُوْنَ ۝

“এই পরকাল আমি তাদের জন্যে নির্ধারিত করি, যারা দুনিয়ার বুকে ঔদ্ধত্য প্রকাশ করতে ও অনর্থ সৃষ্টি করতে চায় না। খোদাভীরুদের জন্যে শুভ পরিণাম। যে সৎকর্ম নিয়ে আসবে, সে তদপেক্ষা উত্তম ফল পাবে এবং যে মন্দ কর্ম নিয়ে আসবে, এরূপ মন্দ কর্মীরা সে মন্দ কর্ম পরিমাণেই প্রতিফল পাবে।” (২৮:৮৩ – ৮৪)


তাঁর দাওয়াতী কার্যক্রমে বাধা

মক্কার প্রভাবশালী সর্দারগণ নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর উপদেশ বাণীর প্রতি তেমন কোন আগ্রহ পোষণ করত না। শুরুতে মক্কার কুরাইশ নেতৃবর্গ মুহাম্মদ (সাঃ) এর দ্বীনি দাওয়াতকে তেমনটা পাত্তা দেয়নি। তারা মনে করেছিল তাদের শক্তিশালী দেবতাদের ক্রোধানলে তিনি ভষ্মীভূত হয়ে যাবেন। কিন্তু সময় যতই গড়াতে লাগলো পৌত্তলিকতা –বিরোধী ইসলামী ধর্মমতের দ্রুত বিস্তার লাভে তারা শঙ্কিত হয়ে পড়লো। বিশেষ করে হযরত ওমর (রাঃ) এর মত এক বড় মাপের ব্যক্তিত্ব প্রবল ইসলাম–বিরোধী হওয়া সত্ত্বেও যখন ইসলাম গ্রহণ করলেন তখন মক্কার কাফের নেতৃবর্গ প্রমাদ গুনলো। তারা তাদের বাপ-দাদার ধর্ম এবং কা’বা কেন্দ্রিক তাদের প্রভাব–প্রতিপত্তি ধ্বংস হওয়ার আশংকাবোধ করলো।

প্রথমে কুরাইশ নেতা আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল চাচা আবু তালিবের নিকট অভিযোগ পেশ করে মুহাম্মদ (সাঃ)-কে  পৌত্তলিকতা বিরোধী কার্যক্রম থেকে বিরত রাখার অনুরোধ জানায়। আবু তালিব নিজে ইসলাম গ্রহণ না করলেও তিনি তাঁর স্নেহাস্পদ ভ্রাতুষ্পুত্রের প্রচারিত ধর্মমতের প্রতি ছিলেন সম্পূর্ণ সহানুভূতিশীল। কুরাইশ নেতৃবৃন্দের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তিনি হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)- কে ডেকে এনে তিনি বললেন:

‘তুমি কুরাইশদের বাপ–দাদার ধর্ম ও তাদের রীতিনীতির বিরুদ্ধাচরণ থেকে নিবৃত হও এবং তোমার ধর্ম তুমি পালন কর আর তাদেরকে তাদের ধর্ম পালন করতে দাও।’

উত্তরে নবীজী (সাঃ) বললেন,

‘আমিতো তাদের কাছে একটি কলেমার স্বীকৃতি চাই যা পালন করলে সমগ্র আরবভূমি তাদের পদানত হয়ে যাবে।’

আবু তালিব জিজ্ঞেস করলেন, ‘কি সে কলেমা?’ নবীজী (সাঃ) বললেন:

‘তা হলো: লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ – এক মাত্র আল্লাহ্ ছাড়া অন্য কোন উপাস্য নেই।’

এ কথায় উপস্থিত কুরাইশ নেতৃবর্গ বিস্মিত হয়ে বললো:

‘আমরা কি আমাদের বাপ-দাদার উপাস্যগুলোকে ছেড়ে একজনের উপাসনা করব? এতো এক অদ্ভুত ব্যাপার!’

কুরাইশ নেতৃবর্গ বিফল মরোরথ হয়ে আবু তালিবের গৃহ থেকে বেরিয়ে গেলো। অভিযোগ করেও যখন কোন সমাধান হলো না তখন তারা হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-কে বাপ–দাদার ধর্ম ধ্বংসকারী পাগল বলে জনসমক্ষে আখ্যায়িত করলো।  বিরূপ মন্তব্য ও ঠাট্টা–মশকরা দ্বারা হেয় প্রতিপন্ন করতে লাগলো। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআনের বেশ কয়েকটি আয়াত নাযিল হয়। নাযিলকৃত আয়াতগুলোর কয়েকটি নিম্নে পেশ করা হলো:

أَجَعَلَ الْآلِهَةَ إِلَـٰهًا وَاحِدًا ۖ إِنَّ هَـٰذَا لَشَيْءٌ عُجَابٌ۝ وَانطَلَقَ الْمَلَأُ مِنْهُمْ أَنِ امْشُوا وَاصْبِرُوا عَلَىٰ آلِهَتِكُمْ ۖ إِنَّ هَـٰذَا لَشَيْءٌ يُرَادُ۝ مَا سَمِعْنَا بِهَـٰذَا فِي الْمِلَّةِ الْآخِرَةِ إِنْ هَـٰذَا إِلَّا اخْتِلَاقٌ۝ أَأُنزِلَ عَلَيْهِ الذِّكْرُ مِن بَيْنِنَا ۚ بَلْ هُمْ فِي شَكٍّ مِّن ذِكْرِي ۖ بَل لَّمَّا يَذُوقُوا عَذَابِ۝

“সে কি বহু উপাস্যের পরিবর্তে এক উপাস্যের উপাসনা সাব্যস্ত করে দিয়েছে। নিশ্চয় এটা এক বিস্ময়কর ব্যাপার। তাদের কতিপয় বিশিষ্ট ব্যক্তি একথা বলে প্রস্থান করে যে, তোমরা চলে যাও এবং তোমাদের উপাস্যদের পূজায় দৃঢ় থাক। নিশ্চয়ই এ বক্তব্য কোন বিশেষ উদ্দেশ্যে প্রণোদিত। আমরা সাবেক ধর্মে এ ধরনের কথা শুনিনি। এটা মনগড়া ব্যাপার বৈ নয়। আমাদের মধ্য থেকে শুধু কি তারই প্রতি উপদেশ বাণী অবতীর্ণ হল? বস্তুতঃ ওরা আমার উপদেশ সম্পর্কে সন্দিহান; বরং ওরা এখনও আমার আযাব আস্বাদন করেনি।” (৩৮:৫ – ৮)

فَسَتُبْصِرُ وَيُبْصِرُونَ۝ بِأَييِّكُمُ الْمَفْتُونُ۝ إِنَّ رَبَّكَ هُوَ أَعْلَمُ بِمَن ضَلَّ عَن سَبِيلِهِ وَهُوَ أَعْلَمُ بِالْمُهْتَدِينَ۝ فَلَا تُطِعِ الْمُكَذِّبِينَ۝ وَدُّوا لَوْ تُدْهِنُ فَيُدْهِنُونَ۝

“সত্ত্বরই আপনি দেখে নিবেন এবং তারাও দেখে নিবে। কে তোমাদের মধ্যে বিকারগ্রস্ত। আপনার পালনকর্তা সম্যক জানেন কে তাঁর পথ থেকে বিচ্যুত হয়েছে এবং তিনি জানেন যারা সৎপথ প্রাপ্ত। অতএব, আপনি মিথ্যারোপকারীদের আনুগত্য করবেন না। তারা চায় যদি আপনি নমনীয় হন, তবে তারাও নমনীয় হবে।” (৬৮:৫ – ৯)

মানুষের মৃত্যু হলে আবার তার পুনরুত্থান ঘটবে এবং তাকে জবাবদিহির সম্মুখীন হতে হবে এটা ছিল কুরাইশদের বিশ্বাস ও ধারণার সম্পূর্ণ বিপরীত। কুরাইশ নেতা উমাইয়া ইবনে খালফ কবর থেকে একটি মৃত মানুষের জীর্ণ হাড় কুঁড়িয়ে নিয়ে নবীজী (সাঃ) এর নিকট গেলো এবং তাঁকে বললো, ‘তুমি কি মনে কর এটা পুনর্জীবিত হবে?’ উত্তরে তিনি বললেন, ‘যে সত্তা এটাকে প্রথমবার সৃজন করেছেন তিনিই এর প্রত্যাবর্তন ঘটাবেন।’ পুনরুজ্জীবন প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ্ বলেন,

فَقَالَ الْکٰفِرُوْنَ هٰذَا شَیْءٌ عَجِیْبٌ ۝ ءَاِذَا مِتْنَا وَ کُنَّا تُرَابًا ۚ ذٰلِكَ رَجْعٌۢ بَعِیْدٌ ۝ قَدْ عَلِمْنَا مَا تَنْقُصُ الْاَرْضُ مِنْهُمْ ۚ وَ عِنْدَنَا كِتٰبٌ حَفِیْظٌ۝

“….অতঃপর কাফেররা বলে: এটা আশ্চর্যের ব্যাপার। আমরা মরে গেলে এবং মৃত্তিকায় পরিণত হয়ে গেলেও কি পুনরুত্থিত হব? এ প্রত্যাবর্তন সুদূরপরাহত। (কবরে) মৃত্তিকা তাদের কতটুকু গ্রাস করবে, তা আমার জানা আছে এবং আমার কাছে আছে সংরক্ষিত কিতাব।” (৫০:২ – ৪)

وَقَالُوا أَإِذَا كُنَّا عِظَامًا وَرُفَاتًا أَإِنَّا لَمَبْعُوثُونَ خَلْقًا جَدِيدًا۝ قُلْ كُونُوا حِجَارَةً أَوْ حَدِيدًا۝ أَوْ خَلْقًا مِّمَّا يَكْبُرُ فِي صُدُورِكُمْ ۚ فَسَيَقُولُونَ مَن يُعِيدُنَا ۖ قُلِ الَّذِي فَطَرَكُمْ أَوَّلَ مَرَّةٍ ۚ فَسَيُنْغِضُونَ إِلَيْكَ رُءُوسَهُمْ وَيَقُولُونَ مَتَىٰ هُوَ ۖ قُلْ عَسَىٰ أَن يَكُونَ قَرِيبًا۝

“তারা বলে: যখন আমরা অস্থিতে পরিণত ও চূর্ণ–বিচূর্ণ হয়ে যাব, তখনও কি নতুন করে সৃজিত হয়ে উত্থিত হব? বলুন: তোমরা পাথর হয়ে যাও কিংবা লোহা। অথবা এমন কোন বস্তু, যা তোমাদের ধারণায় খুবই কঠিন; তথাপি তারা বলবে: আমাদের কে পুনর্বার কে সৃষ্টি করবে। বলুন: যিনি তোমাদেরকে প্রথমবার সৃজন করেছেন। অতঃপর তারা আপনার সামনে মাথা নাড়বে এবং বলবে: এটা কবে হবে? বলুন: হবে, সম্ভবতঃ শ্রীঘ্রই।” (১৭:৪৯ – ৫১)

আবু লাহাব, আবু জেহেল, আবু সুফিয়ান প্রমুখ কুরাইশ নেতৃবর্গ মুহাম্মদ (সাঃ) এর কুৎসা রটনা এবং তাঁকে মিথ্যাবাদী সাব্যস্ত করার প্রচার–প্রচারণার কাজে নিয়োগ করলো তৎকালীন বিখ্যাত সব কবিয়ালদেরকে। এরা তাদের কাব্যগাঁথা ও বাগ্মীতার দ্বারা সাধারণ মানুষকে তাঁর বিরুদ্ধে উত্তেজিত করে তোলার প্রয়াস চালায়। বিভিন্ন সময়ে নবীজী (সাঃ) ও তাঁর অনুসারীগণের উপর নানা ধরনের নিপীড়ন–নির্যাতন দ্বারা তাঁর দাওয়াতি কার্যক্রমে বাধার সৃষ্টি করে। এরপরও যখন নবী করীম (সাঃ)-কে নিবৃত্ত করা গেলো না তখন কুরাইশদের একটি প্রতিনিধিদল দ্বিতীয়বারে আবু তালিবের নিকট গেলো। এবার তারা দুষ্টমতি কাফের ওয়ালীদ ইবনে মুগীরার নেতৃত্বে তার পুত্র ওমারা ইবনে ওয়ালীদকে সঙ্গে নিলো। তার পুত্র ছিল অপরূপ সুন্দর ও সাহসী কুরাইশ যুবক। সে তাকে দেখিয়ে বললো:

‘আপনি আপনার ভ্রাতুষ্পুত্রকে আমাদেরকে দিয়ে দিন এবং এর বিনিময়ে আপনি ওমারাকে আপনার ছেলে হিসেবে গ্রহণ করুন।’

আবু তালিব তার এ অদ্ভুত প্রস্তাবে বিস্মিত হলেন এবং তৎক্ষণাৎ তা প্রত্যাখ্যান করলেন।

এরকম বিরূপ পরিবেশে সকল বাধা অতিক্রম করে মুহাম্মদ (সাঃ) এর প্রচার কার্যক্রম যথারীতি চলতে লাগলো। একত্ববাদের প্রতি তাঁর উদাত্ত ও সাবলীল আহ্বান এবং পৌত্তলিকতার অসারতা সম্পর্কে তাঁর যৌক্তিক বক্তব্য মানুষের পুরোনো ধ্যান–ধারণা ও চিন্তার জগতে ক্রমশই প্রভাব বিস্তার করছিলো। দেব–দেবী বা অন্য কোন উপাস্য ছাড়াই যে সরাসরি মহান  আল্লাহর নৈকট্য ও সন্তুষ্টি অর্জন করা যায় সে পথ তারা খুঁজে পেলো। মানব জীবনের আসল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে তারা জ্ঞাত হচ্ছিল। ক্ষণস্থায়ী পার্থিব জীবনের মেকি চাকচিক্য ও দুঃখ–কষ্টের তুলনায় পরকালীন জীবনের অনন্ত সুখ–শান্তি, জবাবদিহিতা ও মহাশাস্তির ভয়–ভীতি তাদের মনে রেখাপাত করছিল। ইসলামের এ বৈপ্লবিক মতাদর্শ কুরাইশ নেতৃবর্গকে মহাক্ষিপ্ত করে তুললো। তারা তাদের এতকালের ধর্মীয়, আর্থ–সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাব–প্রতিপত্তি সমূলে ধ্বংস হওয়ার আশঙ্কাবোধ করলো।

পৌত্তলিকতা, ভ্রান্ত বিশ্বাস, কুসংস্কার ও অপকর্মে লিপ্ত গাফেল কুরাইশ নেতৃবর্গের শত ভয়–ভীতি এবং নিপীড়ন–নির্যাতনেও আল্লাহর নবীকে তাঁর ধর্ম প্রচার থেকে নিবৃত করতে ব্যর্থ হলো। কুরাইশ নেতাদের অন্যতম উতবাহ্ ইবনে রাবীয়াহ্ এর নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল তৃতীয় দফায় আবু তালিবের সাথে সাক্ষাৎ করলো। এবার তারা কঠোর কন্ঠে তাদের দাবী পেশ করে। তারা বললো:

“মুহাম্মদ যদি নেতৃত্ব চায় আমরা তাঁকে আমাদের নেতা বানিয়ে দেবো, সে যদি সুন্দরী রমণী চায় আমরা আমাদের সবচেয়ে সুন্দরী রমণীগণ তাঁকে উপহার দেবো, সে যদি ধন – সম্পদ চায় আমরা সবাই মিলে তাঁকে ধনাঢ্য বানিয়ে দেবো। বিনিময়ে সে আমাদের ধর্ম ও প্রতিমাদের বিরুদ্ধাচরণ থেকে বিরত থাকতে হবে। সে যদি এসবে রাজী না হয় এবং আপনি যদি তাঁকে বিরত না রাখেন তবে এর সমাধান যুদ্ধের মাধ্যমেই হবে।”

কুরাইশ নেতৃবৃন্দের এ কঠোর মনোভাব আবু তালিবকে চিন্তান্বিত করে তোলে। এ যাবৎ তিনি তাঁর পূর্ণ সমর্থন ও সর্বশক্তি দিয়ে ভ্রাতুষ্পুত্রকে সহযোগিতা করেছেন। এক্ষণে কুরাইশদের সাথে যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়া কতটা যুক্তিপূর্ণ তা তাঁকে ভাবিয়ে তোলে। তিনি মুহাম্মদ (সাঃ)-কে ডেকে কুরাইশদের প্রস্তাব ও হুমকির কথা শুনিয়ে দেন এবং বলেন, ‘হে ভ্রাতুষ্পুত্র! আমি বার্ধক্যে উপনীত হয়েছি ও দুর্বল হয়ে পড়েছি। এ পরিস্থিতিতে তোমার ও আমার অস্তিত্ব বিপন্ন হয়ে পড়েছে। অত্যাসন্ন এ বিপদ মোকাবেলার শক্তি কি আমাদের আছে?’ বৃদ্ধ চাচা আবু তালিবের এ কথায় তিনি কিছুটা উদ্বিগ্ন বোধ করলেন এবং কিছুক্ষণ এর পরিণাম চিন্তা করলেন। রিসালতের দায়িত্ব পালনে এ ধরনের ঝুঁকি ও বিপদ যে খুবই স্বাভাবিক এটা তিনি উপলব্ধী করলেন। তারপরও আল্লাহ্ তায়ালার উপর পরম ভরসা রেখে তিনি বললেন:

‘হে পিতৃব্য! কাফেরগণ আমার ডান হাতে সূর্য ও বাম হাতে চন্দ্র এনে দিয়েও যদি আমাকে অমার আরব্ধ কাজ থেকে বিরত রাখতে চায় – আমি তাদের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করব।’

”আল্লাহ্ এক এবং অদ্বিতীয়, তাঁর কোন শরীক নেই” – এ মহা সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য মহান আল্লাহ্ তাঁকে নবী ও রসূল হিসেবে প্রেরণ করেছেন। তিনি যা করছেন তা তাঁর ব্যক্তিগত লাভালাভের জন্য নয়, বরং আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী বিশ্ব মানবতার শান্তি ও মুক্তিই তাঁর এ ধর্ম প্রচারের একমাত্র উদ্দেশ্য। নিম্নোক্ত আয়াতটিতে এ উদ্দেশ্যই ব্যক্ত হয়েছে:

قُلْ مَا سَأَلْتُكُم مِّنْ أَجْرٍ فَهُوَ لَكُمْ ۖ إِنْ أَجْرِيَ إِلَّا عَلَى اللَّهِ ۖ وَهُوَ عَلَىٰ كُلِّ شَيْءٍ شَهِيدٌ قُلْ إِنَّ رَبِّي يَقْذِفُ بِالْحَقِّ عَلَّامُ الْغُيُوبِ۝ قُلْ جَاءَ الْحَقُّ وَمَا يُبْدِئُ الْبَاطِلُ وَمَا يُعِيدُ۝ قُلْ إِن ضَلَلْتُ فَإِنَّمَا أَضِلُّ عَلَىٰ نَفْسِي ۖ وَإِنِ اهْتَدَيْتُ فَبِمَا يُوحِي إِلَيَّ رَبِّي ۚ إِنَّهُ سَمِيعٌ قَرِيبٌ۝

“(হে নবী) বলুন, আমি তোমাদের কাছে কোন পারিশ্রমিক চাই না বরং তা তোমরাই রাখ। আমার পুরস্কার তো আল্লাহর কাছে রয়েছে। প্রত্যেক বস্তুই তাঁর সামনে। বলুন, আমার পালনকর্তা সত্য দ্বীন অবতরণ করেছেন। তিনি অদৃশ্যের পরিজ্ঞাতা। বলুন, সত্য আগমন করেছে এবং অসত্য না পারে নতুন কিছু সৃজন করতে এবং না পারে পূনঃ প্রত্যাবর্তিত হতে। বলুন, আমি পথভ্রষ্ট হলে নিজের ক্ষতির জন্যেই পথভ্রষ্ট হব; আর যদি আমি সৎপথ প্রাপ্ত হই, তবে তা এ জন্যে যে, আমার পালনকর্তা আমার প্রতি ওহী প্রেরণ করেন। নিশ্চয় তিনি সর্বশ্রোতা, নিকটবর্তী।  (৩৪:৪৭ – ৫০)

মনে সাহস ও ঈমানী দৃঢ়তা এবং সকল লোভ- -লালসা ও বাধা–বিপত্তিকে উপেক্ষা করার এমনই ছিল তাঁর মনোবল ও প্রত্যয়। তাঁর প্রত্যয়পূর্ণ বক্তব্যের দৃঢ়তা উপস্থিত সবাইকে হতচকিত করলো। আবু তালিব বিমুগ্ধ চিত্তে তাঁর কথা শুনলেন এবং বললেন, ‘তুমি তোমার কাজ চালিয়ে যাও, আমি সর্বাবস্থায় তোমাকে সহযোগিতা করে যাব।’ কুরাইশ নেতারাও বুঝে গেলো তাদের কি করণীয়। ক্রোধান্বিত কুরাইশ নেতৃবৃন্দ তাদের হুমকি পুনর্ব্যক্ত করে বেরিয়ে গেলো।

এ ঘটনার পর আবু তালিব হাশেমী ও মুত্তালিব গোত্রের সবাইকে ডেকে একত্র করেন এবং তাদেরকে কুরাইশদের হুমকির বিষয়টি অবহিত করেন। এর মোকাবেলায় তিনি তাদের প্রতি মুহাম্মদ (সাঃ)-কে সর্বাত্মক সমর্থনের আহ্বান জানান। স্বগোত্রীয় লোকজনের অধিকাংশই তখন পর্যন্ত ইসলাম কবুল করেননি। এতদ্সত্ত্বেও সব দিক বিবেচনা করে তারা মুহাম্মদ (সাঃ) এর প্রতি তাদের সমর্থন ব্যক্ত করেন। তবে নবীজী (সাঃ) এর অপর এক চাচা এবং ইসলামের ঘোর শত্রু আবু লাহাব তার বিরূপ প্রতিক্রিয়া জানিয়ে সরে পড়ে।

 

নবী করীম (সাঃ) এর সাথে দুর্ব্যবহার

প্রথম পর্যায়ে নবী করীম (সাঃ) কুরাইশদের দ্বারা নানাবিধ হেনস্তার শিকার হয়েছিলেন। পদে পদে তারা বাধা–প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করত এবং তাঁকে হেনস্তা করতে শুরু করল। একদিন কা’বা চত্তরে নামাযে সিজদারত অবস্থায় ছিলেন। এমন সময় আবু জেহেল পশুর নাড়িভুঁড়ি এনে তাঁর উপর ফেলে দেয়। নবী (সাঃ) কোনরূপ প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে নীরবে নিজ বাসায় চলে যান। তাঁর এ অবস্থা দেখে কন্যা ফাতিমা (রাঃ) বিচলিত হয়ে কেঁদে ফেলেন এবং পিতার দেহ-মোবারক নিজ হাতে ধুয়ে–মুছে পরিস্কার করে দেন। আবু লাহাবের স্ত্রী প্রায়শই তাঁর চলার রাস্তায় ময়লা আবর্জনা ফেলে এবং কাঁটা বিছিয়ে যাতায়াতে বিঘ্নের সৃষ্টি করত। তিনি নিজ হাতে এগুলো সরিয়ে পথ চলতেন, কিন্তু কোন অভিযোগ করতেন না। কাফেররা গাল–মন্দ ও ঠাট্টা–বিদ্রূপ দ্বারা তাঁকে উত্ত্যক্ত করার চেষ্টা করতো। মক্কায় আগত হজ্জ্ব যাত্রীদের কাছে তাঁর বিরুদ্ধে মিথ্যাচার করতো ও তাঁকে গণক বা উন্মাদ বলে আখ্যায়িত করতো। তাদের সমাবেশে তিনি দ্বীনের কথা বলতে গেলে তারা সোরগোল পাকিয়ে তা ভণ্ডুল করার প্রয়াস পেতো। কুরআনের বাণী তাদের অন্তরে যেন জ্বালা ধরিয়ে দিত, তারা আল্লাহর নবীকে মিথ্যাবাদী, উন্মাদ, কবি, যাদুকর ইত্যাদি আখ্যা দিল। অথচ নবুওত–পূর্ববর্তী জীবনে এ লোকগুলোই তাঁকে সত্যবাদী ও বিশ্বস্ত আখ্যা দিয়েছিল। এ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ্ তাঁর নবীর সমর্থনে বললেন:

وَإِن يَكَادُ الَّذِينَ كَفَرُوا لَيُزْلِقُونَكَ بِأَبْصَارِهِمْ لَمَّا سَمِعُوا الذِّكْرَ وَيَقُولُونَ إِنَّهُ لَمَجْنُونٌ۝ وَمَا هُوَ إِلَّا ذِكْرٌ لِّلْعَالَمِينَ۝

“কাফেররা যখন কুরআন শুনে, তখন তারা তাদের দৃষ্টি দিয়ে যেন আপনাকে আছড়ে ফেলে দেবে এবং তারা বলে, সে তো একজন উন্মাদ। অথচ এ কুরআন তো বিশ্বজগতের জন্যে উপদেশ বৈ অন্য কিছু নয় (৬৮: ৫১ – ৫২)।”

এহেন বিরূপ ও কঠিন পরিস্থিতিতে রহমতের নবী অপরিসীম ধৈর্য সহকারে সব ধরনের নিপীড়ন সহ্য করে তাঁর প্রচার কাজ চালিয়ে যেতে লাগলেন। মহান আল্লাহর সাহায্য ছিল তাঁর পাথেয়। তাই শত প্রতিকূলতা, নির্যাতন–নিপীড়ন সত্ত্বেও রহমতের কান্ডারী নবী (সা)–কে আল্লাহর দ্বীন প্রচারে মোটেও হতদ্যোম করতে পারেনি। মহান আল্লাহর নির্দেশ পালনে তিনি ছিলেন অকুতোভয়।

 

নও-মুসলিমদের উপর জুলুম-নির্যাতনের কিছু ঘটনা

হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর ঘনিষ্ট বন্ধু ও নব্য মুসলিম হযরত আবু বকর (রাঃ) ছিলেন মক্কার বনু তাইম গোত্রের একজন ধনাঢ্য ও সম্মানিত ব্যক্তি। তিনি শুরুতেই ইসলাম গ্রহণ করেন। তখন গোপনে ইসলামের দাওয়াতি কার্যক্রম চলছিল। মুসলিমদের সংখ্যা মাত্র ৩৯জন, তখন তিনি নবীজী (সাঃ) -র দরবারে প্রকাশ্যে তবলিগী খুৎবা প্রদানের আবেদন জানালেন। কিন্তু এতে তিনি রাজী হলেন না। নাছোড় বান্দা আবু বকর (রাঃ) বারবার অনুরোধ করে অনুমতি আদায় করলেন। এটাই ছিল ইসলামের প্রথম তবলিগী খুৎবা। সবাইকে নিয়ে তিনি কা’বা প্রাঙ্গণে যান ও খুৎবা দিতে শুরু করেন। এর পরক্ষণেই কাফের ওৎবার নেতৃত্বে কুরাইশরা আবু বকর (রাঃ) এর উপর প্রচন্ড আক্রমণ চালিয়ে তাঁকে ক্ষতবিক্ষত করে ফেলে। এতে তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়েন। খবর পেয়ে বনু-তাইম গোত্রের লোকজন এসে তাঁকে উদ্ধার করে এবং বাড়ি নিয়ে যায়। দীর্ঘক্ষণ পর তাঁর জ্ঞান ফিরে আসলে প্রথমেই নবীজী (সাঃ)-র খবর জানতে চান। তাঁর মাতা তাঁকে খাদ্য ও পানীয় দিতে গেলে তিনি তা গ্রহণে আপত্তি জানিয়ে বলেন, নবীজী (সাঃ) -র খবর না পাওয়া পর্যন্ত তিনি খাবেন না। কি অপরিসীম ও অকৃত্রিম ভালবাসা বন্ধুর জন্য!

নব দীক্ষিত গরীব মুসলমানগণ বিশেষ করে ক্রীতদাসরা তাদের তীব্র নির্যাতনের শিকার হচ্ছিল। তাঁদেরকে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করা হতো, চাবুক মারা হতো, শিকল বাঁধা অবস্থায় তপ্ত মরুর রোদে পাথর চাপা দিয়ে রাখতো, তাঁদের পিঠে ও পেটে জ্বলন্ত অঙ্গার রেখে শুইয়ে রাখা হতো, পেটে তীর উৎকীর্ণ দিতো এবং মুসলিম নারীদেরকে উলঙ্গ করে বিভিন্নভাবে লাঞ্ছিত ও নিপীড়ন করা হতো। হযরত বেলাল (রাঃ) ছিলেন কাফের উমাইয়া ইবনে খলফ এর ক্রীতদাস। তিনি গোপনে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছেন এ কথা জানতে পেরে সে ক্ষিপ্ত হয়ে তাঁর উপর নির্মম নির্যাতন শুরু করে। সে তাঁকে তপ্ত রোদে চিৎ করে শুইয়ে বুকের উপর পাথর চাপা দিয়ে রাখতো। এ অসহনীয় অবস্থায়ও তিনি মহান আল্লাহর নাম “আহাদ”-”আহাদ” জপ করতেন। একদা হযরত আবু বকর (রাঃ) তাঁকে এ অবস্থায় দেখে তাঁর মালিকের কাছ থেকে প্রচুর অর্থের বিনিময়ে ক্রয় করে মুক্ত করে দিলেন। এভাবে তিনি আরও কয়েকজন নির্যাতিত মুসলিম ক্রীতদাস ও বাঁদীকে তাঁদের মালিকের কাছ থেকে ক্রয় করে মুক্ত করে দেন।

হযরত আম্মার (রাঃ) তাঁর পিতা—মাতাসহ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। এতে কাফেররা ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে এবং তাঁদেরকে পূর্ব ধর্মে ফিরিয়ে আনতে ভীষণ অত্যাচার–নির্যাতন শুরু করে। অত্যধিক অত্যাচারের ফলে তারা অজ্ঞান হয়ে পড়তেন। তারপরও তাঁরা ইসলাম ত্যাগ করতে সম্মত হননি। কাফেররা তখন তাঁর পিতা ইয়াছির (রাঃ) এর দু’পায়ে দু’টি দড়ি দিয়ে দু’টি উটের পায়ের সাথে বেঁধে উটদ্বয়কে বিপরীত দিক থেকে তাড়িয়ে নেয়। ফলে তাঁর দেহ চিড়ে দু’টুকরো হয় এবং তিনি তৎক্ষণাৎ শাহাদত বরণ করেন। তাঁর স্ত্রী সুমাইয়া (রাঃ)-কে আবু জেহেল বর্শাবিদ্ধ করে হত্যা করে। তিনি হলেন প্রথম মুসলিম নারী যিনি শাহাদত বরণ করেন। ইসলাম গ্রহণের কারণে হযরত আবু যর গিফফারী (রাঃ), হযরত খাব্বাব (রাঃ), প্রমুখ সাহাবীগণ এ ধরনের অকথ্য নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন। তাঁদের উপর অকথ্য নির্যাতনের ব্যাপারে মহান আল্লাহ্ বলেন:

وَمَا نَقَمُوا مِنْهُمْ إِلَّا أَن يُؤْمِنُوا بِاللَّهِ الْعَزِيزِ الْحَمِيدِ۝ الَّذِي لَهُ مُلْكُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ ۚ وَاللَّهُ عَلَىٰ كُلِّ شَيْءٍ شَهِيدٌ۝

“তারা তাদেরকে শাস্তি দিয়েছিল শুধু এ কারণে যে, তারা প্রশংসিত, পরাক্রান্ত আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেছিল, যিনি নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলের ক্ষমতার মালিক, আল্লাহর সামনে রয়েছে সবকিছু।” (৮৫:৮ – ৯)

 

মুজিযা প্রদর্শনের দাবী

ইসলাম একটি যুক্তিবাদী ধর্ম। এর প্রতিটি বিশ্বাস ও কর্ম যৌক্তিক ও স্বাভাবিক (natural)। ইসলাম মানুষকে বিবেক ও বুদ্ধিবৃত্তিক জ্ঞান চর্চার মাধ্যমে বিশ্ব–প্রকৃতিতে বিরাজমান আল্লাহর নিদর্শনসমূহ সম্পর্কে চিন্তা–ভাবনা করার কথা বলে যাতে মানুষ আল্লাহকে জানতে ও বুঝতে পারে। কিন্তু কিছু ব্যক্তিবর্গ তাঁর নবুওতের স্বপক্ষে হযরত মূসা ও হযরত ঈসা নবীর মুজিযার মত মুজিযা প্রদর্শনের দাবী করে। কাফের সম্প্রদায় সর্বদাই নবীগণের মুজিযাকে অস্বীকার করেছে এবং এগুলোকে যাদু বলে আখ্যায়িত করেছে। আবু জেহেল এক চাঁদনী রাতে নবীজী (সাঃ)-কে বললো, ’তোমাকে নবী বলে স্বীকার করব যদি তুমি এ চন্দ্রকে দ্বিখন্ডিত করে দেখাতে পারো।’ তিনি আল্লাহর অসীম কুদরতে ও আঙ্গুলের ইশারায় চাঁদকে দ্বিখন্ডিত করলেন। উপস্থিত সবাই তা দেখলো। কিন্তু আবু জেহেল বললো, ’মুহাম্মদ আমাদেরকে যাদুগ্রস্ত করে ফেলেছে।’ সে বললো, ‘মক্কার দূর প্রান্তের লোকজন যদি দ্বিখন্ডিত চাঁদ দেখে থাকে তবে আমরা বিশ্বাস করব।’ অনুসন্ধানে জানা গেলো দূর প্রান্তের লোকেরাও তা–ই দেখেছে। তখন অবিশ্বাসী আবু জেহেল বললো, ‘মুহাম্মদ সবাইকে যাদুগ্রস্ত করে ফেলেছে।’

কাফেরগণ এও জানতে চায় কুরআন কেন পুস্তকাকারে নাযিল হলো না। তারা সাফা পাহাড়কে স্বর্ণে রূপান্তরিত করার দাবীও করে বসে। অথচ এরা তাদের স্বহস্তে তৈরী উপাস্যদের কাছে এমন কিছু দাবী করে না বা দাবী যদি কখনও করেও তবে এগুলো তাদের এসব দাবী পূরণে যে সম্পূর্ণ অক্ষম – এটা তারা জানে। তা সত্ত্বেও তাদের এহেন দাবী সম্পূর্ণ অযৌক্তিক ও ভিত্তিহীন। আল্লাহ্ রব্বুল আলামীন মুজিযা দান করেন যাতে আল্লাহ্ ও তাঁর নবী–রসূলগণের উপর মানুষের বিশ্বাস প্রবল হয়। মুজিযায় বিশ্বাস করা অত্যাবশ্যকীয়। দাবীকৃত মুজিযা প্রকাশিত হওয়ার পর তাতে অবিশ্বাস করলে আল্লাহর গজব অবশ্যাম্ভাবী হয়ে পড়ে। মুজিযা প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআনের নিম্নোক্ত আয়াতগুলো প্রণিধানযোগ্য:

وَيَقُوْلُ الَّذِيْنَ كَفَرُوْا لَوْلَاۤ اُنْزِلَ عَلَيْهِ اٰيَةٌ مِّنْ رَّبِه ط اِنَّمَاۤ اَنْتَ مُنْذِرٌ وَّلِكُلِّ قَوْمٍ هَادٍ۝

“কাফেররা বলে: তাঁর (নবীর) প্রতি তাঁর পালনকর্তার পক্ষ থেকে কোন নিদর্শন (মুজিযা) অবতীর্ণ হল না কেন? আপনার কাজ তো ভয় প্রদর্শন করাই এবং প্রত্যেক সম্প্রদায়ের জন্যেই পথপ্রদর্শক ছিল।” (১৩:৭)

وَمَا كَانَ لِرَسُوْلٍ اَنْ يَّاْتِىَ بِاٰيٰةٍ اِلَّا بِاِذْنِ اللهِ فَاِذَا جَآءَ اَمْرُ اللهِ قُضِىَ بِالْحَقِّ وَخَسِرَ هُنَالِكَ الْمُبْطِلُوْنَ۝

“…….. আল্লাহর অনুমতি ব্যতীত কোন নিদর্শন নিয়ে আসা কোন রসূলের কাজ নয়। যখন আল্লাহর আদেশ আসবে, তখন ন্যায়সঙ্গত ফয়সালা হয়ে যাবে। সেক্ষেত্রে মিথ্যাপন্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।” (৪০:৭৮)

وَإِذَا رَأَوْا آيَةً يَسْتَسْخِرُونَ۝ وَقَالُوا إِنْ هَـٰذَا إِلَّا سِحْرٌ مُّبِينٌ۝

”তারা যখন কোন নিদর্শন দেখে তখন বিদ্রূপ করে। এবং বলে, কিছুই নয়, এযে স্পষ্ট যাদু।” (৩৭:১৪ – ১৫)

قُلْ لَّاۤ اَقُوْلُ لَکُمْ عِنْدِیْ خَزَآئِنُ اللّٰهِ وَ لَاۤ اَعْلَمُ الْغَیْبَ وَ لَاۤ اَقُوْلُ لَکُمْ اِنِّیْ مَلَکٌ ۚ اِنْ اَتَّبِعُ اِلَّا مَا یُوْحٰۤی اِلَیَّ ؕ قُلْ هَلْ یَسْتَوِی الْاَعْمٰی وَ الْبَصِیْرُ ؕ اَفَلَا تَتَفَكَرُوْنَ۝

“(হে নবী) আপনি বলুন: আমি তোমাদেরকে বলি না যে, আমার কাছে আল্লাহর ভান্ডার রয়েছে। তাছাড়া আমি অদৃশ্য বিষয় অবগতও নই। আমি এমন বলি না যে, আমি ফেরেশতা। আমি তো শুধু ঐ ওহীর অনুসরণ করি, যা আমার কাছে আসে। আপনি বলে দিন: অন্ধ ও চক্ষুষ্মান কি সমান হতে পারে? তোমরা কি চিন্তা কর না?” (৬:৫০)

 

বিরোধীতার মুখে নবী (সাঃ) এর প্রতি আল্লাহর সাত্ত্বনা বাণী

আল্লাহর বাণী প্রচারে মক্কার কাফেরগণ যে শুধু বিরোধিতাই করত তা নয়, নবী করীম (সাঃ)-কে ব্যঙ্গ–বিদ্রূপ দ্বারা মানসকিভাবে নিগৃহীত করতো এবং তাঁর অনুসারীবৃন্দের ওপরও চালাতো শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন।অবিশ্বাসীরা যখন তাঁকে প্রত্যাখ্যান করত ও তাঁকে ও তাঁর সাথীগণের ওপর অমানুষিক দৈহিক নির্যাতন চালাত তখন তিনি তাদের অজ্ঞতার্পূণ আচরণে খুবই ব্যথিত ও উদ্বিগ্ন হতেন। এ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ্ বললেন:

“কাফেররা যখন কুরআন শুনে, তখন তারা তাদের দৃষ্টি দিয়ে যেন আপনাকে আছড়ে ফেলে দেবে এবং তারা বলে, সে তো একজন উন্মাদ। অথচ এই কুরআন তো বিশ্বজগতের জন্যে উপদেশ বৈ অন্য কিছু নয় (৬৮: ৫১ – ৫২)।”

“তারা মুখের ফুঁৎকারে আল্লাহর আলো নিভিয়ে দিতে চায়। আল্লাহ্ তাঁর আলোকে পূর্ণরূপে বিকশিত করবেন যদিও কাফেররা তা অপছন্দ করে (৬১:৮)।”

“অতএব, আপনি উপদেশ দান করুন। আপনার পালনকর্তার কৃপায় আপনি অতীন্দ্রিয়বাদী নন এবং উম্মাদও নন।” (৫৫:২৯)।

নবী করীম (সাঃ) ও তাঁর অনুসারী মজলুম মুসলিমদের সান্ত্বনায় আল্লাহ্ তায়ালা “সুরা বুরুজ” নাযিল করলেন।

অবস্থাদৃষ্টে আল্লাহ্ তায়ালার পক্ষ থেকে তাঁর প্রিয় নবী (সা) এর নিকট সান্ত্বনার বাণী নাযিল হলো। আল্লাহ্ তায়ালা তাঁকে আশ্বাস ও সান্ত্বনা দিয়ে বললেন:

وَاصْبِرْ وَمَا صَبْرُكَ اِلَّا بِاللهِ وَلَا تَحْزَنْ عَلَيْهِمْ وَلَا تَكُ فِىْ ضَيْقٍ مِّمَّا يَمْكُرُوْنَ۝ اِنَّ اللهَ مَعَ الَّذِيْنَ اتَّقَوا وَّالَّذِيْنَ هُم مُّحْسِنُوْنَ۝

“এবং আপিন ধৈর্যশীল হোন। কারণ আপনার ধৈর্য তো আল্লাহর প্রেরিত (সাহায্য)। তাদের জন্য দুঃখিত হবেন না, এবং তাদের ষড়যন্ত্রে নিজেকে বিপর্যস্ত করবেন না। নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সঙ্গে আছেন, যারা পরহেযগার এবং যারা সৎকর্ম করে।” (১৬:১২৭ – ১২৮)

ادْفَعْ بِالَّتِىْ هِىَ اَحْسَنُ السَّيِّئَةَ نَحْنُ اَعْلَمُ بِمَا يَصِفُوْنَ۝

“মন্দকে প্রতিহত করুন সর্বোত্তম পন্থায়। (আপনার সম্পর্কে) তারা যেসব কথা বলে সে সম্বন্ধে আমি সবিশেষ অবহিত”।” (২৩:৯৬)

وَلَقَدِ اسْتُهْزِئَ بِرُسُلٍ مِّنْ قَبْلِكَ فَحَاقَ بِالَّذِيْنَ سَخِرُوْا مِنْهُمْ مَّا كَانُوْا بِه يَسْتَهْزِءُوْنَ۝

“আপনার পূর্বেও অনেক রাসূলের সাথে ঠাট্টা–বিদ্রূপ করা হয়েছে। অতঃপর যে বিষয়ে তারা ঠাট্টা করত তা উল্টো ঠাট্টাকারীদের উপরই আপতিত হয়েছে।” (২১:৪১)

وَلَقَدِ اسْتُهْزِئَ بِرُسُلٍ مِّن قَبْلِكَ فَحَاقَ بِالَّذِينَ سَخِرُوا مِنْهُم مَّا كَانُوا بِهِ يَسْتَهْزِئُونَ۝

”নিশ্চয়ই আপনার পূর্ববর্তী পয়গম্বরগণের সাথেও উপহাস করা হয়েছে। অতঃপর যারা তাঁদের সাথে উপহাস করেছিল, তাদেরকে ঐ শাস্তি বেষ্টন করে নিল, যা নিয়ে তারা উপহাস করত।” (৬:১০)

 

অধ্যায়সমূহ